ভুতুড়ে লাইব্রেরির ভৈরবী
অরিন্দম দাশগুপ্ত
ঝম্ ঝম্ ঝম্ ঝম্...
ও কিসের শব্দ ?
বিছানায় আধশোয়া হয়ে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন শুভমানস বাবু। চমকে উঠে বসলেন। ঘরটা দশ ফুট বাই কুড়ি ফুট মতো। দোতলায়। পাশে একটা ছোট ওয়াশরুম। ঘর থেকেই যাওয়া যায়। বাকিটা খোলা ছাদ। নিচের তলায় পুরোটা জুড়ে লাইব্রেরি আর ছোট একটা অফিস ঘর। তার পাশ দিয়েই ছাদে ওঠার ইট বের করা ন্যাড়া খড়খড়ে সিঁড়ি। সেই সিঁড়িতেই শব্দটা হচ্ছে। তাহলে কি কেউ আসছে ? কিন্তু কে ই বা আসবে এত রাতে, এই পান্ডববর্জিত তথাকথিত ভুতুড়ে লাইব্রেরিতে ? আর শব্দটাই বা এরকম অদ্ভুত কেন ?
হ্যারিকেনটা হাতে নিয়ে একটু আলোটা বাড়িয়ে দিলেন শুভমানস। কান খাড়া করলেন। কিন্তু এখন আর শব্দটা পেলেন না। টর্চ হাতে এগিয়ে এলেন কাঁচবন্ধ জানলার দিকে। বাইরে শীতের কুয়াশা ভেজা আবছা অন্ধকার। শিশির ভেজা কাঁচের ওপর দিয়ে তারই মাঝে টর্চের আলো ফেললেন, সিঁড়ির একদম ওপরের দুটো ধাপ দেখা গেলো ছাদের আলসের ফাঁক দিয়ে। কিন্তু সেখানে কেউ ছিল না।সরে এসে খাটে বসে অস্ফুটে হাসলেন ভারতীয় সেনার প্রাক্তন সুবাদার শুভমানস। বয়স হচ্ছে বুঝতে পারছেন। ভুল শোনা ও তো বয়সেরই লক্ষণ। যাকে বলে ভিমরতি ধরা। কিন্তু পঞ্চাশ না পেরোতেই ভিমরতি, মানতেও মন চায় না। তবে কী সত্যি ই কেউ আসছিল সিঁড়ি পথে ? তাহলে চলে গেলো কেন ? আর কেই বা এখানে আসবে এত রাতে ? আর ওই আওয়াজটাই বা কিসের ছিলো ?
শিশির ভেজা কাঁচের জানলা দিয়ে বাইরে হিমেল তমসাচ্ছন্ন নিস্তব্ধ কালো আকাশের দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ আগে শুনতে পাওয়া অপার্থিব ঝম্ ঝম্ শব্দটার কথাই ভাবছিলেন শুভমানস গুহ, পরিচিত মহলে গুহসাহেব। অকৃতদার। বয়স আটচল্লিশ। আজ দশই ডিসেম্বর ১৯৮৮, শনিবার। চার বছর আগেই সেনাবাহিনী থেকে অবসর নিয়েছেন সুবাদার গুহসাহেব। তারপর নিজের বিদ্যার জোরেই এক্স-আর্মিম্যান হিসাবে পেয়েছেন আরেকটা সরকারি চাকরি। অস্ত্র ছেড়ে এখন তিনি শাস্ত্রের কারবারি। সরকারি গ্রন্থাগারের জেলা আধিকারিক। বর্তমানে পোস্টেড বীরভূমে। থাকেন সিউড়ির সরকারি কোয়ার্টারে।
হঠাৎই নিস্তব্ধতা ভেঙ্গে পিছনের দিক থেকে ভেসে এলো কয়েকটা শেয়ালের ডাক। মনে মনে ভাবলেন শুভমানস, লাইব্রেরি করার আর জায়গা পায়নি। দুপুরে এখানে এসেই চারদিক ঘুরে দেখেছেন তিনি। তখনই একথাটা তাঁর মনে হয়েছিল। সিউড়ি থেকে প্রায় তিরিশ মাইল দূরে এই গ্রাম, নাম ভৈরবীথান। বেশি বড় না, মাত্র শ খানেক পরিবারের বাস। তবে বেশ সমৃদ্ধ। হাইস্কুল, খেলার মাঠ, স্বাস্থ্যকেন্দ্র সবই আছে। আর আছে এই লাইব্রেরি। গ্রামের একদম শেষে একটা বিরাট ঝুপরি ঝুপরি বট গাছে ঘেরা জংলা জায়গা আর একটা পরিত্যক্ত মধ্যযুগীয় সাতমহলা জমিদার বাড়ি পেরিয়ে একদম পান্ডব বর্জিত জমির ওপর বাগানঘেরা এই গ্রন্থাগার। পিছনে প্রায় মজে যাওয়া দ্বারকা নদী আর তার ওপারে এক বিশাল জনশূন্য দীগন্তবিস্তৃত জলাভুমি আর বাদাবন। আর এই লাইব্রেরির কম্পাউন্ড লাগোয়া নদীতীরে বহুযুগ আগের এক পরিত্যক্ত শ্মশানঘাট।
একটা সিগারেট ধরাতে গেলেন শুভমানস। আর ঠিক তখনই, অনুভব করলেন একটা অদ্ভুত গন্ধে কখন যেন ভরে গেছে তার ঘর। গন্ধটা চিনলেন— ধুনো, চন্দন আর কাঠপোড়ার। কিন্তু তার সাথে একটা আঁশটে ভাব আছে, সেটাই চিনতে পারলেন না শুভমানস। গন্ধটা এতই তীব্র যে দরজা-জানলা বন্ধ থাকা অবস্থতেও ঘরে বসে শরীর অস্থির করছিল শুভমানসের। উঠে ভাবলেন দরজাটা খানিক খুলে রাখবেন আর ঠিক তখনই বন্ধ দরজার বাইরে খোলা ছাদে শুরু হলো শব্দটা।
ঝম্ ঝম্ ঝম্ ঝম্ শব্দটা আসছে এই ঘরেরই চৌকি সংলগ্ন দেওয়াল থেকে। কেউ যেনো বাইরে থেকে কুড়ি ইঞ্চি চওড়া দেওয়ালে প্রচন্ড আঘাত করছে। যেনো ভেঙ্গে ফেলতে চাইছে এপাশের দেওয়ালটা। অবাক অব্যক্ত বিস্ময়ের একদম শেষ সীমায় পৌছে তখন স্থানুবৎ বসে ছিলেন শুভমানস। আর তারপরেই সাথে শুরু হল আরেক অদ্ভুত, থপ্ থপ্ থপ্ থপ্ আওয়াজ।
* * *
ভয় পাননি শুভমানস। সৈনিকের জীবন তাঁকে করে তুলেছে অকুতোভয়। কিন্তু চিন্তিত তো হলেন বটেই। বাঁ হাতে টর্চ আর ডানে রিভালভার নিয়ে জানলার কাঁচে একদম মুখ চেপে বাঁদিকে দরজার সামনে ছাদে কী ঘটছে বোঝার চেস্টা করলেন। কিন্তু সে জায়গাটা দেখা গেলো না। এদিকে সেই বিচিত্র গন্ধের একটানা আবেশে তখন রীতিমতো গা গুলিয়ে উঠছে শুভমানসের। এদিকে ঠিক খিল আঁটা দরজার বাইরে তখন আবার শুরু হয়েছে ঝম্ ঝম্ থপ্ থপ্ আওয়াজ।
একবার ভাবলেন শুভমানস, যা থাকে কপালে— দরজা খুলে ছাদে যাবেন। কিন্তু পরের মুহূর্তেই নিজেকে সংবরন করলেন। তিনি দুঃসাহসী, কিন্তু হঠকারি নন। একবার নিজের অবস্থাটা বিচার করলেন। এই নিরালা লাইব্রেরিতে তিনি একা, নিকটস্থ মনুষ্য বসতি এতটাই দূর যে এই শীতের রাতে সেখানে বন্দুকের শব্দও পৌছাবে না। পৌছোলেও কেউ রাতের বেলা এই বাড়ির ছায়া মারাতো না, কারণ গ্রামের সার্ব্বজনীন বিশ্বাস এই লাইব্রেরি ভুতুড়ে। পরলোক মানেন না শুভমানস, কিন্তু এখানে যে কিছু একটা হয় রাতের অমানিশার কালোছায়ার মাঝে, সেটা এখানকার খাতাপত্র পরীক্ষা করতে গিয়ে টের পেয়েছেন শুভমানস। বাইরে আবার থপ্ থপ্ শব্দটা বেজে উঠতেই বিকট গলার চিৎকার করে উঠলেন প্রাক্তন সুবাদার গুহ সাহেব, ‘কে ওখানে ? উত্তর দাও। নাহলে আমি গুলি ছুঁড়তে বাধ্য হবো।’ উত্তর কিছু এলো না বটে, কিন্তু থপ্ থপ্ শব্দটার উৎস আন্দাজ করতে পারলেন শুভমানস। ওটা পায়ের শব্দ! প্রচন্ড ভারি চেহারার বলশালি কোন মানুষের পদচারণার ফলেই ওই থপ্ থপ্ শব্দ বেজে উঠছে বাইরের খোলা ছাদে। খেয়াল করলেন শুভমানস, এখন সে শব্দ চলেছে কাঁচের পাল্লা টানা জানলার দিকে। বাইরে তখন কুয়াশা আরো ঘন। আকাশে চাঁদ নেই, চুঁইয়ে পড়া তারার আলোয় যে টুকু অন্ধকার কাটছে, তার চেয়ে ঢের বেশি মায়াবি রহস্যময়তা তৈরি হচ্ছে শুভমানসের ঘর, তার মন ও সমস্ত সত্ত্বা জুড়ে। সম্মোহিতের মতো একদৃষ্টে জানলার দিকে তাকিয়ে ছিলেন শুভমানস।
রীতিমতো ঠান্ডা লাগছে তখন, অথচ জানলার কাঁচের পাল্লা, দরজা সবই তো আগের মতোই বন্ধ। তবে ? তাঁর কি নার্ভ ফেল করছে ? ভয়েতে এরকম হচ্ছে ? মনে মনে নিজেকেই ধিক্কার দিয়ে রিভালভারটা সোজা কাঁচের জানলার দিকে বাগিয়ে ধরলেন শুভমানস। আর তার পরমুহূর্তেই দুবার দপ্ দপ্ করে হঠাৎই নিভে গেলো ঘরের একমাত্র আলোর উৎস, হ্যারিকেন লণ্ঠনটা।
অন্ধকারে চৌকিটা কয়েকবার হাতড়ালেন শুভমানস কিন্তু টর্চটা একটু আগে কোথায় রেখেছেন, ঠাহর করতে পারলেন না। বেশিক্ষণ খুঁজতেও পারলেন না। তার আগেই চোখ গেলো জানলার দিকে। বাইরের চুঁইয়ে পড়া আলোর মাঝেই দেখলেন এক বিরাট মনুষ্য মূর্তির আবছায়া সমস্ত জানলা জুড়ে দাঁড়িয়ে একভাবে তাকিয়ে আছে এই ঘরের অন্ধকারের দিকে। এরকম কাউকে স্বপ্নেও আশা করেন নি শুভমানস। কয়েক মূহূর্ত আবিস্ট হয়ে পড়েছিলেন বাইরের ভয়ংকর নির্জনতা, মৃত্যু শীতল হিম মাখা ডিসেম্বরের আদিম জ্যোৎস্নার আস্বাদ, উৎকট গন্ধের আবেশ আর কদাকার দানবাকৃতি ছায়া মানবের উপস্থিতিতে। সম্বিত পেলেন আবার সেই ঝম্ ঝম্ শব্দে। মুহূর্তে বুঝলেন শুভমানস, ওই লোকটি হাত নাড়ালেই শব্দ হচ্ছে। আর তারপরেই সেই মূর্তি দুহাত ঠুকতে লাগলো জানলার লোহার গরাদে আর সেই তালে তালে হয়ে চলা ঝম্ ঝম্ শব্দে বুঝলেন শুভমানস, লোকটির দু হাতেই আছে একাধিক মোটা মোটা লোহার বালা। সেই বালার ঠোকাঠুকিতেই আসছে ওই অপার্থিব শব্দ। লোকটা ঘুরে সিঁড়ি পানে হাঁটা দিতেই আবার শিহরিত হল শুভমানস। ওই হাঁটার ভঙ্গি এরকম অদ্ভুত কেনো ? আর কে সে ? কি চায় ? হঠাৎই যুক্তবাদী শুভমানসের মনে হলো, তাহলে কি সেই দেড়শ বছর আগের ভৈরবীর অ-মৃতা জলে ডোবা দেহ আজ আবার জাগ্রত হয়েছে নরতৃষ্ণায় ? তাহলে কী মুখুটির কথা সত্য ? গ্রামবাসিদের বিশ্বাস সঠিক ? তাহলে কি এ গ্রামের কিংবদন্তি অনুসারে আজ রাতে এই বাড়িতে রাত কাটানোর পরিণামে গভীর রাতে মৃত্যু পরোয়ানা নেমে আসবে শুভমানসের ওপরে ? আর ভাবতে পারলেন না শুভমানস, ধপাস করে বসে পড়লেন চৌকির ওপরে।
ততক্ষণে আঁশটে গন্ধটা চিনতে পেরেছেন গুহ সাহেব। সেটা পচা পাঁকের।
* * *
দীপঙ্কর ওরফে দীপু শুধু যে গুহ সাহেবের ড্রাইভার তাই নয়, তাঁর কম্বাইন্ড হ্যান্ড সব কাজের কাজী। মোদ্দা কথা হল, বীরভূমে বদলি হয়ে আসার পর থেকে গুহ সাহেব ক্রমশই নির্ভরশীল হয়ে উঠেছেন বছর পঁচিশের এই সরকারি ড্রাইভারের ওপর। সকালে ভৈরবীথান আসার পথে একবার চা খেতে গাড়ি থামিয়েছিলেন গুহ সাহেব, তখনই দীপুকে বলেন, —‘মন দিয়ে শোন দীপু। একটা গোপন সূত্রে খবর পেয়ে ওই প্রত্যন্ত গ্রামে আমায় যেতে হচ্ছে। ওখানে একটা লাইব্রেরি আছে এককালে শুনেছি প্রচুর বই ছিলো মায় একটা অতিথিশালা ও। কিন্তু এখন কোনটাই ভালভাবে মেনটেইন হয় না। শুধু তাই নয়, একদম নিরিবিলিতে থাকা ওই লাইব্রেরিতে নাকি গভীর রাতে কিছু একটা হয়। গ্রামের লোকেরা অবশ্য সেটা ভৌতিক বলেই মানে। সে যাই হোক, সরকারিভাবে এটাই ঠিক আছে যে, আমি হঠাৎই ওখানে ভিজিট করবো। তাই আজ যাচ্ছি। ওখানে আমি আজ রাতও কাটাবো, ভেবেছিলাম তোকেও সাথে রাখবো। কিন্তু বিধি বাম। তুই সুবীর বাবুকে চিনিস তো ?’
এতক্ষণ চুপ করে স্যারের কথা শুনছিল দীপু, এবার বললো,
—‘কোন সুবীর বাবু স্যার ? ওই দারোগা সাহেব ?’
—‘রাইট। এই গ্রামটা যে সদরে, সেখানকার দায়িত্বে আছেন। সেই গোপন সরকারি মিটিং এ ঠিক হয়েছিল আমি যেদিন ভৈরবীথানে যাব সেদিনই চুপিসারে গভীর রাতে ওই লাইব্রেরি ঘিরে ফেলবেন সদলবলে সুবীর দারোগা। কিন্তু, কাল রাত থেকে সমানে ফোন করে যাচ্ছি, পাচ্ছিই না।’ বলেই খেয়াল হল গুহ সাহেবের, চোখ পাকিয়ে বললেন, —‘এই ব্যাটা, তুই হাসছিস কেন ?’
—‘ভূত ধরবেন স্যার ?’
একটু এগিয়ে এসে দীপুর কাঁধে একটা হাত রেখে গলাটা একদম খাদে নামিয়ে নামিয়ে বলেছিলেন গুহ সাহেব।
—‘মানুষ ভূত।’
চলন্ত গাড়িতে একটা সিগারেট ধরিয়ে দীপুকে বলেছিলেন,
—‘তুই মানদা মুখুটির নাম জানিস ?’
—‘ওরেব্বাবা, সে আর জানবো না। অতবড় ধনী তায় রাজনৈতিক ক্ষমতা। প্রাসাদের মত বাড়ি বানিয়েছেন। তবে লোকে বলে বটে, ওনার নাকি মাদক পাচারের ও ব্যবসা...’
কথা শেষ করতে দিলেন না শুভমানস।
—‘রাইট। এবার শোন, ওই মানদা মুখুটি হলেন এই ভৈরবীখানের সাবেক জমিদার বংশের সন্তান এবং সেখানকার স্কুল, ক্লাব, বারোয়ারি সব কিছুরই সভাপতি, ওই লাইব্রেরিরও। মাঝে মাঝেই তিনি এক-দু দিনের জন্য গ্রামে যান। গতকাল সন্ধে বেলায় গেছেন, সোর্সের মাধ্যমে আমরা জানতে পেরেছি আগামি পরশু দুপুরে ফিরবেন। এবারই আসল ব্যাপারটা শোন। এটা দেখা গেছে যে, উনি যখনই গ্রামে যান, তখনই এদিকে মাদক পাচারকারি একটা গ্যাং সাংঘাতিক অ্যাক্টিভ হয়ে ওঠে। কিন্তু ওনার মতো একজন রাঘব বোয়ালকে তো আর এমনি জালে তোলা যায় না।’ হাসলেন শুভমানস।
‘টোপ লাগে... বুঝে গেছি স্যার।’
‘এই টাকাটা রাখ।’ একটু হেসে আবার গম্ভীর হয়ে বললেন গুহ সাহেব, —‘আমাকে ওই গ্রামে মুখুটির বাড়িতে নামিয়েই এক সেকেন্ড ও সেখানে দাঁড়াবি না। কারো সাথে কোন কথা ও বলবি না। সোজা সদরে গিয়ে থানায় সুবীর বাবুর সাথে দেখা করে আমার আসার বিষয়ে জানাবি। ওনাকে না পেলে কিভাবে কী করবি তুই জানিস। আমার বিশ্বাস আছে তোর ওপর। তারপর ওখানেই একটা হোটেলে চান- খাওয়া সেরে বিশ্রাম নিস। একদম কাল ভোরে আবার ওই গ্রামে আসবি। বুঝেছিস ?’
গম্ভীর মুখেই ঘাড় নেড়েছিল দীপঙ্কর বড়াল।
* * *
একটা সিগারেট ধরিয়ে ভাবছিলেন শুভমানস। হাতে ফ্লাস্কের ঢাকায় চা। মনটা একটু সংহত হচ্ছে ধীরে ধীরে। ভাবছিলেন একটু আগের চোখ, কান নাক বিবশ করে দেবার মতো ঘটনাটা। আচ্ছা, এই উৎকট চেহারার মানুষ, এই লোহার বালা, মহিলাদের সাজপোষাক, অপার্থিব গন্ধের সমাহার, এর সবই তো মানুষের কারসাজি হতে পারে। কিন্তু, ঠিক তখনই হ্যারিকেনটা নিভে গেলো কেন ? সেও কী শুধুই সমাপতন! কিন্তু, এখন তো দিব্য জ্বলছে। তেলও আছে অনেকটাই। তাহলে কি, দুপুরে যা শুনেছেন, সেটাই ঠিক ?
সকাল বেলা এগারোটা নাগাদ যখন পিঠে ব্যাগ ঝুলিয়ে মুখুটি ভবনের গেটে এসে দাঁড়ান গুহ সাহেব, তখন মানদা বাবু বাড়ি ছিলেন না। দারোয়ান জানায়, লাইব্রেরিতে আছেন বাবু। শুনে গুহসাহেব আর দেরি করেন নি। পথ নির্দেশ জেনেই প্রায় মাইল টাক হেঁটে এই লাইব্রেরিতে আসেন। নিচের হলঘরে তখন জনা চারেক লোক নিয়ে বসে ছিলেন মানদা মুখুটি।
মানদা মুখুটির চেহারা একদম ছোটখাট, রোগাপাতলা। দুহাতে গোটা আটেক সোনার আংটি, যার সবগুলোতেই জ্বলজ্বল করছে নানা রঙের পাথর। ছোট্ট একটা তেকোনা গোঁফ, চোখে সোনার চশমা, পরিপাটি করে পেতে আঁচড়ানো তেল চপচপে কাঁচাপাকা চুল- কিন্তু দাঁতগুলো ছোপ লাগা, ক্ষয়ে যাওয়া। বয়স যা মনে হল, বছর যাটেক। পরনে পাটভাঙ্গা ধুতি-আলোয়ান।
—‘আপনাকে না জানিয়ে আসার জন্য আমি ক্ষমাপ্রার্থী।’ নিজের পরিচয় দিয়ে বলেছিলেন গুহসাহেব।
—‘রাইটার্স থেকে অডিট সংক্রান্ত জরুরি আদেশনামা না এলে সবকটা লাইব্রেরিতে আমার এভাবে ঘোরার প্রয়োজনও হতো না। কিন্তু, বুঝতেই পারছেন...’
—‘আরে ছাড়ুন তো সাহেব।’ একগাল হেসে বলেছিলেন মুখুটি। ‘বসুন বসুন। আলাপ করিয়ে দিই, এনারা হলেন এই লাইব্রেরির পরিচালন সমিতি। আপনার যা যা কাগজ লাগবে, এনাদের বলবেন।’ বলেই একগাল হেসে বলেছিলেন, ‘আর একটা কথা। যে কদিন এখানে আছেন, দুবেলা দু মুঠো কিন্তু এই অধমের বাড়িতেই...’
—‘আরে সে হবেখন।’ বলেছিলেন গুহ। ‘কিন্তু আপনি এখানেই পাঠিয়ে দেবার একটু ব্যবস্থা করবেন স্যার। আমার মেয়াদ এক রাতের। কাল সকালেই আমায় আবার অন্য একটা লাইব্রেরিতে যেতে হবে। আর্জেন্ট ব্যাপার, একদম সময় নেই। তাই এই কঘন্টা আমি আপনাদের গেস্টরুমেই থাকবো। ওটা ব্যবহারযোগ্য আছে তো ?’
—‘তা আছে। কিন্তু, রাতে এখানে। মানে....’ একসাথে ইতস্তত করতে আরম্ভ করলেন ঘরে উপস্থিত মুখুটি সমেত সবকজন সভ্য।
—‘কোন প্রবলেম স্যার ?’ অবাক হয়ে প্রশ্ন করেন শুভমানস।
—‘মানে বিষয়টা,’ একটু থেমে একজন সভ্য বলেছিলেন, ‘বিষয়টা ভৌতিক স্যার।’
একটা অট্টহাস্য করে বলেছিলেন গুহসাহেব, —‘ওসব গ্রাম্য কুসংস্কার আমি মানি না ভাই। তবে এখানে তো এখনো দেখছি বিদ্যুৎ সংযোগ নেই। তাই শুধু একটা তেলভরা হ্যারিকেন আর খাবার জল পেলেই হবে।’ বলেই গলায় কৌতুকের সাথে বলেন, ‘তা কি ভূত ? মামদো নাকি...’
—‘দেড়শ বছর আগের ভৈরবীর অ-মৃতা জলে ডোবা দেহ’ কাঁপা গলায় বলেছিলেন মুখুটি। ‘এখানে রাত কাটানোর পরিণাম— মৃত্যু।’
সকালে এরপরেও সভ্যদের এখানে না থাকার বারংবার অনুরোধ শুনে হেসে উড়িয়ে দিয়েছিলেন, কিন্তু এখন এই অন্ধকার আর নির্জনতায় কথাটা মনে পড়তেই চমকে জানলার দিকে তাকালেন শুভমানস। দুহাতে জানলার বাইরে রডগুলো ধরে একদৃষ্টে তার দিকে চেয়ে আছে কিছুক্ষণ আগে দেখা সেই ভয়ংকর নারীমূর্তি!
ধীরে ধীরে নিজের দুহাত কাঁচের ওপর খাবার মত প্রথিত করলো সেই রমনী। তারপর প্রচন্ড বেগে ওপর থেকে হাত নামালো নিচে আর অবাক বিস্ময়ে দেখলেন শুভমানস, সেই স্বল্প আলোতেই বুঝতে পারলেন যে, শিশির ভেজা সেই কাঁচে স্পষ্ট আঁচড় ফেলেছে দশটা তীক্ষ্ণ নখের দাগ।
এরপর পিছন ফিরে আবার ঝম ঝম থপ থপ শব্দ তুলে দৃষ্টির আড়ালে বেরিয়ে গেলো সেই ভয়ংকর পিশাচ মূর্তি। আর একভাবে সেদিকে তাকিয়ে রইলেন প্রাক্তন আর্মি অফিসার শুভমানস।
* * *
আবার নিচ থেকে ভেসে আসা একটা কুকুরের ডাকে যখন সম্বিত ফিরে পেলেন শুভমানস, তখন বেশ রাত। ঘরের ডানদিকের দরজা দিয়ে লাগোয়া ওয়াশরুমে গিয়ে ওই প্রচন্ড শীতেই চোখে মুখে জল দিলেন শুভমানস। ঘরে ফিরে এসেই বন্ধ করলেন জানলার কাঠের পাল্লা দুটো। ও ভয়ানক মূর্তি উনি আর দেখতে চান না। দুপুরের কথা আবার মনে পড়লো শুভমানসের। একতলার অফিস ঘরেতেই তাঁর দুপুরের খাবার এনে দিয়েছিল মুখুটি মশাই এর খাস চাকর মাঝবয়সি মনোহর মণ্ডল। খেতে খেতেই তিনি ভৈরবীর কথা জানতে চান মনোহরের কাছে। দু চোখ গোল গোল করে মনোহর বলেছিল,
—‘সে প্রায় দেড়শ বছর আগের কথা স্যার। এই জমিতে তখন ছিল মুখুটিদের একটা বাগান বাড়ি। শ্মশান ধারে বলে এমনি পড়েই থাকতো, যতদিন না সেই বংশের ছোট ছেলে, তারাশংকর এখানে নদী তীরের বাগানে একটা তন্ত্র সাধনার আখড়া খোলেন। অবশ্য মূল বাড়িটা তখন তারাশংকর একটা পান্থনিবাস হিসাবে খাতায় কলমে ব্যবহার করতেন। দেখাশোনা করতো এক বিধবা সাঁওতাল মহিলা। নাম ধর্মা। কিন্তু আদপে ওই মহিলা ছিল তারাশংকরের সেই গুপ্ত উপাসনার সহায়িকা, সঙ্গিনী— ধুমা। প্রায়শই এখানে যেসব অতিথিরা রাতে একা থাকতেন, তাঁদের আর পরদিন কোন খোঁজ মিলত না। ধর্মা অবশ্য জানাতো, অতিথি চলে গেছে। এমনকি তাদের লোটাকম্বলও আর পাওয়া যেতো না। কিন্তু ইংরেজ পুলিশ অফিসাররা গোপনে নজর রেখেছিলেন। তাঁরা জানতে পেরেছিলেন, ধর্মা রাতের খাবারে আরক মিশিয়ে ওই হতভাগ্য লোকগুলোকে অজ্ঞান করতো। তারপরে তারাবাবুর সাথে মিলে তাদের হত্যা করে সেই মৃতদেহ নিয়ে কিছু একটা গুপ্ত সাধনা চর্চা করতো আর রাত শেষ হবার আগেই সেই মৃতদেহ সমেত বাক্স প্যাটরা সব চলে যেতো দ্বারকা নদীর পাঁকে বা জলের তলায়।’
—‘এই নদীতে ?’ প্রশ্ন করেন শুভমানস।
—‘তখন এই নদী এ রকম ছিল না স্যার। অনেক চওড়া, অনেক গভীর। যাই হোক, এরকমই এক রাতে এখানে আশ্রয় নেন তারাপীঠ ফিরত এক তীর্থযাত্রি। তিনিও ছিলেন একা। যথারীতি তাকে আরক খাইয়ে অজ্ঞান করে যখন বলি দিতে যাওয়া হচ্ছিল, তখনই এই বাগান ঘিরে ফেলে পুলিশ। তারাবাবুর লেঠেলরাই নাকি প্রথমে পুলিশের ওপর চড়াও হয় আর তারপরে পুলিশ সাহেবের গুলিতে মৃত্যু হয় তারা কাপালিকের আর লাফিয়ে দ্বারকার জলে ডুবে মরে ওই ধর্মা ওরফে ধূমা। অবশ্য লোকে বলে, সেই তীর্থযাত্রি নাকি ছিল পুলিশেরই পাঠানো খোঁচর।’
—‘তারপর ?’
গলা নামিয়ে বললো মনোহর। —‘তারপর অনেক বছর এই জমি এমনিই পড়ে ছিল। আমাদের বাবুর বাবা এখানে লাইব্রেরি আর অতিথিশালা করেন। দিনমানে লোকে আসে, ছেলে পুলেরা বইও নেয়। কিন্তু সাঁঝের বেলা স্যার...’
—‘কি হয় ? বলো মনোহর।’
মনোহর চুপ করেই ছিল বেশ কিছুক্ষণ। তারপরে বলেছিল,
—‘সে সব অশৈলি কাণ্ড স্যার। ওই ধূমার নাকি এখনো রক্ততেষ্টা মেটেনি। সে যাক... কথা তো শুনলেন না, রাতে আপনি সাবধানে থাকবেন কিন্তু। আর-আরে এই দেখো। আপনি তো খাচ্ছেনই না স্যার। খান খান...’
হ্যারিকেনের পাশেই একটা টিফিন ক্যারিয়ার রাখা ছিল। খাবার কথা মনে পড়তে এতক্ষণে খেয়াল হল গুহ সাহেবের। সন্ধ্যার ঠিক আগেই মনোহর এসে ওই দুটো জিনিস দিয়ে যার। সাথে দুটো বড় জলভর্তি জাগ। যাই হোক, খাবার ভালোই দিয়েছে এক গোছা রুটি, আলুভাজা, কষা মাংস আর দুটো লাড্ডু ধরণের মিস্টি। আর দেরি না করে চিন্তিত মুখেই খেতে বসে গেলেন শুভমানস। সাধারন মানুষ হলে হয়তো এ অবস্থায় কোন আহারই গলা দিয়ে নামতো না, কিন্তু শুভমানস তাঁর সেনাজীবনে শিখেছেন, বিপদে কখনো পেট খালি রাখতে নেই। কথাটা মানেন তিনি, তাই হয়তো ফলও পেলেন। খেয়ে উঠে হাত ধুতে ধুতেই একটা অদ্ভুত চিন্তা মাথায় আসায়, একটানে চৌকিটা একটু সরিয়ে সেদিকের দেওয়ালে টর্চের কুঁদো দিয়ে হাল্কা হাল্কা আঘাত করতে থাকলেন শুভমানস। তখনই হঠাৎ আবার সেই বিকট গন্ধটা পেলেন গুহসাহেব। দপ দপ করতে লাগলো হ্যারিকেনের শিখা আর আবার সেই ঝম ঝম শব্দ বাজলো সামনের দেওয়ালের একটা বিশেষ অংশের বাইরের দিকে। সেখানে পৌঁছে গেলেন শুভমানস, কিছু একটা পরীক্ষা করেই মুহুর্তে আবার চৌকিটা যথাস্থানে টেনে ধপ করে বসে পড়লেন সেটার ওপর। গন্ধটা কমে গেলো, হ্যারিকেনের শিখাও হল স্বাভাবিক। একটা সিগারেট ধরাবেন ভাবছিলেন কিন্তু মাথাটা খানিকক্ষণ ধরেই কিরকম তালগোল পাকাচ্ছিল, আর পারলেন না। শুভমানস ধপাশ করে শুয়ে পড়লেন বিছানায়।
* * *
কখন যেন হ্যারিকেনটা একদম নিভে গেছে। ঘরটা নিকষকালো অন্ধকারে ঢাকা। মাথার দিকটায় প্রচন্ড ঠান্ডা আর বুকের ওপর একটা আমানবিক চাপ অনুভব করলেন গুহ সাহেব। তন্দ্রার ঘোরটা কাটতে আরো একটু সময় লাগলো। আর তারপরেই স্পষ্টত বুঝতে পারলেন তিনি, তাঁর বুকের ওপর একজন প্রচন্ড ভারি চেহারার মানুষ একদম চেপে বসে আছে। মুহূর্তে, ভয়ে আর ব্যাথায় ধড়মড়িয়ে উঠে বসতে গেলেন আর তখনই তাঁর কাঁধের ওপর ভয়াবহ তীক্ষ্ণ নখরের চেপে বসার বেদনায় ককিয়ে উঠলেন গুহ সাহেব। আর ঠিক তখনই খোলা দরজা দিয়ে আসা হাল্কা আলোয় মনে হল গুহ সাহেবের, তাঁর বুকের ওপর বসে আছে— একজন শাড়ি পরিহিতা মহিলা, যার হাত দুটি আন্দোলিত হলেই আওয়াজ আসছে, ঝম ঝম ঝম...
ভয়ে, প্রচন্ড চাপে আর উত্তেজনায় শ্বাস প্রায় বন্ধ হয়ে এলেও দীর্ঘ অভ্যাসের বলেই এক অদ্ভুত কৌশল পদ্ধতি ব্যবহার করে এক ঝটকায় উল্টে গিয়েই এক প্রকান্ড ঝাঁকুনিতে সেই বিভীষিকাকে নিজের ওপর থেকে ঝেড়ে ফেলে বালিশের পাশে হাত দিলেন গুহ। নাহ্ না আছে টর্চ, না রিভালভার। এদিকে, ঠিক তখনই অনুভব করলেন, আবার তাঁর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে চলেছে সেই বিশালদেহী মহিলা। জানেন গুহসাহেব, এ অবস্থায় একমাত্র আত্মরক্ষার উপায় হল দৌড়। তাই করলেন তিনি, একলাফে ছাদে এসেই ঊর্ধ্বশ্বাসে সিঁড়িতে নেমে এসেই কয়েকলাফে এসে পড়লেন বাইরের বাগানে।
ফটক অনেকটাই দূর। তাই সেদিকে না গিয়ে কাছের পাঁচিলের দিকে দৌড়লেন গুহ। পিছনেই পরিত্যক্ত শ্মশান পারের জঙ্গল। সেখানটাকেই আত্মরক্ষার ঠিক জায়গা মনে হল শুভমানসের। পলকে, বুক সমান পাঁচিল দুহাতে ধরেই দিলেন এক প্রকান্ড লাফ আর ঠিক সেই মুহূর্তে তাঁর পিঠের জ্যাকেট ও জামা ফালা করে দিয়ে পিঠের চামড়া ভেদ করে মাংসের ওপর বসে গেলো একাধিক পাশবিক নখের সুতীব্র আঘাত।
পালানো হল না গুহ সাহেবের, আছড়ে পড়লেন বাগানের শিশির ভেজা ঘাসের ওপর। কোনমতে দেখলেন, তাঁর ঠিক সামনেই একহাতে জ্বলন্ত মশাল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন এক রক্তাম্বর সন্যাসি আর ঠিক তাঁর পিছনেই, দেহ দুলিয়ে এক মারাত্মক জীঘাংসা মেশানো গলায় অট্টহাস্য করছে সেই ভৈরবী। তার হাতের দোলায় ঝম ঝম শব্দ তুলছে মোটা ধাতব বালাগুলো আর কি আশ্চর্য্য, তার কন্ঠ একদম পুরুষালি!
ক্লান্তি আর বেদনায় মাথা ঝুঁকে পড়লো গুহ সাহেবের। আর পারলেন না, জ্ঞান হারালেন। কিন্তু জ্ঞান হারানোর আগের মুহূর্তে একটাই কথা মনে হল তাঁর, সেই গন্ধটা বেরোচ্ছে না কেন!
কাদের হাড়হিম করা প্রাণপণ আর্তনাদ আর গুলির শব্দে যখন গুহসাহেবের তন্দ্রাচ্ছন্ন হলো, তখনও রাত শেষ হয়নি। তিনি বাগানেই পড়ে আছেন, কোনমতে উঠে বসলেন। পাশেই একটা জায়গায় নরম মাটিতে মশালটা পোঁতা থাকায়, চারিদিকে দেখতে কোন অসুবিধা হচ্ছে না। পিঠ আর ঘাড়ে অসম্ভব বেদনা অনুভব করলেন শুভমানস। তারপরে খেয়াল করলেন, বাগানে তিনি ছাড়াও আরো দুজন লোক একইভাবে পড়ে আছে। কারা, চিনলেন না শুভমানস, অনেকটা দূরে, ফটকের দিকে। তবে মনে হল দুজনেই পালিয়ে যেতে চেষ্টা করছিল।
পিঠে আর ঘাড়ে বিষ ব্যাথা উপেক্ষা করে উঠে দাঁড়িয়ে মশাল হাতে লোকগুলোকে পরীক্ষা করলেন গুহসাহেব। দুজনেই মধ্যবয়স্ক পুরুষ, বিরাট চেহারা। একজনের পরণে কাপালিকের রক্তাম্বর, মুখের দাড়ি গোঁফ জটাজুট দেখলেই বোঝা যায় নকল। অপরজন আরো ভয়ংকর, ভৈরবীর সাজে। এর হাতের পাশেই ছিল গুহ সাহেবের রিভালভার। প্রথমেই সেটা হস্তগত করলেন গুহ। আশ্চর্য্য, দুটো গুলি কম। যাই হোক, লহমায় নিজের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে ওদের পোষাক ছিঁড়েই ওদের হাত পা মুখ বেঁধে একটা ঝোপের মধ্যে কোনমতে টানতে টানতে টেনে হিঁচড়ে ফেলে দিলেন শুভমানস। লোকগুলো টসকেছে ভালোই, এতো টানাটানিতেও জ্ঞান ফিরল না।
এবার নদীর দিকে ঘাড় ঘোড়ালেন শুভমানস। সবটা দেখা যায় না। লাইব্রেরি ঘরটা আড়াল পড়ে। শরীরের ব্যাথা আর ক্লান্তি উপেক্ষা করেই মশালটা হাতে নিয়ে সেদিকে এগিয়ে চললেন শুভমানস। কারণ স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছেন তিনি, একজন মহিলার মিহি গলার চিৎকার করে কান্নার শব্দে মিশে যাচ্ছে হাতের বালার ঝম ঝম শব্দ।
* * *
ভোররাতে সুবীর বাবু যখন লাইব্রেরিতে পৌছান— একতলা, দোতলা ঘুরে কোথাও গুহ সাহেবকে খুঁজে না পেয়ে, শেষমেশ দ্বারকা নদীতীরে পিছনের বাগানে এসে তিনি দেখেন, একটা বহু পুরোনো ভেঙ্গে পড়া ঘরের সামনে তারই ভাঙ্গা দেওয়ালে ঠেস দিয়ে আচ্ছন্নের মতো বসে আছেন শুভমানস।
সুবীর বাবুর বারকয়েকের ডাকেই চোখ মেলেন শুভমানস। হাতে একটা বহু পুরোনো ছেঁড়া বই, দুচোখে কেমন ঘোরলাগা বিস্ময়। কোনমতে সুবীর বাবুর সাহায্যে উঠে দাঁড়িয়ে বলেন,
—‘একটু সাহায্য চাই সাহেব।’
—‘বলুন না স্যার।’
—‘অপারেশান সাকসেসফুল। কিন্তু আমি ক্লান্ত, আহত ও বটে। আমি ওপরে যাচ্ছি, একটু বিশ্রাম নেব। আপনি একজন ডাক্তারকে পাঠান আর নিজে সদলবলে এখনই মুখুটিকে গ্রেপ্তার করুন যত শীঘ্র সম্ভব। সামনের বাগানে ঝোপের মধ্যে দেখুন দুটো লোক পড়ে আছে, ওদেরও। ওরা কিন্তু আপনার ভাইটাল এক্সিবিট। আমাদের সন্দেহ একদম ঠিক ছিল, এই বাড়িই ওর মাদক ব্যবসার কেন্দ্র। সুতরাং দেরি করবেন না। আর সদর থেকে আরো ফোর্স আনান, দরকার হবে। যান, কুইক। আটটা নাগাদ আসুন তারপর এখানে, তখন সব বলবো। আর হ্যাঁ, এখানে কমকরে চারজন সশস্ত্র পুলিশকে রেখে যান।’
—‘ও কে স্যার।’ সুবীরবাবু পিছন ফিরে ছুটে অন্ধকারে মিলিয়ে গেলেন। গুহ দেখলেন, তার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে দীপঙ্কর।
—‘দীপু...’ নিশ্চিন্ত গলায় হাত বাড়ালেন গুহ সাহেব।
আঘাত আর ক্লান্তিতে টলোমলো করতে থাকা গুহ সাহেবকে কোনমতে ধরে দোতলার দিকে নিয়ে যেতে যেতে বললো দীপু,
—‘আমি এসে গেছি স্যার।’
পরম মমতায় দীপুর কাঁধে একটা হাত রেখে নিজের রিভালভারটা ওর হাতে দিয়ে বললেন শুভমানস, —‘এটা রাখ। নজর রাখবি, আমি যতক্ষণ বিশ্রাম নেবো, একমাত্র সুবীরবাবুর পাঠানো ডাক্তার ছাড়া আর কেউ যেন না আসে। বড্ড ক্লান্ত লাগছে রে ভাই...’
দোতলার ঘরের বিছানায় সাহেবকে শুইয়ে দিয়ে বন্দুকটা হাতে নিয়ে ছাতে এসে দাঁড়ালো দীপঙ্কর। এবার প্রতীক্ষা ডাক্তারের।
সকাল আটটা পনেরো। লাইব্রেরির দোতলার রেস্টরুমে তখন চাঁদের হাট। নিচের থেকে আনা চেয়ার, বেঞ্চ, এঘরের চৌকি সব ভর্তি। শুধু পুলিশের দল নয়, জেলা প্রশাসনের অনেক কর্তাব্যক্তিও আছেন। তাঁদেরই একজন, রাগত ভঙ্গিতে বললেন,
—‘শুনলাম আপনি ঠিক ভোরের আগে এখানে পৌছেছেন। তার মধ্যে মিস্টার গুহ খুনও হয়ে যেতে পারতেন সুবীর বাবু। এনি এক্সপ্ল্যানেসান ফর দ্য ডিলে ?’
মুখুটিকে একটা চেয়ারে বসিয়ে পিছনে দাঁড়িয়ে ছিলেন সুবীর বাবু, —‘এটা কমিউনিকেসান গ্যাপ স্যার। পরশু রাতে মুখুটি বাবুর এখানে আসার খবর সিউড়িতে বসে পেয়ে তড়িঘড়ি এখানে আসার সিদ্ধান্ত নেন গুহ সাহেব। আমাকে ফোন করেন থানায়, কিন্তু ততক্ষণে একটা কোর্ট কেসে হাজিরা দিতে আমি কলকাতা রওয়ানা হয়ে গেছি। আপনাদেরই নির্দেশ ছিল, তাই এই মিশন সিক্রেট আমি আমার এস আই এর সাথে ও শেয়ার করিনি। আমার ফিরতে ফিরতেই গতকাল রাত দশটা বেজে যায়। থানায় ঢুকেই দেখি, গুহ সাহেবের অত্যন্ত বিশ্বস্ত এই দীপঙ্কর ছেলেটি সারাদিন একভাবে আমার প্রতীক্ষায় বসে আছে। সাহেবের মেসেজ পেয়েই যত দ্রুত সম্ভব সব ব্যবস্থা করে আমি এখানে আসি। তাই...’
—‘ঠিক আছে সাহেব।’ সবাইকে আশ্বস্ত করে বললেন শুভমানস, —‘আমি ঠিক আছি, আর সুবীরবাবু হয়তো আগে এলে একটা সমস্যার সমাধান অধরাই থেকে যেতো। একটু থেমে শুরু করলেন শুভমানস, —‘আমি এখানে এসেই খাতাপত্র চেক করতে গিয়ে, এই লাইব্রেরির ম্যানেজমেন্ট কমিটিতে এমন দুজনের নাম দেখতে পাই, যাদের নাম মাদক চালান সংক্রান্ত গোপন রিপোর্টে মুখ্য সন্দেহভাজন রূপে আমরা আগেই পেয়েছি। তখনই আমার সন্দেহ দানা বাঁধে। এরপর, রাত প্রায় সাড়ে দশটায় প্রথমবার ওই জাল ভৈরবীর আবির্ভাব হয়। আমাকে ভয় দেখাতে, আঙ্গুলের ওপর ক্যাপের মত চাপানো বাঘনখের মত লোহার অস্ত্র দিয়ে কাঁচের জানলায় আঁচড় কেটে তিনি তখনকার মত বিদায় হন। এরপর আবার এলেও আমি জানি না। কারণ, জানলার কাঠের পাল্লাটা আমি ভিতর থেকে এঁটে দিয়েছিলাম।’
একটু থেমে আবার শুরু করলেন গুহসাহেব... ‘আমায় ভয় দেখানো পর্যন্ত ঠিক ছিলো, কিন্তু, খাবারে মাদক মেশানোর মত একটা জঘন্য কাজ করা হবে, এ আমি স্বপ্নেও ভাবিনি। তাই সাদা মনেই রাতের খাবার খাই। আর তার পরেই মাথা হাল্কা হয়ে আসে, চোখের দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে যায়। আর সেই সুযোগে...’
হাতে একটা পাতলা স্টিলের স্কেল নিয়ে ঘরের বাইরে গেলেন শুভমানস। সেখান থেকেই বললেন, —‘সবাই মন দিয়ে দেখুন স্যার। ভিতর থেকে খিলটা তুলে দে দীপু।’
মুহূর্তেই স্কেলের চাড়ে, একদম নিঃশব্দেই বাইরে থেকে খিলটা খুলে আবার ঘরে ঢুকে শুভমানস বললেন, —‘এভাবেই কাল মাঝরাতে এঘরে ভৈরবীর প্রবেশ, আমার বন্দুক-টর্চ গায়েব করা, আমার বুকে চেপে ভয় দেখানো আর তাতেও আমাকে বশ করতে না পেরে নিচের বাগানে জাল কাপালিকের বাঘনখের আঘাত।’ গায়ের চাদর সরিয়ে পিঠর ক্ষতগুলি সবাইকে দেখিয়ে গতরাতে বাগানে আঘাতের ঘটনা বিবৃত করলেন গুহসাহেব।
—‘সৌজন্যে মুখুটিবাবুর চোরাচালানের দুই কেষ্টবিষ্টু আদিল শেখ আর জয়চাঁদ বেড়া। ওরফে ভৈরবী আর কাপালিক। গম্ভীর গলায় বললেন সুবীর। দুজনেই অন স্পট রেড হ্যান্ডেড ওই ভৈরবী-কাপালিকের পোষাকেই, হাতে লোহার বাঘনখ সমেত। থানায় মেজোবাবুর জিম্মায় রেখে এসেছি। প্রচণ্ড কোন শকে জ্ঞান হারিয়েছিল। এখনো ঘুমোচ্ছে দেখে এসেছি। উঠলেই কনফেশান আদায় করবো। কিছু বলবেন, মুখুটি মশাই ?’
তীর্যক কণ্ঠে বললেন সুবীরবাবু।
* * *
‘বলব মানে’ সেই অমায়িক মধুক্ষরা গলা মানদা মুখুটির, ‘ক্ষমা চাইব। আসলে গুহস্যার গতকাল দুপুরে আমাদের তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে সাহসের বড়াই করে এখানে থাকতে চান। এমনকি আমাদের কুসংস্কারাচ্ছন্ন ইত্যাদিও বলেন। তাতেই ছেলেপুলেদের মাথা একটু গরম হয়ে যায়। ওরাও পাল্টা ঠিক করে, ওনাকে গভীর রাতে ভয় দেখানোর। হ্যাঁ, জয়চাঁদ আর আদিল দুজনেই এই গ্রামের ছেলে, এমনকি লাইব্রেরিরও পরিচালন কমিটিতে আছে। অবশ্য, সাহেবকে আঘাত করা ওদের উচিত হয়নি মোটেই।’ একরাশ নোংরা দাঁত সজিয়ে বললেন মুখুটি। ‘তার জন্য ওদের যা শাস্তি হয় সে নয় দেবেন আপনারা। কিন্তু পুলিশ সাহেব, বারবার ওই মাদকের চোরাচালান কেন বলছেন...’
কথা শেষ করতে দিলেন না শুভমানস।
—‘দরজার খিল চাগাড় দিয়ে খুলে আপনার শাগরেদরা এখানে এসে আমাকে জ্ঞানশূণ্য দেখে ভাবে আপনার গোপন চেম্বারের ঠিকানা আমার অধরাই থেকে গেছে। আর এই মস্ত ভুলের কারণেই তারা মালগুলো সরিয়ে না ফেলে আমাকে উত্যক্ত করতে শুরু করে। নিচের বাগানে আমাকে আহত করে ভৈরবীর কাহিনী প্রতিষ্ঠিত করতে যায়। এখানেই আপনি ফেঁসে গেছেন মুখুটিবাবু। আমাকে অজ্ঞান পড়ে থাকতে দিয়ে তখন যদি ওরা এটা ফাঁকা করতো, আপনাকে ধরবার আমার কোন উপায় থাকতো না। তাই না ?’
কথা বলতে বলতেই একলাফে চৌকিতে উঠে পাশের দেওয়ালে একটা বিশেষ অংশে চাপ দিলেন শুভমানস। সাথে সাথে খুলে গেলো একটা দেওয়ালের রঙে রঙ মেলানো চারফুট বাই দু ফুট মত কাঠের লুকোনো চেম্বার। তাতে দূর থেকেই দেখা যাচ্ছে মিল্কপাউডারের মত সাদা গুঁড়ো ঠাসা কয়েক হাজার ছোট ছোট প্যাকেট।
—‘ব্রেভো,’ চিৎকার করে উঠলেন ডেপুটি পুলিশ সুপার সাহেব। ‘মুখুটিবাবুকে এক্ষুণি কাস্টডিতে নাও সুবীর আর ফটোগ্রাফারকে ডাকো...’
—‘এক মিনিট স্যার।’ থমথমে গলা শুভমানসের। ‘এখানে আর একটা অজ্ঞাত বিষয় আছে, প্রায় দেড়শ বছর আগের। একটু শুনে যান।’
একটু আগে ভৈরবীর উপাখ্যানের সূত্র ধরেই বললেন শুভমানস, ‘তারাশংকর বা ধর্মা, কেউই কিন্তু কাপালিক ছিলেন না। খুব সাধারন ভাবেই তাঁরা পূজা পাঠ করতেন। কিন্তু জনজাতির রমণী ধর্মার আর একটা খুব করুণ ইতিহাস ছিল। সে সময়ের কিছু আগেই হওয়া সাঁওতাল বিদ্রোহে ব্রিটিশের গুলিতে প্রাণ দেয় তাঁর স্বামী আর একমাত্র ছেলে। পায়ে গুলি লাগলেও কোনভাবে ধর্মা পালিয়ে আসেন সাঁওতাল পরগনা হয়ে পুরুলিয়ার পথ ধরে। এসে ওঠেন এখানে। আশ্রয় পান পিতৃতুল্য তারাশংকরের কাছে। শেখেন শাক্ত মতে সাধন-ভজন উপাসনা পদ্ধতি। সাথে সাথে চলতে থাকে অতিথিদের সেবা।
তখন, পুলিশের প্রচণ্ড নিপীড়নে সাঁওতাল বিদ্রোহের আগুন প্রশমিত হলেও এদিক ওদিক খণ্ডযুদ্ধ লেগেই থাকতো জনজাতির মানুষ বনাম ব্রিটিশ পুলিশদের। ব্রিটিশ পুলিশ কমিশনার সন্ডার্সের সন্দেহ ছিল, সেসব জনজাতির মানুষরা এই অতিথিশালায় গোপন আশ্রয় নেন। তাই মাঝে মাঝেই তিনিও পুলিশের খোঁচর পাঠাতে থাকেন এখানে, কখনও বা ব্যবসায়ি, কখনো বা তারাপীঠ ফিরত তীর্থযাত্রি রূপে। কিন্তু, সমস্যা হলো কারা সাধারণ যাত্রি আর কারা পুলিশের লোক, অসাধারণ বুদ্ধিমতি ধর্মার কাছে তা গোপন থাকতো না। আর তখনই তাঁর স্বামী আর পুত্রশোক তাঁকে এক হত্যাকারিতে পরিণত করতো। তিনি ভেষজ মিশিয়ে সেইসব খোঁচরগুলোকে অজ্ঞান করে নদীতীরে হত্যা করে সত্যিই তাদের লাশ ও লোটাকম্বল গায়েব করে দিতেন আর এ রকমই একরাতে এখানে সদলবলে রেইড করেন সন্ডার্স। কন্যাসমা ধূমাকে বাঁচাতে নিজের লেঠেল বাহিনী নিয়ে পুলিশের ওপর চড়াও হন তারাশঙ্কর। তাঁকেই গুলি করে বসে সন্ডার্স আর নদীতে ঝাঁপ দিয়ে পালাতে গিয়ে পচা দলদলে পাঁক আর চোরা কাদায় ডুবে মরেন ধূমা।
নানাপ্রকার জনহিতকর কাজে তারাশঙ্করের সুনাম থাকলেও এই বাড়িতে তাঁর আর ধূমার গোপন পূজাপাঠ নিয়ে এ গ্রামে কানাঘুষোও কম হত না। সেটাই ক্যাপটিভেট করেন চতুর সন্ডার্স আর এমন একটা সত্যি-মিথ্যা মিলে এমন একটা মিথ তৈরি করেন যাতে তারাশঙ্করকে হত্যার জন্য তাঁর বিরুদ্ধে জনরোষ প্রকট না হয়ে ওঠে।’
একটু থেমে নিজের ব্যাগ থেকে অতি সাবধানে একটা বহু পুরোনো নোটবুক ডেপুটি সুপার সাহেবের হাতে তুলে দিলেন শুভমানস বাবু। বললেন, —‘স্যার, এই নোটবুকের লেখক স্বয়ং সন্ডার্স। এটা এটা ওনার রোজনামচার খাতা। এখানে পুরো ষড়যন্ত্রটাই লেখা আছে। এ বাড়ির পিছনে তারা বাবুর ভেঙ্গে পড়া সাধন পীঠ খুঁজলে হয়তো আরো অনেক প্রমাণ মিলতে পারে। আমি এটা ওখানেই পেয়েছি, জেসপ স্যান্ডার্সের নামাঙ্কিত একটা বাক্সে। অবশ্য, এটা ওখানে কীকরে এলো আর এই দেড়শ বছরের মধ্যে কবেই বা এলো, আমি জানি না সাহেব। তবে, যা ইনপুট পেয়েছি, পাশের গ্রাম কদমপুকুরে স্যান্ডার্সের ভেঙ্গে পড়া বাংলো বছর কয়েক আগেই কিনেছেন আমাদের মহান মুখুটিবাবু। বোধকরি ওখানেই এই বাক্স সমেত ডায়রি পান এবং সেটা ওই ছাইগাদায় পুঁতে ফেলেন যাতে এ বাড়ির ভয়ের আর ধূমার রক্ততৃষ্ণার বাতাবরণটা বজায় রেখে এখানে শান্তিতে মাদকদ্রব্যের ব্যবসা চালানো যায়। তবে কেনো ওটা নষ্ট করে ফেলেন নি, উনিই জানেন।’
—‘নষ্ট করতেই চেয়েছিলাম।’ এবার মরিয়া গলা মুখুটির। ‘সেজন্যই নিরিবিলিতে লাইব্রেরি ঘরে রেখেছিলাম। তারপর, হঠাৎ এক রাতে দেখি সেটা নিখোঁজ। বাকিটা আমি জানি না স্যার, মাইরি বলছি।’
—‘স্যালুট আপনাকে গুহসাহেব। ধন্য আপনার মেধা আর সাহস।’ একসাথে উঠে দাঁড়ালেন সবকজন পুলিশ আধিকারিক।
* * *
—‘খানিকটা বুঝিস নি। তাই না ? আপনি ও তো তাই।’
একসাথে ঘাড় নাড়লেন সুবীরবাবু আর দীপঙ্কর। এখন বেলা সাড়ে বারোটা। অন্তত একটা দিন ডাক্তারবাবু শুভমানসকে রেস্ট নিতে বলেছেন। তাই আর তাঁকে দীর্ঘ যাত্রা করে সিউড়ি ফিরতে দেননি সুবীরবাবু। নিয়ে এসেছেন সদরে নিজের বিশাল কোয়ার্টারে। সেখানকার গেস্টরুমে পাশ ফিরে শুয়ে শুয়েই বলেন গুহসাহেব,
—‘শুনুন তাহলে। পুরোটাই আনঅফিসিয়ালি কিন্তু সাহেব।’
সুবীরবাবু ঘাড় নাড়তেই শুরু করলেন শুভমানস,
—‘আসল ধর্মা সত্যিই এসেছিলেন। প্রথমবার রাত দশটা নাগাদ। অবশ্য আমায় হত্যা করতে নয়, বরং এই পাপচক্র ভাঙ্গতে সাহায্য করতে। উনি তিনটে সঙ্কেত দেন, যেগুলো আমি পরে বুঝতে পারি।’
—‘এক, তাঁর তীব্র শক্তির প্রভাবে হ্যারিকেনের দপ্ দপ্ করা বা নিভে যাওয়া আর তাঁর অ-মৃতা শরীর থেকে ভেসে আসা পাঁক ধুনো চন্দনের গন্ধ।’
—‘দুই, তিনি জানলায় এসে লোহার গারদে বালা ঠুকে আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করে পিছন ফিরে ছাদের পথে চলে গেলেন। আধঘন্টা পরে এসে ভেরবী বেশধারি আদিলও তাই করলো বটে, কিন্তু আগের সেই অভিজ্ঞতার ফলে আমি বুঝে গেছিলাম সে একদমই আলাদা লোক। যতই ভৈরবী সাজুক, তার প্রভাবে বাতিও নেভে নি। গন্ধও বেরোয়নি আর, জানলায় বাঘনখের দাগ টেনে সে যখন পিছন ফিরে চলে গেলো, তখনই বুঝলাম ওর হাঁটার ভঙ্গি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক। পায়ে ব্রিটিশের গুলি লাগার ফলে, ধর্মা কিন্তু ভালোমতোই খুঁড়িয়ে চলতেন।’
হাঁ করে শুভমানসের গল্প শুনছিলেন সুবীরবাবু আর দীপঙ্কর। তবে, আবার শুরু করলেন গুহসাহেব,
—‘সবথেকে আশ্চর্য্য হল ওনার তৃতীয় সূত্র। সেটা হল একই দেওয়ালের একই নির্দিষ্ট স্থানে ওনার বারবার আঘাত। আর তারই উল্টোদিকে মানে ভিতরের দিকে আমি টর্চের আঘাত করতেই পাই মুখুটির লুকোনো চেম্বারের হদিশ।’
—‘কিভাবে ?’ প্রশ্ন দীপুর।
—‘আরে, যতই রঙে রঙ মেলাক, ইটের আর কাঠের আওয়াজে তফাত হবে না ?’
দীপু বেশ বুঝতে পারছিল যে একটানা কথা বলতে সাহেবের ভালোই কষ্ট হচ্ছে। কিন্তু সুবীরবাবুর মনে তখনো প্রশ্ন বাকি ছিল। তাই তিনি বললেন, —‘আচ্ছা স্যার, ওই স্যান্ডার্স সাহেবের বাক্স কিভাবে পেলেন বললেন না তো ?’
—‘শেষরাতে জ্ঞান ফিরে আসার পর ওই শয়তান দুটোকে বেঁধেছি সবে, স্পষ্ট শুনলাম নদীতীরে এক মহিলার কান্না আর বালার ঝম ঝম শব্দ। সেই শুনে ওই ভাঙ্গা ঘরে গিয়ে মশালের আলোয় দেখি ছাই এর গাদা থেকে উকি মারছে এই বাক্সের একটা কোনা। মনে হল, কেউ সদ্যই এটা খুঁড়ে বের করেছে। আর সেই বাক্সের ওপর রাখা ছিল...’ পকেট থেকে দুটো বহু পুরোনো লোহার বালা বের করে বললেন চিরনাস্তিক গুহ সাহেব, —‘এদুটো পেয়েই বুঝলাম ধর্মার কাজ শেষ। কোনদিনই এই লাইব্রেরিতে তাঁকে আর দেখা যাবে না।’ কপালে বালা দুটো ঠেকিয়ে বললেন গুহসাহেব, —‘শান্তি পাও মা, আর অ-মৃতা নয়, তুমি ভালো থাকো অমৃতলোকে।’
এবং বৃত্তের বাইরে, এপ্রিল ২০২৫

No comments:
Post a Comment