শেষ তুলির আঁচড়
আলেখ্য রায়
"Between shadows and colors, secrets whisper — and some stories are painted in silence."
ঘড়ির কাঁটা বলছে রাত তিনটে বেজে তেইশ। বাইরে বৃষ্টির মৃদু টিপটিপ, দক্ষিণের জানালায় মাঝে মাঝে বিদ্যুৎ কাঁপছে। মাঝে মধ্যেই কিছু কুকুর এসে সেখানে ঘেউ ঘেউ করছে। কলকাতার উত্তরে, শ্যামবাজারের পাশের এক পুরোনো গলি—‘দেওয়ান বাহাদুর লেন’— যার নাম মানুষ ভুলতে বসেছে, ঠিক তেমনই একটা বাড়ি। গলির শেষপ্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা সেই দোতলা বাড়িটা যেন শহরের বিস্মৃতির প্রতীক। পুরোনো অনেক কিছুর মতোই এই দোতলা বাড়িটা এখন পরিত্যক্ত ও ভগ্ন, যেন পুরোনো সময়কে একটু আঁকড়ে ধরে বাঁচার চেষ্টা করছে।
বাড়ির নাম “নীলতারা ভিলা”। কিন্তু নামের সঙ্গে তার কোনও রঙের যোগ নেই। সাদা রঙ খসে পড়া দেয়াল, কাঠের ভাঙা দরজা, জানালার কপাটে কালচে ছোপ, আর ছাদে চিরকালকার মতো দাঁড়িয়ে থাকা একটা পাতাহীন জামগাছ। পাখিরা ওদিকে উড়ে আসে না। একটা মনখারাপ, শরীরভাঙার চিত্র যেন এই বাড়ি জুড়ে রয়েছে। কিছু যেন বলতে চাইছে বাড়িটা, কিন্তু সেটা কী... ?
এই বাড়িতেই থাকেন আরণ্যক দাশগুপ্ত— চিত্রকর, নিঃসঙ্গ, সঙ্গীতবিমুখ। বয়স তিরিশ পেরিয়েছে, তবে তিরিশের ঊর্ধ্বেই যেন তার শরীরে বার্ধক্য এসে তার শরীরে দানা বেঁধেছে, তার চোখের নীচে কালি, আঙুলে কালি, আর মনে— ঘন নীল আঁধার।
সে কারও সঙ্গে কথা বলে না প্রয়োজন ছাড়া। দিনের আলো এড়িয়ে চলে প্রায়, বাজারে যায় ভোরবেলায়। সে শুদ্ধ ছবি আঁকে, আর ছবি দেখে তাকে চেনে শহরের কিছু পাগল আর কিছু প্রেতপ্রেমিক। তার ছবি কোনো সাধারণ প্রকৃতির ছবি নয়, তার ছবি যেন সামনে দেখা কোনো মানুষের একটি রেপ্লিকাকে ক্যানভাস বন্দি করা। আরণ্যকের ছবি নিছক ছবি নয়। তার ছবি নিয়ে সে বলে, “আমি যখন কাউকে আঁকি, কাউকে তুলে ধরি ক্যানভাসে, তাকে ছিন্ন করি। প্রতিটা তুলির আঁচড় মানে এক একটা টুকরো ছুরি। আমি তাকে রঙে আবদ্ধ করি। সে আর বেরোতে পারে না।”
ছোটবেলায় তার বাবা, বিভাস দাশগুপ্ত— এক আধিবিদ্যাবিশারদ ও শিল্প অনুরাগী— তাকে দিয়ে গিয়েছিলেন পুরোনো ইউরোপিয়ান চিত্রকর্মের এক সেট রেপ্রিন্ট, যার মধ্যে ছিল একখানি ভয়াল সৌন্দর্য মেশানো ক্যানভাস— ভ্যান গগের Starry Night। যদিও এটি সেই আসল ছবিটি নয়। Starry Night চিত্রকর্মটি দেখলেই মনে হয় আকাশ যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছে। তার প্রতিটি ঘূর্ণায়মান রেখা ও আলোর খেলায় একধরনের মায়াবী বাস্তবতা সৃষ্টি হয়েছে। তাঁর প্রতিটি ক্যানভাসে এক অন্তর্নিহিত নাটকীয়তা এবং অস্থিরতার ছোঁয়া রয়েছে, যা শিল্পীর মানসিক অবস্থা এবং গভীর আবেগের প্রতিফলন।
ভ্যান গগের ছবিতে রঙ ও আলো এক বিশেষ ভূমিকা পালন করে। তাঁর ব্যবহৃত উজ্জ্বল হলুদ, গাঢ় নীল, সবুজ, লাল এবং কমলা রঙ প্রকৃতির এক প্রচণ্ড অভিব্যক্তিকে ফুটিয়ে তোলে। বাস্তবতার নিরিখে তাঁর রং নির্বাচন অপ্রচলিত হলেও, এই অপ্রচলিত রংই তাঁর ছবিগুলোকে এক অতীন্দ্রিয় মাত্রায় পৌঁছে দেয়। আরণ্যকের কাছে ভ্যান গগ এবং "Starry Night” দুটোই ভীষণ রকম ফ্যাসিনেটিং হয়ে উঠলো। কীভাবে যেন ওই ছবির ওই আকাশ তার মনের মধ্যে তোলপাড় করতে থাকলো, আরণ্যক ওই ছবির দিকে তাকিয়ে একদিন বলেছিল, “আকাশটা হাসছে না, এটা একটা গর্জন। এরকম আকাশ কোথায় পাবো আমি ?”
এরকমভাবে ছবিটি ওর এমনভাবেই মনে গেঁথে গেছিল যে সেই ছবির কথা মাথায় রেখে ওর অনুকরণে একটি চিত্র আঁকে, যেই চিত্রটির নাম সে রেখেছিল—“তিমিরের নীচে তারা।”
এটা ঠিক ‘অনুকরণ’ নয়, যেন এক বিকৃত প্রতিবিম্ব। আকাশে তারা জ্বলছে না, তারা যেন রক্তাক্ত চোখ, আর বাড়িগুলোর জানালায় ছায়া লুকিয়ে। এই ছবির সামনে দাঁড়িয়ে একবার এক গর্ভবতী নারী কেঁদে ফেলেছিলেন— কারণ তিনি নাকি ছবি থেকে শিশুর কান্না শুনেছিলেন। এটা একটা জীবন্ত আকাশ।
আরণ্যক বলে, “ভ্যান গগ পাগল ছিলেন, কারণ তিনি কিছু দেখতেন যা আমরা দেখতে পাই না। আমি শুধু সেই অদৃশ্য জিনিসগুলোর প্রতিবিম্ব তুলি।” ছবিটির রং থেকে যেন একটা মৃত্যুর গন্ধ বের হতো। শুধু এই ছবি নয়, তার আঁকা অধিকাংশ ছবির পেছনেই ছিল মৃত্যুর এক গন্ধ— জানি না সেটা কেরোসিন, না আতর, না পুরোনো ধূপের গন্ধ। কিন্তু সেই গন্ধে যে থাকা যায় না সেটা খুবই স্পষ্ট করে বোঝা যায়।
আর একটি জিনিস— তার স্টুডিওর এক কোণে আছে একটা পুরোনো কাঠের বাক্স। বাক্সের গায়ে লাল রঙে লেখা “V.O.C. 1889”। আরণ্যকের বক্তব্য অনুযায়ী ওটা ওলন্দাজদের এক জাহাজ থেকে উদ্ধার, ভিতরে নাকি “রঙ নয়, আত্মা” আছে। আরণ্যক ওটা কাউকে ছুঁতে দেয় না। ওটা ছোঁয়া বারণ।
একবার এক সাংবাদিক তার ছবি এবং তাকে নিয়ে সাক্ষাৎকার করতে এসে সাহস করে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, “এই বাড়িটা আপনি কেন বেছে নিলেন?”
আরণ্যক হেসেছিল হালকা ঠোঁট বাঁকিয়ে আর বলেছিল - “কারণ বাড়িটার কপালে ছায়া আছে, মনখারাপ আছে। কিছু কিছু দেওয়াল কথা বলে, জানালা ফিসফিস করে। এই বাড়ির দ্বিতীয় তলায় রাত দুটোর পর পা ফেললে শুনতে পাবেন কেউ ধীরে ধীরে কাপড় ভাঁজ করছে। কে জানে হয়তো আমার আগের কোনো এক ন্যুড মডেল!” তার পর কণ্ঠ নরম করে বলেছিল, “এই বাড়িতে একটা আত্মা থাকে, সে আমার রঙ চুরি করে না, আমার শরীর চায় না— সে চায় আমি প্রতিদিন ওকে দেখি, শুধু দেখি আর যেন তুলে ধরি ক্যানভাসে।”
সেদিনের সেই সাংবাদিকের কাছে এই কথাগুলো শুধুমাত্র একজন পাগল চিত্রকরের প্রলাপ ছাড়া আর কিছুই মনে হয়নি। তবে সত্যিই কী প্রলাপ ছিল ?
তবে এভাবেই আসলে গড়ে উঠেছিল আরণ্যকের নিঃসঙ্গ ও ভয়ানক জগত। কিন্তু সেই জগতে তখনও আসেনি ইরা— যে আসবে, দেহ দেবে, প্রেম দেবে, বিশ্বাসঘাতকতা দেবে, এবং শেষে তার প্রতিচ্ছবি হয়ে ফিরে আসবে…।
* * *
বৃষ্টি হচ্ছিল খুব সেদিন। আর সেই বৃষ্টিভেজা বর্ষার দুপুরে প্রথম এসেছিল ইরা আরণ্যকের বাড়িতে। গায়ে ভিজে জামা, হাতে একটা মোটা বইয়ের ব্যাগ। চোখে ছিল অদ্ভুত এক ঔদ্ধত্য— যেন সে চ্যালেঞ্জ করতে এসেছিল এই বাড়ির ছায়াদের। ছায়ারাও যেন ওকে দেখে একটু গুটিসুটি মেরে যায়। ইরা হঠাৎ করেই বাড়িতে ঢুকে জল চুঁইয়ে নামা কেশরাশি সামলে বলেছিল,
-“আপনার ছবি আমি ‘রক্তের মত’ পড়ি বুঝলেন, এই শহরে আপনি একমাত্র শিল্পী, যার ছবির ফ্রেমের ভেতর কেউ নড়ে। এরকম সব ছবিগুলো আমাকে ফ্যাসিনেটিং করে তোলে বুঝলেন, আমি আপনাকে দেখি আর আমার বুক ধুকপুক করে ওঠে।”
একটা মেয়ে হুট করে ঢুকে পড়ে এতসব বলায় আরণ্যক তাকিয়েছিল অবাক হয়ে আর বলেছিল, -“তুমি কে ? হঠাৎ করে আমার বাড়িতে ঢুকে এলে ?”
-“ওহ সরি, আমি তো আমার পরিচয় দিতেই ভুলে গেছি, আসলে আপনাকে দেখে এত excited হয়ে গেছিলাম যে কী বলবো, আমার নাম রাই মজুমদার। ফাইন আর্টস, রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করে এখন বই বিক্রি করি। আগের সপ্তাহে কাগজে আপনার একটা ইন্টারভিউ পড়ে বুঝতে পারলাম আপনি খুব শরীর ভালবাসেন, আর ভালোবাসেন ছায়া। আর ঠিক এই কারণেই আমি আপনার সামনে দাঁড়িয়ে। আমিও ক্লাসিক পড়ি, শরীর ভালোবাসি, যেকোনো শরীরের আনাচে কানাচে আমায় খুব টানে, আমি নিজে ছায়ার সঙ্গে শুতে পারি জানেন যদি সে আমায় সত্যি চায়।”
ঠোঁটে একটা রহস্যময় হাসি হেসে কথাকটা বললো ইরা। এরকম কথাবার্তায় খানিকটা অবাক হয়ে যায় আরণ্যক, তবে নিজের ব্যক্তিত্বের সাথেও এর ভীষণ মিল খুঁজে পেয়ে ওর ঠোঁটে হালকা হাসি ফুটে উঠেছিল আর তারপরে বলেছিল-
-“ছায়ারা শুধু চায় না, ওরা দাবী করে।”
ইরা ধীরে এসে দাঁড়িয়েছিল তার ক্যানভাসের সামনে— “তিমিরের নীচে তারা।” ছবিটা। তার চোখ বড় হচ্ছিল, কিন্তু ঠোঁট ফিসফিস করছিল— “ওখানে একটা মেয়ে আছে। জানালার ওই পাশে দাঁড়িয়ে। ওকে দেখতে পাচ্ছি আমি।”
আরণ্যকের গলা শুকিয়ে এসেছিল এ কথায় খানিকটা কাঁপা গলায় বলেছিল - “তুমি ওকে দেখতে পাচ্ছ ?”
ইরা উত্তর দেয়নি। সে শুধু একপা একপা করে এগিয়ে এসেছিল আরণ্যকের দিকে। আর আচমকাই আরণ্যকের হাতের আঙুলটা মুখে পুরে নিয়েছিল এবং তারপর সেই আঙুল নিয়ে নিজের জামার ভেতরে বুকের ওপরে রেখেছিল। আরণ্যক সেখান থেকেই বৃন্তের জেগে ওঠা টের পেয়েছিল আর তারপর খুব সন্তর্পনে নিজের ঠোঁট নামিয়ে রেখেছিল ইরার ঠোঁটের ওপরে। বৃষ্টিভেজা সেই দুপুরে দুটো শরীর তখন এক জায়গায় হয়ে গিয়েছিল আর বাড়ির ছায়াদের মধ্যেও যেন একটা ফিসফাস শুরু হয়ে যায়।
আর তারপর থেকেই শুরু হয়েছিল এক ধূসর প্রেম— যেখানে শরীর ছিল, কিন্তু সেটা আলোর নীচে নয়। তারা রাতের অন্ধকারে জড়াতো একে অন্যকে, মেঝেতে, ক্যানভাসের পাশে, পুরোনো কাপড়ে। রং, ঘাম, নিশ্বাস, ক্যানভাস আর অন্ধকারে মিশে যেত পুরো বিষয়টি, ঠিক যেন তৈলচিত্রে আঁকা কোনো চিত্রকরের অ্যাডাল্ট পেন্টিং।
একদিন চরম মুহূর্তে ইরা বলেছিল, “তুমি যখন আমার ওপর ঝুঁকে পড়ো, আমার কেন জানি মনে হয়, আমার আত্মা কেউ টেনে নিচ্ছে।”
ইরার শরীর ছিল মোমের মতো গলে পড়া, আর হাওয়ার দমকে কাঁপতে থাকা জানালার পাশেই তারা দু’জন মিশে যাচ্ছিল—ছায়া আর শরীর, ঘাম আর রং, কান্না আর কামনায়। আরণ্যকের চোখ তখন আধখোলা— সে দেখছিল ইরার গলা বেয়ে নামা ঘামরেখা, আর কল্পনা করছিল সেই রেখাকে রঙে বেঁধে রাখার উপায়। কিন্তু কোন রঙে বাঁধবে তাকে? সাদা, কালো না ধূসর?
এক রাতে ঘনিষ্ঠ অবস্থায় বলেছিল “তুমি জানো, এই শরীরটা আমার না,” ইরা ফিসফিস করে বলেছিল, তার নখ আরণ্যকের পিঠে আঁচড় কাটছিল। ধীরে ধীরে শেষ হয়ে যাচ্ছিল তারা, আরণ্যককে গ্রাস করতে করতে ইরা বলেছিল, “তুমি যতই আমাকে ছোঁও, আমার মনে হচ্ছে আমি ফুরিয়ে যাচ্ছি, একটা অন্য কিছু যেন এসে আমার ভিতর বসে পড়ছে।”
“তাই তো চাই”, আরণ্যক বলেছিল ঠান্ডা গলায়, “আমি তোমায় রঙে চুরি করতে চাই। এমনভাবে, যাতে তুমিও ভুলে যাও—তুমি আসলে কে ছিলে, আমার ক্যানভাসে থাকো তুমি।”
ইরা কাঁপছিল তখন, কিন্তু ঠোঁটে ফুটছিল এক বিভ্রান্ত হাসি, এ যেন এক অমোঘ আকর্ষণ, সেই আকর্ষণেই বারবার বলে উঠেছিল ইরা - “আমায় চিত্রিত করো, আরণ্যক। আমার ভিতরে যা আছে, সব দেখে ফেলো— সেই কুয়োর ভিতরটা পর্যন্ত, যেখানে আমার মেয়েবেলার দুঃস্বপ্ন লুকিয়ে আছে।”
আরণ্যকের তুলির ডগা চুম্বনের মতো ছোঁয়াচ্ছিল তার স্তনের পাশে, কাঁধের নীচে, ঊরুর কাছে, “তুমি এখন শুধু নারী নও”, সে বলল, “তুমি এক আত্মার গহ্বর। তুমি সে, যে ছবির ফ্রেমের ভিতর থেকে ফিরে তাকায়, বারবার তাকায়।”
একটা রাত এসেছিল, যেখানে বাতাসে শুধু ভেজা কাপড়ের গন্ধ, ঘামে লেপ্টে থাকা শরীরের গন্ধ আর সেই V.O.C. 1889 রঙের কটু গন্ধ। ইরা সেদিন চিৎকার করে উঠেছিল, শরীর বাঁকিয়ে বলেছিল —
“তুই কে ? আরণ্যক, তুই তো ছবি আঁকিস, কিন্তু আমার আত্মা কেটে নিচ্ছিস কেন?”
আরণ্যক তখন দাঁড়িয়ে ছিল তার সামনে, রঙ মাখা হাতদুটো হাওয়ায় থেমে আছে, কাটকাট গলায় বললো - “তুই এখন আর তুই নস। তুই আমার সৃষ্টি। আমি তোর ঈশ্বর, তুই এখন আমার ক্যানভাসে আছিস, বাস্তব জীবনে নয়।”
“তাহলে আমায় ফেরত দে!” ইরা হঠাৎ রক্তজবলার মতো হেসে উঠেছিল, ওর মুখটা তখন অবিকল ভূতের মতোন লাগছিল।
“আমার শরীর, আমার ছায়া, আমার আয়নার প্রতিবিম্ব—সব ফেরত দে। আমি তোকে প্রেম দিয়েছিলাম, প্রেত হতে চাইনি!”
আরণ্যক ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে। তার চোখে যেন আগুন জ্বলছে।
“তুই বুঝিস না, ইরা। ছবিটা একটা দরজা। আমি শুধু আঁকি না— আমি খুলি। অন্য এক জগতের দরজা।”
ইরা আতঙ্কে পেছনে সরে যায়, “তুই এসব কী বলছিস, আরণ্যক? তুই তো কখনো এমন ছিলিস না ?…”
আরণ্যক মৃদু হেসে ওঠে, “মানুষ যা আঁকে, তা কেবল রঙ আর কল্পনা নয়। আমি যখন তোর প্রতিচ্ছবি আঁকি, তখন তোকে ছুঁয়ে ফেলি এক এমন স্তরে, যেখানে শরীরের বাইরে এক ভয়ঙ্কর ইচ্ছা থাকে। আমি ওখানে পৌঁছেছি, ইরা।”
তারপর হঠাৎই ঘরটা কেঁপে ওঠে। একটা অজানা ঠাণ্ডা হাওয়া বয়ে যায়। সেই পুরোনো কাঠের জানলাটা খুলে যায় বিকট শব্দে। বাইরে গা-ছমছমে আঁধার। ইরা একটা চিৎকার চেপে রাখে।
“তুই আমার মডেল না, ইরা। তুই আমার ক্যানভাস। তোর শরীর, তোর চামড়া, তোর রক্ত… সবই আমার রঙ।”
ইরার চোখে জল চলে আসে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, ওর চোখে ভয় আর বিরক্তির বদলে ধরা পড়ে এক অদ্ভুত টান। আরণ্যক যে শুধু ভয় জাগায় তা নয়… সে টানে। টেনে নিয়ে যায় এক গভীর অন্ধকারে, যেখান থেকে আর ফেরা যায় না।
সে রাতে ইরা আর ঘর ছাড়েনি। আরণ্যকের স্টুডিওতে সারারাত একটা শব্দ চলতেই থাকে— তুলির আঁচড়, ক্যানভাসে রক্তের মতো ঘন লাল রঙের বয়ে যাওয়া।
ভোরবেলা, দরজা খুলে বাইরে বেরোতে গিয়ে ইরা আবিষ্কার করে তার বাঁ হাতের পাতায় একটা কাটা দাগ। সরু, গভীর, আর একেবারে নতুন।
জানালা তখন বিকট শব্দে খুলে গিয়েছিল। বাতাসে ভেসে এসেছিল পুরোনো কাগজ, মরা ফুলের গন্ধ আর সেই রঙের গা-ঘিনঘিনে ঘ্রাণ।
আরণ্যক জেগে উঠেছিল চমকে। ঘরটা ছিল শূন্য। ইরা নেই। শুধু সেই ছবিটার দিকে তাকিয়ে সে অবাক হয়ে দেখেছিল—
“তিমিরের নীচে তারা”-র মেয়েটার চোখে এক ফোঁটা জল, নাকি রক্ত, গড়িয়ে নামছে গাল বেয়ে।
আর মেয়েটার ঠোঁট যেন হঠাৎ একটু নড়ল সে বলল খুব ধীরে, ফিসফিস করে—
“আমায় ফেরত দে, আরণ্যক। নইলে তুইও আয়নাতে আর নিজেকে দেখতে পাবি না।”
তার আঁকা ছবিটায় এক অদ্ভুত পরিবর্তন। ওই জানালার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ছায়ামূর্তির চোখের কোণে তখন এক ফোঁটা জল, নাকি রক্ত, নামছিল।
আর একটি নতুন ছবি দাঁড়িয়ে আছে ক্যানভাসে। তাতে ইরার মুখ। কিন্তু চোখ দুটো নেই— সেখানে শুধু দুটো শূন্য গহ্বর। আর ক্যানভাসের নীচে লাল রঙে লেখা—
“শেষ আঁচড় এখনও পড়েনি।”
* * *
ইরার চলে যাওয়ার পরে আরণ্যক যেন ধীরে ধীরে হারিয়ে গেল এক অনন্ত আঁধারের মধ্যে, যেখানে সময়ের কোন মানে নেই, দিনের আলো তার ক্যানভাস ছুঁতে পারে না, এবং ঘড়ির কাঁটা থমকে আছে এক নির্দিষ্ট মুহূর্তে— যেদিন ইরা শেষবারের মতো তার স্টুডিওর জানালার পাশে দাঁড়িয়েছিল। ঘরের সমস্ত দরজা-জানালা বন্ধ, খাবারের পাত্রে জমে ওঠা ধুলোর আস্তরণ, মোবাইলের স্ক্রিনে বন্ধুবান্ধবদের নাম ঝলসে উঠলেও, আঙুল আর ছুঁয়েও দেখত না।
শুধু একটাই কাজ করত সে— একটাই ছবি আঁকা।
নাম দিয়েছিল : “ইরা – শেষ প্রতিচ্ছবি।”
ছবিটা যেন একটা যন্ত্রণা থেকে জন্ম নিয়েছে। ক্যানভাসের ওপরে একজন নারী— পেছন ফিরে দাঁড়িয়ে, চুল এলোমেলো, নগ্ন শরীর এক ঘন কালো কুয়াশায় ঢাকা। কিন্তু সেই ছায়ার মধ্যে অস্পষ্ট ভাবে ফুটে উঠছে একাধিক হাত, যেগুলো কখনও তাকে জড়িয়ে ধরছে, কখনও তার দেহ চিরে ফেলছে। ছায়ার ভেতরে ছড়ানো ছড়ানো চোখ, আর গভীর ফিসফিসানি, যেটা শব্দ নয়, অনুভূতি। তাকে আঁকতে আঁকতে আরণ্যকের চোখ লাল হয়ে যেত, শরীর শুকিয়ে যেত, কিন্তু সে থামত না।
এক সন্ধ্যায় দরজায় টোকা পড়ল। দরজা খুলে দেখল, এক শীতল, দৃঢ়চেতা নারী দাঁড়িয়ে। পরনে সাধারণ পোশাক, চোখে ঠাণ্ডা জিজ্ঞাসা। নিজেকে পরিচয় দিলেন— ইন্সপেক্টর রূপসা মৈত্র, দমদম থানার তদন্তকারী অফিসার।
“ইরা মজুমদার নামে এক মেয়ে নিখোঁজ। শেষবার তাকে আপনার সঙ্গে দেখা গিয়েছিল আরণ্যকবাবু।”
আরণ্যক নিঃস্পৃহ কণ্ঠে বলল, “হ্যাঁ, ইরা মজুমদার, রবীন্দ্রভারতীর ছাত্রী, উনি মাঝে মাঝে আসতেন। ওর পোর্ট্রেট আঁকছিলাম, মানে উনিই আঁকতে বলেছিলেন আর কী। তারপর হঠাৎ করেই উনি আসা বন্ধ করে দিলেন, উনি আর আসেননি।”
রূপসা ঘরের মধ্যে ঢুকে চারপাশে চোখ বুলাল। পুরোনো ক্যানভাস, সাদা-কালো আলোকছায়ার খেলা, আর এক অদ্ভুত গন্ধ—জ্যামিতিক নীরবতা আর উন্মত্ততা যেন একই সঙ্গে ধরা আছে এই ঘরে।
হঠাৎ সে থমকে দাঁড়াল— একটা ছবির সামনে।
“ইরা – শেষ প্রতিচ্ছবি!”
“এই ছবিটা কি তারই?” রূপসার কণ্ঠে সন্দেহের শীতলতা।
আরণ্যক মুখ ফিরিয়ে বলল— “হয়তো। কিন্তু আপনি যাকে খুঁজছেন, সে হয়তো এখন শুধু ছায়া। আর ছায়ারা তো নিখোঁজ হয় না, তারা শুধু রয়ে যায়— পেছনে, দেয়ালে, জানালার পর্দায়।”
রূপসার ভ্রু কুঁচকে গেল।
“এই বাড়ির ইতিহাস ভালো নয়, আপনি নিশ্চয় জানেন? এক ব্রিটিশ সেনার প্রেমিকা এই ছাদ থেকেই লাফ দিয়েছিলেন। তারপর থেকে এই বাড়ি... কিছুটা অদ্ভুত তো বটেই।”
আর যাওয়ার সময়, রূপসা হঠাৎ থেমে গেল, “তিমিরের নীচে তারা” ছবিটার সামনে। তার চোখ আটকে গেল জানালার ধারে দাঁড়িয়ে থাকা এক ছায়ামূর্তিতে।
“এই জানালার পাশে যে মূর্তি দাঁড়িয়ে... এর মুখ অনেকটা ইরার মতো নয়?”
আরণ্যক এক অদ্ভুত হাসি হেসে বলল— “আপনি যা দেখছেন, সেটাই হয়তো সত্যি। অথবা, আপনি যা ভাবছেন, তা-ই হয়তো ছবি বলছে না। ছবি তো কথা বলে না, ফিসফিস করে। আপনার কান কি তা শুনতে পারে, ম্যাডাম মৈত্র?”
রূপসা আর এক মুহূর্তও অপেক্ষা না করে বেরিয়ে গেলেন। দরজা বন্ধ হল। ঘরে আবার সেই নিস্তব্ধতা।
আরণ্যক ধীরে ফিসফিস করে বলল— “তুই ফিরেছিস, ইরা? আমি তোকে শেষ বার তুলব... একেবারে শেষ বার।”
রাত তিনটে। ঘরের বাতি নিভে গেছে। কেবল দূরের ট্রেনের শব্দ, আর গাছের পাতার ফিসফাস। আরণ্যকের ঘুম ভেঙে গেল হঠাৎ। চোখ খুলেই দেখল— ছবিটার জানালায় যে ছায়ামূর্তি ছিল, সে আর নেই। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে, বিছানার পাশে কেউ শুয়ে আছে। চুল এলোমেলো, ভেজা কালি লেগে আছে দোহারা শরীরে, মুখে এক চঞ্চল, ফ্যাকাশে হাসি।
ইরা !
নগ্ন শরীর, বুকের মাঝ বরাবর লাল দাগ, আর চোখ দুটো—অন্ধকার গহ্বর, যেন গভীর পচন ধরা দুই অতল।
আরণ্যক উঠে বসতেই ইরা ঠোঁট নেড়ে বলে উঠল— “তুই তো বলেছিলি, আমায় রঙে বন্দি করবি। আমি এসেছি। এবার আমার আঁচড় তুই নিতে পারবি তো, আরণ্যক?”
তার শরীরের আঙুলগুলো এবার তুলির দিকে এগিয়ে গেল। আঙুলের ডগায় ভেজা কালি। সে তুলিকে চুমু খেল, তারপর ক্যানভাসে একটি সরু দাগ টেনে দিল।
তারপর বলল— “এটাই শেষ তুলির আঁচড়। এরপর রঙ শুকিয়ে যাবে। আমি আর রঙ হব না। আমি হব ছায়া। তোর ভিতর... তোর কল্পনায়... তোর আঁকায়। তোর রাত্রির নিঃশ্বাসে... আমি বাঁচব, আর তুই মরবি।”
আর তক্ষুনি ক্যানভাসের পেছনের ঘড়িটা বন্ধ হয়ে গেল। যেন সময় আটকে গেল সেই আঁচড়ে। আরণ্যকের চোখ দুটো এখন আর শূন্য নয়। সেখানে শুধু ছায়া, আর এক অনন্ত কুয়াশা।
কোনও এক নারী, পেছন ফিরে দাঁড়িয়ে, আবার নিজের চুল ছুঁয়ে বলছে—
“শুরু হোক, শেষ অধ্যায়।”
* * *
বাড়িটার চারপাশে তখন ভরা শরৎ, কিন্তু তাতে যেন কার্তিকের বিষাদ মিশে আছে। আকাশ জুড়ে ঢাকের আওয়াজ, চতুর্থীর রাতের কাশফুল-ভেজা বাতাসে প্যান্ডেলের রোশনাই। কলকাতার অন্য বাড়িগুলো আলোয়, শব্দে, উৎসবে মেতে উঠলেও, ৩১/বি ভবানী দত্ত লেনের সেই পুরনো দোতলা বাড়িটা নিঃশব্দ আর নিঃসঙ্গ।
আরণ্যক সেই অন্ধকার ঘরে ধূপ জ্বালিয়ে বসে। তার সামনে এখন শুধু একটা বিষয়— “শেষ প্রতিচ্ছবি।”
ছবিটা এখন সম্পূর্ণ। ক্যানভাসে এক নগ্ন নারী, চোখে দুটো গর্ত যেন অন্ধ গহ্বর, গলায় অদৃশ্য দাগের ছাপ, আর চারপাশে জড়ানো অদ্ভুত এক ছায়া—যা ঘূর্ণায়মান, যেন ছবি থেকে বেরিয়ে দেওয়াল বেয়ে চলেছে। ছবির রঙ যেন নিজস্ব সীমানা অতিক্রম করে—ঘরের ছাদ, জানালা, দরজা পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে।
আরণ্যক নিজের মধ্যেই আধা-মানব, আধা-ছায়া হয়ে গেছে। সে এখনো শিল্পী, কিন্তু তার শিল্প আর রক্ত আলাদা নয়। সে এক দৃষ্টিতে চেয়ে আছে ছবিটার দিকে, এবং ফিসফিস করে বলে— “আজ পুজোর চতুর্থী। মা আসেন… কিন্তু কেউ জানে না, দেবী প্রথম আসেন ছায়ার ভিতর দিয়ে।”
ঠিক তখনই দরজায় জোর ধাক্কা। একটা কড়া গলার আওয়াজ,
“পুলিশ। দরজা খুলুন!”
দরজা খুলতেই ঢুকে পড়ল ইন্সপেক্টর রূপসা মৈত্র, সঙ্গে দু’জন কনস্টেবল। আজ তার চোখে ক্লান্তি, কিন্তু ঠোঁটে দৃঢ়তা। হাতে সার্চ ওয়ারেন্ট।
সে বলল, “আমরা আপনার স্টুডিওয় ঢুকতে চাই। আমরা ইরার মৃত্যুর সূত্রে নতুন কিছু পেয়েছি।”
আরণ্যক চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।
রূপসা নিজের ব্যাগ থেকে একটা ফাইল বের করে বলল, “তিন বছর আগে বার্সেলোনার এক পরিত্যক্ত স্টুডিও থেকে একই ধরনের বাক্স উদ্ধার হয়েছিল— VOC 1889। তার রঙেও ছিল একই প্রবণতা—‘ছবির মধ্যে আত্মার বিলীন হওয়া’। আপনি জানেন না?”
আরণ্যক মৃদু হাসল, বলল— “জানি। কারণ আমিও তো সেই বাক্সেরই খণ্ডাংশ। ওই বাক্সটা রঙ নয়, ওটা আত্মা। জমাট বাঁধা আত্মা। ভ্যান গগের মৃত্যুর পর তা চলে গিয়েছিল কিছু সাহসী শিল্পীর হাতে। তারা কেউ টিকল না। একমাত্র আমি... আমি তাকে ভালোবেসেছিলাম।”
রূপসা আর অপেক্ষা করল না। সে এগিয়ে গেল স্টুডিওর ভিতরে। ঘরটা যেন কাঁপছে। বাতাস ভারী। দেয়ালের গায়ে ছায়া গড়িয়ে যাচ্ছে। একটা ছায়া রূপসার ছায়ার গায়ে গিয়ে মিশে গেল। তার চোখ হঠাৎ আটকে গেল ছবিটার দিকে।
“শেষ প্রতিচ্ছবি!”
এখন আর শুধু ছবি নয়—তার প্রাণ আছে।কিন্তু ইরা কোথায়? ছবির মাঝখানে যে নারীটি আগে ছিল, সে নেই। বরং তার আশেপাশে ঘূর্ণায়মান ছায়াগুলো যেন ফ্রেম ফুঁড়ে চারপাশে ছড়িয়ে পড়েছে।
ঠিক তখনই ঘরের তাপমাত্রা এক ঝটকায় হিমে নেমে এল। একটা ছায়া হঠাৎ পিছন থেকে এক কনস্টেবলের গলায় হাত রাখল। সে কেঁপে উঠে পড়ল মাটিতে, চোখে ফেনা, মুখে গম্ভীর আতঙ্ক— তার শেষ চিৎকার জমে রইল ঘরের মধ্যেই। রূপসা বন্দুক বের করে তাক করল ছবিটার দিকে।
“ছবিটার মধ্যে কি আছে, আরণ্যক? কোথায় ইরা?”
আরণ্যক অদ্ভুতভাবে হাসল।
“তুমি তো ভাবছিলে ইরা নিখোঁজ। সে নিজেই তো চাইত অমর হতে— আর আমি তাকে দিয়েছি রঙের অমরত্ব। তার শরীর গলে গেছে এই ক্যানভাসে, আত্মা ঘুরে বেড়ায় ছায়ায়। সে এখন আমার প্রেমিকা নয়— সে আমার ঈশ্বরী। আমার আরাধ্য।”
রূপসা তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে বলল, “আমি এটাকে ধ্বংস করব। ইরাকে মুক্ত করতে হবে তোমার থেকে।”
আরণ্যক চিৎকার করে উঠল— “না! তুমি জানো না সে কে! আমি তাকে বন্দি করিনি— সে নিজেই রয়ে যেতে চেয়েছে! সে এখন আর ইরা নয়, সে এখন ছায়ার মাতৃরূপ!”
ঠিক তখনই পাড়ার পূজোমণ্ডপ থেকে শাঁখ বাজল। আশেপাশের প্যান্ডেল থেকে আওয়াজ ভেসে এল, বোধন হয়েছে! দেবী এসেছেন!
ঘরের ছায়াগুলো হঠাৎ তীব্রভাবে কাঁপল। একটা চাপা হাহাকার ঘরের ভিতর বয়ে গেল। ছবিটার মাঝখান থেকে একটা ফিসফিসে গলা ভেসে এল— “আমার শরীর ছিল রঙে, আত্মা ছায়ায়… এখন প্রতিশোধ আগুনে হবে।”
আর ঠিক সেই মুহূর্তে ছবির ভিতর থেকে একটা ছায়া ফুঁড়ে বেরিয়ে এল। চুল এলোমেলো, চোখ দুটো শূন্য, গায়ে রঙ মেশানো রক্তের ছিটে।
ইরা...।
রূপসা গুলি চালাল। গুলি গিয়ে লাগল ক্যানভাসে। ছবির ফ্রেম চিরে গেল, এক কর্কশ চিৎকারে ঘর কেঁপে উঠল। ঘরের এক কোণ থেকে আগুন জ্বলে উঠল— ছোটো এক আঁচড়ে, তারপর ছড়িয়ে পড়ল সবদিকে।
আরণ্যক শেষবার চিৎকার করল— “ইরা! আমায় ছেড়ে যাস না! আমায় নিয়ে যা!”
ইরা ধীরে ঘুরে তাকাল। তার চোখে প্রেম আর অভিশাপের জোয়ার।
সে বলল— “তুই আমায় বন্দি করেছিস। আজ আমি তোকে মুক্ত করব— ছায়া করে। চিরদিনের জন্য।”
ছবি, ঘর, আগুন সব মিলে একটা ভয়ংকর বিস্ফোরণ হল। আশেপাশে ঢাকের শব্দ থেমে গেল, রোশনাই নিভে এল।
তিন মাস পর বাড়িটা ভেঙে ফেলা হয়। পুলিশ রিপোর্টে লেখা থাকে, “ঘটনাস্থলে একটি পোড়া ক্যানভাসে রক্ত মেশানো চামড়ার টুকরো ও চুল পাওয়া যায়। তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ছবির ছায়া বদলাচ্ছিল। এটা শুধুমাত্র হত্যা নয়, এটা ছিল এক আত্মা চুরির শিল্প।”
রূপসা মৈত্র এখন অনেকটা চুপচাপ। তার বাড়ির এক কোণে রাখা একটি ছোট, পোড়া ক্যানভাস। সেখানে একটি নারী দাঁড়িয়ে আছে— চোখের কোণে একফোঁটা জল। নাম নেই। ছায়া নেই। কিন্তু রঙের মধ্যে লুকিয়ে আছে রক্ত।

No comments:
Post a Comment