নিশিরাতের নিশি — শঙ্খ চক্রবর্তী — ভূতের গল্প — এবং বৃত্তের বাইরে

Nishi Rater Nishi

নিশিরাতের নিশি

শঙ্খ চক্রবর্তী


আজকে তোমাদের আমার নিজের জীবনের একটা গল্প শোনাবো। যদিও বিশ্বাস করা অথবা না করাটা তোমাদের ব্যাপার। গল্পটা শুনলে তোমরা হয়তো অবিশ্বাস করবে। কারণ আজকালকার শহুরে, জনবহুল পটভূমিতে এই কথা বিশ্বাস করা সত্যিই শক্ত। তবুও আজও সেই ঘটনার কথা মনে হলে, আমার গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে। 

আমার এক বাল্য বন্ধুর নাম ছিল টনি। তখন আমরা এক জায়গাতেই থাকতাম। এক স্কুলে, এক ক্লাসে পড়তাম। এখন অবশ্য ও থাকে ভিলাইতে আর আমি কোলকাতায়। যোগাযোগ অনেক কমে গেছে। কিন্তু তখন আমাদের রোজ দেখা হত। স্কুলে আমরা পাশাপাশি বসতাম। খুব ভাব ছিল আমাদের। এর অবশ্য একটা কারণ ছিল। আমরা দুজনেই কারোর সঙ্গে কোনো ঝামেলায় যেতাম না। কথাও বলতাম কম। টনির সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব বেশি ছিল এই কারণে। স্কুলের মাস্টার মশাইরাও আমাদের দুজনকে ভালোবাসতেন। 

যাইহোক এবারে আসল কথায় আসি। আমরা যেখানে থাকতাম সেই জায়গাটাকে গ্রাম বলাই ভাল। তখনও সব জায়গায় পাকা রাস্তা ছিল না। যেটুকু রাস্তা পাকা ছিল তাও ছিল অনেক জায়গায় ভাঙা। আমাদের বাড়ির থেকে মাইল তিনেক দূরে ছিল একটা গ্রাম। নাম তার সাঁতরাপাড়া। সেখানে ফুলকপি, বাঁধাকপি আর শশার চাষ হত। বড় বড় কলাবাগান আর আমবাগান ছিল। আর ছিল অপরূপ প্রাকৃতিক শোভা। দিনের বেলায় তাই আমি আর টনি মিলে প্রায়ই ঘুরতে ঘুরতে ওদিকে চলে যেতাম। তবে দিনের বেলার ছবি কিন্তু রাতে উধাও হয়ে যেত। সাঁতরাপাড়ার অনেক গুলো জায়গার বেশ বদনাম ছিল। রাতে ওখানে বড়রাই যেতে ভয় পেত। 

সাঁতরাপাড়ার একদিকে ছিল একটা ইংরেজ আমলের কবরখানা। এই জায়গাটার ছিল ভীষণ বদনাম। রাতে তো দূর, দিনের আলোতেও কেউ ওদিকে যেতে চাইতো না। 

চুপচাপ থাকলেও আমাদের সাহসের অভাব ছিল না। আর বিভিন্ন রকম দুস্টু বুদ্ধি প্রায়ই আমাদের মাথায় খেলা করত। এমনই একদিন খবর পেলাম টনিদের পাশের বাড়ির বয়স্ক ভদ্রলোক মারা গিয়েছেন। ওরা টনিদের দূর সম্পর্কের আত্মীয়। তাই টনিদের মতো ওরাও খ্রিস্টান। 

ভদ্রলোককে কবর দেওয়া হল সাঁতরাপাড়ার কবরখানায়। কিন্তু টনি ছোট বলে তাকে কেউ সেখানে নিয়ে গেলনা। ব্যাপারটায় টনির যে বেশ রাগ হয়েছে সেটা সে আমাকে বলেছিল। সে আরও বলেছিল সুযোগ পেলেই সে একদিন কবরখানায় যাবে।

এর কয়েক দিন পর হঠাৎ একদিন দুপুরে টনি আমার বাড়ি এসে হাজির। তখন গরমের ছুটি চলছে। এসেই টনি আমার হাত ধরে পেছনের বাগানে নিয়ে গেল। আমি অবাক হয়েছিলাম। 

“ব্যাপার কি রে?”

“কী হয়েছে জানিস না?”

“না তো।”

“যে লোকটা সেদিন মারা গেল, রোজ রাতে তাকে নাকি কবরখানার গেটের কাছে দেখা যায়।”

আমি শুনে ঘাবড়ে গেলাম। কিন্তু টনির সাহস খুব। 

“আজ রাতে কবরখানায় যাব চল ভূত দেখতে। দেখব সে সত্যিই আছে কিনা।”

আমি রাজি হচ্ছিলাম না। কিন্তু টনি জোর করতে লাগল। তার জোরাজুরিতে বাধ্য হয়ে রাজি হলাম। ঠিক হল অন্ধকার হয়ে গেলে আমরা যাব। টনিই এসে আমাকে ডেকে নিয়ে যাবে। সত্যি কথা বললে, বাড়ি থেকে যেতে দেবে না। তাই টনি কিছু একটা বানিয়ে বলে কিছুক্ষণের জন্য আমাকে ডেকে নিয়ে যাবে। এই পর্যন্ত পরিকল্পনা করে টনি সেদিন চলে গেল। যদিও ধরা পড়ে গেলে তারপর কী হবে, সেটা নিয়ে আমরা মাথা ঘামাইনি।

তবে মজা হল, সেদিন সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত হয়ে গেলেও টনি এল না। আমিও ব্যাপারটা ভুলে গেলাম। আমাদের বাড়িতে লোক বেশি ছিল না। থাকার মধ্যে আমি আর আমার মা, বাবা। মা, বাবা যে ঘরে শুতেন, আমি শুতাম তার পাশের ঘরে। সেদিন রাতে শুয়ে পড়ার পর আমি ঘুমিয়েও পড়েছিলাম তাড়াতাড়ি। 

অনেক রাতে একটা আওয়াজ পেয়ে ঘুম ভেঙে গেল। আমার ঘরে রাস্তার দিকে একটা জানলা আছে। সেই জানলায় ঠুক ঠুক করে কেউ ধাক্কা দিচ্ছে। আমি চমকে উঠে বসলাম। এত রাতে জানলায় কে ধাক্কা দিচ্ছে? দেওয়ালের ঘড়িতে দেখলাম এগারোটা বাজে। কোলকাতায় এটা তেমন কিছু রাত নয়। তবে সেই সময়ে, মফস্বল শহরে সেটা অনেক রাত। বিছানায় বসে ভয়ে ঘামছি, হঠাৎ শুনি টনির গলা। 

“এই রাধু কবরখানায় যাবিনা ?”

এত রাতে টনির গলা শুনে অবাক হলেও আমি জানলা খুললাম। টনি জানলার বাইরেই দাঁড়িয়ে ছিল। বললাম, 

“এত রাতে তুই?”

“সন্ধ্যা বেলায় বাড়িতে ফাঁকি দিয়ে বেরোতে পারিনি। এখন সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। তাই লুকিয়ে লুকিয়ে বেরিয়ে পড়েছি। চলে আয় যাব।”

ওর কাণ্ড দেখে আমি আশ্চর্য হয়ে গেলাম। 

“তুই কী পাগল নাকি? এত রাতে বাড়ি থেকে বেরিয়েছিস? সবাই জানতে পারলে কী হবে?”

“জানবে না। সবাই ঘুম থেকে ওঠার আগেই আমরা ফিরে আসব। চল ঘুরে আসি কবরখানা থেকে।”

এত রাতে কবরখানায় যাওয়া বোকামি। বললাম, 

“আজকে ছেড়ে দে। এখন আর যাবনা।”

কিন্তু টনি নাছোড়বান্দা। 

“না না আজকেই যাব। আমি আসছি ভেতরে।”

হঠাৎ আমার ঘরের দরজায় টোকা। দরজা খুলতেই দেখি টনি দাঁড়িয়ে আছে। 

“নে, তৈরি হয়ে নে।”

 আমার তখন কেমন ঘোর লেগে গেছে। তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে নিলাম। কী করছি কেন করছি, কিছু খেয়াল নেই। 

কিন্তু ঘর থেকে বেরিয়ে হঠাৎ আমার একটা চমক লাগল। সদর দরজা বাবা নিজে হাতে বন্ধ করে তালা দেন। তাহলে টনি ভেতরে এল কী করে? তাহলে কি বাবা দরজা বন্ধ করতে ভুলে গেছেন? 

কিন্তু টনি ততক্ষণে সদর দরজার কাছে পৌঁছে গেছে। আমি দেখলাম দরজা খোলা। তার মানে হয় দরজা আগের থেকেই খোলা ছিল, নয়তো টনি এখন দরজা খুলেছে। এইসব ভাবতে ভাবতেই আমি দরজার কাছে পৌঁছে গেছি। দরজার কাছে গিয়ে দেখি অবাক কাণ্ড। দরজা যথারীতি বন্ধ। টনির কোথাও কোনো অস্তিত্ব নেই। কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছি, হঠাৎ বাইরে থেকে টনির চাপা গলা পেলাম। 

“অ্যাই রাধু দরজা খোল। যাবিনা?”

আমি আশ্চর্য হয়ে গেলাম। টনি তার মানে ভেতরে ঢোকেইনি। তাহলে ভেতরে আমি এতক্ষণ ধরে কাকে দেখলাম? 

কিন্তু টনির গলা শুনলে বরাবর আমি মাতোয়ারা হয়ে যাই। কোনো তাল জ্ঞান আমার থাকেনা। সেদিনও তার ব্যতিক্রম হল না। আমি জলদি দরজা খুলে ফেললাম। বাইরে এসে দেখি, কিছু দূরে চাঁদের আলোয় টনি দাঁড়িয়ে রয়েছে। চারপাশ জনশূন্য। আকাশে চাঁদের আলো থাকলেও তা কেমন ঘোলাটে মতো। হঠাৎ দূরে কোথাও একটা রাতচরা পাখি ডেকে উঠল। কেমন যেন ডাকটা। ভয়ে আমার বুকের ভেতর ছ্যাঁত করে উঠল। 

এমন সময় টনি আমাকে হাতছানি দিয়ে ডাকল। আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো ওর দিকে এগিয়ে গেলাম। আমি ওর দিকে এগিয়ে যেতে, টনি হঠাৎ হি হি হি হি করে হেসে উঠল। তারপর বলল, 

“চল যাই।”

ওর হাসিটা আমার কেমন যেন লাগল। 

টনি আগে, আমি পেছনে। টনি যেন হাওয়ার বেগে ছুটছে। প্রাণপণে ছুটেও আমি ওর নাগাল পাচ্ছিনা। ছুটতে ছুটতে জীভ বেরিয়ে আসার উপক্রম। জোর করে ওর নাম ধরে ডাকতে গেলাম। গলা দিয়ে কথা বেরোল না। 

এই করতে করতে কখন যেন কবরখানার গেটের সামনে চলে এসেছি। গেট খোলা। টনিকে আশেপাশে কোথাও দেখতে পেলাম না। গেটের একদিকে কবরখানার অফিস। সেখানে চব্বিশ ঘন্টা লোক থাকার কথা। কিন্তু দেখলাম অফিস তালা বন্ধ। এমন সময় হঠাৎ টনির গলা পেলাম।

“আজকে অফিসে কেউ নেই। আজ একটা বিশেষ দিন তাই। তাই তো আজকের দিনটা বেছে নিয়েছি।”

খেয়াল করলাম টনি আমার পাশেই দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু এতক্ষণ ও কোথায় ছিল? সে কথা জিজ্ঞেস করার আগেই টনি বলল, 

“চল ভেতরে চল।”

ওর পেছনে পেছনে কবরখানার ভেতরে ঢুকলাম। চারিদিকে আগাছার জঙ্গল। দূরে আবার কোথাও রাতচরা পাখি ডাকল। তখনই হঠাৎ পাশেই একটা বাচ্চার কেঁদে ওঠার আওয়াজ পেলাম। এই নির্জন কবরখানায় বাচ্চা আসবে কোথা থেকে? আমার মাথার মধ্যে কেমন করে উঠল। কান্নার আওয়াজে মনে হল চতুর্দিকে কিসের যেন অশুভ ইঙ্গিত। পৃথিবীর সব অশুভ শক্তি আজ যেন এই কবরখানায় জেগে উঠতে চাইছে। আশেপাশে সার দিয়ে কবর। কোথাও প্রাণের চিহ্ন মাত্র নেই। মাটির তলা থেকে যেন মৃতের দল আমাকে দেখে যেন হা হা করে অট্টহাসি হাসছে।

 কেমন একটা বাজে গন্ধ নাকে এল। এমন সময় একফালি মেঘ এসে চাঁদটাকে ঢেকে দিল। দূরে অনেক গুলো কুকুরের আর্ত চিৎকার শুনতে পেলাম। মনে হল কবর গুলোর তলায় কারা যেন গুঙিয়ে গুঙিয়ে কাঁদছে। বুঝলাম আর এখানে থাকা উচিত হবেনা।

 টনি আবার কোথায় হারিয়ে গিয়েছিল। ওর নাম ধরে চিৎকার করলাম, 

“টনি ই ই ই। টনি ই ই ই।”

আমার ডাক প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরে এল। 

“টনি ই ই ই। টনি ই ই ই।”

কিন্তু কোথায় টনি? এই নিকষ অন্ধকার কবরখানায় কত কালের কত অভাগার সঙ্গে আমি সম্পূর্ণ একা। আবার চিৎকার করতে গেলাম। গলা দিয়ে আওয়াজ বের হল না। পালাবার জন্য পেছনে ফিরলাম। তখনই দেখি সামনে টনি দাঁড়িয়ে। 

“কোথায় যাচ্ছিস? দেখ এখানে কত মজা।”

ঠিক তখনই চারপাশে কারা যেন সমস্বরে হা হা করে হেসে উঠল। কারা যেন কোরাসের মতো গাইতে লাগলো, 

“আয় কাছে আয়, ঠান্ডা ঠান্ডা কবরের তলায়।”

টনি দেখলাম হাসছে। আকর্ণ বেরিয়ে এসেছে ওর দাঁত। 

“চল চল যাবি? আয় আমার সাথে, ঠান্ডা ঠান্ডা কবরের তলায়।”

দেখলাম আমাদের পাশের একটা কবর ধীরে ধীরে ফাঁক হয়ে যাচ্ছে। টনি আমার হাত ধরে টানতে লাগল। 

“আয় এর নিচে যাব। মাটির নিচে কত সুখ, কত শান্তি।”

ঠিক তখনই কবরটার ভেতর থেকে উঠে এল একটা কঙ্কাল। আর পারলাম না। প্রচণ্ড ভয় পেয়ে আমি আর্তনাদ করে উঠলাম। দেখলাম টনির মুখটা কেমন বদলে যাচ্ছে। এ কোনো জীবন্ত মানুষের মুখ নয়। তখনই বহুদূর থেকে অনেক লোকের কোলাহল কানে এল।

পরদিন আমার জ্ঞান ফিরেছিল আমাদের শোওয়ার ঘরে। আমার বাবা, মা এবং পাড়ার লোকেদের অনেকে হাজির ছিলেন। সুস্থ হতে পুরো সাতদিন লেগেছিল আমার। পরে শুনেছিলাম টনি নাকি সেদিন বাড়ি থেকেই বেরোয়নি। ডাক্তার বলেছিল আমি ঘুমের ঘোরে স্বপ্ন দেখে ওই কান্ড ঘটিয়েছি। কিন্তু হলফ করে বলতে পারি, আমি সেই রাতে মোটেই স্বপ্ন দেখিনি।


এবং বৃত্তের বাইরে, জুলাই ২০২৫

No comments:

Post a Comment