নয়নগঞ্জের নৈশকথা - আকাশদীপ গড়গড়ী - ভূতের গল্প - এবং বৃত্তের বাইরে

Nayan gunge er noisho kotha a bengali horror story


নয়নগঞ্জের নৈশকথা

আকাশদীপ গড়গড়ী


 –“স্যার, ছোটমুখে একটা বড় কথা বলি?” 

–“বলো, বিনোদ।” 

–“স্যার, রাতে ভালো করে দরজা-জানালা বন্ধ করে ঘুমোবেন। চারদিকের অবস্থা তো ভালো নয়, কখন কী হয়, বলা যায় না। চলি স্যার, সাবধানে থাকবেন।”

একটা নমস্কার ঠুকে সরকারবাবুর ডাকবাংলো থেকে হাসিমুখে বিদায় নিল বিনোদ। আমিও দরজাটা ভালো করে বন্ধ করে খাটে এসে বসলাম। বাইরে এখন হাড়কাঁপানো শীত। গাঢ় ধূসর কুয়াশার আস্তরণে যেন গোটা নয়নগঞ্জ ঢাকা পড়েছে...।

 ব্যাপারটা তাহলে একটু গোড়া থেকেই খুলে বলি। আমি সাগর দত্ত, পেশায় একজন মেডিকেল রিপ্রেজেনটেটিভ। বাড়ি কলকাতার কাছেই। বাবা-মা মারা যাওয়ার পর এখন বেঁচে আছি কেবলমাত্র দু’জন, আমি আর আমার ছোট্ট ভাই সৈকত। কোভিড মহামারীর পর দু’টো বছরও কাটেনি, আমার নিষ্পাপ ভাইটার হঠাৎ ব্রেন ক্যান্সার ধরা পড়ল। লাস্ট স্টেজ। ডা.গোস্বামী জানিয়েছিলেন, সৈকতের হাতে সময় বলতে আর বড়জোর মাস চারেক। ডাক্তারবাবুর কথা শুনে সেদিন আমার বুক ঠেলে কান্নার রোল গলার কাছে উঠে আসতে চাইছিল। এই পৃথিবীতে একমাত্র সৈকত ছাড়া আমার আর কেউ নেই। নিজের থেকেও বেশি আমি ওকে ভালোবাসি। 

সৈকতের একটা সুপ্ত প্রতিভা আছে। সেটা হল ড্রয়িং। ছোটবেলা থেকেই সে খুব সুন্দর ছবি আঁকতে পারে। সেদিন রাতে সৈকত হঠাৎ খপ করে আমার হাতটা চেপে ধরে ভেজা গলায় বলল, “দাদা, আমি জানি, আমার যে রোগটা হয়েছে সেটা খুব শিগগিরই আমাকে তোর কাছ থেকে কেড়ে নেবে৷ কিন্তু মরার আগে আমার একটা শেষ ইচ্ছে আছে। রাখবি দাদা?” 

সৈকত চুপচাপ বালিশের নীচ থেকে একটা ভাঁজ করা লিফলেট বার করে আমার দিকে এগিয়ে দিল। ভাঁজ খুলে দেখি, সেটা একটা বিজ্ঞাপন। কিন্তু বড় অদ্ভুত সেই বিজ্ঞাপনের ধরণ। সেখানে লেখা রয়েছে, ‘ডিসেম্বরের তেরো তারিখ শশধরপুরের সবুজ সংঘের প্রাঙ্গণে একটি বসে আঁকো প্রতিযোগিতা আয়োজন করা হয়েছে একটি বিশেষ উদ্দেশ্যে। সকলে এই প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করতে পারবে না। কেবল তারাই পারবে, যারা জীবনঘাতী অসুখের থাবায় আক্রান্ত। যাদের হাতে মাত্র ক’টা দিন সময় আছে। কিন্তু বাঁচার ইচ্ছে আছে প্রবল। তাই সেই সকল মানুষদের কথা মাথায় রেখে এই বিশেষ প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়েছে। বয়সের কোনো সীমারেখা নেই। প্রতিযোগিতায় বিচারকের দায়িত্বে থাকবেন কলকাতার নামজাদা চিত্রশিল্পী মিস্টার শৈলেন কুণ্ডু। এই প্রতিযোগিতায় যে প্রতিযোগীর আঁকা বিচারকের চোখে সেরার সেরা হবে, সেই প্রতিযোগীর জন্য থাকবে বাঁচার একটা দ্বিতীয় সুযোগ। লন্ডনের একটি বিখ্যাত ক্যান্সার রিসার্চ সংস্থা ক্যান্সারের ওপর একটা বিশেষ জীবনদায়ী ওষুধ প্রস্তুত করেছে। সরকারী মতে বৈধ হওয়ার পর তাদের সেই ওষুধ পরীক্ষার জন্য একজন পেশেন্টের প্রয়োজন। যে ভাগ্যবান প্রতিযোগী বিজয়ী হবে, সে এই ওষুধ ব্যবহার করার বিশেষ সুযোগ পাবে। সাথে পাবে চিকিৎসার খরচ বাবদ যাবতীয় অর্থ।’ 

সৈকত আমার হাত চেপে ছলছলে চোখ মেলে বলেছিল, “দাদা, আমাকে নিয়ে যাবি রে শশধরপুরে? আমি একবার শেষ চেষ্টা করতে চাই। তোকে ছেড়ে যেতে ইচ্ছে করছে না রে দাদা। দেখিস, আমি ঠিক জিতে যাব।” 

সেদিন এই হাড় জিরজিরে রোগা একরত্তি ছেলেটার চোখে যে আত্মবিশ্বাসের ঝিলিক দেখেছিলাম, আমি সেটা কিছুতেই উপেক্ষা করতে পারিনি। ডা. গোস্বামীর অনুমতি নিয়ে সমস্ত ব্যবস্থা করে আমরা দু’জন বেরিয়ে পড়েছিলাম শশধরপুরের উদ্দেশ্যে। 

শশধরপুরে আমি এর আগে কখনও যাইনি। হাওড়া থেকে ট্রেন নেওয়ার পরেই মাঝপথে ঘটল বিপত্তি। এদিকটায় এমনিতেই ট্রেনের আধিক্য কম। তার উপর আমরা যে ট্রেনটায় বসেছিলাম, সেটা চলছিলও ধিকধিকিয়ে। কিছুক্ষণ পরেই আমাদের কামরাটা একদম খালি হয়ে গেল। নয়নগঞ্জ বলে একটা অখ্যাত স্টেশনে এসে হঠাৎ ট্রেনটা দাঁড়িয়ে গেল। দিনের আলো প্রায় ফুরিয়ে এসেছে। সেই যে ট্রেনটা দাঁড়াল, আর সেটা নড়ল না। খোঁজ নিয়ে জানা গেল, কাল সকালের আগে আর ট্রেন এগোবে না। সামনে নাকি রেললাইনে কাজ চলছে। 

আমার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়েছিল। একেই অচেনা জায়গা, তার উপর সঙ্গে আবার অসুস্থ ভাই রয়েছে। এইটুকু পথ আসতে আসতেই ক্লান্তিতে সৈকতের দুর্বল শরীরটা আরও একটু নির্জীব হয়ে পড়েছিল। নয়নগঞ্জ প্ল্যাটফর্মটা বেশি বড় না। শীতের সন্ধেতে কুয়াশার আড়ালে কেবল দু’টো টিমটিমে আলো জ্বলা ছোট চায়ের দোকান চোখে পড়ল। চারপাশটা বেশ জনশূন্যই বলা চলে। পাশেই আরেকটা গুমটিঘরে আলো জ্বলছে। সম্ভবত ওটাই স্টেশন মাস্টারের ঘর। ট্রেন থেকে নেমে আমি আর সৈকত এগিয়ে গেলাম স্টেশন মাস্টারের ঘরের দিকে। 

স্টেশন মাস্টার লম্বামতো চেহারার দাড়িওয়ালা ভদ্রলোকটি বেশ মিশুকে। শ্যামলা বর্ণ, গায়ে একটা কালো ওভারকোট চড়ানো। তিনি একটা খাতায় কিছু লেখালেখি করছিলেন। আমি ভদ্রলোককে আমাদের পরিচয় দিলাম। তিনিও হেসে নমস্কার করে নিজের নাম বললেন, পরিতোষ সমাদ্দার। তারপর পরিতোষবাবু আমাদের এখানে আসার কারণ জিজ্ঞেস করায় আমি সব কথা খুলে বললাম। 

সৈকতকে দেখে আর ওর হতভাগ্য অসুখের কথা শুনে ভদ্রলোকের মুখেও যেন একটা চাপা দুঃখের ছাপ স্পষ্ট হয়ে উঠল। তারপর পরিতোষবাবু শ্বাস ছেড়ে বললেন, “কী জানেন, দত্তবাবু, আপনার ওই ভাইটির বয়সী আমারও একটি ছোট মেয়ে ছিল। মায়া। কিন্তু তারপর একদিন… ও হারিয়ে গেল। আর ফিরে এল না। একদিন সকালে হরিহরের পুকুরে ওর মৃতদেহটা ভেসে উঠল। কিন্তু কেবল দেহটা। মাথাটা নেই। দত্তবাবু, আপনার ওই ভাইটিকে দেখে আমার হঠাৎ মায়ার কথাটা মনে পড়ে গেল। যাইহোক, কিন্তু আপনারা তো আর আজ রাতে শশধরপুরে পৌঁছতে পারবেন না। ট্রেন কাল সকালের আগে ছাড়বে না।” 

–“আমার ভাইয়ের শরীরের অবস্থা ভালো নয়, দেখে বুঝতেই তো পারছেন। ওর পক্ষে বেশি ছুটোছুটি করা সম্ভব নয়। যেভাবে হোক কাল সকাল দশটার মধ্যে শশধরপুরে পৌঁছতেই হবে।” 

–“ট্রেন তো একটাই, দত্তবাবু। সেটা আজ রাতে চলবে না। শশধরপুর যাওয়ার লাস্ট বাসটাও চলে গেছে প্রায় ঘন্টা দেড়েক আগে।” 

–“তাহলে উপায় কী, পরিতোষবাবু? আমরা এখন কোথায় রাত কাটাব?” 

–“উমম্… একটা উপায় অবশ্য আছে। একটা পুরনো ডাকবাংলো আছে। এক সরকারী অফিসারের তৈরি করা। আপনারা একটু অপেক্ষা করুন, আমি একটা ব্যবস্থা করে দিচ্ছি। বিনোদ… অ্যাই বিনোদ… কোথায় গেলি, বাপ? একবার ইদিকে আয় দেখি শিগগির!” 

পরিতোষবাবুর হাঁকডাক শুনে বিনোদ নামের একটি অল্পবয়সী স্থানীয় ছেলে এসে নমস্কার করে দাঁড়াল। রোগা-সোগা চেহারা, লম্বা মুখ, খাড়া নাক, দুটো ছোট ছোট কুতকুতে চোখ আর একমাথা কোঁকড়ানো চুল। পরিতোষবাবু আমাদের সাথে তাঁর অ্যাসিস্টেন্ট বিনোদের পরিচয় করিয়ে তার হাতে একগোছা চাবি ধরিয়ে দিয়ে হেসে বললেন, -“বিনোদ, এঁরা আজ রাতে আমার অতিথি। ওঁদের সরকারবাবুর ডাকবাংলোতে নিয়ে যাও। আজ রাতটা ওঁরা ওখানে থাকবেন।” 

বিনোদ মাথা চুলকে বলল, “কিন্তু ওখানে তো…”

–“আহ্ বিনোদ! কী হচ্ছে কী? যেটা বললাম, সেটা করো। বললাম না, এঁরা আমার বিশেষ অতিথি। ওঁদের সরকারবাবুর ডাকবাংলোতে নিয়ে যাও।”

বিনোদ আর কোনও কথা না বাড়িয়ে পিছু ফিরে চলতে শুরু করল।

আমি ভদ্রলোককে ধন্যবাদ দিয়ে সৈকতকে সঙ্গে নিয়ে বিনোদের পিছু পিছু হাঁটতে হাঁটতে বেরিয়ে এলাম নয়নগঞ্জ স্টেশনের বাইরে। 

* * *

বিনোদ বিভিন্ন অন্ধকার গলিপথ ঘুরিয়ে টর্চের আলোয় আমাদের নিয়ে এল একটা বিশাল দোতলা বাগানবাড়ির সামনে। গোটা রাস্তাটা সে খুব বেশি একটা কথা বলেনি। বাড়ির পেছনদিকের বাগানে পরিচর্যার অভাবে বড়-বড় জঙ্গল গজিয়ে গেছে। জায়গাটার আশেপাশে আর কোনো বসতবাড়ি চোখে পড়ল না। কেবল চোখে পড়ল বহুদূর বিস্তৃত ধু-ধু ধানখেতের জমি আর কালচে জলের বড় বড় পুকুর। এই তেপান্তরের প্রান্তরে পুরনো ধাঁচে তৈরি সরকারবাবুর ডাকবাংলোটা একা একা ভূতের মতো মাথা তুলে দাঁড়িয়ে রয়েছে। 

বিনোদ চাবির গোছার থেকে একটা চাবি বার করে পাক দিতেই দরজার গায়ে লাগানো তালাটা খুলে গেল। বিনোদের পেছন পেছন আমরা ভেতরে ঢুকে পড়লাম। কেমন একটা ভ্যাপসা পচা গন্ধ নাকে এসে লাগল। 

বিনোদ একতলার একটা ঘরে আলো জ্বালিয়ে একটু ঝাড়পোঁছ করে রাতের মতো আমাদের থাকার ব্যবস্থা করে দিল। ঘরে একটা খাট, বালিশ, চাদর, তোষক এসব রয়েছে। একপাশে একটা ছোট বাথরুম। ঘরে আর বিশেষ কিছু আসবাবপত্র চোখে পড়ল না। একতলার এই ঘরের গা-লাগোয়া একটা সিঁড়ি উঠে গেছে সোজা দোতলায়। সিঁড়ির অন্যপাশে একটা বন্ধ দরজা। বিনোদ জানাল, ওই দরজাটা দিয়ে নাকি ঘরের পেছন দিকের বাগানে যাওয়া যায়। 

ঘরে ঢুকে আমি বিনোদের সাথে কথা বলছি, এমন সময় সৈকত আমার জামার আস্তিন টেনে জিজ্ঞেস করল,

–“এই দাদা, ওটা কে রে?”

–“কোনটা কে?” 

–“আরে ওই তো দ্যাখ, সিঁড়ির ওপর বসে আছে…একটা মেয়ে।” 

–“মেয়ে? কই আমি তো কাউকেই দেখতে পাচ্ছি না। কী করেই বা দেখব? ওদিকটা তো ঘুটঘুটে অন্ধকার।” 

আমাদের কথা বোধহয় বিনোদ শুনতে পেয়েছিল। সে শুষ্ক হেসে বলল, –“ও কিছু নয়, ছোটবাবু। অনেকদিন বন্ধ ছিল তো ঘরটা, তাই মনে হয় খোলা দরজা দিয়ে কুয়াশা ঢুকে পড়েছে ভেতরে।”আমি বললাম,–“ভাই, তুই খাটে শুয়ে বিশ্রাম কর। আমি এই কাকুটার সাথে একটু কথা বলে আসছি।” এই বলে ওকে ঘরের খাটে শুইয়ে দিয়ে দরজা ভেজিয়ে আমি আর বিনোদ বাইরে বেরিয়ে এলাম। তারপর জিজ্ঞেস করলাম,–“বিনোদ, এই বাংলো বাড়িতে কোনো সমস্যা নেই তো?” 

–“না-না স্যার। এখানে এর আগে আপনাদের মতো আরও অনেকেই রাত কাটিয়েছে। সরকারবাবুর ডাকবাংলোতে একটা রাত কাটাতে আশা করি আপনাদের কোনো সমস্যা হবে না৷ সব ব্যবস্থাই করা আছে। সরকারবাবুরা আর এখানে থাকেন না। বিদেশে ছেলের কাছে চলে গেছেন। পরিতোষবাবু তো সরকারবাবুর চেনা লোক, তাই যাওয়ার আগে এই ডাকবাংলোটা তাঁর কাছেই গচ্ছিত রেখে গেছেন।” 

–“ও। ঠিক আছে বিনোদ। তুমি এখন যেতে পারো। সাহায্য করার জন্য অশেষ ধন্যবাদ।” 

বিনোদ “আচ্ছা স্যার” বলে যেতে গিয়েও আবার ঘুরে দাঁড়াল৷ ওর মুখে অস্থিরতার ছাপ দেখে প্রশ্ন করলাম, –“তুমি কি কিছু বলতে চাও, বিনোদ?” আমার প্রশ্নটা শুনে বিনোদ আমতা-আমতা করে মাথা চুলকে বলল, –“স্যার, ছোটমুখে একটা বড় কথা বলি?” 

তখনই প্রথম বিনোদের মুখে সেই অদ্ভুত ঘটনাটা শুনলাম। নয়নগঞ্জ থেকে আকছার নাকি বাচ্চা চুরি হচ্ছে। যারা নিঁখোজ হয়েছে, তারা নাকি ওই সৈকতেরই বয়সী। কিন্তু কে বা কারা এই কাজ করছে, তাদের কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। এমনকি নিঁখোজ বাচ্চারাও নাকি আর কেউ ফিরে আসেনি। 

বিনোদ চলে যেতেই ঘরে ঢুকে দেখি, সৈকত একমনে বিছানায় বসে ব্যাগ থেকে আঁকার খাতা আর পেন্সিল বার করে কীসের একটা ছবি আঁকছে। কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, “কীরে, কার ছবি আঁকছিস?” 

আমার প্রশ্ন শুনে সৈকত খাতাটা আমার চোখের সামনে তুলে ধরল। দেখি, সে একটা সিঁড়ির ছবি এঁকেছে। সম্ভবত সেটা এই ডাকবাংলোরই সিঁড়ি। সিঁড়ির রেলিং ধরে গলা বাড়িয়ে বসে আছে একটা বাচ্চা মেয়ে। পরনে একটা ফ্রক। মুখটা ফ্যাটফেটে সাদা। চোখদু’টো কালো কুচকুচে। পাতলা ঠোঁটে লেগে আছে একটা বিষন্ন হাসি। গলার কাছে একটা চওড়া কাটা দাগ। প্রশ্ন করলাম, –“এটা কার ছবি এঁকেছিস, ভাই?” 

–“ওই যে ওই মেয়েটার। সিঁড়ির উপর বসে ছিল। তুই ঘরে ঢুকতেই তো হাওয়ায় মিলিয়ে গেল।” 

–“যাঃ! তা আবার হয় নাকি? কই দেখি…”

সৈকতের কথা শুনে সিঁড়িতে আবার টর্চের আলো ফেলে ভালো করে দেখে নিলাম। নাঃ! কেউ তো নেই সেখানে। তবে সৈকত এটা কার ছবি আঁকল? আমার গায়ে একবার কাঁটা দিয়ে উঠল। 

* * *

রাত তখন কত কে জানে। হঠাৎ কী এক নিদারুণ অস্বস্তিতে আমার ঘুমটা ভেঙে গেল। তেষ্টায় গলা শুকিয়ে আসছে। জল খাওয়ার জন্য ব্যাগের দিকে হাত বাড়াতে যাব, হঠাৎ বিছানার পাশে চোখ যেতেই আমার বুকের ভেতরটা হঠাৎ ছ্যাঁৎ করে উঠল! এ কী! সৈকত কোথায়? বিছানা যে বেবাক ফাঁকা। হাতঘড়িতে সময় দেখলাম। রাত প্রায় দু’টো। এই হাড়কাঁপানো ঠাণ্ডায় মাঝরাতে আমার অসুস্থ ভাইটা গেল কোথায়? 

একবার মনে হল, আমি ঘুমোচ্ছি দেখে হয়তো সে একা একাই উঠে বাথরুমে গেছে। হাতে টর্চটা নিয়ে তাড়াতাড়ি চাদর সরিয়ে বিছানা ছেড়ে নেমে এগিয়ে গেলাম বাথরুমের দিকে। কিন্তু নাঃ! বাথরুমটাও যে ফাঁকা। সৈকত তো সেখানে নেই। 

এমন সময় হঠাৎ সিঁড়ির দিকটা থেকে ছমছম শব্দে নুপূরের শব্দ ভেসে আসতেই আমার শরীরের সমস্ত লোম খাড়া হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। পরক্ষণেই শুনতে পেলাম, খিলখিল শব্দে একটা বাচ্চা মেয়ের গলায় হাসির আওয়াজ। সেটা আসছে ওই সিঁড়ির দিকটা থেকেই। আমার বড্ড কৌতূহল হল, টর্চ বাগিয়ে গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে গেলাম সেদিকে। সিঁড়ির কাছাকাছি আসতেই টর্চের আলোয় খেয়াল করলাম, বাংলো বাড়ির বাগানে যাওয়ার পেছনের দরজাটা হাট করে খোলা। জুঁই ফুলের খুব মিষ্টি একটা গন্ধ ভেসে আসছে বাগানের দিক থেকে। সেই গন্ধটা আমার মাথার ভেতরের স্নায়ুপেশিগুলোকে ধীরে ধীরে অবশ করে দিচ্ছে। সম্মোহিতের মতো আমি বাগানের দিকে এগিয়ে চললাম। 

বাতাসের কুয়াশার চাদর ভেদ করে দেখতে পেলাম, মাথার উপর একটা গোল চাঁদ উঠেছে। আজ বোধহয় পূর্ণিমা। টর্চ জ্বালানোর প্রয়োজন হল না, কারণ জ্যোৎস্নার স্নিগ্ধ আলোয় লম্বা বাগানটা ভেসে যাচ্ছে। কিছুদূর এগিয়ে আসতেই দেখতে পেলাম, একটা জুঁই ফুলের ঝোপ, থোকায় থোকায় ফুল ফুটেছে। সেই ফুলের মোহময়ী গন্ধই চারপাশের শীতল বাতাস আচ্ছন্ন করে রেখেছে। এবার সামনের দিকে চোখ পড়তেই আমার শরীরটা একবার ছমছম করে উঠল। আরেহ্! ওটা কে? সৈকত না?

হ্যাঁ, ঠিক তাই। সৈকতই বটে। সে তখন মোহাচ্ছন্ন কলের পুতুলের মতো এক পা এক পা করে এগিয়ে চলেছে বাগানের ভেতরের দিকে। আর কী আশ্চর্য! তার সামনে সামনে বাতাসে ভেসে ভেসে উড়ে চলেছে একটি বাচ্চা মেয়ে। পরনে সাদা একটা ফ্রক, একমাথা খোলা চুল, পায়ে নুপূর। মেয়েটি খিলখিল শব্দে হাসতে হাসতে হাতছানি দিয়ে আমার ভাইকে ডেকে নিয়ে চলেছে। সৈকতকে দেখে আমার সমস্ত ঘোর লাগা ভাবটা তড়িৎগতিতে কেটে গেল। আমি দৌড়ে গিয়ে ওর কাঁধে একটা হাত রেখেই চেঁচিয়ে উঠলাম, –“ভাই? এই ভাই? এত রাতে এই অচেনা জায়গায় কোথায় যাচ্ছিস?” 

সৈকত আমার দিকে ঘুরে তাকাল, তার চোখের দৃষ্টি দেখে আমি চমকে উঠলাম। গোটা মুখটা ব্লটিং পেপারের মতো সাদা ফ্যাটফেটে। ঢুলুঢুলু চোখের মণিতে কেমন যেন মরা মাছের মতো দৃষ্টি। ফ্যাঁসফেঁসে গলায় সে উদাস কন্ঠে বলল, –“আমাকে যেতে দে, দাদা। ও আমাকে নিয়ে যেতে এসেছে।” 

–“কী উল্টোপাল্টা বলছিস? কে নিতে এসেছে?” 

–“ওই যে ওখানে দাঁড়িয়ে আছে। মায়া। ও আমাকে ডাকছে। আমাকে যে যেতেই হবে।” 

সৈকতের কথা শুনে আমার শরীরটা ছমছম করে উঠল। সামনের ঝাপসা অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে দেখি, সেই কুয়াশার মতো সাদা ফ্রক পরা মেয়েটা, হাসি হাসি মুখে জুঁই ফুলের ঝোপটার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। পাথরের মতো স্থির, ঠান্ডা, পলকহীন সেই দৃষ্টি। গলার কাছটা আড়াআড়িভাবে চেরা। সেখান থেকে তাজা রক্তের ধারা গড়িয়ে পড়ে তার সাদা ফ্রকটা লাল রঙে রাঙিয়ে দিচ্ছে। হাতছানি দিয়ে সৈকতকে ডাকছে। আমার বুকের ভেতরে কেউ যেন জোরে জোরে হাতুড়ির বাড়ি মারতে লাগল। কাঁপা কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করলাম, –“ক-কে তুমি? কী চাও?” 

সেই মেয়েটা এবার খিলখিল শব্দে হেসে উঠে ভাসা ভাসা স্বরে জবাব দিল, –“ওই যে ওকে চাই। ওকে আমি নিয়ে যেতে এসেছি।” 

–“কিন্তু কেন? কোথায় নিয়ে যাবে ওকে?” 

–“যেখানে আমরা থাকি। এই বাগানের গভীরে, সুড়ঙ্গপথে। তোমার ভাইকে খুব পছন্দ হয়েছে আমার। আমার তো কোনো খেলার সাথী নেই। তাই ওকে নিয়ে যেতে এসেছি। আমার বয়সী কেউ এখানে এলে আমি তাদের চুপিচুপি ডেকে নিয়ে যাই। বেশিক্ষণ তো আর আমি খেলার সুযোগ পাব না। তার আগেই তো বাপি ওকে মেরে ফেলবে। তারপর নিজের কাছে বন্দি করে রাখবে। আমার বাকি বন্ধুদের আত্মাদেরও বন্দি করে রেখেছে বাবা। আর মাত্র একটা আত্মার প্রয়োজন। তোমার ভাই-এর মৃত্যু হলেই সেই সংখ্যা পূর্ণ হবে। তার পরেই তো বাবা খুঁজে পাবে সরকারবাবুর গুপ্তধন। হিঁ-হিঁ-হিঁ!” 

মেয়েটির কথার অর্থ কিছুই আমার বোধগম্য হল না। সৈকত ঝটকা মেরে আমার হাতটা কাঁধ থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে ঘড়ঘড়ে গলায় বলল, –“আমাকে মায়ার সাথে যেতে দে দাদা। তোকে ছেড়ে চলে যেতে খুব কষ্ট হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু আমি তো আর ফিরতে পারব না। মায়া আমাকে ডাকছে, যেতেই হবে। ওর সাথে খেলা করার যে আর কেউ নেই।” 

–“নাঃ! তুই আমাকে ছেড়ে কোথাও যাবি না, ভাই। ভুলে যাস না, কাল সকালে তোকে শশধরপুরে পৌঁছতেই হবে। সেখানে ছবি আঁকার প্রতিযোগিতায় জিততেই হবে। তবেই তোর প্রাণদায়ী সেই ওষুধ ওরা তোকে দেবে। তুই আবার আগের মতো সুস্থ হয়ে উঠবি। ফিরে আয় ভাই, ফিরে আয়। মায়া বলে কেউ নেই। ও নিশির ডাক।” 

কিন্তু আমি যতই জাপটে ধরে ওকে থামাতে চাই, সৈকতকে কিছুতেই থামাতে পারি না৷ তার শরীরে তখন ভর করেছে আসুরিক শক্তি। সে আমার বাঁধন ছাড়িয়ে ছুটে যেতে চাইছে সেই কুয়াশার পিছু পিছু। সেই মেয়েটি এবার ভয়ার্ত গলায় চেঁচিয়ে উঠল, –“বড্ড দেরি করে ফেললে। বাপি যে চলে এসেছে। আমার আর তোমার ভাইয়ের সাথে খেলা করা হল না। বাপি ওকে এখনই মেরে ফেলবে।” 

–“ব-বাপি মানে? কে তোমার বাপি?” 

–“একবার পেছনে ঘুরেই দেখো না।” 

মেয়েটির কথা শুনে পেছন ঘুরে তাকাতেই প্রচন্ড চমকে উঠলাম। একী! কখন যে চুপিচুপি এক লম্বাচওড়া চেহারার ছায়ামূর্তি আমার ঠিক পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে, বুঝতেই পারিনি। আধো-অন্ধকারে সেই ছায়ামূর্তির মুখ স্পষ্ট করে বোঝা যাচ্ছে না। কেবল দেখতে পাচ্ছি, আগুনের ভাঁটার মতো একজোড়া গনগনে লাল চোখ যেন হিংস্র প্রতিহিংসার আগুনে দাউদাউ করে জ্বলছে। সেই ছায়ামূর্তি এবার গমগমে বাজখাঁই কন্ঠে কেটে কেটে বলল,

–“ভালোয় ভালোয় আপনার ভাইকে আমার হাতে তুলে দিন, দত্তবাবু। সে এখন আমার শিকার। কথা শুনলে আপনার প্রাণ ভিক্ষা দেব। নইলে আপনার ভাইয়ের সাথে সাথে আপনাকেও মেরে এই বাগানে পুঁতে দেব।”

লক্ষ করলাম, লোকটির উঁচু করা হাতে ধরা রয়েছে একটা বড় ধারালো চকচকে দাঁ। 

মুখ চিনতে না পারলেও গলার স্বর শুনে বুঝতে অসুবিধা হল না। এ সেই স্টেশন মাস্টারের গলা। পরিতোষ সমাদ্দার। আতঙ্কে আমার বুক শুকিয়ে গেল। শুষ্ক গলায় বললাম,

–“এসব কী বলছেন, পরিতোষবাবু? আপনার কথাতেই তো ভরসা করে ওকে নিয়ে এখানে এসে উঠলাম। আপনি তো ওর অসুস্থতার কথা সবই জানেন…তারপরেও…”

আমার কথা শেষ হওয়ার আগেই আকাশ ফাটিয়ে বিশ্রী শব্দে হো-হো করে নিষ্ঠুর ভঙ্গিতে হেসে উঠে পরিতোষ সমাদ্দার বললেন, 

–“সব জানি বলেই তো এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এমনিতেই আপনার ভাইয়ের হাতে আর খুব বেশি সময় নেই। কিছুদিন পর ছেলেটা এমনিতেই মারা যাবে। তার চেয়ে ভালো নয় কি, মরার আগে ও কোনো মহৎ উদ্দেশ্যে কাজে লাগুক? আপনার ভাইকে মেরে ফেললেই সে হয়ে উঠবে সর্বজ্ঞানী, ঠিক অন্যদেরই মতো। তখন ওরা আমার কাজটা আরও সহজ করে দিতে পারবে। আপনার ভাইয়ের মতো আরও অনেক বাচ্চাদের আমি বলি দিয়েছি। তাদের আত্মাকে বন্দি করে রেখেছি ছোট ছোট কাঁচের শিশিতে। আপনার ভাই প্রেতযোনি প্রাপ্ত হলেই ধাঁধার শেষ সূত্র আমার চোখের সামনে উন্মুক্ত হয়ে যাবে সরকারবাবুর গুপ্তধনের পথ। তারপরেই ওদের সবার ছুটি। হা-হা-হা।” 

চরম আতঙ্ক আর বিস্ময়ে আমি তখন বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছি। বেশ বুঝতে পারলাম, এই পরিতোষ সমাদ্দার লোকটা বদ্ধ উন্মাদ। তিনি দাঁ-টা হাতে চেপে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছেন আমাদের দিকে। পরিতোষ সমাদ্দার আবার গর্জে উঠলেন, –“আমার শিকারকে ছেড়ে দিন, দত্তবাবু। নইলে আজ আপনার মৃত্যু নিশ্চিত।” 

জ্যোৎস্নার মৃদু আলোয় দেখতে পেলাম, হাতে উদ্যত দাঁ-টা নিয়ে পরিতোষ সমাদ্দার পায়ে পায়ে এগিয়ে আসছেন আমাদের দিকে। ছুটে পালিয়ে যাব ভেবেও পালাতে পারছি না, মনে হচ্ছে, পা’দুটো যেন আষ্টেপৃষ্ঠে মাটির সাথে বেঁধে ফেলেছে একঝাঁক বন্য লতাপাতার শেকড়। মুখে ইষ্টনাম জপতে জপতে সৈকতকে আড়াল করে ভয়ে চোখ বুজে ফেললাম আমি। আর ঠিক তখনই একটা কান্ড ঘটল। 

সেই কুয়াশা মাখা মেয়েলি ছায়ামূর্তিটি হঠাৎ বাতাসে ভেসে এসে দাঁড়াল ঠিক আমাদের সামনে। দু’হাত দু’দিকে ছড়িয়ে আড়াল করে দাঁড়াল সৈকতকে। তারপর তীক্ষ্ণ কন্ঠে বলল, –“না বাপি। আমি কিছুতেই সৈকতকে নিয়ে যেতে দেব না। আমি আগে ওকে দেখেছি। তুমি কথা দিয়েছিলে, এবার যাকে এনে দেবে তাকে তুমি মারবে না। আমার খেলার সাথী হয়ে থাকবে ও। আমার আগের বন্ধুদের তুমি বন্দি করে রেখেছ নিজের কাজের জন্য। সৈকতকে আমি কিছুতেই নিয়ে যেতে দেব না।” 

–“কী বললি মায়া? তুই আমার কাজে বাধা দিবি? তুই জানিস না, ওই গুপ্তধনের জন্য আমি কত বছর ধরে অপেক্ষা করে আছি? ভুলে যাস না হারামজাদি, কীভাবে তোকে গলা কেটে খুন করেছিলাম আমি। নিজের মেয়ে বলে তোকেও ছাড়িনি। রাস্তা ছাড় বলছি! নইলে বাকিদের মতো তোকেও বোতল বন্দি করে ফেলব।”

গর্জন করে উঠলেন পরিতোষ সমাদ্দার। 

–“নাঃ! কিছুতেই না! সৈকত কেবল আমার শিকার! আমি কিছুতেই ওকে তোমার হাতে তুলে দেব না!”

বলে চিৎকার করে এবার মেয়েটি ঝাঁপিয়ে পড়ল পরিতোষ সমাদ্দারের উপর। টাল সামলাতে না পেরে তাঁর বিশাল শরীরটা আছড়ে পড়ল বাগানের মাটিতে। সেই মেয়েটি এবার হিংস্র নখের আঘাতে ক্ষত-বিক্ষত করে দিতে লাগল তাঁর মুখ। অসহ্য যন্ত্রণায় এক অমানুষিক আর্তনাদ করে উঠলেন পরিতোষ সমাদ্দার। আমার চোখের সামনে শুরু হল প্রেতে ও মানুষে এক অস্বস্তিকর ধ্বস্তাধস্তি। 

কতক্ষণ যে পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে সেই অসম লড়াই দেখছি, তার খেয়াল ছিল না। সৈকতের দেহটা তখন ক্লান্তিতে অবসন্ন হয়ে ধীরে ধীরে ঢলে পড়ছে আমার দুই বাহুতে। হঠাৎ কানের কাছে একটা খসখসে গলা শুনতে পেলাম, –“স্যার…প্রাণে বাঁচতে চান তো শিগগির পালিয়ে যান এখান থেকে…শিগগির…” 

চমকে উঠেছিলাম। কই আমার কাছাকাছি তো আর কেউ দাঁড়িয়ে নেই। তাহলে কে এমন ফিসফিস করে আমার কানের সামনে কথা বলল?

–“ক-কে?” 

–“আমি স্যার। বিনোদ। বাপ-মেয়ের মধ্যে এখন তুমুল অশান্তি বেঁধেছে, এই সুযোগ…পালিয়ে যান স্যার। আপনার ভাইয়ের প্রাণ নিয়ে পালিয়ে যান এখান থেকে…” 

কানের কাছে বিনোদের গলা শুনতে পাচ্ছি ঠিকই, কিন্তু তাকে ধারেকাছে কোথাও চোখে দেখতে পাচ্ছি না। আমার শরীরটা শিরশির করে উঠল। আমি আর দেরি করলাম না। প্রেতে-মানুষে সেই অসম লড়াই-এর দাপটে আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠছে…বাগানের সব ঘাস, ঝোপঝাড়, জঙ্গল সব পিষে যাচ্ছে। আমি কোনোমতে সৈকতের অবসন্ন অচৈতন্য দেহটা কাঁধের উপর ফেলে বাগানের বেড়া টপকে দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে দৌড়াতে শুরু করলাম। কোনদিকে চলেছি, কিছুই জানি না। কেবল একটা অশরীরী কণ্ঠস্বর শুনতে পাচ্ছিলাম ঠিক আমার কানের কাছে,

–“এই দিক দিয়ে আসুন স্যার… বাঁ-দিকে… এবার সোজা স্টেশনের দিকে… দৌড়োন স্যার… আরও জোরে দৌড়ে পালিয়ে যান!...” 

* * *

সেই বিভীষিকার রাতে কীভাবে যে আমি সরকারবাবুর ডাকবাংলো থেকে পালিয়ে এসে নয়নগঞ্জ স্টেশনে পৌঁছে স্টেশন মাস্টারের ঘরের সামনে আছাড় খেয়ে অজ্ঞান হয়ে পড়ে গিয়েছিলাম, তা আমি জানি না। ভোরবেলায় যখন জ্ঞান ফিরল, তখন দেখি, আমি আর সৈকত স্টেশন মাস্টারের ঘরের একটা চৌকির উপর আড়াআড়ি ভাবে শুয়ে আছি। একজন বেঁটেখাটো চশমা পরা গুঁফো মধ্যবয়সী লোক আমার মুখের ওপর ঝুঁকে দাঁড়িয়ে ছিলেন। এই মুখ আমার অচেনা। জ্ঞান ফিরতেই জিজ্ঞেস করলাম,

–“আ-আমি…আমরা…কোথায়? আপনি কে?” 

–“নমস্কার। আমি এই নয়নগঞ্জের স্টেশন মাস্টার পরিতোষ সমাদ্দার। আপনারা দু’জন আমার ঘরের দরজার সামনে অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলেন। কী ব্যাপার বলুন তো? আপনারা কারা? এখানে কোথায় এসেছিলেন?” 

লোকটার কথা শুনে আমার মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। এই লোকটা যদি নয়নগঞ্জের স্টেশন মাস্টার পরিতোষ সমাদ্দার হয়, তাহলে কাল যার সাথে আলাপ হল… সেই লোকটি তাহলে কে ছিল? পরিতোষ সমাদ্দারের এনে দেওয়া গরম চা খেয়ে কিছুটা স্বস্তি বোধ করলাম। তারপর ধাতস্থ হয়ে ধীরে ধীরে সব কথা তাঁকে প্রথম থেকে খুলে বললাম। সৈকত জানাল, কাল রাতের কথা ওর কিছুই মনে নেই। 

আমার মুখে সব কথা শুনে পরিতোষ সমাদ্দারের মুখ গম্ভীর হয়ে গেল। তিনি থমথমে মুখে বললেন, –“হুম! বুঝেছি। এ সেই ভানু মিত্তিরের কাজ। আমার নাম ভাঙিয়ে আপনাদের ধোঁকা দিয়েছে। তবে কেবল আপনারা নন, ভানু এর আগেও অনেককে টেনে নিয়ে গেছে ওই পোড়ো ভুতুড়ে বাংলো বাড়িতে। তাদের আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।” 

–“ভানু মিত্তির… কে?” 

–“দত্তবাবু, জোর বাঁচা বেঁচে গেছেন। আপনাদের ভাগ্য খুব ভালো বলতে হবে। ভানু মিত্তির এই নয়নগঞ্জেরই লোক ছিল। ছিল বলছি, কারণ ভানু এখন আর বেঁচে নেই। বেঁচে থাকতে ভানু ছিল খুব লোভী আর স্বার্থান্বেষী একজন মানুষ। তবে ইতিহাস নিয়ে পড়াশোনায় বেশ জ্ঞান ছিল ওর। সবাই বলত, বেশি পড়াশোনা করতে করতে ভানুর মাথাটা নাকি খারাপ হয়ে গিয়েছিল। কেউ কেউ বলত, ভানু নাকি তন্ত্রমন্ত্র, কালাজাদু, এসবও জানত। সারাদিন এদিকে-সেদিকে কীসব যেন খুঁজে বেড়াত। এই নয়নগঞ্জে এক উচ্চপদস্থ সরকারী কর্মচারী মলয় সরকারের একটা বাংলোবাড়ি ছিল। তিনি ছিলেন বিপত্নীক। তাঁর একটা ছোট ছেলে ছিল। ভানু তাকে পড়াতে যেত। ওই সরকার বাংলোতে নাকি অনেক গুপ্তকুঠুরি আছে। শোনা যায়, সেখানের কোনো একটা গুপ্তকুঠুরিতে নাকি লুকনো ছিল তাঁদের পূর্বপুরুষের রাশি রাশি ধনরত্ন। কিন্তু তার খোঁজ কেউ জানত না। তবে একটা কথা গ্রামের বাতাসে উড়ে বেড়াত, সেই গুপ্তধন উদ্ধার করতে হলে নাকি ভেদ করতে হবে একটা প্রাচীন ধাঁধার রহস্য। সেই ধাঁধা লুকোনো আছে কোনো এক প্রাচীন পুঁথিতে। তবে সেসব কথা সত্যি কী মিথ্যে, তা কেউ জানে না। খুব সম্ভবত সরকারবাবুর মুখে সেই গুপ্তধনের কথা শুনে ভানুর লোভী মন আবার মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। গোপনে সে অনুসন্ধান শুরু করে। অনেক চেষ্টার পর সে এক গুপ্তকুঠুরির পেটের ভেতর থেকে খুঁজে পায় সেই পুঁথিটা। কিন্তু সেই ধাঁধাটার সমাধান করতে পারেনি। সেখানে নাকি বলা ছিল, মোট তেরোটা বাচ্চা, যাদের বয়স আঠারো হয়নি, তাদের একটা বিশেষ প্রক্রিয়ায় বলি দিতে হবে, তারপর তাদের আত্মাদের বন্দি করে রাখতে হবে। সেই তেরোজন বাচ্চার আত্মাই নাকি কেবলমাত্র সেই গুপ্তধনের ধাঁধার উত্তর বলতে পারবে।

ভানুর মাথায় খুনপোকাটা চাগাড় দিয়ে উঠল। প্রথম যে বাচ্চাটাকে সে মারে, সে ছিল ওই ভানুরই নিজের মেয়ে, মায়া। তাকে গলা কেটে খুন করেছিল ভানু। তার দ্বিতীয় শিকার হয় মলয়বাবুর ছোট্ট ছেলেটা, নাম বিল্টু। বাধা দিতে এসে ভানুর হাতে খুন হন মলয়বাবুও। মলয় সরকারের মৃতদেহটা সে বাগানের মাটিতে পুঁতে দিয়েছিল। কিন্তু বিল্টুর আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। যাইহোক, ভানুও কিন্তু সেই গুপ্তধনের অভিশাপের হাত থেকে বাঁচতে পারেনি। একদিন সকালে সরকার বাংলোর বাগানে ঘাড় মটকানো অবস্থায় ভানুর দোমড়ানো দেহটা আবিষ্কার হয়। স্থানীয় লোকেদের ধারণা, কোনো হিংস্র প্রেত ছাড়া কারুর পক্ষে এভাবে একটা মানুষকে মেরে ফেলা সম্ভব নয়। মলয় সরকারের মৃত্যুর পর তাঁর বাসস্থানটাও পরিত্যক্ত হয়ে যায়। সকলে বলত, ভূত বাংলো। অনেকে নাকি অনেক কিছু দেখেছে। কিন্তু তারপরেই নয়নগঞ্জ থেকে হঠাৎ ছোট ছোট বাচ্চা চুরির হার বেড়ে যায়। সকলের ধারণা, ভানু মিত্তির নাকি প্রেতযোনি প্রাপ্ত হয়েছে। তার অতৃপ্ত আত্মাই বাচ্চাগুলোকে ধরে নিয়ে গিয়ে তাদের বলি দিয়েছে। অনেকে তাকে দেখেওছে।

আপনাদের মতো পথভুলে যদি কোনো পথিক এখানে এসে পড়ত, আর তাদের সাথে যদি কোনো ছোট বাচ্চা থাকত, তবে ভানু মিত্তিরের চোখকে তারা এড়াতে পারত না। সে ভেক ধরে তাদের টেনে নিয়ে যেত ওই ভূত বাংলোয়। তারপর খুন করে বাগানের মাটিতে পুঁতে দিত। এখনও পর্যন্ত মোট বারোটা বাচ্চার নিঁখোজের খবর পাওয়া গেছে। আপনার ভাইটি ছিল তার তেরো নম্বর এবং শেষ শিকার। আপনাদের কপাল ভালো, জোর বাঁচা বেঁচে গেছেন। আজ পর্যন্ত অন্য কেউ ভানুর প্রেতের হাতে পড়ে প্রাণ নিয়ে ফিরতে পারেনি।” 

পরিতোষ সমাদ্দারের কথা শুনে আমার সমস্ত শরীর শিউরে উঠল। জিজ্ঞেস করলাম, “আর বিনোদ? এই নামের কাউকে চেনেন?” 

নয়নগঞ্জের মধ্যবয়সী স্টেশন মাস্টার ফোঁস শব্দে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,

–“বিনোদ বড়ালের কথা বলছেন তো? হুঁ! চিনতাম। বিনোদ আমারই অ্যাসিস্টেন্ট ছিল। স্থানীয়… বড় ভালো ছেলে ছিল। এইতো… কয়েক সপ্তাহ হল, চোরা জন্ডিস হয়ে তিনদিনের জ্বরে ভুগে জলজ্যান্ত প্রাণটা চোখের সামনে শেষ হয়ে গেল। কিন্তু কী জানেন দত্তবাবু, আমার মনে হয়, বিনোদ এখনও এই নয়নগঞ্জ স্টেশনের মায়া কাটাতে পারেনি। সে এখনও এখানেই থাকে। আমি অনেকবার তার অস্তিত্ব অনুভব করেছি। যাইহোক, আপনাদের শশধরপুর যাওয়ার ট্রেন কিন্তু আরেকটু পরেই এসে পড়বে। তৈরি হয়ে নিন।” 

এরপর ভোরের ট্রেন ধরে আমি সৈকতকে নিয়ে পৌঁছে গিয়েছিলাম শশধরপুরের সবুজ সংঘের মাঠে বসে আঁকো প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠানে। সৈকত সেদিন মনপ্রাণ দিয়ে ওর সর্বসেরা চেষ্টাটুকু দিয়ে ছবি এঁকেছিল। কিন্তু বিচারকের বিচারে ওর আঁকা ছবি প্রথম হতে পারেনি। স্বভাবতই, ক্যান্সারের সেই জীবনদায়ি ওষুধ ভোগ করার সৌভাগ্য জুটেছিল অন্য আরেকটি মেয়ের কপালে। সৈকত খুব মনমরা হয়ে গিয়েছিল। শশধরপুর থেকে ফিরে অবশ্য ও আর বেশিদিন বাঁচেনি। সপ্তাহ দুই পর, একদিন রাতে, সৈকত আমাকে ছেড়ে পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে চিরদিনের মতো চোখ বুজল। ওর মৃত্যুর শোকটা আমি মেনে নিতে পারিনি। এই একাকীত্বের দাসত্বে মানসিকভাবে প্রচন্ড ভেঙে পড়েছিলাম। 

কিন্তু না, সৈকত আমাকে পুরোপুরি ছেড়ে যায়নি। মৃত্যুর পর ও এখনও আমার সাথেই থাকে। আমি ওকে দেখতে পাই, ওর সাথে কথা বলি। কিন্তু সৈকতের মনে বড় দুঃখ। এই সুবিশাল প্রেতলোকে ওর খেলার আর কোনো সঙ্গী নেই। সৈকতের শুকনো মুখটা দেখে আমার বুকের ভেতরটা তোলপাড় হয়ে যায়। ঠিক করেছি, যেভাবেই হোক, ওকে একটা খেলার সাথী ঠিক জোগাড় করে দেব। আজও তাই, রাত বাড়লে, অন্ধকারে গা ঢেকে আমি বেরিয়ে পড়ি ছোট কোনো বাচ্চার সন্ধানে। সারারাত গিয়ে বসে থাকি স্টেশনে। যদি পথভুলে কোনো পথিক সাথে বাচ্চা নিয়ে এখানে রাতের বেলায় এসে পড়ে, তাহলে আমিও সেই ভানু মিত্তিরের মতোই ভুলিয়ে-ভালিয়ে তাদের নিয়ে আসব আমার বাড়িতে। আর তারপর…


এবং বৃত্তের বাইরে, সেপ্টেম্বর ২০২৫

No comments:

Post a Comment