নাম তার পুলকিত - ভাস্কর পাল - ভূতের গল্প - এবং বৃত্তের বাইরে

Nam tar Pulakito - A horror Stoey

নাম তার পুলকিত

ভাস্কর পাল


অনেক্ষণ হয়ে গেল দুর্বাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। দুর্বাও খুঁজে পাচ্ছিল না ওর খরগোশটাকে। ছাড়া পেলেই কেবল পালিয়ে পালিয়ে বেড়ায় ও। তৃণভূমি, বিশাল বিশাল সব গাছ আর সামনে ফিতের মতো নদীটাকে দেখে ওর মন উড়ু উড়ু করে।

 দুর্বাদের ঘরটা ভারি সুন্দর একটা জায়গাতে অবস্থিত। সেখানে কত মসৃণ ঘাসের বিছানা আর নানান জাতের অজানা রঙিন ফুল। ওদের হলুদ রঙের বাড়ির পাশেই একটা সোনাঝুড়ি গাছ ডালপালা মেলে দাঁড়িয়ে আছে। ঘর থেকে কিছুটা দূরেই বয়ে চলেছে নদী। ছোট নদী, এপাড় থেকে ওপাড়ের দূরত্ব খুব কম। তবে বর্ষার সময় দু-কূল ছাপিয়ে জল চলে আসে বাসভূমির দিকে। নদী কিছুদূর গিয়ে নানান বাঁক নিয়েছে। আরও কিছুদূর গেলে তার উৎপত্তিস্থল দেখা যায়। একটা পাথুরে ঘরের মতো জায়গা সেখানে থেকেই প্রকৃতির অমোঘ খেয়ালে অনর্গল ধারায় অবিরাম গতিতে এক পাথুরে দেওয়াল থেকে জল উপচে উপচে পড়ছে। সাধারণ মানুষ বলে বাবা কালারুদ্রের এক বিস্ময়কর উপহার ছাড়া এ আর কিছুই নয়। যদিও বিজ্ঞ জনের মত ওখানে একটা আর্তেসিয়ান কূপ আছে। 

ওদের বাবা, দূর্বা আর ওর দিদি অঙ্কিতাকে সে জায়গা দেখিয়ে নিয়ে এসেছে। ওরা ভেলাতে চড়ে বাবার সাথে প্রায়ই যায় সেখানে। যদিও এপার হয়েও যাওয়া যায় সেখানে, তবে বিস্তর দূরবর্তী সেই পথ। তাছাড়া ভেলাতে গেলে একটা রোমাঞ্চকর অনুভূতি হয়! ওই পাথুরে ঘরের পাশেই বাবা কালারুদ্রের প্রাচীন মন্দির, আর তারপরেই ঘন জঙ্গল শুরু হয়েছে।

অনেকক্ষণ হয়ে গেছে মেয়ে এখনো আসেনি, তাই চিন্তা হচ্ছিল মায়ের। তাই তিনি ওর বাবাকে তাগাদা দিচ্ছিল বারবার। বাবা আশ্বস্ত করে বলল-“ও নিশ্চয় জঙ্গলে গেছে আর বন্ধুদের সাথে খেলায় মেতেছে। তাই হয়ত ঘরের কথা ভুলেই গিয়েছে। আমি সাইকেল নিয়ে এখনই যাচ্ছি।” 

দূর্বার বাবা আর বেশিক্ষণ দাঁড়ালেন না। ঘর থেকে সাইকেল বের করে চটপট জঙ্গলের পথে পা চালালেন। পথ যে অনেক দূর…। 

* * *

গ্রীষ্মের দুপুর বেলা, দূর্বারা ঘন জঙ্গলে খরগোশটাকে খুঁজে বেড়াচ্ছিল। একসময় সে ক্লান্ত হয়ে বসলো একটা ছাতিম গাছের তলায়। রূপসা আর পল্লবী দূর্বার খরগোশ খুঁজে না পেলেও গাছ থেকে বেশ কিছু লিচু পেড়ে এনেছে। এখন সেটাই সাবাড় করার পালা। তবে দূর্বার মন মোটেও ভালো নেই, কেন যে ওই খরগোশটাকে এখানে সঙ্গে নিয়ে এসেছিল!

জঙ্গলটা দূর্বাদের ক্রীড়াভূমি। একাদশী বালিকাগুলো এখানে আসতে ভারী ভালোবাসে। জঙ্গলটা বহুদূর বিস্তৃত, তবে সিংহভাগ এলাকাই অনাবিষ্কৃত। এলাকাবাসীরা বলে ওইসব জায়গায় অপদেবতার বাস। তাই ওখানে গেলে অপদেবতার করাল রোষে পড়তে হয়। ওখানে দীঘির কাছে একটা ভারী অদ্ভুত গাছ আছে। কারও বড় চুল থাকলে, গাছটা তার ডালপালা বিস্তার করে তার চুল টেনে তাকে গাছের উপর উঠিয়ে নিয়ে আসে, তারপর নির্মম ভাবে উপর থেকে নীচে ফেলে দেওয়া হয়। আর নীচেতে অপেক্ষা করে থাকে ত্রিশূলের মতো সূচালো কাঁটার ঝোপ। মৃত্যু অবধারিত, যেন একটা প্ল্যানড মার্ডার! সবকিছু যেন একটা সাজানো ছক! তবে এখানে ভয়ের কিছু নেই। ফুল আর ফল গাছে সমৃদ্ধ এই এলাকা। এছাড়াও রয়েছে শিশু, সোনাঝুরি আর শিরিষ গাছের আধিক্য। 

রূপসা লিচু খেতে খেতে বলল- -“খরগোশটা আবার দিঘির দিকে চলে যায়নি তো?”

 ভয়ে প্রাণ শুকিয়ে গেল দূর্বা আর পল্লবীর। ওদিকে গেলে খরগোশের আশা ছেড়ে দিতে হবে। ওখানে যাওয়ার সম্ভাবনাটাই বেশী বলে মনে হচ্ছে দূর্বার। কারণ সব জায়গা ওদের খোঁজা হয়ে গেছে, খালি ওখানেই তো যাওয়া হয়নি। 

ওদের মধ্যে পল্লবীই যা একটু সাহসী। সে বলল- -“ওদিকে একবার তাহলে যাবি?”

-“না রে, তোর মতো আমার অত সাহস নেই। আমার যদি কিছু হয়ে যায় তাহলে আমার মা-বাবার দুখের শেষ থাকবে না।”- দূর্বা ক্লান্ত স্বরে বলল। 

-“অ, আর আমরা নদীর জলে ভেসে এসেছি। থাক তাহলে, আসার মন হলে ঠিকই চলে আসবে।”- পল্লবী বলে। 

গ্রীষ্মের ভয়ানক দুপুর। সূর্য এখন মাথার উপরে, তবে এখানে বেশ ছায়া হয়ে আছে। দূরের ঝোপ গাছগুলো থেকে বনফুলের গন্ধ আসছে। ঘরে যেতে মন চায় না ওদের, এখানে নিরালায় বেশ শান্তি আর স্নিগ্ধতা। এখানে খেলা শেষ, এবার কালারুদ্রের মন্দিরে যাবে ওরা। ওখানে আরো মজা। মন্দিরের পাশে সেই জলের গুহা, সেখানে থেকে জল এনে বেশ খেলা হয়, তাই গুহার এক গোপন অন্দরে ওদের খেলার সামগ্রী আছে। 

আজও কিছুক্ষণ মোহিত হয়ে ওরা গুহার ঝর্নার দৃশ্য দেখছিল। হঠাৎ রূপসা ওদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলল- -“গুহার ঝর্ণার কাছেই ওটা কার মাথা?”

অন্য দুজনেই বেশ অবাক ও ভয় পেয়েছে রূপসার কথা শুনে। তারা সত্য অনুসন্ধানে আরো এগিয়ে গেল গুহার কাছে। ভয়ে ওরা বিস্ফারিত চোখ মেলে দেখলো গুহার যে দেওয়াল থেকে অনর্গল ধারায় জল পড়ছে তার ঠিক সেইখানেই একটা লোক মুখ হাঁ করে জল খাচ্ছে। লোকটা কি মৃত? তা না হলে সারাক্ষণ হাঁ করে আছে কেন! ওকি ঝর্ণার সমস্ত জল একদিনেই পান করতে চায়! ভয়ে তিনজনের ছুটতে ছুটতে বাড়ির দিকে রওনা হয়। 

* * *

নদীর ঘাটে ওরা বসেছিল। চারিদিক জ্যোৎস্নার বন্যায় প্লাবিত। নদীর জল জ্যোৎস্নার আলোয় চিকচিক করছে। দুই বোন অঙ্কিতা আর দূর্বা চাওমিন নিয়ে বসেছে, সঙ্গে রয়েছে বাবা-মা। গ্রীষ্মের সময় বেশ আরামের জায়গা বটে, আজ প্রকৃতি যেন একটা সুন্দর বাতাসের আয়োজন করেছে। 

খরগোশটা জ্যোৎস্নায় তৃণভূমিতে খেলা করে বেড়াচ্ছে। দূর্বাদের হন্তদন্ত হয়ে বাড়ি ফিরে আসার কিছুক্ষণ পরেই ও ফিরে আসে। কোথায় যে বেড়াতে গিয়েছিল কে জানে!

চাউমিন খাওয়া শেষ হয়ে যাওয়ার পরেও অঙ্কিতা কিছুক্ষণ বসে ছিল নদীর কাছে। ঠিক তখনই আবার ফোনটা এলো। সেই একই নাম্বার, শেষে ছয় ছয়। এই নিয়ে একত্রিশ বার হবে! ছেলেটা কে, এতবার ফোন করছে কেন? অঙ্কিতা দুইবার রিসিভ করার পর আর ফোন তোলেনি। 

প্রথমবার রিসিভ করতেই অজানা নাম্বারের ছেলেটা কেমন একটা গলায় বলছিল -“অঙ্কিতা, একবার জঙ্গলে এসো না, ওখানে একটু তোমাতে-আমাতে হবে।” তারপরই ফোনের ওপাশ থেকে ছেলেটার ঠান্ডা হাসি পাওয়া যায়। 

কি অসভ্য, বাজে বাস্টার্ড টাইপের ছেলে। অঙ্কিতার বারবার মনে হচ্ছিল ছেলেটাকে দীঘির জলে বড়ো বড়ো কুমিরের কাছে সে ছেড়ে দিয়ে আসে। ওই সোয়াইনটার জন্য সে ঠিকমতো রাতে ঘুমাতে পারে না। আচ্ছা, নাম-নাম্বার এসব জানলো কী করে? চেনাজানা কেউ তো এভাবে বিরক্ত করবে না!

দোনামনা করতে করতে ফোনটা রিসিভই করে অঙ্কিতা। ওপাশ থেকে একটা ঠান্ডা অথচ শয়তানি গলায় একটা শব্দ ভেসে আসে... 

-“অঙ্কিতা?”

জ্যোৎস্নার আলোতে তৃণভূমিতে যেখানে খরগোশটা বিচরণ করছে, অঙ্কিতা সেখানে এসে দাঁড়ালো। অঙ্কিতা ছেলেটার প্রত্যুত্তরে একটা হুঁ বলতেই ওপারের বক্তা যেন একটা আলতো প্রশ্রয় পায়। 

ওপাশে থেকে কথার ফুলঝুরি উড়ে আসে- -“আরে, সুইট বেবি কেমন আছো? ফোন কেন তুলছো না। ভয় পাচ্ছো বুঝি? ছেলেটা আবারও গা ঘিনঘিনে হাসি হাসে।”

তারপরে একটা বজ্রকঠিন গলায় বলে- -“শুনে রাখো অঙ্কিতা, ফোনে আমাদের যে আলাপ-প্রলাপ চলছে চলতে দাও, তা না হলে সোজা বাড়িতে গিয়ে এমন ঝামেলা পাকাবো সেটা তোমার কল্পনার বাইরে চলে যাবে। তাই যেটা চলছে সেটাকে চলতে দাও! আর ফিজিক্যাল তো হচ্ছি না। তবে তুমি চাইলে…।”

-“আপনি কেন আমাকে এভাবে বিরক্ত করছেন? নাম্বারটা এবার আমি পুলিশে দেবো।”- অঙ্কিতা গলায় যথেষ্ট দৃঢ়তা এনে বললো। 

-“ওয়াও, রাগ যে তোমার মিষ্টি আরও অনুরাগের চেয়ে… যদিও অনুরাগের কোনো স্যাম্পেল এখনো পেলাম না। সেটার প্রতীক্ষাতেই আছে, এর মধ্যে পুলিশকে কেন টেনে আনা সুইটহার্ট!”-ছেলেটা আবার হাসে। 

অঙ্কিতা কিছু বলার আগেই কাছেপিঠে বেশ একটা শোরগোল শোনা যায়। লোকজনের কথাবার্তায় বেশ একটা ভয় পাওয়া ভাব। সে ফোন রেখে মন দিয়ে শোনার চেষ্টা করে। বাড়ি থেকে বেশ একটু দূরে রাস্তার কাছে গুহা নিয়ে লোকগুলো আলোচনা করছে। অঙ্কিতা আর দূর্বার বাবা ওদিকে এগিয়ে গেল। 

-“আরে, আমিই তো প্রথম দেখি। গুহার কাছে নদীতে বিকেলে মাছ ধরছিলাম, হঠাৎ দেখি টমি খুব ঘেউ ঘেউ করছে। আমি ভাবলাম কী হলো রে বাবা, এমন শান্ত চিত্তের কুকুর অমন অশান্ত হয়ে উঠলো কেন? সে বারবার গুহার দিকে যাওয়ার জন্য তাড়া দিচ্ছিল। আমি মাছের ছিপ ফেলে ওর সাথে গুহার দিকে যাই। সেখানে গিয়েই তখন চোখে পড়ে কাণ্ডটা! একটা লোক মুখ হা করে জলে পড়ে আছে। গলার কাছে ক্ষতচিহ্ন, যেন কেউ ছুরির ফলাতে বারবার আঘাত করেছে সেইস্থানে। রক্তের দাগ যদিও খুব একটা দেখলাম না, সারাক্ষণ জল যায় তো সেদিকে।” -বেশ একটা অহংকারের হাসি হাসে লোকটা। 

পুলিশের আই. সি সবটা শুনলেন। আসলে খবরটা তিনি আগেই পেয়েছেন বেশ ঘুরপথে। গুটিকয়েক মেয়ে স্থানীয় হাই স্কুল থেকে ছুটি হয়ে যাওয়ার পর গেট থেকে বেরোবার মুখে গল্প করতে করতে আসছিল। সেই সময় এক ট্রাফিক কন্ট্রোলার একজনকে বলতে শুনেছে সে নাকি গুহার কাছে একটা লোককে দেখেছে যে মুখ হাঁ করে শুয়েছিল। তখনই ওনার সন্দেহ জাগে। তাই সে গল্পচ্ছলে ষষ্ঠ শ্রেণীর ওই মেয়েগুলোর কাছে সবটা জেনে নেয়। তারপর স্থানীয় থানার আই.সি কে ঘটনাটা জানায়। আসলে মেয়েগুলো এই গ্রামেরই মানে দূর্বা, রূপসা আর পল্লবী। 

তাই দূর্বাদের বাবারা এবং গাঁয়ের আরও অনেকে উপস্থিত ছিল। অঙ্কিতাও সেখানে গেলো। ঘটনা শুনে মনে হচ্ছে ব্যাপার সুবিধার নয়, লোকটা কি খুন হয়ে গেলো নাকি! এই নির্জন শান্ত গ্রামে খুন?

* * *

আড্ডা জমে উঠেছিল লালুর চায়ের দোকানে। লকডাউনের পর বেশ কিছুদিন ধরে চায়ের দোকানে বেসামাল ভিড় হচ্ছে। লালু গোটা ফ্যামিলিটাকে চায়ের দোকানে কাজে লাগিয়ে দিয়েছে, তা না হলে তো সামাল দেওয়া সম্ভব নয়। একটা চায়ের দোকানে আটজন রয়েছে আর সবাই হিমসিম খাচ্ছে! এভাবে চলতে থাকলে আবার দোকান চাঙ্গা হয়ে উঠবে। তবে লালুর চার বছরের মেয়েটা তো আর কাজ করতে পারবে না। তাই সে কাজের থেকে অকাজ করছে বেশি। একবার তো ফুটন্ত চায়ের প্যান উল্টিয়েই দিলো। 

কালীতলার মোড় অবস্থিত কালীতলা ও রুদ্রপুরের সংযোগস্থলে। তাই দুই গ্রামের মানুষ এখানে আসে, জমজমাট হয়ে ওঠে কালীতলার মোড়। অথচ দুই তিন মাস আগেও লকডাউনের সময় এই এলাকায় মানুষ থাকে বলে মনে হতো না। এলাকার মিষ্টির দোকান, জুতোর দোকান, হোটেল সবকিছুই যেন নবজীবন লাভ করেছে। 

তবুও নিশ্চিন্ত হওয়া যায় না। এলাকায় নতুন খুন সবার মনে একটা আশঙ্কার জন্ম দিয়েছে। এসব নিয়েই ঘোর আলোচনা চলে চায়ের কাপে তুফান তুলে। ওই জঙ্গলে যে আগে কারোর লাশ পাওয়া যায় নি তা নয়। তবে সেসব নেহাতই অলৌকিক ও অপদেবতাকৃত, তাই এলাকাবাসীরা সেসব খোদ সেই ব্যক্তিরই চরম ভুল বলে কোনোমতে মেনে নিতো। কিন্তু সদ্য এই মৃতদেহ পাওয়া গেছে গুহার ভিতরে যা কিনা কালারুদ্রের মন্দির থেকে খুব কাছেই। সেখানে অপদেবতার অ পর্যন্ত নেই, তাহলে? মানুষ?

আর একটু দূরে বেঞ্চে বসে চিকেন স্টিক খাচ্ছিল পুলকিত। তাকে এলাকায় নবাগত বলেই মনে হয়। এ অঞ্চলের শয়তান ছেলেগুলোর কোনো শর্টলিস্ট করলে পুলকিতের নাম প্রথমে আসবে। সে এসব ব্যাপারে বিন্দুমাত্র সন্দিহান ছিল না। 

খাওয়া শেষ হলে দাম না মিটিয়েই রাস্তায় হাঁটতে থাকে পুলকিত। হাতে মালকড়ি না থাকলে সে জিনিসের দাম মেটানোর প্রয়োজন বোধ করে না, এমনই প্রতাপ তার এখানে। একবার এক রোলওয়ালা টাকা চেয়েছিল ওর কাছে। সে লোকটার গলা টিপে শাসানি দিয়ে বলেছিল -“ভাই, তুই কবেকার রে, আমার কাছে টাকা চাইছিস? ভালো মুডে আছি না হলে তোর মতো অর্বাচীনকে এইখানেই খালাস করে দিতাম।”

এরপর থেকে ওর নামে যে পুলিশে রিপোর্ট হয়নি তা নয়। তবে পুলিশকে ধুলো দিয়ে বারবার সে চকমা দিয়েছে। নিজেকে লুকিয়ে রাখার অদ্ভুত কৌশল রপ্ত আছে পুলকিতের। আর এই পন্থা যে বহুলাংশে অলৌকিক তা অনেকেই স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করেছে! 

সেবার যেদিন ব্যাংক ডাকাতি হলো পুলকিতের দলের সকলেই ধরা পড়ে যায় শুধু পুলকিত ছাড়া। দলের লোকেদেরই থার্ড ডিগ্রি দেওয়ার পর জানা যায় সে নাকি বাড়িতেই আছে, কোথাও পালিয়ে যায়নি। পুলিশের বড়কর্তা তো গভীর জলের মাছকে এত সহজে জালে জড়িয়ে ফেলেছেন এই আনন্দে দ্বিগুন উৎসাহ নিয়ে বাহিনী নিয়ে ছুটে চলে রুদ্রপুরের জঙ্গলে তার ডেরায়। মুহূর্তে ঘিরে ফেলা হয় ডেরার চারপাশ। তখনই ঘরের ভিতর থেকে পুলকিতের গলার আওয়াজ পাওয়া যায়। সে বেশ একটা মজারু গলায় বলে- -“আরে এসেছেন নাকি আপনারা! প্রথমেই ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি, আপনাদেরকে এত কষ্ট করে আসতে হলো এইজন্য। আসলে খুব খিদে পেয়েছিল, তাই খেয়ে নিচ্ছি। আর একটু অপেক্ষা করুন, ওকে?”

পুলকিতের অমন রগড় শুনে বাইরে পুলিশ বাহিনী ও স্থানীয় লোকেদের মধ্যে হাসির ঢেউ ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু ওর যে কী অভাবনীয় ক্ষমতা রয়েছে সেটা হয়তো কেউ ভাবতে পারেনি। বাড়ির ভিতর থেকে কথাগুলো বলার পর অনেকক্ষণ আর কথা শোনা যায় না। এতে বেশ বিচলিত হয়ে পড়ে পুলিশ অফিসার। এমনিতেও পালানোর পথ নেই যদিও, গোটা বাড়িটা ঘিরে ফেলা হয়েছে। তবুও অফিসার আর দেরি না করে ঘরের দরজা ভেঙে ফেলার নির্দেশ দেয়। কিন্তু কোথায় কী! বাড়ির ভিতর ঢুকে দেখা গেল সেখানে একটা বিছানা ছাড়া আর কিছুই নেই। শুধু যে ও গেছে তাই নয়, সঙ্গে নিয়ে গেছে সমস্ত প্রমাণ! পুরো বাহিনী কিছুক্ষণের জন্য বাকহারা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। কীভাবে একটা লোক এমন নিশ্চিদ্র ঘেরাটোপের মধ্যেও পুরোপুরি ভ্যানিশ হয়ে যেতে পারে এটা কারোর মাথায় ঢোকে না!

পুলকিত জানে সে অপ্রতিরোধ্য, তবুও মানুষ খুনের মতো গর্হিত কাজ সে কখনও করেনি। কিন্তু এলাকায় খুনের পর তার মাথার দাম উঠেছে কয়েক লাখ টাকা। মনে মনে হাসিই পায় তার, সে বুঝতে পারে ওকে একবার ধরতে পারলে অন্য সব হিসাবও পুরোদস্তুর কষে নেওয়া হবে। তাই একটা ছদ্মবেশ অবশ্য ধরেছে সে, বলা তো যায় না বিনা প্ররোচনায় শুটআউট শুরু হয়ে গেলো। 

ধীরে ধীরে অন্ধকারে মিলিয়ে যেতে থাকে পুলকিত। তার গন্তব্য রুদ্রপুরের জঙ্গল। মনটা বড়ো খুঁতখুত করে, রুদ্রপুরের জঙ্গলে তার আধিপত্য কি শেষ হয়ে যাচ্ছে! তা না হলে... আচ্ছা ও-ই অপদেবতা কি ওকেও কোনো...। আর ভাবতে পারেনি পুলকিত। সে মনস্থির করে পুলিশ তাকে খুঁজলেও, সে খুঁজে বের করবে খুনিকে। রুদ্রপুরের জঙ্গল তার একার, এখানে অন্য কারো চ্যাঙরামি একদম বরদাস্ত করবে না। 

* * *

তখন সবে সন্ধ্যা নামছে। দূরের জঙ্গল থেকে পাখিদের ঘরে ফেরার গান ভেসে আসছে। এক যুবক দ্রুত গতিতে নদীর কাছেই হলুদ বাড়ির দিকে এগিয়ে আসছিল। তাকে দেখে বেশ ক্লান্ত ও দিশেহারা দেখাচ্ছিল। অন্ধকারে যুবকের মুখ দেখে বোঝার উপায় নেই তার মনের মধ্যে কী ঝড় চলছে। যুবকের মাথায় একটা টুপি, কাঁধে একটা স্কুল ব্যাগের মতো ব্যাগ ঝোলানো রয়েছে। হাতের স্মার্ট ওয়াচ সময় দেখার জন্য জ্বলে উঠছে। ও নিশ্চয় খুব ঘামছে, বারবার পকেট থেকে রুমাল বের করে মুখটা মুছে নিচ্ছে। 

গেট বেশ কিছুক্ষণ নক করার পর দরজা খুলে দিলো অঙ্কিতার বাবা। তিনি যুবককে চিনতে পারলেন না। না পারারই কথা, সে তো পূর্বপরিচিত নয়। তবে যুবককে দেখে শিবরাম বাবুর মায়া হলো। তিনি বললেন,

-“আরে তোমাকে তো বেশ ক্লান্ত লাগছে দেখছি। এসো একটু বিশ্রাম নেবে।”

-“থ্যাংক ইউ কাকু।”

যুবক শিবরাম বাবুর সাথে ঘরে ঢোকে। 

চা আর স্ন্যাকসের সাথে কথাবার্তা চলতে থাকে ওনাদের মধ্যে। যুবককে প্রথমে দেখে বুকটা ধক করে উঠেছিল অঙ্কিতার। মনে করেছিল সেই ফোনে জ্বালানো লোকটা তাকে খুঁজতে খুঁজতে এতদূর এসেছে। পরে আসল পরিচয় জানার পর অবশ্য লজ্জাও পেয়েছে!

কথা বলে জানা গেল যুবকের নাম দীপ স্যান্যাল। সে এখানকার জঙ্গলে এসেছে কিছু অদ্ভুত আর অলৌকিক গাছ নিয়ে গবেষণা করতে। ও একা আসেনি, বরং ওদের একটা টিম রয়েছে। সেই টিমের ৫ জন সদস্যের মধ্যে একজনকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। ব্যাপারটা ঘটেছে প্রায় এক সপ্তাহ হল। জঙ্গলেরই একটা জায়গায় ওরা তাবু খাঁটিয়ে ছিল। বেশ কাজ চলছিল। দিনের বেলায় গাছপালা নিরীক্ষণ আর বেলা পড়ে যাওয়ার পর সন্ধ্যাবেলায় যা যা নিরীক্ষণ হয়েছে তা নিয়ে লেখাজোখা। সত্যি বলতে কি গাছগুলোর মধ্যে অলৌকিকতার কোন গন্ধ পাওয়া যায়নি। দুর্লভ প্রজাতির গাছ হলেও তাদের মধ্যে অস্বাভাবিকতা কিছু চোখে পড়েনি। 

দীপ যেহেতু ওই টিমের লিডার তাই সে নির্দেশ দিল গাছগুলো এবার রাতে নিরীক্ষণ করা হবে। তাতে সবাই সানন্দে সায় দিল। সেই রাতেই ঘটলো বিপত্তি। টিম তখন বিভোর হয়ে দেখছিল গাছের নাচ অনেকটা অশোকবিজয় রাহার মায়াতরু কবিতার মতো। অলৌকিকতার এমন নিদর্শন পেয়ে দীপ তো বেশ খুশি হয়। সে তাদেরই এক টিমমেম্বার কাঞ্চনকে বলে সে যেন এই দৃশ্যটা ক্যামেরাবন্দী করতে না ভোলে! কিন্তু হঠাৎই একটা গাছ শব্দ করে ফেটে গেল। মানে পুরো কাণ্ডটা যেন দরজার মতো খুলে গেলো আর সেখান থেকে বেরিয়ে এলো একটা কালো কুচকুচে মতো কি একটা, অনেকটা ফুটবলের মতো। সেটাই গড়াতে গড়াতে ওদের দিকে দ্রুত গতিতে এগিয়ে আসছিল। তখনই ওরা ভয়ে কোনোমতে তাবুতে গিয়ে আশ্রয় নেয়। 

শিবরাম বাবু সমস্তটাই মন দিয়ে শুনলেন। নানা চিন্তা তার মাথায় জট পাকিয়ে যাচ্ছে। তিনি জিজ্ঞেস করলেন দীপকে,

-“আচ্ছা, তুমি লাশটা আইডেন্টিফাই করেছো?”

-“কোন লাশটা?” বেশ ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বলে দীপ। সে কথার মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝতে পারে না। 

-“আচ্ছা, তাহলে তুমি জানো না। ব্যাপারটা নিয়ে দেখছি থানার কোনো হেলদোল নেই! সে যাকগে, তিন দিন হলো আমাদের কালারুদ্রের মন্দিরের কাছে একটা গুহার ঝর্ণার কাছেই একটা মৃতদেহ পাওয়া যায়। প্রথম দেখেই বোঝা যায় কেউ ওকে খুন করেছে। আমার মনে হচ্ছে, যাকে পাওয়া যাচ্ছে না বলছো সেই এই ভদ্রলোক! আমাদের দূর্বা ওকে প্রথম দেখেছে, ও নিশ্চয়ই চিনতে পারবে।” - শিবরাম বাবু বলেন। 

ঘটনার করুণ পরিণতিতে স্বভাবতই দীপ ভেঙে পড়লো। সে কল্পনাও করতে পারেনি এমনটাও হতে পারে। সে ফোনের গ্যালারি থেকে একটা ফটো বের করে দূর্বাকে দেখিয়ে বলে,

-“এটাই কাঞ্চনের ছবি, দেখো তো চিনতে পারো কিনা?”

দূর্বা বেশ কিছুক্ষণ ভালোভাবে ছবিটা দেখলো। তারপর অতিরিক্ত উচ্ছ্বাসে উচ্ছ্বসিত হয়ে বললো,

-“হ্যাঁ, এই লোকটাই তো! গলায় ওই হারটাই দেখেছিলাম!”

-“আসলে কাকা, আপনাকে একটু মিথ্যা বলেছিলাম। আমি লাশ শনাক্ত করেই এসেছি, তবুও ঠিক আশ্বস্ত হচ্ছিলাম না। কারণ আমি যখন কাঞ্চনকে দেখতে যাই, তখন চেহারা দেখে বোঝার উপায় নেই ও আমাদের কাঞ্চন! তাছাড়া গলায় হারটাও ছিল না।”-দীপ উদ্বিগ্ন হয়ে বললো। 

শিবরাম বাবু বেশ কিছু সময় ধ্যানস্থ হয়ে ভাবলেন। তারপর বললেন,-“ওই হার নিশ্চয়ই অনন্ত নিয়েছে। দূর্বারা ছাড়া ওই তো দেখেছিল।”

-“তবে যেটা তোমার জানা দরকার সেটা এখন বলি, মন দিয়ে শুনবে। ঠিক আছে?”- শিক্ষকের ভঙ্গিতে বলেন শিবরাম বাবু। 

-“আচ্ছা, শুনবো বলুন।”- দীপ বললো।

আরও অন্য সকলে এসে বসলো শিবরাম বাবুর কাছে। ততক্ষণে অঙ্কিতা, মায়ের হাতের গরম গরম লুচি আর ঘুগনি সার্ভ করলো দীপকে। শিবরাম বাবু শুরু করলেন,

-“তোমরা যেখানে ক্যাম্প খাটিয়ে আছো সেটা অপদেবতার বাসস্থান। অপদেবতা এখানে বেশ জাগ্রত, একটু অনিয়ম হলেই চরম রোষে পড়তে হয়। তরুয়া দেখতে একদম স্বাভাবিক গাছের মতোই, তবে রাত হলেই ওই গাছের শাখাপ্রশাখায় একটা অদ্ভুত কম্পন শুরু হয়। তখন গোটা এলাকায় ভূমিকম্পের মতো দোলাচল শুরু হয়। তারপর সেইসব শাখাপ্রশাখা বদলে যায় দীর্ঘ রোমশ হাতে, কাণ্ডে ফুটে ওঠে বড়ো বড়ো লাল চোখ। গোটা জঙ্গলে সে তখন চড়ে বেড়ায়। এখানে যেসব গাছ আছে সবই অপদেবতা তুষ্ট। তাই তার বিরুদ্ধে কোনো রকম অসম্মান প্রদর্শিত হলেই গাছগুলোই ভয়ঙ্কর আচরণ করতে শুরু করে! তোমাদের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। যবে থেকে তোমরা ওখানে তাবু খাঁটিয়েছো তবে থেকেই একটু একটু করে রোষ জমা হচ্ছিল ওই গাছগুলোর ভিতরে। আর সেদিন যখন রাতে, গাছগুলো তোমরা পর্যবেক্ষণ করার কথা ভাবলে তখনই ঠিক হয়ে গেছিল তোমাদেরকে তাড়াবার ভাবনা!”

শিবরাম বাবু থামলেন। দীপ বেশ মন দিয়ে শুনছিল সব। সে বিজ্ঞানের ছাত্র, তার যুক্তিবাদী মন পূর্বে শোনা ঘটনাগুলোকে উড়িয়ে দিতে চায়। তবে সেও যা প্রত্যক্ষ করেছে তাও তো কম অলৌকিক নয়! দীপ দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললো,

-“সেই অপদেবতার এক্সাক্ট লোকেশনটা কোথায়?”

-“সেটা বলা ভারী শক্ত। তবে যে গাছটা থেকে তুমি বলছো কালো রঙের কিছু একটা বেরিয়ে আসে, আমার মতে সেটাই হলো ওনার জায়গা। কিন্তু খটকা তো অন্য জায়গায়।”

-“কীসের খটকা?”

-“তোমার বন্ধু কাঞ্চনের যেখানে মৃতদেহ পাওয়া গেছে সেটা অপদেবতাকৃত হত্যা নয়। কারণ সেটা তার এলাকার এক্তিয়ারের বাইরে! এটা কোনো খুনির কাজ।”

-“আচ্ছা, তোমার টিমের অন্যান্য ছেলেগুলো কোথায়?”- শিবরাম বাবু বললেন। 

-“তারা কি আর থাকবে ভেবেছেন, ভয়ে কোথায় সব পালিয়েছে!”- করুণ হাসি হাসে দীপ। 

-“আজ যখন এখন এসেই পড়েছো, তখন রাতটা থেকেই যাও না হয়! কী থাকবে?”

-“বেশ, আপনি যখন বলছেন।” হাসি মুখে সায় দেয় দীপ।

সে যে কী করে কাঞ্চনের বাবা মার মুখোমুখি হবে তার কথা ভেবেই বুক ফাঁকা হয়ে যায় দীপের! কাঞ্চনের ফোন না পেয়ে তার বাবা মা বারবার ফোন করছে। হে জীবন, তুমি কেন এত নিষ্ঠুর হলে! কাঞ্চনের কথা ভেবে আবার চোখে জল আসে দীপের, কোনোমতে আড়াল করে সেই চোখের জল। 

* * *

পৃথিবীর বহু মানুষ শুধু তার বর্তমানের উপর ভিত্তি করে তাকে বিচার করে। সে যে অতীতে খুব একটা খারাপ ছিল না, সেটা কেউ মনে রাখেনা! পুলকিত এমন অবিচারেরই শিকার! 

করোনার সেই দুঃসময়ের এক রাতে মেস থেকে হেঁটে হেঁটে বাড়ি ফিরতে বেশ রাত হয়ে যাচ্ছিল। বাড়ি তার রুদ্রপুরেই, যখন সে জঙ্গলের মধ্যে আসছিল তখন হঠাৎ ঝমঝম করে বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল। বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচতে সে একটা গাছের নীচে দাঁড়ায়। অন্ধকার রাত, বৃষ্টি তারপর আবার এই জঙ্গল সম্পর্কে ভয়ানক সব অপবাদ! তবু শরীরের ক্লান্তিতে গাছের নিচেই বড় আরাম বোধ হয়। 

 তখনই ঘটে ঘটনাটা। সে যে গাছের নিচে দাঁড়িয়ে ছিল সেখানেই ছিল অপদেবতা তরুয়া-র বাসস্থান। তরুয়া পুলকিতকে বশে আনতে গাছের শাখা প্রশাখা বিস্তার করে তার চুলে বিলি কেটে দেয়। পুলকিতের আরামে ঘুম চলে আসে। তারপর সকালে যখন তার ঘুম ভাঙ্গে তখন সে অন্য মানুষ! অপদেবতার অপশক্তির প্রভাব ততক্ষণে শুরু হয়ে গিয়েছে। যে যুবকের পরিচয় ছিল ইংরেজি সাহিত্যের একজন রিসার্চ ফেলো সেই হয়ে উঠলো এক মূর্তিমান শয়তান। ডেরা পাতলো সেখানেই, হয়ে উঠল অপদেবতার একনিষ্ঠ পূজারী। তার ছোঁয়াতেই এলাকার গাছগুলো হয়ে উঠলো এলাকার বিভীষিকা! অপদেবতার কলঙ্কময় আশীর্বাদে সে প্রবর্তন করল টাকা উপার্জনের নানা অসৎ উপায়। এছাড়াও অল্প বয়সী মেয়েদের দেখলেই তাকে ভোগ করার লালসা জন্ম নিলো।

তরুয়ার কাছে আবার এসে দাঁড়ায় পুলকিত। সকালের ফুটফুটে রোদ জঙ্গলের শোভা বাড়িয়ে দিয়েছে। গাছটার সামনে আসতেই সে তার শাখা-প্রশাখা বিস্তার করে অভিবাদন জানালো। তবে আজ পুলকিত কোনো রকম অভিবাদন গ্রহণ করার মেজাজে ছিল না। সে কৈফিয়ত চায়, সে ছাড়া আর কে তরুয়ার আশীর্বাদ ধন্য হলো!

উত্তর পেতে দেরী হয় না পুলকিতের। গাছ থেকে বেরিয়ে আসে কালো রঙের ফুটবলের মতো একটা বস্তু তাকে পথ দেখিয়ে কোথায় যেন নিয়ে যেতে চায়। পুলকিত এর মানে বুঝলো, সেও গড়িয়ে যেতে থাকা ফুটবলের পিছু নিলো। 

ফুটবল যেখানে থামলো সেখানেই জঙ্গল বেশ ঘন। পুলকিতকে দেখে একজায়গায় সেই ঝোপের একাংশ ধীরে ধীরে সরে যেতে থাকে। আর বেরিয়ে আসে একটা লাশ, ক্ষতবিক্ষত পঁচা একটা মৃতদেহ। পুলকিত হঠাৎ দেখে কেমন চমকে যায়। এটাই কি খুনি নাকি, কিন্তু সে তো নিজেই খুন হয়ে বসে আছে!

কেউ যেন গলায় ফাঁস দিয়ে মেরেছে, তারপর শিয়াল-কুকুরে একটু খেয়েছে। উফ! কী দুর্গন্ধ! চলেই যাচ্ছিল, হঠাৎ পাশে একটা ফোন দেখতে পেয়ে, কেন যেন কৌতুহল হলো তার। একটু ঘেঁটে পাওয়া গেল একটা রেকর্ডিং। সেই রেকর্ডিং শুনতেই উঠে এলো বিস্ফোরক তথ্য!

* * *

রেকর্ডিং মুহূর্তে ভাইরাল হলো অনলাইনে। সবাই এটা ভেবে অবাক হয় যে খুনি নিজেই তার কীর্তি আপলোড করেছে। অঙ্কিতাই প্রথমে ফেসবুকে সেটা দেখায় দীপকে। সে তখন বাড়ি যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিল। অঙ্কিতা ভীষণ উৎসাহিত হয়ে দীপের কাছে এলো। তারপর বললো-

-“দাদা, কিছু যদি মনে না করেন একটা কথা বলবো?”

দীপ ফিরে তাকায় অঙ্কিতার দিকে। কী ভীষণ রূপকথাময় এক মুখ! সে কি তাকে..? দীপ বললো,

-“কী কথা বলো?”

-“ফেসবুকে আপনার বন্ধু কাঞ্চন সম্পর্কে কী একটা বলছে।”- অঙ্কিতা বললো। 

-“আচ্ছা, শোনাও তো।”

-“নিজেই তবে শুনে নিন। যা সব শুনছি বাপরে!”

বলে অডিও চালিয়ে দেয় অঙ্কিতা। যেটুকু শোনা যায় তা তুলে ধরা হলো- “হ্যাঁ, আমি স্বীকার করছি যে আমিই খুনটা করেছি। কিন্তু আপনি কে বলুন তো?”

এই প্রশ্নের জবাবে ওপাশে থেকে অন্য একটা গলা ভেসে আসে যেটা মোটেই কোনো মানুষের হতে পারে না! কেমন একটা সরু অথচ ভীষণ উত্তেজিত ভারী একটা কন্ঠ। সেই কন্ঠের অধিকারী বলে, -“তরুয়া আমি। এখন এবার বলে ফেল কাঞ্চনকে কেন মারলি?”

লোকটার উপর পীড়ন বাড়াতে থাকে জঙ্গলের ভয়ংকর সেই অপদেবতা। 

-“আচ্ছা, আচ্ছা বলছি। কাঞ্চনের সাথে আমার ওয়াইফের সম্পর্ক যে বাড়ছিল সেটা দুইমাস থেকেই লক্ষ্য করছিলাম। ওকে দেখলেই এমন গায়ে ঢলা ভাব করতো আমার স্ত্রী। উফ, অসহ্য, আর নিতে পারছিলাম না। একদিন তো শেষ সীমাও অতিক্রম করে ফেলেছিল ওরা। সেইদিন বুধবার হবে, হঠাৎই ল্যাব থেকে আচমকা ছুটি পেয়ে গেলাম। ভাবলাম ভালোই হলো ঘরে গিয়ে দুপুরে মনের শান্তিতে খাওয়াও যাবে আর বেশ একটা ঘুমও দেওয়া যাবে। ঘরে এসে বেডরুমের কাছে এসে আমি থমকে গেলাম। তখন কাঞ্চন আর আমার স্ত্রী বিছানায় অন্য খেলায়...। রাগে অন্ধ হয়ে গেলাম, মনে মনে ঠিক করলাম কাঞ্চনকে রাখা যাবে না। 

এবারে দীপ সেই সুযোগ যেন আমার হাতের মুঠোয় এনে দিলো। সেইবারে গাছের নাচের ভয়াবহতায় সবাই যখন পালিয়ে যাচ্ছিলাম তখনই কাঞ্চনকে পিছন দিক থেকে পাকড়াও করে গলায় ছুরি চালিয়ে দিই। তারপর গুহার ঝর্ণার কাছেই ওকে ফেলিয়ে ফিরে আসি। আর তখনই…”

-“আমি চলে আসি, তাই তো? আচ্ছা, তোর বউকে মারিস নি?” -তরুয়া বললো। 

-“ওকে কেন মারতে যাবো? আমি তো বাড়িতে থাকি না, তাই ওর চাহিদা থাকতেই পারে। আচ্ছা, আমাকে এভাবে টর্চার করার মানে কী বলতে পারেন?”

-“কারণ তোর জন্য আমার একনিষ্ঠ ভক্তের জীবন দুর্বিষহ হয়ে যাচ্ছিল। পুলিশ সন্দেহ করছে খুন নাকি সেই করেছে। আমি তার রক্ষাকর্তা হয়ে সেটা তো হতে দিতে পারি না।”- তরুয়া বললো। 

অডিও ক্লিপটা শেষ হয়। অঙ্কিতা আর দীপ দুজনেই নীরব। কিছুক্ষণ পর দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে অঙ্কিতা বললো,

-“আপনি লোকটাকে চিনতে পারলেন?”

-“হ্যাঁ, প্রমথেশ দা, আমাদের ল্যাব সহকারী। আমি আসি অঙ্কিতা, আবার হয়তো দেখা হবে। কিছু ভালো লাগছে না।” দীপ উঠে যায়। 

ও এবার ঘরে ফিরবে। আর কারো খোঁজ নেবে না সে। প্রমথেশদা হয়তো আর বেঁচে নেই। মরে নিশ্চয়ই আপদ গেছে। আর ওই ভক্ত, সে থাকে কোথায়? সে কি ওই মোস্ট ওয়ান্টেড পুলকিত? জেনে আর হবেটাই বা কি!

-“আপনার নাম দীপ তাই না?”

হঠাৎই পিছনে একটা কন্ঠস্বর শুনতে পায় দীপ। ঘুরে তাকায়। দেখে একটা লোক বেশ একটা ফাজিল হাসি হাসতে হাসতে এগিয়ে আসে। 

 -“আপনি কে বলুন তো? ঠিক চিনলাম না!”

-“চিনে আর লাভটাই বা কি! তবে এটুকুই বলতে পারি আপনার দুই গ্রুপ মেম্বারই উচিত শিক্ষা পেয়েছে।”-পুলকিত বললো। 

-“হ্যাঁ, তা আপনি যথার্থই বলেছেন পুলকিত বাবু। আসি।”

দীপ সংক্ষিপ্ত উত্তর দিয়ে জঙ্গল থেকে বেরিয়ে আসে। 

পুলকিত থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে। খুব অবাক হয়েছে সে, আবার খুশিও হয়েছে ছেলেটার ব্যবহারে! নিজেকে তার কেমন অপরাধী মনে হচ্ছে, ভালো মানুষ হওয়ার ইচ্ছা জাগে।


এবং বৃত্তের বাইরে, সেপ্টেম্বর ২০২৫

No comments:

Post a Comment