ঈশাহক মণ্ডলের গল্প — ভূতের গল্প — শঙ্খ চক্রবর্তী — এবং বৃত্তের বাইরে

Horror Story by Shankha Chakroborty

ঈশাহক মণ্ডলের গল্প

শঙ্খ  চক্রবর্তী

তোমরা আমাকে চেনো কিনা জানিনা। আমি হলাম ভূত বিলাসী মোহনদাস। আমার নাম হয়তো তোমরা শোনোনি। তবে এখন আমি যেটা তোমাদের বলতে চলেছি, সেটা না শোনার ভুল কিন্তু করোনা। এখন আমার জীবনের যে অভিজ্ঞতার কথা তোমাদের বলব, তাকে ভয়ঙ্কর বললেও কম বলা হয়।

এখনকার থেকে বেশ কয়েক বছর আগেকার কথা বলছি। তখন আমি ঈশাহক মণ্ডলের একমাত্র মেয়েকে অঙ্ক করাতাম। ঈশাহক মণ্ডলের বাড়ি ছিল গয়েশপুর গ্রামের ভেতর। আমাদের বাড়ির থেকে প্রায় সাত কিলোমিটার দূরে। এই পথটা সেই সময় আমি সাইকেল চালিয়ে যেতাম। বলা বাহুল্য সেই সময় মোটর চালিত দু চাকা আমার ছিল না। গ্রামের রাস্তা, তাই রাস্তার আলোর কোনো বালাই ছিল না। তবে পরিচিত পথ হওয়ায় অসুবিধা আমার কোনদিন হয়নি।

ঈশাহক মণ্ডল গয়েশপুর গ্রামের ভেতরেই হাতুড়ে ডাক্তারি করত। তার বাড়ির উঠোনের একধারে ছিল তার চেম্বার। ছাত্রী পড়ানোর ফাঁকে সময় পেলেই সেই চেম্বারে বসে আমি তার সাথে গল্প জুড়তাম। তার জীবনের অনেক বিচিত্র অভিজ্ঞতার গল্প সে আমাকে শুনিয়ে ছিল।

গয়েশপুর গ্রামে থাকলেও, জঙ্গীপুর এবং সুন্দরবন অঞ্চলে তার বড় ব্যবসা ছিল। ব্যবসার কাজে মাসের মধ্যে অনেকটা সময় সে ওইসব অঞ্চলে কাটাতো। অভিজ্ঞতা আর অর্থ কোনোটাই তার খুব কম ছিল না। এবং তার ঝুলিতে বিচিত্র গল্পের সংখ্যাও ছিল অনেক।

সেদিনও আমি ওর মেয়েকে পড়াতে গিয়েছিলাম। তখন সন্ধ্যা গড়িয়ে গিয়েছে। চারপাশে অন্ধকার। ঝিঁঝিঁ ডাকতে শুরু করেছে। মন দিয়ে ছাত্রীকে চক্র বৃদ্ধি সুদ বোঝাচ্ছি, হঠাৎ মণ্ডল ঘরে ঢুকে খাটের ওপর বসে পড়ল। মুখখানা তার ভাবলেশহীন। সে একদৃষ্টে আমার দিকে তাকিয়ে ছিল। সে সচরাচর পড়ানোর সময় ঘরে ঢোকেনা। তাই তার এহেন আচরণে আমি আশ্চর্য হলাম। তাকে দেখে আমার মনে হয়েছিল সে আমাকে কিছু বলতে চায়। তাই জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে আমি তার দিকে তাকিয়ে ছিলাম। তার চোখ মুখের এইরকম ভাবও আমি কোনদিন দেখিনি। 

মণ্ডল বোধহয় বুঝতে পেরেছিল যে আমি একটু অবাক হয়েছি। তাই সে এবার কথা বলল। 

“আজকে ছাত্রীকে ছেড়ে দিন। চলুন একটু চেম্বারে গিয়ে বসি।”

মণ্ডলের প্রস্তাবে রাজি না হওয়ার কিছু ছিল না। কারণ সারাদিন পড়িয়ে, দিনের এই সময়টায় আমি ক্লান্ত বোধ করতাম। মেয়েটাকে ছুটির কথা বলতেই সে একলাফে উঠে চলে গেল। আমিও মণ্ডলের সঙ্গে তার চেম্বারে গিয়ে বসলাম। 

চেম্বারে নিজের চেয়ারে বসে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে, মণ্ডল কিছুক্ষণ বাইরের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে রইল। আমার আর ধৈর্য থাকছিল না। কারণ বাইরে ব্যাঙ ডাকতে শুরু করেছে। চারপাশে ঘুটঘুটে অন্ধকার। আকাশ মেঘে ভর্তি। যখন তখন প্রবল বৃষ্টি নামবে। এদিকে আমি সঙ্গে ছাতা নিয়ে আসিনি। তাই তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরতে পারলেই মঙ্গল। গোদের ওপর বিষ ফোঁড়ার মতো লোডশেডিং হয়ে গিয়েছে। মণ্ডল একটা মোমবাতি জ্বেলে ছিল। কিন্তু তাতেও পুরো ঘরটা আলো হয়নি। এদিকে মণ্ডল কথা আর বলেনা। বাধ্য হয়ে আমাকেই মুখ খুলতে হলো। 

“বলুন কি বলছিলেন।”

এবার অবশ্য মণ্ডল মুখ খুলল। 

“ধনেখালির মাছের ভেড়ীটা এবার বন্ধ করে দেব বুঝলেন।”

মণ্ডলের যে ধনেখালিতে একটা মাছের ভেড়ী আছে এটা আমার জানা ছিল। ভেড়ীটা সে কিনেছিল এক বন্ধুর পরামর্শে। এবং সেখানে যে লাভ হচ্ছিল না সেটাও আমি জানতাম। তাই আমি খুব একটা অবাক হলাম না। তবে সম্পত্তি হারানোর বেদনা বড় কষ্টকর। মণ্ডলের আজকের হতাশা বুঝতে আমার অসুবিধা হলোনা। তাই মনের ভাব মনে রেখে জিজ্ঞাসা করলাম, 

“কেন?”

মণ্ডল আমার কথার সরাসরি জবাব দিল না। 

“আপনাকে আমার বন্ধু সফিকুলের কথা কখনও বলেছি?”

“না।”

“আমি যখন অল্টারনেটিভ মেডিসিন নিয়ে পড়াশোনা করতাম, তখন সফিকুল আমার সঙ্গে পড়ত। তার বাড়ি ছিল সুন্দরবন। টিটাগড় অল্টারনেটিভ মেডিসিন কলেজে তার সঙ্গে আমার পরিচয়। পড়াশোনা শেষ করে সুন্দরবনে নিজেদের দ্বীপে ফিরে গিয়ে সে ওখানে হাতুড়ে ডাক্তার হয়। আপনার জানা আছে কিনা জানিনা, সুন্দরবনের ওইসব এলাকায় হাতুড়ে ডাক্তাররাই ভরসা। সেই কারণে সফিকুল ওখানে ভাল পসার জমিয়ে ফেলে। এছাড়াও মাঝেমাঝে গ্রামের অন্য ছেলেদের সঙ্গে সে জঙ্গলে মধু আনতে যেত। সেই মধু কলকাতায় এনে বিক্রি করত।”

আমি বুঝলাম মণ্ডলের পেটে আজ গল্প আছে। তাই গুছিয়ে বসলাম। বাইরে ঝড় বৃষ্টি শুরু হয়ে গিয়েছিল। ঘড়িতে বাজে মোটে সাতটা। আমার সেদিন আর পড়ানো ছিল না। তাই বাড়ি ফেরার তাড়া আমার ছিল না। ওদিকে মণ্ডল কিন্তু তার গল্প থামায়নি।

“নিজের ক্লিনিকের জন্য ওষুধ কিনতেও সফিকুল মাঝেমাঝে কলকাতায় আসত। সে চাঁদসী চিকিৎসাতেও হাত পাকিয়ে ছিল। তাই তার প্রচুর ওষুধের দরকার হত। মাসে অন্তত দুবার সে কলকাতায় আসত। ফলস্বরূপ তার সঙ্গে দেখা সাক্ষাৎ আমার বন্ধ হয়নি। মাস দুয়েক আগে সফিকুল আমাকে তাদের বাড়িতে যাওয়ার জন্য অনেক করে বলেছিল। এবং আমি তাকে কথা দিয়েছিলাম তার বাড়িতে যাব। এবার ধনেখালিতে গিয়ে কাজকর্ম তাড়াতাড়ি মিটে গেল। গত মাসে ব্যবসা ভাল হয়েছিল। প্রথমবার হাতে বেশ কিছু টাকা এল। তাই ভাবলাম সফিকুলের বাড়ি থেকে এবার ঘুরে যাই। কারণ সফি আমাকে লোভ দেখিয়েছিল, যে করেই হোক বাঘ দেখিয়ে আনবে। 

 সফিকুলের বাড়ি পাখিরালয় ছাড়িয়ে আরও বেশ কিছুদূর গিয়ে একটা দ্বীপের ভেতর। মোবাইল ফোনের টাওয়ার সেখানে পাওয়া যায়না। তাই যাওয়ার আগে তাকে খবর আমি দিতে পারলাম না। যেদিন ওর বাড়িতে গেলাম, সেদিন সকালে একটা কাজে আমাকে গদখালী আসতে হয়েছিল। তাই ওর বাড়িতে যাওয়ার জন্য লঞ্চ ধরেছিলাম গদখালী থেকে। যদিও সফির বাড়ি যেখানে লঞ্চ সেখানে একটানা যায়না। পথে পাখিরালয়তে লঞ্চ বদলাতে হলো। দু দফায় প্রায় তিন ঘণ্টা, শেষে ডিঙি নৌকো করে আরও আধঘণ্টা। কারণ সফি যে দ্বীপে থাকে সেখানে লঞ্চ দাঁড়ানোর মতো কোনো ঘাট নেই। অগত্যা স্থানীয় ডিঙি নৌকোই ভরসা। দীর্ঘ যাত্রাপথ। আমি বেরিয়ে ছিলাম বেলা করে। যে দ্বীপে আমার গন্তব্য, সেখানে যখন নামলাম তখন অন্ধকার নেমে আসছে। যে মাঝি ডিঙি চালাচ্ছিল, আমাকে একটা বাঁধের কাছে নামিয়ে দিয়ে সে তাড়াতাড়ি চলে গেল। তার বাড়ি আরও ভেতরের কোনো দ্বীপে। চলে যাওয়ার আগে সে বলে গেল, “যেখানে যাচ্ছেন তাড়াতাড়ি চলে যান। অন্ধকার হয়ে আসছে। পথঘাট ভাল নয়।”

দ্বীপে নেমে আমি বিপদে পড়ে গেলাম। বাঁধের পথ ধরে যতদূর দেখা যায় কোথাও কেউ নেই। এমন কাউকে পেলাম না যে সফির বাড়ির রাস্তা জিজ্ঞেস করব। সফিকুল আমাকে কাগজে লিখে তার বাড়ির ঠিকানা দিয়েছিল। কিন্তু এখানকার কিছুই চিনি না। তাই কাউকে জিজ্ঞেস না করলে সফির বাড়ি খুঁজে পাওয়া আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না। ওদিকে অন্ধকার নেমে আসছে। শুনেছিলাম অনেক সময় নদী পেরিয়ে বাঘ এইসব দ্বীপে চলে আসে। ভয়ে আমার হাত পা পেটের মধ্যে ঢুকে যেতে শুরু করল। ঠিক সেই সময় হঠাৎ দেখি, বাঁধের এক জায়গায় সফিকুল দাঁড়িয়ে। হাতে যেন চাঁদ পেলাম।

হাত দিয়ে আমাকে ইশারা করে সফিকুল তার পেছনে যেতে বলল। আমিও তার পেছনে চলতে শুরু করলাম। বাঁধ ধরে প্রায় মিনিট পাঁচেক হাঁটার পর আমরা একটা বাড়ির সামনে এসে দাঁড়ালাম। বাড়িটা এক মানুষ সমান নাইলনের জাল দিয়ে ঘেরা। শক্ত বাঁশের গেট। গেটের গায়েও নাইলনের জাল জড়ানো। সফিকুল গেট খুলে আমাকে ভেতরে ঢুকতে ইঙ্গিত করল। আমি ভেতরে ঢুকলেও সে কিন্তু ভেতরে ঢুকলো না। বাইরের থেকে গেট আটকে দিয়ে, বাঁধ ধরে অন্ধকারে কোথাও চলে গেল। গোটা রাস্তা সে কোনো কথা বলেনি। এবার সে যখন চলে যাচ্ছিল, আমি তার নাম ধরে অনেক ডাকলাম। কিন্তু সে আমার কথার কোনো উত্তর দিল না। 

আমার ডাকে বাড়ির ভেতর থেকে সফির ছোট ভাই রফিকুল বেরিয়ে এসেছিল। সফিকুলের সঙ্গে কলকাতায় তাকে আমি অনেকবার দেখেছি। আমাকে দেখে সে আশ্চর্য হয়েছিল।

‘‘আরে দাদা তুমি?”

তাকে বললাম যে হঠাৎ সুযোগ পেয়ে গিয়ে চলে এসেছি। কারণ সফি অনেকবার করে আমাকে আসতে বলেছিল। আমাকে দেখে রফিকুল যে খুশি হয়েছিল সেটা আমি বিলক্ষণ বুঝতে পেরেছিলাম। কিন্তু তার মুখে চিন্তার ভাব আমার চোখ এড়ালোনা। তাকে যেন বিমর্ষ দেখাচ্ছিল।

‘‘এভাবে একা এসে তুমি ঠিক করোনি দাদা। এখানে বাঘ বেরিয়েছে। গতকাল নদী পেরিয়ে আমাদের গ্রামে ঢুকেছিল। এই বাঘটা বাংলাদেশের। এদিকে চলে এসেছে। কাল অনেক রাতে পাশের দ্বীপে একজনকে মেরেছে। তবে তুমি যে নিরাপদে আমাদের বাড়ি খুঁজে পেয়েছো সেটাই ভাল।”

তাকে বললাম, সফিকুলকে না পেলে আমি সহজে বাড়ি খুঁজে পেতাম না। কিন্তু আমাকে বাড়িতে ঢুকিয়ে সফিকুল কোথায় যেন চলে গেছে। আমার কথা শুনে রফিকুল যেন আকাশ থেকে পড়ল। 

‘‘সেকি? দাদা তো এখানে নেই! ওরা কয়েকজন বন্ধু মিলে বনের গভীরে গেছে মধুর খোঁজে। এইজন্য বাড়িতে সবাই চিন্তিত। বাঘ বেরিয়েছে। অথচ দাদা গিয়েছে জঙ্গলে। ওদের ফেরার কথা আগামীকাল।”

সফি যে আমাকে পথ চিনিয়ে নিয়ে এসেছে এই কথা রফিকুল কিছুতেই বিশ্বাস করল না। তবে লক্ষ্য করলাম তার মুখ ভয়ে কেন যেন সাদা হয়ে গিয়েছে। 

মা বাবা, বউ আর ছোট ভাই। এই নিয়ে সফির সংসার। যত্ন তারা খুব করল। তবে সফি যে আমাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে এসেছে একথা তারা কেউ বিশ্বাস করল না। সফির মা বললেন, 

‘‘গতকাল পাশের দ্বীপে বাঘ একজনকে খেয়েছে। সে লোকটা নিশ্চয়ই বেঘোমড়ী হয়েছে। সেই কু বাতাস আজ এখানে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তাই রাতে যাই ঘটুক, কিছুতেই ঘরের দরজা খুলে বেরিও না। কাল সকালেই সফির চলে আসার কথা। সে ফিরে এলে, দিনের বেলা চারপাশে ঘুরে দেখো।”

তাড়াতাড়ি রাতের খাওয়া খাইয়ে তারা আমাকে শুতে পাঠিয়ে দিল। একটু পরেই তারা নিজেরাও যে যার ঘরে দরজা দিল। আমাকে তারা যে ঘরটা দিয়েছিল বাড়িতে অতিথি এলে সেই ঘরটি ব্যবহার করা হয়। ঘরের একটি মাত্র জানলা। রফিকুল আমাকে সেটি খুলতে বারণ করল। 

একে অচেনা জায়গা। তার ওপর এত তাড়াতাড়ি শোওয়ার অভ্যাস আমার নেই। ঘুম আর কিছুতেই আসেনা। সমানে এপাশ ওপাশ করছি। আর খালি ভাবছি সফিকুল আমাকে বাঘ দেখাবে বলেছিল। এ যাত্রা তা বোধহয় আর হলোনা। 

রাত তখন কত জানিনা, হঠাৎ আমার জৈবিক চাহিদা চাগাড় দিল। বাথরুম ঘরের বাইরে। তাই বাধ্য হয়ে ঘর থেকে বেরোতে হলো। কাজ সেরে বাথরুম থেকে বেরিয়ে দেখি যে সফিকুল উঠোনে দাঁড়িয়ে আছে। তাকে দেখেই আমি এগিয়ে গেলাম। 

‘‘কিরে আমাকে ছেড়ে দিয়ে তুই কোথায় চলে গিয়েছিলি? এখানে সবাই বলছে তুই নাকি জঙ্গলে গেছিস মধু আনতে, ফিরবি আগামীকাল ?”

সফিকুল ঠোঁটে আঙুল দিয়ে আমাকে চুপ করতে বলল। তারপর প্রায় ফিসফিস করে বলল, 

‘‘আস্তে কথা বল। আমি ফিরেছি সন্ধ্যাবেলা। সব কাজ মিটে গেছে তাড়াতাড়ি।”

‘‘বাড়িতে ঢুকিসনি কেন?”

‘‘তোকে বাঘ দেখাবো বলে। বাড়িতে একবার ঢুকে পড়লে আর তোকে বাঘ দেখাতে নিয়ে যাওয়া হতোনা।”

‘‘বাঘ কোথায় আছে?”

‘‘নৌকা করে নদী দিয়ে কিছুদূর গিয়ে জঙ্গলের মধ্যে। সেখানে বাঘের থাবার ছাপ দেখেছি। সেখানেই তোকে নিয়ে যাব। আমার সঙ্গে চুপিচুপি চল। কাউকে জাগানোর দরকার নেই।”

‘‘এত রাতে নৌকা কোথায় পাবি।”

‘‘নৌকা আমার নিজেরই আছে। তোদের ওখানে লোকের ঘরে ঘরে যেমন দু চাকা থাকে, আমাদের এখানে তেমন নৌকা থাকে। তৈরি হয়ে নে।”

একটা ব্যাপার আশ্চর্য লাগছিল। আমার আসার কোনো কথা ছিল না। কিন্তু সফির হাবভাব দেখে মনে হচ্ছে আমি যে আসব, এটা যেন সে জানত। যাইহোক, তৈরি হয়ে সেই রাতেই সফির সঙ্গে বেরিয়ে পড়লাম। নিশ্ছিদ্র অন্ধকার। বাঁধের কোলে, নদীতে একটা ডিঙি নৌকা দাঁড় করানো ছিল। সফি আমাকে সেখানে নিয়ে গিয়ে তুলল।

 সফি দাঁড় টানছিল পাকা মাঝির মতো। আমি বসেছিলাম ছই এর মধ্যে। কিন্তু আমি সফির একটা পরিবর্তন লক্ষ্য করছিলাম। যে ছেলেটা সবসময় অত কথা বলত, সে কথা বলছিল খুব কম। নৌকায় ওঠার পর আমার একটা কথারও উত্তর সফি দেয়নি। ছই এর ভেতর বসে, মাঝেমাঝে আমি বুঝতে পারছিলাম না যে নৌকায় আদৌ আমি ছাড়া আর কেউ আছে কিনা। 

মূল নদী থেকে বেরিয়ে অনেক সরু খাঁড়ি জঙ্গলের ভেতর দিয়ে বয়ে গেছে। একসময় নৌকা মূল নদী ছেড়ে তেমনই একটা খাঁড়ির ভেতর ঢুকলো। এইসব খাঁড়ির ভেতর ঢোকা সরকার থেকে নিষিদ্ধ। এমন সব জায়গায় বাঘ জল খেতে আসে। দুধারে জঙ্গলকে প্রায় গায়ের ওপর নিয়ে নৌকা এগিয়ে চলল। যখন তখন বাঘের সঙ্গে মোলাকাত হতে পারে। এমনকি বিপদ হওয়াও বিচিত্র নয়। 

মোবাইলে দেখলাম রাত বারোটা বাজে। ঠিক তখনই কোথা থেকে মেঘ এসে আকাশ ছেয়ে ফেলল। আশেপাশের জঙ্গল কাঁপিয়ে প্রবল ঝড় মূহুর্তে আমাদের নৌকাটার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। নৌকা ভীষণ ভাবে দুলতে লাগলো। আমি ভয়ে, “সফি, সফি...” বলে আর্তনাদ করে উঠলাম। কিন্তু কোথায় সফি? কারোর কোনো সাড়া নেই। বোধ হতে লাগলো এই জনমানবহীন জঙ্গলে, প্রাকৃতিক দুর্যোগ মাথায় নিয়ে, এই নৌকায় আমি সম্পূর্ণ একা।

এই সময় নৌকাটা হঠাৎ ভীষণ ভাবে দুলে উঠে, একধারে কাত হয়ে থেমে গেল। বুঝলাম নৌকা কোনো চড়া বা জঙ্গলের পলিতে আটকেছে। তখনই বিকট শব্দ করে বিদ্যুৎ চমকে উঠল। আর দেখতে পেলাম যেখানে বসে সফি দাঁড় টানছিল, সেখানে বসে আছে একটা বাঘ। তার দৃষ্টি আমার দিকে। চোখ দুটো যেন তার আগুনের মতো জ্বলছে। সফির চিহ্নমাত্র নেই। আমার বোধ বুদ্ধি তখন লোপ পেয়েছিল। প্রাণে বাঁচতে সেই পরিস্থিতিতেই নৌকা থেকে লাফ মেরে জঙ্গলে ঢুকে পড়লাম। হয় এই বাঘটা সফিকে খেয়েছে। নয়তো, আমাকে যে ডেকে নিয়ে এসেছে সে সফি নয়। সে অন্য কেউ। জঙ্গলের কাদা মাটির ভেতর দিয়ে প্রাণপণে ছুটছি, কাদায় বারবার পা আটকে যাচ্ছে। আর পেছনে ধেয়ে আসছে সাক্ষাৎ মৃত্যু দূত সেই বাঘ। পেছনে তার গর্জন শোনা যাচ্ছে থেকে থেকেই। ধরে ফেলতে বোধহয় আর দেরি নেই। এভাবে কতক্ষণ ছুটেছি জানিনা। হঠাৎ কিছুতে পা আটকে মুখ থুবড়ে পড়লাম। 

হয়তো কিছুক্ষণের জন্য জ্ঞান হারিয়ে ছিলাম। সম্বিত ফিরে পেতে বুঝলাম জঙ্গলের ভেতরে কোনো এক জায়গায় পড়ে আছি। বাঘের গর্জন আর শোনা যাচ্ছেনা। হঠাৎ নরম অথচ প্রচণ্ড ঠাণ্ডা কিছুতে হাত ঠেকল। হাতড়ে হাতড়ে বুঝলাম সেটা একটা মানুষের দেহ। 

 মোবাইলটা তখনও আমার পকেটেই ছিল। সেটা বের করে, টর্চ জ্বালালাম। তার আলোয় যা দেখলাম তাতে আমার বুকের রক্ত হিম হয়ে গেল। মাংস খোবলানো, রক্তমাখা একটা মৃতদেহ। সম্ভবত বাঘে মেরেছে। কিন্তু পুরোটা খেয়ে যেতে পারেনি। মৃতদেহটা আর কারোর নয়, সফিকুলের।”

এই পর্যন্ত বলে মণ্ডল চুপ করল। বোধহয় দম নেবে বলে। আমি ওর কথা শুনে স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিলাম। 

“সেকি? তারপর?”

“যে আমাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে এসেছে, সামনে সেই বন্ধুরই মৃতদেহ দেখে আমি স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিলাম। তারপর বোধহয় আবার জ্ঞান চলে গিয়ে থাকবে।

জ্ঞান ফেরার পর নিজেকে সফিকুল দের বাড়িতে শোওয়া অবস্থায় দেখতে পেয়েছিলাম। শুনেছিলাম যারা মধু আনতে গিয়েছিল, তারাই ভোরবেলা সফিকুলের মৃতদেহ এবং আমাকে আবিষ্কার করে। যেদিন আমি ওদের বাড়িতে গিয়েছিলাম সেদিনই বিকেলে সফিকে বাঘে টেনে নিয়ে যায়। অতএব আমি আগাগোড়া যাকে দেখেছি সে সফিকুল নয়। ওখানকার এক গুনীন বলল সফি বেঘোমড়ী হয়েছে। বেঘোমড়ীর সংস্পর্শে যে যায় সে নাকি ধীরে ধীরে নরখাদক হয়ে ওঠে। আমি বেঘোমড়ীর দেহ ছুঁয়েছি। আমার কী হবে তার ঠিক নেই। এই বলে সে আমার হাতে একটা তাবিজ বাঁধতে এল। গুনীনের কথা শুনে আমার হঠাৎ ভীষণ রাগ হলো। তাকে এক ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিলাম। মনে হচ্ছিল ওকে চিবিয়ে খাই। আমার ধাক্কায় জোর ছিল। লোকটা মাটিতে পড়ে গিয়েছিল। উঠে দাঁড়িয়ে বিড়বিড় করে কিসব মন্ত্র বলতে বলতে, ও প্রায় ছুটে পালিয়ে গেল। 

ওদের বাড়িতে তখন সকলেরই শোচনীয় মানসিক অবস্থা। তাই ওখানে আর না থেকে ধনেখালিতে ফিরে এলাম। এই ঘটনার পর আর ওখানে মাছের ভেড়ীটা রাখার ইচ্ছে নেই।”

আমি মণ্ডলের কথা শুনছিলাম। বেঘোমড়ীর মড়া যে ছোঁয় সে নরখাদক হয়ে যায়। একথা আমিও শুনেছি। প্রথমে তার দাঁত গুলো নাকি ছুঁচলো হয়ে যায়। শ্বদন্ত গজিয়ে ওঠে। তবে এগুলো সবই আমার শোনা কথা। 

বৃষ্টি ততক্ষণে থেমে গিয়েছিল। মণ্ডলের কথা শুনে গায়ের মধ্যে কেমন শিরশির করছিল। মণ্ডলকে বললাম যে এবার আমাকে যেতে হবে। আমার কথা শুনে মণ্ডল কেমন করে যেন হেসে উঠল। 

“ভয় পেলেন নাকি?”

দেখলাম ওর মুখটা যেন আর আগের মতো নেই। সামনের দাঁত গুলো কেমন যেন ছুঁচলো হয়ে ঠেলে বেরিয়ে এসেছে। ওর কথায় উত্তর না দিয়ে বেরিয়ে আসছি। মণ্ডল আবার হেসে উঠল। 

“বড় ক্ষিধে পাচ্ছে মাস্টার মশাই। কি খাই বলেন দেখি? এরা বাড়িতে যা রেঁধেছে তা আর খেতে ইচ্ছে করছে না।”

 পরিষ্কার দেখলাম ওর ছুঁচলো দাঁত গুলো যেন আরও ঠেলে বেরিয়ে এসেছে। মনের মধ্যে কু গেয়ে উঠল। আর একটাও কথা না বাড়িয়ে, সোজা সাইকেলে চেপে বসলাম। গোটা রাস্তাটা খালি মনে হতে লাগলো আমার পেছনে কেউ যেন আসছে। 

মণ্ডলের বাড়িতে আমার পড়ানো ছিল আবার তিনদিন পর। ঠিক পরেরদিন বিকেলেই পেলাম একটা সাঙ্ঘাতিক খবর। মণ্ডলকে নাকি সুন্দরবনে বাঘে খেয়েছে। আগেরদিন রাতে, ওদের বাড়ির চৌহদ্দির ভেতর ঈশাহক মণ্ডলকে একমাত্র আমিই দেখতে পেয়েছিলাম।

এবং বৃত্তের বাইরে, জানুয়ারি, ২০২৫


No comments:

Post a Comment