প্রেত ভাত — বিনয় হালদার — ভূতের - গল্প — এবং বৃত্তের বাইরে

Pret bhat horror story by binat

প্রেত ভাত

বিনয় হালদার


মৃত্যু কেমন অদ্ভুত তাই না ? এই আছি, এই নেই। গত কয়েক মাস আগে পর্যন্তও ভদ্রলোক দিব্য গটগট করে হেঁটে যাচ্ছিলেন। আজ তিনি অতীত। পাস্ট। সকালে ঘুম থেকে উঠে বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখি নিচে টোটো করে মালপত্র নামানো চলছে। মনে পড়লো আজ পাশের ফ্ল্যাটের সমরেশবাবুর শ্রাদ্ধ।

আশপাশের ফ্ল্যাট গুলোর মধ্যে সবচেয়ে বয়স্ক মানুষ ছিলেন তিনিই। তাঁর ছেলের সঙ্গে বেশ খাতির থাকলেও ভদ্রলোকের সঙ্গে তেমন আলাপ ছিল না আমার। তবুও প্রতিবেশী বলে কথা, নেমতন্নটা ঠিক পৌঁছে গেছে সময়মতো। সাধারণত কোনো শ্রাদ্ধ বাড়িতে আমি যাই না। ভূত প্রেতের কারণে অবশ্যই নয়, যাই না এই কারণেই, কারো মৃত্যু উপলক্ষে পাত পেড়ে খাওয়াটা আমার একদম ভালো লাগে না। তবে শ্রাদ্ধ কথাটা উঠলেই ছেলে বেলার একটা ঘটনা খুব মনে পড়ে। সত্য মিথ্যার থেকেও সেই ঘটনার অনুভূতিটুকু এখনও জীবন্ত করে রেখেছে দিনটাকে। দিনটাকে বলার থেকে বলা ভালো রাত টাকে। 

সে অনেক দিন আগের কথা। আমার গ্রামের পৈত্রিক বাড়ি হলদিয়া অঞ্চলের একটি প্রত্যন্ত গ্রাম হরিবল্লভপুরে। সেখানের বেশ কিছু ব্রাহ্মণ ঘর নিয়ে ছোট্ট একটি পাড়া ব্রাহ্মণপল্লী। আশপাশের দূর দূর গ্রাম গুলোর সারা বছরের পূজা, বিবাহ, শ্রাদ্ধ ও নানান আচার অনুষ্ঠানের জন্য এ পাড়ার ব্রাহ্মণদের ওপর ভরসা করে থাকেন অসংখ্য মানুষ। তাই ব্রাহ্মণপল্লী নামেই জায়গাটি বিশেষ পরিচিত। এই পাড়ার শেষ প্রান্তে ছিল আমার বাড়ি। ছিল বললেও হয়তো ভুল বলা হবে, কারণ এখনো সেই বাড়িখানা রয়েছে। তবে এখন তা ভগ্নপ্রায়। শেয়াল সাপ খোপের আস্তানা। বহুদিন সেখানে যাওয়া হয় না আর। ঠাকুমা ঠাকুরদা গত হওয়ার পর সেই যা বাবা মাকে নিয়ে কলকাতায় চলে এলাম। বরাবরের জন্য পাকা বাসিন্দা হয়ে গিয়েছি এখন আমরা এই শহরের। তবুও রয়ে গেছে ভাঙা বাড়িখানা। সেই বাড়ির ঠিক পেছনেই এক চিলতে বাগান আর ঠিক তার পাশেই বড় একটা পুকুর। তাকে ঘিরে আছে বেশ কিছু গাছ, তার পর ফাঁকা মাঠ। মনে পড়ে, ছেলে বেলার একটি বিশেষ ঘটনা যার স্পষ্ট কোনো ধারণা আমি আজও মেলাতে পারি না। তখনও আমার উপণয়ন হয়নি, পাড়ার সবথেকে দুরন্ত ও ডানপিটে ছেলে বলতে যা বোঝায় আমি ঠিক তাই ছিলাম। গাছের মগডালে উঠে বসে থাকা বা গাছের ওপর থেকে পুকুরে ঝাঁপ দেওয়া বা বাচ্চাদের খেলার জায়গায় ধূলো উড়িয়ে খেলা পণ্ড করে দেওয়ায় ছিলাম সিদ্ধহস্ত। তার জন্য মায়ের কানমোলাও কম পাইনি। রক্ষা পেতাম কেবল ঠাকুরদার জন্য। আমি ছিলাম তাঁর প্রাণ। অত্যন্ত স্নেহ করতেন তিনি আমায়। ছোট বেলায় ঠাকুরদা বাড়ির সবাইকে বলতেন শ্রাদ্ধ বাড়িতে খোকাকে নিয়ে যাবে না। আমাকে উনি খোকা বলে ডাকতেন। এমনকি আমার ছেলের পাঁচ বছরের জন্মদিন উপলক্ষে যখন গ্রামের বাড়িতে যাই, তখনও পর্যন্ত ওই খোকা নামেই ডেকে ছিলেন। আজ আর তিনি নেই। তাঁর কথা মনে পড়লে জীবনের কত গল্প, কত মূহুর্ত, কত কথা ছবির মত ভেসে ওঠে মনের দেওয়ালে। আজ দীর্ঘ দশটা বছর কলকাতায় কেটে গেল, চাকুরী ঘর-সংসার নিয়ে, তবুও তপ্ত গ্রীষ্মের অবকাশে যেমন কালবৈশাখী আসে তেমনি গ্রামের বাড়ির স্মৃতি কখনো কখনো তাদের উপস্থিতি জানান দেয়। তখন হারিয়ে যাই অনেক অনেক মাইল দূরে। দুর, সময় কে কি মাইল দিয়ে মাপা যায়? বরং অনেক অনেক কাল আগে।

 আমার ঠাকুরদা নরহরি বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর পাণ্ডিত্যের জন্য, নিষ্ঠাবান ব্রাহ্মণ হিসেবে সুপরিচিত ছিলেন। ছিলেন বললেও ভুল বলা হবে এখনও তাঁর সেই সুনাম গ্রামের বাড়িতে গেলেই শুনতে পাওয়া যায় মাঝেমধ্যে। তবে শুধু পৌরহিত্য নয় তিনি ছিলেন বিচিত্র সব পেশার মানুষ। এলাকার একমাত্র উচ্চ বিদ্যালয়ের তিনি সংস্কৃত বিষয়ের শিক্ষক। সঙ্গে তিনি হোমিওপ্যাথি চিকিৎসায় নিজের হাত পাকিয়ে ছিলেন। এবং আরো একটি পেশা, না না পেশা না বলে বলতে হবে শখ। হ্যাঁ শখই বটে সে একরকম। প্রেতচর্চা। তাবিজ কবজ ঝাড়ফুঁকে তিনি বিশ্বাসী ছিলেন না, তবে তিনি মানতেন অদৃশ্য কোন এক শক্তি কে। যা হয়তো আধ্যাত্মিক শুভ শক্তির সঙ্গেই হেঁটে চলে তার আড়ালে আড়ালে। নরহরি বন্দ্যোপাধ্যায়ের নিজস্ব সংগ্রহে নানান পুরাতন পুঁথি ছিল, যেগুলো হয়ত এখন আর খুঁজে পাওয়া যাবে না। বা হয়তো খুঁজে পেলেও তা আর পাঠযোগ্য থাকবে না। শেষ জীবনে শুনেছি নাকি ওই পুঁথি পত্রের মধ্যেই কাটাতেন সারাটা দিন। তবে কোষ্ঠী বিচার করে ভাগ্য গণনায় তার দ্বিগুণ নামডাক থাকলেও সে পথকে কখনোই পেশা হিসেবে বেছে নেননি।

তাঁর একটি গুণের কথা বলি শুনুন। তবে তার গুণের প্রসঙ্গ আসার আগে আমার দোষটুকু দেখাতে হয়। তখন বয়স ছয় কি সাত বছর, প্রাথমিক স্কুলে পড়া কালিন মাঝে মাঝেই দুপুর বেলা ফাঁকা জমির পাশের একটা আম গাছে অকারণেই গিয়ে বসে থাকতাম। সে গাছ যেন অপূর্ব এক শান্তির জায়গা। পুকুরের পাড় আঁকড়ে ধরে রেখে তার মস্ত শরীরটা এলিয়ে পড়েছে পুকুরের জলের দিকে। সেই গাছের আম যারা কখনো খায়নি, আমের মিষ্টত্ব কি অপূর্ব হতে পারে তা থেকে তারা বঞ্চিত হলেন। সেই অসাধারণ স্বাদের আমে সারা গাছ ভরে উঠত বৈশাখে। যখন নির্জন দুপুরে অর্ধেক গ্রাম ঘুমন্ত তখন সেই গাছের মধ্যের একটা শরু ডালে পা দুটো আটকে মাথা টা পুকুরের জলের দিকে ঝুলিয়ে দুলতে থাকত একটি বাচ্চা ছেলে। সেই খেলায় তার আনন্দ, সেই খেলায় তার মজা। একদিন দুদিন করতে করতে প্রায় রোজই সে বাড়ির লোকের চোখ এড়িয়ে, ভরদুপুরে সেই একই খেলায় মেতে ওঠে। খাঁ খাঁ দুপুর, আশপাশে কেউ কোথাও নেই। পুকুরের জলে কেবল একটি বালকের ছায়া ভেসে চলেছে ক্রমাগত। আর গাছের ডালে কাক ডেকে চলেছে বিরাম নিয়ে নিয়ে। 

কা.. কা.. কা..কা..।

সেই সময়ের দুপুর গুলো ছিল নানান রূপকথায় মোড়া। দুপুরে ছোটদের ঘুম পাড়ানোটাই ছিল বড়দের সবচেয়ে কঠিন কাজ। কখনো মায়ের কোলের কাছে শুয়ে শুনতাম পান্তা বুড়ির গল্প, গ্রামের কোন বাগানে, কে কবে ভূত দেখেছে। কোথায় ভরদুপুরে যেতে নেই। কখন না ঘুমিয়ে পাড়ায় ঘুরলে ছেলে ধরা তাদের ঝুলিতে ভরে নিয়ে চলে যাবে। সেই একটা মস্ত ভয়ের বিষয় ছিল বটে। ছেলে ধরা। বিচিত্র তাদের বর্ণনা। চোখ দুটো গোল গোল, লাল টকটকে। তাদের দেখলে প্রথমে ভিখারী বা পাগল বলে ভ্রম হবে। তাদের হাতিয়ার নাকি একটা লজেন্স, একটা পুঁতির মালা, একটা থলে ভর্তি ছোটদের লোভনীয় উপাদান। তারা লোভ দেখিয়ে ছেলেদের ধরে নিয়ে গিয়ে মেরে ফেলে। এখনকার অনেক জ্ঞানী মানুষ জন বলেন ছোটদের এই সব ভূতুড়ে কাহিনী শোনানো উচিত নয়। তাতে নাকি তাদের মনে কুসংস্কার বাসা বাঁধে। কি জানি সেটা কতটা সত্য। তবে ছোটদের মধ্যে যে ভৌতিক কাহিনীর প্রভাবে কল্পনা শক্তির যে উন্নতি ঘটে তা হলফ করে বলতে পারি। না হলে রূপকথার জন্ম হত কী ? ভয় পাওয়ার পরেই তো আমরা সাহস অর্জনের শিক্ষা টুকু পাবো তাই না ? ভয় বলো, কল্পনা বলো, আর কুসংস্কারই বলো সেই সব গল্প, সেই সব ভরদুপুরে ওই গল্পের রোমাঞ্চ বেশ অভিভূত করে রাখত আমায়। তবে রোমাঞ্চের স্বাদ গ্রহণেও পিছু পা হতাম না কখনো। তাই তো সেই নির্জন দ্বিপ্রহরে আম গাছের ডালে উল্টো হয়ে ঝুলে থাকার মজা থেকে নিজেকে বঞ্চিত করতে পারিনি। হ্যাঁ আমিই। সেই ঝুলন্ত বালকটি আমিই। আমার ছায়াই পুকুরে জলে ছবি তৈরি করত সেই সব দুপুরে আর আমি সেই দিকে তাকিয়ে দুলতাম। নিজের রঙিন ছায়া দেখতে দেখতে।

আর ওই খেলার জেরেই হোক বা অন্য কোন কারণে হোক, বেশ অসুস্থ হয়ে পড়লাম কয়েক দিনের মধ্যে। ভয়ঙ্কর জ্বর। চিকিৎসা চলছে, ওষুধ সেবন চলছে, তবুও জ্বর কিছুতেই সারে না। মা, বাবা, ঠাকুমার সে এক ভয়ঙ্কর উদ্বেগ। দাদু শেষমেশ তার হোমিওপ্যাথি ক্ষান্ত রেখে অন্য এক চিকিৎসা প্রয়োগ করলেন। তাঁর সেই গোপন চিকিৎসা। যে চিকিৎসা শেখার জন্য মাঝে মাঝেই দূর দূরান্তের গ্রাম থেকে কত মানুষ এসে প্রায় হন্যে হয়ে পড়ে থাকতেন। কিন্তু দাদু বরাবর তাদের নিরাশ করতেন। কদাচিৎ সেই চিকিৎসা পদ্ধতি প্রয়োগ করতেন কেবল নিকট আত্মীয় এবং পাড়া প্রতিবেশীর অনুরোধে। কেবলমাত্র অনুরোধ ছাড়াই আমার জন্য বোধহয় প্রথম প্রয়োগ করে ছিলেন। রোজ সন্ধ্যায় তিনি আমাকে একা বাড়ির ভেতরে একটা জল চৌকিতে বসিয়ে রেখে আমার সামনের আসনে বসে কি এক মন্ত্রপাঠ করে যেতেন বেশ কিছু সময় ধরে। দু তিন দিন এমন হওয়ার পর, শেষে দাদুর কি এক মন্ত্রবলেই যেন সেরে উঠেছিলাম। তখন অবশ্য কিছু জানতে দেওয়া হয়নি আমায়, পরে, অনেক বড় হয়ে শুনেছি, ওই আম গাছের মগডাল থেকে একটি বাচ্চা ছেলে পা ফসকে পড়ে যায়, আর নিচের একটা শুকনো অর্ধেক ভাঙা ডালের সুঁচালো অংশে তার শরীরটা গেঁথে গিয়েছিল। সে নাকি বহুকাল আগের ঘটনা। আমি যখন আম গাছে দুলতাম আমার সঙ্গে আমার পাশে নাকি সেই অদৃশ্য হতভাগা বালকও দুলত। সে তার একাকীত্ব কাটিয়ে এক বন্ধু পেয়েছিল। এ দাদুর গননা। আমি সে বন্ধুর দেখা অবশ্য কখনো পাইনি। সে সময় অনুভব করেছিলাম কিনা এখন আর মনে নেই। এখন সে গল্পে আর ভয়ও আসেনা। শুধু দাদুর কথাটা মনে পড়ে যায়। সেই ঘটনার কদিন পরে বাড়িতে এক পূজা হলো, তার পর ওই আম গাছে দাদু সুতো জড়িয়ে কি সব করলেন আর আশ্চর্য রকম ভাবে সেই বছরেই বর্ষায় বাজ পড়লো ওই গাছে। পুড়ে, শুকিয়ে মরে গেল সেই গাছ। অলৌকিক ক্ষমতাই হোক বা প্রকৃতির নিয়মেই সে গাছ ধীরে ধীরে স্মৃতির অতলে তলিয়ে গেল। আমার শৈশবের মত, বাবার শৈশবের মত, দাদুর শৈশবের মত। 

দেখেছেন কি কথায় কোথায় চলে এলাম। যে কথাটা এতক্ষণ ধরে বলতে চাইছি বরং সেটাতে আসা যাক। এই শ্রাদ্ধ বাড়িতে নেমন্তন্ন এলেই ছেলে বেলার সেই ভয়াল ঘটনাটি বারবার মনে উঁকি দেয়। কালো নিকষ অন্ধকারের মতো। ছোট থেকেই আমি খুব দুষ্টু সে তো আগেই বলেছি। কিন্তু সে দুষ্টুমি যে কি ভয়ঙ্কর রকম রূপ নিত, তা যারা সচক্ষে দেখেছেন তারা তাকে দুষ্টুমির তুলনায় বদমাইশি বলবে হয়তো। সেই জন্য মায়ের নিত্য ভাবনা, বাবার সদাসর্বদা আতঙ্ক, ঠাকুমার নাতিকে নিয়ে কান্নাকাটির বিরাম নেই, আর ঠাকুরদার গভীর চিন্তা। পাড়াপড়শি সবার নিত্যদিনের নালিশ তো আছেই। গাছে উঠে লোকের ঘরের আম পেড়ে নিয়েছি তো কখনো আচার চুরি করতে গিয়ে কাঁচের বয়াম ভেঙে ফেলেছি, কারো ছেলে কে মেরে দাঁত ভেঙে দিচ্ছি, কারো জুতা নিক্ষেপ হচ্ছে পুকুরের মাঝখানে। কোন কোন সময় বাবার হাতে মারটাও জুটেছে সেইসবের জন্য। তবুও গাছে চড়ার সাহস কমেনি, বাড়েনি পুকুরের অতলে তলিয়ে যাওয়ার ভয়। তবে ভূতের ভয় কোন বাচ্চাটাই বা পায় না বলুন? তবুও জানতাম, যা চোখে দেখা যায় না তাকে আবার ভয় কী ? সত্যিই সেভাবে ভূতে ভয় ছিল না কোন দিন।

গ্রামের দিকে সন্ধ্যায় তখন মাঝে মাঝেই পাড়ার সব বড়রা, বাসন্তী পূজার মণ্ডপ তলায় এক হয়ে গল্পের আসর বসাতেন, কোন কোন দিন পড়ার ফাঁকে ছোটরাও সামিল হওয়ার সুযোগ পেতাম, তবে তা খুবই কম। সেই অন্ধকার সন্ধ্যায়, যদিও সেই সময় গ্রামে ওটা ছিল রাত্রি। হ্যারিকেনের আলোয় কতো রকমের যে গল্প হত তা বলে শেষ হবে না। ঠাকুর দেবতা থেকে শুরু করে একেবারে ভূত প্রেতে এসে থামত সেই গল্প। গল্পের চোটে যখন বাকি ছেলেরা বাবার পেছনে, ঠাকুরদার কোলের কাছে সিঁটিয়ে যেত, আমি তখন ওদের দেখানোর জন্য অন্ধকারে একটু দূরের শিমুল গাছটা ছুঁয়ে আসতাম। তবে অবশ্যই বুকে থুতু ফেলে, আস্তে আস্তে রাম রাম বলতে বলতে। এটা আমার ঠাকুমার কাছে শেখা। যতই সাহসী ডানপিটে হোক না কেন বয়স যে তখন তার মাত্র দশ বছর। সেই বয়সে বন্ধুদের সাহস দেখানোর জন্য অন্ধকারে হাঁটা যায় তবে ঠাকুমার শেখানো মন্ত্রবলের সহায়তা নিয়ে অবশ্যই।

তবে সেদিনের সেই একটি অদ্ভুত ঘটনা ওই ডাকাবুকো সাহসী ছেলেটার হাড় হিম করিয়ে দিয়েছিল, যার কোন উত্তর আজও সে পায়নি। এতগুলো বছরেও। তার ঠাকুরদাও বলে যাননি। শুধু শ্রাদ্ধ বাড়ির নেমন্তন্ন এলেই সেই কথাটা সবার প্রথম মনে আসে। 

কয়েক মাস আগেই সবে সুস্থ হয়েছি। মন্দিরতলার গাছের আম পাড়তে গিয়ে পা টা ভেঙে ছিল। কয়েকমাস ওই ভাবে ঘরে বন্দী থাকা, ওহ্ কি যে দুঃসহ যন্ত্রণা। তাই পায়ের প্লাস্টার কাটার সঙ্গে সঙ্গেই প্রায় উৎপাত শুরু। সেদিন ছিল মঙ্গলবার তার ওপর পূর্ণিমা। সারাটা বিকেল মন্দির তলায় খেলার পর ধূলো পায়ে সন্ধ্যায় এলাম পুকুর পাড়ে, পা ধুয়েই পড়তে বসতে হবে। না হলে বাবার বেজায় ধমক। ব্যাস সেই মতো পুকুরে নেমে হাত মুখ ধুতে থাকলাম। আমার বাড়ির পাশেই বড় পুকুর তার পর সারি সারি নারিকেল গাছ, তার পর বিঘার পর বিঘা ধান জমি। আমার বাড়িটা ঠিক সেই জমির প্রান্তে। আর গ্রামের শেষ সীমানায়। সূর্য ডুবে গেছে বেশ কিছুক্ষণ আগে, চারদিকে বেগুনী রঙের সন্ধ্যায় কেমন ঝাপসা হয়ে গেছে। পুকুরের জল কুচকুচে কালো, তাতে চাঁদের আলো পড়ে ঝিলিক দিচ্ছে সোনার মত। চারিদিকে কী নিস্তব্ধতা। শুধু পুকুর পাড়ের একটা নিম গাছে কী একটা পাখি ডাকছে গুপ, গুপ, গুপ শব্দ করে। যেন পুকুরের জলে কেউ ছোট্ট ছোট্ট ঢেলা ছুঁড়ছে। সেই পরিবেশ জানি না আমাকে কতক্ষণ সেখানে স্থবির করে রেখেছিল। সে এক অদ্ভুত মূহুর্ত! ভয়ঙ্কর সন্ধ্যা! সেই মূহূর্তে বুঝি নিজের প্রতিচ্ছবি দেখেও মানুষ ভয় পাবে। আমি মুখ হাত ধুয়ে সবে মাত্র ঘাট থেকে উঠতে যাচ্ছি এমন সময় দূরের জমির দিক থেকে কে যেন হাঁক দিল আমার ডাক নাম ধরে।

- আবীর। এদিকে একবার আয়। খাবি নাকি তাড়াতাড়ি আয়।

- কে... ?

কোন উত্তর নেই। কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম ঘাটে। কেন দাঁড়িয়ে রইলাম জানি না, কেউ যেন শক্ত করে ধরে রেখেছে ওই স্থানে। একবার মনে হলো পাড়ার পিকু দা। তার পর মনে হলো, না না বাপ্পা দা বোধহয় ডাকলো। আমি আবার চেঁচিয়ে উঠলাম 

- এখন আর যাবো না। পড়তে বসতে হবে। মা বকবে। 

সেই আবছা অন্ধকার থেকে আবার উত্তর এলো 

- একবার আয়, খেয়েই চলে যাবি। 

এ তো পিকুদার গলা নয়, বাপ্পাদার গলাও নয়। তবে ? একটু কৌতূহল নিয়েই এগিয়ে যেতে ইচ্ছে হলো পুকুর পাড় ধরে। গ্রামের ঘরে ঘরে তখন শাঁখ বাজছে। কি যে অস্থিরতা ভর করলো, মনের মধ্যে দোনামোনা সত্বেও ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলাম সেই ফাঁকা জমির দিকে। সবেমাত্র মাঠ থেকে পাকা ধান উঠেছে। তাদের অবশিষ্ট নাড়া গুলো কেটে কেটে বড় বড় ঢিপি বানিয়ে রেখেছে গাঁয়ের কোন গৃহবধূ। রান্নার জ্বালানি করার জন্য। সেই সব নাড়া আর মাটির গন্ধ কেমন করে যেন টেনে নিয়ে গেল আমায়। আমিও মোহগ্রস্তের মত এগিয়ে গেলাম। না, কেউ নেই। 

সেই নাড়া গাদার কাছে গিয়ে কাউকে দেখতে পেলাম না। ভাবলাম কেউ হয়তো এর পেছনে লুকিয়ে আছে। কিন্তু না, খুঁজে দেখলাম কেউ নেই। আশপাশের কোথাও নেই। তবে ?

প্রশ্নটা মাথায় আসার আগেই নাকের মধ্যে এল সুন্দর এক ধূপের গন্ধ। কাছেপিঠে কোথাও ধূপ জ্বলছে। পূর্ণিমার সন্ধ্যায় চারদিকটা বেশ পরিস্কার দেখা যাচ্ছে। সেই আলোতেই দেখতে পেলাম বেশ কিছুটা দূরত্বে কতগুলো মানুষ যেন বসে বসে কিছু খাচ্ছে। জোৎস্না হলেও তাদের স্পষ্ট চেনা যাচ্ছে না, কেমন আবছা আবছা, কেমন ধোঁয়াশা ধোঁয়াশা। তাদের মধ্যে থেকেই একজন হাতের ইশারায় আমাকে ডাকছে। এতক্ষণ পর একটু যেন মুখটা দেখতে পাচ্ছি, অদ্ভুত এক হাসি মুখ। সে আমাকে ডাকছে, আমিও কোন এক মন্ত্রবলে যেন এগিয়ে যাচ্ছি তার দিকে। একসঙ্গে এতগুলো লোক এইভাবে মাটিতে বসে কী খাচ্ছে ? কারা ওরা ? কোথা থেকে এসেছে ? এসব প্রশ্ন তখন আর আসছে না। আমি শুধুই এগিয়ে চললাম। হয়ত এগিয়ে গিয়ে তাদের পাশে বসে তাদের ওই পাত থেকে ওই অজানা খাদ্য টুকু খেয়েও নিতাম অজান্তেই। তবে মোহ ভাঙ্গলো মায়ের কন্ঠ শুনে। দূর থেকে মায়ের গলা পাওয়া যাচ্ছে। যেন আমাকে খুঁজছে। আমি তৎক্ষণাৎ ঘুরে দাঁড়িয়ে হাঁক দিলাম - এই তো আমি...।

এ কী গলা থেকে কোন শব্দ বেড়োলো না কেন ? আমি প্রাণপণে চেষ্টা করে আবার ডাকলাম। না কোন শব্দ নেই কন্ঠে। গলা শুকিয়ে কাঠ। এতক্ষণ পর খুব ভয় পেয়ে গেলাম। হঠাৎ পেছন ঘুরে দেখি সেই সব মানুষ গুলো আর নেই। কোথায় গেল তারা? ফাঁকা মাঠে লোকানোর কোন জায়গায় নেই, তবে ? 

আর একটু কাছে এগিয়ে গেলাম, যেখানে ওরা বসে ছিল। গিয়ে যা দেখলাম এখনও ভাবলে এই শহরের ফ্ল্যাটে বসেও গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে। ধূপ জ্বলছে তখনও, ঠিক তার পাশেই কলা পাতায় মাছ ভাতের উচ্ছিষ্ট। তারা বসে সদ্য খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে খাচ্ছিল এই পোড়া মাছ ভাত। হু হু শব্দে হঠাৎ একটু হাওয়া ধেয়ে এলো। আমি আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারলাম না। দিলাম ছুট। প্রচণ্ড জোরে। ওই বাতাসের থেকেও বুঝি জোরে। ঘরে ঢুকেই সোজা মায়ের কোলে। তার পর আর কিছুই মনে নেই। কদিন অসুস্থ ছিলাম তাও জানি না। 

এবারেও দাদু সারিয়ে তুললেন কিনা তাও জানি না। তবে ওই ঘটনার পর থেকেই দাদু বিধান দিয়েছিলেন খোকাকে কখনো কেউ শ্রাদ্ধ বাড়িতে নিয়ে যাবে না। ব্যাস, সেই থেকেই শ্রাদ্ধ বাড়ির ভোজ এলেই আমিসহ বাড়ির মহিলারা কেউ যেতেন না। এমনকি খুব নিকট আত্মীয় হলেও। 

কবে... কবেই স্মৃতির গহ্বরে হারিয়ে গেছে সেই সব দিন, সেই সব ভয়। তবে শ্রাদ্ধ বাড়িতে নেমন্তন্ন এলেই সেই ঘটনা আবার উঁকি দিয়ে ওঠে মনের মধ্যে।

হিন্দু ধর্মের কিছু নিয়ম অনুসারে গ্রামের দিকে শ্রাদ্ধের দিন, সন্ধ্যার পর 'প্রেত ভাত' নামে মৃত ব্যক্তির আত্মা ও আশপাশের প্রেতদের উদ্দেশ্যে পোড়া মাছ সহযোগে ভাত সাজিয়ে গ্রামের প্রান্তের কোনো জমিতে রেখে আসতে হয়। এ সমস্ত নিয়ম কানুন গ্রামের ছোট ছোট ছেলে মেয়েরা সব জেনেই থাকে। আমিও জানতাম। কিন্তু সেদিন জানতাম না, বাড়ি থেকে অনেকটা দূরে পাড়ার এক দাদুর শ্রাদ্ধানুষ্ঠান ছিল সেদিনই। আর তাকে উদ্দেশ্য করেই আমার বাড়ির কাছের জমিতে প্রেত ভাত দিয়ে গিয়েছিলেন তাঁর বাড়ির লোকেরা। 

আজও দৃশ্যটা মনে পড়লে গা টা ছমছম করে ওঠে। ভাবি সেদিন তাহলে আমার নাম ধরে ডেকেছিল কে বা কারা ? কোনো প্রেত ? যারা ওই নির্জন মাঠে বসে গ্রহণ করছিল পোড়া মাছের আস্বাদন ?


এবং বৃত্তের বাইরে, জুলাই, ২০২৫

No comments:

Post a Comment