বিবর্ণ — তুষার চট্টোপাধ্যায় — ভূতের গল্প — এবং বৃত্তের বাইরে

Bibarna. Written By tushar chattopadhyay

বিবর্ণ

তুষার চট্টোপাধ্যায়


“আমিও তোমাদের সঙ্গে যাব।” শাশুড়ি মা’র কথায় খুব বিব্রত এবং হতবাক হয়ে গেলাম। সহ্য করা যাচ্ছে না আবার মুখের উপর কিছু বলতেও পারছি না। রিনার হাসি বুঝিয়ে দিল, তার সম্মতির কথা। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে আস্তে আস্তে বললাম, “কিন্তু ঘর বুকিং তো অনেক আগে হয়ে গেছে। এখন তো আর কোনও ঘর পাওয়া সম্ভব নয়।” আমার দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে শাশুড়ি মা বললেন, সেটা তিনি বুঝে নেবেন। আমাকে এ বিষয় নিয়ে কিছু ভাবতে হবে না।

মা মেয়ে রাজি, কেয়া করেগা কাজী। বাধ্য হয়ে চুপ করে বসে রইলাম পাঁচন গেলার মত মুখ করে। সংসারে শান্তি রক্ষা বলে কথা। চুপ করে না থেকেই বা উপায় কী! 

মাত্র বছর দেড়েক হয়েছে বিয়ে হয়েছে। সম্বন্ধ করেই বিয়ে। আমার চোখে রিনা সুন্দরী। প্রথম দেখাতেই পছন্দ হয়ে গিয়েছিল। সম্বন্ধ স্থির হতেই বিয়ের আগেই আমাদের মধ্যে ফোনে কথা হত। পরে ভিডিও কল। এ ভাবেই শুরু হয়েছিল পারস্পরিক ভাললাগা। পারস্পরিক সম্মতি এবং আকর্ষণে মনে হচ্ছিল স্থির হওয়া বিয়ের দিন যেন আসতেই চাইছে না।

বিয়ের পনেরো দিনের মধ্যেই বেরিয়ে গিয়েছিলাম হানিমুনে। অরণ্য। শাশুড়ি মা’র ইচ্ছা ছিল পাহাড়। বিয়ের আগেই রিনাকে জানিয়েছিলাম, আমার ইচ্ছার কথা। সমস্ত ব্যবস্থাও করে ফেলেছিলাম। অপর প্রান্ত থেকে শাশুড়ি মা ফোন ধরে বারবার বলতেন পাহাড়ে যেতে। ওটাই নাকি হানিমুনের আদর্শ জায়গা। 

হানিমুনের দিনগুলো খুব আনন্দে কেটে গেল। পরস্পরকে কাছে পাওয়ার আনন্দ এবং সেই সঙ্গে পরস্পরকে চিনে নেওয়া। মনের সম্পর্ক স্থাপনটা সবচেয়ে জরুরী। সম্বন্ধ করে বিয়ে, তাই সম্পূর্ণ অচেনা অজানা দু’জনকে চিনে নেওয়ার সঙ্গে পরস্পরকে বুঝে নেওয়ার জন্য বিয়ের পর একান্তে দু’জনের আসাটা খুব জরুরী। প্রেম করে বিয়ে করলেও হানিমুনের অন্য একটা মাত্রা আছে। সেক্ষেত্রেও বিয়ের পর সংসার জীবনে পরস্পরকে চেনা, জানা এবং পরস্পরকে বোঝার রূপ ভিন্ন।

কিন্তু তালটা কাটত বারবার। ঘনঘন শাশুড়ি মার ফোন এবং ইনস্ট্রাকশন। বিরক্ত হতাম। মনে মনে সান্ত্বনা দিতাম নিজেকে, হয় তো পিতৃহারা একমাত্র সন্তানকে কাছ ছাড়া করে খুব উদ্বেগে আছেন। হয় তো এটা স্নেহ এবং ভালবাসার বহিঃপ্রকাশ।

এই দেড় বছরে বারবার ছন্দপতন ঘটেছে। বারবার মেয়েকে নিজের কাছে বেশি দিন রেখে দেওয়া আমাকে মানসিক দিক থেকে বিব্রত এবং বিধ্বস্ত করত। কিন্তু পারতাম না প্রতিবাদ করতে। শাশুড়ির পর্বতসমান ব্যক্তিত্বের কাছে মৌন থাকাটাই আমার কাছে শ্রেয় ছিল।

ইচ্ছার বিরুদ্ধে বারবার শ্বশুর বাড়িতে যেতে হত শাশুড়ি মা’র ডাকে। বিভিন্ন কথাবার্তায় বুঝে যেতাম, আমার নামে অনেক নালিশ রিনা করত মা’র কাছে। পাত্তা দিতাম না। মৌনব্রত নিতাম। বাড়িতেও ফোন করে তিনি বাবা-মার কাছে অনেক প্রশ্ন করতেন। কথাপ্রসঙ্গে বলেও দিতেন, “আমি জানতে পারলাম সব তোমার রাত জাগার ফল। গভীর রাত পর্যন্ত জেগে পড়াশোনা করতে। এখনও তোমার কাজ করো রাত জেগে জেগে। কিন্তু মানুষের তো ঘুমেরও প্রয়োজন। চেষ্টা করো নিয়ম মেনে ঘুমাতে আর রিনাকে আরও বেশি সময় দিতে।’’

মনে মনে হাসতাম। রাত জেগে পড়াশোনা করতাম বলেই ওই নামকরা স্কুলের ফার্স্ট বয় ছিলাম আমি। জয়েন্টে ভাল ফল করে নামকরা সরকারি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে ভর্তি হয়েছিলাম সিভিল নিয়ে। ওটাই আমার পছন্দের বিষয় ছিল। অনেকেই বলেছিলেন, জয়েন্টে আমার অত ভালো পজিশন। অন্য বিষয় নিয়ে পড়া উচিত। কিন্তু বাড়ি থেকে আমার ওপর কখনও কোনও মতামত বা ইচ্ছা জোর করে চাপিয়ে দেওয়া হত না।

রিনা আমার বাবা-মাকে তুমি বলে সম্বোধন করত। শাশুড়ি মা একদিন আমাকে বলে ফেললেন, আমাকে আপনি না বলে তুমি বলে ডাকবে। তুমি তো আমার ছেলের মতই। কিন্তু আমার যেন কেমন অস্বস্তি হত তুমি বলতে। তাই তুমি এবং আপনি দুটোই চলত আমার।

শাশুড়ি মা এবং রিনাকে নিয়ে শাশুড়ি মা’র কথায় বার কয়েক মার্কেটিংয়ে বেরিয়েছি কিংবা সিনেমা দেখতে। এ ছাড়া নামি রেস্টুরেন্টে খাওয়া তো ছিলই। আমার পরিচিত কারও সঙ্গে দেখা হয়ে গেলে তাঁরা ভাবতেন, ওরা দু’জন বোন। ভুলটা ভাঙিয়ে দিতেই তাঁরা খুব অবাক হয়ে যেতেন।

শাশুড়ি মা’র সৌন্দর্য ব্যক্তিত্ব রিনার চাইতে অনেক বেশি। চলনে বলনে একটা আভিজাত্য ছিল। কিন্তু আমার মনে হত খুব দাম্ভিক। খুব নাকউঁচু স্বভাব। রিনা কিন্তু ওরকম নয়। হয় তো তার বাবার স্বভাব পেয়েছে। রিনার বাবাকে আমি দেখিনি কিন্তু শুনেছি উনি খুব অমায়িক লোক ছিলেন। ডাক্তার। একটি নামি বেসরকারি হাসপাতালে কাজ করতেন। অকাল মৃত্যু। রিনা তখন কলেজে পড়ে।

আমি যে কোম্পানিতে কাজ করি তার যাবতীয় গুরুত্বপূর্ণ কাজ আমি রাত জেগে করি। সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যান রাত জেগে করতে আমার ভাল লাগে। এই নিয়ে রিনার চাইতে রিনার মা’র আপত্তি বেশি।

শাশুড়ি মা আমাদের সঙ্গে বের হতেন উগ্র আধুনিক পোশাকে। রিনাকেও উদ্বুদ্ধ করতেন ওই ধরনের পোশাক পরতে। এ ব্যাপারে চলত মা-মেয়ের যুগলবন্দী। আমার বিষয়টা পছন্দ নয়। কিন্তু মুখ ফুটে কখনও বলিনি। বাড়িতে মা’কে খুব সাধারণ পোশাকে সাধারণ জীবন যাপন করতে দেখেছি। তাই হয় তো বিষয়গুলি আমার কাছে অস্বস্তিদায়ক। কারও ব্যক্তিগত পরিসরে ঢোকার ছেলে আমি নই। কিন্তু আমার ব্যক্তিগত পরিসরে ঢুকে পড়াটা আমি ঠিক পছন্দ করতে পারছি না।

শাশুড়ি মা ঘুম নিয়ে বারবার অনেক কথা বলেন। বলতে পারি না রিনার মতো অলস হলে এতদূর আমি উঠতে পারতাম না। কথাটা বলতে গিয়েও গলার কাছে আটকে যায়। নীলাদ্রি মুখোপাধ্যায়কে আপনি জামাই করেছেন তার জীবনে এই উন্নতি দেখে। সে নিজের যে জায়গাটা তৈরি করেছে, সেটা দেখে। 

বিয়ের সময় থেকেই লক্ষ্য করছি হঠাৎ হঠাৎ কেমন যেন তন্দ্রাচ্ছন্ন ভাব চলে আসে। বিশেষ করে শাশুড়ি মা’র দর্শন পেলে। কখনও কখনও মনে হয় তাঁর কথাই ঠিক। আমারও প্রয়োজন বিশ্রামের। কিন্তু পারি কই? কাজ তো আমার ওপর নেশার মত চেপে বসেছে। তারপর এই বিষয়ে নিত্য নতুন বই পড়া। আমার তো আরও আরও সময়ের প্রয়োজন। সময় প্রতিদিন এত দ্রুত শেষ হয়ে যায় কী করে, বুঝতে পারি না!

রিজার্ভ এসি গাড়িতে চলেছি আমরা। আমি, রিনা আর শাশুড়ি মা। এসি চালানোর পক্ষপাতী আমি ছিলাম না। কিন্তু শাশুড়ি মা’র জেদ। কোনও ধুলো ঢুকতে দেওয়া যাবে না। সুদীর্ঘ পথ। গাড়ির জানালা খোলা থাকলে দৃশ্যগুলি উপভোগ করতে করতে এবং প্রকৃতির হাওয়া খেতে খেতে একটা সুন্দর আমেজ উপভোগ করা যায়। আসলে এরা এসি ঘরে থাকতে অভ্যস্ত। আমার মতো রোদ ঝড় জলে তো কাজ করতে হয় না। তাই প্রকৃতিকে অন্যভাবে দেখতে পাওয়া এবং উপভোগ করা এদের দ্বারা সম্ভব নয়।

এসে পৌঁছলাম জমিদার বাড়ি। এখান থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরেই ফরেস্ট। বনাঞ্চলের ক্ষুদ্র সংস্করণ বলা যেতে পারে। অনেক খোঁজ খবর নিয়ে জায়গাটার সন্ধান পেয়েছি। সুদৃশ্য বিশাল জমিদার বাড়ি। কিন্তু সব জমিদারবাড়ির ললাট লিখন তো একই। কালের গর্ভে বিলীন হয়ে যাওয়া। একই সঙ্গে বহু ক্ষেত্রে রক্ষণাবেক্ষণের অভাব। এই জমিদার বাড়িও তার ব্যতিক্রম নয়। একটা অংশে রক্ষণাবেক্ষণের অভাব তো রয়েছেই। দেখা পাওয়া যাচ্ছে বটগাছ এবং অশ্বত্থ গাছের। 

হঠাৎ মাথার মধ্যেটা কেমন ঝিমঝিম করতে লাগল। একটা তন্দ্রাচ্ছন্ন ভাব। বসে পড়লাম জমিদার বাড়ীর সিঁড়িতে। হয় তো বসে বসেই ঘুমিয়ে পড়েছি। একটু পরেই ঘুমটা ভাঙল শাশুড়ি মা এবং রিনার ধাক্কাধাক্কিতে। স্বপ্নটা অসমাপ্ত থেকে গেল। একটা বাড়ির বিশাল কালো গোল টেবিলে মেলে ধরেছি বিশাল বাড়ি তৈরির নকশা। চারপাশে ঘিরে ধরে আছে কয়েকজন। কিছু একটা যেন বোঝাতে চাইছিলাম। কিন্তু স্বপ্নভঙ্গ। আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়ালাম। শুরু হল শাশুড়ি মায়ের বকুনি। বারবার বলেছি এত রাত জেগো না। এত কম ঘুমালে চলবে না। শাশুড়ি মা বকবক করতেই থাকেন। তাঁর সঙ্গে যোগ্য সঙ্গত করে রিনা।

জমিদার বাড়ির একটা অংশে কয়েকটা ঘর ভাড়া দেওয়া হয় ট্যুরিস্টদের জন্য। এই অংশটুকু যথেষ্ট পরিমাণে রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়। একটি ঘর আমাদের জন্য বরাদ্দ। আরেকটা ঘর চাইলাম। কিন্তু পাওয়া গেল না। সব ঘর ট্যুরিস্টদের জন্য বুকড্। 

ম্যানেজারবাবু খুব ভাল লোক। আমাদের সঙ্গে আরও একজন এসেছেন শুনে থাকতে দিতে আপত্তি করলেন না। আলাদা একটা বেড চেয়েছিলাম। ফোল্ডিং খাট। কিন্তু সেই ব্যবস্থা তাঁদের নেই।

ঘরে ঢুকলাম। ঘরে টিভি আছে। ডবল বেড সহ এসি ঘর পরিপাটি করে সাজানো। সোফায় গিয়ে চুপ করে বসে রইলাম। রাত্রিবেলা সোফায় শুয়ে কাটিয়ে দেব। ভাগ্যক্রমে লম্বা সোফা। একজনের বসার উপযুক্ত করে দু'টো সোফা থাকলে এই সুযোগ হত না। অন্ধকারের মধ্যে এই ভাবেই বোধহয় আলো খুঁজে পাওয়া যায়।

এটাচ বাথ। ট্যুরিস্টদের সুবিধার্থে পরবর্তীতে এটি তৈরি করা হয়েছে। ঘরের ছাদগুলো খুব উঁচু। পৌঁছাতে পৌঁছাতে সন্ধ্যা পার হয়ে গেছে। এখানেই আমাদের জন্য ডিনারের ব্যবস্থা হবে। চা এবং ডিম টোস্টের অর্ডার দিয়ে বাথরুমে গেলাম ফ্রেশ হতে।

গাড়ি জমিদারবাড়ির কম্পাউন্ডেই থাকবে। ড্রাইভারদের থাকার জন্য আলাদা রেস্টরুম আছে। সুন্দর বন্দোবস্ত। বাড়িতে একটা জায়গা নির্দিষ্ট আছে লাঞ্চ এবং ডিনারের জন্য। পরপর কয়েকটা গোল টেবিল পাতা।

রিনা এবং শাশুড়ি মা ফ্রেশ হয়ে এসে বসল ঘরে। আমার খুব অস্বস্তি হচ্ছে। সেটা শাশুড়ি মায়ের উপস্থিতি। কোথায় আমরা নবদম্পতি আনন্দ করতে আসব তা না, মাঝখানে কাবাব মে হাড্ডি। আমাদের বিয়ে বছর দেড়েক হয়ে গেলেও নিজেদের নবদম্পতি বলেই মনে হয়। এটা আমার মনের অনুভূতি। হয় তো ওর ঘন ঘন বাপের বাড়িতে গিয়ে থাকা এবং ওকে নিজের মতো করে না পাওয়াটাই এর কারণ।

ড্রাইভারের রেস্টরুমে চা এবং ডিম টোস্ট পাঠিয়ে দিতে বললাম। তার আগে মোবাইলে ওর সঙ্গে আলোচনা করে নিয়েছি। ডিনারে কী খাবে, সেটা যে চা দিতে যাবে তাকে বলে দিতে বলেছি। তার যা ইচ্ছা খেতে পারে। কোনও সিদ্ধান্ত কারও উপর চাপিয়ে দেওয়া আমার স্বভাব বিরুদ্ধ।

চা খেতে খেতে সিদ্ধান্ত হল সন্ধ্যাবেলা এলাকাটা ঘুরে দেখব। কাল যাব ফরেস্টে। শাশুড়ি মা এবার রেডি হবেন। আমি স্বেচ্ছায় ঘরের বাইরে গিয়ে দাঁড়ালাম। 

আমাকে ভেতরে ডাকতেই, ঘরের ভেতরে গিয়ে দেখি দু’জনেই রেডি। মা মেয়ে দু’জনেরই উগ্র সাজপোশাক। শাশুড়ি মাকে সাজপোশাকে যেন উগ্র অতি আধুনিকা মনে হচ্ছে। মাথার ভেতরটা আবার ঝিম ঝিম করে উঠল। একটা তন্দ্রাচ্ছন্ন ভাব। ঘুম আসছে। সোফায় বসে পড়লাম। ওদের ডাকে যথারীতি ঘুম ভেঙে গেল। সেইসঙ্গে স্বপ্নও। স্বপ্নে কাকে যেন দেখতে পেলাম অন্ধকারে! অন্ধকারে দরজা খুলে দিতেই আমি একটা ঘরে ঢুকতেই সে যেন আমার সামনে এসে দাঁড়াল।

শুরু হল দু’জনের ধমকানি। রিনারটা মৃদু আর শাশুড়ি মা’রটা প্রচন্ড তীক্ষ্ণ এবং তীব্র। কলকাতায় ফিরেই আমাকে ডাক্তার দেখাবে। কোনও বাধাই তিনি শুনবেন না। আমি নাকি গুরুতর অসুস্থ। 

বেরিয়ে পড়লাম তিনজনে। এলাকায় জনবসতি খুব কম। বড় বড় গাছপালায় ভরা সবুজ সুন্দর মনোরম পরিবেশ। বুক ভরে শ্বাস নিলাম। এ এক অনাবিল আনন্দ। আমরা বেশ অনেক্ষণ ঘুরলাম।

এবার ফেরার পালা। চোখ যায় জমিদার বাড়ির দিকে। শরীরটা কেমন করে ওঠে। তন্দ্রাচ্ছন্ন মনে অতি ক্ষীণভাবে একটা সুর বাজতে লাগল। জমিদার বাড়ির গেটের সামনে এসে গেছি। আমাকে অসুস্থ মনে করে দারোয়ান টুলটা এগিয়ে দেন। তন্দ্রাচ্ছন্ন অবস্থায় আমাকে বসিয়ে দেওয়া হয় ওখানে।

অনেক মানুষ কাজ করছে খালি গায়ে খাটো ধুতি পরে। গড়ে উঠছে এক বিশাল বাড়ি। মাথায় জল ঢেলে দিতেই স্বপ্নভঙ্গ। আস্তে আস্তে হেঁটে এগিয়ে চললাম ঘরের দিকে। 

রাতে ডিনার সেরে এবার শুতে যাওয়ার পালা। ওরা দু’জনেই খুব ডায়েট মেনে চলে। আমি সম্পূর্ণ বিপরীত। যেটা ভাল লাগে খাই। যতটুকু ইচ্ছা হয় খাই। আমি রেডি হয়ে শুতে গেলাম সোফায়। একটা মাথার বালিশ জোগাড় করতে পেরেছি। শাশুড়ি মা’র খুব আপত্তি। উনি বালিশ নিয়ে মাটিতে শুতে চাইছেন। একটা চাদর পেতে নেবেন মেঝেতে। আমি রাজি হলাম না। সোফাতে শুয়েই এই রাত কাটিয়ে দেব।

রিনা আর শাশুড়ি মা দু’জনেই রাতের পোশাকে। শরীরের মধ্যে আমার কেমন অস্বস্তি হতে থাকে। রিনা লাইটটা নিভিয়ে দিতেই স্বস্তি পেলাম। চোখের সামনে আর কিছু দেখতে হবে না।

চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছি। দু’চোখে নেমে আসছে ঘুম। বাড়ি তৈরীর কাজ শেষ। জমিদারবাবু বাধা দিলেন বাড়ি ফিরে যেতে। গৃহ প্রবেশ পর্যন্ত থাকতে হবে। এ তো আদেশ নয়। ভালবাসার টান। জমিদার বাড়ির নির্মাণশৈলী ওঁর খুব পছন্দ হয়েছে। ঘুমটা ভেঙে গেল। আমি তো এই জমিদার বাড়িটাই স্বপ্নে দেখলাম! কিন্তু এই বাড়ি তো নতুন নয়। বহু বছরের পুরানো। ঠিক আজকে যেভাবে এই বাড়ি স্বপ্নে দেখেছি তা তো সদ্য নির্মিত!

আবার চলে গেলাম ঘুমের দেশে। আবার মনের যাত্রা শুরু হল। শান্ত পায়ে মস্তিষ্কের অলিতে-গলিতে মন হাঁটছে খুঁজতে খুঁজতে আবছা হয়ে ওঠা অজস্র কুয়াশার মধ্য দিয়ে। 

জমিদারবাবু আমায় দেখে খুব খুশি। আমি ইঞ্জিনিয়ার। পড়াশোনার পর রাজস্থান থেকে বিশেষ ট্রেনিং নিয়ে এসেছিলাম। কিছু বিদ্যে অর্জন করেছিলাম রাজস্থানে প্রাসাদগুলির নির্মাণশৈলী নিয়ে। জমিদার বাড়ি নির্মাণের তদারকি আমাকেই করতে হবে। আমার করা জমিদার বাড়ির নকশা জমিদারবাবুর খুব পছন্দ হয়েছে।

ঘুমের মাঝেও বিস্ময়ের অন্ত নেই। এই স্বপ্ন আমি একটানা দেখিনি। বারবার ঘুম ভেঙেছে। সব সময় একটা তন্দ্রাচ্ছন্ন ভাব। আর তখনই দেখতে পাচ্ছি নানা রকম স্বপ্ন। আমার চেতনা রহস্যময় স্বপ্নের পদসঞ্চারে বারবার সজাগ হয়ে উঠেছে। সেগুলির কোলাজ করলে তৈরি হয় একটা ঘটনা।

রাতের বেলা অমোঘ টানে চলে গেলাম জমিদারবাড়ির এক প্রান্তে। ঝোপ জঙ্গল পেরিয়ে এক পরিত্যক্ত জলাশয়। নিশুতি রাতের চাঁদের আলোয় দেখতে পেলাম একজনকে। অস্পষ্ট প্রায় দেহ আড়াল থেকে নিঃশব্দে বেরিয়ে এল। বারবার বোঝার চেষ্টা করছি তাকে। এটা কী করে সম্ভব? আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে যাকে দেখি সেই দাঁড়িয়ে আছে আমার সামনে! সাদা ধুতি আর পাঞ্জাবি পরিহিত। মাথা দিয়ে রক্ত পড়ছে চুঁইয়ে চুঁইয়ে। সমস্ত শরীর ভেসে যাচ্ছে রক্তে। সাদা পাঞ্জাবি রক্তের হোলিতে রাঙা। আস্তে আস্তে ঢুকে গেল আমার পায়ের কাছে এই মাটির তলায়।

চারিদিকে প্রগাঢ় অসীম অন্ধকার। শরীরটা কেমন শিহরিত হয়ে উঠল। তা হলে আমি শুয়ে আছি এইখানে মাটির তলায়! আবার তন্দ্রাচ্ছন্ন ভাব। দূর বিস্তৃত অতীতের রহস্যাবৃত বেদনাময় বিস্তৃতি। ঘুম ক্লান্ত-অবসন্ন মন আকাশে ডানা মেলে ওই ধূসর আকাশ বেয়ে নিঃশব্দ পাখা সঞ্চারে কোথায় যেন উড়ে চলল!

গৃহ প্রবেশের পর একজনের মারফত আসে রানিমার নির্দেশ। নাঢঘরের কোনও আওয়াজ যেন অন্দরমহলে না ঢোকে, সেই ব্যবস্থা করতে হবে। বাড়ি তৈরি হয়ে যাওয়ার পর তা কী করে সম্ভব? জমিদারবাবুর ইচ্ছায় জমিদার বাড়ির এক প্রান্তে তৈরি হয়েছে নাচঘর। জানিয়ে দিলাম আমার অপারগতার কথা।

পরের দিন বাড়ি ফিরে আসব। হঠাৎ রাত্রিবেলা একটি মেয়ে এসে খবর দেন, রানিমা দেখা করতে চান। অনিচ্ছাসত্ত্বেও দেখা করতে গেলাম। কিন্তু আমি তো জানিয়ে দিয়েছি, নাচঘরের আওয়াজ অন্দরমহলে প্রবেশ বন্ধ করা আর সম্ভব নয়।

জমিদার বাড়ির পিছনের দরজার দিকে নিয়ে যাওয়া হল আমাকে। বাড়ির ম্যাপ তো আমার মুখস্থ। আমি গিয়ে পৌঁছতেই পিছনের দরজা খুলে আমাকে ঢুকিয়ে দেওয়া হল একটি ঘরে। অন্দরমহল। পিছনের দরজা দিয়ে জমিদার বাড়ির মেয়েরা যাবে সদ্য কাটা পুকুরে স্নান করতে। ওই পুকুরটি মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত।

মাথায় ঘোমটা দিয়ে এক মহিলার প্রবেশ। ঘরে ঢুকেই মেয়েটিকে বললেন চলে যেতে। দরজাটা ভেজিয়ে দিয়ে খুলে ফেললেন ঘোমটা। অল্প আলোয় চেনার চেষ্টা করছি। পরিচয় দিলেন তিনি রানিমা। এই জমিদার বাড়ি তৈরীর সময় আমি প্রায়ই যেতাম পুরাতন জমিদার বাড়িতে জমিদারবাবুর সঙ্গে আলোচনা করতে। শুনলাম তখনই লুকিয়ে লুকিয়ে অনেকবার তিনি দেখেছেন আমাকে। ক্ষুধিত চোখ দু’টো জ্বলছে। জানালেন আমার প্রতি আসক্তির কথা। নেশাগ্রস্ত লম্পট স্বামীর চাইতে আমার প্রতি তাঁর দুর্বলতা অনেক বেশি। 

আমি রাজি নই। ফিরে আসতে যেতেই সামনে এসে জড়িয়ে ধরলেন আমাকে। প্রচন্ড অস্বস্তিতে তাড়াতাড়ি ছাড়িয়ে নিতে চাই। ঠিক তখনই দরজা খুলে প্রবেশ করলেন জমিদারবাবু। রানিমার মুহূর্তেই মূর্তি বদল হল। অভিযোগ করলেন, আমি পেছনের দরজা দিয়ে ঢুকে পড়েছি অসদ্‌ উদ্দেশ্যে। পরক্ষণেই রানিমা ঘর থেকে একটা শক্ত ডাণ্ডা তুলে পরপর আঘাত করলেন আমার মাথায়। এরপর জমিদারবাবুর নির্দেশে কয়েকজন লোক আমাকে তুলে নিয়ে আসলো এখানে। আমাকে পুঁতে রাখা হল। চারিদিকে প্রচার হল, আমি বাড়ি ফিরে গেছি। আমার স্থান হল নিখোঁজের তালিকায়।

আবছা অন্ধকারে এসব ঘটনা পরপর দেখতে পাই তন্দ্রাচ্ছন্ন অবস্থায়। এক দৃষ্টে অন্ধকারের দিকে চোখ মেলে তাকালাম। শুধু অন্ধকার আর অন্ধকার, তবুও কেমন একটা ক্ষীণ আলো যেন সেই ঘন অন্ধকারের মধ্যে হঠাৎ ঝিলমিল করে উঠল। বিস্তৃতির ঘন অন্ধকারের মধ্যেই হঠাৎ স্মৃতির আলো ঝিলমিল করে উঠছে। মন পঙ্গু জীর্ণ অস্তিত্ব নিয়ে আঘাতে জর্জরিত হয়ে অবসাদে ভুগতে লাগল। ব্যথা মিশ্রিত বিস্ময়ভরে চিনতে ভুল হয়নি রানিমাকে। ঘৃণা মনের মধ্যে পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে উঠতে লাগল। মাথার মধ্যে জেগে ওঠে প্রতিশোধ স্পৃহা।

ছুটে ফিরে গেলাম ঘরে। আলতো করে দরজা ঠেলে ঘরে ঢুকে হাত দিয়ে ধাক্কা মেরে শাশুড়ি মা’র ঘুম ভাঙিয়ে মুখে আঙুল দিয়ে ইঙ্গিতে বোঝাই নিস্তব্ধে উঠে আসতে। রিনা তখন অকাতরে ঘুমিয়ে।

সম্ভাব্য কোনও বিপদের আশঙ্কা করে শাশুড়ি মা উদ্বিগ্ন হয়ে আমার সঙ্গে চললেন। ঠিকঠাক পোশাক পরার সময় পাননি। শাশুড়ি মা’কে নিয়ে হাজির হই অকুস্থলে। ওই স্থান নির্দেশ করে জবাব চাই মিথ্যাচারের। শাশুড়ি মা হতবাক। ভীত সন্ত্রস্ত। অর্থহীন অদ্ভুত দৃষ্টি মেলে প্রস্তর মূর্তির মতো নিস্পন্দভাবে দাঁড়িয়ে রইলেন। চোখ দুটি অসংযত, ভীত, চঞ্চল। কয়েক মুহুর্তব্যাপী অনিশ্চয়তা এবং নীরবতা। এবার প্রতিশোধের পালা। প্রাণঘাতী ব্যভিচারিণীর মিথ্যা কলঙ্ক এবং ষড়যন্ত্রের প্রতিশোধ। উল্লাসে মন ঝলমল করে উঠল রৌদ্রকরোজ্জ্বল বিস্তৃত জলরাশির মতো। সময় সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো। সবকিছুই ফিরিয়ে দেয়। 

জঙ্গল থেকে তুলে নিলাম একটা মোটা ডাল। এবার আঘাত করব মাথায়। শাশুড়ি মা পালাতে গেলেন। প্রচণ্ড শক্তিতে ডালটা শাশুড়ি মা’র মাথায় মারতে উদ্যত হতেই প্রগাঢ় নিরবতা এবং অন্ধকারের মধ্যে অস্ফুটে আর্তনাদ করে শাশুড়ি মা মাটিতে পড়ে গেলেন। চাঁদের আলোয় দেখতে পাই এক সরিসৃপ এঁকেবেঁকে জঙ্গলের মধ্যে ঢুকে গেল। এ তো সাপ। মাথার মধ্যে কেমন করতে থাকে। আবার তন্দ্রাচ্ছন্ন ভাব। আর কিছু মনে নেই।

যখন জ্ঞান ফিরল আমি হাসপাতালের বিছানায়। ওখানে শুয়েই আমার কেবিনের অ্যাটেনডেন্টের কাছে জানতে পারলাম, শাশুড়ি মা’র পায়ে বিষাক্ত সাপে ছোবল মেরেছে। এই হাসপাতালেই ভর্তি। উল্টোপাল্টা বকছেন তিনি। মুখে তাঁর একটাই কথা, জামাই পাগল হয়ে গেছে।

চোখটা বন্ধ করলাম। মাথাতে খুব যন্ত্রণা। জানি না কতক্ষণ কেটে গেছে। হঠাৎ তন্দ্রাচ্ছন্ন ভাবটা কেটে গেল। মা’র ডাকে চোখ খুললাম। বাবা-মা দু’জনেই দাঁড়িয়ে আছে। চোখ মুখ দেখলে বোঝা যায় খুব উদ্বিগ্ন। রিনা কাল রাতেই ফোনে খবর দিয়েছে। তখনই রওনা দিয়েছিল বাবা মা।

বাবা-মা কেবিনের বাইরে বেরোতেই শুনতে পেলাম রিনার গলা। সঙ্গে আরও কয়েকজন। এরা তো আমার শ্বশুরবাড়ির সম্পর্কের আত্মীয় স্বজন। 

রিনা একটানা বলে চলেছে, বিয়ের পরই সে বুঝতে পেরেছিল, আমি নাকি প্রায়ই তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে যাই। তন্দ্রাচ্ছন্ন অবস্থায় উল্টোপাল্টা চিন্তা করি। আপন-মনে বিড়বিড় করি। ওদের চাপাচাপিতে কিছু কিছু কথা আমি প্রকাশ করেছিলাম। সেটাকেই সত্য বলে মানি। আমাকে নাকি টলানো যায় না বিশ্বাস থেকে। দিন দিন পরিস্থিতি তাদের কাছে নাকি খুব আতঙ্কের হয়ে উঠছিল। আমার শাশুড়ি মা আমার বাবা মা’র সঙ্গে কথা বলেছিলেন। কিন্তু তাঁরা সে রকম কিছু দেখতে পাননি।

মনে মনে হাসলাম। তন্দ্রাচ্ছন্ন ভাবটা তো আসত কেবলমাত্র শাশুড়ি মা’কে দেখলে। বিষয়টা বেমালুম গুলিয়ে দিল রিনা। বিয়ের সম্বন্ধের সময় শাশুড়ি মা’কে দেখার আগে পর্যন্ত আমার মধ্যে তো কখনও তন্দ্রাচ্ছন্ন ভাব আসেনি। এসব স্বপ্ন তো কখনও দেখিনি। তবুও এই সম্বন্ধ পাকা হয়েছিল কারণ শাশুড়ি মাকে দেখে আমার অস্বস্তি আমি প্রকাশ করিনি বা করতে পারিনি। আমিও পারিনি পিছিয়ে আসতে। আমার এই মানসিক অবস্থার জন্যই নাকি শাশুড়ি মা মেয়েকে আমার সঙ্গে ছাড়তে ভরসা পাননি। বেমানান হলেও চলে এসেছিলেন আমাদের সঙ্গে। রিনা বলছে, এই অবস্থাতে তার মা বলছে অবিলম্বে ডিভোর্স নিতে।

মাথার মধ্যেটা কেমন ঝিমঝিম করছে। ভাবছি জোরে বাবা মাকে ডাকি। খুব ঘুম পাচ্ছে। বড় ক্লান্ত আমি। এ ক্লান্তি শরীরের নয়, মনের।

মা’র ডাকে আবার ঘুমটা ভেঙে গেল। আজকেই আমাদের কলকাতায় নিয়ে যাওয়া হবে। শাশুড়ি মা’র অবস্থা ভাল নয়। অ্যাটেনডেন্টের কথায় বাবা মা কেবিনের বাইরে বেরিয়ে গেল। চোখ বন্ধ করে শুয়ে রইলাম।

অ্যাটেনডেন্টের কাছে খবর পেলাম একটু আগে শাশুড়ি মা মারা গেছেন। হার্টফেল। তিনি খুব ভয় আর আতঙ্কে ছিলেন। মনে মনে খুব খুশি হলাম। 

আবার ঘুম আসছে। এ এক শান্তির ঘুম। জানি না কতক্ষণ ঘুমিয়ে ছিলাম। হয় তো এক প্রহর ঘুমিয়েছি নিরুপদ্রবে। ঘুমটা ভাঙতেই ঘরের আলোয় চোখ চাইলাম। হাসপাতালের এই ঘরটা আমার একার জন্য বরাদ্দ। কেউ নেই ঘরে। হঠাৎ দেখি, চেয়ারে শাশুড়ি মা বসে! মুখে লাজ রক্তিম ক্রুর হাসি। পোশাক সেই ব্রিটিশ আমলের জমিদার বাড়ির বউদের মতো। ফুটে উঠল সেই রানিমার প্রতিচ্ছবি। অন্ধকারের মতো নীরবতা আবার জমে পাথর হয়ে গেল। মুহূর্তগুলো ভয়ঙ্কররূপে স্তব্ধ। শুনতে পেলাম সেই সুদূর অতীত থেকে আসা প্রেমময় আর্তিতে কণ্ঠস্বর,

-“এই চলুন না আমার সঙ্গে...।”


এবং বৃত্তের বাইরে, মে ২০২৫

No comments:

Post a Comment