আত্মজ - ঋষভ চট্টোপাধ্যায় - ভূতের গল্প - এবং বৃত্তের বাইরে

Atmojo- A horror Story by rishav chattopadhyay

আত্মজ

ঋষভ চট্টোপাধ্যায়


ডানদিক থেকে বাঁ-দিক জোড়া কাঁচের জানালাটার উপর মাথা এলিয়ে বসে আছে পলা। চোখে একটা ক্লান্ত, অবসাদমাখা দৃষ্টি। ওর শুকনো, রুক্ষ, নিস্প্রাণ মুখটার সাথে সম্পূর্ণ মানানসই সে দৃষ্টি। সেই দৃষ্টি যার দিকে তাকালে মনে হয়, এ জগতের কোনোকিছুরই হওয়ার কোনো কারণ বা প্রয়োজন নেই; হতে হয়, তাই হয়ে চলেছে। খেতে হয় তাই খাচ্ছে, ঘুমোতে হয় তাই ঘুমোচ্ছে--- যেন ওর শরীরজুড়ে সকল জৈবিক ক্রিয়া চলছে নিজের নিয়মে। তাদের চলে বা থামায় ওর কিছু এসে যায়না। সেই দৃষ্টি যা বিয়াল্লিশ দিন ধরে ওর সঙ্গ ছাড়েনি। বিয়াল্লিশ দিন আমার ঝকঝকে, বুদ্ধিদীপ্ত মেয়েটার মুখে কেউ একগাদা কালি লেপে দিয়েছে যেন।

বন্দে ভারত এনজিপি ঢুকে ব্রেক কষে একেবারে নিথর হয়ে যাওয়া অবধি ঐভাবেই জানলার বাইরে একভাবে তাকিয়ে ছিল পলা। আমি ধীরপায়ে লাগেজপত্র গুছিয়ে নিচ্ছিলাম। অন্যসব যাত্রীরা কলতানে মুখর হয়ে ট্রেন থামার বহু আগেই গেটের মুখে দাঁড়িয়েছিল। আমি ওর মাথায় হাত রাখলাম, “ওঠ, মা! আমরা এসে গিয়েছি।”

আমার কথা কানে পৌঁছতেই যেন সম্মোহন কাটলো ওর। আমি বুঝতে পারি ভাবনা থেকে বাস্তবের জগতে বড়ো কষ্ট করে নামতে হচ্ছে ওকে--- যেমন আজকাল প্রায়শই হয়। কী অপূর্ব সারল্যে চোখে পলক পড়ে পরপর দুবার। ঘাড়টা অল্প এদিক ওদিক ঘুরিয়ে বুঝতে চায় কোথায় এসেছে, কেন এসেছে। আমি বুঝতে পারি এখন ওকে। এই বিয়াল্লিশ দিনে ওর প্রতিটা চলন, দৃষ্টি, কথা বলা বা না বলা--- সবকিছু মুখস্ত হয়ে যেতে শুরু করেছে আমার। সতেরো বছর না জানার ইতিহাসের সামনে এই বিয়াল্লিশটা দিন লড়ে চলেছে। 

এনজিপি নেমেই কল করলাম ট্রাভেল এজেন্টকে। গাড়ি তৈরীই ছিল। দুজনের সামান্য লাগেজ ডিকিতেই ধরে গেল। ড্রাইভারকে লাগেজ তুলতে হেল্প করার সময় থমকে গেলাম। ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠেছিল কী? শরীর থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল জমাট একটা শ্বাস? রুমি থাকলে কোনোভাবেই ডিকিতে লাগেজ ধরে যেত না। গাড়ি ছেড়ে দিল। কিছুক্ষণের মধ্যেই জলপাইগুড়ি শহর ছাড়িয়ে শীতের বৃষ্টিভেজা উত্তরবঙ্গ জীবন্ত হয়ে উঠল।

যোধপুর পার্কের সুবিশাল ডুপ্লেক্স ফ্ল্যাটটায় আমি আর পলা থাকি কার্যত ভাড়াটের মতো। ওর ঘরে ওর দিন কেটে যায়, আমার ঘরে আমার। শুধু কোথাও বেরোনোর সময় একে অপরের দরজায় নক করে একবার জানিয়ে যাওয়ার একটা প্রথা নিজেদের অজান্তেই কীভাবে যেন তৈরী হয়ে গিয়েছে। এক একদিন বেখাপ্পা সময়ে ঘুম থেকে উঠে মনে করতে পারতাম না পলা বাড়িতে আছে নাকি নেই। সারা ঘর পাগলের মতো ডেকে বেড়ানোর পর মনে পড়তো ও জানিয়ে গিয়েছিল যে বেরোচ্ছে। 

দুজনেই শুধু জানতাম অন্য ঘরে আরেকজন আছে। দুটো মানুষ যাদের শরীরের রক্ত মিলে যায়, তারা দিনের পর দিন বাস করেছে অচেনা পড়শীর মতো। ত্রিশ ফুটের লম্বা ডাইনিং স্পেসটা টপকে এক ঘর থেকে অন্য ঘরে যাওয়া হয়ে ওঠেনি। চেষ্টা করেছি, অনেকবার। ওর দরজার সামনে ঠায় দাঁড়িয়ে থেকেছি মিনিটের পর মিনিট। তর্জনী আর মধ্যমা উঠেছে, কাঠের দরজার খুব কাছে গিয়ে নামিয়ে এনেছি হাত। প্রথম দিকে খাবার বেড়ে দরজা খুলে “খেতে আয়...” বলে ডাকতাম। দিনে বার তিনেক এই অজুহাতে দেখা তো হত। তারপর একদিন খাবার বাড়তে গিয়ে দেখলাম পলা নিজের খাবার নিজেই বেড়ে নিয়ে ওর রুমে চলে গিয়েছে। 

জানলার বাইরে থোকা থোকা মেঘ ঝুলতে থাকা সবুজ পাহাড়ের চূড়াগুলো দেখতে দেখতে আমার সেদিনের কথা মনে পড়ছিল যেদিন সমীর এসেছিল বাড়িতে। দশ মিনিট বাড়িতে থেকেই যা বোঝার বুঝে গিয়েছিল ও। ছাদে সিগারেট খেতে খেতে বলল, “শোন, বিষয়টা হাতের বাইরে বেরিয়ে যাওয়ার আগে সমাধান কর। নিজে দুটো সন্তানের বাবা হিসেবে বলছি তোকে, এই দুরত্বটাকে চেপে বসতে দিসনা তোদের মধ্যে। এখনো সময় আছে। এরপর দেরি হয়ে গেলে মনের ভেতর জমা জিনিসগুলোর ওজন এতো বেশি হয়ে যাবে, যে শত চেষ্টা করেও উপড়ে ফেলতে পারবি না। সারাজীবনের মতো মেয়েকে হারিয়ে ফেলবি।”

“আমি তো চেষ্টা করছি রে, সমীর। আমি আর কী করব বল ?” নিজেকে ভীষণ অসহায় লাগছিল সেদিন। 

আমার কথার সরাসরি উত্তর না দিয়ে সমীর বলেছিল, “পলা খুব ত্রুশিয়াল একটা বয়েসে আছে রে। এই বয়েসে বাবা-মায়ের ব্যাপারে যে ইম্প্রেশন তৈরী হয়, সেটা বহুদিন অবধি পাল্টায় না।” একটু থেমে যোগ করে, “তুই একটা কাজ কর। তোরা দুজনে মিলে কোথাও একটা ঘুরে আয়। টিকিট, হোটেল নিয়ে চিন্তা করিসনা। ওসব আমি ম্যানেজ করে নেব।”

“কী যে বলিস না তুই! পলা আমার সাথে এক টেবিলে খেতে বসতে চায়না সমীর, আর ও নাকি আমার সাথে ঘুরতে...”

“ওটা আমার আর শতরূপার উপর ছেড়ে দে। পলাকে তো আর আজ দেখছি না। তুই না হয় এতো বছর ছিলিনা, আমরা তো ছিলাম। পলা এখনো ওর সমীরকাকার কথা ফেলতে পারবে না, দেখিস।”

“দ্যাখ চেষ্টা করে।”

কানে হেডফোন গুঁজে সিটের উপর গা এলিয়ে দূরের পাহাড়গুলোর দিকে তাকিয়ে আছে পলা। বাইরের বৃষ্টিটা ঝিরিঝিরি থেকে এবার বেশ নিয়মিত হয়ে উঠেছে। এনজিপি থেকে তাবাকোশি ঘন্টা দুয়েকের রাস্তা। আমরা অবশ্য যাচ্ছি তাবাকোশি  পেরিয়ে।

পলার জীবনে পাহাড় খুব বেশি দেখা হয়নি বলে সমীর পাহাড়েই যেতে পরামর্শ দিয়েছিল। বলেছিল, “শীতকালে যাচ্ছিস, দার্জিলিং শহরে খুব ভিড় পাবি। তোদের দুজনেরই এখন শান্তি দরকার। তাই কোনো তুলনায় নিরালা জায়গায় যাওয়াই ভালো। ইন্টারনেটে একটা খুব ভালো হোম স্টে খুঁজে পেয়েছি বুঝলি তো। নামেই হোম স্টে, আসলে একটা বিরাট বাংলো। একজন রিটায়ার্ড এংলো ইন্ডিয়ান ব্যবসায়ীর বাংলো। জায়গাটা তাবাকোশি আর জোড়পোখরির মাঝামাঝি। বুক করে দিচ্ছি। ক’টাদিন শান্তিতে কাটিয়ে আয়।”

ভেবে দেখলাম, এরকম জায়গা হলে তাবাকোশি আর জোড়পোখরি দুটোই ঘুরে আসা যাবে। তাছাড়া দার্জিলিংও ঘন্টা দুয়েকের রাস্তা। তাই একদিন ম্যালটাও ঘুরিয়ে আনতে পারব পলাকে।  

পরদিন সন্ধ্যাবেলা আমার দরজায় নক করল পলা,

“ফ্রি আছো? কথা আছে।”

“হ্যাঁ, বল।”

“তুমি এসব কী শুরু করেছ বোলো তো ? সমীর আঙ্কল ফোন করেছিল। কেন করছো তুমি এসব ?”

“দ্যাখ, আইডিয়াটা সমীরের। আর আমারও আপত্তি সেভাবে...”

“কিন্তু আমার আপত্তি আছে। একবারও আমার সম্মতি নেওয়ার কথা মনে হয়েছে তোমার ?”

“তোকে না জিজ্ঞেস করে কিছুই করতাম না রে, মা।”

“বাবা! জীবনটা ম্যাজিক নয়।” পলার গলায় ক্রমেই একটা মরিয়া ভাব ফুটে উঠছিল সেদিন। “আট-টা বছর তুমি জাস্ট কোথাও ছিলে না। না আমার জীবনে, না মায়ের জীবনে। তোমার রিসার্চ, তোমার ডিগ্রি, তোমার স্টেটসে লাখটাকার চাকরি, নাম, যশ, খ্যাতি--- এসবের মধ্যে আমরা কোথায় ছিলাম বলতে পারো ?”

একেবারে চুপ করে গিয়েছিলাম সেদিন আমি। বলার মতো কী-ই বা ছিল আমার সেদিন ? সেদিন আমার শুধুই শোনার পালা, পলা বলে চলেছিল, “যখন রিসার্চ প্রজেক্টটা নিয়ে তুমি দেশ ছেড়ে চলে গিয়েছিলে, মাত্র আট বছর বয়েস ছিল আমার। আমার পুরো এডোলেসেন্সে, আমার বড়ো হওয়ার সময়টা কোথাও তোমাকে পাইনি আমি। শুধু সপ্তাহে একটা ভিডিও কল, আর বছরে একবার দু-সপ্তাহের জন্য দেখা। ব্যাস! তোমার কোনো ধারণাও আছে ওই আট থেকে এই সতেরো অবধি সময়টা একটা মানুষের বড়ো হওয়ার জন্য কতটা জরুরি ?” ওর গলার মধ্যে ভাঙতে থাকা স্বরটা চিনতে অসুবিধা হয়নি আমার।

“শুধু মাসের শেষে কাড়ি কাড়ি টাকা ঢুকে যেত মায়ের একাউন্টে। সেই টাকায় এই এতবড়ো ফ্ল্যাট, হাজারটা ডিজাইনার গয়না, দামী ফোন, দশটা বিখ্যাত ব্র্যান্ড্রের ব্যাগ, তাক ভর্তি শ্যানেল! টাকা টাকা টাকা--- আমার দমবন্ধ লাগে বাবা। নিজের দায়িত্ব না নেওয়া, নিজের অনুপস্থিতিটাকে টাকা দিয়ে ঢাকার চেষ্টা করে গিয়েছ আটটা বছর। আটটা বছর একা হাতে আমাকে মানুষ করেছে মা। তুমি জানতেই পারলে না, কখন মেয়েটা এইটুকু থেকে এতো বড়ো হয়ে গেল। আজকে সেই মা চলে গিয়েছে বলে, তুমি যদি ভাবো তুমি সেই জায়গাটা পূরণ করতে পারবে...” আর কথা বলতে পারেনি  পলা। ডুকরে কেঁদে উঠেছিল। আমি এগিয়ে গিয়ে ওর মাথাটা বুকে জড়িয়ে ধরতে গিয়েছিলাম, কিন্তু ও হালকা হাতে সরিয়ে দিল আমাকে। কান্নার দমক সামলাতে সামলাতে বলেছিল, “তুমি পারবে না বাবা। তুমি পারবে না।”

চোখ বন্ধ করলেই এখনো সেই “তুমি পারবে না বাবা...” কথাটা কানের মধ্যে প্রতিধ্বনিত হতে থাকে আমার। চোখ খুলতে দেখলাম একটা পেল্লাই দোতালা বাংলোর সামনের মোরাম বিছানো রাস্তায় আমাদের গাড়িটা ঢুকছে। এসে পড়েছি। গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়াতেই সত্যিই অবাক হয়ে গেলাম। চারপাশটা সত্যিকার অর্থেই সিনেমার সেট মনে হচ্ছে। রাস্তার নিরবচ্ছিন্ন বৃষ্টি কোথায় হাওয়া হয়ে গিয়েছে। ঝলমলে রোদ এসে পড়ছে পুরো বাড়িটা জুড়ে। বাড়িটার তিনদিক জুড়ে ঘিরে রয়েছে পাহাড়। একটা পাহাড়ের ঢাল কী অবলীলায় মিশে গিয়েছে অন্য পাহাড়ের গায়ের মধ্যে। সকালের আলোয় তাদের সবুজ শরীর ঝলমল করছে। চতুর্থ দিকটি জুড়ে চুপটি করে বসে রয়েছে শান্ত, স্নিগ্ধ পাহাড়ি জনপদ। তবে সেই জনপদকে এখান থেকে এতটাই দূরে যে খেলনা শহরের মতোই লাগে। 

প্রাথমিক নান্দনিকতা কাটতে খেয়াল হল, এই বাংলোটা মূল জনপদ থেকে রীতিমতো বিচ্ছিন্ন। বাংলোর পিছনেও রাস্তা নয়, ছোটোখাটো একটা জঙ্গল আছে। এই ঝলমলে সকালের রোদ চলে গেলে, রাতের অন্ধকার নামলে বিষয়টা এতটা স্বস্তিদায়ক থাকবে বলে মনে হল না।  

চাকর এসে আমাদের একতলার বসার ঘরে নিয়ে গেল। মালপত্র সে-ই সব তুলে দেবে আমাদের রুমে। পলাকে জলটল খাইয়ে আমি চারপাশটা একটু ঘুরে দেখছিলাম। বেশ দামি সব কাঠের আসবাবপত্র। মালিক যে শুধু ধনীই নন, সঙ্গে রুচিশীলও তাতে কোনো সন্দেহের অবকাশই নেই। দেওয়াল জুড়ে বিশাল বিশাল পেন্টিং, দেয়ালের প্রতিটা কোনায় রাখা অপূর্ব কিছু ভাস্কর্য।

একটু পরেই ঘোরানো সিঁড়ি দিয়ে নেমে এলেন যে ভদ্রলোক, তাকে দেখে ভারতীয় কম, ইউরোপিয়ান বেশি মনে হয়। কাঁধ থেকে পা অবধি ঘন কালো জোব্বা, ব্যাকব্রাশ করা চুল, অতিরিক্ত ফর্সা গায়ের রং, নিখুঁত ভাবে কামানো গাল। এক ঝলক দেখলেই মনে হয়, হাতে একটি লম্বা লাঠি হলেই সহজেই যে কোনো উনিশ শতকের ইউরোপীয় ডিউকের চরিত্রে বসিয়ে দেওয়া যায়। বয়েস পঞ্চান্নর আশেপাশেই হবে বলে মনে হল। 

“হ্যালো, মিস্টার মিত্র। আই আম লুসিফেন ডিসুজা। ওয়েলকাম টু মাই মাইজারলি ফেসিলিটিজ।”

আমি নমস্কার করতে গিয়েও, হ্যান্ডশেক করে ফেললাম। মজা করেই বললাম, “থ্যাঙ্ক ইউ স্যার। পার্ডন মি ব্যাট ইফ দিস ইজ ইউর মাইজারলি ফেসিলিটি, আই উড লাভ টু নো দা রিচ ওয়ান।”

হো হো করে হেসে উঠলেন ডিসুজা। বাংলায় বললেন, “আরে না না, আসলে সারাজীবন চুটিয়ে বিজনেস করেছি। দিল্লি, গুজরাট, ব্যাঙ্গালোর, চেন্নাই--- ইউ নেম ইট--- দেশের প্রায় সব বড়ো শহরেই অনেকদিন করে থেকেছি। একাধিক কোম্পানির অংশীদার ছিলাম। আর স্বভাবে আমি বরাবরই বেশ কঞ্জুসই  বলতে পারেন। তাই আর্লি রিটায়ার করার পরও হাতে ভালোই টাকা জমেছিল। এই বাংলোটা ছিল এক প্রবাসীর। আইরিশ। সে এদেশ ছেড়ে পাকাপাকিভাবে ডাবলিনে শিফট করবে ঠিক করে বিক্রি করতে চাইছিল। সস্তায় পেলাম, কিনে নিলাম।”

ভদ্রলোকের কথা বলার মধ্যে কেমন যেন একটা ক্লান্তির ছাপ। বললাম, “বাহ্! তা ভালোই করেছেন। নাহলে আমাদের বাপ্- মেয়েকে হোটেল খুঁজতে হত। বুঝতেই তো পারছেন এই সিজিনের সময়ে দার্জিলিঙে কী রাশ চলে।”

হঠাৎ লক্ষ্য করলাম ডিসুজার মাথাটা একটু যেন নীচে ঝুঁকে এল। একটা অসহায় হাসি ফুটে উঠলো ওনার ঠোঁটের কোনায়। “কী-ই বা লাভ হল কিনে ? বিরাট প্রাসাদে একাকী দৈত্য হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছি।” বলতে বলতে ডিসুজার দৃষ্টি পেছন দিকে ঘুরে গেল। ওনার দৃষ্টি অনুসরণ করে তাকালাম পিছনের দেওয়ালে। একটা লার্জার দ্যন লাইফ ফটোগ্রাফ--- একটি ফুটফুটে মিষ্টি মেয়ে তাকিয়ে আছে আমাদের দিকে। 

ডিসুজা একই রকম মাথা ঝুঁকিয়ে বললেন, “আমার মেয়ে...টিউলিপ। যখন চলে গেল, তখন ওর বয়েস আপনার মেয়ের মতোই হবে।”

“আই আমি এক্সট্রিমলি সরি, মিস্টার ডিসুজা। এতো অল্প বয়েসে... কী হয়েছিল ?”

“মিস্টার মিত্র, ইউ রিমেম্বার দ্যাট স্টোরি অফ বুদ্ধ?” ডিসুজার অসহায় হাসিটা আরো অসহায় হয়ে উঠছে। “এমন কোনো ঘর কী আছে যেখানে মৃত্যু প্রবেশ করেনি কখনো? আমার মনে হয় কী জানেন, কোভিড ১৯ আমাদের নতুন করে একবার এই শিক্ষা দিয়ে গেল।”

আমি কী বলব খুঁজে পাচ্ছিলাম না। পলার মুখের দিকে তাকালাম, দেখলাম ও-ও আমার দিকেই তাকিয়ে রয়েছে।

“আমার শুনে খুবই খারাপ লাগছে মিস্টার ডিসুজা। আপনার স্ত্রী আঘাত সামলাতে পেরেছেন ?”

ডিসুজার ঝুঁকে থাকা মাথা দুবার ডানদিক থেকে বা-দিকে নড়ল। “আকিউট ডিপ্রেশন, ওষুধ ডাক্তার সব করেছিলাম। লাভ হয়নি। শেষটায় একদিন এখান থেকে কিলোমিটার খানেক দূরে খাদে ঝাঁপ দিয়ে... আমাকে বলেছিল, আজ অনেকদিন পর ঘুরতে যেতে ইচ্ছে করছে। আমি সঙ্গে যাবো বলেছিলাম, জানেন ? শুনলো না।” গভীরভাবে শ্বাস টানেন ডিসুজা, “মেয়ে চলে গিয়েছিল একুশে, মা বাইশে।” তর্জনী দিয়ে চোখ মোছেন ডিসুজা।

“যাই হোক, ছাড়ুন আমার কথা। আপনারা বলুন... এই দ্যাখো, তোমার সাথে তো আলাপ করাই হয়নি মিস।”

“হ্যালো আঙ্কল। আমি পলা। পলা মিত্র।” মরা হাসি ঠোঁটে ঝুলিয়ে বলে পলা। 

“বাহ্! মিষ্টি নাম। তা বাবা-মেয়ে ব্যাগপত্র নিয়ে বেরিয়ে পড়া হয়েছে যে ? মা বাদ ?”

পলা এতক্ষন তাকিয়ে ছিল ডিসুজার দিকে। এবার ধীরে ধীরে বারান্দার রেলিং বেয়ে উপরে উঠতে থাকা লতাটার দিকে চোখ ফিরিয়ে নিল। 

“মিস্টার ডিসুজা, আপনি একটু আগে বলছিলেন না বুদ্ধের বলা গল্পটির কথা। এমন কোনো ঘর কী আছে যেখানে কোনোদিন মৃত্যু প্রবেশ করেনি ?”

“ওহ মাই গড! ডোন্ট টেল মি!”

“ইয়েস, মিস্টার ডিসুজা।”

ডিসুজা ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ান, আমার দিকে এগিয়ে আসেন। স্বভাবতই আমাকেও উঠে দাঁড়াতে হয়। উনি হাত রাখেন আমার কাঁধে, আর সঙ্গে সঙ্গে সেই কথাটা আরো বেশি করে মনে হল যেটা ওনাকে দেখেই মনে হয়েছিল। ভদ্রলোককে বেজায় ক্লান্ত লাগছে, কাঁধে রাখা হাতটাও অল্প অল্প কাঁপছে।

“মিস্টার মিত্র, ফরম্যাল সান্ত্বনা দিচ্ছি না। আই ক্যান ফিল হোয়াট ইউ আর গোয়িং থ্রু।”

আমি ধীরে ধীরে মাথা নাড়ি।

আমাদের জন্য দোতালায় পাশাপাশি দুটো ঘরের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ডিসুজা থাকেন এক তলায়। দোতালায় বাকি সবকটা ঘরই দেখলাম তালাবন্ধ। ডিসুজার চাকর একটু পরেই আমাদের জন্য ব্রেকফাস্ট নিয়ে এল। এখন প্রায় এগারোটা বাজছে বলে ব্রেকফাস্ট রুমে দেওয়া হল। ভদ্রলোক কপট হুকুমের সুরে হেসে বললেন, “দেখুন, বাপ্-মেয়েকে কিন্তু এই একলা বুড়োর সঙ্গে একটু সময় কাটাতেই হবে। অতএব ব্রেকফাস্ট লাঞ্চ ডিনার যেটাই করবেন, রুমে হবে না।”

আমি সহাস্য সম্মতি জানালাম।

গাড়ি বলাই ছিল। চান সেরে বেরিয়ে পড়লাম দুজনে তাবাকোশির উদ্দেশ্যে। ঘোরা, টুকটাক খাওয়া দাওয়ার মাঝে দুটো একটা কথা বলছিল পলা। আমি এটা সেটা বলে ওকে হাসানোর চেষ্টা করছিলাম। ফেরার সময় ধীরে ধীরে ও নিজে থেকেই অনেক কথা বলতে শুরু করল। তারপর কখন যেন ঝুপ করে আমার বুকে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়ল। চোখের কোনটা চিকচিক করে উঠছিল আমার। 

গাড়ি যখন বাংলোর কাছাকছি চলে এসেছে, দেখলাম ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নেমেছে। ভাগ্যিস ছাতাটা সঙ্গে ছিল। পলাকে বাঁচিয়ে কোনোমতে বাংলোর দাওয়ায় এসে উঠলাম। দোতালায় যাওয়ার পথে ডিসুজাকে কোথাও দেখতে পেলাম না। চাকরটাকে জিজ্ঞেস করতে বলল তার মনিব নাকি ঘুমোচ্ছে। একটু অবাকই লাগলো। আটটা বাজে। এরকম অসময়ে কে ঘুমোয় ?

আমরা দুজনে ফ্রেশ হয়ে চেস খেলছিলাম, অপেক্ষা করছিলাম কখন ডিনারের জন্য ডাকা হবে। পাহাড়ে রাত খুব দ্রুত নেমে আসে। আমাদের রুমের ভারী পর্দার পিছনের শার্শিতে যে ছবি দেখতে পাচ্ছি, তাতেও সেই নিয়মের কোনো ব্যতিক্রম নেই। একনাগাড়ে বৃষ্টি হয়ে চলেছে, থোকা থোকা কুয়াশা এসে জমাট বাঁধছে জানলার শার্শিতে। আর এমন সময়ে হঠাৎ দরজায় কড়া নাড়ার আওয়াজ। খুলে দেখি চাকরটা ডিনারের ট্রে হাতে দাঁড়িয়ে।

আমরা দুজনেই ভুরু কুঁচকে একে অপরের দিকে তাকালাম। আজব ব্যাপার! ভদ্রলোক নিজেই ডিনারের জন্য ইনভাইট করে এখন রুমে ডিনার পাঠিয়ে দিয়েছেন ? 

“তোমার মনিব যে বলেছিলেন আমরা একসাথে ডিনার করব ?”

চাকরটার মুখে একটা ইতস্তত ভাব। একটু কিন্তু কিন্তু করে বলল, “ইয়ে মানে, বাবু এখনো ঘুমোচ্ছেন। আপনারা খেয়ে শুয়ে পড়ুন।”

ডিনার শেষ করে, লেপ ঢাকা দিয়ে পলাকে ভালো করে শুইয়ে দিলাম। ঘর থেকে বেরোনোর আগে বলে দিলাম কোনো দরকার লাগলেই যেন আমাকে সঙ্গে সঙ্গে ডাকে। 

পলার দরজা ভেজিয়ে বাইরে এলাম। দোতালাতেও সবকটা ঘরের মধ্যিখানে একটা বেশ বড়ো ডাইনিং স্পেস আছে। চাকরটা সেটার সবকটা আলো নিভিয়ে কেবল একটা হালকা বেগুনি আলো জ্বালিয়ে দিয়ে গিয়েছে। বৃষ্টির দাপটটা আরো বেড়েছে। ডাইনিং স্পেসটার পিছনের কাচের শার্শির উপর তার শব্দ ক্রমাগত জোরদার হচ্ছে। ঘন কুয়াশা মেখে ঝাপসা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে শার্শিগুলো। সেটার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে একটা সিগারেট বের করে ফস করে দেশলাইটা জ্বালাতেই, সেই হলুদ ছোট্ট শিখার আলোটা গিয়ে পড়ল শার্শির উপর। 

সেই ক্ষণস্থায়ী আলোতে দেখলাম শার্শির কুয়াশা ধীরে ধীরে একটা আকার নিচ্ছে। একটা বৃহৎ, কদাকার পুরুষের মুখ ফুটে উঠছে বলে মনে হচ্ছে। দুটো জ্বলন্ত কয়লার মতো চোখ স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি আমি। আমি কী সম্মোহিত হয়ে গিয়েছি ? ঘরে কোথাও বাইরের ঠান্ডা হাওয়া ঢোকার উপায় নেই, কিন্তু আমার সারা শরীরে কাঁটা দিয়ে উঠছে। মুখটা আরো স্পষ্ট হয়ে উঠছে ক্রমেই। দুটো টকটকে লাল ঠোঁট চওড়া হয়ে একটা সাক্ষাৎ শয়তানের হাসি ফুটে উঠছে মুখটায়।

হাতে দেশলাইয়ের আগুনের ছ্যাঁকা লাগতেই চমকটা কেটে গেল। হাতটা দু বার ঝেঁকে নিয়ে শার্শিটার দিকে তাকালাম। কোত্থাও কিছু নেই। বুকের মধ্যে ধড়াস ধড়াস করছে। ব্যাপারটা নিয়ে নিশ্চিত হতে পায়ে পায়ে এগিয়ে গেলাম জানলার কাছে। বেগুনি নাইটল্যাম্পের রেখাটা যেখানে এসে পড়েছে, ঠিক সেখানটায় মুখ লাগিয়ে দেখার চেষ্টা করলাম।

দু মিনিট, তিন মিনিট, পাঁচ মিনিট কেটে গেল। শার্শির উপর বৃষ্টির ছাঁট ছাড়া কিচ্ছু দেখতে পেলাম না। চলে আসবো ভাবছি, এমন সময়ে হঠাৎ আবার ভেসে উঠলো সেই বীভৎস মুখটা। আমার মুখের ঠিক উপরে শার্শিতে সেঁটে দাঁড়িয়ে আছে সেই মুখ। তার রক্তিম চোখদুটো ঠিক আমার চোখের উপর। ব্যাপারটা হতে লাগলো ঠিক এক সেকেন্ড, তক্ষুনি কাছেই কোথাও সারা আকাশ আলোকিত করে বিদ্যুৎ চমকালো, আর সেই উজ্জবল আলোয় আমি স্পষ্ট দেখলাম--- ওই বীভৎস্য মুখটার লাল ঠোঁটের নিচ থেকে বেরিয়ে এসেছে দুটো ফ্যাটফ্যাটে সাদা, তীক্ষ্ণ, লম্বা স্বদন্ত।

আমি ছিটকে পাশের চেয়ারটায় পড়ে গেলাম। পড়ি কী মরি করে উঠে টিউবলাইটটা জ্বালালাম। শার্শির দিকে তাকিয়ে দেখি কিচ্ছু নেই। একটু দম নিয়ে সাহস করে ধীরে ধীরে খুলে ফেললাম শার্শিটা। উপরে, নীচে তাকিয়ে দেখলাম। কোথাও কিচ্ছু নেই।

মাঝরাত্রে একটা তীক্ষ্ণ চিৎকারে ছিটকে উঠে বসলাম বিছানার উপর। এক মুহূর্ত সময় লাগলো বুঝতে চিৎকারটা আসছে পাশের ঘর থেকে। এক ঝটকায় লেপ সরিয়ে ছুটে বেরিয়ে এসে পলার ঘরে ঢুকে পড়লাম। তাড়াতাড়ি লাইট জ্বালালাম।

পলার গা থেকে লেপটা খসে পড়ে গিয়েছে খাটের নীচে। আর পলা একটা অদ্ভুত ভঙ্গিতে হাত পা বেঁকিয়ে পড়ে আছে বিছানায়। ওর ডান হাতটা খাট থেকে প্রায় ঝুলছে। ঘাড়টা বিপজ্জনক ভাবে একপাশে কত করা। চোখদুটো আধবোজা। 

“পলা, কী হয়েছে বোলো, মা ?”

আমি তাড়াতাড়ি খাটে এসে ওকে খাট থেকে তুলে বুকে জড়িয়ে ধরলাম। দু হাতের মধ্যে ওর মুখটা ধরে বললাম, “কী রে ? ঘুমের মধ্যে ওরকম চিৎকার করে উঠলি কেন ? হাত, পা, ঘাড় বেঁকিয়ে শুয়েছিলি। কী হয়েছে ? দুঃস্বপ্ন দেখেছিস ?”

পলা ঘুমের ঘোরেই কী যেন বিড়বিড় করে চলেছে। চোখদুটো এখনো আধবোজা। ঘাড়টা ডানদিক থেকে বা দিকে দুলছে। একটু পরেই আমার বুকের উপর মাথা দিয়ে পড়ে গেল। বুঝতে পারছি ঘুমের মধ্যে বড়ো কোনো শক পেয়েছে বেচারি। ওকে এঘরে একা ফেলে যেতে মন চাইছে না। 

উঠে গিয়ে দরজাটা লাগলাম। গ্লাসে জল ঢেলে ওকে ধরে একটু একটু করে খাইয়ে দিলাম। আলো নিভিয়ে, আস্তে করে ওকে শুইয়ে, আমিও শুয়ে পড়লাম ওর পাশে। মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে দিতে গভীর ঘুমে ডুবে গেল পলা। কিন্তু আমার চোখে ঘুম এল না। দূরের কালো কালো জঙ্গলের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে মনের ভিতরে ভীষণ অস্বস্তি হতে থাকল আমার। এসব কী হচ্ছে ? প্রথমে শার্শিতে ওই মুখ আর তারপর পলার চিৎকার, ওর এরকম নেতিয়ে পড়া অবস্থা! এমন কিছু কী ঘটছে আমাদের সাথে, যেটা নিয়ে আমাদের কোনো ধারণাই নেই ?

সকালবেলা পলার ঘুম ভাঙলো ধুম জ্বর নিয়ে। গায়ে হাত দিয়েই বুঝতে পারলাম বেশ টেম্পারেচার আছে। ডিজিটাল থার্মোমিটারটা সঙ্গেই রাখি। চেক করে দেখি যা ভেবেছি তাই। প্রায় একশো তিন।  ডিসুজা ব্রেকফাস্টের জন্য ডাকতে এসেছিলেন। কালকের জন্য অনেক 'সরি টরি' বলে বললেন কাল নাকি খুব ক্লান্ত ছিলেন। কথাটা অবশ্য ভুল না। আজ সকাল থেকেই ওনাকে একেবারে তরতাজা লাগছে। বয়েস যেন দু-তিন বছর কমে গিয়েছে এক রাত্রেই। পলার জ্বরের কথা বলে ব্রেকফাস্ট ঘরে দিয়ে দিতে বললাম। উনি বললেন, “সে আমি রুমে পাঠিয়ে দিচ্ছি। কিন্তু আপনার মেয়েকে তো ওষুধ দিতে হবে। দাঁড়ান, আমি একটা ক্যালপল পাঠিয়ে দিচ্ছি চাকরির হাতে।”

ব্রেকফাস্টের পর ডিসুজার ক্যালপল পলাকে খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিলাম। এক রাতের জ্বরেই বেচারা একেবারে বিছানার সঙ্গে মিশে গিয়েছে। কীকরে যে জ্বর এল? কাল তো এক মিনিটেরও কম ভিজেছে বৃষ্টিতে। আজ একেবারে উঠে বসতেই পারছে না। 

আমি নীচে নেমে এসে ডিসুজার সঙ্গে খানিকক্ষন গল্প করলাম। একটু বাদে উনি কোথায় একটা বেরিয়ে গেলে কী করি, কী করি করে ওনার লাইব্রেরিটা একটু ঘাঁটা ঘাঁটি করতে লাগলাম। নানারকম বইয়ের মাঝে একটা মোটা বাঁধাইয়ের ডাইরিতে চোখ আটকে গেল। উল্টে পাল্টে নেহাতই রোজকার জমা খরচ হিসাবের ডাইরি বলেই মনে হল। তবে চোখ আটকালো ডাইরির প্রচ্ছদটায়। বেশ কায়দা করে, কারসিভে “B & D” অক্ষরদুটো লেখা রয়েছে। এই লোগোটা ভীষণ চেনা ঠেকছে আমার, কী জানি কেন!

বিকেল অবধি পলার জ্বর খুব একটা কমল না। একশো আড়াই মতো রয়েছে এখনো। আমার হাউস ফিজিশিয়ানকে ফোন করে বললাম পুরো ব্যাপারটা। উনি হোয়াটস্যাপে কয়েকটা ওষুধের নাম পাঠিয়ে দিলেন। আমি পলাকে বলে তাড়াতাড়ি ওষুধের দোকান খুঁজতে বেরিয়ে পড়লাম।

বাংলোটা এতটাই বিচ্ছিন্ন পুরো জনপদ থেকে যে অনেকটা হাঁটতে হল ওষুধের দোকান খুঁজে পেতে। ওষুধ কিনে যখন ফিরছি তখন প্রায় সন্ধে হবো হবো। চারপাশে কুয়াশার আস্তরণ ভেদ করে প্রায় কিছুই দেখা যাচ্ছে না। কদাচিৎ এক দুজন সারা শরীর উইনচিটারে ঢেকে পেরিয়ে যাচ্ছে। টর্চ জ্বেলে ধীর পায়ে হাঁটছি, হঠাৎ আমার ষষ্ঠেন্দ্রিয় আমাকে ভীষণ সজাগ করে দিল। কেউ যেন আমাকে বলে দিল যে আমার এক্ষুনি পিছন ফিরে তাকানো দরকার। আমি পিছন ফিরতেই একটা মেয়ের মুখ আমার মুখের উপর একেবারে হুমড়ি খেয়ে পড়লো। 

“বিওয়ার! বিওয়ার!”

মেয়েটি আমার কাঁধের এতো কাছে এসে দাঁড়িয়েছে বুঝতেই পারিনি। আচমকা এই পিছন থেকে আসা আক্রমণে বেসামাল হয়ে স্লিপ করে পড়ে গেলাম খাদের ধারে। আরেকটু হলেই গড়িয়ে যাচ্ছিলাম অন্তহীন অন্ধকারে, কিন্তু তার আগেই মেয়েটির হাত আমার হাতটাকে ধরে এক হ্যাচকা টানে আমাকে সোজাভাবে দাঁড় করিয়ে দিল। আমি ধাতস্থ হওয়ার আগেই আমার কানের কাছ মুখ এনে অসম্ভব ঠান্ডা একটা গলায় ফিসফিসিয়ে বলল, “বিওয়ার অফ দা রেন! বিওয়ার অফ দা রেইন্।”

আমি মুহূর্তের মধ্যে পিছন ফিরেও কাউকে দেখতে পেলাম না। কুয়াশার মধ্যে থেকে বেরিয়ে এসে যেন কুয়াশার মধ্যেই মিলিয়ে গিয়েছে মহিলা।

হাউস ফিজিশিয়ানের প্রেস্ক্রাইব করা ওষুধে পলার জ্বর ধীরে ধীরে কমে এল। কিন্তু তাও রাত্রে ওকে একা ঘরে ঘুমোতে দেওয়া ঠিক হবেনা বলেই মনে হল। মাঝরাতে আবার জ্বর আসতে পারে আর তাছাড়া জানি না কেন একটা তীব্র মানসিক অস্বস্তি হচ্ছে এই বাংলোটাকে ঘিরে। সেদিনের সেই মুখটাকে আমি ভুলতে পারছি না। ওটা কী শুধুই আমার ভ্রম ? যেটাই হোক, পলাকে একা রাখা নিরাপদ বলে মনে হচ্ছে না। 

রাতে ডিনারের পর আমি পলার রুমেই শুতে যাওয়ার আগে ডাইনিং স্পেসে পায়চারি করতে করতে সিগারেট খাচ্ছিলাম। বৃষ্টিটা আবার অঝোর ধারায় শুরু হয়েছে। আজ যেন একটু বেশি ঝোড়ো হাওয়াও বইছে। মিথ্যা বলব না, ডাইনিং স্পেসে এই অপেক্ষার মূল কারণ আমার কালকের ভ্রমকে আরো একবার পরখ করা। আচ্ছা, বিকেলের ওই মাঝবয়েসী মহিলা কী সত্যিই পাগল ? “বিওয়্যার অফ দা রেইন্” মানে? বৃষ্টি থেকে সাবধান হওয়াটা তো খুব স্বাভাবিক একটা ব্যাপার। তারজন্য তো উইনচিটার পড়ে, ছাতা নিয়েই বেরিয়েছিলাম। এতে আবার বলার কী আছে ? আর অচেনা অজানা লোককে গায়ের উপর হুমড়ি খেয়ে পড়ে কেউ এটা বলবেই বা কেন? ঘটনাটা কী আমার কাল রাতের অস্বস্তিটা আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে ?

আধ ঘন্টা কেটে গেল, সেরকম কিচ্ছু হল না। আমি উঠে ঘরে ঢোকার আগে সিগারেটটা স্পেসের কোনায় রাখা ডাস্টবিনটায় ফেলতে গিয়ে একটা অদ্ভুত দৃশ্য দেখলাম। ঘুটঘুটে অন্ধকার নেমে এসেছে বাংলোটার বাগানে। একটা আলোও জ্বলছে না কারণ কারেন্ট চলে গিয়েছে। অন্ধকার এতটাই গাঢ় যে তক্ষুনি পর পর কটা বিদ্যুৎ না চমকালে দৃশ্যটা দেখতেই পেতাম না।

এরকম আকাশ ভাঙা বৃষ্টির মধ্যে ডিসুজা বাগানের ঠিক মাঝখানটায় আমার দিকে পিছন ফিরে, দু'হাত দুদিকে ছড়িয়ে মাথাটা নীচের দিকে গুঁজে দাঁড়িয়ে আছে। মাথায় ছাতা থাকা তো দূরের কথা, ডিসুজা প্রায় উলঙ্গ। একটা আন্ডারওয়ার কেবল লজ্জা নিবারণ করছে। তারা সারাটা শরীর ভিজে যাচ্ছে বৃষ্টির জলে, আর জলধারার মধ্যে থেকে থেকে শরীরের সবকটা পেশী ফুঁসে উঠছে।

লোকটা কী বদ্ধ উন্মাদ ? স্ত্রী-মেয়েকে হারানোর দুঃখে একেবারে পাগল হয়ে গিয়েছে মনে হয়। আমি ঘরে ঢুকে শুয়ে পড়লাম। পলা গভীর ঘুমে ডুবে। আমি আলো নিভিয়ে নাইট ল্যাম্পের ম্লান আলোর দিকে তাকিয়ে থাকলাম। কালকের ওই মুখ, পলার চিৎকার আর আজকের ওই রাস্তার পাগল মহিলা--- এই সবকিছুই কী কাকতালীয়?

রাত তখন কত হবে খেয়াল নেই। আমার ঘুম ভেঙে গেল দুম করে। বুঝতে পারলাম পলা আমার বুকের কাছে সরে এসেছে। কাঁপা কাঁপা দু হাতে আমাকে জাপটে ধরেছে। ওর সারা শরীর ভয়ে থরথর করে কাঁপছে। মুখ দিয়ে একটা গোঙানির মতো আওয়াজ বেরোচ্ছে। “বাবা...” ডাকার মতো ক্ষমতাটুকু নেই ওর।

হঠাৎ করে ঘুম ভাঙলে মানুষের দৃষ্টি আর শ্রবণশক্তি ঠিকভাবে কাজ করতে কয়েক সেকেন্ড সময় নেয়। আমার ক্ষেত্রেও ঠিক তাই হল। কিন্তু ওই কয়েক সেকেন্ডে একটা প্রচন্ড অজানা ভয় যেন আমাকে পঙ্গু করে দিল। আমি অনুভব করলাম বাইরের কুয়াশা কোনো অদৃশ্যপথে ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়েছে। ঘরটা অসম্ভব ঠান্ডা হয়ে গিয়েছে। ঘরের ভেতরের বাতাস ভারী হয়ে আমাদের দুজনেরই শ্বাস নিতে অসুবিধা হচ্ছে।  

এইরকম দমবন্ধকর অবস্থায় পলার দৃষ্টি অনুসরণ করে খাট থেকে তিন ফুট দূরের বিরাট কাচের শার্শিটার দিকে তাকালাম। যেটা দেখলাম তাতে আমার হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া কয়েক সেকেন্ডের জন্য বন্ধ হয়ে গেল। শ্বাস নেওয়াটা প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠল। নিকষ কালো ঘরটার মধ্যে ম্লান লাল নাইটল্যাম্পের আলোটা সোজা গিয়ে পড়েছে শার্শির একটা বিশেষ জায়গায়। ঠিক সেইখানে মাটি থেকে অন্তত ফুট চল্লিশ উঁচুতে বসানো এই শার্শিটার উপর ঝুঁকে পড়ে দাঁড়িয়ে আছে কালকের সেই বীভৎস কদাকার মুখ। সে মুখের নানা জায়গায় অজস্র ক্ষতের দাগ। রক্ত ঝরছে ঠোঁটের কষ বেয়ে। তার লম্বা, দৈত্যাকার কালো জোব্বা পরা চেহারাটা বাতাসে ভাসমান। গনগনে কয়লার মতো লাল দুটো চোখ ভয়ানক লোলুপ একটা দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সোজাসুজি পলার দিকে। যেন ওই চোখ দিয়েই গিলে খাবে ওকে। বিদ্যুতের ঝলকে দেখতে পেলাম মুখগহবরের মধ্যে থেকে দুটো হলদে সাদা স্বদন্ত বেরিয়ে আসছে, বাড়তে বাড়তে চোয়ালের নীচে এসে শেষ হল। সাক্ষাৎ নরক থেকে শয়তান উঠে এসেছে যেন। 

ঠিক তখনই শার্শির উপর আছড়ে পড়ল দশটা তীক্ষ্ণ নখের দুটি থাবা। একটা জান্তব আক্রোশের গর গর শব্দ আকাশ বাতাস ভরিয়ে তুলেছে। প্রবল আক্রোশে থাবার আঘাতে, নখের আঁচড়ে কাঁচের শার্শি ভেঙে দেবার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে কদাকার জীবটা। মাথা দিয়ে ঠুকতে শুরু করেছে কাঁচটাকে। পলকা শার্শি কতক্ষন আটকে রাখতে পারবে এই নরকের জীবকে ? 

পলা ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে জাপটে ধরেছে আমাকে। আমি ওই শয়তানের থেকে চোখ সরিয়ে ওকে বলতে যাচ্ছিলাম, “ভয় নেই, মা, যতদিন বাবা আছে ভয় নেই।” কিন্তু ঠিক তখনই আমার নজর পড়ল পলার ডানদিকের ঘাড়ে। ওর একপিঠ চুলের আড়াল ঠেলে দেখা যাচ্ছে দুটো লাল গভীর ক্ষতচিহ্ন। তাদের মধ্যে দূরত্ব দেখে এক ঝলকে কামড়ের দাগ বলেই মনে হয়।

ওদিকে কাচের উপর নখরের আঁচড় তখন চরম জায়গায় গিয়ে পৌঁছেছে। আর বড়োজোর এক মিনিট এই আক্রমণ আটকাতে পারবে কাঁচটা। হঠাৎ কাল রাতের কথা মনে হতেই একটা আইডিয়া মাথায় এসে গেল। কোনোমতে টি টেবিল থেকে আমার জোরালো টর্চটা তুলে জীবটার মুখের দিকে তাক করে জ্বালিয়ে দিলাম। অন্ধকার ভেদ করে তীব্র আলোর একটা চওড়া রেখা গিয়ে পড়ল ঠিক ওর মুখের উপর। সঙ্গে সঙ্গে একটা নারকীয় তীব্র চিৎকার করে সেটা ছিটকে গিয়ে পড়ল নীচে। আমি এক লাফে খাট থেকে নেমে রুমের আলোটা জ্বালিয়ে দিলাম। 

“বাবা! এসব কী হচ্ছে বলো তো? আমার খুব ভয় করছে। আমি আর এক মুহূর্ত এখানে থাকতে চাইনা।” কাঁদতে কাঁদতে বলে পলা।

বাতাস ধীরে ধীরে পাতলা হচ্ছে। আবার শ্বাস নিতে পারছি। হাঁফাতে হাঁফাতে বললাম, “আমিও চাইনা রে, মা। এই বাংলোতে আর এক মুহূর্ত না।” মোবাইলটা তুলে দেখি রাত আড়াইটে। “কাল সকালটুকু হওয়ার অপেক্ষা। ভোরের আলো ফুটলেই সোজা গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে যাব এখান থেকে।”

সারারাত আমরা আর ঘুমোতে পারলাম না। আলো জ্বেলে পলাকে বুকে জড়িয়ে ধরে জেগে থাকলাম আমি।

অদৃষ্টের কী করুন পরিহাস! সকালের আলো ফুটতেই ফোন করলাম ড্রাইভারকে। সে এখন দার্জিলিঙে। বলল, একটানা প্রবল বর্ষণে দার্জিলিং থেকে তাবাকোশি আসার রাস্তায় ধস নেমেছে। মিলিটারি রাস্তা মেরামতের কাজ করছে, কিন্তু দিন দুয়েকের আগে ওর পক্ষে এখানে আসার কোনো উপায় নেই।  

পলা খবরটা পেয়ে খুব ছটফট করতে শুরু করল।

“বাবা! তুমি প্লিজ কিছু একটা করো। এই হন্টেড বাংলোতে আমি আরও একটা রাত কিছুতেই থাকব না।”

“থাকতে তো আমারও এক মুহূর্ত ইচ্ছে করছে না রে। কিন্তু কী করব বল ? এই ছোট্ট জনপদে কোথাও হোটেল বা হোম স্টে কিচ্ছু নেই। আমি সমীরকে দিয়ে খোঁজ নেওয়ালাম। ধস না সরলে কীকরে ড্রাইভার আসবে বল ?” একটু দম নিয়ে পরের কথাগুলো বললাম, “আমি তো আছি।”

অচেনা পাহাড়ি গ্রামে এসে পিশাচের মোকাবিলা করতে যতটা সাহস লাগে, সম্ভবত তার চেয়েও অনেক বেশি লাগে বাপের উপর ভরসা হারানো মেয়ের ভরসা জিতে নিতে।

ব্রেকফাস্ট বা লাঞ্চের সময় বিষয়টা ডিসুজাকে জানাবো বলে ভেবেছিলাম। কিন্তু কাল রাতের ওর অর্ধ-উলঙ্গ হয়ে বৃষ্টিতে ভেজার দৃশ্যটা দেখার পর থেকে লোকটাকে ঠিক ভরসা করতে পারছি না আমি। জোড়পোখরির দিকের রাস্তা খোলা আছে। কিন্তু গাড়ি যেহেতু নেই তাই সেদিকে যাওয়ার উপায়ও নেই। ঘরে বসে বসে অস্বস্তি আর আশংকা দুটোই মনের উপর আরো চেপে বসছে বলে বিকেলের দিকে বেরিয়ে পড়লাম দুজনে। সকাল থেকে পলার জ্বরটাও আর আসেনি। কাছেই একটা বেকারি ক্যাফে আছে, সেখানেই যাব বলে ঠিক হল।

কাল রাতের ঘটনাটা থেকে পলার মনোযোগ সরিয়ে রাখার জন্য অন্য সব বিষয়ে কথা বলছিলাম আমি। কিন্তু আমার নিজের মনের মধ্যে ওই একটা চিন্তাই বয়ে চলেছে কেবল। কেন জানিনা মনে হচ্ছে কাল সন্ধ্যার ওই মহিলার সাথে এই পুরো রহস্যের কিছু একটা যোগ আছে। নাহলে হঠাৎ করে আমাকেই টেনে ধরে ওসব কথা বলার কী মানে ?

ক্যাফেতে খাওয়া দাওয়ার পর কাছেই একটা ছোট্ট মার্কেটে গেলাম আমরা। পলাকে বললাম, “শোন, আমার একটা ছোট্ট কাজ আছে। তুই একটু কেনাকাটা কর। আমি আধঘন্টার মধ্যে ঘুরে আসছি।”

পলা একটু অবাক হলেও “হ্যাঁ” বলল। তারপর আমি সবচেয়ে জরুরি কথাটা বললাম, “যতক্ষণ না আমি আসছি, মার্কেটেই থাকবি। কোনো অবস্থাতেই আমাকে ছাড়া বাংলোতে ফিরবি না। ডিসুজার সাথে দেখা হলেও না।”

রাস্তা চিনতে খুব একটা অসুবিধা হল না। মার্কেট থেকে কাল যেখানে মহিলাকে দেখেছিলাম সেই জায়গাটা হেঁটে আসতে মিনিট কুড়ি লাগলো। কুয়াশা জমে উঠেছে আবার, একটু পরেই ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি শুরু হল। জায়গাটা এমনিতেই নির্জন, দোকানপাট একেবারেই নেই দেখে বুঝতে পারছি এই রাস্তায় লোক চলাচল খুব একটা নেই। 

সন্ধে আরেকটু গাঢ় হতে হতাশ হয়ে ভাবছি এবারে ফিরে যাব, এমন সময়ে আমার বা দিক থেকে নারীকণ্ঠে একটা পরিত্রাহি চিৎকার শুনতে পেলাম। আওয়াজ শুনে মনে হল দুশো তিনশো মিটার দূর থেকে আসছে। ছুটে দেখতে যাব ঠিক সেই সময় রাস্তাটা যেখানে বাঁক নিয়েছে, সেদিকে চোখ পড়তেই বুকের রক্ত হিম হয়ে গেল। গত দু-রাতের সেই মুখ! কাল রাতের সেই ভয়ানক-দর্শন পিশাচ বুটের মশমশ আওয়াজ করতে করতে এগিয়ে আসছে। স্বাভাবিক প্রতিবর্তে আমি ছুটে পিছিয়ে এসে তার দৃষ্টির আড়ালে চলে এলাম। কোথায় লুকোবো ভাবছি, নজরে পড়লো পাহাড়ের গায়ের একটা ফাটল। বেশি চওড়া না হলে, একজনের লুকোনোর পক্ষে যথেষ্ট।

নিজেকে আড়াল করে আবছা অন্ধকারের মধ্যে সামনের দৃশ্য দেখতে থাকলাম। পিশাচটার কোলে শুয়ে আছে একটা বছর পনেরোর মেয়ে, পরনে একটা লং স্কার্ট। তার মাথাটা এলিয়ে রয়েছে অদ্ভুত ভঙ্গিতে। সে কী মৃত না অজ্ঞান বোঝা যাচ্ছে না। আবার শুনতে পেলাম সেই পরিত্রাহি চিৎকার। উন্মাদিনীর মতো চিৎকার করতে করতে মরিয়া হয়ে পিশাচটার পিছনে দৌড়ে আসছে কালকে সন্ধ্যার সেই মহিলা। দৌড়ে এসে সে ঝাঁপিয়ে পড়ল লোকটার উপর। 

দুজনের মধ্যে প্রবল ধস্তাধস্তি হচ্ছে। পিশাচটা কিছুতেই কিশোরীটিকে ছাড়বে না। এক সময় মহিলার চুলের মুঠি ধরে রাস্তার উপর তাকে ছুঁড়ে ফেলে দিল সে। পরমুহুর্তে যেটা হল সেটা দেখে বুকের ভিতরটা যেন ভেঙে গেল আমার। কিশোরীটিকে এক লহমায় ছুঁড়ে খাদে ফেলে দিল পিশাচটা। মহিলা শেষ মুহূর্তে উঠে দাঁড়িয়ে দৌড়ে গেলেন, কিন্তু শেষরক্ষা হল না। পিশাচটা এবার তার চুলের মুঠি ধরে পেছন থেকে তাকে জাপটে ধরল, বেরিয়ে এল তার দুই স্বদন্ত। সোজা কামড় বসিয়ে দিল মহিলার ঘাড়ে। কতক্ষন এই জিনিস চলেছিল, আমার নিজেরই খেয়াল নেই। একটু পড়ে মহিলার শরীরটা নেতিয়ে পড়লো। সেই অবশ শরীরটাকে ধাক্কা মেরে খাদের মধ্যে ফেলে দিয়ে মশমশ শব্দ তুলে কুয়াশায় মিলিয়ে গেল কাল রাতের বাংলোর পিশাচ।

পাহাড়ের খাঁজ থেকে বেরিয়ে পলাকে ফোন করে জানালাম মিনিট কুড়ির মধ্যেই আসছি। ঘন ঘন সিগারেট খেয়ে নিজেকে একটু শান্ত করার চেষ্টা করলাম। কিন্তু যা ঠিক করার আমি ঠিক করে নিয়েছি। অনেক হয়েছে লুকোচুরি। এবারে সরাসরি প্রশ্ন করবো ডিসুজাকে। আমি নিশ্চিত ও এই পুরো রহস্যের অনেক কিছুই জানে। তাছাড়া ওর বাংলোতে রাতবিরেতে পিশাচ দেখা যাচ্ছে, আর ও কোনো দায়িত্ব নেবেনা, এটা তো হতে পারেনা। হঠাৎ খেয়াল হল একটা সম্পূর্ণ অন্য কথা। কাল রাত অবধি আমি একজন অলৌকিকে চরম অবিশ্বাসী, বিজ্ঞানের ছাত্র ছিলাম। স্রেফ একটা রাতের ঘটনা কীভাবে আমাকে এমন অনেককিছুতে বিশ্বাস করিয়ে দিল! কাল যা দেখলাম তা কি সত্যি ? আজ একটু আগে যা দেখলাম তাও কি সত্যি না ভৌতিক ? জানিনা। এই মুহূর্তে আমার মেয়ের নিরাপত্তার চেয়ে বেশি জরুরি আর কিচ্ছু নয়।

পলাকে মার্কেট থেকে পিক আপ করে মন ঠিক করেই বাংলোতে ঢুকলাম। ডিসুজাকে উদ্ধত ভাবে হাঁক দিয়ে ডাকতে যাব, ঠিক সেই সময়ে আমার পা দুটো দাঁড়িয়ে গেল। আমরা দুজন দাঁড়িয়ে আছি এক তলার ড্রইং স্পেসে। ঘোরানো সিঁড়ির নীচের দেওয়ালে লার্জার দ্যান লাইফ সাইজে দেখা যাচ্ছে ডিসুজার মৃতা মেয়ের ছবি। আমি মন্ত্রপূত পুতুলের মতো স্তম্ভিত হয়ে তাকিয়ে আছি সেই ছবির দিকে। পলার হাতটা শক্ত করে চেপে ধরলাম আমি।

রাতে আমি পলাকে নিয়ে ওর ঘরে না শুয়ে আমার ঘরে শুলাম। আমার ঘরে অত বড়ো জানলা নেই। একটা ছোট জানলা আছে, আমাদের দুটো পুলওভারকে তার উপর চাপিয়ে সেলোটেপ দিয়ে সাঁটিয়ে দিলাম। প্রথমে ভেবেছিলাম সারারাত ঘুমোবো না। তারপর মনে হল, রেস্ট নেওয়াটা দরকার। কাল যদি রাস্তা খুলে যায় তাহলে ভালো, নাহলে কাল একটা বিরাট যুদ্ধের জন্য তৈরী হতে হবে আমাকে। আজ রাতে আর বিশেষ কিছু হল না। বৃষ্টির যদিও থামার কোনো নামগন্ধ নেই।

পরদিন সকালে উঠেই ড্রাইভারকে ফোন করলাম। সে বলল ধস সরানোর কাজ চলছে, কিন্তু পরদিন সকালের আগে গাড়ি চলাচল শুরু হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। অগত্যা ব্রেকফাস্ট সেরেই পলাকে নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। ডিসুজাকে বলে দিলাম যে লাঞ্চ আমরা আজ বাইরেই করে ফিরব। মার্কেটটা ছোট, কিন্তু এই ছোট্ট জনপদে যাওয়ারও আর কোনো জায়গা নেই। পলা যখন টুকটাক এটা ওটা দেখছে, আমি তখন ফোন করলাম অমৃতকে। অমৃত আমার কলেজ লাইফের বন্ধু। এখনো টুকটাক যোগাযোগ আছে।

সৌজন্য বিনিময়ের পর বললাম, “আচ্ছা, তুই এর আগে বেনেডিক্ট এন্ড ডিকেনশন কোম্পানিতে চাকরি করতিস না ?”

অমৃত জানালো ও বেনেডিক্ট এন্ড ডিকেনশন -এ বেশ উঁচু পোস্টেই ছিল। আমি বললাম, “তোকে একটা লোকের নাম হোয়াটসআপ করছি। লোকটা সম্ভবত ওই কোম্পানির একজন অংশীদার ছিল  বছর কয়েক আগে অবধিও। কোম্পানিতে এখনো তোর চেনা কেউ থাকলে তুই একটু খোঁজ নিয়ে বলতে পারবি লোকটা  রিটায়ারমেন্ট কবে নিয়েছিল ? আর তারপর লোকটার ব্যাপারে কোম্পানির কাছে কোনো খবর আছে কিনা ?”

অমৃত বেশ অবাক হল এরকম গোয়েন্দা মার্কা প্রশ্নে। ওকে পরে সব বোঝাবো বলে শান্ত করে নামটা পাঠিয়ে দিলাম। মিনিট কুড়ি পরে আমরা দুজন যখন পাহাড়ের ঢাল ধরে হাঁটছি, তখন ফোন করল অমৃত। 

“হ্যাঁ, বল।”

“তুই ঠিকই বলেছিস। ভদ্রলোক বেনেডিক্ট এন্ড ডিকেনশন-এর পার্টনার ছিলেন দীর্ঘদিন। প্রায় বারো বছর। ২০১৯ এ ভদ্রলোক সব শেয়ার বিক্রি করে পার্টনারশিপ ছেড়ে দেন। তারপর ২০২২ অবধি ভদ্রলোক কোম্পানির সাথে সৌজন্যমূলক যোগাযোগ রেখেছিলেন। মুম্বাই অফিসে বড়ো রিউনিয়ন হলে আসতেন, গোয়াতে ফ্যামিলি ট্যুর হলেও যেতেন। এমনকি নর্থ বেঙ্গলে সেটল করার পর দার্জিলিঙে একবার পার্টিও দিয়েছিলেন। সেটা ২০২২ এর অক্টোবর। তারপর থেকে ভদ্রলোকের আর কোনো খোঁজ নেই। পার্টির জন্য ফোন করা হলে ধরেননি, মেইলেরও উত্তর দেননি।”

“বেশ! থ্যাঙ্ক ইউ সো মাচ... রে।”

মনের মধ্যে ছবিটা এইবার ধীরে ধীরে পূর্ণ রূপ নিচ্ছে। মার্কেটে লোকজনকে জিজ্ঞেস করে জেনে নিয়েছিলাম কাছে পিঠে সাইবার ক্যাফে আছি কিনা। একটাই আছে। সেটার উদ্দেশ্যে পা বাড়িয়ে দিলাম। শুধু একটা তথ্য লাগবে আমার নিজেরে থিওরিকে নিয়ে নিশ্চিত হবার জন্য।

ক্যাফেতে পৌঁছে যা খুঁজছি, সেটা বের করতে ঠিক দশ মিনিট লাগল আমার। বুকের ভেতর হৃদপিন্ডটা পাগলের মতো নেচে চলেছে। প্রিন্ট আউটটা নিতে নিতে ক্যাফের ছেলেটিকে জিজ্ঞেস করলাম, “দাদা, কাছেপিঠে কোথাও তালা চাবির দোকান আছে?”

দেখি, পলা ভ্রু কুঁচকে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। ছেলেটি জানালো এখান থেকে বাসস্ট্যান্ডের দিকে একটু এগোলে কয়েকটা লোহালক্কড়ের দোকান পড়বে।

ক্যাফের ছেলেটির নির্দেশমতো হেঁটে পেয়ে গেলাম দোকানগুলো। খানতিনেক বড়ো বড়ো তালা আর তাদের চাবি কিনে পিঠের রুকস্যাকে ভরে বাংলোর পথে হাঁটা দিলাম। পলার মুখের দিকে তাকিয়েই বুঝতে পারছি ওর মনে অজস্র প্রশ্ন ভীড় করে আসছে। কিন্তু ওকে এখন সেসবের উত্তর দিলে ভয় পেয়ে যাবে বেচারি। 

বাংলোয় ঢুকে মনিব বা চাকর কাউকেই দেখতে পেলাম না। পলাকে ড্রইংরুমে বসিয়ে পা টিপে টিপে ডিসুজার ঘরের দিকে এগিয়ে গেলাম। দরজা বন্ধ। ঘড়ি দেখলাম। সন্ধ্যা প্রায় সাতটা। তারমানে খুব সম্ভবত ডিসুজা ঘুমোচ্ছে। কালবিলম্ব না করে আমি একতলার মেইন গেটের সামনের কলাপসিবলটা টেনে সবচেয়ে বড়ো তালাটা লাগিয়ে চাবি দিয়ে দিলাম। হতভম্ব পলার হাত ধরে দোতালায় উঠে এলাম। দোতালার ডাইনিং স্পেসের সামনের একফালি বারান্দায় কাঠের জানলা। পাল্লাদুটো টেনে, তাদের মাঝ বরাবর আমার সদ্য কেনা লোহার চেনটা বেঁধে আরেকটা তালা ঝুলিয়ে দিলাম।

ব্যাস! প্রস্তুতি শেষ! এবার শুধুই অপেক্ষা। পলাকে নিয়ে আমি ওর ঘরে ঢুকে দরজা ভেতর থেকে বন্ধ করে দমবন্ধ করে দাঁড়িয়ে রইলাম। দেখতে দেখতে এক ঘন্টা কেটে গেল। দু'রাত ভালো করে না ঘুমানোর ক্লান্তিতে একটু বুঝি তন্দ্রা এসে গিয়েছিল আমার, ঠিক তখনই যে আওয়াজটা শোনার জন্য অপেক্ষা করছিলাম, সেটাই শুনতে পেলাম। বৃষ্টি আবার মুষলধারে শুরু হয়েছে, কিন্তু সেই আওয়াজ ছাপিয়ে একতলার কলাপশিবলটা প্রবল আক্রোশে ঝাঁকানোর আওয়াজ শুনতে পাচ্ছি। 

কয়েক মিনিটের অপেক্ষা। তারপরেই ঘোরানো সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে আসার শব্দ। কি হোলে চোখ রেখে দেখলাম উদ্ভ্রান্তের মতো সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে আসছে লুসিফেন ডিসুজা। দোতালায় উঠেই সোজা দৌড়ে গেলেন বারান্দার জানলার দিকে। সেখানে ঝুলতে থাকা শিকলটা দেখে একটা বিকট জান্তব চিৎকার বেরিয়ে এল ওনার মুখ থেকে। শিকলটা ধরে ভয়ানক জোরে ঝাঁকাতে শুরু করলেন তিনি। পরমুহূর্তেই হুঙ্কার শোনা গেল, “মিস্টার মিত্র! মিস্টার মিত্র।”

আমি দরজা খুলে বেরিয়ে এলাম। শান্ত গলায় বললাম, “বলুন মিস্টার ডিসুজা।”

“বলুন মানে? আপনি এসব কী করছেন? একতলার গেট, দোতালার জানলায় তালা লাগিয়েছেন কেন?”

“বাইরে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি হচ্ছে। এ অবস্থায় বাইরে যাবেন না, ঠান্ডা লাগতে পারে।”

আরো জোরে চিৎকার করে ওঠেন ডিসুজা, “আমি কোথায় যাব না যাব, আমি বুঝবো। আপনি আগে এই তালা খুলুন। এটা আমার বাড়ি।”

“খুলে দেব, বৃষ্টিটা থেমে যাক। ওহ! সরি! আপনার তো বৃষ্টিটাই সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন তাইনা ?”

এক মুহূর্তের জন্য চমকে ওঠে ডিসুজা। পরমুহূর্তেই মুখটা চরম ভাবে বিকৃত হয়ে ওঠে অকৃত্রিম ক্রোধে, “ব্লাডি সোয়াইন! তুই কী করে জানলি? তোর তো দিন ঘনিয়ে এল।”

ডিসুজার সোজা শরীরটা ঝুঁকতে শুরু করেছে, পুরো শরীরটা ফুঁসে উঠছে বারবার, শক্ত হয়ে উঠছে হাতের মুঠো।

আমি কপট হেসে বলি, “এতো জলদি কিসের লুসিফেন ? এখনো তো অনেক সওয়াল জবাব বাকি। আপনার মেয়ে টিউলিপ কী কোভিডে মারা গিয়েছিল নাকি অন্য কোনো বিষে? রক্তচোষা পিশাচ হিসেবে নিজের ক্ষমতা পরীক্ষার গিনিপিগ শেষমেশ মেয়েকেই বানালেন?”

বিকট চিৎকার করে পৈশাচিক হাসি হেসে ওঠে ডিসুজা, “কিন্তু এখন তো তোর মেয়েকে গিনিপিগ বানিয়েছি। ও তো এনিমিয়াতে মরছে, বাঁচাবি কী করে ?”

আমি কথার উত্তর না দিয়ে বলে চললাম, “আর আপনার স্ত্রী বোধয় নিজে থেকে খাদে ঝাঁপ দেননি ? আপনি স্বহস্তে তাঁকে স্বর্গপথে যাত্রা করান। কী তাইতো ?”

ডিসুজা ধীরে ধীরে দূরত্ব কমাচ্ছে আমার আর নিজের মধ্যে। আমার চোখের সামনে তার মুখের আদল বদলে যাচ্ছে, ফুটে উঠছে গত দু রাতে দেখা ভয়ানক-দর্শন পিশাচের মুখ। মুখে নারকীয় একটা হাসি মাখিয়ে বলল, “নারী রক্তে অন্য উত্তেজনা আছে। বিশেষ করে সেই নারী যদি হয় কিশোরী।”

আমি আবারো পাত্তা না দিয়ে বললাম, “কিন্তু আসল খবর তো অন্য জায়গায় লুসিফেন। অক্টোবর, ২০২২ এর পড়ে তোমার কোনো খবর পাওয়া যায়নি দেখে নেটে একটু খুঁজতেই এই খবরটা পেলাম।” পকেট থেকে প্রিন্ট আউটটা বের করলাম আমি। “উত্তরবঙ্গ বুলেটিন-এর পয়লা নভেম্বরের খবর বলছে, তাবাকোশি নিবাসী ধনী ব্যবসায়ী লুসিফেন ডিসুজা তার আগের দিন রাতে ফুন্টসোলিং-এ একটি গাড়ি দুর্ঘটনায় মারা যান। কী অদ্ভুত না!”

আমার চোখের সামনে ডিসুজার শরীর থেকে সব জামাকাপড় খসে পড়ল। একটা বীভৎস্য উলঙ্গ জান্তব দেহ বেরিয়ে এল। আমি কথা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সর্বশক্তি দিয়ে সেই শরীরটা ঝাঁপিয়ে পড়ল আমার উপর। লক্ষ্য আমার কণ্ঠনালী। আওয়াজ শুনে পলা এক ছুটে ঘরের বাইরে বেরিয়ে এল। কিন্তু আমার উপর ওই নারকীয় জন্তু-পিশাচকে দেখে ভয়ে সিঁটিয়ে গেল।

আমি ঠিক এইরকম কিছুর জন্যই তৈরী ছিলাম। ডিসুজা কিছু করার আগেই পকেট থেকে বের করে আনলাম একটা লম্বা নেপালি কুকরি। সেটা বসিয়ে দিতে গেলাম জন্তুটার বুকে, কিন্তু পারলাম না। পিশাচটার আসুরিক শক্তিটাকে আমি এতটা হিসেব করিনি। মুহূর্তেই আমার হাত থেকে কুকরিটা কেড়ে নিয়ে আমার বুকে বসিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করতে লাগলো সে। আমি প্রাণপনে দু হাতে করে আটকানোর চেষ্টা করছি। এমন সময় মরিয়া হয়ে পলা ব্যাগ থেকে একটু আগে কেনা একটা তালা বের করে জন্তুটার মাথায় বসিয়ে দিল। 

খুব যে লাভ হল তা নয়, তবে ওর মনোযোগ সরে যাওয়ার সুযোগে আমি কুকরীটা বুকের উপর থেকে নীচে নামাতে সক্ষম হলাম। মরিয়া হয়ে ডিসুজা সেটা আমূল বসিয়ে দিল আমার বা জংঘাদেশের ধার বরাবর। প্রচন্ড যন্ত্রণায় তীব্র আর্তনাদ করে উঠলাম আমি। আমার হাত দুটো খসে পড়ে গেল জন্তুটার গলা থেকে। আমাকে এক লাথিতে দেয়ালে ছুঁড়ে ফেলে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালো সে। 

লোলুপ দৃষ্টিতে পলাকে দেখতে দেখতে এক পা এক পা করে ওর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে জন্তুটা। পলা ভয়ে কেঁদে উঠছে। আমি মরিয়া হয়ে উঠে দাঁড়াতে গেলাম। পারলাম না। অসহ্য যন্ত্রনায় উল্টে পড়ে গেলাম মাটিতে। পিশাচটা হাত বাড়িয়ে টেনে নিল পলাকে। ওকে পেছন থেকে জাপটে ধরে দাঁত বসাতে উদ্যত হল ওর কাঁধে। পলা পাগলের মতো ছটফট করছে, আমি অসহায় বাপ্ কাঁদতে কাঁদতে কাতরাচ্ছি মাটিতে।

হঠাৎ একটা অদ্ভুত ব্যাপার ঘটে গেল। পিশাচটা হঠাৎ সজোরে ছিটকে গিয়ে পড়ল উল্টোদিকের দেয়ালে। স্পষ্ট মনে হল যেন কোনো অসীম শক্তিশালী অদৃশ্য কেউ প্রভূত ঘৃণায় ছুঁড়ে ফেলেছে তাকে। তবে বেশিক্ষণের জন্য নয়। পিশাচটা শরীর ঝাকুনি দিয়ে আবার উঠে দাঁড়ালো। পলার দিকে সে এগোতেই সেই অদৃশ্য শক্তি অকল্পনীয় ক্ষিপ্রতায় মাটি থেকে রক্তমাখা কুকরীটা তুলে নিয়ে আমূল বসিয়ে দিল পিশাচের বুকের মধ্যিখানে। বিশ্রী আর্তনাদ করে মাটিতে উল্টে পড়ে গিয়ে ধুঁকছে সে এখন। 

লক্ষ্য করলাম পলার গলা থেকে খুলে যাচ্ছে ওর রুপোর পেন্ডেন্টটা। স্তব্ধবাক হয়ে সেদিকে তাকিয়ে আছে পলা। বাতাসে ভাসতে ভাসতে সেই পেন্ডেন্টটা এগিয়ে যাচ্ছে পিশাচের দিকে। পরমুহূর্তেই জন্তুটার মাথাটা টেনে ধরে তার গলা বরাবর পেন্ডেন্টের তীক্ষ্ণ মুখটা চালিয়ে দিল সেই অদৃশ্য হাত। ফিনকি দিয়ে নিকষ কালো রক্ত ছিটকে এল চারিদিকে। মুহূর্তের মধ্যে আগুন ধরে গেল পিশাচটার শরীরে, নারকীয় চিৎকার করতে করতে ঝলসে পুড়ে ছাই হয়ে গেল সেটা। 

ঠিকই তো! কোথায় যেন পড়েছিলাম রুপোর তৈরী অস্ত্রই এইসব রক্তচোষাদের যম। পলা কাঁদতে কাঁদতে দৌড়ে ছুটে এল আমার কাছে। আমি পা আঁকড়ে ধরে কোনোমতে বললাম, “ওয়ান জিরো জিরো।”

পলা ছিটকে উঠে মোবাইলে ডায়াল করা শুরু করল। 

ঠিক সেইসময় সজ্ঞানতা আর জ্ঞান হারানোর মাঝামাঝি এক অদ্ভুত অবস্থায় একটা খুব চেনা গন্ধ আমার নাকে এসে ধাক্কা দিল। ছটফট করে উঠল আমার সমস্ত চেতনা। এই তো সেই গন্ধ যা মেখে থাকতাম একটা সময় সারাদিন, এই গন্ধের জন্যই তো ছটফট করতাম প্রবাসে, এই গন্ধের সাথে মিশে গিয়েই তো তৈরী করেছিলাম পলাকে। 

ব্যাস! আর কিচ্ছু মনে নেই।

হাসপাতালে যখন জ্ঞান ফিরল, তখন প্রায় মাঝরাত। পলা আমার হাতে মাথা রেখে অঝোরে কেঁদে চলেছে। আমি অশক্ত দেহে ওকে বুকে টেনে নিলাম। একটু পরে ডিউটিতে থাকা ডক্টর এসে জানালেন, জংঘাদেশে খুব বিপজ্জনক জায়গায় আঘাত পেয়েছিলাম আমি। আর একটু হলেই যে শিরা ক্ষতিগ্রস্থ হতে পারতো, তাতে প্রাণ সংশয়ের সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু এখন আর কোনো বিপদের সম্ভাবনা নেই। তবে আগামী দিন পাঁচেক হাসপাতালেই থাকতে হবে আমাদের।

পলাও ভয়ানক শক পেয়েছে। ওর কাউন্সিলিংয়ের প্রয়োজন। তবে সেসব কিছু কাল শুরু হবে। আপাতত পলাকে কিছু খাওয়ানো দরকার। আমার জ্ঞান না আসা অবধি কিছুই মুখে তুলতে রাজি হচ্ছিল না। আমি ওকে একজন নার্সের সঙ্গে ক্যান্টিনে খেতে পাঠিয়ে তবে নিশ্চিন্ত হলাম। 

পলা চলে যাওয়ার পর গত কয়েকদিনে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোকে একটু অনুধাবনের চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু আমার মন মাতোয়ারা হয়েছিল একটু আগের সেই গন্ধটায়। গন্ধটার কথা ভাবতে ভাবতেই হঠাৎ আবার আমার চারপাশে সেই গন্ধটারই উপস্থিতি টের পেলাম। আর বাঁধ মানতে চাইলো না আমার মন। ডুকরে কেঁদে উঠলাম আমি। 

“রুমি... রুমি!”

শূন্য টুইন শেয়ারিং রুমে কোনো শব্দ শুনতে পেলাম না। কোনো প্রত্যুত্তর ভেসে এল না। কিন্তু ভীষণ বাস্তব, ভীষণ লৌকিক, ভীষণ গভীর একটা পরশ আমার বা হাতের তালুর মধ্যে অনুভব করলাম। আমি সেই অদৃশ্য হাতের আঙুলের ব্যবধান ভরিয়ে দিলাম আমার আঙ্গুল দিয়ে। 

“তোমাকে ছাড়া পারবো না রুমি...” আর্তনাদ করে কেঁদে চলেছি আমি। “তোমাকে ছাড়া একা হাতে পলাকে মানুষ করতে আমি পারব না।”

অনুভব করলাম আমার তালুর মধ্যে বায়বীয় চাপ অল্প বেড়ে গেল। একটা শরীরের ওম যেন ঘন হয়ে এলো আমার বুকের উপর। সবটুকুই কী আমার ক্লান্ত মনের ভ্রম ? নাকি সত্যিই আমার কপাল ছুঁয়ে গেল দুটো উষ্ণ, আদরহীন, একাকী ওষ্ঠাধর ?

একটু পরে হাতের মুঠো খুলে দেখি পড়ে আছে পলার রুপোর পেন্ডেন্টটা। ওর পাঁচ বছরের জন্মদিনে ওকে উপহার দিয়েছিল ওর মা, আমার লাং ক্যান্সারে চলে যাওয়া স্ত্রী রুমি।

আর কিচ্ছু নেই আমার হাতের মুঠোয়। শুধু শূন্য, শূন্য, শূন্যতা!


এবং বৃত্তের বাইরে, অক্টোবর ২০২৫

No comments:

Post a Comment