রংগার ফিরে আসা - দেবগুরু চট্টোপাধ্যায় - ভূতের গল্প - এবং বৃত্তের বাইরে

rongar phire asa - A horror Story by debguru

রংগার ফিরে আসা

দেবগুরু চট্টোপাধ্যায়


প্রচুর আলো হইচই সাইকোডেলিক মিউজিক ড্রাগসের যে গোয়া, তার থেকে দূরে – নিরালা গ্রাম, সবুজ ক্ষেত, জলাজঙ্গলে ভরা দিবার আইল্যান্ড আমার বড় পছন্দের জায়গা। এসেছিলাম গোয়া ট্যাটু ফেস্টিভ্যালে। সেখান থেকে সড়কপথে আড়াইঘন্টা সফরশেষে ফেরিতে মাণ্ডবী নদী পার করে এসে পৌঁছেছি এই নিরালা বিজন দ্বীপে। হোম-স্টে বুক করা ছিল আগে থেকেই।

ডাব-চিংড়ি আর পর্ক ভিন্ডালু দিয়ে দুর্দান্ত লাঞ্চ সেরে জানুয়ারির ঝিমঝিমে রোদ গায়ে মেখে বেরোলাম হাঁটতে। দিবারের সরু সরু গলিপথগুলো ধরে। গন্তব্য মাণ্ডবী নদীতীর। লোকালয় শেষে পথ গেছে ঝোপঝাড় জঙ্গল ভেদ করে। জঙ্গলের ফাঁকে মাঝে মাঝে চোখে পড়ছে পর্তুগীজ কায়দায় তৈরি পুরানো বাংলো। লোক থাকে কিনা বোঝার উপায় নেই। শরীরে নদীর বাতাস এসে লাগল, সাথে ভেসে এল উকুলেলের ধুন। কোঙ্কনি এলাকায় কেউ বাজিয়ে চলেছে বাংলার মেঠো সুর! ঝুমুর তালে বাজছে ‘যে জন প্রেমের ভাব জানে না।’ গাছের ডালের জটলা সরিয়ে এগোলাম সুর লক্ষ্য করে। অনেকটা বানজার জমির ওপারে জঙ্গুলে এলাকা, গাছপালার ফাঁকে দাঁড়িয়ে একাকী বাংলোবাড়ি। সেটাই সুরের উৎস। 

কাঠের বেড়ার সামনে দাঁড়িয়ে ঢুকব কিনা ইতস্ততঃ করছি, উকুলেলে থেমে গেল। বাড়ির ভেতর থেকে ঘড়ঘড়ে কফ জড়ানো বাজখাঁই গলা ভেসে এল, 

-“হু ইজ দেয়ার?”

-“আই য়্যাম এ ট্যুরিষ্ট।” 

-“হোয়াট ডু ইউ ওয়ান্ট হিয়ার?”

বলতে বলতে এক ঢ্যাঙা অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান দরজা খুলে বারান্দায় এসে দাঁড়ালেন। ফটফটে সাদা গায়ের রঙ; মাথার সামনেটায় টাক। মাঝমাথা বেয়ে লম্বা হয়ে নামা সোনালী চুল পনিটেল করে বাঁধা। থুতনি থেকে দাড়ি ঝুলছে ঋষি অরবিন্দের মত। চোখে হাল্কা শেডের সানগ্লাস। সেটা খুলে আমায় আপাদমস্তক মাপতে মাপতে প্রশ্ন করলেন,

“আর ইউ এ ক্যাট পার্সন?”

আমার জ্যাকেটের গোটানো হাতার বাইরে বেরিয়ে থাকা মুখব্যাদান করা বিড়ালের ট্যাটুটা দেখে ধারণা করেছেন। বলতে পারতাম, ‘না, আমি বিড়ালপ্রিয় মানুষ নই, ট্যাটুপ্রিয় বলতে পারেন।’ না বলে আলাপ এগনোর লোভে মিচকি হেসে ঘাড় হেলিয়ে জানতে চাইলাম,

“ফ্রম হোয়ার ডু ইউ লার্নড দ্যাট বেঙ্গলি সং?”

সাহেব সানগ্লাসটা চোখে ফেরৎ করে ঝরঝরে বাংলায় বললেন, 

“বাঙালি দেখছি! আমিও বাঙালি। বসিরহাটের ছেলে। আসুন, ভেতরে আসুন। কোথায় উঠেছেন এখানে?”

কিচেন থেকে বিয়ার আর কয়েকটা প্যাশান ফ্রুট কেটে নিয়ে এসে বাগান লাগোয়া বসার ঘরের টেবিলে রাখতে রাখতে আমার বিস্মিত মুখের দিকে চেয়ে জানালেন,

“এখানে সবাই আমায় ফ্রেডি গোমস নামে জানে। আসল নাম অরিন্দম আদক। বছর পনেরো রয়েছি দিবারে।”

হাইব্যাক সোফায় ধপাস করে দেহটা রেখে বিয়ারের বোতল মুখে ঠেকালেন। প্রায় এক তৃতীয়াংশ গলায় চালান করে একটু থম ধরে বসে থেকে বললেন,

“অনেক বছর পর কাউকে নিজের আসল নামটা বললাম। নামটা মুখে আনলাম।”

“এতদূরে পড়ে আছেন এতবছর, দেশের জন্য মন কেমন করে না? যেতে ইচ্ছে করে না!”

ওনার অনুমতি নিয়ে দেয়ালে ঝোলানো উকুলেলেটা নামিয়ে নেড়েচেড়ে দেখতে দেখতে প্রশ্ন করি।

“যেখানে ভালো লাগে, যে দেশে মন বসে যায় – সেটাই আমার দেশ।”

উদাসী নরম সুরে বলেন। প্রসঙ্গ বদলান। বাংলার এটা ওটা সেটা খুঁটিনাটি খবর নিতে থাকেন। ভদ্রলোকের ফটফটে সাদা রঙ আর সোনালী চুলের রহস্য আমি বুঝে গেছি। অরিন্দম আদক এলবিনিজম মানে ধবল রোগে আক্রান্ত। এ রোগে দেহের মেলানিন কমে যায়, পিগমেন্টেশান হয় না। 

উনি সেসব বাংলা ব্যান্ডের হাল-হকিকত জানতে চাইছিলেন যেগুলো অধুনালুপ্ত, অনেকদিন প্রোগ্রাম করে না, বা মিউজিক এলবাম রিলিজ করে না। করোনাকালের পর থেকে বাংলা গায়কদের কেমন হাঁড়ির হাল তা বলতে বলতে ফসিলসের চন্দ্রমৌলির আত্মহত্যার খবরটা জানাই। অরিন্দম চুপ হয়ে যান। দরজার ফ্রেম, সোফা, ম্যাট্রেস, মিটসেফ, সব জায়গায় বেড়ালের আঁচড়ের দাগ। অরিন্দমকে কথায় ফেরানোর জন্য বললাম, “ক’টি বেড়াল আপনার? সারাদিন বাইরে বাইরে ঘুরে বেড়ায়, না?”

প্রশ্নে ঝটিতে তাকান অরিন্দম।

“একটা। একটাই বিড়াল আমার। রংগা। আপনার ডানদিকে ওই জানলার গোবরাটটায় বসে আছে।”

ভদ্রলোকের মুখে ঠাট্টার ভাব নেই। ওনার সাথে পরিচয় এত গভীর হয়নি যে উনি এমন উদ্ভট ঠাট্টা করতে পারেন আমার সাথে। একটু বিরক্ত হয়ে খালি গোবরাটটায় তাকিয়ে বলি, “ও বোধহয় জানলা দিয়ে বেরিয়ে পাশের ঝোপে চলে গেছে।”

“না না। ওখানেই বসে আছে। এক মনে আপনাকে দেখছে। আগে আমাকে না ছুঁলে ওর অস্তিত্ব বুঝতে পারতাম না। এত বছর একসাথে থেকে এখন স্পষ্ট বুঝতে পারি রংগা কোথায় আছে, কি করছে।”

ছিটগ্রস্থ নাকি! নাঃ, দেশের মানুষ পেয়ে একটু ঠাট্টা জুড়েছে বোধহয়। পালটা মশকরা করে শূন্য গোবরাট লক্ষ্য করে হাত বাড়িয়ে আঙুল নেড়ে ইশারা করে ডাকি, “আয়ঃ, আয়ঃ। রংগা আয়ঃ।” 

অরিন্দম বাঁকা হাসি দিয়ে বলেন, “ওভাবে ডাকলে আসবে না। আপনাকে পছন্দ হলে আসবে। আপনার তো আসলে বিশ্বাসই হচ্ছে না যে ওখানে একটা বিড়াল বসে আছে।”

চোখে উপচে পড়া হাসি নিয়ে মাথা নেড়ে জানাই– “না।”

উঁচু পিঠের সোফাটায় শরীর এলিয়ে সামনের চৌকো সেন্টার টেবিলের ওপর ধরাম করে একটা পা তুলে আরেক পা তার ওপর চাপালেন। মাথা পিছনে হেলিয়ে বোতল উপুর করে তলানি অব্দি বিয়ারটা গলায় চালান করার পুরো সময়জুড়ে চোখের তলা দিয়ে আমায় মেপে চললেন অরিন্দম আদক। শূণ্য বোতল গড়িয়ে দিলেন কাঠের মেঝেতে। 

গড়গড়িয়ে বোতলটা কিচেনের দিকে যেতে যেতে একধাক্কায় অন্যদিকে ঘুরে গেল। অদৃশ্য কিছু বোতলটার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে। ঘরময় বোতলটা এতোলবেতোল গড়িয়ে খেলতে লেগেছে। এই অদৃশ্য কিছুটা অবশ্যই বেড়াল। ক্যাট পার্সন না হলেও বিড়ালের গড়ানে কোনোকিছু নিয়ে খেলার ধরণ আমার অজানা নয়। মিনিট খানেকের মধ্যেই নিচু একটা মিটসেফের তলায় ঢুকে বোতলটা আটকে গেল। অদৃশ্য একজোড়া থাবা চাপড়ে চাপড়ে সেটা বের করার চেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে বোতল খেলায় আগ্রহ হারালো শেষমেশ। 

এই একমিনিট টানা একটা পুঁ শব্দ বেজে গেছে কানে। শব্দের ওপার থেকে শোনা যাচ্ছিল অরিন্দমের খুকখুক হাসির আওয়াজ। পোষা বেড়ালের খেলা দেখে মজা পাচ্ছেন। টের পাচ্ছিলাম ঘাড়ের কাছের মেরুদাঁড়া শক্ত হয়ে গিঁট পাকিয়ে উঠছে। আঙুলগুলো অবশ, হাতের তালু পায়ের তলা ঘামছে। কপাল গলা থেকে ঘাম গড়িয়ে নামছে শেষ জানুয়ারিতে। এটা আমি কি দেখলাম! বিস্ফারিত চোখে তাকাই অরিন্দমের দিকে। ওর মুখের মজা পাওয়া হাসিটা আরো ছড়ালো। প্রশ্ন করতে গিয়ে মুখে জিভের হদিশ পাচ্ছি না; যাকে বলে, বিড়ালে জিভ নিয়ে গেছে। লোকটা বাজিকর? ভুডু জানে! নির্জন দিবার দ্বীপের বিজন জঙ্গলে বসে গুপ্তবিদ্যার চর্চা করে? এ কার পাল্লায় পড়লাম আমি! 

সব প্রশ্নগুলোই বোধহয় চোখে ফুটে উঠেছিল। অরিন্দম আদক সোফার হাতলে এলানো ডান হাত তুলে মুদ্রায় বরাভয় দেখান। 

“আরে আরে এত ভয় পেয়ে যাবেন না। কোনো ভূত-পিশাচ চালক নই আমি। তান্ত্রিক টান্ত্রিক নই। শান্ত হয়ে বসুন। আরেকটা বিয়ার নিন। ব্যাপারটা কি বলি আপনাকে। একটু আগে বললে ইয়ার্কি ভেবে বসতেন। এখন আপনি বিশ্বাস করবেন। শুনুন।”


রংগার কাহিনী 

এনেছে বর্ষার প্রথম ইলিশ। সাড়ে পাঁচশো গ্রামের মাছ আটানব্বই টাকা পড়ে গেল। ছুটির দিনটায় নিজেকে বেশ মৎসমোল্লা রেঁধে খাওয়ায়। সকালে আজ ঘুম ভাঙলই ঝমঝম বৃষ্টির শব্দে। বৃষ্টি ঠেঙিয়ে বাজার যাওয়ার উৎসাহ টের পায় না। বিছানায় বসে সিগারেট জ্বালিয়ে অলস আঙুলে মৃৎকরোটি এশট্রেতে ছাই ঝাড়তে ঝাড়তে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলো, ডিমভাজা দিয়েই দুপুরের খাওয়া সারবে। সন্ধ্যায় মামনের সাথে প্রেম করতে বেরিয়ে বাইরে কোথাও খেয়ে ফিরবে। একচটকায় সারাদিনটা ছকে ফেলে বিছানা ছেড়ে ফ্রেশ হতে না হতেই বৃষ্টি উধাও। আকাশ ঝকঝকে। তক্ষুনি বাজারে রওনা হয় মরসুমি ইলিশ ভোজন শুরুর সিদ্ধান্ত নিয়ে। 

বাজারের ব্যাগ হাতে পাড়ায় ঢুকে রাস্তার খোঁদলে জমা জল এড়াতে উঁচু ফুটপাথ ধরে হাঁটছিলো। ক’পা এগোতেই চমক লাগে, দাঁড়িয়ে যায়। নিয়োগীবাড়ির পাঁচিলে বসা ধোসকা হুলোটাও ওকে দেখে পেট চাটা থামিয়ে স্থির, সতর্ক। নাক কাঁপিয়ে ব্যাগের মাছের ঘ্রাণ নিচ্ছে, চক্ষুস্থির করে ওকে মাপছে। এই সুযোগে ও পুঙ্খানুপুঙ্খ খুঁটিয়ে দেখে নিয়েছিল ভীষণ চেনা লাগা জীবটাকে। যেটার পরিচর্যা চালাচ্ছিলো সেই পেটের মত বুকটাও সাদা, বাকি দেহে হলুদ কালোর বিচিত্র ছোপ। মুখের বাঁদিক কালো, ডানদিক হলুদ। হলুদ নাকের ডগায় বাটারফ্লাই গোঁফের মত কালো ছোপ। কালো কানে ছিটছিটে হলুদ ছাপ। একইরকম কালোয় হলুদে লেজ; দড়ির মত, ঝোপালো নয়। সামনের ডান পা কালো, বাঁ পা সাদা। হুবহু রংগা। তার দশ বছর আগে হারিয়ে যাওয়া পোষ্যটার অবিকল সংস্করণ। চোখে শুধু সেই পরিচিতির আভাস নেই। থাকার কথাও নয়, কেননা এ রংগা নয়। কোত্থেকে এল এটা! তিনবছর এ পাড়ায় আছে কখনো তো চোখে পড়েনি! তাকে একঠায় চেয়ে থাকতে দেখে বেড়ালটা মৃদু ডাক শোনায়। অঙ্গমার্জন অসমাপ্ত রেখে, ঝুঁকে আসা আমগাছের মোটা ডালায় টুক করে চড়ে সুললিত মার্জার গমনে পাতা ডালে ছায়ান্ধকার ঝুপসি কন্দরে হারিয়ে যায়।

তেল গরম হতে নুন-হলুদ মাখানো দুটো টুকরো কড়ায় ছাড়া মাত্র ডানপায়ের পাতার ওপর পরপর দুটো ছোট্ট হাল্কা চাপ পড়ে। সাথে সাথে একটা বিদ্যুৎচমক পা থেকে মাথায় গিয়ে জোর ঝিলিক মারে। কড়ায় চড়বড় শব্দের মাত্রা জানান দিচ্ছে মাছ ওল্টানোর সময় হল, তাতেই সার ফেরে। খুন্তি হেলিয়ে মাছ ওল্টায়। আড়ষ্ট ঘাড় নরম হয়। নীচে দেখে। না, পায়ের কাছে কেউ নেই। আশেপাশে তাকায়। থেমে থেমে চোখ চালায় খাটের তলা, বেডসাইড টেবিলের তলা, আলমারীর পাশ, চেয়ার, ডাইনিং টেবিলের তলায়। ফ্রিজের ওপরে। সোফার ওপর আর বাথরুমের সামনে প্লাস্টিকের ঝুড়িতে ডাঁই করে রাখা জামাকাপড়ে একটু বেশিক্ষণ চোখ বিঁধিয়ে রাখে। না, কাপড়গুলোয় নড়াচড়া নেই। অনেকক্ষণ আটকে রাখা শ্বাস বেরিয়ে গিয়ে বুক হাল্কা হয়। সেই থেকে রংগার কথা ভেবে চলেছিলো, তাই একটা পুরানো পরিচিত অনুভূতি শরীর টের পেয়েছে। এমন হয়। 

বিড়ালটাকে দেখে থেকে কবেকার সেই খুব আদরের পোষ্যটার নানা কিছু মনে পড়ছে, ছোটো ছোটো মুহুর্তসব। সে কারণেই মনে হয়েছে রংগা পায়ের পাতার ওপর দিয়ে একদিকের দু’পা ফেলে হেঁটে গেল, নিতম্ব লেজ ঘষে দিয়ে গেল পায়ের পাতায়। অতি পুরানো ও ভীষণ পরিচিত একটা স্পর্শানুভুতি স্মৃতির ঘাড়ে চড়ে ফিরে এসেছে। ভেবে বেশ অবাক লাগে। বাকি মাছ সাঁতলে শুধু ল্যাজাটা কড়া করে ভেজে আলাদা বাটিতে তুলে মাছ ভাজা তেলটাও তাতে ঢেলে রাখে। দুপুরে তেল লুকা দিয়ে অর্ধেক, ডাল ল্যাজা দিয়ে অর্ধেক ভাত খাবে। বাকি মাছগুলো ঝোল করে রেখে দেবে। ঝোলের জন্য বেগুন কাটতে বসেছে, দরজায় ধাক্কা, সাথে হাঁক– 

“সাহেব, সাহে...এ...ব।”

ফ্ল্যাট নম্বর 'সি-টুর' কান্তিকাকার গলা। সাহেব উঠে দরজা খোলে। কান্তিকাকার সিঙ্কের কলের হাতল ঘুরেই যাচ্ছে, জল বন্ধ হচ্ছে না। এক্ষুনি একটু না দেখে দিলেই নয়। 

ওয়াশার ঠিকমত বসিয়ে টাইট করে দেয়ার ওয়াস্তা। সারিয়ে দিয়ে চলে আসছে সাহেব, কান্তিকাকি আটকালো। প্লেটে দু’টো মিষ্টি দিয়ে বসিয়ে দিল। মামনকে কবে বিয়ে করছে এই একমাত্র প্রশ্ন আর বিয়ে সংক্রান্ত অযাচিত নানা পরামর্শ এড়াতে একটা মিষ্টি চিবানো শেষ না হতেই আরেকটা মিষ্টি গালে ফেলে জল দিয়ে সহজ করে গলায় পাঠিয়ে, “এখন যাচ্ছি কাকি, রান্না পড়ে আছে...” বলে চটজলদি কেটে এল। সাহেবের ফ্ল্যাটে প্রেমিকা আসে যায় – কি কি যে বন্ধ দরজার ওপারে হয়… ভেবে ভেবে এইসব কাকিমা-মাসিমাদের রাতে ঘুম হয় না। ব্যাপারটাকে সাতপাক ঘুরিয়ে বৈধ করে নিতে পারলে বাঁচে। এঁদো মানসিকতার প্রতি মুখ মচকানো বিরক্তি নিয়ে সাহেব ফ্ল্যাটের দরজা খোলে। 

বাসনে বাসনে ঠোকা লাগার মৃদু শব্দ, তারপরেই ঝনঝনিয়ে স্টিলের প্লেট মেঝেতে পড়ল। সাহেব রান্নাঘরে ছুটে যায়। চিৎ করে রাখা খালি ভাতের হাঁড়িটা অল্প দুলছে, পাশে গ্লাস ঠোকা লেগে শুয়ে গড়াচ্ছে। গ্যাস স্টোভের ওপর থেকে ভাজা মাছের প্লেট নিচে পড়ে গেছে। মেঝেতে, বার্ণারের পাশে, কিচেন স্ল্যাবে ছত্রখান হয়ে রয়েছে মরসুমের প্রথম ইলিশের কুটি কুটি টুকরো। তেলে আধডোবা ল্যাজা যেমন কে তেমন রয়েছে। আক্রান্ত হয়েছে সাঁতলানো মাছের প্লেট। এ কোনো বেড়ালেরই কীর্তি। সাহেব সারা ঘর খুঁটিয়ে দেখে ফের; না কোত্থাও কিচ্ছু নেই। চট করে কাউকে পালিয়ে যেতেও দেখেনি। ছড়িয়ে থাকা মাছের টুকরোগুলো গুছিয়ে প্লেটে জড়ো করে অবাক হয় সাহেব। সেভাবে কোনো মাছই খায়নি। সব মাছ ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে রেখেছে। কে করল?

প্রশ্নের উত্তর মেলে দুপুরে খেতে বসে। চেয়ারের ধার ঘেঁসে ঝুঁকে বসে খাওয়া অভ্যেস। ল্যাজার মাছ ভাঙতেই সাহেবের পিঠ ঘেঁষে কিছু উঠে এল চেয়ারের ছেড়ে রাখা জায়গায়। পিঠে নরম দেহ আদুরে করে ঠেকিয়ে যে প্রাণীটা দাঁড়িয়ে রয়েছে, স্পর্শেই চেনে সাহেব, বেড়াল। সে বেড়ালের হিসেবি মন্থর আন্দোলিত লেজের ডগা তার কনুইয়ে সুরসুরি দিচ্ছে। সারা দেহে রোমাঞ্চ আর আতঙ্কের ঢেউ একসাথে আগে কখনো টের পায়নি সাহেব। পিছে ফিরে দেখে –কেউ নেই। ছোঁয়া বলছে ভীষণরকম আছে। এবার আর ক্ষণিকের ভ্রম নয়। নিজের অদৃশ্য শরীরটা একটানা সাহেবের পিঠে চেপে রেখেছে। এই ভঙ্গীতেই পাতের মাছের ভাগ চাইত প্রিয়তম পোষ্যটি। দশ বছর আগে হারিয়ে যাওয়া রংগা ফিরে এসেছে! 

বুকের ধুকপুকুনি থামার সময় দেয় সাহেব। একটুকরো মাছ ভেঙে রাখে টেবিলে। তার গায়ে ঘষে স্পর্শটা মুহুর্তে উধাও হয়ে যায়। টেবিলে মাছের টুকরোটা অল্প অল্প ধাক্কায় সরে সরে যাচ্ছে। রংগা জিভ দাঁতের কসরতে ওটা উদরস্থ করতে চেয়ে বার বার ব্যর্থ হচ্ছে। আন্দাজ মাফিক মাছের টুকরোটার একটু উপরে বাতাসে হাত বোলালো সাহেব। আঠালো খসখসে লোমে ঢাকা বেড়ালের মাথা পালটা ঘসুনি দিল ওর হাতে। মাছ ভুলে হারিয়ে পাওয়া মানুষ-সাথীর হাতে মাথা গাল ঘষে চলে রংগা। 

দুপুরের ঘুমটা হল পরম শান্তির। কতবছর পরে বালিশের ওপরের দিকটা দখল করে সাহেবের মাথাটাকে শিরস্ত্রাণের মত পাকিয়ে শুয়েছে রংগা। এভাবেই শুত সারাবছর। শুধু শীতকালে বালিশ ছেড়ে ওর বুক ও গলার ভাঁজে কম্বলে ঢুকে শুতো ধুমসোটা। 

প্রগাঢ় ঘুম সান্ধ্য মশাদলের পিনপিনানিও ভাঙাতে পারেনি। অনবরত দরজা ধাক্কে সাহেবকে ডেকে তুলল মামন। দরজা খুলে দিয়ে বাথরুমে জলবিয়োগ করতে করতে শুনতে পেল মামন ওকে কুম্ভকর্ণ, ঘরটাকে ডাস্টবিনের সাথে তুলনা করছে। এ দুটো ব্যাপারই মামনের প্রিয়। ও ভালোবাসে কুম্ভকর্ণকে জাগিয়ে তুলতে আর এই ডাস্টবিনটাকে সিজিল করতে। সেটাই করছে, শব্দে টের পায়। ঝপাত ঝপাত করে হাতের চাপড়ে বালিশ বিছানার ধুলো ঝেড়ে পরিপাটি করে সাজিয়ে রাখছে।

“সোফার ওপর জামাকাপড় রাখতে না করেছি না!”

ঝাঁঝি দেয় মামন। মানে ওগুলো এবার ভাঁজ হয়ে যাবে। চোখেমুখে জল ছিটিয়ে মাউথ ফ্রেশনার গার্গল করতে করতে তৃপ্তিবোধ করে সাহেব। দু’বছরেই তাকে কত আপন করে নিয়েছে মামন। ওকে বিয়ে করবে বলেই তো পয়সা জমিয়ে চলেছে। মামন সাহেবের মনের শান্তি, প্রাণের আরাম। কান ফুটো করে দেয়ার মত তীক্ষ্ণ চিৎকার করে উঠল মামন। কুলকুচি ফেলে বাথরুম থেকে ছুটে বেরিয়ে সাহেব দেখে রক্তশূণ্য সাদা মুখে মামন সোফার বসার জায়গায় উঠে দাঁড়িয়ে আছে। সদ্য ভাঁজ করা একটা প্যান্ট ওর হাত থেকে ভাঁজ এলোমেলো হয়ে পড়ে আছে মেঝেতে।

“কি? কি হল!” সাহেবের প্রশ্নে গোল মুখ আরো গোল করে চোখের তারা বিস্ফারিত করে মামন। “আমার স্পষ্ট মনে হল একটা বিড়াল আমার পায়ে মাথা ঘষছে।” 

মুহুর্তে সচেতন হয়ে পড়ে সাহেব। রংগা ফিরে এসেছে! জীবিত নয়, অশরীরী হয়ে। না, মৃত ও অদৃশ্য হয়ে বলা ঠিক হবে। রংগার শরীরের স্পর্শ পাওয়া যায়, এইমাত্র মামনও পেল। যদিও মামনকে বলা যাবে না একথা। ওর ভীষণ ভূতের ভয়। সাহেব আজ সকাল অব্দি ভূতে বিশ্বাস করত না। এখন অবিশ্বাসের কারণ দেখছে না। কারণ দেখছে না ভয় পাওয়ারও। 

মামনকে সোফায় উঠে থাকতে দেখে প্রথমে বেশ হকচকিয়ে গেছিল সাহেব – চোখেমুখে সেই ভাবটা মেখেই তাকিয়ে থাকে কয়েকমুহুর্ত। দ্রুত ভেবে নেয় এবং হেসে উঠে কথাটা উড়িয়ে দেয়।

“তোমার পায়ে সুরসুরি দেয়ার কথা ভাবছিলাম গার্গল করতে করতে, সেটাই লেগে গেছে।” মামন ব্লাশ করে সোফা থেকে নামে। 

“না, সত্যি; দেখো, আমার হাতে কেমন কাঁটা দিয়েছে। স্পষ্ট মনে হল একটা বেড়াল পায়ে মাথা গাল ঘষছে।” 

“কোথায় বেড়াল!” 

হাত উল্টে মামনের কথা উড়িয়ে দিয়ে সাহেব আলমারীতে লাগানো আয়নার সামনে চিরুনি নিয়ে দাঁড়ালো। দাড়ি কাটা হয়নি। এমনিও গাল দাড়ি বিরল। হাল্কা সোনালি লোমের গুচ্ছ এখানে ওখানে। থুতনিতে একটু বেশি। কয়েকদিন রাখলে বেশ লাগে দেখতে। ছোট করে কাটা সিল্কি সোনালি চুলগুলো আঁচড়াতে আঁচড়াতে সাহেব পায়ে রংগার ছোঁয়া পায়। মুহুর্তের জন্য হাত চিরুনি থমকে যায়। আবার স্বাভাবিকভাবে আঁচড়াতে থাকে। রংগা বাঁ পায়ের পাতা, গোড়ালিতে গা ঘষা শেষ করে দু’পায়ের ফাঁক গলে লেজ হেলিয়ে ডানপায়ের বাইরের দিকে গাল ঘষতে উপস্থিত। সাহেব আয়নায় মামনকে দেখে। বিছানায় বসে স্মার্টফোনে এগিয়ে পিছিয়ে সাহেবের সাজসজ্জা-র ‘গোপন’ ভিডিও তুলছে। ছোট্ট একটা হাঁফ ছাড়া শ্বাস ফেলে সাহেব। ওর পা ছেড়ে রংগা মামনের পায়ে মাথা ঘষতে যাবে না। হাত বাড়িয়ে ফ্রিজের ওপর থেকে ফেস ক্রিমের কৌটো নেয়। পর্যাপ্ত পরিমানে গালে ডলতে থাকে। এসব সাহেবকে সারা বছরই মাখতে হয়। চামড়া ওর খুবই সেনসিটিভ; চকের মত সাদা। এলবিনিজম ধরেছিল কমবয়সেই। তখন থেকে অরিন্দম আদক সবার ডাকে ডাকে ‘সাহেব’ হয়ে গেছে। মা ছাড়া এমনকি কাছের আত্মীয়রাও কেউ ‘অরি’ বলে ডাকে না। তাতে কিছু যায় আসে না। সাহেব জানে এলবিনো চেহারা আর মানানসই ডাকনাম ওর ইউএসপি। সংগ্রামপুরের অনেক মেয়ে ফিদা ছিলো। হাল্কা শেডের সানগ্লাস নামিয়ে বাদামি চোখের চাউনি ফেলে ছুটকো প্রেমিকা তুলত সাহেব বিনা কসরতে। 

মামনকে নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নামার পুরো সময়টা ভেতরে ভেতরে সিঁটিয়ে থাকে সাহেব। রংগা দরজা অব্দি এসেছিল ওর পায়ে পায়ে। মামনকে আড়াল করে গোড়ালির ঠেলায় ওকে ঘরে ঢুকিয়ে দরজা বন্ধ করেছে। করেই খেয়াল হয়েছে – রংগার চলাফেরায় দরজা দেয়াল কোনোকিছুই আর বাধা নয়। যদি এখন পিছন পিছন আসে! আরেকবার যদি মামনের পায়ে গা ঠেকায় তাহলে আর দেখতে হবে না।

নাঃ। আসেনি। নিশ্চিন্তির শ্বাস ছেড়ে মামনের কাঁধ পাকড়ে কাছে টেনে নিরিবিলি পাড়াটা ছেড়ে শহরের কোলাহলের দিকে পা বাড়ায়।

ফেরে নিশুতি রাতে। ফ্ল্যাটে ঢুকে হাত-পা ছড়িয়ে সোফায় বসতেই কোলের ওপর অদৃশ্য নরম বেড়াল এসে গুটি পাকিয়ে বসে। আঙুল দিয়ে ওর না দেখা লোমগুলো আঁচড়ে দিতে দিতে সাহেব ডাকে, “রংগা”। বেঁচে থাকতে এমন আদর আর নাম ধরে ডাকে যারপরনাই আবেশ পেয়ে রংগা গুরগুর শব্দ করত। মৃত্যুর পর আর ডাকে না, গুরগুর করে না। স্বর হারিয়েছে রংগা। খানিক ওকে নিয়ে বসে থেকে শেষে জামাকাপড় বদলে দেয়াল থেকে তার একান্তের প্রিয় উকুলেলে নামিয়ে বক্স জানলায় চেপে বসে। স্ট্রিট ল্যাম্পের ঝাপসা আলোর ওপারে বাড়িঘর গাছপালার নিঝুম আভাসের দিকে চেয়ে হাতের যন্ত্রে গমক তোলে, বাজাতে থাকে হাছন রেজা... 'বন্দে মায়া লাগাইছে, পিরিতি শিখাইছে...'। কোমোরে গা ঠেকিয়ে বসে রংগা। 

পরদিন কাজের থেকে ফিরে ফ্ল্যাটের সিঁড়ি বাইছে। ওর উল্টোদিকের ফ্ল্যাটের বাপ্টু দুদ্দাড়িয়ে নামতে নামতে সাহেবকে দেখে থমকে দাঁড়ায়। চোখ বড়বড় করে বলে, “জানো সাহেবদা, আজ কি হয়েছে?” ফ্যাক্টরিতে ধকল বেশি গেছে বা ছুটির পরের দিনটায় ধকল বেশি লাগে। ক্লান্ত হাসি ফুটিয়ে সাহেব মাথা নাড়ে, না, জানে না।

“আজ একটা বিড়ালভূত এসে বনু-র চকলেট কেড়ে নিয়েছে; বনুকে আঁচড়েও দিয়েছে।” সব ক্লান্তি কেটে নার্ভ টানটান, সাহেব ভ্রু কুঁচকায়, “হ্যাট! কি সব হাবিজাবি বকছিস।”

“আরে না! হাবিজাবি না। শোনোনা কি হয়েছে...”

বাপ্টু উত্তেজিত হয়ে হাত-পা নেড়ে শোনায় কি হয়েছে।

“দুপুরবেলা বনু-র ঘুম আসছিলো না। মায়ের পাশ থেকে গুটিগুটি উঠে ফ্রিজ থেকে একটা মিল্কিবার বের করে মেঝেতে বসে খাচ্ছিল। হঠাৎ হাতে ঝটকা খেয়ে আঁতকে ওঠে, চকলেট পড়ে যায়। সেই চকলেট বাতাসে উড়তে থাকে। মাটির একটু উঁচু দিয়ে উড়ে সোজা ফ্ল্যাটের দরজায় ধাক্কা খেয়ে মাটিতে নামে। বনু তো এসব দেখে বেজায় চিৎকার। তাতেই বাপ্টু আর মা উঠে পড়ে। দেখে দরজার সামনে পড়ে একটামাত্র কামড় দেয়া মিল্কিবার। আর বনু-র ডানহাতের ওপর লম্বা লম্বা চারটে আঁচড়ের দাগ...।”

“তারপর মা পাঁচ আঙুলের দাগ বসায়নি চকলেট চুরি করে খাওয়ার জন্য?” সি-ওয়ানের সামন্তবাবু সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে বাপ্টুর গল্পে থমকে দাঁড়িয়েছিলেন। তিনি হেসে প্রশ্নটা করেন। বাপ্টুর মাথায় হাল্কা একটা গাঁট্টা দিয়ে সাহেবের সাথে হাসি বিনিময় করেন। বড়দের অবিশ্বাস বাপ্টুর উত্তেজনা আরো বাড়িয়ে দেয়। 

“তোমরা বিশ্বাস করলে না তো! মা-ও বিশ্বাস করেনি। বুঝবে যখন ঐ বিড়ালভূত তোমাদেরো কামড়াবে। আচ্ছা, যদি বিড়ালভূত না-ই থাকবে তো বনুকে আঁচড়ালো কে?” 

“সত্যিকারের বেড়াল।” উত্তর দেন সামন্তবাবু। 

“ও। আর বনু তাকে দেখতে পেল না কেন? আমরাও উঠে কোনো বিড়াল দেখিনি। আর বনু কেনই বা খামোকা হাতের চকলেটটা এক কামড় দিয়ে দরজায় ছুঁড়ে দিয়ে চিৎকার করবে?” 

এতসব অসমাধিত রহস্যের উত্তর ভেবে না পেয়ে সামন্তবাবু বলেন, “বেশ তো; এখন থেকে ওই ভূত বেড়ালটাকে পোষ। রোজ দুধ মাছ খেতে দে। তাহলে আর হাত থেকে কেড়ে খাবে না।” 

সজোরে হেসে উঠে সাহেবের দিকে চেয়ে মাথা নেড়ে ওদের পাশ দিয়ে নেমে যান। সাহেবও বাপ্টুকে আর কথা বাড়াতে না দিয়ে উঠে আসে। ফ্ল্যাটে ঢুকে দরজা বন্ধ করে। মাথার ভেতরটা চনচন করছে। এই সম্ভাবনা ঘুনাক্ষরেও ভাবেনি। কেন যে ভাবেনি! রংগার অভ্যাস এদিক ওদিক টইটই করা। তাই করেছে। উপরন্তু সাহেব বাড়ি নেই। একা একা রংগা করেই বা কি। 

ঘরের আলো জ্বেলে সাহেব আস্তে করে ডাকে, “রংগা...।”

বোধহয় ঘুমোচ্ছিল। ডাক শুনে সটান এসে পায়ে মাথার গোঁত্তা মেরে চলে যায় সোফার পায়ায় নখ ধার করতে। খটর বটর শব্দ থেকে ওর অবস্থান আন্দাজ করে সাহেব রংগাকে কোলে তুলে নেয়। গলায় আদরস্পর্শ বুলিয়ে দিতে দিতে বলে, “এসব করিস না রংগা। আমি না থাকলে ঘরে লক্ষ্মী হয়ে থাকবি।”

ও একটা মুর্তিমান অলক্ষ্মী –বলত মা। সাহেবদের গ্রামের বাড়ির রান্নাঘরের দেয়াল টিনের, মাটির মেঝে। খুঁড়ে ইঁদুর যাতায়াত করত। বন্ধ রান্নাঘরের জানলা দিয়ে ঢুকে সেগুলোকে তাড়া করার উন্মাদনায় রংগা বাসনকোসন ফেলে, মশলার কৌটো, আটার ডাব্বা উল্টে কাণ্ড বাঁধাতো মাঝেমাঝেই। গালাগাল করত, আবার ভালোও বাসত মা রংগাকে। মাছসেদ্ধ করে দিত, দুধের বাটি চাঁছা সর।

মা জানত রংগা সাহেবের কতটা পেয়ারের বেড়াল। ওর চামড়ার সমস্যার জন্য ডাক্তার জীবজন্তু পুষতে বারণ করেছিল। সেসব পাত্তা না দিয়েই এই কুড়িয়ে পাওয়া হুলোটাকে পুষেছে। রংগা যেন ওর হরিহর আত্মা। বিড়ালের সাথে ঘেঁষাঘেঁষির জন্যই ওর হাতে-পায়ে স্কিনের নানারকমের সমস্যা। দু’জনে কেউ কাউকে কাছছাড়া করবে না। এই রংগা একবার হারিয়ে গেল।

বন্ধুবান্ধবের সাথে আঠারো দিনের রাজস্থান ট্যুর-এ গিয়েছিল সাহেব। ফিরে এসে কি কাণ্ডটাই না সে বাঁধাবে বেড়াল হারিয়েছে শোনামাত্র– এই ভয়েই মা কাঁটা হয়েছিল। ফেরার পর ওকে দুরুদুরু বুকে জানিয়েছিল মা খবরটা, সাহেব যাওয়ার দিন পাঁচেক পর থেকেই আর দেখা যাচ্ছে না রংগাকে। একদিন দুপুরে মাছসেদ্ধ মাখা ভাত খেয়ে পাড়ায় টহল দিতে বেরিয়ে আর ফেরেনি। সাহেবের বাবা বোন যথেষ্ট খুঁজেছে। সে খোঁজায় আস্থা না রেখে সাহেব নিজে আরো খোঁজে। যুক্তি সাজিয়ে বোঝার চেষ্টা করে কোথায় কোথায় যেতে পারে বেড়ালটা। রংগা দুরন্ত নচ্ছারটাইপ হুলো। আশেপাশের বাড়িগুলোয় হামলা ছিনতাইবাজি করে অহরহ। তারাই কেউ সাহেব নেই দেখে মওকা পেয়ে মেরে দিল? কিভাবে মারল! ওকে ধরা তো সহজ নয়! খাবারে বিষ মিশিয়ে ?

সন্দেহটা এত প্রবল হয়েছিল যে বেশ কিছুদিন ও প্রতিটা প্রতিবেশির মুখ খুঁটিয়ে দেখত; বিশেষ করে সেইসব লোকের বেড়াল কুকুর দেখলেই খ্যাদানো ঢিল মারা যাদের অভ্যেস। হুলোর ঝগড়া দেখলে গরম ফ্যান ছুঁড়ে মারা, বাঁশ দিয়ে কুকুরের মাথা ফাটিয়ে দেয়ার মত কুকীর্তি করে লাহিড়ি বুড়ো। তাকেই ওর কালপ্রিট মনে হয়েছিল শেষমেশ। একদিন অন্ধকারে মুখে গামছা বেঁধে বুড়োকে সাইকেলশুদ্ধ ধাক্কা মেরে ড্রেনে ফেলে দেয়। কোমোরের হাড় ভেঙে গিয়েছিল লাহিড়ির। তাও মন শান্ত হয়নি পুরো। আদরের অতি ন্যাওটা পোষ্যকে হারানোর বেদনা অনেকদিন ধরা ছিল বুকে। রংগার গলায় পরানোর জন্য রাজস্থান থেকে নিয়ে আসা পেন্ডেন্টগুলোর একটা সাইকেলের চাবির রিং করে নিয়েছিল সাহেব– মনে হত, রংগা একরকম সাথেই আছে।

জ্যান্তে যা স্বভাব ছিলো, মরেও তা যায়নি। চুপচাপ লক্ষ্মী হয়ে থাকার বান্দা নয় রংগা। সাহেব কাজে বেরোলেই চরতে বেরোয়। ঘুরে বেড়ায় করুণাময়ী এপার্টমেন্টের যত্রতত্র। একতলায় গেলে টের পায় গুড্ডুদের কুকুর। মারাত্মক চিৎকার করে। একদিন সে হল রংগার তীব্র আক্রমণের শিকার। নাক মুখ গাল গলা আঁচড়ে আঁচড়ে ক্ষতবিক্ষত করে দেয়। তারপর থেকে রংগার অস্তিত্ব টের পেলে কুকুরটা সটান মেঝেতে লেপ্টে শুয়ে গুঁগুঁ কুঁইকুঁই শব্দ ছাড়ে। এছাড়াও এপার্টমেন্ট জুড়ে ঘটে চলে একের পর এক কাণ্ড।

ফ্ল্যাট নম্বর 'এ-টুর' মানিকবাবু খেতে বসে দেখলেন তার পাতের মাছের দাগা ছুটে চলে যাচ্ছে। মানিকবাবুর ছোট ছেলে সেটা ধরতে গিয়ে শূন্য থেকে বেড়ালের আঁচড় খেয়ে ভয়ে থরথর। বাপ্টুর বোনের সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনা আর মানিকবাবুর ব্যাপারটা মিলে প্রচার হতে এপার্টমেন্টের অধিকাংশ আবাসিকের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ল আতঙ্ক। বাকি যারা এসবকে গল্পগুজব মনে করে মজা পেল, অন্যদের গুরুত্ব দিতে না করল, তাদের মধ্যে দু’জনের সাথে ঘটল দু’টো ঘটনা। 

সি-ওয়ানের সামন্তবাবু সিঁড়ির রেলিঙে হাতের ভর রেখে রেখে উঠছিলেন। সাহেবদের দোতলার ল্যান্ডিং পেরিয়ে তিনতলার সিঁড়ি ভাঙার মুখে রেলিং এর প্যাঁচে হাত রেখেই আঁতকে ভয়ানক চিৎকার ছেড়ে কয়েক পা সরে যান। তার হাত অদৃশ্য এক বিড়ালের পিঠে পড়েছিল। 

টপ ফ্লোরের নতুন আবাসিক তন্ময় মিত্র ছাদে গেছিলেন সন্ধের আগে। রেলিং ধরে পায়চারি করে মফস্বল শহরের সান্ধ্য আকাশরেখা যথেষ্ট উপভোগ করেন। শেষে ছাদের মাঝে গোল করে বাঁধানো বেঞ্চে বসতে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়েন এক ঝটকায় পিঠ ছিলাটান করে। বাঁ-চোখের কোণে দেখতে পান, পাতাবাহারের টবটা কিসের ধাক্কায় কাত হয়ে পড়ে গড়িয়ে গেল। কিসের আবার! যে অদৃশ্য প্রাণীটার গায়ের ওপর তিনি বসতে যাচ্ছিলেন সেটার- বেড়াল – বেড়াল ভূতের ধাক্কায়। 

এরপর আর ব্যাপারটা নিয়ে ঠাট্টা করার বেশি কেউ বাকি থাকে না। করুণাময়ী এপার্টমেন্ট জুড়ে বেড়ালভূত নিয়ে ত্রাহি ত্রাহি দশা। প্রত্যেকে প্রত্যেককে জিগ্যেস করছে অতীতে কেউ কোনো বেড়াল মেরেছে কিনা। কুকুরের ল্যাজে পটকার চেন বাঁধার দুর্নাম আছে এমন কয়েক কিশোরকে রীতিমত পারিবারিক জেরার মুখে পড়তে হল। এত কাণ্ডের মধ্যে দু’জনমাত্র লোক প্রায় নির্বিকার। সাহেব, আর ডি-ফোরের গৌতমবাবু। 

গৌতমবাবু কাঠ নাস্তিক। এপার্টমেন্টের আবাসিক কমিটি বেড়াল ভূতের সমস্যা নিয়ে মিটিং ডেকেছিলো। সাহেব ফ্ল্যাটের ওনার নয় তাই সে মিটিঙে ডাক পায়নি। অন্যদের মুখে শুনেছে, গৌতমবাবু সবাইকে দারুণ ঝেড়েছেন এসব গুজব কুসংস্কারে বিশ্বাস করে পাগল হওয়ার জন্য। মাস হিস্টিরিয়া, মানে গণ-উন্মাদনা বলে দাগিয়ে দেন ঘটনাগুলোকে। একজনের বলা গল্প আরেকজন বিশ্বাস করে বা না করে নিজে রঙ যোগ করে পল্লবিত করার এই প্রবণতার বেজায় নিন্দা করেন। বলেন, “এসব প্রাইমারি স্কুলে হয়। খাবার খেয়ে একজন পেট চেপে উল্টে পড়ে মুখে গ্যাঁজলা তুলতে শুরু করল। বাকিরা বিশ্বাস করল খাবারে বিষ আছে। ব্যাস, সবাই মিলে বমি করতে লাগল। ডাক্তার পরখ করে দেখলেন কারো কোনো বিষক্রিয়া হয়নি। স্রেফ ভ্রান্ত বিশ্বাস আর আতঙ্কের ফেরে ঘটে গেছে সব। আপনারা দামড়া আধদামড়া লোকেরাও কি ইনফ্যান্টের বাচ্চা হয়ে গেলেন!” এসব কথা শুনে যারা কখনো না কখনো বেড়াল ভূতের সাক্ষাৎ পেয়েছে তারা একজোট হয়ে চড়াও হয় গৌতমবাবুর ওপর। হাতাহাতি হয়ে যায় একপ্রস্থ। 

সাহেব জানে ল্যান্ডিং আর ছাদের ঘটনাগুলোর জন্য দায়ী রংগার অলম্বুষে ঘুম। একই ঘুম রংগা সাহেবের সারা শরীর জুড়ে দেয়। সাহেব শুলে ওর বুকে, কোমরে, পিঠে, দু’পায়ের ভাঁজে – পছন্দমত জায়গা বেছে নিয়ে নিঃসাড়ে ঘুমাতে থাকে। এইটা রংগার নতুন, বলা চলে ভৌতিক অভ্যাস। ও সম্ভবতঃ ফিরে পাওয়া মানুষ সঙ্গীকে আরো বেশি ছুঁয়ে ছুঁয়ে থাকতে চাইছে। 

নিজেকে ধনী মনে হয় সাহেবের। অনন্য সম্পদের অধিকারী। অদৃশ্য প্রেত পোষ্য আর কারোর নেই এই ধরাধামে। জ্যান্তে ব্যাটা পাড়ায় গুন্ডামি করে বেড়াতো। কে কখন মেরে দেয় – ভয়ে থাকতে হত। এখন ওকে আর কেউ মেরে ফেলতে পারবে না। সম্পূর্ণ নিরাপদ রংগা। এপার্টমেন্টে ক’টা গোলমেলে ঘটনা ঘটিয়ে ফেলেছে। লোকে আতঙ্কে পড়ে গেছে। রংগাও নিশ্চই হকচকিয়ে গেছে। এসবই ঠিক হয়ে যাবে। নিজের ভৌতিক অস্তিত্বের সাথে এখনো মানিয়ে-গুছিয়ে উঠতে পারেনি ও। আস্তে ধীরে ঠিকই কাউকে টের পেতে না দিয়ে বাস করতে শিখে যাবে। নিরালা নিরিবিলিতে থাকতে চাওয়া বেড়ালজাতির মজ্জাগত। রংগা ওকে ছেড়ে যাবে না আর, চিরপোষ্য থাকতে এসেছে – ভাবলেই এক পরমতৃপ্তি সাহেবের বুকে জড়ো হয়। ছাপিয়ে আসে কন্ঠা অব্দি। ভাবালু কান্নার আকার নেয়। ভাবে – কত ভালোবাসা থাকলে মৃত পোষ্য এভাবে পালকের কাছে ফিরে আসে! 

অবশ্য অন্য কিছু পরিতৃপ্তি ছাড়তে হয়েছে ওকে। কমিটি মিটিঙে সিদ্ধান্ত হয়েছিল ভূত তাড়াতে ওঝা আনা হবে। জোগাড় হয়েছিল এক পুরোহিত কাম ফেংশুই বিশেষজ্ঞ। সব শুনে সে ঘোষণা করে, করুণাময়ী এপার্টমেন্টে পশুপ্রেতযোনীর কু-দৃষ্টি পড়েছে। এপার্টমেন্টের ছাদে যাগযজ্ঞ শেষে প্রতিটা ফ্ল্যাটের রান্নাঘরে একটা করে পাই-ইয়াও মুর্তি টাঙিয়ে দিয়ে গেছে সে। কাঠে খোদাই করা ডানাওলা বাঘ বা বেড়াল, মানুষের মত তার দাঁতের পাটি। দাঁত খিঁচিয়ে খাপ পেতে বসে থাকা সেই পাই-ইয়াও নাকি বিড়ালরূপী পশুপ্রেতযোনীর নেগেটিভ এনার্জি শুষে পজিটিভ এনার্জিতে বদলে ফেলে ক্রমেই সেটাকে ক্ষীণবল করে ফেলবে। রান্নাঘরের স্ল্যাবে উঠে মাঝেমাঝেই রংগা পাই-ইয়াওকে থাবা মেরে দোলায়। একটা নতুন খেলা পেয়েছে। রংগার প্রেতাত্মা দুর্বল না হলেও সাহেবের পরমাত্মা বেশ শক্তিহীন বোধ করছে।

পুরোহিতের দ্বিতীয় নিদানে এপার্টমেন্টে মাছ ঢোকা নিষিদ্ধ হয়ে গেছে। পাই-ইয়াও আর দক্ষিণার শেয়ার বাবদ কড়কড়ে তিনশো চল্লিশ টাকা গুণে দিতে তত গায়ে লাগেনি সাহেবের, যতটা লেগেছে এই নিষেধাজ্ঞায়। নিত্য মাছ ছাড়া ভাত খাওয়া দুর্বিষহ। কিন্তু লুকিয়ে চুরিয়ে মাছ আনার চেষ্টাও করেনি। ঠিকই কেউ দেখে নেবে। কি দরকার সন্দেহে পড়ার। সতর্ক পদক্ষেপে চলতে হচ্ছে ওকে। বেশি ভয় পাওয়ার নাটক করলে অভিনয় ধরা পড়ে যাবে। শান্তভঙ্গীতে বাকিদের ভয়ে সায় দিচ্ছে। মাথা নেড়ে অল্পাদ্য উদ্বেগ জানাচ্ছে। ঘরের প্রতি দুয়ারে একটা করে জলভরা পাত্র রেখে দেয়ার নিদানও দিয়ে গেছে পুরোহিত। রেখেছে সাহেব। তারপর চলার বেখেয়ালে লাথি মেরে ঘর জলে জলাকার করে ফেলেছে কয়েকবার।

বেড়ালভূতের ভয় ছড়িয়ে গেছে পাড়ার বাকি বাড়িগুলোতেও। অন্য যে এপার্টমেন্টটা আছে এ পাড়ায়, সেখানেও। অনেকেই মাছ কেনা বন্ধ করে দিয়েছে। সাহেব পুরো ব্যাপারটায় না হেসে পারে না। ভাবে নিষেধাজ্ঞা থেকে দুধ কেন বাদ পড়ল? ছানার সন্দেশ, রাবড়ি, দই? কুমড়োর তরকারি! রংগা এসবও খেতে কিছু কম ভালোবাসে না। 

মাছ ছাড়াও আরো একটা চরম পরিতৃপ্তি ছাড়তে হয়েছে সাহেবকে। মামন ফ্ল্যাটে এলে একটু ঘাঁটাঘাঁটি, কোনোদিন উদ্দাম ভালোবাসা সেরে নেয়। রংগা-মামনের সাক্ষাৎ এড়াতে সাহেব নিজেই মামনদের বাড়ি হাজির হয়ে যাচ্ছে। ওখানে মামনের মা-বৌদি থাকে আশেপাশে। নিভৃতির অবকাশ নেই। 

রবিবার শেষ দুপুরে সাহেব হাজির হল মামনদের বাড়িতে। এই নিয়ে দ্বিতীয় রবিবার এমনটা করল। মানিকবাবুর মাছ চুরির ঘটনার পরদিনই অফিস ফেরতা মামন উদয় হয়েছিল সাহেবের ফ্ল্যাটে। এপার্টমেন্টের গুঞ্জন থেকে জেনে গেছে বেড়ালভূতের কথা। সাহেবকেও বিস্তৃত বলতে হয়েছে।

“আমি ঠিকই টের পেয়েছিলাম। সেদিন তুমি পাত্তা দাওনি।” এটা ছিল মামনের প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া। তারপর থেকে শুরু হয়েছে এপার্টমেন্ট ছেড়ে দেয়ার প্রথমে তেজিয়াল, পরে ঘ্যানঘ্যানে উপরোধ। সাহেব বুঝিয়েছে এই বাজারে এত কম ভাড়ায় ওর বেকারি ফ্যাক্টরি থেকে হাঁটা দূরত্বে ফ্ল্যাট খুঁজে পাওয়া সম্ভব নয়। নতুন যত ফ্ল্যাট উঠছে সবই প্রায় লিফটওলা। ভাড়া বেশি। সব এখন টু বা থ্রি বিএইচকে। করুণাময়ীর প্রতিটা তলায় চারটে ফ্ল্যাটের একটা সিঙ্গল বিএইচকে। তাতে যা স্পেস সেটা এখনকার টু বিএইচকের সমান। এসব যে মামন বোঝে না এমন নয়। কিন্তু ওই যে; ওর বেজায় ভূতের ভয়। সেটাই কাজে লাগিয়েছিল সাহেব।

“যা সব চলছে আমার এখানে… আমিই বরঞ্চ তোমার বাড়ি আসব আপাতত, তোমাকে এখানে আসতে হবে না। দেখি, এসব মিটুক, তারপর আবার…।” এমন আমতা আমতা বলার বেশি কিছু দরকার হয়নি মামনের ফ্ল্যাটে আসাটা বন্ধ করতে। যদিও সেদিন যেমন, আজও তেমন একটা খালি ডিস্ক মাথার মধ্যে ঘুরে চলেছে যা রেকর্ড করতে চাইছে মামনকে পুরো সত্যিটা জানিয়ে রংগার সাথে সহজ করার উপায়। সাহেব ডিস্কটাকে কিছুই যোগান দিয়ে উঠতে পারছে না। 

মামনের মা-বৌদিকে করুণাময়ী এপার্টমেন্টের বেড়ালভূতের নতুন কীর্তিগুলো শুনিয়ে, তাদের থেকে নানা টোটকা পরামর্শ শুনল। তারপর সাহেব মামনকে নিয়ে গেল মালঞ্চয় নাইট শোয়ে অক্ষয়কুমারের ‘খাট্টামিঠা’ দেখতে।

ফেরার সময় সাহেব অত রাতে পাড়ার মুখে জটলা দেখে অবাক। সেখান থেকে ব্যাপার জেনে উর্দ্বশ্বাসে এপার্টমেন্টে ছোটে সাহেব। এপার্টমেন্টের গেট, একতলা দোতলা সর্বত্র আবাসিকদের ছোট ছোট জটলা। সব জটলারই আলোচ্য একটি ভয়ানক দুর্ঘটনা। ঘোষিত নাস্তিক, ডি-ফোরের গৌতমবাবু সিঁড়ি দিয়ে নামতে গিয়ে অদৃশ্য নরম কিছুর ওপর পা ফেলে চমকে ভারসাম্য হারিয়ে পড়ে কয়েক সিঁড়ি গড়িয়ে যান। পড়ামাত্র একজোড়া অদৃশ্য থাবা ওনার হাত-মুখ আঁচড়ে দেয়। 

ডাক্তারবাবুকে সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসতে দেখে ফ্লোরের সবাই ঘিরে ধরল। ডাক্তারবাবু কিছু বলার আগেই পিছন থেকে গৌতমবাবুর ছেলে জানালো, “বাবার ডানকাঁধের হাড় ফ্র্যাকচার হয়েছে। ডানপায়ের হাঁটু ফুলে ঢোল। ভয়ানক যন্ত্রণা। ডাক্তারবাবু বলছেন মালাইচাকি ড্যামেজ হয়েছে, হসপিটালে নিয়ে যেতে হবে”।

নিচে এম্বুল্যান্স দাঁড়ানোর শব্দ শুনে গৌতমবাবুর ছেলে উপরে দৌড়ালো। 

দোতলার অন্য আবাসিকদের সাথে একরাশ উৎকন্ঠা নিয়ে খাড়া রইল সাহেব। বাকিদের থেকে সে উৎকন্ঠা ভিন্ন রকম। তবে তা বেড়ালভূতকে নিয়েই। এদ্দিন যা করছিল রংগা তাতে খানিক বিব্রত, খানিকটা মজা লাগছিল সাহেবের। নেহাত বেড়াল সুলভ কীর্তি সেসব। আজও তা-ই করেছে, কিন্তু ফলাফল হয়েছে মারাত্মক। মাঝ সিঁড়িতে বেড়াল বসে ঝিমোয় না এমন নয়, কিন্তু অদৃশ্য হয়ে ঝিমোলে বিপদ হয়। রংগার অবিবেচনার জন্য ওর ওপর রাগে গা রি-রি করছে সাহেবের। বড়ই বিপজ্জনক হয়ে উঠছে রংগার ফিরে আসাটা। অন্যের পক্ষে শুধু না, ওর পক্ষেও। লোকে যদি জানে কার পোষা ভূতবেড়াল এসব ঘটাচ্ছে, কি কি যে হবে! ভাবতেই মাথা গুলিয়ে ওঠে সাহেবের। 

গৌতমবাবুকে স্ট্রেচারে করে নামানোর সময় তিনি তারস্বরে সমবেত অধিবাসীদের বলতে বলতে গেলেন, “আপনাদের অবিশ্বাস করে কটুকথা যা বলেছি, তার জন্য ক্ষমা করে দেবেন। যে... যেকোনো ওঝা, শ্যামন, জানগুরু, উইচ ডাকুন। ওই ভূত তাড়ান। সব খরচখরচা আমি দেব”।

এই গৌতমবাবুই আগে পাই-ইয়াও কেনেননি। 

ফ্লোর খালি হলে দরজা খুলে নিজের ফ্ল্যাটে ঢোকে সাহেব। রাগে শরীর জ্বলছে। আলো জ্বালতেই প্রথম চোখ চলে যায় সোফার পায়ার দিকে। মৃত্যুর পরে রংগার নখ বাড়ে কিনা জানা নেই। কিন্ত রোজ নখ ঘষা ওর অভ্যাস। সেই নখের দাগ রয়েছে খাটেরও পায়ায়। পাপোশে। ফ্রিজের ওপর রাখা প্লাস্টিকের ফুলগুচ্ছর ডাঁটিগুলোতে রয়েছে রংগার দাঁতের দাগ। কয়েকটা ফুল কেটেও ফেলেছে ইতিমধ্যে। কেউ ফ্ল্যাটে এলে এগুলো দেখতে পাবে। কি জবাব দেবে সাহেব! বেড়ালভূত ঘরময় ঘুরে বেড়ায় জানা সত্ত্বেও কেন কাউকে জানায়নি তার ব্যাখ্যা কী দেবে?

বাইরের পোশাক না ছেড়েই বিছানায় বসে পড়ে। সিগারেট জ্বালায়। মৃৎকরোটি এশট্রেটা কাছে টেনে নেয়। এই মাটির তৈরি নরকরোটি– যার হাঁ-মুখ আর ব্রহ্মতালুর ছ্যাঁদা দিয়ে ছাই ঝাড়া যায়– মামন ওকে গিফট করেছিল। ওফ, মামন! কি করে মামন আর রংগাকে একই সংসারে রাখা যাবে! মাথার মধ্যে সব কিছু ভেঙে ভেঙে পড়ছে; কিছুই আর আগের মত সহজ সরল থাকছে না। সিগারেটের শেষাংশ এশট্রেতে গোঁজে সাহেব। পিঠময় আদুরে স্পর্শ লাগিয়ে কোলে উঠে আসে রংগা। এত রাত অব্দি লোকজন হৈচৈ চারদিকে, তাই বোধহয় ঘরের কোণে গুঁড়ি মেরে ছিল। এবার ধীরেসুস্থে পরিচিত আরামের কাছে ফিরছে। দিশেহারা রাগে দু’হাতে অদৃশ্য বেড়ালটাকে তুলে দূরে ছুঁড়ে দেয় সাহেব। রান্নাঘরের দোরে রাখা পশুপ্রেতযো নিবিতাড়নী জলপাত্র চলকে ওঠে। ওদিকেই কোথাও সভয়ে লুকিয়ে পড়ল বোধহয়।

বিছানা ছেড়ে পোশাক বদল করে সাহেব। সেই শো শুরুর আগে চাওমিন খেয়েছিল। রাতে রুটি কিনে ফিরেছে ওবেলায় রেঁধে রাখা মুর্গীর মাংস দিয়ে খাবে বলে। মুখে একটুও রুচি নেই। উকুলেলে নিয়ে জানলার গোবরাটে উঠে বসে সাহেব। টুংটাং স্ট্রামিং করে। ঠিকঠাক কোনো তাল সুর মাথা বেয়ে হাতে নামছে না। দু’তিনটে গান বাজাতে শুরু করেও ছেড়ে দেয়। আমেজ আসছে না। ছুঁড়ে দেয়ার পর থেকে রংগার সাড়া নেই। কোমোরের কাছে ঘেঁষে বসল না অন্যদিনের মত। ভয় পেয়েছে। রাগ অভিমান হয়েছে অবোলা জীবটার। ও তো কোনো বদ মতলব নিয়ে এগুলো করছে না! রংগার অসহায়তা নিজের অসহায়তা সাহেবের মাথার সব শান্তি গুলিয়ে দেয়। দীর্ঘশ্বাস ফেলে জানলা ছেড়ে বিছানায় আসে। রাত বিনিদ্র যাবে এমন একটা আশঙ্কা নিয়ে শুয়ে পড়ে। 

না। রংগা মাথার বালিশে বা গায়ের ওপর এসে বসে না। প্রচন্ড মনের টান উপেক্ষা করতে না পেরে রংগা'র প্রেত এসেছিল। আজ দুচ্ছাই উপেক্ষা পেয়ে বিদায় নিল! আর ও ফিরে আসবে না? সাহেবের চোখের কোণ দিয়ে জল নেমে কানের ভাঁজে গড়ায়। 

বিকট শব্দে কনভেয়ার বেল্ট আটকে যাওয়া, ধাতব ঝনঝনানি, অনেকগুলো ভয়ার্ত চিৎকার। লো-বেকড, ফাটা কুকিজগুলো বাতিল করে ফ্রেশ কুকিজ সেট তৈরি দেখভাল করছিল সাহেব প্যাকেজিং সেকশানে। পরপর শব্দগুলো বিপদবাহী বার্তা পৌঁছে দিল। লেবারদের সাথে ওও ছুট লাগালো প্রোডাকশান ইউনিটের দিকে। 

দেখে ধুন্ধুমার কাণ্ড। দেড়তলার মিক্সিং স্টেশান আর গ্রাউন্ড ফ্লোর জুড়ে চলছে ছূটোছুটি তান্ডব। পালাচ্ছে একদল, ক’জন কিছু খুঁজছে, দু’চারজন এখানে ওখানে ঘাপটি মেরে লুকিয়েছে। কনভেয়ার বেল্ট বন্ধ কেন সাহেব তা দক্ষ চোখে মেপে দ্রুত বুঝে নেয়। আভেন থেকে বেল্ট প্রথম ধাপ যেখানে নামছে সেখানে চ্যানেলে এলুমিনিয়াম ট্রে আটকে গেছে। ঐ বরাবর মেঝেতে পড়ে রয়েছে আরো কতকগুলো। হইচইয়ের মাঝে ‘সাদা বেড়াল...’, ‘ওদিকে খোঁজ...’, ‘ঘাড়ে না ঝাঁপিয়ে পড়ে...’, ‘কোনো কোণায় যাস না কিন্তু...’ – কথাগুলো কানে আসছে, আর গায়ের লোমগুলো মায় মাথার চুল খাড়া হয়ে উঠছে। শরীর সিঁটিয়ে যাচ্ছে। মগজ জুড়ে বিপদ সাইরেন। মোটমাট ব্যাপারটা জানতে পারল কুণ্ডুদা সহকর্মীদের পরিচর্যায় জ্ঞান ফিরে পাওয়ার পর। দেড়তলার মিক্সিং সেকশনের ফ্লোরে বসে আর পাঁচজন ফ্যাক্টরি স্টাফের সাথে সাহেবও শুনল সেই ‘ভয়াবহ’ ঘটনা। 

ময়দা মাখার যান্ত্রিক হাঁড়িগুলো তদ্বির করছিলো কুণ্ডুদা। স্পঞ্জ বড্ড ঘন হচ্ছে। গরম জল মেশাতে হবে। বয়লার ম্যান মুন্নাকে হাঁক দিয়ে ডাকামাত্র ঘটল কাণ্ডটা। কোন শূন্য থেকে ঝুপুস করে কি এসে পড়ল সামনের ঘুরতে থাকা হাঁড়িতে। কুন্ডুদা মা কালীর দিব্যি গেলে বলছে সে কিছুই পড়তে দেখেনি, কিন্তু পড়ে উঠতে দেখেছে। উঠেই সেটা ছুট লাগালো প্যাসেজ ধরে। একটা বেড়াল। ময়দার লেই যেখানে যেখানে লেগে রয়েছে সেটুকুর বাইরে কিছু দেখা যাচ্ছে না। শুধু পিছনের পা, লেজ, পেট আর সামনের থাবার খানিকটা। মাথা পিঠ বিলকুল গায়েব। তবে কানের সাদা ডগা দেখা যাচ্ছিল বোধহয়। তখন কি আর স্থির হয়ে অত দেখার সময়! এমন ভয়াল ব্যাপার চোখের সামনে ঘটতে দেখে বিরাট চিৎকারে লাফিয়ে ওঠে কুণ্ডুদা। রাকিব খালি ট্রের বোঝা কাঁধে আসছিল উল্টোদিক থেকে। আধাশরীরী বেড়ালটাকে ছুটতে দেখে ও পাগলপারা, দিগ্বিদিকজ্ঞান হারিয়ে দৌড়ায় কাঁধের ট্রে ফেলে…। সাহেব গল্প শুনতে শুনতে চোখ বোলায়। ফ্লোরে বিড়ালের পায়ের ছোপগুলো টানা কিছুদূর গিয়ে হঠাৎ দিগভ্রান্ত ছোটাছুটি করেছে, শেষে ব্রয়লার রুমের পাশের রেলিঙের দিকে ছুটে গিয়ে মিলিয়ে গেছে। মানে লাফ মেরেছে নিচে। কুন্ডুদা বলে চলেছে – ওর হাইপ্রেশার, ঘটনার অভিঘাত নিতে না পেরে মাথা ঝিমঝিম অন্ধকার…।

ময়দা মাখা মাথা-পিঠহীন বেড়ালটাকে দেখেছে ফ্লোরের আরো ক’জন। তাদের একজন, ট্রলিম্যান প্রেমার বয়ান সবচেয়ে ইন্টারেস্টিং। সে দেখেছে বেড়ালটাকে ছুটে একটা কার্ডবোর্ডের পার্টিশান পার করতে। পার্টিশানে ধাক্কা খাওয়ামাত্র সাদা দেহাংশগুলো বোমার মত ফেটে রেণু রেণু ছড়িয়ে গেল। পার্টিশানের ওপারে আবার রেণুগুলো জড়ো হয়ে লেজ পিছন থাবার আকার পেল সঙ্গে সঙ্গে। আবার সেটা ছুট লাগালো, শেডের দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে একইরকম রেণু রেণু ছড়িয়ে গেল। 

অন্য প্রোডাকশান শেডগুলোতে এরপরের কয়েকঘন্টা ময়দা মাখা মুন্ডু-পিঠহীন বেড়ালকে বসে থাকতে বা চলতে ফিরতে দেখে চলল কেউ না কেউ। পরিস্থিতি এমন যে ম্যানেজারকে রুম থেকে বেরিয়ে এসে হাঁকডাক করতে হল প্রোডাকশান চালু রাখার জন্য। তার কাছে ‘ভয়ে হাত-পা বসে যাচ্ছে’ বলে ছুটি চাইতে গিয়ে ধাতানি খেয়ে কেউ কেউ ফিরে এল। কিন্তু সে ধাতানি ফ্যাক্টরি জুড়ে বয়ে চলা আতঙ্ক আর গুঞ্জনস্রোত থামাতে পারল না। 

করুণাময়ী এপার্টমেন্টে রংগা নানা কাণ্ড বাঁধালে যেমন করে থাকে সাহেব, তেমনই পাঁচজন উৎকন্ঠিতের ভীড়ে মিশে ডুবে ডুবে জল খাওয়ার ভঙ্গীতে সবকিছু দেখে চলেছিল, শুনে চলেছিল। বিপদে ফেলল হালদারকাকা। ফ্যাক্টরির সিনিয়ার টেকনিশিয়ান। সাহেবদের পাশের গ্রামের বাসিন্দা। সাহেবকে বেকারী ফ্যাক্টরির সুপারভাইজারির চাকরি, করুণাময়ীর ফ্ল্যাট সব এই জোগাড় করে দিয়েছে। কান্তিকাকার বন্ধু। সেইসূত্রে ওখানকার বেড়ালভূতের উপদ্রবের গল্প জানে। অতএব নিখাদ ঠাট্টাচ্ছলে প্রশ্ন করল, “হ্যাঁরে সাহেব, তোদের করুণাময়ীর বিড়ালভূতটা তোকে ফলো করতে করতে এখানে হাজির হয়নি তো!” এসময়ে এই প্রশ্ন হাঁটে হাঁড়ি ভাঙার সামিল। মুহুর্তে সাহেবের মুখ শুকিয়ে আমসি। আশেপাশের অনেকগুলো জিজ্ঞাসু দৃষ্টির সামনে আড়ষ্ঠ হাসে। জানায় এপার্টমেন্টের একজন ফোন করে কিছু আগে বেড়ালভূতের মাছচুরির খবর দিয়েছে। একই ভূত দু’জায়গায় থাকবে কি করে! তারপর আচমকাই জোর গলায় ঘোষণা করে, “ফ্যাক্টরিতে কোনো বেড়াল অপঘাতে মরেছে কিনা খোঁজ করো সবাই”।

তখনকার মত পরিস্থিতি সামলায়। সাহেবের বুক যদিও ভয় দুরুদুরু। হালদারদা কাকাকে আলাদা করে ডেকে ঝাঁঝি দেয়, “তুমি কি দেয়া চাকরিটা খেয়ে নিতে চাও!”

পরিস্থিতি লঘু করতে চায় হালদারকাকা, “আরে ধুর; ও তো আমি ঠাট্টা করছিলাম। কিচ্ছু হবে না তোর”।

আশ্বাসে আশ্বস্ত বোধ করে না সাহেব। ঘটনাতো সত্যি। করুণাময়ীর বেড়ালভূতই ফ্যাক্টরিতে উপদ্রব করেছে। এবং যোগসূত্র সাহেব। হামলাবাজিটা রংগা শুধু আজ করেই থেমে যাবে এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। খাঁড়া কানে ফ্যাক্টরি স্টাফেদের কনাঘুষো শুনে চলে। যারা জানত না, তারাও জেনে যাচ্ছে সাহেবদের এপার্টমেন্টের বেড়ালভূতের উপদ্রবের কথা। আর দু-চারবার রংগা এমন হামলা চালালে এদের স্থির বিশ্বাস হবে সাহেবের পিছু পিছু ওই পশুপ্রেতযোনী ফ্যাক্টরিতে আসছে উপদ্রব করতে। ওরা তখন দল বেঁধে হাজির হবে ম্যানেজারের কাছে সাহেবকে ফ্যাক্টরি থেকে সরিয়ে দেয়ার দাবি নিয়ে। একজন সুপারভাইজারকে বাঁচাতে এতগুলো স্টাফের সাথে বিরোধে যাবে কেন ম্যানেজার? তারমধ্যে ম্যানেজারও যদি বেড়ালভূতের সাক্ষাৎ পেয়ে যায় তাহলে তো কথাই নেই। কী বিপদেই না ফেলল রংগা! 

রংগাকে ছুঁড়ে দেয়ার পর গোটা দু’দিন আর ওর অস্তিত্ব টের পায়নি সাহেব। ভেবে আশ্চর্য্য হচ্ছিল, রংগা নামক উপদ্রব মুক্তি মোটেই ওকে শান্তি দিচ্ছে না। হারা মানিক ফিরে পেয়ে হারিয়ে ফেলল, এমন এক শূন্যতা বোধ বুক জুড়ে, মনমরা ভাব। খেতে বসে রংগার স্বভাবসিদ্ধ পিঠ ঘেঁষে দাঁড়ানোটা মনে করে চোখ বেয়ে জল নামছিল। মনে মনে বলেছিল, যেখানেই থাকুক, সুখে থাকুক। জানলায় বসে উকুলেলেতে তুলেছিল বিষন্ন ধুন, কোমোর ঘেঁষে বসেনি রংগা। রাতে রংগার স্পর্শহীন শুয়ে থেকে থেকে ঘুম নামার আগে দীর্ঘশ্বাস ফেলে স্বগতোক্তি করেছিলো সাহেব, “যাক, করুণাময়ীর ভূতুড়ে বিড়ালের উপদ্রব শেষ হল”। বিশেষ সুখদায়ক আশ্চর্য এক ঘটনা ঘটেছিল তার জীবনে, দুনিয়ার সেটা সহ্য হল না – এমন এক অবুঝ অভিমান বুকে জড়ো হয়।

আজ সকালেই মামনের সাথে ফোনে গল্প করছে, কথা বলতে বলতে থতমত খায়। রংগা। বিছানায় বাবু হয়ে বসা সাহেবের কোলটা জুড়ে এসে বসেছে। ফিরে এসেছে আবার! ছেড়েই যায়নি আসলে, অভিমানে গুটিয়ে বসেছিল। তাড়াতাড়ি মামনের সাথে কথা মিটিয়ে রংগাকে কোল থেকে তুলে বুকে জড়িয়ে আন্দাজে কানের কাছে মুখ নিয়ে বলে, “রংগা, সোনা আমার; তুই চলে যা যেমন গেছিলি। এ পৃথিবীতে তোর আর থাকা চলে না রে! মানুষ তোকে সহজভাবে নেবে না। আমাকেও। চলে যা সোনা বিড়াল”।

রংগা বেশি চটকে ধরা পছন্দ করে না। হাঁচরপাঁচর করে নেমে যায়। চলে যায় না। প্রিয় পালকের সঙ্গ ছাড়ার কোনো ইচ্ছা নেই ওর। সাহেব ওকে বলে, “থাকতে হলে ঘরে থাক। বাইরে যাস না। অন্যের বাড়িঘরে হানা দিস না। সিঁড়ি রেলিঙে গিয়ে বসে থাকিস না। কাউকে জানান দিস না তুই আছিস। বুঝলি, রংগা, কাউকে জানান না দিয়ে থেকে যা।” কথা শোনার বহর আজ দেখিয়ে দিল রংগা। বোধহয় ফ্ল্যাটের পরিবেশ একঘেয়ে লাগছিল। সাহেবের পিছন পিছন ফ্যাক্টরি অভিযানে চলে এসেছে। সাহেবকে খানিক স্বস্তি দিতেই বুঝি আকাশে সদ্য ভেসে আসা কালো মেঘের পাহাড় তড়িঘড়ি বৃষ্টি হয়ে নামল। যে আশঙ্কাটা সাহেব করছিল– ময়দার লেই মাখা মুন্ডহীন বেড়াল ল্যাজ খাড়া করে সাহেবের পিছন পিছন হেঁটে চলেছে এ দৃশ্য আজ শহর দেখবে– তার থেকে নিস্কৃতি। বৃষ্টি ময়দা ধুইয়ে রংগাকে আবার অদৃশ্য করে দেবে।

লক্ষ্মী হয়ে, কাউকে অস্তিত্ব জানান না দিয়েই ক’দিন থেকে গেল রংগা। না এপার্টমেন্টে না ফ্যাক্টরিতে; কোথাও কোনো উপদ্রব নেই। শেষমেশ বোধহয় ও বুঝতে পেরেছে সাহেব ছাড়া কেউই ওকে স্বাভাবিকভাবে নিতে পারছে না। এবার শুধু মামনকে বুঝিয়ে নিলেই হয়, ফ্ল্যাট বদলে লাভ নেই। যে ফ্ল্যাটে যে চুলোয় যাক সাহেব, ওর পোষ্য সেখানেই গিয়ে ঘাঁটি গাড়বে। মরণের ওপার থেকে সাহেবের সঙ্গ পেতে ফিরে এসেছে রংগা, ছেড়ে যাবে না। প্রথম প্রথম একটু অস্বস্তি হলেও কিছুদিনের মধ্যেই রংগাকে আর ভয়াবহ মনে হবে না। ও এমন কিছুই করে না যা ভৌতিক, জীবিত থাকলে করত না।

বেড়ালসুলভ যে কাজটা এরপর করল রংগা, তাতে সাহেবের সব পরিকল্পনায় জল– সঠিক বলতে ডাল পড়ে গেল। সি-ফোরের এলা আন্টি অফিস বেরোনোর আগে তাড়াহুড়োয় রান্না সারছে। পায়ের কাছে নাইটি ধরে টানাটানি করছে তার আড়াই বছরের মেয়ে পম্পি। মেয়ে আর শ্বশুর-শ্বাশুড়ির দুধ ঠান্ডা করতে রেখে কড়ায় ফোড়ন দিয়ে কুকারে সেদ্ধ ডাল তাতে ঢালতে ঢালতে আন্টি দেখতে পেল বাটির দুধে ঢেউ কাটছে। অদৃশ্য কোনো কিছু বাটির এককোণ থেকে জিভ চালিয়ে দুধ খাওয়ার চেষ্টা করছে। অদৃশ্য কিছুটা যে আসলে কী তা নিয়ে করুণাময়ীর বাসিন্দাদের সংশয় থাকার কথা নয়। দেখে আঁতকে ওঠামাত্র হাত ফসকে কুকারের সেদ্ধ ডাল গিয়ে পড়ে পম্পির গায়ে। নরম চামড়া। মুখ বুক পেট ঝলসে যায়।

নাইট শিফটের শেষে কচুরি কিনে ফিরছিল সাহেব। শ্লথ পায়ে এপার্টমেন্টের সিঁড়ি ভাঙতে ভাঙতে ওপরের ফ্লোরে হুলুস্থুলু চিৎকার চেঁচামেচি শুনে প্রমাদ গণে সে। ছুটে পৌঁছোয় অকুস্থলে। এলা আন্টির ঘরে জড়ো হওয়া আরো ক’জন প্রতিবেশীর সাথে সাহেবও দেখে রান্নাঘরের স্ল্যাবে চলকে পড়া দুধের পাশে স্পষ্ট দু’চারটি বেড়াল পদছাপ। ঠাকুমার কোলে শোয়া পম্পির বুকে বরফ মোড়া গামছা চেপে ধরে উদ্বিগ্ন মুখে কান্তিকাকি। পম্পি প্রকাণ্ড কান্না আর চিৎকার, ছুঁড়ছে হাত পা। সাহেব পম্পিকে কোলে তুলে নেয়। এলা আন্টিকে আসতে বলে ছোটে রায় মেডিক্যালে। প্রাথমিক চিকিৎসাটা ওখানে হয়ে যাবে। 

শেষমেশ নার্সিংহোমে ভর্তি করতে হল পম্পিকে। সব মিটিয়ে ফিরল যখন সাহেব, ঘড়িতে আড়াইটে। সকাল থেকে পেটে দানা পড়েনি। পম্পিকে ঘাড়ে তুলে ডাক্তারখানায় দৌড়েছিল যত না দায়ীত্ববোধে তার থেকে বেশি অপরাধবোধ থেকে। কেউ না জানুক ও তো জানে, দায়ী কার বেড়াল। আর বেড়াল কবেই বা নিজের অপকর্মের দায় নিয়েছে। সব দোষ পালকের। জীবিত থাকতে রংগার চুরি চামারি হুজ্জুতির অনেক খেসারত দিতে হয়েছে সাহেবকে। কারোর বাড়ি থেকে গোটা মাছ ঝেড়েছে তার দাম দাও। কার চালের ওপর অন্য হুলোর সাথে মারামারি করে টালি ভেঙেছে, নিজেদের ঘরে রাখা টালি তাকে দিয়ে এসো। প্রতিদ্বন্ধী হুলো ভবঘুরে অতএব পোষা হুলোর পালকই দেবে ক্ষতিপূরণ। কিন্তু আজ পরিস্থিতি অত সরল নয়। ক্ষতিপূরণও আর সহজ নেই। 

ফ্ল্যাটে ফিরেই সটান বিছানায় ফ্ল্যাট হয়েছে সাহেব। শুয়ে শুয়ে ভেবে যাচ্ছে। ভেবে কোনো কুল পাচ্ছে না। রংগা ক্রমাগত তার জীবন দুর্বিষহ করে তুলছে। এই ভূতুড়ে বেড়াল পোষার ব্যাপারটা প্রকাশ হয়ে গেলে কি যে দুর্গতি হবে! বেড়ালের সব কৃতকর্মের দায় তখন বর্তাবে সাহেবে। ক্লান্তি কাটা, ঘুম আসা দুরস্থান, মাথা ভার করা ভবিষ্যৎ আশঙ্কা নিয়ে বিছানায় এপাশ ওপাশ করে চলেছে সাহবে। নাস্তানাবুদ ভেবে ভেবে। দরজায় আলতো টোকা পড়ল কয়েকটা। বিছানা ছেড়ে উঠে সন্তর্পণে দরজা খোলে। এলা আন্টি। মুখে বিপন্ন কৃতজ্ঞতা, হাতে টিফিন কৌটো। 

“কচুরি তরকারির ঠোঙাটা তো আমার ওখানেই রেখে এসেছো। সেই সকালের জিনিস; তরকারি পচে গেছে, বাসি কচুরি খাওয়া বিষ খাওয়ার সমান। ফেলে দিয়েছি। এগুলো সকালে করেছিলাম। ওই আমি দুটো খাচ্ছি, তোমার জন্য দুটো আনলাম। খেয়ে নাও।” 

এলা আন্টিকে সৌজন্যের খাতিরে ভেতরে আসতে বলা উচিত। কিন্তু দুস্কর্ম করে থেকে উধাও রংগা যদি এখনই ফিরে আসে। নতুন মানুষকে নিজের ‘এলাকাভুক্ত’ করার অভ্যাসে যদি পায়ে গা ঘষে! ভেবে, আপ্যায়নের দিকে না গিয়ে মুখে ক্লান্ত হাসি টেনে সেই আশ্বাসটাই দেয় সাহেব যা নার্সিংহোম থেকে ফেরার পথে দিয়েছে।

“তোমার কোনো চিন্তা নেই আন্টি। তুমি অফিস কোরো। আমি নার্সিংহোমে ডে-ভিজিটে চলে যাবো। আরো কোনো দরকার লাগলে বোলো।”

দু’টো রুটি ভাঁজ করে রাখা; সাথে ছোটো টিফিনকৌটোয় আলু-পটলের তরকারি। বিছানায় গুম হয়ে বসে রুটি ছিঁড়ে তরকারি মাখিয়ে খেতে শুরু করে সাহেব। রুটিটা শক্ত মত হয়ে এসেছে, কড়কড়ে হয়ে যায়নি। একেকজনের রুটির হাত থাকে। তরকারিতে আরেকটু ঝাল পড়ত। এলা আন্টির সাথে সিঁড়িতে দেখা হলে সৌজন্য বিনিময়ের বেশি সম্পর্ক ছিল না। আজ কয়েকঘন্টায় হৃদ্যতা গড়ে উঠেছে। যদি কোনোদিন ফাঁস হয়ে যায় পম্পির একসিডেন্টের জন্য বকলমে দায়ী কে! রুটি চিবানো থেমে যায় সাহেবের।

৭ 

সিদ্ধান্তটা নিয়ে নেয় সাহেব। বাড়িই বদলাবে। মামন আর রংগাকে নিয়ে সংসার পাতবে অন্যত্র। মামনকেই বাড়ি খোঁজার দায়িত্ব দিয়েছে। কেমন বাড়ি চাই সেটা বুঝিয়েছে। খুব রোমান্টিক একটা ভাবনা। এই ফ্ল্যাটটা ছাড়লে ওরকম একটা বাড়ির জন্যই ছাড়া যায়।

কিরকম? ঘিঞ্জি পাড়ার মধ্যে হবে না। আশপাশটা বেশ ফাঁকা ফাঁকা থাকবে। বাড়িতে অন্য ভাড়াটে থাকলে চলবে না। বাড়িওলার বসতভিটা হবে না সেটা। বাড়িটা হবে শুধু মামন আর সাহেবের। সাহেব আর মামন থাকবে শুধু সেখানে। শুনে বুঝদার দুষ্টুমি মাখা হেসেছে মামন।

“কত শখ! এরকম অর্ডারি বাড়ি কে কোথায় বানিয়ে রেখেছে ভাড়া দেয়ার জন্য? অত পাওয়া যায়না বাবু।” মুখে বললেও আসলে খুঁজছে। খুশি মনেই খুঁজছে। ওর পক্ষে খোঁজা সহজ। এই শহরেরই মেয়ে, চেনা পরিচিত অনেক। তায় ও যে এডভোকেটের রিসেপশনিস্টের কাজ করে, তার কাছেও বাড়ি জমি সংক্রান্ত ব্যাপারে প্রচুর লোক আসে। পেয়ে ঠিক যাবেই। ভাড়া হয়তো একটু বেশি পড়বে। এখনকার মত বাড়ি থেকে হেঁটে ফ্যাক্টরিতে যাওয়া যাবে না। যাতায়াতের খরচ যোগ হবে সংসারের খাতায়। তা হোক, রংগার জন্য, মামনের জন্য, সংসারের জন্য এটুকু করতেই হবে। 

মতলবটা হল এরকম ক্লোজ কমিউনিটি থেকে সরে যাওয়া। যেখানে ফ্ল্যাটে ফ্ল্যাটে হামলা করে রংগা এলাকা সরগরম করতে পারবে না। নিরিবিলি অঞ্চলে এদিক ওদিক দু-এক জায়গায় উৎপাত করলেও তার সাথে সাহেবকে কেউ জড়াতে পারবে না। এখানে সে বিপদ সবসময় যেন ঘাড়ের ওপর ঝুলে আছে। কখন মর্জিমত খসে পড়বে। ঘাড় বাঁচাতেই সরে যেতে হবে সাহেবকে।

বাঁচে না। বিপদের ঝুলন্ত ভারী ফলাটার মর্জি হয় ঘাড়ের ওপর নেমে আসার। মাঝ সপ্তাহে, বৃহস্পতিবারে। ডিউটি করে বাড়ি ফিরছে যখন, দুপুর দু’টোয় চারপাশে বিকেলের আলো। আকাশে মেঘভার। কুকারে ভাত ডিম আলু সেদ্ধ করে কাঁচালঙ্কা ঘি দিয়ে মেখে গপাগপ গিলে বিছানা নিতেই গুটিগুটি বালিশে এসে শোয় রংগা। তখনই থমধরা মেঘ ভেঙে ঝমঝমিয়ে নামল বৃষ্টি। প্রগাঢ় ঘুমে ঢলে পড়তে সময় লাগল না সাহেবের। একটু পরপরই বেজে ওঠা ফোন রিং সে ঘুম ভাঙাতে পারল না। 

বাজ পড়ার গমগম শব্দের মাঝে তীক্ষ্ণ স্বরে কেউ ডেকে চলেছে সাহেবকে। ধড়মড় করে উঠে বসল। স্বপ্ন নাকি? আকাশে মেঘ নেই। বৃষ্টি ধরে গেছে। বিষন্ন আকাশে দিনের বিদায়ী আলো, জানলা দিয়ে চুঁইয়ে ঢুকছে ঘরে। চক্ষুকর্ণের বিবাদ মিটিয়ে দরজায় ধুমধাম ধাক্কা পড়ল। মামন চিল চিৎকার করছে ওর নাম ধরে। দরজার দিকে দু’পা এগোতেই পা হড়কে গেল। এত ঘুম পাচ্ছিল খেয়ে উঠেই যে বৃষ্টি শুরু হয়েছে দেখেও উঠে জানলা বন্ধ করতে ইচ্ছে যায়নি। ছাঁট ঢুকে মেঝে ভিজে গেছে। সাড়া দিয়ে দরজা খোলে। চোখেমুখে বিরক্তি মেখে দাঁড়িয়ে আছে মামন। উল্টোদিকের ফ্ল্যাটের দরজা ধরে দাঁড়িয়ে বাপ্টুর মা, পাশের ফ্ল্যাটের সুবীর ধর বেরিয়ে এসেছেন; সিঁড়ি বেয়ে নামছিলেন তন্ময় মিত্র, দাঁড়িয়ে গেছেন। ভালোই লোক জমেছে যা হোক।

“কুম্ভকর্ণও তোমার কাছে ফেল করে যাবে। দিনেদুপুরে এমন ঘুমাও কি করে! আমি ওদিকে ফোনের পর ফোন করে না পেয়ে…” 

বলতে বলতে প্রতিবেশীদের দিকে অপ্রস্তুত হাসি মেলতে চাওয়া সাহবের বুকে ঠেলা দিয়ে ভেতরে ঢোকে মামন। নিজেই দরজা বন্ধ করে দেয়। 

“কি ব্যাপার! কি হয়েছে?”  

“মনমতো বাড়ি পাওয়া গেছে।” 

“হ্যাঁ?”

“হ্যাঁ। সেইটা জানাতে ফোন করেছি তো বাবুর তোলার নাম নেই। একি! ঘরের এ কি অবস্থা!”

জল সপসপে মোজাইক মেঝের দিকে চেয়ে আঁতকে ওঠে মামন। 

“জানলা বন্ধ না করে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।”

সাহেবের মুখের ওপর হাত নেড়ে ওর ব্যাখ্যা শোনায় অনাগ্রহ প্রকাশ করে বাথরুমের দিকে পা বাড়ায় মামন, মপটা নিয়ে ঘর মোছার বাসনায়। সাহেব হাত ধরে টেনে বিছানায় বসায়।

“ঘর মোছা পরে হবে। আগে বাড়ির খবর বলো।”

নার্ভাস হাতে একটা সিগারেট জ্বালিয়ে বাবু হয়ে বসে। মামন হড়বড় করে জানায় –ওর বসের এক ক্লায়েন্ট শহরের একধারে বেশ ফাঁকা জায়গা দেখে জমি কিনে রেখেছিল। সেখানে এখন বাড়ি তুলেছে। বাইরের প্লাস্টার শুধু বাকি। এদিকে রিটায়ারমেন্টের দু’বছর বাকি থাকতে এসেছে ট্রান্সফার অর্ডার। এতে তার জোড়া সমস্যা। এক তো নিজে দাঁড়িয়ে থেকে কাজ দেখভাল করা অসম্ভব হয়ে পড়ল। তার চেয়েও বড় সমস্যা, এডভোকেট লম্বা মামলা লড়ে যে ক্লাবের হাতে দখল হয়ে যাওয়া জমিটা ছাড়িয়েছিলেন, তারা এর অনুপস্থিতির সুযোগে আবার দখলদারি করতে পারে। ব্যাপার জানতেই এডভোকেট মামনের সাথে কথা বলিয়ে দেয় ওনার। উনি সহজেই রাজি। এমনই তো চাইছিলেন। ভাড়া দিতে হবে নামমাত্র। ফিনিশিঙের কাজ দেখভাল করতে হবে। ভদ্রলোক আগামীকাল ফিরবেন কাজের জায়গায়। তাই আজই বাড়িটা দেখিয়ে নিতে চান। মামন তখনই ফোন করে সাহেবকে। পায় না। মুষলধারে বৃষ্টি পড়ছে দেখে অপেক্ষা করতে বাধ্য হয়। এখন এসে দেখে এই অবস্থা। যাক, এখন সাহেবের কাজ তৈরি হয়ে নেওয়া। একটু সন্ধে হয়ে গেলেও সমস্যা নেই। বাড়িতে ইলেক্ট্রিসিটি আছে। 

কথা শেষ করে মামন ওঠে মেঝে মুছতে। মেঝেয় মপ টানতে টানতে চোখ পড়ে সোফার পায়ায়। 

“একি! এ তো বেড়ালে আঁচড়ে ফালা ফালা করে দিয়েছে! বেড়ালভূত তোমার ঘরে আসে বলোনি তো!”

“ও-ওটা অন্য বিড়াল। আমার কাছে মাছ কাঁটা খেতে আসে।” 

“খেতে আসে বলে কি শুতেও চাইবে? আর তুমিও দেবে? আসবাবপত্র নষ্ট করলে তাড়াতে হয় জানো না?” 

বলতে বলতে আঁতকে হাতের মপ ফেলে পিছিয়ে যায় মামন। ওর সদ্য মোছা জায়গা দিয়ে জল মাখা পায়ের ছাপ এঁকে সাহেবের কাছে আসছে রংগা। একেই বলে ঝুলি থেকে বেড়াল বেরিয়ে পড়া। সম্ভবতঃ দরজা ধাক্কাধাক্কির শব্দে ঘাবড়ে সরে পড়েছিল। এখন সব থিতু বুঝে সাহেবের কাছে আসছে। টুক করে লাফিয়ে কোলে উঠে পড়ল রংগা। কোলে দাঁড়িয়ে বুকে পায়ের ভর রেখে সাহেবের থুতনিতে মাথা ঘষে সোহাগ জানাচ্ছে। ওকে শান্ত করতে মাথায় পিঠে হাত বোলালো সাহেব। ছানাবড়া চোখে সবটা দেখে চলে মামন। 

“ওটা কি? ওই ভুতুড়ে বেড়ালটা? তুমি ওটার গায়ে হাত দিলে! তোমার ভয় করছে না?”

মামনের গলা চেরা চিৎকার বিপন্ন করে সাহেবকে। এমনকিছুর ভয়ে কাঁটা হয়েছিল। মামনকে বোঝাতে হবে ভেবে গেছে, কিভাবে, কি বলবে কিছুই স্থির করতে পারেনি। এখন শিয়রে শমন। সাহেব যথাসম্ভব স্বাভাবিক রাখে গলার স্বর, 

“করছে না। তোমারও ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই। এটা আমার পোষা বিড়াল। তোমায় কিছু করবে না।” 

“কিক্‌ -কী? তুমি ভূত বেড়ালটাকে পুষছ!”

মামের ঠোঁট দু’টো এগিয়ে শেষ শব্দটা উচ্চারণ করে স্থির হয়ে গেছে। এতটাই হতবাক হয়েছে যে ভূতের ভয় লুপ্ত হয়ে গেছে সাময়িক; কয়েক পা এগিয়ে এল মামন। হয়তো নিজেরই উত্তেজনা শান্ত করতে সাহেব রংগার মাথা গলা পিঠে হাত বুলিয়ে যাচ্ছে। বেড়ালের অবস্থান বুঝে সেদিকে আঙুল তুলে মামন পরের চিৎকারটা ছাড়ে। 

“এক্ষুনি তাড়াও ওটাকে। তোমার মাথা একেবারে খারাপ হয়ে গেছে নাকি! ভূতের গায়ে কেউ হাত দেয়? গঙ্গাজলে হাত ধোও। ওরে বাবা! ওরে মা!” 

ক্রমে উত্তেজনা বাড়ছে মামনের। সাহেব হাতের ইশারায় ওকে শান্ত হতে বলে, 

“এত ভয় পেও না। বলছি তো ও তোমায় কিছু করবে না। এটা আমার পোষা বিড়াল রংগা।” 

“তু-তুমি ভুত পোষো?” 

“আরে না। সেরম কিছু না। রংগা আমার অনেকদিন আগের পোষা বিড়াল। মরে গেছিল। সপ্তাকয় হল ফিরে এসেছে।” 

“ফিফ-ফিরে এসেছে! তুমি তাকে রেখে দিয়েছো? একটা বয়স্ক লোকের পা ভাঙল, একটা বাচ্চা পুড়ে গেছে ওর জন্য; আর তুমি চুপ করে আছো? কাউকে কিছু বলছ না, ব্যবস্থাও নিচ্ছো না!”

মামনের তীক্ষ্ণ গলা দরজার বাইরে যাচ্ছে? কেউ শুনতে পেয়ে গেল? ভীষণ শঙ্কিত সাহেব মামনকে সংযত করার চেষ্টা করে। 

“আস্তে বলো। লোকে শুনবে। আমি শেষ হয়ে যাবো।”

“শুনুক। সবাই শুনুক। তোমার মত ভয়ঙ্কর লোকের আসল পরিচয়টা জানুক। বাবা গো! এ আমি কার সাথে ঘর বাঁধব বলে ঘর খুঁজছি?” 

“মামন মামন। এরম করে না। পাগল হোয়ো না। শোনো একটু আমার কথা। রংগা ভূত বিড়াল মানছি। কিন্তু ও ভূতুড়ে নয়। স্রেফ ওকে দেখতে পাওয়া যায় না বলেই নানা লোকের একসিডেন্ট হচ্ছে। এসব ঠিক হয়ে যাবে নতুন বাড়ি গেলে। সেখানে তো আর প্রচুর লোক আশেপাশে উপরে নিচে থাকবে না... ”

“ওই – ওই ভূত বেড়াল যাবে নতুন বাড়ি? তুমি এর জন্য আমায় দিয়ে বাড়ি খোঁজাচ্ছো? আ-আমি নতুন সংসার পাতব ভূত বেড়াল নিয়ে!” 

মামন গলা সপ্তমে তুলে বলে চলে, 

“আ-আমায় পাগল বলছ তুমি? আমি পাগলামি করছি? আমি ভূত বেড়াল কোলে নিয়ে আদর করছি? আমি – না – না – তোমার সাথে সংসার করা দূর – আঁ – আঁ – মাগো-ও!” 

মামনের কথার মাঝেই রংগা ওর কোলে উটকো হয়ে উঠছে টের পাচ্ছিল সাহেব। ব্যাপার পুরো বোঝার আগেই ঘটে গেল কাণ্ডটা। ঘন ঘন মাথা ঝাঁকাতে থাকা মামনের কানের ঝুলন্ত দুল রংগার মনোযোগ কেড়েছিল। সটান ঝাঁপ দিয়েছে দুল লক্ষ্য করে। মুহুর্তে মামনের কানের লতি ছিঁড়েখুঁড়ে দরদর রক্ত। মেঝেতে রক্তরাঙা থাবার ছাপ ফেলতে ফেলতে রান্নাঘরের দিকে ছুটে গেল রংগা। আকাশী পাথর আর কড়ি লাগান মামনের দুলটা শূন্যে দুলতে দুলতে চলে গেল রান্নাঘরের পার্টিশানের আড়ালে। 

মামন ডাকাত পড়া চিৎকার ছাড়ল – “আ-আ-আ-মা-আ-গো-ও-ও; খুন করল, খুন করল”।

কি করছে ঠিকমত না বুঝেই মামনের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে ওকে মেঝেয় পেড়ে ফেলে সাহেব। স্রেফ ওকে চুপ করানোর তাগিদই কাজ করেছিলো। মামনের পাল্টা ওকে উল্টে ফেলে দিতে চাওয়ায়  সাহেবকে আরো বলপ্রয়োগে বাধ্য করে। ধ্বস্তাধ্বস্তি চলে রক্তাক্ত মেঝেতে। মুখ টিপে ধরা সাহেবের বাঁ-হাতের তেলোর ধারে মামন সর্বশক্তিতে কামড় বসাতে ডান হাতে ওর গলা টিপে ধরে সাহেব। এভাবে বাঁ-হাতটা ছাড়িয়ে বিছানার ধারে রাখা নরকরোটি এশট্রেটা হাতে পেয়ে যায়। খাবলে টেনে আছড়ে নামায় মামনের কপালে। 

বেমক্কা ঝড়ের আগের স্তব্ধ প্রকৃতির মত ঘরটায় সাহেব হামাগুড়ি দিয়ে পিছু হেঁটে সরে যায় মামনের নিথর দেহটা থেকে। বিস্ফারিত চোখে চেয়ে দেখে নিজের আর রংগার কীর্তি। মেঝেময় ঘষড়ে যাওয়া রক্তরেখায় মামন-সাহেবের যুদ্ধচিহ্ন আঁকা। রক্তদাগে নতুন রক্ত সিঞ্চন করছে মামনের কপাল থেকে চুল ভিজিয়ে নামা রক্তধারা। ফুলোফুলো কোমল মুখটা ওর সিগারেট ছাই রক্তে মাখামাখি। নাক ও ঠোঁটের মাঝে, বন্ধ চোখদুটোর খাঁজে, চুলে আটকে রয়েছে সিগারেটের শেষাংশ। মামনের গপসো চুল ভরা মাথা মুখের চারপাশে ছড়িয়ে রয়েছে তাদের প্রেমের বর্ষপুর্তিতে মামনের উপহার নরকরোটি এশট্রের নানা আকারের টুকরো। গালের ভগ্নাংশে ভর দিয়ে কাত হয়ে একটা চোখের কোটর ঠায় দেখে চলেছে সাহেবকে। 

পরিপূর্ণ নিস্তব্ধতা ছিঁড়ে ছিঁড়ে যাচ্ছে ঠুনুর ঠুনুর মৃদু শব্দে। গ্যাস সিলিন্ডারের পাশে মামনের দুলটা নিয়ে খেলছে রংগা। হামাগুড়ি দিয়েই যায় সাহেব বন্ধ দরজায়। কান ঠেকিয়ে একাগ্রভাবে বাইরেটা বুঝতে চেষ্টা করে। একেবারে নিস্তব্ধ। তাদের ঝগড়ার শব্দে লোক জড়ো হয়ে যায়নি। দরজা ধরে উঠতে গিয়ে ফের বজ্রাসনে বসে পড়ে। সিঁড়ি বেয়ে উঠে আসছে পায়ের আওয়াজ। দু’জোড়া। ভেসে আসছে কথপোকথন। ফ্লোরে এল। একজোড়া পদশব্দ ওপরের সিঁড়ি ভাঙতে থাকে, আরেকজোড়া তার দরজার সামনে এসে থমকায়। দরজায় ধাক্কা পড়ে, “সাহেব, সাহে-এ-ব”।

কান্তিকাকার গলা। সাড়া না দিলেও সাহেবের ভয় হচ্ছে তার হৃদপিন্ডের প্রকাণ্ড লাফান শব্দ কান্তিকাকা শুনতে পেয়ে যাবে বুঝি। দরজার সামনে থেকে সরে যেতে চেয়ে ফের মনে হয়, যদি নড়ার শব্দ বাইরে যায়। হালদারকাকার বন্ধু। এই ফ্ল্যাটের মালিকেরও। সেইসূত্রে নিজেকে সাহেবের সেমি গার্জেন, সাহেবকে ওর প্লাম্বার ইলেক্ট্রিশিয়ান মনে করে লোকটা। যাক, ডেকে না পেয়ে সিঁড়ি ভেঙে উঠে যাচ্ছে। 

পায়ের শব্দ একেবারে মিলিয়ে যাওয়ার পর ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায় সাহেব। তার সাদামাটা নিরিবিলি শান্ত গোছানো জীবনটার ওপর যে ভয়ঙ্কর দুর্যোগ নামতে চলেছে সেটা মাথায় পাকিয়ে ওঠে। প্রতিবেশি, লাঞ্ছনা, পুলিশ, জেল। মা-বাবা-বোন-গ্রামের লোক। মায়ের ভীষণ ভেঙে পড়া মুখটা দেখতে পায় সাহেব। বাবার অবাক বিড়ম্বিত মুখ। হাতকড়া পরিয়ে সাহেবকে এই পাড়া থেকে পুলিশভ্যানে তোলা হচ্ছে। মামনের বৌদি দাদা সাথে গৌতমবাবুর ছেলে সাহেবকে এলোপাথারি মেরে আক্রোশ মেটাতে চাইছে। ছিঁড়ে নিতে চাইছে সাহেবের চুল পোশাক। পম্পির মা এলা আন্টির মুখের আস্থা, মামনের মায়ের ভরসার দৃষ্টি বদলে গেছে ঘৃণা, অবিশ্বাসে।

এগুলোই ভবিতব্য। লন্ডভণ্ডকারী প্রলয়ঙ্কর ঝড় উঠতে চলেছে তার জীবনে। মামনকে খুনের দায়ে ফাঁসি বা যাবজ্জীবন – মামন সত্যিই মারা গেছে? অন্তিম একটুখানি আশায় বুক বেঁধে সাহেব একভাবে পড়ে থাকা দেহটার কাছে যায়। নাকের সামনে হাত রাখে। নিঃশ্বাস পড়ছে! বেঁচে আছে মামন! উঠে বসবে একসময়। তারপর? ফাঁসি বা যাবজ্জীবন বাদে সবগুলো হবে। মামনই চিৎকার করে লোক জড়ো করবে। যে কোনো সময় জ্ঞান ফিরবে আর শুরু করে দেবে তান্ডব। 

দ্রুত ভেবে নেয়। আরো দ্রুত বেশবাস পরে দরকারী জিনিসপত্র, কিছু পোশাক ব্যাগে নেয়। কাঁধে ঝুলিয়ে নেয় উকুলেলে। ঘরটা ভালো করে মাপে চোখ দিয়ে। রান্নাঘরের দরজায় রাখা জলের পাত্রে ডুবে রয়েছে কড়ি ও আকাশী পাথর লাগান দুলটা। লোফালুফি করতে গিয়ে ওখানে ফেলেছে রংগা। সন্তর্পণে ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে দরজা বন্ধ করে সাহেব। ফ্লোরে রাখা ব্যাগ তুলতে গিয়ে বোঝে ওজন বেড়ে গেছে। ওর ওপর চেপে বসেছে দ্বিতীয় কালপ্রিট। সাহেবের সাথে গৃহত্যাগ করতে চায়। ওকে নিয়ে এখান থেকে যতদূর সম্ভব পালিয়ে যেতে হবে। নিরাপদ দূরত্ব খুঁজতে হবে। পৃথিবীর কোনো নির্জন কোণায় ঘাপটি মেরে লুকোতে হবে। 

অরিন্দম আদকের কথা 

গল্প বলতে বলতে উঠে গিয়ে আরো বিয়ার, ড্রাই কোকোনাট, বেকড ফিশ, পিকলস নিয়ে এসেছেন অরিন্দম আদক। বেশ কয়েকবোতল বিয়ার চড়ানোয় আমার স্নায়ুও অনেকটা শিথিল, মন নির্ভয়। মাঝে একবার শরীরের সব রোম মায় মাথার চুল দাঁড়িয়ে গেছিল অবশ্য। অরিন্দম আদক কিচেনে যান বেকড ফিশ আনতে, আমিও উঠে দেয়াল থেকে উকুলেলেটা নামিয়ে স্ট্রামিং শুরু করতেই পায়ে ঘেঁষে দাঁড়িয়েছিল রংগা বেড়ালের প্রেত। তারপর থেকে আর পিছু ছাড়েনি। আমায় ছাড়তে হয়েছে চেয়ারের পিছনভাগ। নতুন আসা লোকটাকে সহ্য হয়েছে তার। পছন্দও। তাই কোমর ঘেঁষে চেয়ারের পিছনটায় বসেছে এসে। বেশ ভারী চেহারার বড়সড় একটা হুলো– স্পর্শানুভুতি জানাচ্ছিল। মাছ এনে রাখতে রাখতে অরিন্দম আদক বলেছিলেন, “ভয় নেই, রংগা মুখ দেবে না। অনেককাল ও জেনে গেছে খাওয়াদাওয়া আর ওর জন্য নয়”।

গল্প যখন শেষ হল বাইরে ঘুরঘুট্টি অন্ধকার নেমেছে। একটা দীর্ঘশ্বাস বেরোলো অরিন্দমের বুক নিঃস্ব করে। আমার নেশাটা আলাপের শুরুতে ওনাকে জানিয়েছিলাম। সেই কারণেই বোধহয় বললেন, “আপনি চাইলে লিখতে পারেন গল্পটা। নামধামগুলো সামান্য বদলে দেবেন। ওর নামটা 'মামন' রাখবেন, আমি ওই নামেই ডাকতাম”।

ওর কাছে জানতে চেয়েছিলাম, “মামনের খোঁজখবর আর নেন নি!”

“খোঁজখবর নিতে হয়নি। ওই খোঁজ দিয়েছে বলতে পারেন। বছর ছয়েক আগে গোয়া এসেছিল বর আর মেয়েকে নিয়ে। অঞ্জুনা বিচে দেখেছিলাম…।” 

“আরেকটা কথা জানতে ইচ্ছা করছে; সেই যে হুবহু রংগার মত বেড়ালটা, তাকে আর একবারও দেখতে পেয়েছিলেন?” 

“নাঃ। কেন একথা জানতে চাইছেন!” 

“হতে পারে যে রংগা সেই একবার আপনাকে দেখা দিয়েছিল।”

“না না। চোখ দুটো একেবারেই অন্যরকম ছিল বিড়ালটার।” 

একটু ইতস্তত করে মোক্ষম প্রশ্নটা করি, 

“অনুশোচনা হয় না! মনে হয় না, এই বেড়ালটার জন্য জীবনটা ছারখার হয়ে গেল? মামনকে পেলেন না।” 

অরিন্দম আদক সরাসরি আমার চোখের দিকে চাইলেন। তারপর ওর দৃষ্টি ঘুরে গেল জানলার বাইরের অন্ধকারে, 

“অনুশোচনা? না। অপরাধবোধ একটা রয়ে গেছে। মামনকে আঘাত করার জন্য আমি নিজেকে ক্ষমা করিনি, করার চেষ্টাও করিনি…। হয়তো মামনও করেনি ক্ষমা আমাকে। কিন্তু… আমি ভেবে দেখেছি, আমরা সংসার করতে পারতাম না। অন্ততঃ আমি ওই সংসারে টিঁকতে পারতাম না, সংসার হোত না আমাদের।” 

আমার দিকে ফিরে তাকান অরিন্দম আদক, 

“আমি যদি বারবার করে রংগাকে তাড়িয়ে দিতাম, রংগা চলে যেত। মনে মনে এটা জানতাম আমি। কিন্তু মায়া রয়ে গেছিল বলে, মায়ার টানেই এসেছিল তো রংগা। ওকে তাড়িয়ে দিলে, ওর সাথে সাথে আমার সব মায়াটান বিদায় নিত, বুঝলেন। সংসারে মায়া না থাকলে টেকা যায় না। রংগার সাথেও অন্যায় করতাম, মামনের সাথেও।” 

“রাত হচ্ছে। অনেকটা উজিয়ে ফিরতে হবে। এবার ওঠা দরকার।”

কথাটা বলতে উনি ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। এগিয়ে দিতে চাইলেন। টর্চ দিতে চাইলেন। আমি জানালাম, রাস্তা চেনা, নিজেই ফিরতে পারব। পকেট টর্চ নিয়েই আমি বেরিয়েছি। জ্যাকেটের পকেট থেকে এভারেডি মিনি বের করে দেখাই। আমি চেয়ার ছাড়ায় রংগা চেয়ারটার পুরো দখল নিয়েছিল। কি করে সেটা বুঝলেন অরিন্দম জানিনা, উনি হাত বাড়িয়ে রংগাকে কোলে তুলে নিলেন। ওকে আদর করতে করতে আমার সাথে বাগানপথটা পেরোলেন। কাঠের বেড়ার সীমানায় দাঁড়িয়ে বললেন, “আরেকদিন আসুন, আপনাকে প্রাণভরে হাছন রেজা, আব্দুল করিম শোনাবো”।

স্মিত হেসে ঘাড় নাড়লাম। ভেতরের নাছোড় কৌতুহল মুখ ফুটে বেরলো, “মামনের জন্য মন পোড়ে না!”

নির্ভারে মাথা নাড়েন, কোলের অদৃশ্য বেড়ালকে অল্প দোলান অরিন্দম।

“আমার রংগা আছে তো। আপনি ক্যাট পার্সন। আপনি বুঝবেন ধরেই গল্পটা আপনাকে বলা। জানেন তো, বিড়াল কিন্তু পালক নির্বাচন করে। কোনো বিড়াল যদি জীবনে মরণে আপনাকেই একমাত্র পালক হিসাবে বেছে নেয়, আপনি নিজেকে সেরা ভাগ্যবান মনে করতে পারেন।”

No comments:

Post a Comment