আত্মার ঘ্রাণ
প্রদীপ চট্টোপাধ্যায়
আমার কাজটাকে অনেকেই অবহেলার চোখে দেখে। অনেকে নাক সিঁটকায়। তাতে অবশ্য আমার কিছু যায় আসে না। কারণ কাজটা করে আমি যুশি। নিত্য নতুন পরিবেশে যেতে পারি, নতুন নতুন লোকের সঙ্গে আলাপ হয়। কথায় কথায় নানা কথা জানতে পারি, নতুন নতুন ঘটনার সঙ্গে পরিচিত হই। আমার নতুন প্রোডাক্টের মতই নতুন অনুভূতিগুলো লাভ করি। পরবর্তী সময়ে যা আমাকে নানা ভাবে সাহায্য করে।
আমি বেরিয়ে যাই খুব ভোরবেলা। ফিরি কখনও বিকালে, কখনও বেশ রাত হয়। আসলে কাজের নেশটা চেপে যায়। এই যেমন সেদিন খুব ভোরের ট্রেন ধরে চলে গেলাম একেবারে একটা অঁজ গাঁয়ে। আসলে আমার কাজ হল, নতুন নতুন প্রোডাক্টকে পাবলিকের মধ্যে পরিচিত করা। বিশেষ করে নতুন কোম্পানিগুলোর কাজই আমি করি। কারণ টাকাটা বেশি পাওয়া যায়। তাছাড়া টিফিন খরচাটাও বেশি দেয়। তা থেকে কিছুটা বাঁচিয়ে আমি আমার সারাদিনের সিগারেট খরচাটা তুলে নিই। এছাড়া গাড়ি ভাড়া তো আছেই। প্রথম দিকে আমি নামি কোম্পানির প্রোডাক্ট গ্রামে-গঞ্জে গিয়ে পরিচিত করাতাম। গ্রামের মানুষকে বোঝাতাম। আসলে বেশিরভাগ কোম্পানিই ইদানিং গ্রামে মার্কেট করতে চাইছে। তাছাড়া এখন বেশ ভালো রকম প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেছে গ্রামীণ মার্কেট নিয়ে। নতুন কোম্পানি বা পুরানো কোম্পানির নতুন প্রোডাক্টগুলো আমি এভাবেই ছড়িয়ে দিই। ওহ, আমার নামটা বলা হয়নি। আমি থাকি শহরের দিকে, আমার নাম মনমোহন গাঙ্গুলি। বাড়িতে বৃদ্ধ মা-বাবা আছেন, আমি বিয়ে এখনও করিনি। বাড়িটা ছোট হলেও আমাদের নিজের এই যা।
তা একটা নতুন প্রোডাক্ট নিয়ে ক’দিন ধরেই আমি গ্রামগঞ্জে ঘুরছি। প্রোডাক্ট নতুন কোম্পানির যেহেতু তাই সময় একটু বেশিই দিতে হচ্ছে, অবশ্য ওরা যে টাকা আমায় দেয় তাতে পুষিয়ে যায়। এমনই একটা প্রোডাক্ট সেদিন বিভিন্ন দোকানে ঘুরি একটা মোটা অর্ডার যোগাড় করে স্টেশনে ফিরে এলাম। তার আগে একটা ভালো রেস্টুরেন্টে ঢুকে খাবার খেয়ে নিয়েছি। আমি যে গ্রামীণ স্টেশনটায় দাঁড়িয়ে আছি তার নাম হচ্ছে মৌসুমী। সাধারণত এই নামে স্টেশন আগে আমি দেখিনি বা শুনিনি। তবে হতেই পারে, এতে সন্দেহ কি। এখান থেকে আমি ফিরব হাওড়ায়, ওখান থেকে বাসে বাড়ি। তা হাওড়া যেতেই সময় লাগবে অনেক। ট্রেন আসতে দেরি আছে, একটা সিগারেট ধরিয়ে প্লাটফর্মে অপেক্ষা করতে লাগলাম। ফাঁকা প্লাটফর্ম। এমন অঁজ গাঁয়ে লোকজন এই সময়ে কোথায় বা যাবে? যখন চুপচাপ দাঁড়িয়ে সিগারেট টানছি, সেই সময় একটা মেয়ে এসে আমার থেকে সামান, তফাতে দাঁড়াল। মেয়েটাত বয়স বাইশ পার হয়নি বলে আমার অনুমান। দেখতে বেশ সুন্দর যা আমায় অবাক করল। কারণ এই রকম একটা গ্রামীণ স্টেশনে এমন সুন্দরী মেয়ে দেখতে পাব আশা করিনি। তা কয়েকবার দেখে অন্য দিকে চেয়ে রইলাম। এখনও ট্রেন আসতে কিছুক্ষণ বাকি।
হঠাৎ নাকে একটা সুগন্ধ এসে লাগলো। অদ্ভুৎ গন্ধ। গন্ধটা প্রাণ ভরে নিয়ে ভাবলাম, মেয়েটা এমন গাঁয়ে এমন সুগন্ধী কোথায় পেল! তারপরই ভাবলাম, হয়ত কেউ ওকে উপহার দিতে পারে। গন্ধটা সমানে নাকে এসে ঢুকে আমায় মুগ্ধ থেকে মুগ্ধতর করে তুলছে। আমার সর্ব শরীর আর মন যেন ক্রমশ মেয়েটার দিকে ধাবিত হচ্ছে। একটা অদ্ভুৎ মোহময়তায় আমি ক্রমে আছন্ন হয়ে পড়ছি। কী সাংঘাতিক ব্যাপার রে বাবা। এমন সময় মেয়েটা আমার দিকে আচমকা তাকিয়ে বলল, ট্রেনের খবর কি হয়ে গেছে?
আমি মেয়েটার দিকে মুখোমুখি তাকালাম। দারুণ দেখতে, চোখ দুটো চমৎকার। যেন কত কিছু কথা নীরবে বলে দিচ্ছে। ঠোঁঠ মোহময়, সেখানে ঝুলছে এক টুকরো হাসি। আমি বিহ্বল হয়ে বললাম, হ্যাঁ মানে হ্যাঁ খবর হয়ে গেছে। মেয়েটা আমার তোতলামি দেখে হেসে ফেললো। আমি বোকার মত চেয়ে রইলম।
মেয়েটা হঠাৎ প্রশ্ন করল, কোথায় যাবেন? আমি মন্ত্রমুগ্ধের মত বললাম, হাওড়া। মেয়েটি হেসে বলল, আমি অবশ্য কয়েকটা স্টেশন পড়েই নামব। আমি একটু ধাতস্ত হয়ে বললাম,- আচ্ছা।
কিন্তু গন্ধটা আমায় ক্রমে আরো আছন্ন করছিল। আমি সেই সুগন্ধ থেকে কিছুতেই নিজেকে বার করে আনতে পারছিলাম না। আমার মনে হয়, মেয়েটা সেটা আঁচ করতে পেরেছিল। এমন সময় তীব্র হর্ণের আওয়াজে তাকাতেই দেখি ট্রেনটা প্লাটফর্মে ঢুকছে। আমি মেয়েটার দিকে তাকালাম। মেয়েটা কিছু বলল না। অথচ আমি ওখান থেকে সরতে পারলাম না।
ট্রেনটা এসে দাঁড়াল। আমি মেয়েটা যে কামারয় উঠছে সেখান কি উঠব, এমন ভাবনা আসতেই দেখি মেয়েটা আমায় ইশারা করে একই কামরায় উঠতে বলল। আমি মেয়েটার পিছন পিছন উঠে পড়লাম। কেমন যেন হয়ে গেছি আমি। পকেটে ভালোই টাকা রয়েছে, একটা দুশ্চিন্তা এল বটে তবে পরক্ষণেই উবে গেল, কারণ মেয়েটি বলল, বসুন।
আমি চেয়ে দেখি, ট্রেনের কামরায় মাত্র কয়েকজন ইতঃস্তত লোক। ফাঁকাই বলা যায়। মেয়েটার পাশে বসলাম। গন্ধটা আমাকে ছাড়ছে না, মেয়েট নড়াচড়া করলে গন্ধটা তীব্র হচ্ছে আর আমাকে ভীষণ অবশ করে দিচ্ছে।
আমি বললাম, এদিকেই থাকেন বোধহয়।
মেয়েটি বলল, হ্যাঁ তবে ওই যেখানে নামব বললাম, ওখানে আমার বাড়ি নির্জনপুর।
আমি বললাম, বাঃ নামটা তো খুব সুন্দর!
মেয়েটা বলল, হ্যাঁ। নামটা খুব সুন্দর। আমি আর কিছুক্ষণ পরেই নামব। প্রয়োজন হলে আমাদের গ্রামটা একবার দেখতে পারেন, পরের ট্রেন ঘন্টা দেড়েক বাদে আছে, চলে যাবেন।
আমি খুব খুশি হয়ে বললাম, বেশ নামব। আপনি যখন বলছেন না নেমে থাকা যায় না।
মেয়েটা কোনও সময়ই শব্দ করে হাসছে না। তার চমৎকার ঠোঁঠ থেকে এক ঝলক হাসি ঝরে পড়ল। তারর সেও চুপ আমিও চুপ।
তারপর দুজনে চুপচাপ হাঁটতে লাগলাম। যেখানে নেমে হাঁটছি, একেবারে পল্লীগ্রাম। গ্রামের চারিদিকে ঘনঘন গাছপালায় ভর্তি। ছায়াসুশীতল গ্রাম একেই বলে। মাঝে মাঝে বড় বড় পুকুর। সেই পুকুরে হাওয়া তিরতির করে ঢেউ তুলছে। পুকুরে অবশ্য হাঁসের দেখা নেই। তবে গ্রামটা ঘিরে রেখেছে প্রচুর পাখি। নানা রকমের এত পাখি জীবনে আমি দেখিনি। তাদের রকমারি ডাক আমার কানে আসছে। বিকাল হয়েছে। আকাশ একেবারে নীল এবং পরিস্কার। গ্রামের রাস্তা ধরে হাঁটছি। মন যেন ভরে যাচ্ছে। আমার পাশাপশি হাঁটছে ওই সুন্দরী। তার শরীর থেকে সেই মুগ্ধকর সুবাস আমার নাকে লাগছে। জানি না, মনটা যেমন কেমন হয়ে আছে। আমার চোখে চোখ পড়তেই মেয়েটি বলল, কেমন লাগছে আমাদের গ্রাম?
আমি বললাম, অপূর্ব, তুলনাহীন। আমার কথা শুনে মেয়েটি সেই ভাবেই হাসল। গ্রামীণ বিকাল পরিবেশে সেই হাসির কোনও তুলনা আমার মাথায় এল না। এমন সময় আমার হঠাৎ মনে হল, আরে এতক্ষণ হাঁটছি, একজনও মানুষ তো চেখে পড়েনি। তাহলে কি গ্রামে কোনও মানুষ নেই ? নাকি তারা ঘরের মধ্যেই থাকে ? প্রশ্নটা মাথায় আসতেই মেয়েটার দিকে চাইলাম।
সে ভ্রু নাচিয়ে বলল, কিছু বলবেন?
তোমাদের এমন সুন্দর গ্রামে মানুষ কোথায়? একজনকেও তো দেখতে পাচ্ছি না।
মেয়েটি এই প্রথম খিলখিল করে হেসে বলল, আছে। তবে সব সময় দেখা যায় না। একটু পরেই দেখতে পাবেন।
আমি বললাম, একটু পরেই তো সন্ধ্যা ঘনাবে, অন্ধকার নামবে?
মেয়েটি সুরেলা কন্ঠে বলল, তখনই মানুষ দেখতে পাবেন।
আমি রহস্যময় কথার আর কোনও উত্তর দিলাম না, ভাবলাম, বাড়ি ফিরব কিভাবে। মেয়েটাকে জিজ্ঞাসা করলাম, বাড়ি ফিরতে পারব তো?
মেয়েটা হেসে বলল, দেখা যাক না। তারপরই প্রশ্ন করলাম, আর কত দূর যেতে হবে?
মেয়েটি একটু দূরে আঙুল দেখিয়ে বলল, ওই যে ওই ঘনঘন গাছগুলো দেখছেন, ওর পাশের রাস্তায় একটু এগোলেই আমার বাড়ি। চলুন। বলেই সহসা মেয়েটি আমার হাত ধরল।
অদ্ভুৎ এক অনুভূতি। আমার মনের ভিতরটা ছটফট করে উঠল অদ্ভুৎ আরামে। মেয়েটার গা থেকে সে সুগন্ধ ভেসে আসছে তা আরো প্রকট হলো। আমি এমন মায়াবী অনুভবে কোনওদিন হারাইনি, ভাবিওনি। আমি কোথায় যেন হারিয়ে যেতে লাগলাম।
মেয়েটি আমার দিকে আড় চোখে চেয়ে বলল, ভালো লাগছে?
আমি বললাম, দারুণ।
মেয়েটি বলল, চলুন।
আমি এগিয়ে যেতে যেতে পরিবেশের দিকে তাকালাম। বিকেল শেষ হচ্ছে। দূরের গাছপালার মাথায় সূর্যের সোনালী আলো মুগ্ধকর পরিবেশ তৈরি করেছে। গাছপালাগুলো সেই আলোক রশ্মি বুকে নিয়ে যেন অন্ধকারের সাধনায় রত। মাঠঘাট চমৎকার মুগ্ধ আলোকে ভেসে যাচ্ছে। একি কোনও স্বর্গের পথে আমি চলেছি! জানি না। মেয়েটি আমার হাত তখনও ধরে রেখেছে। তার শরীর থেকে ভেসে আসা সুগন্ধ ক্রমে আমায় অবশ শুধু নয় শেষ বিকালে মনে অন্য তাড়না আনছে। আমি মুগ্ধ দৃষ্টিতে মেয়েটির দিকে তাকালাম। তার চেখে অন্য মেজাজ খেলা করছে। একেই বলে মোহময় চাউনি। এভাবে যখন মুগ্ধ হয়ে গেছি আমি। তখন মেয়েটি বলল, এটাই আমার বাড়ি।
আমি চেয়ে দেখি, একটা কুটিরের কাছে দাঁড়িয়ে। চমৎকার ভাবে কুটিরটি তৈরি। কুটিরের মাথা নানা গাছপালার সবুজ পাতা সাজানে। বেশ বড় উঠোনটা নিখুঁত ভাবে নিকানে। সম্ভবত গোবর দিয়ে নিকানো হয়েছে। উঠোনের শেষ ভাগে সার সার নানা জাতের ফুল গাছ। সেখানে ফুল ফুটে আছে। সেই গন্ধ মাত করে দিচ্ছে পরিবেশ। বইছে মৃদুমন্দ বাতাস। কুটিরর ওপর একখান দাওয়া। সেটাও নিখুঁত পরিস্কার। দাওয়ার একধারে কয়েকটি ছোট ছোট চৌকি। একটা শীতলপাটি। সম্ভবত কেউ এলে ওটা পেতে বসতে দেওয়া হয়।
আমার হাতে মৃদু চাপ মেরে মেয়েটি বলল, দাওয়ার ওপরে উঠুন। মাত্র চারটি ধাপ ভেঙে আমি দাওয়ায় উঠতেই মেয়েটি শীতলপাটিটা পেতে দিয়ে বলল, বসুন। আমি ফ্রেস হয়ে এলে আপনি যাবেন। ততক্ষণে আমি চা বানিয়ে নেব আপনার জন্য।
আমি বললাম, দরকার কি, আমায় ফিরতে হবে যে।
মেয়েটি বলল, সবে সন্ধে, সময় আছে এখনও। ঘাবড়াবেন না। বলেই সে চলে গেল ফ্রেস হতে।
অল্পক্ষণ পরেই ফিরে এল। স্নান করেছে, তাই অপূর্ব দেখাচ্ছে তাকে। বাঁধা চুল এখন সম্পূর্ণ খওলা। পিঠ জুড়ে ভিজে চুল ছড়িয়ে রয়েছে। কিছু বুকের সামনে। তার শরীর থেকে যে গন্ধ পেয়েছিলাম, তা যেন আরো সুন্দর হয়ে আমায় বিহ্বল করে দিচ্ছে। আমি তার দিকে এক দৃষ্টিতে মুগ্ধ হয়ে চেয়ে রইলাম। মেয়েটি মৃদু হেসে বলল, শুধু চেয়ে থাকলে হবে, যান ফ্রেস হয়ে আসুন। চা বসাচ্ছি।
আমি ফ্রেস হতে এগিয়ে গেলাম। উঠোন থেকে নেমে শেষ ভাগে বাথরুম রয়েছে। বাথরুমের ভিতর ঢুকে গেলাম। হাত মুখ ধুতে ধুতে মনে হল, দেখি তো উঁকি মেরে মেয়েটি কি করছে। যেমন ভাবা তেমনি কাজ। বাথরুমের দরজাটা অতি সামান্য ফাঁক করে চাইতেই বুক চমকে উঠল।
একি দেখছি, মেয়েটির সেই সুললিত চেহারা নেই। একট কঙ্কালসার দেহ দাওয়ার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। দাওয়ার এক পাশে দাউদাউ আগুন জ্বলছে। সেই আগুনে একটা পাত্র চাপানো। আগুন জ্বলছে অথচ উনুন নেই, নেই সামান্য কিছু আবরণ। আগুন জ্বলার উপকরণও নেই। কি করে আগুন জ্বলছে! আমার ভয়ে মুখ শুকিয়ে গেল। পাছে আপনা থেকে চিৎকার করে উঠি তাই মুখ চেপে ধরলাম নিজেই। হাতমুখ ধোয়া চুলোয় উঠল। পালাতে হবে, পালাতে। মেয়েটা কোনও মায়াবিনী। আমাকে নিশ্চয় ভুলিয়ে ভালিয়ে এনেছে। এরপর কি হবে আমি জানি না। কিন্তু পলাবকি ভাবে? বাথরুমে দাঁড়িয়েই ভাবতে লাগলাম।
দিনের আলোয় হাঁটতে হাঁটতে আসতে আসতে কোনও মানুষই চেখে পড়েনি। মেয়েটা বলেছিল, রাতে মানুষ দেখা যাবে। তার মানে কি! মেয়েটার গায়ের যে মোহময় গন্ধ, ওটা তাহলে পুরুষদের আকর্ষণ করার জন্য! আমি সেই মোহেই এখানে এসেছি। মেয়েটা ছদ্ম রুপ ধরে আছে। আমি ভয়ে অবশ হয়ে যেতে লাগলাম। পা যেন সরছে ন, পালাতে পারব কি, নাকি জনমানব শূন্য গ্রামে আমায় ওই মেয়েটা না ডাইনি নাকি পেত্নী নাকি মায়াবিনী রক্ত চুষে খাবে!
আমি ভয়ে পাগলের মত হয়ে উঠলেও মাথা ঠিক রাখার চেষ্টা করে প্ল্যান খুঁজতে লাগলাম। এখনও পালাবার সময় রয়েছে অবশ্য পালাতে পারব কিনা জানি না। কারণ মেয়েটা যদি অলৌকিক শক্তিধর হয় বা মায়াবিনী হয় তবে আমায় ধরতে ওর বিন্দুমাত্র সময় লাগবে না। তা হোক তবুও আমায় পালাতেই হবে, কিছুক্ষণের জন্য অন্তত বাঁচতে পারব।
যেমন ভাবা তেমনি কাজ, আমি বাথরুম থেকে সন্তর্পণে বেরিয়ে গ্রামের রাস্তায় পড়লাম। আসার আগে দেখে এসেছি, দাওয়ায় শূন্যে আগুন জ্বলছে, তার ওপর একটা পাত্র। সেখানে নিশ্চয় চা ফুটছে এবং সেটা আমার জন্যই। তার মানে মারার আগে খাতির।
গ্রামের রাস্তায় পড়ে দৌড় লাগালাম। কোনদিকে যাচ্ছি ঠিক নেই। আদৌ কোনও স্টেশন পাব কিনা তাও জানি না। দৌড়াতে দৌড়াতে দেখলাম মেয়েটা ঠিকই বলেছিল, রাতে কারা যেন হাঁটাচলা করছে রাস্তায়। আমার পাশ দিয়ে কয়েকটা মূর্তি চলে গেল। কিন্তু আশ্চর্য তারা আমার দিকে ফিরেও তাকালো না। আমি চমকে দেখলাম, তাদের মাটিতে ছায়া পড়ছে না। গ্রাম ঘন অন্ধকারে ছাওয়া নয়, কারণ আকাশে ফালি চাঁদ রয়েছে। ফলে এক ধরণের ধূসর আলো ছড়িয়ে আছে চারিদিকে। দৌড়াতে দৌড়াতে দেখলাম, মাঠে কারা যেন কাজ করছে। তাদের কথার শব্দ না পেলেও পৈশাচিক হাসির আওয়াজ পাচ্ছি। আমি দৌড় থামাইনি, বাঁচতে পারব না জানি তবু চেষ্টা করতে ক্ষতি নেই। এখনও পর্যন্ত ওই মেয়েটার আমার সামনে আসেনি। তবে আসবে আমি জানি।
আমার এসব কিছুই আজব লেগেছিল প্রথমদিকে। এখন বুঝে গেছি এটি একটি ভৌতিক গ্রাম বা আত্মার গ্রাম। জনশূন্য এই গ্রামে ভূত প্রেতেরই বসবাস। এমনকি এখানে মহিলারা ভেক রূপ ধারণ করে মায়াবিনী সেজে জ্যান্ত মানুষ ধরে আনে ভুলিয়ে ভালিয়ে অথবা রূপ দিয়ে মোহিত করে। যেমন আমায় সুগন্ধ দিয়ে মেয়েটি তার দিকে আকর্ষিত করে আমায় মোহগ্রস্ত করে তুলেছিল। তারপর তার পিছন পিছন মোহবিষ্ট হয়ে আমি এখানে হাজির হই। তারপর যা ঘটছে তা বলে চলেছি আপনাদের।
আমি গ্রাম পেরিয়ে একটি মাঠে পড়লাম। আমার মনে হল যে, এই মাঠ আমি দুপুরে মেয়েটির সঙ্গে আসার সময় পেরিয়ে ছিলাম। আশা জাগল মনে, এই মাঠ পের হলেই সম্ভবত স্টেশন পেয়ে যাব। কিন্তু এখন মাঝরাত। ট্রেন নিশ্চয় থাকবে না। প্রচণ্ড দৌড়ানোর জন্য খিদে পাচ্ছে বেশ তা ছাড়া ক্লান্তি জড়িয়ে ধরছে আমায়। কিন্তু নিজেকে বাঁচাতে গেলে এসব ঝেড়ে ফেলতে হবে। পিপাসা বেড়েছিল খুব। তখনই মনে পড়ল, আমি ব্যাগটি দাওয়ায় ফেলে এসেছি। ওর মধ্যে জল ভর্তি বোতল ছিল। এখন জল পান করার উপায় নেই। তৃষ্ণায় ছাতি ফেটে গেলেও আমার দাঁড়ানো চলবে না। আমি দৌড়াতে শুরু করলাম। যেমন করে হোক মাঠটা পের হতেই হবে। তারপর যা হয় হবে।
আমি প্রাণপণ দৌড়ে মাঠের প্রায় শেষ ভাগে পৌঁচ্ছে গেলাম। ঘন রাতে জ্যোৎস্না থাকার জন্য আমি রেল লাইনের তার দেখতে পেলাম। ওমনি বুকের মধ্যে আশা জেগে উঠল। বুঝলাম, আত্মার গ্রাম আমি পেরিয়ে এসেছি হয়ত। ঠিক সেই সময় একটা দমকা বাতাস এল। প্রচণ্ড ঠান্ডা সেই বাতাস আমার হাড়ের ভিতর পর্যন্ত কাঁপিয়ে দিল। আমি বুঝলাম, ওই মেয়েটা মানে মায়াবিনী এসে গেছে এবং আমার মৃত্যু অনিবার্য। কি করি কিছুই মাথায় এল না।
এমন সময় অন্ধকার ভেদ করে, মায়াবিনীর জাল ছিঁড়ে একজন লোক উদয় হলো, রাতের অন্ধ মাঠে। লোকটা নিশ্চয় আরেক শয়তান। আমার মাথা এবার সম্পূর্ণ গুলিয়ে গেল। কি করব ভেবে পাচ্ছি না। কালো আর ভীষণ রোগাটে লোকটা আমার দিকে এগিয়ে আসছে। তার মাথায় বিরাট জটা, সেটা পেঁচিয়ে বাঁধা। আমি আঁতকে উঠলাম। তার সঙ্গেই সেই মেয়েটার অট্টহাসি সারা মাঠে ছড়িয়ে পড়ল।
লোকটা আমার একদম কাছে। সে ইশারায় আমায় কিছু বলছে। আমার বোঝার মত ক্ষমতা নেই। এমন বার কয়েক করল লোকটা তবুও কিছু বুঝলাম না। ঠিক তখনই আমার বুকের কাছটা কেমন করে উঠল। আমর জামার বোতাম খুলে বুকে হাত দিলাম ওমনি আশার সঞ্চার হলো মনে এবং চমকে উঠলাম।
আমার গলায় দুলছে সেই তাবিজটা যেটা দিয়েছিলেন আমার বাবার গুরুদেব। ধরতে গেলে তিনি আমাদের বংশের গুরুদেব। যদিও আমায় দীক্ষিত করার আগেই তিনি দেহ রাখেন। এই সেই তাবিজ। মনে পড়ে গেল ঘটনাটা। তখন আমার অল্প বয়স। গুরুদেব বাড়িতে এসেছিলেন। মা বাবা আমায় দেখতে বলেছিলেন। তিনি আমার কপাল দেখেই চমকে উঠে বলেছিলেন, ভীষণ বিপদ ঘনাবে যুবক বয়সে। মা বাবা কাতর কন্ঠে বলেছিলেন, কি বিপদ! রক্ষার পথ আছে কি?
গুরুদেব বলেছিলেন, পথ আছে। তবে তিনদিন ধরে তোর বাড়িতে থেকে আমায় ছোট্ট একটা যজ্ঞ করতে হবে। সেখান সেখান থেকেই বের হবে ওর বাঁচার পথ। সব ঠিকঠাক হয়ে গেল, যজ্ঞ হলো। তারপর এক ভোরে স্নান করে এলাম। গুরুদেব নিজের হাতে এই তাবিজ আমার গলায় পড়িয়ে দিয়ে বলেছিলেন, ভূত, প্রেত, পিচাশ তোর যাতে যাতে কোনও ক্ষতি করতে না পারে তাই এই তাবিজ। যত্ন করে সারা জীবন গলায় রাখবি, খুলবি না। তারপর চার লাইনের একটা মন্ত্র শিখিয়ে দিয়ে বলেছিলেন, বিপদে পড়লেই তাবিজ ধরে এই মন্ত্র চোখ বুজে জপ করবি। ব্যাস সব সমাধান হয়ে যাবে। সেই থেকে আবিজ আমি খুলিনি। আজ গুরুদেবের আত্মা আমায় স্মরণ করিয়ে দিলেন। কোথায় তিনি? চারিদিকে তার আর সন্ধান পেলাম না।
যাই হোক পথ পেয়ে গেছি, এখন সত্যের বিচার হয়ে যাবে। এমন সময় সেই মেয়েটা আবার অট্টহাসি করে উঠল। সারা মাঠে অনেকগুলো সুন্দরী মেয়ের আবির্ভাব হলো। এখন আমি কোনও দিকে তাকাব না। তাবিজটা ধরে চারলাইনের সেই মন্ত্রটা চোয বুজে জপ করতে লাগলাম। চোয বুজে থাকার জন্য কিছুই দেখতে পচ্ছি না বটে তবে অদ্ভুৎ সব ভয়ার্ত শব্দ আমার কান ঝালাপালা করে দিতে চাইল। আমি একমনে মন্ত্র পাঠ করতে লাগলাম।
মন্ত্র পাঠ করতে করতে কেমন যেন মোহিত হয়ে গেলাম। মনে হলো, কেউ আমায় স্পর্শ করছে। তার হাত ফুলের মত নরম এবং স্নেহময়। বিশ্রী ভয়ার্ত আওয়াজ গুলো কানের পাশ থেকে হঠাৎ উধাও হয়ে যেতেই মনে হলো, কানে যেন তালা লেগে গেছে। কি হচ্ছে বুঝতে পারছি না, আমি চোখও খুলছি না। এভাবে দীর্ঘ সময় কেটে যাবার পর কেউ যেন কানে কনে বলল, চোখ খোল। আমি ভয়ে ভয়ে চোখ খুলতেই দেখলাম, আশাপাশে কেউ নেই। শুধু আবছা আলো ছড়িয়ে মাঠময়। আমার আনন্দে চিৎকার করতে ইচ্ছা করল, তার মানে ভোর হচ্ছে। আর কোনও ভয় নেই।
আমি দূরে তাকাতেই রেল লাইন দেখতে পেলাম। হ্যাঁ হ্যাঁ, ওই স্টেশনেই আমি নেমে ছিলাম সম্ভবত। দৌড়ালাম। তারপর স্টেশনে ঢুকে পড়লাম। ব্যাগটা কাছে না থাকলেও পকেটে বেশ কিছু টাকা ছিল। তাই দিয়ে টিকিট কাটলাম। জানলাম, অল্পক্ষণ পরেই ট্রেন আছে। খিদে পাচ্ছিল খুব। এত সকালে স্টেশনের সব দোকান খোলেনি। চায়ের দেকান খোলা আছে। চা আর বিস্কুট খেলাম। ঠিক তখনই ট্রেনের হর্ণ শুনতে পেলাম।
ট্রেন আসতেই উঠে জানলার ধারে বসলাম। ভোরের ট্রেনে তেমন ভিড় নেই। জানিও না এই ট্রেনে ঠিক কতটা ভিড় হয়। খানিকক্ষণ পরেই ট্রেন ছেড়ে দিল। জানলা দিয়ে সকালের পবিত্র হাওয়া আমায় সর্ব শরীর ধুয়ে দিচ্ছে। আরাম পেলাম। চোখ বুজলাম, ওমনি গত রাতের স্মৃতি দুঃস্বপ্নের মত আমায় ঘিরে ধরল। আমি অস্বস্তি অনুভব করলাম। সেই মেয়েটার সুন্দর চেহারাটা যেমন চোখের সামনে ভেসে উঠল তেমনই তার কঙ্কালসার দেহটাও চোখের সামনে ভেসে উঠল। আমি আঁতকে উঠলাম। হঠাৎ করেই মেয়েটার গায়ে যে গন্ধ পেয়ে ছিলাম, সেটা ভেসে এল। এখন আর মুগ্ধতা কাজ করছে না। বুঝতে পারলাম ওটা অশরীরী গন্ধ, মায়া ছড়ানো থাকে ওতে। যদি না তখন বুদ্ধি করে পালাতাম এতক্ষণে আমি লাশ হয়ে যেতাম। দু’হাত তুলে গুরুদেবকে প্রণাম জানালাম। কত কিছুই না অলৌকিক কান্ড ঘটে যা আমাদের জানা-বোঝার বাইরে। নইলে ওই সময় ওভাবে গুরুদেব কেন দেখা দেবেন আর কেনই বা আমায় তাবিজ আর মন্ত্রের কথা মনে করিয়ে দেবেন। ওটা ছিল বলেই তো প্রাণে বাঁচলাম।
ট্রেন পূর্ণ গতিতে চলেছে। ক্রমে ভিড় বাড়ছে। আমায় আর কয়েকটা স্টেশন গিয়ে গাড়ি চেঞ্জ করতে হবে। না হলে হাওড়া যেতে পারব না। ব্যাগটার জন্য মনটা খারাপ করল। বেশ কিছু টাকা ওতে ছিল, কিছু অর্ডারের কাগকপত্র। তবে যা গেছে যাক, প্রাণটা তো বাঁচানো গেছে! ট্রেনের ভিড়ের মধ্যেও আমার চোখের সামনে আরেকবার ভেসে উঠল সেই আত্মার গ্রামটা। আমি আঁতকে উঠে চোখ খুললাম। নাহ, আর কোনও ভয় নেই।
এবং বৃত্তের বাইরে, জানুয়ারি, ২০২৫

No comments:
Post a Comment