মেডুসা — ভূতের গল্প — সাগরিকা রায় — এবং বৃত্তের বাইরে

Medusa

মেডুসা

সাগরিকা রায়

প্ল্যানচেট করার একটা তীব্র ইচ্ছে জেগেছে মৃদুভাষের মধ্যে। এর কারণও আছে। একটা সময় মৃদুভাষ এসব নিয়ে ভাবেনি। বস্তুতপক্ষে সে এসব ভাবনার মধ্যেই ঢোকেনি। যদিও একটা সময় প্ল্যানচেট নিয়ে মগ্ন ছিল বললে অত্যুক্তি হয় না। কিন্তু লাজরুণের বাবার বিষয়টা কানে আসার পরেই ফের প্ল্যানচেট ওর মাথাতে ঘুরছে।

কিছুদিন আগের কথা। সেকেন্ড ইয়ারের ফিলসফির ক্লাস নিয়ে কমনরুমে এসে জল খাচ্ছে, তখন কোণের দিকে ঋতশ্রী আর লাজরুণকে দেখল ফিসফিস করে আলোচনা করছে। এতো নীচু স্বরের আলোচনা, যে পাশের জন একটি শব্দ শুনতে পাচ্ছে না বলে কান খাড়া করেও ভ্রু কুঁচকে আছে। 

দৃশ্যটা হাসির উদ্রেক করার মতোই। তবু মৃদুভাষ নিজেকে সামলে নিয়ে চেয়ার টেনে বসেছে অনিকেতের পাশে। একটা কাগজে হালকা হাতে লিখল, “পাশে বসে দুজন কী যড়ষন্ত্র করছে বল তো ? শুনতে পেয়েছ কিছু ?”

অনিকেত বিরক্ত নিয়ে মাথা নাড়ে, “নাহ। কিচ্ছু না। মনে হয়, মলে লিপস্টিক ডিস্কাউন্টে দিচ্ছে, সেসবই আলোচনার বস্তু। অথবা ঋতশ্রীর বিয়ে ঠিক হয়েছে হয়তো !”

মৃদুভাষ অল্প হেসে পরের ক্লাসের জন্য তৈরি হচ্ছিল। থার্ড ইয়ারের ক্লাস নিতে প্রস্তুতি নিয়ে আসতে হয় ভালভাবে। ক্লাসে দীপন চ্যাটার্জি আর সুলগ্না দেব নিজেরা প্রস্তুতি নিয়ে এসে প্রফেসরকে নাজেহাল করার চেষ্টা করে। সে সুযোগ ওদের দেয় না মৃদুভাষ। 

অনিকেত উঠে গেল। ওর ক্লাস আছে। মৃদুভাষ উঠবে উঠবে করছে, সেই সময় লাজরুণ বলল, “মৃদুদা, একটা কথা ছিল।”

“বলে ফেল।” মৃদুভাষ ডায়েরির পাতা উলটে যাচ্ছে এক মনে। 

“ওভাবে নয়। আপনি সিরিয়াস হোন। দরকারি কথা।”

অবাক হল মৃদুভাষ, “কী কথা বল তো ? অনেকক্ষণ দেখছি তোমরা দুজনে ফিসফিস করছিলে। কী ব্যাপার ?”

লাজরুণ একটু থেমে থেমে বলল, “আমার একটা সমস্যা হয়েছে। বলব ?”

“অবশ্যই বলবে। কী ব্যাপার ? সিরিয়াস কিছু ?” মৃদুভাষ দেখছিল, লাজরুণের ঘন আইল্যাসের ছায়া পড়েছে গালের ওপর। ফর্সা গালের ওপরে হালকা ছায়া অল্প অল্প নড়ছে। 

লাজরুণ বলল, “আমার বাবার শরীর বেশ খারাপ করেছে। বাবা থাকেন নিজামপুরে। বীরভূমের কাছেই এই নিজামপুর। বাবা রিটায়ার করার পরে ডেয়ারি ফার্ম খুলেছেন। বিরাট ব্যাপার স্যাপার। বেশ কিছু স্টাফ আছে ফার্ম দেখাশোনার জন্য। আমি চাকরির সূত্রে কলকাতাতে আছি। নিজামপুরে মাসে দু’বার যাই। কিন্তু, এখন যা দেখছি, আমাকে বোধহয় চাকরি ছেড়ে নিজামপুরে গিয়ে বাবার কাছে থাকতে হবে। মা এসব সামলাতে পারছে না। বুঝতে পারছেন আমার পরিস্থিতিটা?”

“হুম। লাজরুণ, এখনই ডিসিশন নিও না। দেখা যাক। তুমি বরং ছুটি নাও। ছুটি নিয়ে বাবার কাছে যাও। বাবার শরীর ভাল হলে তারপর ফের জয়েন করো। ফার্ম দেখাশোনার জন্য নিশ্চয় একজন আছেন ? কেবলমাত্র তোমার বাবা একা পারবেন না বড় ফার্ম সামলে নিতে। তাই না ?”

“হ্যাঁ মৃদুদা। সুমন দেব নামের একজন আমাদের এই ফার্মে আছেন। ম্যানেজার। উনিই ফোন করে বাবার শারীরিক পরিস্থিতি বুঝিয়ে বললেন আমাকে।” 

“উনি বিশ্বাসী নিশ্চয় ?”

“মনে তো হয়। আমি থাকি না। বাবা মানসিক ভাবে শক্ত, দৃঢ় চরিত্রের মানুষ। শরীরও ভাল ছিল। ব্যায়াম করেন নিয়মিত। এখন বয়স হলে যা হয় আর কি। তাহলে ছুটি নিয়ে নিজামপুরে যেতে বলছেন ?”

“আমার সেটাই ঠিক মনে হচ্ছে। তুমি যাও। দরকার হলে আমাকে জানিও। ভয় পেও না। টেনশন করো না। আজকেই একটা অ্যাপ্লিকেশন দিয়ে রাখ। ছুটি মঞ্জুর হলে তারপর চলে যাও।”

লাজরুণ থ্যাংকস জানিয়ে নিজের চেয়ারে গিয়ে বসে ঋতশ্রীর সঙ্গে আলোচনায় মেতে গেল। ছুটি নেবে, সেই বিষয়েই আলোচনা। 

মৃদুভাষ ক্লাস নিতে বেরিয়ে গেল। লম্বা করিডর দিয়ে যেতে যেতে ছাতিম ফুলের গন্ধ পেল মৃদুভাষ। এই শীতের বিকেলে ছাতিম ফুটেছে কোথায় ! ছাতিম ফুলের গন্ধ অন্য ঋতুতে হঠাৎ করে তারাই পায়, যারা অন্যলোকের দেখা পায়। মৃদুভাষ এই কথা দিদার কাছে শুনেছে। অনেক দিন আগে একবার লাভা লোলেগাঁও বেড়াতে গিয়েছিল মৃদুভাষ। ফেরার সময় বিকেল ঘনিয়ে এসেছিল। প্রাইভেট গাড়িতে চেপে আসার সময় কণাদ বোস ওদের সঙ্গ নিয়েছিল। কণাদকে আগে থেকে চেনা ছিল না। লাভাতে গিয়ে আলাপ হয়েছিল। কণাদ ওদের গাড়ির সামনে এসে ওর অসুবিধের কথা বলেছিল, “এমারজেন্সি। তাড়াতাড়ি করে বাড়িতে ফিরে যেতে হবে। যদি আপনাদের অসুবিধে না হয়, আমি কি আপনাদের সঙ্গে যেতে পারি ?”

কেউ আপত্তি করেনি। ইনোভাতে জায়গা প্রচুর। কণাদ ধন্যবাদ দিয়ে উঠে এল। গাড়ি ছুটছিল পাহাড়ি পথের বাঁক ঘুরে ঘুরে। কণাদ ওদলাবাড়িতে নেমে যাবে। ঠিক সেই সময় তীব্র ছাতিমের গন্ধে গাড়ির ভিতরটা ভরে গেল। 

মৃদুভাষ চিনতে পারেনি। নাক টেনে বলেছে, “কিসের গন্ধ? কেমন যেন মন উদাস করা গন্ধ।” 

তখন দিদা আস্তে আস্তে বলল, “এ ছাতিমের গন্ধ ! এসময় কেন…! ছাতিমের গন্ধ সন্ধের দিকে পাওয়া যায়। এখন তো সন্ধে হয়নি !” 

মৃদুভাষ হেসেছে, “এটা কোনও কথা হল ? বাতাসে ভেসে এসেছে গন্ধটা।” 

দিদা আনমনে বলেছে, “ছাতিম সময়ের আগে দেখা দিলে বুঝবে সময় পালটে যাচ্ছে ! এমনটা হওয়া উচিত নয়।”

মৃদুভাষের ক্লাস কেউ মিস করতে চায় না। আজও পূর্ণ হল এর দিকে তাকিয়ে তুষ্ট মুখে পড়াতে শুরু করল মৃদুভাষ। গ্রীক মিথলজি পড়াবে আজ। ব্যারিটোন গলায় পড়াতে শুরু করল মৃদুভাষ, “আজ মেডুসাকে নিয়ে বলব। মেডুসা! কেউ বলে দানবী। কেউ বলে দেবী। আসলে সে কে ? জানতে হলে আমাদের শুনতে হবে। 

গ্রীক মিথলজির একটি চরিত্রের নাম মেডুসা। মেডুসাকে কেউ বলে দানবী। কেউ বলে ডাইনী। মেডুসার চোখের দিকে তাকালেই পাথর হয়ে যেতে হবে। ২০১০ সালে হলিউডের সিনেমা clash of the Titans-এ মেডুসাকে দেখানো হয়েছিল। কিন্তু কে এই মেডুসা ? সে কি জন্মাবধি একজন দানবী ? জানতে হলে আমাদের একটু বিস্তারিত ভাব মেডুসাকে জানা উচিত। গ্রীক মিথলজির অন্যান্য দানবীর মত মেডুসার জন্মদাতা ছিলেন টাইফন আর একিডনা। টাইফন ও একিডনা ছিলেন দানব ও দানবী। তিন গর্গন অত্যন্ত খারাপ বোনের মধ্যে ছোট বোন মেডুসা অন্য দুই বোনের মত অমর ছিলেন না। এই তিন বোনকে একসঙ্গে গর্গন বলে ডাকা হতো। আবার, মতান্তরে বলা হয়, মেডুসার বাবা-মা ছিলেন সমুদ্রের দেবতা ফোরসিস ও সিতো। মেডুসা সেই কারণে মোটেই দানবী ছিলেন না। তিনি পরমাসুন্দরী একজন দেবকন্যা ছিলেন। তিনি যেখানে সূর্যের আলো পৌঁছয় না, সেই উত্তরে দেবি এথেনার মন্দিরের একজন ধর্মযাজিকা ছিলেন। একবার তাঁর নাকি সূর্যকে দেখার ইচ্ছে হল। দেবী এতেনার অনুমতি চেয়েও পেলেন না। তখন দেবীর ওপরে মেডুসার ক্ষোভ জন্মাল। সেই রাগ, ক্ষোভ থেকে তিনি দেবীকে দুকথা শুনিয়ে দিলেন, “আমার সৌন্দর্যের প্রতি আপনার ঈর্ষা আছে। আমি সূর্যের দেখা পেলে সূর্য আমার রূপে মুগ্ধ হবেন, সেটা আপনার সহ্য হচ্ছে না।”

এথেনা ক্রুদ্ধ হয়ে অভিশাপ দিলেন, “যে রূপ নিয়ে তোমার এত অহংকার, সে রূপ অদৃশ্য হয়ে যাবে। তোমার দিকে যে তাকাবে, সে পাথর হয়ে যাবে। সেই কারণে কেউ তোমার মুখদর্শন করবে না।” 

অভিশাপের ফলে মেডুসার গোলাপি বর্ণ সাপের মত সবুজাভ হল। চিকণ ত্বক-এ মাছের মত বড় বড় আঁশ দেখা দিল। স্বর্ণকেশ পরিণত হল হাজার হাজার বিষাক্ত সাপে। কোমর থেকে সম্পূর্ণ শরীর সাপ হয়ে গেল। চোখের দৃষ্টি হল শীতল। ঠিক সাপের মত। মেডুসার মাথা হল মৃতদের রক্ষক, সমাধির রক্ষক, খারাপ আত্মাদের রক্ষক।”... 

মৃদুভাষ পড়িয়ে চলে। ক্লাসের মনোযোগ একীভূত হয়ে আছে মৃদুভাষের মধ্যে। গ্রীক মিথলজির একটি চরিত্র শতাব্দীর পর শতাব্দী পেরিয়ে এসে একটি ক্লাসের মধ্যে স্থির হয়ে রয়েছে। 

এক সময় মৃদুভাষের ক্লাস শেষ হল। স্মিত হেসে ক্লাস থেকে বেরিয়ে আসছে যখন, তখনও ক্লাস নিশ্চুপ হয়ে আছে। 

মৃদুভাষের আজ আর ক্লাস নেই। ও বেরিয়ে এল। এখন গাড়িতে উঠে নিজের বাড়ির দিকে যাবে। ড্রাইভার নয়ন বহুদিনের। ও গাড়ি স্টার্ট দিয়ে একবার মৃদুভাষের দিকে তাকিয়ে দেখল। মৃদুভাষ ফোনে মগ্ন। দু’চারটে কথা ছিটকে আসছে। নয়ন বুঝতে পারছিল মৃদুভাষ অনিন্দিতা ম্যামের সঙ্গে কথা বলছে।

 ফোন রেখে মৃদুভাষ বাইরের দিকে তাকিয়ে রইল। বিকেলের কলকাতা সেজে উঠবে সন্ধের জন্য। আলো জ্বলে উঠছে এক এক করে। এ সময় প্রকৃতি অলস হয়ে থাকে। যেন দ্বিপ্রাহরিক নিদ্রা সেরে আলগোজে গা ধুতে যাচ্ছে। 

“বাড়িতেই যাবেন তো ?” নয়ন অভ্যেস মতো প্রশ্ন করে নেয়। 

“বাড়িতে ? না। আজ একবার দিনুবাবুর বাড়িতে যাব। ল্যান্সডাউনে। ওখান থেকে সোজা বাড়িতে।” মৃদুভাষ গা এলিয়ে দিল সীটে। 

নয়ন ল্যান্সডাউন রোডের দিকে গাড়ি ঘুরিয়ে নিল। দিনুবাবুর বাড়িটা একটা আজব জায়গা। কবেকার প্রাচীন এক বাড়ি, যার জন্মসাল কেউ জানে কিনা সন্দেহ, সেই বাড়িতে মাঝে মধ্যেই যায় মৃদুভাষ। সামনের বড় দরজার পরে চৌকো উঠোন ঘিরে শ-খানেক ঘর। নয়ন দেখেছে, বেশির ভাগ ঘর বন্ধ। কেউ থাকে না। বট-অশ্বত্থের আস্তানা। ভাম, ইঁদুরের সংসারও গড়ে উঠেছে সেখানে। এসবের ভিতরে আছে দিনুবাবুর ঘর। দুটো ঘর নিয়ে থাকেন দিনুবাবু। নয়নকে ঘরে ঢোকার পারমিশন দেননি। ইশারায় বাইরে থাকতে বলেছিলেন। সেই থেকে অপমানিত নয়ন বাড়ির ভিতরে যায় না। বাইরে গাড়ির ভিতরেই থাকে। কেন যে স্যার ওখানে যান ! ভেবে পায় না নয়ন। 

গাড়ি সেই প্রাচীন বাড়ির সামনে এনে পার্ক করালো নয়ন। মৃদুভাষ “তড়াতাড়িই আসছি,” বলে বাড়ির ভিতরে ঢুকে গেল। বড় সদর দরজার পরে আধ অন্ধকার উঠোন পেরিয়ে দিনুবাবুর ঘরের দিকে যাওয়ার সময় দোতলার নিঝুম বারান্দায় কিছু উড়ে যেতে দেখল মৃদুভাষ। অদ্ভুত কিছু। এত বড় পাখি এই বাড়িতে কে পোষে ? কী পাখি ওটা ?

 দিনুবাবুর ঘরের দরজা বন্ধ। নক করার পরে ভিতর থেকে চিরপরিচিত “ক্যা হ্যাঁ ?” প্রশ্নটা এল। মৃদুভাষ আস্তে নিজের নামটা বলল। মিনিট খানেক পরে দরজা খুলল। মৃদুভাষ ভিতরে ঢুকতেই দরজা বন্ধ হয়ে গেল। 

ঘরের ভিতরের অনুজ্জ্বল আলোর মধ্যে ঘরটিকে দেখল মৃদুভাষ। এখানে এলেই মৃদুভাষ যেন হাজার বছর পিছিয়ে যায় বারবার। দিনুবাবু প্রাচীন জিনিস সংগ্রহ করেন। প্রাচীন মূর্তি সংগ্রহ করাটা মৃদুভাষের একটা নেশা। আর, দিনুবাবুর কাজই হল প্রাচীন মূর্তি সংগ্রকারীদের সাহায্য করা। 

“আজ একটা আশ্চর্য কিছু দেখাবেন বলেছিলেন ! কী সেই আশ্চর্য ?” মৃদুভাষ ঘরের চারদিকে চোখ ঘুরোয়, “কী এসেছে আজ ?” বলে একটু থেমে মৃদুভাষ প্রশ্নটা করেই ফেলল, “একটা বড় পাখি দেখলুম যেন। উড়ে গেল বাড়ির দোতলার বারান্দা দিয়ে। কোনদিকে গেল বুঝতে পারলুম না।”

দিনুবাবু চমকে গেলেন। পরক্ষণেই হেসে বললেন, “দেখলেন নাকি ? গরুড় পাখির মূর্তি এসেছে। হারিয়ে গেছে ভেবে কাতর হয়েছি, অমনি দেখতে পেলুম সে উড়ে বেড়াচ্ছে বাড়িময়। কল্পনা নয় মৃদুবাবু। সব কল্পনা দিয়ে তৈরি হয় না। কিছু আছে ছায়া হয়ে, কিছু রয় মায়াতে।”

আশ্চর্য হয়ে কথা হারিয়ে গেল মৃদুভাষের। এই কি তাহলে দিনুবাবুর আশ্চর্য ? 

“আজ শেষ রাতে এক আশ্চর্য এসেছে। অন্ধকারের জীব সে। অন্ধকার কেটে যাওয়ার আগেই এসেছে। আলোর স্পর্শ সে সহ্য করতে পারে না মৃদু। দেখাবো তাঁকে। চোখ ধুয়ে ফেল দেখার পরে। স্ফটিকের জলে চোখ ধুয়ে ফেল। নইলে, ওই চোখ দুটোতে অন্ধকার ছাড়া আর কিছু আসবে না! মনে রেখ।” 

দিনুবাবু একখানি পেতলের বাক্স থেকে ছোট ছোট কিছু মূর্তি বের করে সাজিয়ে রাখছেন। মৃদুভাষের চেনা ভাস্কর্যের মিনি রূপ এসব। এসবই গ্রীক ভাস্কর্যের ছোট রূপ। ঘর সাজাতে রসিকেরা এসব কিনতে আসেন। এখানে ডেলোসের প্রাচীন অ্যাপোলো, ফিডিয়াসের সোনা ও হাতির দাঁতের আথেনা পার্থেনসের মূর্তি আছে। আরেকটা কী বের হচ্ছে পেতলের বাক্স থেকে ? মৃদুভাষ গলা বাড়াল। আচ্ছা! এই মূর্তির রূপও ওর চেনা। ফরাসি ভাস্কর ফ্রেডেরিক অগাস্ট বার্থোল্ডির তৈরি স্ট্যাচু অফ লিবার্টি। 

এই সময় দিনুবাবু মুচকি হেসে একটা রূপোলি কাগজে মোড়া মূর্তি বের করা রাখলেন উঁচু জায়গায়। মূর্তিটি কীসের, মৃদুভাষ দেখতে না পেরে কৌতূহলে ফেটে পড়ছিল। দিনুবাবু সেটা অনুভব করে হাসিটা ঠোঁটের মধ্যেই আটকে রাখলেন।

মৃদুভাষ টেবিলের ওপরে একটা মাঝারি সাইজের তেপায়া কাঠের কৌটোর ওপরে রূপোলি কাপড়ে মোড়ানো মূর্তির দিকে দেখছিল। নির্নিমেষে দেখছিল। দিনুবাবু ওর দৃষ্টি অনুসরণ করে ফিচেল হাসি হাসলেন, “দেখতে চাও ? দেখবে ? দাঁড়াও।” বলে একখানি পাথরের গেলাসে রাখা জল দেখালেন, “এই যে স্ফটিকের জল। এই জল দিয়ে চোখ ধুয়ে নাও আগে। দেখার পরে ফের চোখ ধুতে হবে।”

মৃদুভাষ দিনুবাবুর কথা মেনে নেয়। উনি বরাবর নানারকম কাণ্ড করেন। মুডি লোক। মৃদুভাষ কথার অমান্য করে না বলেই হয়তো মৃদুভাষকে পছন্দ করেন দিনুবাবু। 

ঘরের কোনের বেসিনের দিকে গেল মৃদুভাষ। পাথরের গেলাস থেকে জল নিয়ে মৃদুর চোখে ছিটিয়ে দিলেন উনি। চোখ বন্ধ রাখা চলবে না এ সময়। জল চোখে যেতেই একটু জ্বালা করে উঠল। অবশ্য, খানিক পরেই জ্বালাটা কমে গেল। মৃদুভাষ নিজের জায়গায় গিয়ে বসতে যাচ্ছে, দিনুবাবু বললেন, “ঘরের আলো কমিয়ে দিচ্ছি ভাই। আর, মূর্তির মোড়ক খোলা হলে টাচ করতে যেও না। আমি তাহলে এবারে মূর্তির আবরণ উন্মোচন করছি।”

মৃদুভাষ চরম কৌতূহল নিয়ে তাকিয়ে আছে। দিনুবাবু তেপায়া টেবিলের ওপরের রূপোলি কাপড়ে মুড়িয়ে রাখা মূর্তি হাতে নিলেন। পাকে পাকে কাপড় জড়িয়ে রাখা আছে। কয়েক পাক খাওয়ার পরে আস্তে আস্তে মূর্তি উন্মোচিত হল। মৃদুভাষ প্রথমে বিশ্বাস করতে পারেনি। সম্পূর্ণ মূর্তিটি দেখার পরে ও আনন্দে এবং বিষাদে একই সঙ্গে দ্রবীভূত হয়ে গেল যেন। এই মূর্তির জন্য অনেকদিন অপেক্ষা করে আছে মৃদুভাষ। গ্রীক মিথলজির এই মূর্তি নিয়ে ওর আগ্রহ সীমাহীন বললে কমই বলা হয়। 

“এই হল মেডুসা! চোখ অসাড়। তাই চোখের মণি দেখা যায় না। এর দেখার মধ্যে আছে মাথা থেকে ঘাড়ে লুটিয়ে পড়া সাপগুলো। দেখেছ ?”

“মেডুসার নয়, মনে হচ্ছে আমার জিভ অসার হয়ে গেছে এই মূর্তি দেখে। অনেকদিনের ইচ্ছে পূরণ হল। আপনাকে ধন্যবাদ!”

“ধন্যবাদ! তুমি চেয়েছিলে। আমি এনে দিয়েছি। বিনিময় প্রথা আছে এর মধ্যে। সুতরাং ধন্যবাদের প্রয়োজন নেই। এই সাপগুলো দেখ। মাথার ডানদিকে সাপ দেখ। দুটো সাপ হল মৈথুনরত ভাইপার। সহবাসের সময় পুরুষ ভাইপারটি নারী ভাইপারের মুখের ভিতরে নিজের মাথাটি ঢুকিয়ে দেবে। গর্ভধারণ হলেই নারীটি পুরুষ ভাইপারকে কামড়ে দেবে। মরণ কামড় !”

“আর মাথার ওপরের সাপগুলো ?”

“মাথার ওপরে ১৩টি সাপ আছে। ১৩ হল ভয়ের সংখ্যা পাশ্চাত্যে। মেডুসার চুলের মধ্যে রয়েছে দুটো ডানা। এর অর্থ আছে অবশ্য। এথেনার শাপে সে পাথর হয়। বলা হয়, এথেনা অভিশাপ দিয়ে মেডুসাকে বাঁচাতেই চেয়েছিল। ... আচ্ছা, পরে হবে এসব কথা। এখন আপনি কি মেডুসাকে নিতে চাইছেন ?” দিনুবাবু নির্লিপ্তভাবে জানতে চান। 

“চাই। এই বক্স পাব তো ? নইলে কেমন করে নিয়ে যাব এই মূর্তি ?” 

“ব্যবস্থা করে দিচ্ছি। তাহলে কি আমাকে অনলাইনে পেমেন্ট করছেন ? নাকি ক্যাসে ?”

“অনলাইনে। এত ক্যাস সঙ্গে নিয়ে আসিনি। আমি তো জানতুম না মালটা এসে গেছে।”

“মৃদুবাবু, একে মাল বলবে না। অনেক দূর থেকে তোমার কাছে আসবে বলে রওনা হয়েছে, এটা মনে রাখবে। আর হ্যাঁ, মেডুসাকে এই রূপোলি কাপড়েই প্যাক করে দিচ্ছি। বক্স পাবে।”

বলতে বলতে মূর্তিটি গুছিয়ে ফেললেন উনি। তারপর বক্সের ভিতরের নরম এয়ার বাবল শীটের ভিতরে আস্তে শুইয়ে দিলেন। বক্স লক করে চাবি দিলেন মৃদুভাষের হাতে। মৃদুভাষ টোটাল ব্যাপার সামলে নিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার সময় অভ্যেস বশত বলে, 

-“সী ইউ টুমরো।” দিনুবাবু মাথা নাড়েন, “কাল কেন, নেক্সট মান্থ পর্যন্ত কমপ্লিটলি চেঞ্জ হবে তোমার পথ। এট এভরি স্টেপ তুমি আমার কথা বুঝতে পারবে। আই হোপ। গুড নাইট মৃদুবাবু। একটা কথা। তুমি স্ফটিকের জল দিয়ে চোখ ধুলে না ? স্ফটিক আর গেলাসটা নিয়ে যাও সঙ্গে। আর যাওয়ার আগে চোখ ধুয়ে যাও।” বলতে বলতে ভিতরের ঘরের দিকে চলে গেলেন দিনুবাবু। মৃদুভাষ দিনুবাবুর নির্দেশমতো কাজ সেরে স্ফটিকের গেলাস আর মেডুসার বাক্স নিয়ে বেরিয়ে গেল। কলকাতায় তখন সন্ধে পেরিয়ে যুবতী রাত নামছে। 

( ২ )

অনিন্দিতা লিফট থেকে বেরিয়ে ক্যাবে উঠবে বলে দ্রুত বেরিয়ে আসছিল, মৃদুভাষ পথ আটকাল, “কী হল ? এভাবে বেরিয়ে যাচ্ছ ? কোথায় যাবে ?”

“মৃদু, সায়না ফোন করেছে আমাকে। কিছু কথা আছে বলছে। আমার মনে হয় এবারে ওর সঙ্গে মুখোমুখি কথা বলতে হবে। আমাদের রিলেশনের ভিতরে আরেকজন আছে। তাঁকে না জানিয়ে আমাদের সম্পর্ক পূর্ণতা পাবে না। সুতরাং ইমিডিয়েট সায়নার সঙ্গে কথা বলে পুরো ব্যাপারটা খোলসা করে নেব। আমাকে বাধা দিও না।” অনিন্দিতা পা বাড়ায়। 

মৃদু ফের আটকে দিল, “আমিও সঙ্গে যাব। কিন্তু আজ নয়। একটু সময় চাইছি অনি। প্লিজ। দেখ, সায়না আমার ওয়াইফ ঠিকই, কিন্তু দেড় বছর ধরে তোমার সঙ্গে লিভ ইন করছি, সেটা সায়না সদ্য জেনেছে। ওকে সময় দিতে হবে। ওর বিজনেস আছে। এসবের ফলে ওর বিজনেসে চাপ পড়ছে। আমি চাই না এভাবে একটা চালু বিজনেস নষ্ট হোক। মনে রেখ অনি, সায়নার বিজনেসটা আমিই দেখা শোনা করে থাকি। বেশ ভাল বিজনেস করছে সায়না। এখনই আমি কোনভাবে সায়নাকে দূরে সরাতে চাই না। আগে সবটা হাতে নিই !”

“সবটা ?”

“ইয়েস! সবটা। ইয়ারলি সিক্সটি ফাইভ লাখস আমার হাতে আসে এই বিজনেসের হাত ধরে। সবটা ইয়ার্কি নয়।” রেগে যাচ্ছিল মৃদু। অনেকদিনের ইচ্ছেটা নষ্ট করতে চাইছে অনিন্দিতা। বিয়ে ! হাঃ ! বিয়েটাই কি সব নাকি ? 

অনিন্দিতা একটু অন্যমনস্ক, “তুমি আমাকে ভোলাচ্ছ না তো মৃদু ?”

“না। সময় চাইছি। আশা করছি, খুব দ্রুত সমস্যাটা মিটে যাবে।”

অনিন্দিতা ফের ফ্ল্যাটে ফিরে গেল। মৃদুও সঙ্গী হল। লাজরুণ ফোন করেছে আজ দুপুরে। ওর বাবা লাস্ট উইকে মারা গিয়েছেন। লাজরুণ বেশ ভেঙে পড়েছিল। এখন একটু সামলেছে বলে মনে হয়েছে মৃদুর। কিন্তু একটা আশ্চর্য কথা বলছে লাজরুণ। ও নাকি প্ল্যানচেট করে বাবাকে আনবে। বাবার সঙ্গে কথা বলবে। প্ল্যানচেট সম্পর্কে কমনরুমে মৃদুর অভিজ্ঞতা শুনেছিল একদিন। সেই জন্য মৃদুর পরামর্শ চাইছে। কীভাবে কী করতে হবে ? মৃদু বলেছে যা জানে। লাজরুণের কাজিন এসেছে। সেও উৎসাহী এই বিষয়ে। 

আজ সারাক্ষণ প্ল্যানচেট নিয়ে ভেবে চলেছে মৃদুভাষ। দুই বছর আগে একবার প্ল্যানচেট করেছে ও। সেও বাঁকুড়ায়। মামার বাড়িতে গিয়ে কাজিনদের সঙ্গে মিলে প্ল্যানচেট করেছিল। সুভাষমামা সদ্য মারা গিয়েছেন। প্ল্যানচেট করে মামাকে ডাকা হয়েছিল। মামা এসেছিলেন। সেই অনুভূতি বা অভিজ্ঞতাকে আজও ভুলতে পারেনি মৃদুভাষ। মামার স্ট্রোক হয়েছিল। কিন্তু প্ল্যানচেটে এসে মামা বলেছে, স্ট্রোক নয়। কেউ মামাকে ধাক্কা দিয়েছিল আচমকা। মামা সিঁড়ি দিয়ে পড়ে যান। নীচে পড়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। তখন কেউ এসে তাঁর মাথায় ভারি কিছু দিয়ে জোরে আঘাত করে। তৎক্ষণাৎ মৃত্যু হয় মামার। 

সেদিন যারা সঙ্গী ছিল, তিনজনের একজনও ভয়ে মুখ খোলেনি। আজ পর্যন্ত কেউ জানে না সেদিনের প্ল্যানচেটের অভিজ্ঞতার কথা। কিন্তু মৃদুভাষের মন খুঁজে ফেরে আজও মামার হত্যাকারীকে। কোনভাবেই পাওয়া যায়নি কোনরকম ক্লু, যা থেকে খুনিকে ধরে ফেলা যায় ! নেশাটা নিভে গেছিল। 

লাজরুণ ফের সেই নেশায় আগুন দিয়ে গেল আজ। মন আকর্ষিত হচ্ছে প্রেতচক্রের দিকে। মৃদুভাষ অনিন্দিতার ফ্ল্যাটে বেশি সময় থাকতে পারল না। অনেক কাজ পড়ে আছে। সেসব মিটিয়ে ফেলতে হবে। দেরি নয়। আগুনের ধোঁয়া দেখা যাচ্ছে। আগুন জ্বলছে ভিতরে। বিস্ফোরণ ঘটতে যাচ্ছে। 

রাতের অন্ধকারে ঘর সাজাতে বসে মৃদুভাষ। অনিন্দিতা এসেছে। আর আছেন দিনুবাবু। আজ মৃদুভাষ প্রেতচক্র সাজিয়ে বসবে। সায়নার থেকে মুক্তির পথ খুঁজতে ডাকবে সুভাষমামাকে। বোস্টন পদ্ধতিতে বিজোড় সংখ্যা নিয়ে প্রেতচক্রে বসবে মৃদু। 

“এমন কাউকে ডাকো যাকে আমরা তিনজনেই দেখেছি।” দিনুবাবু চোখ বুজে দুলছেন চেয়ারে, “তাড়াতাড়ি করো। আমার ফিরতে হবে !”

কাকে দেখেছে তিনজনই ? এমন কাউকে, যাকে দিনুবাবু, অনিন্দিতা, মৃদু দেখেছে! এমন একজন আছে! সায়না! কিন্তু সায়নাকে দিনুবাবু দেখেননি! তা হোক, উনি ছবিতে দেখবেন নাহয়! অসুবিধে কী? আজ সায়নার আত্মাকে চক্রে ডাকার উদ্দেশ্য নিয়েই প্রেতচক্র সাজিয়েছে মৃদুভাষ। জীবিত সায়নার আত্মা এই আহ্বানের কাছে সাড়া না দিয়ে পারবে না ! এভাবেই সায়নার হাত থেকে মুক্তি পাবে মৃদুভাষ।

“এই ছবিটা দেখুন। আমার রিলেটিভ। মাত্র দু’মাস আগে মারা গিয়েছে। এঁকেই ডাকব। অনিন্দিতা, তুমিও এঁকে দেখেছ। দেখ।” ছবিটা অনিন্দিতার হাতে দিতেই চমকে উঠে দাঁড়ায় অনিন্দিতা, “সে কী ? এ তো...!”

থামিয়ে দেয় মৃদু, “হ্যাঁ। ঠিক ধরেছ। তোমাকে বলা হয়নি দুঃখ পাবে বলে। তুমি ওঁকে চিনতে। তোমার ভারি মন খারাপ হবে ওঁর মৃত্যুর খবরে। আমি জানি। তবু, এঁকেই ডাকব আজ।” 

জীবিতকে ডেকে প্রেতের আসরে ঢুকিয়ে দেবে মৃদু আজ। অন্য ভুবনের ছায়াময় জগতে ঢুকে যাক সায়নার আত্মা। একবার ঢুকে গেলে আর ফিরে আসবে না। সে উপায় নেই। অনিন্দিতা আসুক মৃদুর জীবনে। লিভ ইন করে লুকিয়ে থাকার জীবন চায় না মৃদু। জটিল পথের শেষে হয়ে যাক আজই। 

একমনে সায়নার কথা ভেবে যাচ্ছে তিনজনে। মৃদুভাষ সায়নার কথা ভাবতে ভাবতে সোজা তাকিয়ে আছে। ঘরে মোমবাতির শিখা স্থির। বাতাস নেই চার দেওয়ালের মধ্যে। অনেকদূরে কোথায় গান বেজে উঠল। একটা গাড়ি শব্দ করে চলে গেল। 

শব্দের আলোড়নের মধ্য দিয়ে কখন ধীরে ধীরে জাগতিক শব্দ উধাও হয়ে যাচ্ছে, কেউ টের পায়নি। নিঃসীম অন্ধকারের মধ্যে মোমের সামান্য হলদে আলো ক্রমে ক্রমে নিভু নিভু হয়ে যাচ্ছে, মাথায় আসেনি। মৃদু একদৃষ্টে সামনের দিকে তাকিয়ে আছে। ওই যে, এসেছে সে ! উঁচু তেপায়ার ওপরে কেউ একজন বসে আছে। বসে আছে কি ? না, শুধু একজনের মাথা দেখতে পাচ্ছে মৃদু। সায়নার একরাশ চুল নেমে এসেছে কাঁধ ছাপিয়ে। চুল ওভাবে বেঁকে তেড়ে উঠছে কেন ! সাপের ফনার মতো মাথা উঁচু করছে ! মোমের আলোয় দিনের আলোর মতো পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে সবুজাভ বর্ণের গাত্রবর্ণ, মুখময় মাছের মতো আঁশ। শীতল চোখের দৃষ্টি ! দৃষ্টিতে আলো নেই ! চোখে মণি নেই! প্রাণহীন যেন! কেবল প্রাণ আছে মাথার ওপরের তেরোটি সাপের মতো চুলের। কী যে দেখছে, কেন যে দেখছে, মাথাতেই নেই মৃদুর। এক ধোঁয়াটে ঘূর্ণির মধ্যে স্থির হয়ে আছে কার অটল আদেশে। সায়নাকে এরকম কেন দেখাচ্ছে ! 

চমকে উঠেছে মৃদুভাষ। কে এসেছে ! ঘরে কে এসেছে ! পাকা শসার গন্ধে ভরে যাচ্ছে ঘর ! কে এসেছে ! সাপ !

দিনুবাবুর মুখ দিয়ে কেমন একরকম শব্দ হচ্ছে। দিনুবাবুর মাধ্যমেই কি সায়নার আত্মা প্রবেশ করেছে এই প্রেতচক্রের আসরে ? দিনুবাবু শব্দ করছেন ? নাকি অনিন্দিতা ? এমন অদ্ভুত ফিসফিসে স্বর কার ? এভাবে কে যেন কথা বলে ? মনে পড়ে না কেন ! 

পা জড়িয়ে কিছু একটা উঠছে। মৃদুর মনে হচ্ছে লাউডগা সবুজ পাতা ডাঁটা নিয়ে ওর শরীরকে আশ্রয় করে উঠছে যেন। ক্রমেই ওপরের দিকে উঠছে। সেই সঙ্গে ফিসফিস শব্দটা বেড়ে চলেছে। কানের কাছে এসে থেমেছে লাউয়ের ডগা। সেই শাকের ডাঁটার একেবারে সম্মুখ ভাগ থেকে শব্দটা উঠছে, ফিস শ... শ... শশশশ !

চমকে ঘাড় ঘোরাতে গিয়ে মৃদু অনুভব করল ও ঘাড় ঘোরাতে পারছে না ! কানের পাশ দিয়ে গলা পেঁচিয়ে ধরেছে যে, তার শরীর থেকে শসার গন্ধ আসছে। তাজা শসার গন্ধ। যেন এইমাত্র গাছ থেকে তুলে আনা শসা। সাপের গা থেকে এই গন্ধ বের হয়! ঘরে সাপ ঢুকেছে ? 

মৃদু অনুভব করছে আরও একটা লাউএর ডগা ওকে আশ্রয় করে ওপরের দিকে উঠে আসছে। আরও একটা ! আরও..., আরও...!

 দিনুবাবু কিছু বলছেন কি! উনি কি উঠে গেলেন নাকি? ঘরে কেউ নেই? চেয়ার সরানোর মতো শব্দ হল না ? অনিন্দিতা কোথায় গেল ? 

মাথা ঘুরিয়ে দেখার সুবিধে পাচ্ছে না মৃদু। সাপ মাথা পেঁচিয়ে রেখেছে। মাথা জুড়ে সাপের ফোঁস ফোঁস শুনতে শুনতে মৃদু নিস্তেজ হয়ে পড়ছে। অনিন্দিতার সাড়া নেই ! ও কি চলে গেল দিনুবাবুর মতো ? মৃদুকে ফেলে ? সায়না নেই ? সায়না কি আজকের আসরে ঢোকেনি ? কী আশ্চর্য ! এসব কী হচ্ছে সায়না? 

বাইরে বুঝি বৃষ্টি নেমেছে ? সরু সরু সুতোর ধারায় বৃষ্টি নেমেছে ? বৃষ্টির ধারার ফনা আছে। মাটিতে পড়ার পরেই ফনা তুলে মৃদুর ফ্ল্যাটে ঢুকে পড়ছে তারা। 

গভীর ঘুমের মধ্যে ঢুকে পড়ছে মৃদু। আলোহীন এক অধ্যায়ের অংশ হয়ে যাচ্ছে ও। 

(৩)

বৃষ্টিটা জোরেই নেমেছে। সায়না মৃদুকে ফোন করেও পাচ্ছে না। ওর কলেজ-কলিগদের সঙ্গে যোগাযোগ করেও কোনও হেল্প পেল না। কাউকে কিছু না বলেই অনিন্দিতার ফ্ল্যাটে এসেছে সায়না। লজ্জা, অপমাণ ভুলেই আসতে হয়েছে। কাল রাতে ভীষণ খারাপ অবস্থার মধ্য দিয়ে গেছে ও। কেউ এসেছিল ওর ফ্ল্যাটে। বাইরে থেকে বারবার নক করেছে। বারবার। সায়না আইহোল দিয়ে কাউকে, কিছুকে দেখতে পায়নি। সিকিউরিটিকে ফোন করে জানালে সিকিউরিটি এসে দেখেছে। কাউকে দেখতে পায়নি। আজ সকালে সিসিক্যামেরার ফুটেজে কিচ্ছু আসেনি ! 

এসব দেখে ভয় পেয়েছে সায়না। কী হল ব্যাপারটা ? মৃদু কি কাউকে পাঠিয়েছিল ? সায়নার জন্য সুপারি কিলার পাঠিয়েছে মৃদু ? সবই বিশ্বাস হয়। মৃদু সায়নার হাত থেকে নিষ্কৃতি পেতে চায়, এ তো সহজ কথা ! ওকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দিতে চেয়ে কাকে পাঠিয়েছে মৃদু ? এমন কে, যাকে সিসিক্যামেরা ধরতে পারেনি ? 

মৃদুর সঙ্গে দেখা করে একটা হেস্তনেস্ত করতে চায় সায়না। এভাবে দরকার নেই কাউকে আগলে রাখার। মন উঠে গেলে শুধু দেহ দিয়ে কী হবে ? শূন্য খাঁচা ঘরে ঝুলিয়ে রেখে কি পাখির সঙ্গ মেলে কারও ? 

অনিন্দিতাকে ফোন করেছে। ফোন বেজে গেছে। কেউ ফোন তোলেনি। সায়না মৃদুকেও ফোনে পায়নি। অনিন্দিতার ফ্ল্যাটে গিয়ে সিকিউরিটিকে জিজ্ঞাসা করে জেনেছে অনিন্দিতা ফ্ল্যাটে আছে। মৃদুবাবুও ছিলেন। এখন আছেন কিনা সে জানে না। 

সায়না অনিন্দিতার ফ্ল্যাটের সামনে গিয়ে ডোরবেল বাজিয়েছে পরপর। সাড়া না পেয়ে দরজায় নক করে দেখেছে দরজা ভিতর থেকে ভেজিয়ে রাখা। 

দরজা খুলে ভিতরে যাওয়ার আগে সতর্কতা অবলম্বন করতে পাশের ফ্ল্যাটের দুজনকে সঙ্গে নিয়েছে ও। আজকাল যা সব হচ্ছে, কিচ্ছু বিশ্বাস নেই, জানে সায়না। কে কোথা থেকে ফাঁসিয়ে দেবে তার ঠিক নেই। 

ফ্ল্যাটের ভিতরটা চমৎকার করে সাজানো। কেউ নেই ফ্ল্যাটে। বেডরুমে ঢুকে অবাক হল সায়না। নিপাট শয্যা। কেউ ঘুমোয়নি রাতে ? পাশের রুমে একটা মোমপোড়া গন্ধ আটকে আছে। টেবিলের ওপরের মোমদানির ওপর থেকে গলে পড়া মোম শক্ত হয়ে সময়কে টেনে রেখেছে। একটা তেপায়া টেবিল ঘিরে তিনটে চেয়ার আছে। ঘরে কেউ নেই, অথচ ছিল, বোঝা যায়। প্রশ্ন হল, তারা সব গেল কোথায় ?

সায়না ঘরের মধ্যেকার জিনিসপত্র দেখছিল। মৃদুর ফেভারিট ব্রান্ডের সিগারেট, পোশাক, জুতো… সবই রয়েছে। মেয়েলি অন্তর্বাস, জিনস, ক্লাচ! মৃদু বাইরে যায়নি, অথচ ঘরেও নেই ! আর অনিন্দিতা ? সে কোথায় পালাল ?

 ক্যাবিনেটের ওপরের ছোট তেপায়া টেবিলের ওপরটা ফাঁকা পড়ে আছে। এখানে কিছু ছিল কি ? কে জানে ! সায়না মৃদুর কতটুকুই বা জানে ! এই যে, ঘর জুড়ে মোমপোড়া গন্ধ ছাপিয়ে শসার গন্ধের কারণও কি জানে !

রহস্যময় নিখোঁজ দুজন মানুষ! থানাপুলিশ হলেও কোনও ট্রেস নেই দুজনের একজনেরও। কেউ ওঁদের বাইরে বেরিয়ে যেতে দেখেনি। অথচ এটাও তো ঠিক যে, বাইরে বেরিয়েছে নিশ্চয়। নইলে গেল কোথায় ?

সময় পেরিয়ে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। বিমর্ষ সায়না নিজের বিজনেসের দিকে মন দেয়। মৃদু কখনও ওঁকে ভালবাসেনি। কখনও চায়নি ওঁকে। সায়না আগেই সসম্মানে মুক্তি দিলেই ভাল করতো। তাহলে হয়তো মৃদু অনিন্দিতাকে নিয়ে ঘরছাড়া হত না। দেশান্তরী হত না। মৃদুর ক্ষতি চায়নি সায়না। কখনও। 

এক প্রাচীন বাড়ির একটি ঘরের দরজা খুলে দাঁড়াল এক প্রৌঢ়। কাস্টমার এসেছে। মেডুসার মূর্তি চায় সে। মেডুসার মূর্তি আছে। সঙ্গে আছে এক কাপলের মূর্তি। গ্রীক মিথলজিতে এর নাম নেই। কিন্তু মেডুসার শাপে তাঁরা দুজনেই পাথর হয়ে গিয়েছিল। সেই মূর্তি সদ্যই হাতে এসেছে। দাম একটু চড়ার দিকে। রূপোলি কাপড়ে মুড়িয়ে রাখা মেডুসার মূর্তি দেখার আগে কাস্টমারকে স্ফটিকের জলে চোখ ধুতে হল প্রৌঢ়ের নির্দেশে। তারপরেই পুরোনো পেতলের বাক্স থেকে মাছের আঁশের প্রিন্ট করা ছাই রঙ্গা কাপড়ের ভিতর থেকে একটি নারীপুরুষের ছয় ইঞ্চি লম্বা পাথরের মূর্তি বেরিয়ে এল। অসাড় চোখে সামনের দিকে তাকিয়ে আছে পুরুষটি। নারীর চোখে মণি নেই। পুরুষের চোখেও। দুজনেই পাশাপাশি বসে আছে। সামনের দিকে মুখ। হয়তো দুজনের দৃষ্টি একই দিকে নিবদ্ধ ছিল পাথর হওয়ার আগে। 

যে কথা কেউ জানে না। সে কথা একমাত্র এই প্রৌঢ় জানেন। তিনি জানেন, মেডুসার মাথা হল মৃতদের রক্ষক, সমাধির রক্ষক, অশুভ, খারাপ আত্মাদের রক্ষক। তিনি আরও জানেন, প্রেতচক্রে বসে ছবির মহিলার কথাটা মাথাতেই আসেনি তাঁর। মেডুসার মূর্তিটা এমন জায়গায় রেখেছে মৃদুবাবু, সেদিকেই দৃষ্টি গেছে আর মেডুসাকেই ভেবে গেছেন চক্রে বসে। কিন্তু বিজোড় সংখ্যায় দুজনকে অন্তত একই আত্মাকে ভাবতে হয়। তিনজন ডাকাই উচিত। কমপক্ষে দুজন। তাহলে প্রৌঢ়ভদ্রলোক ছাড়া আর কে মেডুসাকে ভেবেছিল ? মৃদুবাবু ! তাই কি মেডুসা প্রেতচক্র থেকে ডাক পেয়ে নরক থেকে, প্রাচীন দুনিয়া থেকে বেরিয়ে এসেছিল প্রেতচক্রে! ডাক শুনতে পেয়েছে সে !

প্রেতচক্রে বসে প্রৌঢ় মৃদুবাবুকে সাবধান করেছেন। তাঁর বান্ধবীকেও সাবধান করেছেন। কিন্তু কেউ তাঁর কথা শুনতেই পেল না সেই মুহূর্তে! আশ্চর্য! লোকে জানবে তাঁরা দুজনে নিরুদ্দেশ! এরকমটা হতে পারে, প্রৌঢ় কি ভেবেছিলেন? জানতেন? 

প্রৌঢ় পাথরের নারীপুরুষের মূর্তিটা হাতে নিয়ে দেখেন। মেডুসা আজও সত্যি। তার চোখের দৃষ্টি আজও খারাপ আত্মাকে পাথর করে দেয়। ওপর থেকে দেখে বোঝা যায়নি, মৃদুবাবুর শরীর একটি অশুভ আত্মাকে সঙ্গী করে চলেছে !

এবং বৃত্তের বাইরে, জানুয়ারি, ২০২৫

 

 


No comments:

Post a Comment