সে ফিরে আসে - ভূমি সেনগুপ্ত - ভূতের গল্প - এবং বৃত্তের বাইরে


se fire ase

সে ফিরে আসে

ভূমি সেনগুপ্ত


একটা কোলাহল শোনা গেল বাইরে। দ্বিজেন্দ্র ইজিচেয়ার থেকে উঠতে গিয়েও উঠতে পারলেন না। কোমরের ব্যথাটা আবার বেড়েছে। তার উপর দীর্ঘদিন ধরে তাঁর রাত কাটে কাকনিদ্রায়। প্রায়শই সারা বাড়িতে গোটা রাত্রি জুড়ে ভূতের মত তিনি ঘুরে ঘুরে বেড়ান। সকলে ঘুমে নিমগ্ন অথচ তাঁর চোখে কোন কোন রাতে ঘুমের লেশ মাত্র থাকে না। পুরো রায়বাড়ি জুড়ে কেউ কেউ যেন ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদে, নিদারুণ যন্ত্রণায় আর্তনাদ করে। অথচ দ্বিজেন্দ্র কাউকে দেখতে পান না। বহুবার কাজের লোকেদের ঘুরিয়ে ফিরিয়ে জিজ্ঞাসা করে দেখেছেন কিন্তু কোন সদুত্তর পায়নি। উল্টে তারা নিজেদের মধ্যে মুখ চাওয়া চাওয়ি করেছে। বস্তুত সারা দিন ধরে খাটুনির পর তারা রাতে মড়ার মতো ঘুমায়। শুধু দ্বিজেন্দ্রর কানে সব ভেসে আসে। কিন্তু ওই কোলাহলের পর আর অলসতা করা চলে না। দ্বিজেন্দ্র খাস ভৃত্য মহিমকে হুকুম করলেন, “বাইরে এত গণ্ডগোল কিসের? দেখে এস তো।”

এই এক স্বভাব মিতভাষী ভূস্বামীর। ভৃত্যদের পর্যন্ত 'তুই' সম্বোধন করেন না। এটুকু তাঁর মায়ের শিক্ষা। দ্বিজেন্দ্রর মাও ছিলেন ধনাঢ্য পরিবারের কন্যা। রক্ষণশীল পরিবারের সন্তান হলেও সেকালে বাড়িতে মেম রেখে নাতনিকে লেখাপড়া, আদবকায়দা শিখিয়েছিলেন তাঁর ঠাকুরদা। দ্বিজেন্দ্র নিজে এবং তাঁর পিতা নরেন্দ্রও ছিলেন বিলেত ফেরত। চমক ভাঙে তাঁর মহিমের ডাকে।

“হুজুর নায়েবমশাই জানালেন সেই সাগরপারের দেশ থেকে আপনার সঙ্গে দেখা করতে এক খুকি এয়েছে। কী সুন্দর মুখখানা তার! একদম যেন পদ্মকলি। ডাকি তাকে?”

মহিমের বকবকানিতে একটু বিরক্ত হন দ্বিজেন্দ্র। তাকে একরকম মাঝপথে থামিয়ে দিয়েই দ্বিজেন্দ্র বলেন, “যা ডেকে নিয়ে আয় তাকে।” বক্তব্যের মাঝখানে বাধা পাওয়ায় মহিম কিঞ্চিৎ ক্ষুণ্ন হয়। সে কি এ বাড়িতে আজকের লোক? আজ প্রায় চল্লিশ বছর হতে চললো সে এ বাড়ির বাসিন্দা। এ পরিবারের কত ওঠা পড়ার সাক্ষী সে! সদ্য আগত মেয়েটিকে ডাকতে যেতেই আর এক বিস্ময়। মেয়েটি যে কখন বিড়ালের মত নিঃশব্দে ঘরের মধ্যে হাজির হয়েছে তা দুজনের কেউ টের পায়নি।

দ্বিজেন্দ্র চেয়ে চেয়ে দেখেন মেয়েটিকে। নাহ্‌, মহিম অত্যুক্তি করেনি কিছু। সত্যি কমলকলির মতো মুখখানা। মেয়েটি ততক্ষণে বিশুদ্ধ ব্রিটিশ ইংরেজিতে নিজের পরিচয় দিতে শুরু করেছে। দ্বিজেন্দ্র বুঝলেন এ মেয়ে তাঁর নাতির বান্ধবী। নাম লিজা আথারটন। পরিচয় দান পর্ব সমাপ্ত করে পকেট হাতড়ে সত্যেন্দ্রের একখানা চিঠি দ্বিজেন্দ্রর হাতে তুলে দেয় মেয়ে। মুক্তোর মত হাতের লেখায় লিজার বক্তব্যের সত্যতা প্রমাণিত। দ্বিজেন্দ্র চিঠিখানা কিছুক্ষণ নিজের দু-হাতের মধ্যে রেখে স্তব্ধ হয়ে বসে থাকেন। এতকাল পর নিজের বংশধর যোগাযোগ করেছে তাও চিঠির মাধ্যমে। চিঠির সার বক্তব্য যে লিজা ভারতের ইতিহাস নিয়ে গবেষণা করছে। সেজন্যই তার কোচবিহারের এই আধা মফঃস্বলে আসা। তাই দাদুর কাছে বাবার মারফৎ নাতির অনুরোধ তার বান্ধবীটির যেন এখানে আপ্যায়নে কোন ত্রুটি না হয়। 

চিঠিটায় আরেকবার চোখ বুলিয়ে নিজের মনে হাসলেন দ্বিজেন্দ্র। অনুরোধ! এ সবই যার সে কিনা সুদূর থেকে চিঠিতে অনুরোধ জানিয়েছে! সবই তাঁর কপাল। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে উঠে দাঁড়ান দ্বিজেন্দ্র। লিজার দিকে হাত বাড়িয়ে দেন, “এস লিজা আথারটন। তোমায় নিয়ে আমাদের অন্দরমহলে যাই। আমার নাতির বান্ধবী তুমি। তার প্রথম আবদার অগ্রাহ্য করলে এই বুড়োকে বাড়ির বুড়ি পানাপুকুরে ডুবিয়ে ছাড়বে।” কথাগুলো বলেই খেয়াল হয় দ্বিজেন্দ্রর। বিদেশিনী তো তাঁর আবেগের মর্ম কিছুই বুঝবে না। কিন্তু পরক্ষণেই খেয়াল করেন স্বর্ণকেশিনী কেমন এক বিহ্বল দৃষ্টিতে তাঁর দিকে চেয়ে। এক মুহূর্তের জন্য মনে হল যেন তেমনটাই। নিজেকে সংযত করেন যুক্তির কশাঘাতে দ্বিজেন্দ্র। না, তাঁরই ভুল হয়েছে। জীবনভর ভুলের সাগরেই অবগাহন করে গেলেন তিনি। নিজের রক্তকেই চিনতে বড় ভুল হয়েছিল তাঁর। ভাবা যায়, যে সন্তানকে চোখের সামনে জন্মাতে দেখলেন, তিল তিল করে বড় করলেন, তাকেই পরখ করতে অত বড় ভুল কিভাবে করে বসলেন তিনি!

* * *

অন্দরমহলের দরজায় এসে ডাক দিলেন দ্বিজেন্দ্র গম্ভীর কন্ঠে, “স্বর্ণময়ী!”

প্রায় এক যুগ হল কোন এক বিশেষ কারণে এ বাড়ির গিন্নিমা, তাঁর অগ্নিসাক্ষী করে বিয়ে করা স্ত্রী স্বর্ণময়ীর সঙ্গে প্রয়োজন ব্যতীত বাক্যালাপ হয় না তাঁর। স্ত্রী হিসেবে সকল দায়িত্ব পালন করেন স্বর্ণময়ী কিন্তু অন্তরালে থেকে। স্বামীর সঙ্গে সাংসারিক বিষয় ব্যতীত বড়ো একটা কথা বলতে চান না তিনি বহু বছর ধরেই। সেই কবেকার ঘটনা। যেখানে দ্বিজেন্দ্রের কোন দোষ নেই। তিনি শুধুমাত্র প্রথাগত নিয়ম তথা ঐতিহ্যের অনুসারী। এটাই তাঁর সবচেয়ে বড় অপরাধ। তাছাড়া বংশমর্যাদা বলেও তো একটা বস্তু আছে। সেসব তো তিনি আর সন্তানস্নেহের বশবর্তী হয়ে করতোয়ার জলে ভাসিয়ে দিতে পারেন না। স্বর্ণময়ীর নয় একেবারেই ইহকালের-পরকালের ভয় নেই কিন্তু তাঁর তো রয়েছে। 

একটা জিনিস শুধু বার বার খটকা লাগে তাঁর। লিজা বিজয়েন্দ্রর বান্ধবী নাকি প্রেমিকা তা নিয়ে তাঁর একটু খটকা লাগছে বটে। কিন্তু একটা প্রশ্ন তাঁর মনকে অহরহ পীড়িত করে তোলে যে বিজয় আদৌ সত্যেন্দ্রের সন্তান তো! তাঁর বুদ্ধিতে তিনি জানেন এতো কার্যত অসম্ভব। যদিও নাতি অর্থাৎ বিজয়ন্দ্রর মুখখানা দেখবার পর অন্তত সন্দেহের অবকাশ নেই। একদম স্বর্ণময়ীর মুখের আদল। এত আদরের সন্তান তাঁদের! দ্বিজেন্দ্র আবার ডুব দেন স্মৃতির অতলে। কত দেব-দেবীর দোর ধরে তবেই সন্তানসুখ পেয়েছিলেন তাঁরা! হতচ্ছাড়া ছেলেটা সব কিছু তছনছ করে দিল। আর এ সব কিছুর জন্য সেই নিচু জাতের নচ্ছারটাই দায়ী। লেখাপড়া শিখলেই কি আর জাতে ওঠা যায়? অবশ্য এখন তো চিকিৎসাবিজ্ঞান প্রভূত উন্নতি করেছে। বিদেশে তো এসব সুযোগ সুবিধা এদেশের তুলনায় বিস্তর রয়েছে। যাক গে, মরুক গে। এসব ভাববার তাঁর অন্তত কোন প্রয়োজন নেই। হঠাৎ স্ত্রীর কণ্ঠস্বরে অন্যমনস্ক ভাব কাটে দ্বিজেন্দ্রের।

“অসময়ে ডাকছ কেন? এখন আমার কত কাজ থাকে সেকথা কি জানো না?”

দ্বিজেন্দ্র মাথা নিচু করে দাঁড়িয়েছিলেন এতক্ষণ। স্ত্রীর অনুযোগভরা কণ্ঠস্বরে মুখ তুলে তাকালেন। কতকাল তাঁরা পরস্পরের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে কথা বলেন না। গুরুগম্ভীর কন্ঠে বলে ওঠেন দ্বিজেন্দ্র,

“এমনি এমনি ডাকি নি স্বর্ণ। তোমার আদরের নাতির বান্ধবী এসেছে। পড়াশোনা করছে সে এ দেশের ইতিহাস নিয়ে। এখানে ক'দিন থাকবে। একটু দেখে রেখো মেয়েটাকে।”

তারপর গলা নামিয়ে ফিসফিস করে বলেন, “দেখো আবার হবু নাতবৌ কিনা!”

স্বর্ণময়ীর সদা গম্ভীর মুখটায় কী একটু ফাটল ধরলো? কে জানে। চিরকালের চাপা মানুষ। ছেলেও হয়েছে মায়ের মতোই। অন্তর্মুখী স্বভাবের মা-ছেলে চিরকাল দ্বিজেন্দ্রের থেকে একটা আলাদা জগতের বাসিন্দা। বস্তুত দ্বিজেন্দ্র আজও মনে করেন সত্যেন্দ্রের ওই অধঃপতনের মূলে ছিল স্বর্ণময়ীর প্রশ্রয়। দ্বিজেন্দ্র একটা জিনিস বুঝতে পারেননি যে জোর করে আর যাই হোক মানুষের মন পাওয়া যায় না। স্ত্রী স্বর্ণময়ীর ক্ষেত্রেও তিনি জোর জবরদস্তিকেই প্রাধান্য দিয়েছিলেন। ছেলের ক্ষেত্রেও তিনি একই ভুল করেছিলেন। বিলেত ফেরত হলেও মানুষটার কাছে বংশমর্যাদা ছিল শেষ কথা। ভিতরে ভিতরে দ্বিজেন্দ্র মানুষটা ছিল ভয়ানক রক্ষণশীল অন্তত নিজের পরিবারের ব্যাপারে। স্বর্ণের সঙ্গে কথাবার্তার সময় রায় পরিবারের ঠাকুরঘর থেকে বেরিয়ে এল মতির মা, এ বাড়ির বহু পুরাতন কাজের লোক। তাকে দেখেই বিরক্তিতে ভ্রু কুঁচকে উঠলো দ্বিজেন্দ্রর। স্ত্রীর স্বভাব আর বদলালো না। অজাত-কুজাত যাকে পারছে সাবেকি ঠাকুরঘরে ঢুকবার অনুমতি দিয়ে দিচ্ছে। এর আর কোনদিন জ্ঞান হল না যে মুড়ি-মিছরির দর কখনো এক হয় না। ছেলেও ছিল মায়ের মতো। দুজনের এক রা। কিছু বললেই ছেলে শুনিয়ে দিত, “রাধামাধব সকলের বাবা। তাঁকে নিয়ে অন্তত তোমার আভিজাত্যের ধ্বজা উড়িও না।” পুরো মায়ের মতো। আগে যদি এই মহিলার স্বভাব সম্পর্কে জানতে পারতেন তাহলে স্বর্ণময়ীকে বিবাহ করবেন কিনা সে বিষয়ে ভেবে দেখতেন দ্বিজেন্দ্র। যদিও এখন আর ওসব ভেবে কোন লাভ নেই। রাগের মাথায় বহুবার স্বর্ণময়ীকে শুনিয়েছেন দ্বিজেন্দ্র, “তোমাকে বিয়ে করাটাই ভুল হয়েছে।” স্বর্ণ মৃদু হেসেছেন কিন্তু কোন উত্তর করেননি। বহুবার স্বর্ণকে অগ্রাহ্য করেও দেখেছেন দ্বিজেন্দ্র। স্ত্রীর কোন হেলদোল নেই। নিজেই যখন স্ত্রীকে কাছে টেনেছেন তখন মৃদু হেসে স্বর্ণ বলেছেন, “কী, জমিদারবাবুর ধৈর্য ফুরালো। দেখ, এখনো সময় আছে। ভুলটাকে শুধরে নিতে পারো কিনা ভেবে দেখতে পারো।” রাগতে গিয়ে হালছাড়া মুখে হেসে ফেলতেন দ্বিজেন্দ্র। বস্তুত স্বর্ণের এই সৃষ্টিছাড়া স্বভাবের জন্যই যে স্ত্রীর প্রতি তীব্র আকর্ষণ দ্বিজেন্দ্রের সেকথা নিজের চেয়ে বেশি ভালো আর কে জানে?

* * *

স্ত্রীর ডাকে আবার বর্তমানে ফিরে এলেন দ্বিজেন্দ্র। মৃদু গলায় স্ত্রী ডাকছেন তাঁকে, “লিজা তো ঠাকুরঘরে যেতে চাইছে, এদিকে এ তো আবার হিন্দু বলে মনে হয় না। তা সেথায় নিয়ে যাব তোমার নতুন অতিথিকে? তুমি অবশ্য অরাজি হলে আমি পত্রপাঠ না করে দিতে পারি।” দ্বিজেন্দ্র চেয়ে দেখলেন স্বর্ণ হাসছেন, স্বামীকে জব্দ করতে পারার হাসি। রাগ চেপে নিরূপায় দ্বিজেন্দ্র লিজাকে ঠাকুরঘরে নিয়ে যেতে ইশারা করেন।

সারাদিন ধরে লিজাকে নিয়ে স্বর্ণময়ী মেতে থাকেন। দুপুরে খাওয়ার সময় দ্বিজেন্দ্র তো অবাক। এ কোন লিজা? স্বর্ণময়ীর শ্বেত স্বর্ণচরী শাড়ি, গয়নায় লিজা যেন একেবারে মা সরস্বতী। আরও অবাক হন দ্বিজেন্দ্র যে লিজা অল্প অল্প বাংলা বলতে পারে। আবার এ দেশের ভাষা বুঝতেও পারে। লজ্জারাঙা মুখে লিজা জানায় তাঁদের নাতিবাবু বিজয়েন্দ্রই তাকে বাংলা শিখিয়েছে। শুধু তাই নয় এদেশের শিক্ষা-দীক্ষা-সংস্কৃতি-ঐতিহ্য-পুরাণ-বেদ-উপনিষদ সব কিছু সম্পর্কে তাকে গল্প করে শোনান সত্যেন্দ্র। সত্যেন্দ্রর সম্পর্কে কথা বলতে গিয়ে মেয়েটা যে একেবারে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ে সেকথা বার বার লক্ষ্য করলেন দ্বিজেন্দ্র। কতদিন পর এ বাড়িতে তাঁর আদরের সতু'র কথা কেউ বলছে। সকলকে গোপন করে আঁচলে চোখ মোছেন স্বর্ণময়ী। কেউ না জানুক মায়ের মন জানে ছেলের সঙ্গে প্রতিদিন তাঁর যোগাযোগ হয় গভীর রাতে। এতগুলো বছরে প্রতিদিন নিজের একটা লুকানো ফোন নিয়ে ছেলের সঙ্গে কথা বলেন তিনি। সপ্তাহে ছয়দিন ছেলেকে ভিডিও কলে তিনি দেখেন কিন্তু ছুঁতে পারেন না বহু বছর হয়ে গেল। দ্বিজেন্দ্র একটা বিষয় লক্ষ্য করেন যে লিজা একবারের তরে তাঁর পুত্রবধূর ব্যাপারে কোন উচ্চবাচ্য করলো না। একটা সন্দেহের কাঁটা দ্বিজেন্দ্রের মনকে ক্ষত বিক্ষত করতে থাকে। 

দুপুরে বহুদিন পর দ্বিজেন্দ্র অঘোরে ঘুমালেন। ঘুমের ঘোরে মনে হল বহুদিন পর সে এসে দাঁড়িয়েছে পাশে। দুই চোখে অসীম বেদনা, বিশ্বাসভঙ্গের যন্ত্রণা। বার বার তাঁর কানে ধ্বনিত হতে থাকে, “কেন এমন করলেন জ্যাঠাবাবু? এমনটা কী আমার প্রাপ্য ছিল?” চমকে উঠে বসেন দ্বিজেন্দ্র। এতদিন পর এ আবার কোথা থেকে এল? তার তো ফিরে আসা কোন ভাবেই সম্ভব নয়। সে তো কবেই...

লিজার ডাকে চমকে ওঠেন দ্বিজেন্দ্র। স্বর্ণময়ীর সাহায্য নিয়ে লিজা মাছের পিঠে বানিয়েছে। মুখে দিয়েই চমকে ওঠেন তিনি। এ তো হুবহু সেই স্বাদ। কিন্তু লিজা কী করে এইরকম খাবার বানাতে শিখলো? সেও তো খুব সুন্দর রান্না করতে পারতো। দ্বিজেন্দ্রকে অস্থির দেখে লিজা প্রশ্ন করে ভাঙা বাংলায়, “দাদুর কি শরীর খারাপ লাগছে?” দ্বিজেন্দ্র নিজেকে সংযত করে নেন।

রাতের বেলা খাবারের টেবিলে আবার চমক। লিজা বানিয়েছে মুড়িঘন্ট। এবারে দ্বিজেন্দ্র ভাবনায় পড়ে যান। এ কী হয়ে চলেছে? হুবহু একরকম খাবার বানাতে লিজা কীভাবে শিখলো? 

নৈশভোজের পর নিজের ঘরে ইজিচেয়ারে শুয়ে দ্বিজেন্দ্র আবার ডুবে যান অতীতে। বিলেত ফেরত চিকিৎসক সত্যেন্দ্র গ্রামে ফিরে হাসপাতাল গড়তে উৎসাহী হয়ে ওঠে আর এই কাজে তার প্রধান সাহায্যকারী হয়ে ওঠে তারই ছেলেবেলার বন্ধু অতীশ। অতীশের বাবা ছিলেন জমিদার বাড়ির পুরনো কাজের লোক। মা মরা ছেলেটা বাবার সঙ্গে জমিদারবাড়িতে থাকতো। অতীশ ছিল অত্যন্ত মেধাবী ও শ্রুতিধর। বলা ভালো সত্যেন্দ্রের চেয়েও মেধাবী। সত্যেন্দ্রকে যে গৃহশিক্ষকেরা পড়াতে আসতেন তাঁদের পড়ানো শুনেই ঘরের বাইরে থেকে অতীশের পড়া হয়ে যেত। বিদ্যালয়ের বার্ষিক পরীক্ষায় অতীশ প্রথম ও সত্যেন্দ্র সর্বদা দ্বিতীয় স্থান অধিকার করতো। সে নিয়ে অবশ্য দ্বিজেন্দ্রের কোন আপত্তি ছিল না। আজ আফসোস হয় কেন চাকরের ছেলেকে নিজে সঙ্গে করে নিয়ে গিয়ে বিদ্যালয়ে ভর্তি করে দিয়েছিলেন। অতীশের মেধা দেখে সত্যেন্দ্রের শিক্ষকদের কাছেই দ্বিজেন্দ্র তার পড়াশোনার ব্যবস্থা করে দেন। অতীশ অবশ্য তার জ্যাঠাবাবুকে বাবার সমান মর্যাদা দিত। আর স্বর্ণময়ী ? সে তো নিজের ছেলের চেয়ে কোন অংশে কম স্নেহ করতো না তাকে। ছেলের জন্য লুচি-মাংস করলে অতীশ-এর জন্য লুচি-মাংস হবে। পরিচিতরা দুই ভাই বলেই ভুল করতো দুজনকে। ছেলের জেদে তার পাশের ঘরে অতীশ-এর পড়াশোনার ব্যবস্থা করে দিতে হয়েছিল জমিদারমশাইকে।

অবসরে স্বর্ণের পাশে দাঁড়িয়ে হেঁসেলে খুন্তি নাড়ত অতীশ। রান্না করতে ভারী ভালোবাসতো সে। উচ্চমাধ্যমিকের পর সত্যেন্দ্রকে ডাক্তারি পড়তে পাঠানো হল বিদেশে। যাওয়ার কথা অতীশ-এরও ছিল কিন্তু সেসময় ঘটলো এক দুর্ঘটনা। হঠাৎ মারা গেল অতীশ-এর বাবা। ছেলে আর বিদেশে পড়তে যেতে চাইলে না। কলকাতার নীল রতন সরকার মেডিক্যাল কলেজের থেকে ডাক্তারি পাশ করে ফিরে এল এখানে। নাকি দুই বন্ধুতে মিলে হাসপাতাল খুলবেন। স্বর্ণকে নাকি দুই ভাইয়ের কথা দেওয়া আছে। দ্বিজেন্দ্রের ইচ্ছে ছিল সত্যেন্দ্র বিদেশের কোন নার্সিংহোমে ডাক্তারি করুক সেই সঙ্গে এম.ডির পড়াও শেষ করুক। সব কিছু একরকম ঠিকঠাক চলছিল। 

* * *

দ্বিজেন্দ্রের মনে যদিও একটা কাঁটা বিঁধে ছিল। সতুর মধ্যে কেমন একটা নারীসুলভ ভাব যেন উঁকি মারতো। প্রথমটা মনের ভুল ভেবে উড়িয়ে দিতে চাইলেও একদিন বাড়ির দুই কাজের লোককে হাসতে শুনলেন। সেই সঙ্গে আরও কিছু কথা যা তাঁর রক্তে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার পক্ষে যথেষ্ট।

“বড় বাড়ির ছেলেদের অমন কত ঘোড়ারোগ থাকে। ঐজন্যই তো চাকরের ছেলেকে এতদিন ধরে অমন জামাই আদরে পুষছে।” 

দ্বিজেন্দ্রের মনে পড়ে যায় হঠাৎ একখানা কথা। তাঁর এক ঘনিষ্ট বন্ধু এসেছিলেন মেয়েকে নিয়ে ছেলের বিয়ের নিমন্ত্রণ করতে। সেই মেয়েও সুশ্রী, কলকাতায় ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছে। দ্বিজেন্দ্রের সুপ্ত ইচ্ছে ছিল সেই মেয়ে অর্থাৎ মালিনীকে পরে নিজের পুত্রবধূ করবেন। সেই আশাতেই সত্যেন্দ্রের ঘরে দুজনকে পাঠিয়েছিলেন কথাবার্তা কইতে। কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই ব্যস্ত সমস্ত ভাবে ছেলে বেরিয়ে গেল। মালিনী ফিরে এসে বসলো বাবার পাশে। রাগে, অপমানে তার সমস্ত মুখখানা যেন থমথম করছে। এ রাগ নারীত্বের অপমানের তা খুব ভালো করেই বুঝেছিলেন দ্বিজেন্দ্র। পরদিন বন্ধু ফোন করলেন দ্বিজেন্দ্রকে। ব্যাঙ্গের সুরে বললেন, “তোমার খোকা বোধহয় মেয়েরা কাছে এলে অস্বস্তিতে পড়ে বাপু। ছেলের মন বুঝে ভবিষ্যতে এগিও।” দ্বিজেন্দ্রের সারা শরীরে কথাগুলো যেন জ্বালা ধরিয়ে দেয়। পুজোর ছুটিতে দুই বন্ধু বেড়াতে গেল সিমলাতে। বোকা ছেলেদুটো জানতো না যে দ্বিজেন্দ্রের গুপ্তচর তাদের পিছনে ছায়ার মত ঘুরছে। দ্বিজেন্দ্রের যা খবর পাওয়ার পাওয়া হয়ে গিয়েছে। সিমলার হোটেলে, নির্জনে আপত্তিজনক অবস্থায় দেখা গিয়েছিল দুজনকে। পার্থক্য ছিল সত্যেন্দ্রের নারীসুলভ মানসিকতা হেতু তাকে দেখা যেত নারীর ভূমিকায়। এতেই ছিল তার তৃপ্তি।

অপেক্ষা ছিল দুজনের ফেরার। সেদিন দুপুরে মধ্যাহ্নভোজে বিশাল আয়োজন করেছিলেন দ্বিজেন্দ্র। অতীশকে স্নানের পর নতুন পোশাক পরতে বলেছিলেন দ্বিজেন্দ্র। পরিকল্পনা ছিল অনেক কিছুই করবার কিন্তু অতীশ যেন কর্পূরের মত উবে গেল। সত্যেন্দ্র একটা জরুরি ফোন পেয়ে হঠাৎ বেরিয়ে গিয়েছিল। ফিরে এসে গরু খোঁজা খোঁজে অতীশকে। দ্বিজেন্দ্র থানা-পুলিশ কিছুই বাদ রাখেননি। এই ঘটনার পর বাড়িতে থাকতে চায়নি সত্যেন্দ্র। সবকিছু ছেড়ে বিদেশে পাড়ি দেয় সে। যাওয়ার আগে দ্বিজেন্দ্রের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সে উগরে দেয় একরাশ ঘৃণা। সত্যেন্দ্র বলে যায়, “এর পিছনে নিঃসন্দেহে আপনার হাত রয়েছে বাবামশাই। অতীশ ফিরবেই। ফিরতে তাকে হবেই। আমার অনুভূতিকে অস্বীকার করে এভাবে সে দূরে সরে যেতে পারে না।” সকলের অলক্ষ্যে সত্যেন্দ্র সঙ্গে নিয়ে যায় অতীশ-এর রেসিপির খাতাটা। যার প্রতিটা পাতায় মুক্তোর মত হাতের লেখায় অতীশ লিখে রাখতো বাংলার হারিয়ে যাওয়া রান্নাগুলোর পাকপ্রণালী। ওটুকুই সম্বল ছিল সত্যেন্দ্রের। স্বর্ণময়ী ছেলেকে আটকানোর বিস্তর চেষ্টা করেন। যদিও এতে কোন লাভ হয়নি।

* * *

ঢং ঢং ঢং। সদর দেউড়ির ঘড়িতে রাত তিনটে বাজল। ঘুম ভেঙে জমিদার উঠে বসেন। এ কোন সুগন্ধীর সুবাস। এ তো কস্তুরীর সৌরভ যা অতীশ ব্যবহার করত যা সুদূর পাহাড়ি অঞ্চল থেকে আনাতো সত্যেন্দ্র। কে যেন এগিয়ে আসে দ্বিজেন্দ্রের দিকে। কাঁধে হাত রাখে তাঁর। কান্নাভেজা কন্ঠে বলে ওঠে, “আর কেন জ্যাঠাবাবু? অনেকদিন তো এই নরক যন্ত্রণা ভোগ করলাম। এবার আমায় মুক্তি দিন। আমার যথাবিহিত সৎকার করুন।” তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে ওঠেন জমিদার। “তোর আবার সৎকার কী? তোরা তো জাতে বাগদী। তোর চিতায় আগুন দিলেই বা কী আর না দিলেই বা কী!”

এবার কথাগুলো ষ্পষ্ট হয়। এগিয়ে আসে শ্বেতশুভ্র পাঞ্জাবি পরিহিত এক শ্যামবরণ সুশ্রী তরুণ যার সর্বাঙ্গে ছোপ ছোপ রক্তের দাগ বিশেষত পশ্চাদ্দেশে। তরুণ ঠিকমত হাঁটতেও পারছে না। দ্বিজেন্দ্র চিৎকার করে ওঠেন, “না এ সব মিথ্যা। তুই নেই। তোকে আমি বহুদিন আগেই তো...” কথা শেষ হয় না তাঁর। তাঁর আগেই ভাঙা ভাঙা বাংলায় বলে ওঠে লিজা, “গুদামঘরের মেঝেতে পুঁতে দিয়েছিলেন মারাত্মক অত্যাচার করে।”

লিজা আর স্বর্ণময়ী যে কখন ঘরে ঢুকেছেন তা খেয়াল করেননি জমিদার। বলে ওঠেন স্বর্ণ, “আমার একটা সন্দেহ বহুকাল ধরেই ছিল। অতীশ-এর হঠাৎ নিখোঁজ হয়ে যাওয়ার পিছনে তোমারই হাত ছিল। বুঝতে পেরেছিল সতুও। বহু খুঁজেও আমরা ওর কোন সন্ধান পাইনি। এতকাল পরে বিজয়ের এই বান্ধবীকে পেয়েছি। লিজা এই পৃথিবীর মানুষদের অনুভব করতে পারে। এই বাড়িতে প্রথম এসেই ও অনুভব করতে পারে যে বহু বছর ধরে এক অতৃপ্ত চোট খাওয়া প্রাণ বন্দি হয়ে আছে এ বাড়ির খুব কাছে। সেই অসহায় কেঁদে চলেছে অহরহ কিন্তু তার কান্না শোনবার, তার পাশে দাঁড়াবার কেউ নেই। সে এই বাড়িতে ছায়ার মত ঘুরে বেড়াচ্ছে শুধু মুক্তির সন্ধানে। জন্ম না দিলেও আমি ওর আর এক মা ছিলাম। আমার সেই নিরপরাধ ছেলেকে তুমি হত্যা করেছ। সেই ছেলেটা তোমাকে পিতৃতুল্য জ্ঞান করতো! তুমি এত নীচ ভাবা যায় না।”

উন্মাদের মতো চিৎকার করে ওঠেন দ্বিজেন্দ্র, “থামো তুমি। সেই ছোট জাতের ছেলেকে নিয়ে তোমার এত আদিখ্যেতার জন্য ওই জানোয়ারটা স্পর্ধা দেখিয়েছিল আমাদের একমাত্র সন্তানকে স্পর্শ করবার। তুমি জানো আমাদের ছেলে কী করেছিল। সেই সংবাদ প্রকাশ পেলে আমাদের এই পরিবারের ঐতিহ্য, আভিজাত্য, তিল তিল করে গড়ে তোলা এতদিনের সম্মান সব এক মুহূর্তে ধূলিসাৎ হয়ে যেত। লোকে হাসতো আমাদের দেখে যে জমিদার দ্বিজেন্দ্র নারায়ণ রায় একটা ভাঁড়ের জন্ম দিয়েছে।”

শান্ত মুখে স্বর্ণময়ী উত্তর করেন, “আমি তার মা। আমি সব জানি। সে আর পাঁচ জনের মতো নয়। সে বহিরঙ্গে পুরুষ হলেও অন্তরঙ্গে নারী। তাই তো সে নিজেকে নারী হিসেবে জ্ঞান করতো আর অতীশ পুরুষ হলেও তার নারীদের পছন্দ ছিল না। এই পৃথিবীতে ঈশ্বর এক-এক মানুষকে এক-এক রকম করে পাঠিয়েছেন। সকল মানুষ যেমন সমান নয় তেমন সকলের রুচি, পছন্দ-অপছন্দ আলাদা। এই সহজ সত্য তুমি মেনে নিতে পারোনি। সে জন্যই তোমার বন্ধুর মেয়েকে মেনে নিতে পারেনি সতু, বিরক্ত হয়েছিল। তার চৌদ্দ বছর বয়স থেকে আমি এসব জানি। দুটি প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ যদি পরস্পরকে ভালোবেসে সুখী হয় এতে সমস্যা কোথায়? খুব ভালো করেছে সত্যেন্দ্র যে তোমার আওতার বাইরে বেরিয়ে গিয়েছে। এখানে থাকলে ঠিক তুমি ওকে তোমার বন্ধুর মেয়েকে বিয়ে করতে বাধ্য করতে। তোমার অভিজাত পরিবারের মর্যাদা রক্ষার হাঁড়িকাঠে আমার ছেলে কেন নিজের পছন্দকে বলি দেবে? তুমি কে যে একজন মানুষের জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করবে?”

দ্বিগুণ জোরে চিৎকার করে ওঠেন দ্বিজেন্দ্র, “প্রকৃতির নিয়ম যে পুরুষ আর মহিলার সম্পর্কই সমাজে স্বীকৃত, পুরুষের সঙ্গে পুরুষের সম্পর্কের কোন ভিত্তি নেই।”

ততক্ষণে ঘরের মধ্যে আছড়ে পড়লো খুব চেনা এক মিহি অথচ সুমধুর কন্ঠস্বর। কত বছর পর এই কন্ঠস্বর আবার এই জমিদারবাড়িতে প্রতিধ্বনিত হল। সত্যেন্দ্র! কিন্তু এ কী সাজ তার? পরনে সাদার উপর কাজ করা গাউন। সেই সঙ্গে গলায় কানে হালকা হীরের গয়নায় এ তো একজন অভিজাত বিদেশিনী। স্বর্ণ ততক্ষণে জড়িয়ে ধরেছেন নিজের একমাত্র সন্তানকে। দ্বিজেন্দ্র স্তম্ভিত। নীরবতা ভঙ্গ করে লিজা।

“তোমার খুব কৌতূহল ছিল তাই না দাদু যে বিজয়ের মা কোথায়? বিজয়ের মা তোমার সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। তোমার ছেলে সত্যেন্দ্র ওরফে শার্লি হলেন বিজয়ের মা। ওই দেশে পৌঁছে ধীরে ধীরে নিজের উপার্জনের টাকা জমিয়ে সত্যেন্দ্র নারায়ণ নিজের লিঙ্গ পরিবর্তন করবার অস্ত্রোপচার করেন। আই. ভি.এফ এর মাধ্যমে সন্তান জন্ম দেওয়ার চেষ্টা করলেও তিনি সফল হননি। তখন সাহায্য নেওয়া হয় সারোগেসির। তুমি জানো তো দাদু বিজয়ের বার্থ সার্টিফিকেটে ওর বাবা হিসেবে কার নাম দেওয়া আছে?”

সত্যেন্দ্র তথা শার্লি বলে ওঠে, “স্বর্গীয় শ্রী অতীশ মণ্ডল।”

* * *

পরক্ষণেই ঘরের মধ্যে ওঠে অট্টহাসির ঝড়। অতীশের বিদেহী আত্মা বলে ওঠে, “তাহলে এই অভিজাত বংশের সঙ্গে সেই নিচু জাতের ছেলেটার নাম জুড়েই গেল জ্যাঠাবাবু। আটকাতে পারলেন না কোনভাবেই!” 

এগিয়ে আসে শার্লি। আলিঙ্গন করতে চায় অতীশের বিদেহী আত্মাকে। কান্নাভেজা কন্ঠে বলে ওঠে, “তোর কী হয়েছিল? কোথায় হারিয়ে গেলি তুই? এর নেপথ্যে আমার বাবার হাত আছে তা তো তখনই বলেছিলাম। এখন সবটা তুই নিজের মুখে বল।” 

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে অতীশ বলতে শুরু করে...

“সেদিন দুপুরে খাওয়ার পর তুই বেরিয়ে গেলি। আমিও বৃষ্টিভেজা প্রকৃতি দেখতে বেরিয়ে পড়লাম। হঠাৎ পথে মাথাটা কেমন ঘুরে গেল মনে হল। হাজার চেষ্টা করেও চোখদুটি খুলে রাখতে পারছিলাম না। যখন ঘুম ভাঙলো তখন নিজেকে আবিষ্কার করলাম তোদের কোন এক গুদামঘরের মেঝেতে। সামনে চেয়ারে বসে জ্যাঠাবাবু। আশেপাশে দাঁড়িয়ে দশাসই চেহারার অন্তত জনা পাঁচেক চেহারার লোকজন যাদের চেহারা দেখলেই বোঝা যায় মনে মায়া দয়া বলতে কিছুই নেই। আরও বুঝলাম আমার ঘুমিয়ে পড়াটা নিছক কাকতালীয় নয়, পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র। যাই হোক ওই লোকগুলোর সকলের হাতেই ছিল লোহার রড গোছের কিছু। সকলে বিশেষত জ্যাঠাবাবু যেন তারিয়ে তারিয়ে আমার হাত-পা বাঁধা অবস্থাটা উপভোগ করছেন। তাঁর মুখের শীতল হাসি দেখে আমার অন্তরাত্মা শুকিয়ে গিয়েছিল। মন বলছিল আমার সঙ্গে চূড়ান্ত খারাপ কিছু ঘটতে চলেছে। তাঁর নীরব ইশারায় শুরু হল রড দিয়ে সম্মিলিত প্রহার। চোখে অন্ধকার দেখছিলাম আমি। সেই সঙ্গে কানে আসছিল তোর বাবার বলা কথাগুলো, 'কুকুরের পেটে জানিস তো ঘি সহ্য হয় না। আমিও আসলে সেই ভুল করেছিলাম তোকে পড়াশোনা শিখিয়ে। সেজন্য তুই আমার ছেলেটাকে নিজের বিকৃত কামনার শিকার বানিয়েছিস। তোর অপরাধের কোন ক্ষমা নেই। শরীরের বড় জ্বালা না তোর! আজ তোর জ্বালা মেটানোর ব্যবস্থা করছি।'

এরপর আমাকে রক্তাক্ত অর্ধমৃত অবস্থায় পুঁতে দেওয়া হয় ওই গুদামঘরের মেঝেতে। দম বন্ধ হয়ে মৃত্যুর সে কী কষ্ট! সেদিন থেকে আজ অবধি আমি মুক্তির দিন গুনছি। একটাই দুঃখ যে তোর সঙ্গে শেষবারের মত দেখা হয়নি। তোকে বলে যেতে পারিনি যে আমি স্বেচ্ছায় হারিয়ে যাইনি। তোর অতীশ বিশ্বাসঘাতক নয় আর সে অর্থের জন্য তোর কাছে এসেছিল এমন অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা। আজ সব দুঃখ ঘুচে গেল। ভালো থাকিস। আর হয়তো দেখা হবে না রে কেননা এ ভাবে দেহ ধারণ করতে বড় কষ্ট। তাছাড়া কত বছর ধরে আমি এভাবে জীবন-মৃত্যুর মাঝের এক ঘূর্ণিপাকে আটকে রয়েছি। সত্য বলতে আমি ঈশ্বরের নিয়মকে লঙ্ঘন করছি কিন্তু আর নয়।”

অতীশের আত্মা অদৃশ্য হয়ে গেল। শার্লি কান্নায় ভেঙে পড়ে। লিঙ্গ পরিবর্তন করে সে বাবাকে সঠিক জবাব দিয়েছে ঠিকই কিন্তু নিজের সবচেয়ে প্রিয় মানুষটিকে আজ সে চিরতরে হারিয়ে ফেললো। এতদিন তবুও একটা ক্ষীণ আশা ছিল। বিজয় এসবের কিছুই জানে না আর কোনদিন জানবেও না। নিজের পরিবারের এত বড় কলঙ্কের কথা না জানাই শ্রেয়।”

ধপ করে আওয়াজ হল। স্বর্ণময়ী পড়ে গিয়েছেন। সত্যেন্দ্র নাড়ি দেখে বুঝলো সব শেষ। মা আর নেই।

কিছুদিন পর দেশে ফিরে আসে শার্লি তথা সত্যেন্দ্র। সঙ্গে আসে বিজয় ও লিজা। তৈরি হয় অতীশ দাতব্য চিকিৎসালয়।

গুদামঘর থেকে তুলে অতীশ-এর মৃতদেহের যথাবিহিত সৎকার করে শার্লি। শার্লি তথা সত্যেন্দ্র তার প্রিয়জনের মুখাগ্নি করে। 

এদিকে শুরু হয়েছে আর এক সমস্যা। স্ত্রীর মৃত্যুর পর থেকে দ্বিজেন্দ্রের কিছু মানসিক সমস্যা দেখা দিচ্ছে। সবসময় তিনি পূর্বপুরুষদের ছবির সামনে ঘুরে বেড়ান আর বলে চলেন একটাই কথা, “সমকামিতা কী প্রেমের নামান্তর! কী বলেন আপনারা? কী অভিমত আপনাদের?”

No comments:

Post a Comment