আঁচড়
ঋষভ চট্টোপাধ্যায়
লঞ্চের ডেকের কোণটায় একটা পা রেখে ঈষৎ ঝুঁকে চোখে দূরবীনটা লাগায় ঈশান। বাদাবনের মধ্যে এই জায়গাগুলোতেই যে দক্ষিণরায়ের দেখা মিলতে পারে, সেটা এই ক’মাসে জেনে গিয়েছে ও। সুন্দরবনের লোকসমাজে প্রবাদের মতো বয়ে বেড়ায় যে হাওয়া, তাতে কান পাতলেই শোনা যায়-- বাইরের লোকের কাছে ডোরাকাটার দেখা পাওয়া যতই রোমাঞ্চের, স্থানীয়দের কাছে ঠিক ততটাই আতঙ্কের।
দূরবীনটা চোখ থেকে নামায় ঈশান। বাঘ দেখার নেশায় আসল কাজে ঢিলে দিলে চলবে না। গাঙ্গেয় ডলফিনদের নিয়ে পি. এইচ. ডি করছে ঈশান। সেই গবেষণার ফিল্ড ওয়ার্কের জন্যই গত মাস ছয়েক কখনো ধাংমারী, তো কখনো দুধ্মুখি দৌড়োতে হয়েছে ওকে। গাঙ্গেয় ডলফিনদের বেশিরভাগ বিচরণক্ষেত্র যেহেতু বাংলাদেশের অন্তৰ্গত, তাই সুন্দরবনের ভারত সরকারের অধিকৃত অংশ দিয়ে সেখানে যাওয়া সম্ভব নয়। তাই ঢাকা গিয়ে স্পেশাল পারমিশন জোগাড় করে তবে এই ফিল্ড ওয়ার্কে নামতে পেরেছে সে।
আজ সে যাচ্ছে চাঁদপাই স্যাংচুয়ারি। পথ বেশ অনেকটাই, তায় আবার এখন ভাঁটার টান চলছে বলে লঞ্চের গতিও বেশ কম। দিগন্তের গেরুয়া বসন ধীরে ধীরে রাতের কালি মাখছে ম্যানগ্রোভের উপর দিয়ে। পিছন ফিরে ফকিরকে ডাকে ঈশান,
“কী ভাই, আর কতক্ষণ লাগবে ?”
“আরো ঘন্টা দেড়েক লাগবে। নৌকোর গতি নাই তো।”
“সেরেছে ! সন্ধ্যা নেমে যাবে তো ?”
“নোঙ্গর করতে হবে একটু এগিয়ে। রাত নামলে আর এগোনো যাবে না। কাল সকালে আবার...”
“সে কী ! পাড়ের কাছে তো তাঁর ভয় ! রাতে যদি তিনি লঞ্চে উঠে আসেন ?”
ফকির ফিক করে হেসে ফেলে।
“আপনি বাদাবন দেখে উঁকিঝুঁকি মারছেন দেখছিলাম। কিন্তু লাভ নাই, এই জায়গাটায় তিনি তেমন একটা দেখা দেন না। ওনাদের ঘোরাফেরার জায়গা নদী পেরিয়ে উত্তরের জঙ্গলে। তাছাড়া রাতে লঞ্চের দু’ধারে মশাল জ্বালিয়ে দেব। উনি কৃপা করবেন বলে মনে হয়না।”
‘‘দ্যাখো, যা ভালো মনে হয়।”
ঈশান মুখে কথাটা বললো বটে, কিন্তু মনের মধ্যে কাঁটাটা বিঁধেই রইল। এদিকে উপায়ও কিচ্ছু নেই। এনথ্রোপোলজির ছাত্র হিসেবে সে খুব ভালো করেই জানে যে কোনো বিশেষ বস্তুতান্ত্রিক পরিবেশে সেখানকার স্থানীয় মানুষদের ভরসা করাটাই সবথেকে বড়ো বিচক্ষণতার পরিচয়। পরিবেশ মানুষকে এমন অনেক কিছু শেখায় যেটা লাইব্রেরির বিজ্ঞান পারেনা।
ফকির অবশ্য লাইব্রেরি আর জঙ্গল দু’দিকেরই মানুষ। তার ভিটে-মাটি, আদিপুরুষ সব এখানকার হলেও স্কুল ও কলেজ লাইফ কেটেছে কলকাতায়। এটা শোনার সঙ্গে সঙ্গেই ঈশান বুঝতে পেরেছিল কেন ফকিরের বাংলায় সুন্দরবনের উপভাষার ছাপ প্রায় নেই। হাওড়ার একটি সরকারি স্কুল এবং তারপর আশুতোষ কলেজে পড়াশুনো শেষ করে, সে সটান ফিরে আসে এখানে। এখানকার একটি স্কুলে পড়ানোর কাজে যোগ দেয়। লঞ্চ নিয়ে ঘুরে বেড়ানোটা যতটা জীবিকার জন্য, তার থেকেও বেশি শখে। স্কুল থেকে ছুটি পেলেই বেরিয়ে পড়ে মাতলা, বিদ্যাধরীর শরীর বেয়ে। বহু কষ্টে টাকা জমিয়ে লঞ্চটা কিনেছিলেন শ্যামল সাঁতরা। ছেলে যখন স্কুল-মাস্টারির ফাঁকে ফাঁকে তাই নিয়ে বাড়তি রোজকার করার কথাটা পাড়লো, তিনি আর না করেননি।
এই ক’মাসে দুই সদ্য-ত্রিশের যুবকের মধ্যে বন্ধুত্বটা জমেছে বেশ। ভূগোলের ছাত্র হওয়ার সুবাদে ফকির ঈশানের গবেষণা নিয়ে বিশেষ আগ্রহী। দুজনেই একে ওপরের পড়াশুনো থেকে পুষ্টি শুষে নেয়। ঈশান গাইড বর্ধন স্যারকে শুধু বলেছিল এমন কারোর লঞ্চ পেলে ভালো হয় যিনি এখানকার জলজ প্রাণীদের হ্যাবিট্যাট সম্পর্কে ধারণা রাখেন। বর্ধন স্যারের লোক কপাল গুনে এমন একজনকে খুঁজে দিল, যে দরকারের থেকেও বেশি সুবিধা হয়ে গেল ঈশানের। দুজন হেল্পারকে নোঙ্গর করার জায়গা দেখিয়ে দিয়ে, আরো কিচ্ছু টুকটাক নির্দেশ দিয়ে লঞ্চের খোলা জায়গাটায় একটা চেয়ার নিয়ে ঈশানের পাশে এসে বসল ফকির। সন্ধে নামার আগে ঠিক এইখানটায় বসে দুজনে মিলে চা খাবার একটা অভ্যাস হয়ে গিয়েছে এই কদিনে।
“চা খাবেন তো ?”
“হ্যাঁ, হলে মন্দ হয়না।”
মদনকে ডেকে দু’কাপ চা করতে বলে ফকির। কাল ঠিক কোথায় তারা ডলফিনের দেখা পেতে পারে, সেই বিষয়ে কিছু একটা জিজ্ঞেস করতে যাচ্ছিল ঈশান, ফকিরের দিকে তাকিয়ে থেমে গেল। ওর কুঁচকে ওঠা চোখে কিসের একটা চিন্তার ছাপ।
“কী হে ? কী নিয়ে এতো চিন্তা করছো ?”
হালকা হাসে ফকির।
“আপনি দক্ষিণরায়কে নিয়ে চিন্তা করছেন, আর আমি চিন্তা করছি মায়াকে নিয়ে।”
“মায়া ? সেটা আবার কে ?”
“মায়া হলেন তিনি, যাঁর ভয়ে বুঝি দক্ষিণরায়ের বুকও কেঁপে যায়। এই এলাকাটা মোটেই ভালো না। তাঁর উপদ্রবে স্বয়ং দক্ষিণরায়ও এই পথ মাড়ান না।”
কয়েক সেকেন্ড ফকিরের দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে থাকে ঈশান। তারপর হো হো করে হেসে ওঠে,
“হায় রে! আমি ভাবছিলাম তুমি শিক্ষিত ছেলে, এখানকার আর পাঁচটা মানুষের মতো নও। সেই তুমিও কিনা শেষমেষ প্রেতযোনিতে...”
“শিক্ষা বড়োই বহুমাত্রিক জিনিস, ঈশানবাবু। আপনাদের কলকাতার লোকের কাছে যা শিক্ষা, তা আমাদের কাছে বিলাসিতা। আবার আপনাদের স্কুলে যা পড়ানো হয়না, তা না জানলে আমরা এখানে বেঘোরে মারা পড়ব। এই যেমন ধরুন, মাছ ধরতে গিয়ে হঠাৎ ঝড় উঠলে কী করে বাঁচতে হয়, মধু পাড়তে এলে কী করে বুঝবো আশেপাশে তিনি আছেন কিনা, বা ধরুন কোনো নদীতে কামট আছে নাকি-- এসব কী আপনাদের স্কুল কলেজে শেখায় ?’’
“সে তুমি ঠিকই বলছ। কোনটা জ্ঞানের বস্তু আর কোনটা নয়, সেটা জাত-ধর্ম, গরিব-বড়োলোক ভেদে পাল্টে যায়। কিন্তু এটা তো অন্ধবিশ্বাস।”
“কোন বিশ্বাস অন্ধ আর কোন বিশ্বাসে চোখ খুলে যায়, সেটা যে ছ’মাস থেকে বোঝা যাবে না ঈশানবাবু।” ফকিরের কণ্ঠে বন্ধুত্বপূর্ণ বিদ্রুপ। “বিশ্বাসও স্থান বিশেষে পাল্টে যায়। গড়িয়াহাট মোড়ের জমাট আলোর মধ্যে দাঁড়িয়ে যে জিনিস আজগুবি লাগে, এই আদিগন্ত ম্যানগ্রোভ আর খাড়ির মাঝে বসে থাকা সন্ধ্যাবেলায় সেই সবকিছুর প্রতি বিশ্বাস আপনিই চলে আসে।”
ঈশান কয়েক মুহূর্ত স্থির চোখে তাকিয়ে থাকে ফকিরের দিকে। তারপর বলে, “বুঝলাম। তা তোমার এই মায়াদেবী যদি সত্যিই থাকেনও, তার থেকে ঠিক কী রকম বিপদের আশঙ্কা করছ ?”
“সে কী করে বলি বলুন ? তাঁর সাথে তো কোনোদিন সমুখ সমরে যাওয়া হয়নি। তবে এই এলাকা যে তাঁর সে কথা বিলক্ষণ জানি। তবে চিন্তার কারণটা সেটাও না।”
“তবে কী ?”
রাঁধুনি মদন প্লেটের উপর দুটো চায়ের কাপ বসিয়ে এগিয়ে আসছে। ওরা কাপ দুটো প্লেট থেকে তুলে নেয়। চোখাচোখি হয় ঈশানের। সঙ্গে সঙ্গে সেই এক অস্বস্তির অনুভুতিটা ফিরে আসে। গত তিনদিনে এই অস্বস্তিটা বারবার অনুভব করেছে ঈশান। কিছু একটা আছে লোকটার তাকানোর মধ্যে যেটা ওর ভালোলাগে না। চোখের মণিদুটো কেমন যেন ঘুরে চলছে, যেন প্রতি মুহূর্তে রেকর্ড করে নিচ্ছে চারপাশের সবকিছু। ওই চোখের দিকে তাকালেই যেন মনে হয় এমন কিছু চলছে ওর মাথার মধ্যে যা অন্যেরা আঁচ পর্যন্ত করতে পারবেনা। মদন চলে যেতে ঈশান আবার জিগেস করে ফকিরকে,
“কী চিন্তার কারণ বলছিলে যেন ?”
“হ্যাঁ, যা বলছিলাম। আজ সকালে খবর পেলাম যে ওই পাড়ের কাছেই যে নোনাপুরী গ্রাম সেখানে একটা খুন হয়েছে।”
“খুন ?”
“হ্যাঁ, তবে খুনের পদ্ধতিটা বড়ো অদ্ভুত। লোকটার গলাটা নাকি কেউ ধারালো কিছু দিয়ে ছিঁড়ে দিয়েছে।”
“তো তাতে অদ্ভুতের কি হল ? গলার নলি কেটে খুন তো খুবই চেনা একটা খুনের পদ্ধতি।”
“আহা ! আপনি বুঝতে পারছেন না। লোকে বলাবলি করছে যে, যেরকম দাগ গলায় রয়েছে, সেরকম নাকি ছুরি, চাকুতে হয়না। ওই দাগ থেকে লোকের ধারণা হয়েছে যে...’’, একটু ইতস্তত করে ফকির বলে, “এ মায়া ডাকিনীর কাজ।”
“ব্যাস ! শুরু হয়ে গেল। একটা খুন হয়েছে কী হয়নি... দ্যাখো ফকির, আজ সকালে বডি আবিষ্কার হয়েছে মানে এখনো নিশ্চয়ই পোস্টমর্টেম রিপোর্ট আসেনি। সেটা আসতে দাও। কী অস্ত্র, তাতে কতটা ধার ছিল, খুনের সময়, খুনি ডান হাতি না ন্যাটা... সবকিছু জানতে পেরে যাবে। একটু সবুর করো। গুজব ছড়িয়ো না।”
ধূমায়িত চায়ে চুমুক দেয় ঈশান।
“আপনি এসব বিষয়ে কিছুই জানেন না ঈশান বাবু।”
ফকিরের গলায় বিরক্তি। পকেট থেকে ফোনটা বের করে গ্যালারিটা খোলে।
“এই দেখুন, দেখুন ভালো করে। এইরকম দাগ কাউকে ডাকিনীতে না ধরলে হয়না। ছোটবেলা থেকে শুনে আসছি, ডাকিনীর আবির্ভাবের চিহ্ন হল তার হাতের ছাপ। ওই ছাপ কেউ নকল করতে পারেনা। কেউ না।”
ফকিরের গলায় উত্তেজনা ঈষৎ বেড়ে উঠেছে। ঈশান তাকে শান্ত করার চেষ্টা করে,
“আচ্ছা, ঠিক আছে, মাথা ঠান্ডা করো।”
ফকিরের হাত থেকে ফোনটা নিয়ে ভালো করে ছবিটা দেখে সে। গলাটা একেবারে ছিঁড়ে ফেলেছে, কিন্তু পর পর তিনটে তিনকোনা দাগ গলার উপরে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। যেন তিনটে ছুরি একসাথে চালিয়েছে কেউ।
“এটা তো নখের দাগ বলে মনে হচ্ছে।”
“তা নাহলে আর বলছি কী ? এবার বিশ্বাস হল তো যে এ দাগ ছুরির দাগ নয় ?”
“আরে বাবা ! এটা তো বাঘের কীর্তিও হতে পারে।”
একটা ব্যাঙ্গাত্মক শব্দ করে ফকির।
“চার বছর বয়েস থেকে বাঘে খাওয়া মানুষ দেখছি। আমি বাঘের নখের দাগ চিনবো না ?”
ঈশান আর কী বলবে খুঁজে পায়না। ফকিরকে শান্ত করার আর কোনো উপায় না পেয়ে উঠে ওর নিজের ঘরের দিকে হাঁটা দেয়।
সন্ধে প্রায় সাড়ে সাতটা। নিজের ঘরে বসে সারাদিনের অবসার্ভেশনের নোটগুলো লিখে রাখছিল ঈশান। হঠাৎ বাইরে থেকে একটা হৈ হৈ শুনে উঠে সার্সির কাছে এসে দাঁড়ালো। খালাসি দুটো রেলিঙের ধারে দাঁড়িয়ে হাত পা ছুঁড়ে চিৎকার জুড়ে দিয়েছে। কী হয়েছেটা কী ? ডিসেম্বরের সন্ধে। নদীর দিকটা থেকে হু হু করে কনকনে ঠান্ডা হাওয়া বয়ে আসছে। উইনচিটারের উপরে পশমের সালটা গায়ে জড়িয়ে বাইরে বেরিয়ে আসে ঈশান। হৈ হল্লা তখন আরো বেড়ে গিয়েছে। আওয়াজ পেয়ে ইঞ্জিন রুম থেকে বেরিয়ে এসেছে ফকিরও। দুজনেই একে অপরের দিকে মুখ চাওয়া চাওয়ি করে নদীর দিকের রেলিংটার দিকে এগিয়ে যায়।
“বাবু, দেহেন, দেহেন, নীচে দেহেন !” খালাসি দুটো ফকিরকে দেখে আরো জোরে হাঁকডাক করতে শুরু করেছে।
ফকিরের শান্ত মুখটা হঠাৎ করেই বিকৃত হয়ে ওঠে। নাকের পাটা ফুলিয়ে, খুব কড়া গলায় বলে ওঠে,
“কী আছে নীচে ? কী আছে নীচে সত্যি করে বল !”
খালাসিটা কাঁচুমাচু মুখে তাকিয়ে আছে। হু... হা... করে কিছু বলার চেষ্টা করে, কিন্তু পেরে ওঠেনা। ফকির গনগনে চোখে ওর দিকে তাকিয়ে আবার বলে,
“আমি যা ভাবছি, তাই ? কী, তাইতো ?”
খালাসির মুখটা ধীরে ধীরে অধোবদন হয়।
এক ঝটকায় ফকির রেলিঙের ধারে গিয়ে, পকেট থেকে টর্চ বের করে আলো ফেলে জলের উপর। ওর সাথে সাথে ঈশানও এগিয়ে এসেছিল। জোরালো টর্চের আলো নীচের কালো জলে একটা ছোট কিন্তু উজ্জ্বল বৃত্ত রচনা করেছে। সেই বৃত্তের ঠিক মাঝখানে যেটা বা বলা ভালো যাকে দেখতে পায় ঈশান, তাতে ও স্তম্ভিত হয়ে যায়। একটা বাচ্চা মেয়ে, বয়েস বড়োজোর চোদ্দ কি পনের, জলের মধ্যে ভাসছে। শরীরের জায়গায় জায়গায় লতাপাতা জড়িয়ে গিয়েছে। চোখ বন্ধ, মুখটা অল্প একটু খোলা। বুঝে নিতে অসুবিধা হয় না যে সে হয় সংজ্ঞাহীন না হলে মৃত।
কয়েক মুহূর্তের জন্য বোধবুদ্ধি হারিয়ে যায় ঈশানের। যেন বহুদূর থেকে শুনতে পায় ফকিরের কণ্ঠস্বর। খালাসিটার স্যান্ডো গেঞ্জির কলারটা ধরে নিজের দিকে টেনে ধরে চিৎকার করছে সে,
“তোর মরার শখ হয়েছে হারামজাদা, শয়তান ? তুই ওদিকে নজর দিলি কেন ? দিলি তো দিলি আমাদের ডাকলি কেন ? মরবি সালা নিজে মর। আমাদের মারতে চাস ?”
খালাসিটা ভয়ে আধমরা হয়ে গিয়েছে। চিৎকার শুনে অন্য চাকরেরাও দৌড়ে এল। কিন্তু ঈশানের সেসব দিকে মন নেই। সে এগিয়ে এসে ফকিরের সামনে দাঁড়ায়,
“এই শোনো, তোমাদের এসব ঝামেলা পরে করবে। আগে বাচ্চাটাকে বাঁচাতে হবে। হয়তো এখনো উপরে তুলে আনলে বেঁচে যেতে পারে।”
ফকির খালাসীকে ছেড়ে ঈশানের দিকে ঘোরে। গলার স্বরটা একটু নামিয়ে বলে,
“বাচ্চা ? আপনার একবিন্দুও ধারণা আছে নীচে যে জলে ভাসছে সে আসলে কে ?”
“হ্যাঁ ধারণা আছে। একটা পনেরো বছরের বাচ্চা মেয়ে যাকে এখনো তুলে আনলে বাঁচানো যেতে পারে।”
“বাঁচানো না, আমাদের নিজেদেরই মারা পড়তে হতে পারে।”
হিসহিসিয়ে বলে ওঠে ফকির।
“নীচে যে ভাসছে, সে মায়া ডাকিনী। এইভাবেই ও মানুষকে বোকা বানিয়ে লঞ্চে ওঠে, আর তারপর...”
“ফকির...!”
গলার পারদ কখন চড়ে গিয়েছে ঈশান নিজেই বুঝতে পারেনি। ফকিরের দিকে আঙ্গুল উঁচিয়ে সে চিৎকার করে ওঠে,
“তোমার এই নোংরা কুসংস্কার আমি অনেক সহ্য করেছি। নিজের বিশ্বাস নিয়ে নিজে থাকো, আমি কিচ্ছু বলতে যাবো না। কিন্তু এখন যদি আমরা ওকে না তুলে আনি, তাহলে একটা জলজ্যান্ত বাচ্চা মেয়ে একটু একটু করে মরে যাবে। তোমাকে আমি মানুষ খুন করতে দেবোনা, ফকির।”
ভদ্রতার সীমা এখনো ধরে রাখার ইচ্ছে ফকিরেরও ছিল না। সেই ঈশানের মুখের সামনে এসে চিৎকার করে ওঠে,
“ঈশানবাবু, আপনি যেটা বোঝেন না, সেটা নিয়ে নাক গলাবেন না। ওকে উপরে না তুললে একটা খুন হবে, আর তুলে আনলে ছ’টা মানুষের খুনের জন্য দায়ী থাকবেন আপনি।”
“ঠিক আছে। তোমাদের কিচ্ছু করতে হবেনা। তোমরা শুধু দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দ্যাখো। আমাকে একটা দড়ি দাও শুধু। আমি নিজেই যা করার করছি।”
ফকির রাগী গলায় কেটে কেটে বলে,
“কেউ আপনাকে কিচ্ছু দেবেনা ঈশান। আপনি আপনার ঘরে ফিরে যান। অনেকবার ভদ্রভাবে অনুরোধ করেছি। এবার কিন্তু...”
“এবার কী ফকির ? জলে ছুঁড়ে ফেলে দেবে আমাকে ? তোমাদের ফেলার দরকার নেই, আমি নিজেই যাচ্ছি।”
কেউ কিছু বোঝার আগেই রেলিঙের দিকে দ্রুত পায়ে এগিয়ে যায় ঈশান। খালাসিটাকে ধাক্কা মেরে সরিয়ে সোজা ঝাপ দেয় অন্ধকার জলে। জলে পড়ামাত্র কনকনে ঠান্ডায় সারা শরীর অবশ হয়ে আসে তার। কয়েক সেকেন্ড ধাতস্থ হয়ে হাত পা ছুঁড়ে বোঝার চেষ্টা করে মেয়েটা ঠিক কোথায়।
ততক্ষণে লঞ্চে হুলুস্থূল কান্ড বেঁধে গিয়েছে। ফকির গভীর একটা শ্বাস ছেড়ে বিড়বিড় করে বলে ওঠে,
“শেষ ! সব শেষ ! ছ’ ছ’টা লোক মরবে আজকে।”
বলেই নির্দেশ দেয় খালাসীদের,
“এই, দড়ি ফ্যাল। উঠিয়ে আন শয়তানটাকে। সালা নিজেও মরবে, আমাদেরও মারবে।”
ডেকে তুলে এনে ঈশানের ঘরে নিয়ে আসা হল মেয়েটিকে। ওকে মেঝেতে শুইয়েই ঈশান আগে ওর পালস্টা দেখে। যাক! বেঁচে আছে এখনো। তবে এখনো সে অজ্ঞান। খালাসি দুটো মেয়েটাকে নামিয়েই পালিয়েছে। শুধু ফকির থেকে গিয়েছে ঘরে।
“তুমি চাইলে আমাকে সাহায্য নাও করতে পারো।” ভেজা জামা পাল্টাতে পাল্টাতে বলে ঈশান।
“আপনি আমাদের অতিথি, ঈশানবাবু। আপনার প্রতি আমাদের একটা দায়িত্ব আছে। তাইজন্যই এখন আপনি এখানে। নাহলে এখনো ওই জলের মধ্যেই পড়ে থাকতেন।”
“তোমাকে অশেষ ধন্যবাদ। আর কী বলব বলো ? এখন রান্নাঘর থেকে একটু দুধ গরম করে এনে দিতে পারো ? একে খাওয়াতে হবে।”
ফকির বেরিয়ে যায় ঘর থেকে। ঈশান ভালো করে দেখে মেয়েটাকে। ফুটফুটে একটা কিশোরী। বয়েস হয়তো তেরো- চোদ্দরও কম হবে। দেখে মনে হচ্ছে অনেকটা জল ঢুকে গিয়েছে শরীরে, তাইজন্যই এখনো জ্ঞান ফিরছে না। ঈশান উবু হয়ে বসে মেয়েটার পেটের উপর চাপ দিতে শুরু করে। আধ মিনিট পরে ভলকে ভলকে মুখ থেকে জল বেরোতে শুরু করল। আরো জোরে জোরে চাপ দিতে থাকে ঈশান। খানিকক্ষণ এভাবে জল বেরিয়ে আসার পর হঠাৎ ঝাকুনি দিয়ে চোখ খুলে উঠে বসে মেয়েটি। উঠে বসেই কাশতে কাশতে আরো খানিকটা জল বমি করে সে।
ঈশান নিশ্চিন্ত হয়ে এবার পা মুড়ে বসে মেয়েটার সামনে।
“একটু সুস্থ বোধ করছ ?”
মেয়েটা খুব ধীরে ধীরে মাথা উপরে নীচে করে। এখনো কাশছে ক্রমাগত। ফকির দুধের গেলাস হাতে ভেতরে আসে। গেলাসটা ঈশানের হাতে ধরিয়ে চৌকির ধারটায় বসে।
“নাম কী তোমার ? কোথায় থাকো ? এখানে এলে কীকরে ?”
নরম গলায় জিজ্ঞেস করল ঈশান।
মেয়েটা বড়ো বড়ো চোখ করে ওদের দিকে তাকায়। ইতস্তত আশপাশটায় দৃষ্টি ছুঁড়ে ছুঁড়ে বোঝার চেষ্টা করে ও কোথায় আছে এই মুহূর্তে। তারপর হঠাৎই তার বছর চোদ্দর শিখিয়ে দেওয়া লজ্জাবোধ সচেতন হয়ে ওঠে। তাড়াতাড়ি ভেজা ওড়ানাটাকে মাটি থেকে তুলে নিয়ে গায়ের উপর লেপ্টে নেয়। একটিবার সঙ্কোচ ভরা দৃষ্টি ঈশানদের দিকে উঠে এসেই আবার নেমে যায়। মাথা নামিয়ে বসে আছে সে।
“তোমার কোনো ভয় নেই। আমাদের তোমার দুজন দাদা - ই ভাবতে পারো।”
অল্প একটু হেসে বলে ঈশান। ঘাড় ঘুরিয়ে সম্ভবত সমর্থনের জন্যই ফকিরের দিকে তাকায়। ফকিরের মুখে এক চিলতেও হাসি নেই। প্রবল সন্দেহে ভুরুজোড়া কুঁচকে আছে তার। ভয়ে কুঁকড়ে থাকা মেয়েটিকে স্বাভাবিক করার কাজটা ওকে একাই করতে হবে, বেশ বুঝতে পারে ঈশান।
“শোনো, তুমি এই একটু আগে অবধি নদীর কনকনে ঠান্ডা জলে একটা কাঠের পাটাতনকে আঁকড়ে ধরে ভাসছিলে। তোমার জ্ঞান ছিল না। ভাসতে ভাসতে এই লঞ্চটার সঙ্গে এসে ধাক্কা খেল তোমার ওই পাটাতন। তখন আমি আর তোমার এই দাদা মিলে তোমাকে লঞ্চের উপরে তুলে আনলাম।”
মেয়েটার চোখে ধীরে ধীরে একটা কৃতজ্ঞতার সরল হাসি ফুটে উঠলো। হাত দুটোকে বুকের কাছে জড়ো করে আছে সে। ঈশান বুঝতে পারলো ধন্যবাদ জানাচ্ছে তাদেরকে।
“আচ্ছা বেশ বেশ। আর অত ‘থ্যাঙ্ক ইউ’ বলতে হবেনা। শোনো, তোমার তো জামাকাপড় সব ভিজে গিয়েছে, এইসব পরে থাকলে তো ঠান্ডা লেগে যাবে। একেই বাইরে এরকম কনকনে শীত। আমি বরং তোমাকে আমার একটা শার্ট আর প্যান্ট দিচ্ছি। তুমি কাপড় পাল্টিয়ে ফেল। আমরা বাইরে দাঁড়াচ্ছি। তারপর তুমি কোথা থেকে এলে, কিভাবে জলে পড়ে গেলে সব গল্প শুনবো। কেমন ?”
“আমি বাড়ি যাবো।”
একটা ধরা অথচ অসম্ভব সুরেলা গলায় এই প্রথম কথা বলল মেয়েটি।
“হ্যাঁ, বাড়ি তো অবশ্যই যাবে। কাল আলো ফুটলেই, আমরা তোমার গ্রামে গিয়ে তোমাকে তোমার মা বাবার হাতে তুলে দিয়ে আসবো। এই কুয়াশাভরা রাতে তো আর লঞ্চ নিয়ে এগোনো যাবে না। আজ রাতটা তোমাকেই এই লঞ্চেই কাটাতে হবে। আর কোনো উপায় নেই যে। ঠিক আছে ?”
যতটা পারা যায় নরম গলায় কথাগুলো বলে ঈশান।
মেয়েটি সংকুচিত মুখে অল্প একটু ডানদিকে ঘাড়টা হেলায়। ঈশান ওর ট্রলিটা খুলে একটা শার্ট,প্যান্ট আর একটা তোয়ালে বের করে ওর হাতে দেয়। তারপর ওর মাথায় আলতো করে হাত রেখে বলে,
“তুমি দরজা বন্ধ করে নতুন জামাকাপড় পরে ফেল। আমরা বাইরে অপেক্ষা করছি।”
বাইরে বেরিয়ে এসে রেলিঙের দিকে ধীরে পায়ে এগিয়ে যায় ওরা। ফকির সিগারেট ধরায় একটা। বসার জায়গাটার পাশে একটা কাঠের হাতলের উপর থেকে একটা গামছা নিয়ে ভেজা চুলটা মুছতে থাকে ঈশান। ফকির শান্ত অথচ গম্ভীর গলায় বলে,
“আপনিও এবারে ভেজা জামাকাপড়গুলো ছেড়ে নিন, ঈশানবাবু। ঠান্ডা বাতাস দিচ্ছে। এই জল-হাওয়ায়, ভর সন্ধেবেলায় এখানকার জলে ভেজার অভ্যাস আপনার নেই। জ্বর এসে যাবে। উপরে চলে যান। আমার ঘরের আলনায় এক সেট ঘরের পরার পাজামা পাঞ্জাবি রাখা আছে। যান।”
ফকিরের কথাগুলো এড়িয়ে ওর চোখে চোখ রাখে ঈশান,
“তোমার এখনো মনে হয় ও কোনো পিশাচ বা ডাকিনী বা ওরকম কিছু ? নিজের চোখেই তো দেখলে বেচারিকে। ওই ফুটফুটে, ফুলের মতো বাচ্চা মেয়েটা...”
ঈশানের কথা মাঝপথে কেটে বলে ফকির।
“মায়া যখন আসে, তখন সে এইরকম রূপ ধরেই আসে, ঈশানবাবু। সে মানুষের, বিশেষ করে পুরুষ মানুষের মনের নরম প্রবৃত্তিগুলোকে বাড়িয়ে দেয়, যাতে করে তাকে তারা ঘরে বা নিজেদের কাছে আশ্রয় দেয়। ধীরে ধীরে তাদের বিশ্বাস অর্জন করে। তারপর অতর্কিতে...”
“তার মাথায় উঠে পড়ে সোজা ঘাড়টি মটকে দেয়, তাইতো ?”
মিনিট কুড়ির আগের রাগ এখন স্তিমিত হয়ে এসেছে ঈশানের মনে। সে যে শেষমেশ উচিত কাজটা করতে পেরেছে, এটা ভেবে বেশ ফুরফুরে লাগছে তার।
“ছাড়ুন, বাদ দিন।”
ফকিরের গলায় বিরক্তির ভাব স্পষ্ট।
“আপনি আমাকে একটা অন্য কথা বলবেন ?”
“স্বচ্ছন্দে।”
“এই যে আপনারা এসি ঘরে বসে বড়ো বড়ো কনফারেন্সে সরকারি টাকায় চর্ব্য-চোষ্য খেয়ে বলেন, যে ‘সুবিধাভোগী শ্রেণীর জ্ঞান আর প্রান্তিক মানুষের জ্ঞানের মধ্যে উঁচু - নীচ ভেদাভেদ থাকা উচিত না’ --সেটা পুরোটাই পাবলিসিটির জন্য, তাইনা ? মানে নিজের জীবনে সেটা তো একফোঁটাও বিশ্বাস করেন না দেখছি।”
স্মিত হাসে ঈশান।
“না, ফকির, নিজের জীবনেও ঠিক অতটাই বিশ্বাস করি। অন্যদের কথা জানিনা, তবে আমি তো অন্তত করি। কিন্তু কী জানো তো ফকির ? অন্ধবিশ্বাস বা কুসংস্কারের কোনো শহর, গ্রাম, গরিব, বড়োলোক হয়না। শহরে ছেলেধরা সন্দেহে নিরীহ মানুষকে পিটিয়ে মারে জনতা। ঠিক সেইভাবেই মারে যেভাবে ডাইনি সন্দেহে কোনো নির্দোষ বৃদ্ধাকে মারে গ্রামের লোক। আর এই দুটো প্রবণতার মধ্যেই একটা বিরাট মিল আছে, কোথায় বলো তো ?”
লম্বা একটা সুখটান দিয়ে গলগল করে অনেকটা ধোঁয়া ছেড়ে ফকির বলে, “কোথায় ?”
“দুটোর মধ্যেই রাজনীতিটা এক। একা একটা মানুষের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো জনতার আগ্রাসী লালসা !”
সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে যায় ঈশান। জলের শব্দে উল্টোদিকের অন্ধকার বাদাবনের মাথা নাড়া দেখতে দেখতে ধোঁয়া ছাড়তে থাকে ফকির।
একটু পরে ফকিরের জামা পরে নীচে নেমে আসে ঈশান। মেয়েটি জামাকাপড় ছেড়ে দরজার কাছটায় দাঁড়িয়ে রয়েছে। তার মুখে একটা কী করবে বুঝতে না পারা ভাব। ফকির ওর দিকে পিছন ফিরে এখনো এক মনে সিগারেট টেনে যাচ্ছে।
“চলো আমরা ঘরের ভিতরে গিয়ে বসি। বাইরে বড় কনকনে হাওয়া দিচ্ছে।”
বলে ফকিরের দিকে ঘুরে হাঁক পাড়ে ঈশান,
“কই হে ফকির ? এসো।”
লঞ্চ মালিকের সাথে এই অকস্মাৎ উড়ে এসে জুড়ে বসা অতিথির বন্ধুত্ব করিয়েই ছাড়বে বলে ঠিক করে ফেলেছে সে। মুখভর্তি অনীহা নিয়ে সিগারেটটা জলের মধ্যে ছুঁড়ে ফেলে ঘরের দিকে এগিয়ে আসে ফকির।
“চলো, ঘরেই জমিয়ে বসা যাক। যা ঠান্ডা, আরেক কাপ চা বলবে নাকি ?”
তিনকাপ চা করতে বলে ঘরে এসে ঢোকে ফকির। ঈশান আর মেয়েটি ততক্ষণে আড্ডা জুড়ে দিয়েছে। মেয়েটিও জড়তা কাটিয়ে বেশ হেসে হেসে কথা বলছে।
“দাঁড়াও, দাঁড়াও। তোমাকে তো আমাদের পরিচয়টাই দেওয়া হয়নি। আমি হচ্ছি ঈশান, আর এই যে দাদাটা-- ওর নাম হল ফকির। এই লঞ্চটা ওরই। আমরা দুজন মিলে ডলফিনদের উপরে একটু পড়াশুনো করছি সুন্দরবনে ঘুরে ঘুরে।”
ফকির গম্ভীর, তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে; অল্প একটু মাথা নাড়ে। মেয়েটি চোখ বড়ো বড়ো করে শুনছে।
“তোমাদের বাড়ি কোথায় ?”
“আমার বাড়ি তো কলকাতা। তোমার ফকিরদা অবশ্য তোমাদের এখানকারই লোক। সাগরদ্বীপের। আচ্ছা, আমাদের কথা তো হল। এবার তোমার কথা বলো। তোমার নাম থেকে শুরু করো দেখি।”
এই সময় দরজায় ঠক ঠক। ফকির গলা তুলে বলে,
“হ্যাঁ, মদন, ভিতরে এস।”
মদন দরজা ঠেলে হাতের চায়ের ট্রে নিয়ে ভিতরে আসে। ভেতরে ঢোকামাত্র তার চোখ স্থির হয়ে গিয়েছে মেয়েটির উপর। তাকে লঞ্চ তুলে নিয়ে আসা ইস্তক মদন রান্নাঘরেই ছিল। এই প্রথমবার মেয়েটিকে দেখছে সে। কুঁচকানো চোখে সে তাকিয়ে রয়েছে তার দিকে-- যেন গিলে খেয়ে নেবে এক্ষুণি। মাথার চুল থেকে পায়ের নখ অবধি শরীরের প্রতি ইঞ্চি যেন জরিপ করে চলেছে মদনের লাল চোখ। সেই লালসা-দৃষ্টি এতোই নির্লজ্জ আর রাখঢাকহীন, যে মেয়েটি তাড়াতাড়ি খাট থেকে বালিশটা টেনে এনে বুকের উপর চেপে ধরে বসে। ঝট করে মুখ ঘুরিয়ে নেয় দেয়ালের দিকে।
“মদন !”
ব্যাপারটা নজর এড়ায়নি ফকিরের। কড়া গলায় ধমক দিয়ে ওঠে সে। মদন কিন্তু নির্বিকার, মালিকের ধমক অগ্রাহ্য করে তখনও তাকিয়ে আছে সে।
“মদন !” আরো জোরে চিৎকার করে ওঠে ফকির।
এবার মদন ধীরে ধীরে চোখ নামিয়ে হাতের ট্রে-টা সামনে রাখল। কাপগুলো হাতে তুলে দিতে যাচ্ছিল, ফকির আবার ধমকে ওঠে,
“ওটা রাখ ওখানে। বাইরে যা। দূর হ !”
মদনের চোখে বিন্দুমাত্র বিকার দেখা গেল না। সে ট্রে-টা নামিয়ে আরেকবার অশ্লীল একটা দৃষ্টি মেয়েটার সারা শরীরে বুলিয়ে বেরিয়ে গেল ঘর ছেড়ে।
রাগে ঘেন্নায় গা-টা রি রি করছে ঈশানের। নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করে সে। এক্ষুণি যেটা ঘটে গেল সেটাকে মাথার পিছনে ঠেলে দিয়ে জিজ্ঞেস করে,
“হ্যাঁ, কী বলছিলাম যেন আমরা? ওহ হ্যাঁ, তোমার গল্পটা শুনবো। নাও, শুরু করো।”
মেয়েটির কথায় জানা গেল মেয়েটির ভালোনাম, ডাকনাম দুটোই পরী। পরী কর্মকার। তার বাড়ি গোসাবার কাছে একটা ছোট্ট গ্রামে। বাড়িতে তার বাবা, মা, ছোট্ট একটি ভাই আছে। বাবা নদীতে মাছ ধরতে যায়, আর মা গোসাবায় বাবুদের বাড়ি কাজ করে। সে গোসাবার এক স্কুলে সাত ক্লাসে পড়ছে। বাড়ির লোকের সঙ্গে নৌকো করে আত্মীয়ের বাড়ি যাচ্ছিল আজ দুপুরে। ওভারলোড হয়ে যাওয়ার কারণে মাঝপথে নৌকোটি উল্টে যায়। তার শুধু এইটুকু মনে আছে যে, সে জলে ডুবে যাচ্ছে। সে খুব অল্প অল্প সাঁতার জানে, ডুবে যাওয়ার সময় সে খুব চেষ্টাও করেছিল সাঁতরে পারে ওঠার। কিন্তু পারেনি। তারপর আর তার কিচ্ছু মনে নেই।
সবটা শুনে ঈশান আবারো তাকে আশ্বাস দেয় যে, তার চিন্তার কোনো কারণ নেই। কাল সকালেই তাকে তার গ্রামে পৌঁছে দিয়ে আসা হবে।
“ঈশানবাবু, একবার বাইরে আসুন।” ফকির বলে ওঠে।
“কেন ? কী হল ?”
“আসুন না। কথা আছে।”
আরো জোর দিয়ে বলে ফকির। অগত্যা ঈশানকে উঠে বাইরে আসতে হয়।
“আমার গতিক সুবিধের ঠেকছে না।”
অস্থিরভাবে পায়চারি করছে ফকির।
“উফফ ! কেন ? আবার কি হল ?”
“গোসাবা এখন থেকে অনেক দূরে ঈশান। ও যেখানে নৌকো ওল্টানোর কথা বলছে, সেখান থেকে নদীর স্রোতে ভেসে এই জায়গায় এসে পৌঁছনো সম্ভব না। সুন্দরবনের নদীতে সর্বক্ষণ কুমির, কামোট ঘুরে বেড়াচ্ছে। একটা চোদ্দ বছরের ভালো করে সাঁতার না জানা মেয়ের পক্ষে এতক্ষণ এই নদীতে অজ্ঞান অবস্থায় টিকে থাকা অসম্ভব।”
“ফকির শান্ত হও। মানছি তুমি আমার থেকে এখানকার পরিবেশ পরিস্থিতি নিয়ে অনেক বেশি জানো। কিন্তু চোখের সামনে যেটা দেখছি সেটা কী করে অস্বীকার করি বলো ?”
ঘরে ফিরে আসে ওরা। ঢুকেই ফকির জিজ্ঞেস করে,
“তোমার বাবা আজ ছিলেন তোমাদের সাথে নৌকো উল্টে যাওয়ার সময় ?”
“না।”
“তোমার বাবার ফোন নম্বরটা দাও তো। জানানো দরকার ওনাকে যে তুমি বেঁচে আছো, নিরাপদে আছো।”
মেয়েটি মনে করে একটা নাম্বার বলল। ডায়াল করে ফোন কানে লাগলো ফকির।
“ফোন লাগছে না। নট রিচেবল বলছে।”
“আরে বাবা, এই জঙ্গলের মধ্যে কোথায় নেটওয়ার্ক পাবে তুমি?”
“একটু আগেই আমার স্ত্রীকে ফোন করলাম। তখন তো দিব্যি লাগলো।” ফকিরের গলা থেকে ঝরে পড়ছে রাগ, চোখে অসহায়তা।
সুন্দরবনের মানুষ যেভাবে বাদাবনের দিকে তাকায়, ঠিক সেইভাবে একবার পরীর দিকে তাকিয়ে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল ফকির।
দরজার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে পরীর দিকে তাকায় ঈশান। পরীর চোখমুখে একটা কুন্ঠিত, লজ্জার ভাব।
“আমার জন্য আপনাদের অনেক বিপদে পড়তে হল তাইনা ?”
“ধুর! সেসব কিছুই না। আসলে...”
কথার মাঝেই একবার থামে ঈশান। একটু ভাবে যে এটা বলা ঠিক হবে কিনা। তারপর মনে হয়, ধুর, না বলারই বা কী আছে ?
“আসলে তোমার ফকিরদাদার মাথায় একটা পাগলামি ভর করেছে। তোমাদের এইসব এলাকায় নাকি একটা জনশ্রুতি চালু আছে-- মায়া ডাকিনীকে নিয়ে।”
নামটা শোনামাত্র ভয়ে সিঁটিয়ে ওঠে পরী।
“ঈশানদাদা, ও নাম মুখে নেবেন না। এই ভরসন্ধেবেলা ওসব কথা বলতে নেই।”
হো হো করে হেসে ওঠে ঈশান।
“তুমি তো ফকিরের এক কাঠি উপরে দেখছি।”
“ফকিরদাদার চিন্তা করাটা ভুল নয়।”
পরীর মুখ গম্ভীর।
“আমিও দিদার কাছে শুনেছি মায়া ডাকিনী নাকি শীতকালের রাত্রে পাড়ে নোঙ্গর করা নৌকায় উঠে আসে। তারপর...”
“থাক... তোমাকে অত ভয় পেতে হবেনা। আমরা দুজন আছি, নৌকায় এতগুলো লোক আছে, ভয় নেই তোমার। যাই হোক, শোনো, একটু বাদেই রাতের খাবারের ডাক পড়বে। তুমি আমাদের সঙ্গেই খাবে। আপাতত একটু বিশ্রাম করো।”
বাইরে বেরিয়ে উপরের ডেকে উঠে আসে ঈশান। কালচে দিগন্তের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে ফকির। ঈশান চেষ্টা করে ওকে একটু স্বাভাবিক করতে। খুব একটা লাভ যে হয় তা নয়, তবে দুজনে মিলে ঠিক হয় যে, একতলার ঈশানের ঘরেই রাতে পরী ঘুমোবে। উপরে ফকিরের ঘরেই আজ রাতটুকু কাটিয়ে দেবে ওরা দুজন। ফকিরের ঘরে একটাই ছোট পালঙ্ক। ঈশান একবার বলার চেষ্টা করেছিল যে সে নিজেই মাটিতে শুয়ে যাবে; কিন্তু ফকির এমনিতেই যা রেগে আছে, ঈশান কথাটা গিলে নেওয়াই শ্রেয় মনে করল।
রাত্রে একসাথে ডিনার সারতে বসে ফকির সামান্য একটু স্বাভাবিক হয়েছে বলে মনে হল। মদনকে রান্নাঘরের বাইরে বেরোতে বারণ করেছিল সে। একজন খালাসি খাবার সাজিয়ে দিয়ে গেল। ফকির নিজেই সার্ভ করে দিল সকলকে।
রাত্রে শোবার আগে ফকিরের মনের চাপ কমানোর জন্যই ঈশান ওর গবেষণা নিয়ে ওকে এটা ওটা জিজ্ঞেস করছিল। চালটা কাজে লাগলো। সুন্দরবনের জলজ বাস্তুতন্ত্র নিয়ে কথা বলতে বলতে ফকির যেন ভুলেই গেল ওর দুশ্চিন্তার কথা।
আলো নিভিয়ে ফকির ঘুমিয়ে পড়ার খানিক পরে কী মনে হতে একবার নীচে নেমে এল ঈশান। সিঁড়ির বাঁ-পাশেই ওর ঘর। দরজার নীচের ফাঁকটা চুইয়ে আলো এসে পড়ছে বাইরে। দরজার দিকে এগোনোর মুহূর্তে জানলার দিকটায় একটা মানুষের ছায়া দেখতে পেল সে। পা টিপে টিপে ছায়ার মালিকের ঠিক পিছনে গিয়ে দাঁড়ালো। যা ভয় করেছে ঠিক তাই।
“মদন !” রাগী গলায় ধমকে ওঠে ঈশান।
ছিটকে ফিরে তাকায় মদন। ওর পিছনের জানলার শার্সি ভেদ করে পরীকে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন অবস্থায় দেখতে পাচ্ছে ঈশান। সেই জানলায় মুখ লাগিয়ে দু’চোখ দিয়ে পরীকে গিলছিল শয়তানটা। ঈশান হঠাৎ করে পিছনে এসে যাওয়ায় হকচকিয়ে গিয়েছে। এক দু সেকেন্ড পরেই নিজেকে সামলে নেওয়ার চেষ্টা করে সে। কিন্তু ঈশান তাকে সামলানোর কোনো সুযোগ দিতে রাজি নয়।
সোজা এগিয়ে গিয়ে লোকটার গলার গামছাটা ধরে টেনে আনে সামনে। দু হাতে গলাটা টিপে ধরে দেয়ালে চেপে ধরে ওকে। প্রচন্ড রাগে একটা চাপা কণ্ঠস্বর বেরিয়ে আসে ওর গলা থেকে যেটা ও নিজেই চিনতে পারেনা।
“মদন! তোমার নোংরা স্বভাবের কথা তোমার দাদার আর আমার বুঝতে বাকি নেই। শুধু একটা কথা কান খুলে শুনে নাও, আর একবারও যদি তোমাকে আমি এই ঘরের ত্রিসীমানাতেও দেখি, তাহলে সোজা জলে ছুঁড়ে ফেলে দেব। আর ততক্ষণ ফেলে রাখবো যতক্ষণ না কুমির বা কামটে তোমাকে টেনে নিয়ে না যায়। মনে থাকবে?”
মদন গোঁ গোঁ করে কিছু একটা বলার চেষ্টা করে। ঈশান আবার ওর মাথাটা আরো জোরে ঠেসে ধরে কাঠের দেওয়ালে। নিজের ভারী বুট-সহ একটা পা চেপে ধরে মদনের এক পায়ের উপর।
“আমি একটা কথা জিজ্ঞেস করেছি। মনে থাকবে হ্যাঁ কি না ?”
মদন কোনোমতে গোঁ গোঁ করে “হ্যাঁ” বলে। ঈশান ওর চুলের মুঠি ধরে ওকে ছুঁড়ে ফেলে মেঝের উপর।
রাগে কান-মাথা ঝাঁ ঝাঁ করছে ওর। ফকিরকে খবরটা জানাতে হবে। তাড়াতাড়ি উপরে উঠে আসে। ফকির অচৈতন্য হয়ে ঘুমোচ্ছে। সারাদিনের পর বেচারা বড় ক্লান্ত হয়ে আছে। ওকে ডাকাটা ঠিক হবেনা। থাক ! কাল সকালেই ওকে সব জানাবে। কিন্তু এদিকে যে পরীর জন্য চিন্তা হচ্ছে ভীষণ। ওই শয়তানটা দু’কান কাটা, ওকে কোনো ভরসা নেই। পরীর কোনোরকম কোনো ক্ষতি হয়ে গেলে সারাজীবন নিজেকে ক্ষমা করতে পারবেনা ঈশান।
হঠাৎ একটা আইডিয়া মাথায় আসে ঈশানের। নীচে নেমে আসে সে। দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকে দেখে ঘর অন্ধকার। একী ! একটু আগেই তো আলো জ্বলছিল। আর পরীও তো ঘুমোচ্ছিল। তাহলে ও এর মাঝে উঠে আলো নিভিয়ে দিয়েছে ?
পরীকে ডাকতে এগোতে যাবে এমন সময় উল্টোদিকের দেওয়ালে আচমকা চোখ পড়ল ওর। যেটা দেখলো, তাতে শরীরটা বরফের মতো জমে গেল এক মুহূর্তে। ঘর নিশ্ছিদ্র অন্ধকার। শুধু লঞ্চের রেলিঙের ধারে একটা লণ্ঠন কোনোমতে জ্বলছে। খোলা নদীর হাওয়ায় সেই লণ্ঠননের শিখাটা মৃদুমন্দ কাঁপছে। তার ম্লান আলোটা একবার করে হাত বুলিয়ে যাচ্ছে শার্শির উপর দিয়ে। সেই দুলতে থাকা আলোয় দেয়ালের উপরে ছায়ায় আঁকা একটা বিশালাকায় শয়নরত নারীমূর্তি দেখতে পাচ্ছে ঈশান। সেই মূর্তির দৈর্ঘ্য মাটি থেকে সিলিং অবধি অন্তত আট-নয় ফুট। তার হাওয়ায় উড়তে থাকা কোঁকড়া চুল জাল বুনছে দেওয়ালের গায়ে। হঠাৎ ঈশানের নজর পড়ে মূর্তিটির হাতের দিকে। লম্বা, সরু সরু আঙুলের শেষে ঝকঝক করছে সুতীক্ষ্ণ নখর। তার এক একটির দৈর্ঘ্য কিছুতেই সাত-আট ইঞ্চির কম নয়।
শুকিয়ে যাওয়া গলায় কোনোমতে ‘পরী’ বলে ডাক দেয় ঈশান। কোনো উত্তর নেই। আরো একটু জোরে ডাক দেয় সে। এখনো কোনো উত্তর নেই। ভয়ে সিঁটিয়ে গিয়ে প্রায় চিৎকার করে ওঠে ,
“পরী ! ঘুম থেকে ওঠো।”
এক ঝটকায় ঘরের আলোটা জ্বলে ওঠে। খাটের মধ্যে এলোমেলো চুলে হতভম্ব হয়ে বসে আছে পরী। সারা মুখজুড়ে ঘুমের আবেশ মাখা।
“কী হল ঈশানদাদা ? অমন চিৎকার করে উঠলে কেন ? আমি ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম।”
“ইয়ে, মানে, না কিছুনা। আমি একটা জিনিস দেখে... না মানে...”
কথা জড়িয়ে যাচ্ছে ঈশানের। বুকটা হাপরের মতো ওঠানামা করছে।
“কিছু কী হয়েছে ? তুমি কি আমায় ডাকছিল ? আমি ঘুমের মধ্যে শুনতে পাইনি।”
ঈশান এগিয়ে গিয়ে জলের বোতলটা থেকে ঢকঢক করে জল খায় অনেকটা। তারপর একটু দম নিয়ে পরীর পাশে এসে বসে।
“না কিছু হয়নি। তোমাকে একটি জিনিস দিতে এসেছিলাম।”
উঠে গিয়ে ওর ব্যাকপ্যাক খুলে একটা পুরোনো আমলের ছোট্ট ফোন বের করে ঈশান। পরীর হাতে ওটা গুঁজে দিয়ে বলে,
“এটা রাখো। এতে আমার অন্য ফোনের নাম্বারটা “মি” বলে সেভ করা আছে। আমি উপরের তলাতেই আছি। যদি রাত্রে একবারও ভয় লাগে, বা অস্বস্তিও লাগে, আমাকে সঙ্গে সঙ্গে ফোন করবে। কেমন ?”
“ওমা ! খামোখা ভয় লাগবে কেন ?” সরল প্রশ্ন পরীর।
“পরী, তুমি তো এখন বড়ো হচ্ছ, তাই তোমাকে একটা কথা বলি। আমাদের সমাজে মানুষ কখনো-সখনো অপদেবতা, ভূত-প্রেত এসবের থেকেও অনেক বেশি ভয়ঙ্কর। তোমাদের মায়া ডাকিনীর থেকেও বেশি। বুঝলে ?”
ঈশান পরীর মুখের রেখার পরিবর্তন পড়ার চেষ্টা করে। ওর মনে হয় পরী বুঝেছে ও ঠিক কি বলতে চাইছে।
‘‘বেশ ! তাহলে তুমি ঘুমোও। আমি আসি। কাল সকালে আবার কথা হবে। আমি বেরোলে তুমি ঘরের দরজাটা ভালো করে আটকে দিয়ে আমাকে ভেতর থেকে বলবে যে দরজা লাগিয়ে দিয়েছো। তবে আমি উপরে যাবো। কেমন ?”
“আচ্ছা। ঠিক আছে।”
পরী দরজা বন্ধ করার পর উপরে উঠে আসে ঈশান। যাক! এবারে অনেকটা নিশ্চিন্ত লাগছে। ফকির গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। কিন্তু ঈশানের চোখে ঘুম আসতে চায়না। পালঙ্কের উপরে শুয়ে শুয়ে জানলার বাইরে দূরের সবজেটে আকাশটা দেখতে দেখতে বার বার সেই ছায়ামূর্তির ছবিটা মাথার মধ্যে ঘুরপাক খেতে থাকে।
কখন ঘুমিয়ে পড়েছে খেয়াল করেনি ঈশান। ঘুম ভাঙলো ফকিরের হাঁকডাকে। ঘুম যখন অর্ধেক ভেঙেছে, তখন ফকিরের চিৎকার ছাপিয়ে সে শুনতে পাচ্ছে একতলায় খালাসীদের ভয়ার্ত চিৎকার। ধীরে ধীরে বাস্তবের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের চেষ্টা করে সে। ফকিরের ছেঁড়া ছেঁড়া কথা কানে আসছে।
“...এতো একগুঁয়ে লোক জীবনে কোনোদিন লঞ্চে তুলিনি। আপনি এরকম ঢ্যাঁটা আর অবাধ্য জানলে জীবনে আপনাকে সাহায্য করতে রাজি হতাম না।’’
চোখের দৃষ্টি ঝাপসা থেকে ধীরে ধীরে স্থির হতে ফকিরকে দেখতে পায় ঈশান। সে তর্জনী তুলে বলে চলেছে,
“কালকে পইপই করে বললাম এরকম সর্বনাশ করবেন না, করবেন না। হল তো ? একটা জলজ্যান্ত লোকের জীবন দিয়ে দাম চোকাতে হল তো ? এবার শান্তি হয়েছে ?”
“কী বলছ তুমি ? কার জীবন দিয়ে দাম চোকানো ? কী বলছ?” চোখ কচলে বলার চেষ্টা করে ঈশান।
“আর ন্যাকা সেজে থাকবেন না। যান নীচে গিয়ে দেখে আসুন কী করেছে আপনার পরী ডাইনি।”
পরীর নামটা শুনেই ছিটকে সোজা হয়ে বসে ঈশান। পরী ঠিক আছে তো ? এক দৌড়ে নীচে নেমে আসে। ঘরের মুখটায় সব খালাসীরা দাঁড়িয়ে। তাদের ঠেলে সরিয়ে চৌকাঠে পা দিতে গিয়েই পায়ের পাতা হাওয়ায় আটকে যায় ওর। পা দেবে কোথায় ? দরজার মুখটাতেই ঘন তাজা কালচে রক্তের একটা আধখ্যাঁচড়া বৃত্ত রচনা হয়েছে। সেই বৃত্ত থেকে বেরিয়ে একটা রক্তের ধারা টলোমলো পায়ে চলে গিয়েছে ঘরের অন্যপ্রান্ত অবধি। সেই ধারা ধরে চোখ চালালে দেখতে পাওয়া যায় সেই রক্তস্রোতের উৎস। চোখেমুখে একটা ভয়ার্ত, বিকৃত অভিব্যক্তি নিয়ে, ঘাড়টাকে অদ্ভুত একটা কোণে বেঁকিয়ে পড়ে আছে মদন রাঁধুনির সম্পূর্ণ উলঙ্গ দেহটা। এতদূর থেকেও স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে গলার উপর তিনটে সমান্তরাল তেকোনা গভীর ক্ষতচিহ্ন।
দারোগাবাবুর সামনে হতবাক দৃষ্টিতে বসে আছে ঈশান। এখনো বুঝতে পারছে না কোথা থেকে কি হয়ে গেল। ফকির শ্যেন দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ঈশানের দিকে। সে খুব চেষ্টা করেছিল পুলিশি ঝামেলা এড়িয়ে যাওয়ার। কিন্তু কপাল মন্দ ! খালাসীদের চিৎকারে পাশের গ্রাম থেকে লোক জড়ো হয়ে যায়। তারাই পুলিশে খবর দেয়।
“দেখুন, আপনাদের কথা আমি পুরোপুরি উড়িয়ে দিচ্ছিনা।”
টেবিলের উল্টোদিকে বসে বললেন অনন্ত দারোগা। আমি এই এলাকার লোক না হলে হয়তো তাই দিতাম। কিন্তু আমিও ছোট থেকেই মায়া ডাকিনীর গালগল্প শুনেই বড়ো হয়েছি। তার সম্পর্কে যা কাহিনী শুনেছি, তা আপনাদের অভিজ্ঞতার সঙ্গে সম্পূর্ণ মিলে যায়। কিন্তু এসব কথা তো আর কোর্টে ধোপে টিকবে না। আর তাছাড়া মায়া ডাকিনীর প্রবাদে যে খুনের প্যাটার্নের কথা বলা হয়, সেটা এই এলাকার সব লোকই জানে; তাই সেই প্যাটার্ন নকল করে যে কেউ পর পর খুনগুলো করছে না, তারই বা কী গ্যারান্টি? অতএব লঞ্চে থাকা সবকটা খালাসির মতো আপনারা দুজনও যে এই কেসের প্রাইম সাস্পেক্ট, সেটা আশা করি বলে দিতে হবেনা ?”
প্রচন্ড রাগে ঈশানের দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ে ফকির। দারোগাবাবু আবার বলেন, “নেহাত আমার হাতে এক্ষুণি সার্কামস্টেন্সিয়াল এভিডেন্স ছাড়া আর কিছু নেই, তাই আপনাদের গ্রেফতার করতে পারছি না। কিন্তু আপনাদের উপরে আমাকে নজর রাখতেই হবে। আপনারা আপাতত আপনাদের লঞ্চেই থাকবেন। আমার দুজন লোক চব্বিশ ঘন্টা লঞ্চেই আপনাদের সঙ্গে থাকবে। আরো বেশ কিছু লোক পাড় থেকে আপনাদের উপর নজর রাখবে। অতএব নোঙ্গর তোলার বা পালাবার চেষ্টা করবেন না। আমরা আপনাদের ধরেও ফেলবো, মাঝখান থেকে আপনাদের বিরুদ্ধে আমার কেস সাজানো সহজ হয়ে যাবে।
ঈশানের যেন এসব কথা কানেই ঢুকছে না। সে অস্থির ভাবে বলে, “দারোগাবাবু, আপনি কী পর পর খুনের কথা বলছিলেন ?”
“হ্যাঁ। যেভাবে মদন খুন হয়েছে, ঠিক একই প্যাটার্নে গত পরশু রাতে সোমেন মণ্ডল খুন হয়েছে পাশের গ্রামে। ঠিক একইরকম তিনটে তেকোনা প্যরালাল দাগ তার গলাতে। খুনি যে সম্ভবত একই ব্যক্তি, সেটা প্রায় নিশ্চিত।” ফোঁস করে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে স্বগতোক্তির ঢঙে বলেন দারোগাবাবু, “একেই একটা খুন আর আত্মহত্যা নিয়ে জেরবার হয়ে যাচ্ছি, তারপর আবার এই একটা এসে জুটলো। পারিনা আর! পুলিশের চাকরিতে ঘেন্না করে গেল সাল্লা!”
“আত্মহত্যা ? কে আত্ম্যহত্যা করেছে স্যার?”
“আরে ধুর মশাই! আপনি জেনে কী করবেন?” দারোগার গলায় বিরক্তি স্পষ্ট। “আপনি চিনবেন নাকি তাকে ? আপনি তো এখানকার লোকও নন।”
“স্যার, আসলে একইরকম প্যাটার্নে দুটো খুন তো, তাই জিজ্ঞেস করছি। যদি একটু বলেন...”
আরেকটা চাপা শ্বাস ফেলে দারোগা বলে ওঠেন,
“বড়ো গল্প, বুঝলেন মশাই। সোমেন মণ্ডল আশেপাশের গ্রামের ত্রাস। সকলের নাকের ডগা দিয়ে মেয়ে পাচারের ব্যবসা চালাতো। এইসব গ্রামের বাচ্চা বাচ্চা মেয়েদের ধরে এনে বাংলাদেশ, সেখান থেকে সিঙ্গাপুর এসব জায়গায় পাচার করে দেয়। সবাই সব জানে, কিন্তু এমনই ওর পলিটিক্যাল ইনফ্লুয়েন্স যে কেউ কিচ্ছু করতে পারিনা। আমরা ধরেওছি কয়েকবার, কিন্তু প্রতিবারই কোর্টে তুললেই, ও ওর ইনফ্লুয়েন্স খাটিয়ে ঠিক বেরিয়ে যায়।”
“তা দুদিন আগে জানতে পারলাম, এই সোমেন মণ্ডলের তুলে আনা একটা মেয়ে নাকি গলায় দড়ি দিয়েছে। আমি ছুটলাম। গিয়ে দেখি শয়তানটা পগার পার। এদিকে আমরা বডি নামিয়ে পোস্টমর্টেমে পাঠালাম। পোস্টমর্টেমে যা দেখা গেল, তা দেখে আমরাও শিউরে উঠেছিলাম। বডিতে মোট আঠারোটা জায়গায় ক্ষতচিহ্ন ছিল জানেন? জানোয়ারের মতো রেপ করেছে মেয়েটাকে।”
“সরি স্যার, একবার থামাচ্ছি। কত বয়েস এই মেয়েটির ?”
“তা ধরুন, বছর চোদ্দ-পনের। কেন ?”
“না, এমনি। আপনি কী যেন বলছিলেন স্যার ?”
“হ্যাঁ, তো আমি লোক লাগলাম সব জায়গায় সোমেনকে খুঁজে বের করতে। এই প্রথমবার ওর বিরুদ্ধে সলিড এভিডেন্স পেয়েছি, এবারে ওর জাল কেটে বেরোনো মুশকিল হবে জানতাম। এমনই কপাল, ওর খোঁজ পেলাম ঠিকই কিন্তু জ্যান্ত না, মরা।”
“স্যার, মেয়েটির নাম কী পরী কর্মকার ?”
দারোগাবাবু জল খাচ্ছিলেন বোতল থেকে। এমন চমকেছেন, হাত থেকে বোতল ফস্কে শার্ট ভিজে একসা অবস্থা।
“হোয়াট ? আপনি জানলেন কীকরে ? আপনি বেশ ঘোড়েল মাল আছেন তো। আমার থেকে কী কী লুকোচ্ছেন, ঝেড়ে কাশুন তো মশাই। নাহলে, কথা বের করার অনেক রাস্তা জানা আছে আমাদের।”
একই রকম চমকেছে ফকির।
“এসব কী বলছ তুমি ঈশান ?”
“ফকির, তুমি একবারও ভেবে দেখেছো-- আমরা যখন মদনকে আবিষ্কার করি, ও সম্পূর্ণ উলঙ্গ অবস্থায় ছিল। কাল রাতে যে মেয়েটি আমাদের লঞ্চে ছিল, তার যদি মদনকে খুনই করার থাকতো, তাহলে সে মদনকে খামোখা উলঙ্গ করতে যাবে কেন ?”
“মানে তুমি বলতে চাইছো...’’ আমতা আমতা করে বলে ফকির। ওকে উত্তর না দিয়ে ঈশান দারোগার দিকে ফিরে বলে,
“স্যার, আপনি কাইন্ডলি এই আত্মহত্যা করা মেয়েটির একটা ফটো দেখাবেন? আমার মনে হয়ে তাহলেই আমাদের সব কনফিউশন দূর হয়ে যাবে।”
অনন্ত দারোগা পিছনের তাক থেকে একটা ফাইল তুলে নিয়ে ভিক্টিমের ছবি বের করে ঈশানদের সামনে রাখলেন।
ঈশানরা লঞ্চে ফিরে এসেছে। সঙ্গে অনন্ত দারোগা আর তার লোকজন। গোটা লঞ্চ ওলোট পালট করে মার্ডার উইপেন খুঁজছে। রেলিঙে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে দুই যুবক, মুখে একটাও কথা নেই তাদের। একটু পরে অনন্ত দারোগা এগিয়ে এলেন তাদের দিকে -- গ্লাভস পরা হাতে ধরা একটা এক চিলতে কাগজ।
“এটা এই রুমে বালিশের নীচ থেকে পাওয়া গিয়েছে। এটা আমরা নিজেদের জিম্মায় রাখবো। এটার থেকে ফিঙ্গারপ্রিন্ট কালেক্ট করব আমরা। তবে তার আগে, এখানে যা লেখা আছে, সেটা আপনাদের একবার পড়ে শোনানো উচিত বলে মনে হল।”
অনন্ত দারোগা পড়তে শুরু করলেন,
“প্রিয় ঈশানদাদা,
তোমাকে আসার আগে ভালো করে বলে আসতে পারলাম না। তুমি কাল রাতে ঠিকই বলেছিলে। হাজারো ডাকিনী, ভূত-প্রেতের থেকে মানুষই বেশি হিংস্র হয়ে থাকে। ওই লোকটা আমাকে তুলে নিয়ে গিয়ে বড্ডো কষ্ট দিয়েছিল, জানো ? তারপর আমাকে ওই অবস্থায় ঘরে বন্ধ করে ফেলে রেখে যাওয়ার সময় বলেছিল, রাত্রে আবার আসবে। ও চলে যাওয়ার পর আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলাম পালানোর। পারলাম না। শেষে যখন রাত গভীর হতে লাগলো, মনে হল ওই যন্ত্রণা আরো একবার সহ্য করতে পারবো না। তাই, তখন...
কাল রাতে তুমি চলে যাওয়ার অনেকক্ষণ পরে তোমাদের রাঁধুনি আমার ঘরে এসেছিল। দরজার ছিটকিনিটা কিছু একটা করে খুলে ফেলেছিল হয়তো। আমার যখন ঘুম ভাঙলো, দেখলাম প্রচন্ড জোরে এক হাতে করে আমার মুখ চাপা দিচ্ছে, আরেক হাতে করে ছিঁড়ে ফেলছে আমার কাপড় জামা। তুমি ফোন করতে বলেছিলে; বিশ্বাস করো তখন ফোন করার মতো অবস্থা ছিল না। তাছাড়া এখন তো আমি নিজের খেয়াল নিজেই রাখতে পারি।
কাল যখন তুমি আমাকে ফোনটা দিতে এলে, তখন মনে হল যখন বেঁচে ছিলাম তখন তোমার মতো একটা দাদা থাকলে বড়ো ভালো হত। তোমার সাথে আর দেখা হবেনা গো।
ফকিরদাকে আমার উপর রাগ করতে বারণ কোরো। ও তো এখানেই থাকবে। মাঝে সাঝে যদি একটু জ্বালাতে আসি, যেন রাগ না করে। ভালো থেকো। আসি।
ইতি,
তোমার পাতানো বোন পরী
আঁধার নেমে আসা বিকেলের আলোয় ঈশান স্পষ্ট দেখতে পেল ঠোঁটদুটো চেপে ধরে অনেকখানি পাপবোধ চোখে নিয়ে ওর দিকে তাকিয়ে আছে ফকির।
এবং বৃত্তের বাইরে, ফেব্রুয়ারি, ২০২৫

No comments:
Post a Comment