বিষয়ী ওয়াচ সেন্টার — অনিন্দ্য পাল — ভূতের গল্প — এবং বৃত্তের বাইরে

Bishoye Watch Center

বিষয়ী ওয়াচ সেন্টার

অনিন্দ্য পাল


 ‘‘মেরে পিয়া, আব আজারে মেরে পিয়া...’’

ফোনটা বেজে উঠল। উত্তরের সামনে তখন অন্তত কুড়ি জনের লাইন। তিনটে বেজে গেছে। ঘন্টা খানেক লিঙ্ক ছিল না। ফলে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা কাস্টমারদের মুখ দেখলে মনে হচ্ছে সেগুলো সদ্য বিরক্তির পুকুর জলে ডুবিয়ে আনা হয়েছে। কেউ কেউ মাঝে মধ্যে হঠাৎ আওয়াজ দিচ্ছে। ‘হাত চালান, আমরা কি সারাদিন দাঁড়িয়ে থাকব?’

এমনিতেই মেজাজ খিঁচড়ে খিচুড়ি হয়ে আছে, তার উপর এই ফোন! থাক ধরবো না। প্যান্টের পকেটে ফোনটা বেজেই গেল। একবার পুরো রিং হয়ে বন্ধ হয়ে গেল। স্বস্তি পেল উত্তর, স্বস্তিকা নয়। তাহলে সঙ্গে সঙ্গেই আবার করত। যতক্ষণ পর্যন্ত না রিসিভ করবে ততক্ষণ কল করেই যাবে। এটাই ওর বৈশিষ্ট্য। আবার কাজে মন দিল উত্তর। 

ঠিক এক মিনিট পর। আবার। আবার বেজে উঠল ফোনটা। ধন্দে পড়ে গেল উত্তর। স্বস্তিকা তো এরকম করে না। কাউন্টারে দাঁড়িয়ে থাকা কাস্টমারের ক্যাশটা ছেড়ে দিয়ে বের করলো ফোনটা। অজানা নম্বর থেকে টু মিসড কল! ফোনটা আবার পকেটে রাখতে যাবে ঠিক তখনি আবার! ডান হাতে পরের কাস্টমারের চেকটা নিয়ে বাম হাতে ফোনটা রিসিভ করে কানে দিল, বেশ বিরক্তির সঙ্গে বলল 

‘‘হ্যালো! কে বলছেন?’’

—বি. ডব্লু. সি ! 

—মানে? ইয়ার্কি করছেন? কাজের সময় আপনার হেঁয়ালি শুনব? 

—কেন, কী হেঁয়ালি করেছি? ওপাশ থেকে একদম শান্ত স্বরে প্রশ্ন এল। 

কাস্টমারদের সামনে মাথা গরম করা যাবে না। উত্তর কোনরকমে রাগটা সামলে নরম সুরে বলল, 

—দয়া করে বলবেন আপনি কে? আর কেনই বা বারবার ফোন করছেন? 

—আপনার ঘড়িটা নেবেন না? আমি বিষয়ী ওয়াচ সেন্টার থেকে বলছি। ছ-মাস হয়ে গেল, পড়ে আছে ঘড়িটা। 

এবার উত্তর লজ্জায় পড়ে গেল। সেটা তার চোখে মুখে ফুটে উঠলেও স্মার্টফোনের ওপাশের ব্যক্তি তা দেখতে পেল না। বুঝতে পারল কি না তাও বোঝা গেল না। 

—ওহ্! সরি সরি! ঠিক আছে আমি আপনাকে ব্যাক করছি। সঙ্গে সঙ্গেই ফোনটা কেটে গেল। উত্তর নিজের মনেই বিড় বিড় করছিল আর মাথাটা দুদিকে দোলাচ্ছিল। ঘড়িটা ডালিয়া দিয়েছিল, বার্থডে গিফট। খুব পছন্দ হয়েছিল উত্তরের। পরদিন ওটা পরে গেছিল স্বস্তিকার সঙ্গে দেখা করতে। নিজের বান্ধবী হলেও স্বস্তিকার সেটা সহ্য হল না। জন্মদিনের আগের দিন পাওয়া গিফট, জন্মদিনেই আছাড় খেয়ে ধুঁকতে লাগল। তখন পোস্টিং ছিল চাম্পাহাটি। ব্যাঙ্কের কাছেই দোকানটা। “বিষয়ী ওয়াচ সেন্টার”-এ দিয়েছিল সারাতে। স্বস্তিকা জানত ফেলে দিয়েছে। কয়েকদিন সময় লাগবে বলেছিলেন। সপ্তাহ খানেক পর উত্তর গেছিল একদিন, কিন্তু তখনও সেটা ঠিক হয়নি। এরমধ্যেই তার ব্রাঞ্চ চেঞ্জ হয়ে গেল, বাড়ির কাছাকাছি। বনগ্রাম। তবে সত্যি কথা বলতে কি, ঘড়িটার কথা একরকম ভুলেই গেছিল সে। এখন আবার ওটাকে আনতে যাওয়া বেশ ঝক্কির হল। 

সামনের কাস্টমার একটা ফর্ম ফিলাপ করছিল, সেই সুযোগে নম্বরটাতে ঘুরিয়ে আবার ডায়াল করল। একবার রিং হল, কেউ ধরল না। কয়েক মিনিট পরে কাস্টমার ভদ্রলোকের চেকটা ভেরিফাই করে ছাড়ছিল, তখনি বেজে উঠল আবার। ঘাড় আর কানের মধ্যে স্মার্টফোনটাকে স্যান্ডউইচ করে কানে ধরে টাকাটা মেশিনে গুনতে দিল। ওপাশ থেকে শব্দ এলো, 

—কি বলছেন? 

উত্তর সামনের ভদ্রলোককে বলল, —“এক মিনিট” 

—‘‘আচ্ছা, তাহলে এক মিনিট পরেই করুন। ওপাশ থেকে ভেসে এল কথাটা।’’ 

—‘‘আরে না না, আপনাকে বলিনি। ওনাকে বলেছি।’’

সামনের কাস্টমার ভদ্রলোক এবার বললেন,— ‘‘ও আমাকে বলেননি! আরে ঠিক আছে। ঠিক আছে! ক্যাশটা দিন, আমি গুনে নিচ্ছি।’’

—‘‘আরে না না। আপনি একমিনিট দাঁড়ান না! আমি একটু কথাটা বলে নিই!’’

ব্যাপারটা আরও বেশি করে জড়িয়ে যাওয়ার আগেই একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটে গেল। একজন কাস্টমার রে রে করে চেঁচিয়ে উঠে লাইন ভেঙে তেড়ে আসছিল, ঠিক তখনি লাইনের ভিতর থেকে কেউ একটা পা বের করে কিছু করতে গেল। সেই পায়ে আটকে কাস্টমার একেবারে সটান মেঝেতে ধপাস! এই দৃশ্য দেখে কেউ হাসতে শুরু করল, কেউ আবার ছুটে এসে পড়ে থাকা মানুষটাকে তুলে বসিয়ে মুখে জল দিতে লাগল। এই তালগোলে উত্তর দেখল তার সামনের লাইনটা বিলকুল ফাঁকা হয়ে গেছে। সেই সুযোগে আবার ডায়াল করল নম্বরটাতে। 

অনেকটা রিং হবার পর ওপাশ থেকে রিসিভ করলো, কিন্তু এবার অন্য কেউ। 

—‘‘হ্যালো! কে বলছেন? এক মহিলার চিকন গলা ভেসে এল।’’

—‘‘বি ডব্লু সি…’’

উত্তরকে পুরো কথাটা বলতেই দিল না চিকন গলা।

—‘‘বি ডব্লু সি? সেটা আবার কি?’’

—‘‘মানে এটা বিষয়ী ওয়াচ সেন্টার তো! ওনাকে একটু দিন না!”

—‘‘রং নাম্বার, রাখুন!”

উত্তর কিছু বলার আগেই ফোনটা কেটে গেল। ঠিক তখনি আবার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা কাস্টমারদের লাইনে গুঞ্জন শুরু হল। কেউ একজন চেঁচিয়ে উঠলো,

—“কি দাদা বৌদির সঙ্গে কথা শেষ হলে এবার আমাদের দিকে একটু দেখুন! আমরা কি দেখতে খারাপ?”

এই কথায় একটা হাসির রোল উঠল লাইন জুড়ে। 

উত্তর আবার কাজের মধ্যে মুখ গুঁজে দিল। কম্পিউটারের স্ক্রিনটা যেন মুচকি হেসে তাকিয়ে থাকল তার দিকে। 

* * *

থার্ড স্যাটারডে, তাই আজ সুযোগ পেয়ে উঠে বসল ট্রেনে। ঘন্টা দুয়েক লাগল শিয়ালদা পৌঁছতে। তারপর ক্যানিং ট্রেনে চেপে, চম্পাহাটি স্টেশনে নামল যখন ছটা বাজতে যায়। নভেম্বরের মাঝামাঝি, তাই সন্ধ্যা নেমে এসেছে তাড়াতাড়ি। বাতাসে ঠান্ডার ছোঁয়া। উত্তর মোবাইলটাতে বিষয়ীবাবুর নম্বরটা ডায়াল করতে করতে দু-নম্বর প্লাটফর্ম থেকে নেমে লাইন পেরিয়ে একনম্বর ক্রস করে এল। ভিতরের সর্টকাট রাস্তা দিয়ে স্টেশন থেকে মিনিট পাঁচেক লাগবে হেঁটে যেতে, তাই রিকশ নিল না। যখন এখানকার ব্রাঞ্চে ছিল, তখন রাজুদার রিকশটাই ছিল রোজকার যান। আজ রাজুদাকে দেখতে পেল না। এদিকে ফোনটা বেজে গেলেও রিসিভ করলো না কেউ। 

উত্তর হাঁটতে হাঁটতে বটতলার মোড় পর্যন্ত এল। মোড়ের মাথায় চায়ের দোকানটাতে একটু দাঁড়াল। ইচ্ছা হল একটা চা খায়। কিন্তু হঠাৎ গা টা কেমন যেন গুলিয়ে উঠল। এই দোকানটাতে আগেও অনেকবার চা খেয়েছে কিন্তু এরকম কখনো হয় নি। আরও অবাক হল, দোকানদার তাকে দেখেও যেন না দেখার ভান করল। চিনতেই পারলো না! কষ্ট হল উত্তরের। কত গল্প করেছে এই দোকানের সামনের বেঞ্চে বসে। চোখের থেকে দূরে গেলে মনের থেকেও দূর হয়ে যায়, কথাটা ঠিকই। আবার হাঁটা শুরু করল। তাড়াতাড়ি কাজটা সেরে বাড়ি ফিরতে হবে। আটটা চোদ্দর বনগাঁ লোকালটা ধরতেই হবে শিয়ালদা থেকে। না হলে সাইকেলটা আজ আর নেওয়া যাবে না। দোকান বন্ধ করে দেবে। স্বস্তিকাও জ্বালাবে। উত্তর মাঝে মাঝে ভাবে বিয়ের পর কি হবে? রুটিনের বাইরে একটা পাও ফেলতে পারবে না বোধ হয়। ট্রেন থেকে নেমে ইস্তক নেটওয়ার্ক গন্ডগোল করছে তাই, না হলে এতক্ষনে বার কয়েক এনকোয়ারি কমিশনের জবাব দিতে হত। মনে মনে ফোনটাকে ধন্যবাদ দেয় উত্তর।

মোড়ের মাথায় পৌঁছে হতবাক হয়ে গেল উত্তর! একি! ঘড়ির দোকানটাই তো নেই! সেখানে সব ভেঙেচুরে এখন কিছু কনস্ট্রাকশন হচ্ছে। পাশাপাশি অন্য দোকান গুলোর কয়েকটা এদিক ওদিক পলিথিন দিয়ে ঘিরে একটা ঘুপচি মত করে আছে। বাসুকিদার মিষ্টির দোকানটাও নেই! হতভম্ব হয়ে কয়েক মুহূর্ত সেখানে দাঁড়িয়ে থেকে একটু এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখল। কাউকে জিজ্ঞেস করবে? মোড়ের মুখের কাছে একটা পান বিড়ির দোকান, দোকানটা আগে ছিল না। নতুন হয়েছে। উত্তর জিজ্ঞাসা করল, 

—“ভাই, ওই যে ঘড়ির দোকানটা ছিল, কিছু জানো?”

ছেলেটা একমনে একটা পানের উপর চুন ঘসছিল। এই প্রশ্ন শুনে একবার ফিরেও দেখল না। বার কয়েক জিজ্ঞেস করার পর কোনও উত্তর না পেয়ে মাথাটা গরম হয়ে গেল উত্তরের। মনে হল রাস্তার পাশে পড়ে থাকা একটা আধলা তুলে মারে দোকানদারটাকে। এইসব ভেবে মনে মনে গালিগালাজ করছে তখনি হঠাৎ লোডশেডিং! চারদিক অন্ধকার হয়ে গেল। পানের দোকানের ছেলেটা মোবাইলের টর্চটা জ্বেলে সেই একই কাজ করতে লাগল। কি করবে, কাকে জিজ্ঞাসা করবে ভাবছে, ঠিক সেই সময় পিছন থেকে একটা পরিচিত গলা। 

—‘‘আরে! দাদা আপনি! অনেকদিন পর! আসুন, আসুন!”

—‘‘ও, রাজু। দেখোতো কি মুশকিলে পড়েছি...!

উত্তরের কথাটা শেষ করতে না দিয়েই রাজু বলল, 

—“উঠে আসুন, আমি জানি আপনি কোথায় যাবেন! আমিও ওদিকেই যাব।”

হাতে যেন চাঁদ পেল উত্তর। পিছন ফিরে এক লাফে উঠে বসল রাজুর রিকশয়। রাজু যেন ঝড়ের গতিতে চালাতে লাগল রিকশটা। রাস্তায় তেমন লোকজন নেই। এত অন্ধকার যে উত্তর রাজুর মুখটাও দেখতে পাচ্ছিল না। এ দিকে লোডশেডিং একবার হলে ঘন্টাখানেক তো বটেই কখনো তার চেয়েও বেশি সময় বিদ্যুৎ আসে না। হঠাৎ একটা ভাবনা উত্তরের মাথায় ঝিলিক দিয়ে গেল। এই অন্ধকারে সে যেখানে রাজুকে দেখতে পাচ্ছে না, রাজু তাকে চিনল কি করে? কিন্তু ভাবনাটাকে সময় দিতে পারল না, হঠাৎ তারস্বরে বেজে উঠল মোবাইলটা। পকেট থেকে বের করে দেখল ‘বি ডব্লু সি’, সেই নম্বরটা! রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে একটা ঘড় ঘড় শব্দ ছাড়া আর কিছুই শুনতে পেল না। অনেকবার হ্যালো, হ্যালো করার পরেও অন্য কোন উত্তর এল না। কয়েক মুহূর্ত শব্দটা হতে হতে থেমে গেল। মোবাইলটা হাতে নিয়ে দেখল, স্ক্রিনটা পুরো ডার্ক হয়ে গেছে! এবার বিরক্ত হল উত্তর। মোবাইলটা এত সমস্যায় ফেলেছে না! কি করবে ভাবছে, তখনি রিকশটা থেমে গেল। 

—“এসে গেছে দাদা। বিষয়ীদার বাড়িটা এই গলির ভিতরেই। ঢুকে যান, একদম শেষ বাড়িটা, টালির চাল আর ইটের দেওয়াল। বাড়ির সামনে একটা বড় বকুল গাছ আছে। একটা ল্যাম্পপোস্ট ও আছে কিন্তু এখন তো লোডশেডিং, আলো জ্বলছে না।”

এই কথাটা বলে রাজু কেমন যেন একটা শব্দ করে হেসে উঠল। হাসিটা শুনে উত্তরের বুকের ভিতর একটা শিরশিরানি তৈরি হল। কিন্তু সে কিছু বলার আগেই রাজু রিকশ ঘুরিয়ে দুরন্ত গতিতে অন্ধকারে মিলিয়ে গেল। 

 উত্তর হাতড়ে হাতড়ে এগিয়ে যেতে চেষ্টা করল। মোবাইলটার কি যে হল, সেই যে সুইচ্ অফ হয়ে গেছে, আর খুলছেই না। এই গলিটাতে অন্ধকার যেন আরও অনেক গাঢ়। রাস্তার পাশের বাড়িগুলো থেকে যেটুকু আলো আসছে তাতেই বেশ খানিকটা এগিয়ে দেখল, গলিটা একটা জায়গায় শেষ হয়ে গেছে, আর ঠিক সেই শেষ প্রান্তে অন্ধকারের ভিতরে দানবের মত দাঁড়িয়ে আছে একটা বড় গাছ। গাছের কিছুটা ডানদিক ঘেঁষে একটা একতলা দু-কামরার টালির চালের বাড়ি। একটা হাল্কা আলোর রেখা সেখান থেকে এসে পড়ছে রাস্তার উপর। 

—“কেউ আছেন?”

বারান্দার গ্রিলটাতে একটা ধাক্কা দিয়ে বলল উত্তর। কয়েক মুহূর্ত পর প্রায় অন্ধকার ঘরটা থেকে বেরিয়ে এলেন একজন প্রৌঢ়া। 

—“কে?”

—‘‘আমি উত্তর। এটা বিষয়ী ওয়াচ…’’

তাকে বলতে না দিয়েই সেই প্রৌঢ়া বললেন, 

—‘‘বনগাঁ থেকে আসছেন? আপনিই ফোন করেছিলেন তো!’’

উত্তর আমতা আমতা করতে থাকে। ফোনতো সে করেছিল, কিন্তু সেটা তো রং নম্বর বলল। তাহলে? 

—‘‘আসুন, উনি ভিতরে আছেন।’’

উত্তর পায়ের স্লিপ-অন বুট জুতোটা খুলে ভিতরে ঢুকলো। 

—বসুন। একটা প্লাস্টিকের লাল রংয়ের চেয়ার এগিয়ে দিয়ে বললেন প্রৌঢ়া। 

চেয়ারটাতে বসে উত্তর ঘরটার চারদিকটা দেখতে লাগলো। হ্যারিকেনের হালকা আলোতে ঘরটার যতটা দেখা যায় দেখে নিল উত্তর। তেমন কিছু আসবাবপত্র নেই। একটা রং চটা স্টিল আলমারি, একটা পুরনো কাঠের টেবিল আর কয়েকটা ওয়ালমাউন্ট সেলফ ছাড়া আর কিছু চোখে পড়ল না। একদিকে মেঝেতে একটা মাদুরের উপরে এক কিশোরী বসে পড়ছে কিছু। চারধারে ডাঁই করে রাখা আছে বইপত্র। 

—‘‘মাফ করবেন। এতদূর থেকে এটা নিতে আসতে হল। আসলে দোকানটা উঠে গেল, ওখানটায় শপিং মল হবে, তাই। আমার উপার্জন বন্ধ হয়ে গেল। সামনে মেয়েটার উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা। এরপর কলেজে ভর্তি হবে। তাই যেটুকু পারছি আরকি…’’ 

উত্তর চমকে উঠে পিছনে তাকায়, শীর্ণ একটা মানুষ হাতে তার ঘড়িটা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এত রোগা তো ছিলেন না বিষয়ীদা! উঠে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করল,

—‘‘আপনি কি অসুস্থ? এত রোগা হয়ে গেছেন?’’

—‘‘ওই আরকি। সব রোগের বড় রোগ হল দুশ্চিন্তা। সেটাই খেয়ে নিচ্ছে। যাইহোক, এই নিন আপনার ঘড়ি।’’

একটা ঘড়ি তার হাতে তুলে দিলেন বিষয়ীদা। উত্তর ঘড়িটা হাতে নিয়েই কেমন ধন্দে পড়ে গেল। এটা তার ঘড়ি? যদিও মাত্র একবারই পরেছিল, কিন্তু… 

—‘‘জানি, আপনি কি ভাবছেন! এটা আপনার ঘড়ি কি না তাই তো? ঠিকই ধরেছেন, আপনার ঘড়িটা দোকান ভাঙার সময় নষ্ট হয়ে যায়। এটা অন্য একটা ঘড়ি, খুব ভালো আর দামি, একদম অরিজিনাল সুইস ঘড়ি। দাম যদি বলেন এখন এর দাম লাখের কাছাকাছি হবে।’’

—‘‘কিন্তু এটা আমি নেব কেন?’’ অবাক হয়ে বলল উত্তর, ‘‘না না, ওটা আপনি রেখে দিন।’’ 

—‘‘না, এটা আপনাকে নিতেই হবে। নিয়ে যান!’’

বিষয়ীদা এমন একটা স্বরে কথাগুলো বললেন যে উত্তর থতমত খেয়ে দাঁড়িয়ে রইল। বিষয়ীদা আবার বললেন, 

—‘‘আমার তিনশ টাকা হয়েছে।’’

খানিকটা যেন সম্মোহিত হয়ে পড়ে উত্তর। পকেট থেকে পার্সটা বের করে তিনশ টাকা ওনার হাতে দিতে গেল। 

—‘‘না, এটা আমার হাতে দিতে হবে না। আপনি যাওয়ার পথে রাজুকে বলবেন বিজুদার সেলুনে দাঁড় করাতে, ওখানেই দিয়ে দেবেন। বলবেন আমি পাঠিয়েছি। উনি আমার কাছে এই টাকাগুলো পান, এই দেনাটা শোধ হয়ে গেলে আমার মুক্তি। এবার আপনি আসুন। আমাদের হাতে বেশি সময় নেই।’’

কিছুই মাথায় ঢুকছিল না, উত্তর কয়েক মুহূর্ত ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকল। ‘বেশি সময় নেই’ কথাটার অর্থ কী? কিছু বুঝতে না পেরে টাকা আর ঘড়িটা নিয়ে বেরিয়ে এল সে। 

রাস্তায় পা ফেলতেই আবার সামনে এসে দাঁড়ালো রাজুর রিকশ। 

—‘‘উঠে আসুন।’’

—‘‘হ্যাঁ চলো।’’

—‘‘বিজুদার সেলুনে নামবেন তো।”

—‘‘হ্যাঁ! কিন্তু তুমি জানলে কি করে?”

—‘‘আমিই তো নিয়ে যাই। আপনিই শেষ। আর যেতে হবে না।” 

একটু হেসে বলল রাজু। রিকশ তখন আবার ঝড়ের গতিতে ছুটছে।

সেকেন্ড তিরিশেক পর একটা ঘুপচি দোকানের সামনে এসে দাঁড়ায় রিকশটা। রাজু বলল, 

—‘‘আসুন দাদা। এবার আমার ছুটি। আবার দেখা হবে।”

একটু হাসির শব্দ শোনা গেলেও অন্ধকারে দেখা গেল না কিছু। কথাগুলো বলেই রিকশটা ঘুরিয়ে আবার ঝড়ের গতিতে অন্ধকারে মিলিয়ে গেল রাজু। ঠিক তখনই ঝকঝক করে জ্বলে উঠল সব আলো। বিদ্যুৎ এসে গেছে। ভালো করে তাকিয়ে দেখল উত্তর। ছোটখাটো একজন মানুষ দোকানটার ভিতরে বসে আছে। খুব ছোট একটা সেলুন। সামনের দরজাটা এত নিচু যে তাকে মাথা নিচু করে ঢুকতে হলো। 

—‘‘বলুন। কি কাটবেন? চুল না দাড়ি না দুটোই? শুধু চুল তিরিশ, দাড়ি তিরিশ, চুলদাড়ি একসঙ্গে পঞ্চাশ।”

ছোটখাটো লোকটা উঠে দাঁড়িয়ে অনেকটা চিকেন পকোড়ার মত মুখ করে বললো কথাগুলো। 

—‘‘না, না। আমি কিছু কাটতে আসিনি। এই টাকাটা দিতে এলাম।” 

—‘‘টাকা? কিসের টাকা? আমিতো আপনাকে কস্মিনকালেও দেখেছি বলে মনে হচ্ছে না!” 

—‘‘না, তা দেখেননি। কিন্তু এই টাকাটা পাঠিয়েছেন বিষয়ীবাবু।”

—‘‘বিষয়ীবাবু? কোন বিষয়ীবাবু?”

—‘‘ওই যে ঘড়ি সারাবার দোকান ছিল বটতলার মোড়ে।”

কথাটা শুনে লোকটা সভয়ে দু-পা পিছিয়ে গেল, তারপর বেশ ভয় পেয়ে জিজ্ঞেস করল, 

—‘‘কেন ভুলভাল কথা বলছেন? আমি কি আপনার শত্রু? কাটবেন না, সে ঠিক আছে, কিন্তু ভয় দেখাবেন না দয়া করে।”

অবাক হয়ে গেল উত্তর। 

—‘‘মানে? কি বলছেন? আমি ভয় দেখাতে যাব কেন? বিষয়ীবাবুর বাড়ি থেকেই তো আসছি। উনি নিজেই তো বললেন আপনাকে এই টাকাগুলো দিতে। আপনি ওনার কাছে পেতেন। আমাকে আপনার দোকানে নিয়ে এল রাজু, ওর রিকশতে। ওই তো রাজু বাইরে দাঁড়িয়ে আছে, বিশ্বাস না হয় ওকে ডেকে জিজ্ঞাসা করুন।”

উত্তরকে শেষ করতে না দিয়েই লোকটা এবার তড়াক করে লাফিয়ে উঠে বলল, 

—‘‘রাম রাম রাম… ওরে বাপ রে! এ তো দেখছি পুরো ভূতের দল এসে পড়েছে আমার ঘাড়ে! বাপরে বাপ্!”

—‘‘ভূত! মানে, কি যাতা বলছেন? আমি তো এসবের কিছুই বুঝতে পারছি না! এই নিন আপনি এই টাকাটা ধরুন তো, আমাকে ট্রেনটা ধরতে হবে।”

লোকটার হাতে টাকাটা গুঁজে দিল উত্তর। তারপর সেলুন থেকে বেরিয়ে আসতে যাবে, তখন লোকটা ঠিক তার সামনে দাঁড়িয়ে গোল গোল চোখ করে তার মুখের দিকে তাকিয়ে বললো, 

—‘‘সত্যি বলছেন? বিষয়ীদা দিয়েছে?”

—‘‘হ্যাঁ, বলছি তো!”

—‘‘কি করে? কি করে দেয়? গত হপ্তায় ওরা তিনজন রাজুর রিকশায় চড়ে বিয়ের নেমতন্ন খেতে যাচ্ছিল, পিছন থেকে একটা ফুললোড ৪০৭ ধাক্কা দেয়। তিনজন স্পটডেড। রাজুটা হাসপাতালে ধুঁকতে ধুঁকতে পরদিন মরে গেল। আর আপনি বলছেন আপনি বিষয়ীদার বাড়ি গেছিলেন! বিষয়ীদা পাঠিয়েছে আপনাকে! মামদোবাজী! ইয়ার্কি পেয়েছেন?”

কয়েক মুহূর্ত হাঁ করে তাকিয়ে থাকলো উত্তর। ততক্ষণে সেলুনের লোকটা দোকানের ভিতরে ঢুকে উত্তরের হতবাক মুখের উপরেই ঠাস্ করে দরজাটা দিয়ে দিয়েছে। ভিতর থেকে মেশিনগানের ফায়ারিংয়ের মত ভেসে এল ‘রাম রাম রাম রাম…’

দোকান থেকে বেরিয়ে রাজুকে আর দেখতে পেল না। টলতে টলতে স্টেশনে এসে উঠল উত্তর। কিন্তু সেখানে তখন প্রচুর লোকের ভিড়। একটা লোককে জিজ্ঞেস করে জানতে পারল কিছুক্ষণ আগে একটা লোক মোবাইলে কথা বলতে বলতে লাইন পেরোতে গিয়ে আপ ক্যানিং-শিয়ালদা লোকালে কাটা পড়েছে, তাই অবরোধ চলছে। ওহ্ কি জ্বালাতন! বিরক্তি আর রাগে মেজাজটা খিঁচড়ে গেল উত্তরের। আজ একেবারে যা তা চলছে তার সঙ্গে!

কৌতুহলী হয়ে একটু এগিয়ে দেখতে গেল উত্তর। লাইনের উপর পড়ে আছে একটা মানুষের তিনটুকরো শরীর। কেমন একটা অদ্ভুত অনুভূতি হল তার, আর একটু ভালো করে দেখার জন্য ঝুঁকতেই বুকটা ধক করে উঠলো তার। এ কাকে দেখছে, এ তো অবিকল তার মতোই দেখতে! একই রকম মুখ, এমনকি শার্ট আর প্যান্টটাও একদম সেম টু সেম! এ কি করে হয়? লোকটার মাথাটা লাইনের বাইরে, ধড়টা লাইন দুটোর মধ্যে আর কোমর থেকে পা পর্যন্ত লাইনের আর একদিকে পড়ে আছে। দেখতে দেখতেই তার বুকের ভিতরটা কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠল! এত যন্ত্রণা এর আগে কখনো অনুভব করেনি উত্তর! হঠাৎ পাশ থেকে একটা চেনা হাসি শুনতে পেল, ফিরে দেখল রাজু রিকশ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। রিকশর উপরে সিটে বসে আছে বিষয়ীবাবুর মেয়ে এবং স্ত্রী!

চোখাচোখি হতেই তার দিকে হাত বাড়িয়ে বিষয়ীবাবু বললেন, চলে আসুন উত্তর, আমাদের এখন অনেক দূর যেতে হবে।


এবং বৃত্তের বাইরে, এপ্রিল, ২০২৫

No comments:

Post a Comment