আবর্ত
অর্ণবী সাহা ঘোষ
তোকে বললাম তো আমি এখন একদম ক্লিন বিশ্বাস কর। আমি দুদিন থেকে অন্য কোথাও চলে যাবো, কোনো প্রব্লেম হবে না। মোহিত ওর গাড়িটাও ফেরৎ চাইছে এখন আমি কী করবো বল? ও… আচ্ছা! ঠিক আছে দেখছি আমি অন্য কোথাও ম্যানেজ করতে পারি কিনা!
সাম্য ফোন হাতে নিয়ে কি যেন ভাবে তারপর আর এক নামের ওপর আঙুল চালায়,
—মোহিত শোন, শোন আর আমাকে দুদিন দে। তোর গাড়ি তোকে ফেরৎ দিয়ে দেবো। আমাকে দুদিন দে ভাই। …না, না শোন… আরো দুটো দিন… ওহ আচ্ছা।ফোন রেখে গুম হয়ে বসে থাকে ও। তারপর স্ট্রিয়ারিংয়ে চাপড় মেরে চিৎকার করে ওঠে।
—কেউ হেল্প করবে না শালা... কেউ না, কেউ না।
অভ্যেসবশত প্যান্টের বাঁ পকেটে হাত চলে যায়। শূন্য পকেটে হাত ঘুরে সে হাত ফেরে ওর মাথায়। মাথার চুল খামচে ধরে হতাশ হয়ে। সেভাবেই বসো থাকে বহুক্ষণ। রাতজাগা জাতীয় সড়কে হুশ-হাশ শব্দ তুলে গাড়ি ছুটে যায়। হঠাৎ বৃষ্টি নামে ঝমঝমিয়ে। সাম্য ঝাপসা গাড়ির কাঁচের দিকে তাকিয়ে থাকে চুপ করে। রাস্তার ধারের হলদে আলোর আবছা জলছবির দিকে চোখ পড়তে হঠাৎ-ই গাড়ির দরজা ঠেলে নেমে আসে। বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে এগিয়ে যায় মলিন আলোটার দিকে।
আলোটা একটা হোটেল গোছের কিছুর। জাতীয় সড়কের ধারে ব্যাঙের ছাতার মত গজিয়ে ওঠা মোটেলের মত এটিও গজিয়ে উঠছিল কোনোকালে। হোটেলের মুখে ঝুলে থাকা জংধরা বোর্ডটার লেখা নামটা প্রায় উঠে গেছে। সাম্য পড়ার চেষ্টা করে,
—ম...নো…র... মা...
বোর্ড ঘিরে জ্বলতে থাকা টুনিগুলোকেও ক্লান্ত দেখায়। হোটেলের ভিতরে ছোটমত রিসেপ্সশনে একটা অল্পবয়সী ছেলে বসে মন মুঠোফোনে মগ্ন। সাম্য চারদিকে চোখ বুলিয়ে নিয়ে বলে প্রশ্ন করে,
—ঘর হবে ?
—হবে। ঘণ্টা না দিনের হিসেবে ?
ছেলেটি মোবাইল থেকে চোখ সরায় না। হয়ত মনোগ্রাহী কিছু দেখতে ব্যাস্ত। দেখতে দেখতে নিজের মনেই হাসছে।
—আজকের রাতটা থাকার মত।
ফোনে চোখ রেখেই মোটা একটা খাতা এগিয়ে দিতে দিতে বলে,
—দুজনের আইডি কার্ড লাগবে। মদ ফদ বাইরে থেকে আনা চলবে না ফুর্তির আওয়াজ যেন বাইরে না আসে।
—কার্ড নেই।
ছেলেটি এই প্রথম সরুচোখ তুলে সাম্যকে দেখে। তারপর অতন্ত্য বিরক্ত হয়ে বলে,
—কার্ড-ফার্ড ছাড়া রুম-ফুম দেওয়া যাবেনা। আপনি আসুন।
সাম্য ক্লান্ত স্বরে বলে,
—এই ওয়েদারে অন্য কোথাও যাওয়া সম্ভব না। আপনি দেখুন একটু চেষ্টা করে যদি…
ছেলেটি হাত তুলে নীতিবাক্য বোঝানোর ভান করে,
—সব জায়েগায় একটা নিয়ম থাকে, তার বাইরে গিয়ে তো আমরা কিছু করতে পারি না। তাছাড়া…
ছেলেটির সামনে থাকা ডেস্কের ওপর ছটা সব্জে নোট ঠাস করে নামিয়ে রাখে সাম্য।
—পরে আবার দেব। এবার রুম আছে ?
ছেলেটির দুচোখে তখন অবিশ্বাস। এক একটা নোট আলোর সামনে তুলে জরীপ করতে করতে লোলুপ স্বরে বলে,
—আরি ত্বারা! এগুলো আসল ?
—আসল কি নকল পরে দেখবি আগে রুম আছে কিনা বল।
—আছে, আছে। আপনাকে টপক্লাস রুম দেবো। আসুন স্যার আসুন।
একটা চাবি হাতে ছেলেটি উঠে দাঁড়ায়। সাম্য একটু সতর্ক হয়ে চারিদিকে তাকিয়ে নিয়ে বলে,
—ক্যামেরা-ট্যামেরা নেই তো ?
ছেলেটির চোখ আবার সরু হয়,
—কী কেস বলুন তো স্যার ? খুন-টুন করে এখানে শেলটার নিতে এসেছেন ? দেখুন পুলিশ কেস-টেশ হলে চাপ।
সাম্য ছেলেটির কাঁধে হাত রাখে,
—না ভাই, সেসব কিছু না। আমি আসলে পালিয়ে এসেছি, সব কিছু থেকে… তাই আমি চাইনা যারা আমাকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে চায় তারা আমাকে খুঁজে পাক। আমি আর ফিরতে চাই না।
ছেলেটি বোঝেনা কিছুই। ওর অবুঝ মুখের দিকে তাকিয়ে সাম্য ম্লান হাসে। ছেলেটি চাবি হাতে বলে,
—আপনাকে ফিরিয়ে নিতে চায় অথচ আপনি যেতে চান না....। যাকগে! চলুন ঘর দেখাই।
সাম্য বলে, —আমাকে কোন ভালো ঘর দিতে হবে না। এমন একটা ঘর দাও যাতে চট করে কেউ খুঁজতে আসলে তার চোখে না পরে। আছে এমন ঘর ? সারভেন্ট রুম হলেও চলবে।
ছেলেটি মাথা চুকলে বলে,
—ওইসব সারভেন্টের আলাদা করে ঘরদোর কিছু নেই। আমরা লোকাল। আমি দেখছি কি ঘর দিতে পারি।
ছেলেটা ড্রয়ার হাতড়ে চাবির গোছা বের করে আনে। তারপর করিডর পেরিয়ে পিছনের বিল্ডিংয়ের একটা ঘরের দরজা খুলে দিয়ে বলে,
—ব্যাস নিশ্চিন্তে রেস্ট নিন্। খাবার টাবার লাগলে বলেদিন বাতাস তো ভালো নেই স্যার বেশী রাত করা যাবে না।
—খাবার লাগবে না। শুধু দেখবে কেউ যেন ড্রিস্ট্রাব না করে।
ছেলেটি চাবির মাথা দিয়ে দাঁত খুঁচিয়ে বলে,
—কেউ আসবে না স্যার। যে’কজন আছে সব ব্যাস্ত, আপনি নিশ্চিন্তে থাকুন।
ছেলেটা চলে গেল। সাম্য নিজের অবসন্ন শরীরটা বিছিয়ে দিল পাঁচ বাই সাতের গদিহীন বিছানায়। মাথার ওপর বয়েসের ভারে জর্জরিত পাখাটা স্বক্লেশে ঘুরছে। সাম্য সেদিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে ভাবে এতক্ষণে এলিগিন রোডের প্রাসাদে খবর চলে গেছে। সাত সমুদ্র তের নদীর প্রান্তরে থাকা মহারাজ তার একমাত্র সন্তানের খোঁজে পাহাড় প্রমাণ চিন্তা নিয়ে এদেশের পথে পাড়ি দিয়েছে। তার আগে সৈন্য-সামন্তের কাছে কড়া নির্দেশ চলে গেছে। তারাও এতক্ষণে তল্লাশি শুরু করে দিয়েছে সব পাঁচতারা হোটেল বা সম্ভাব্য বন্ধুদের ঘরে। কিন্তু তারা কি কল্পনাও করতে পারবে সেই নিখোঁজ ব্যাক্তিটি এখন শুইয়ে আছে পথের ধারের নাম না জানা প্রায় পরিত্যক্ত হোটেলের এক ঘরে। সাম্য হাসে, বেশ ঠকানো গেছে! পলেস্তার খসা দেয়ালের খাঁজে থাকা টিকটিকি টিক্ টিক্ টিক্ করে ডেকে ওঠে। বাইরে বৃষ্টি অবিরাম ঝরছে। ভারী মালবাহী যানগুলো রাস্তা কাঁপিয়ে চলে যাচ্ছে। তার ভারে কেঁপে কেঁপে উঠেছে ঘরটা। ফ্যানটা কিন্তু নিজের ছন্দেই ঘুরছে। ঘুরতে ঘুরতে কতকিছু যে বলছে…
সাম্যর সেদিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে বাবার কথা মনে পড়ে। মনে পড়ে সেই সদাব্যাস্ত গাম্ভীর্যের আবর্তে মোড়া লোকটার অসহায় চাহুনি। অরিত্রের বাবার পাইপের গোডাউনে থাকা আবর্জনার স্তূপের ভিতরে পড়ে থাকা সাম্যর নেশাতুর মন প্রথম বুঝেছিল এই লোকটা আসলে তাকে কতটা ভালোবাসে। তাইতো মানুষটার কথা রাখতেই জীবনের ছ-ছটা মাস কাটিয়ে দিল বন্দীশালায়। কী যেন রিহ্যাবিশন হোম। নামটা মনে করতে চায় মনে পড়ে না সাম্যর। কিন্তু হায় অতগুলো মনের ডাক্তারও সাম্যর ঝাঁঝরা হয়ে যাওয়া মনে প্রলেপ লাগাতে পারল কই ? এই তো এখনো শ্বাস নিলে বুকের ভিতরে কী একটা ভারী হয়ে থাকে। কি ভীষণ এক যন্ত্রণা সরীসৃপের মত এঁকে বেঁকে পরতে পরতে জড়িয়ে গেছে হৃদযন্ত্রের মজ্জায় মজ্জায়। ভীষণ এই রোগের হাত থেকে “ফেনাটাইল”-ও মুক্তি দিতে অক্ষম। এ রোগের নাম… সাম্য চোখ বোজে। মৃদু প্রায় ক্ষীণ একটা স্বর তানের মত বাজে,
—তোর কাছে আমার দমবন্ধ লাগে। তুই চলে যা সাম্য চলে যা প্লিজ।
সাম্য তাও চলে যায় নি। দাঁড়িয়েছিল বোকার মত। দেখেছিল চলে যাচ্ছে ও অনেক দূরে। ও একা না সঙ্গে অন্য কেউ… কে সে? সাম্য দেখতে পায়নি চোখটা ঝাপসা হয়ে এসেছিল। সাম্য তাকে ক্ষমতার জোড়ে বাঁধতে চায়নি কখনো, শুধু হাতটা শক্ত করে ধরে রাখতে চেয়েছিল। বুঝতেই পারেনি সে ফাঁক কখন আলগা হয়ে গেল। আসলে যারা থাকার তারা থেকেই যায় আর যারা থাকে না তাদের কোনও মায়াডোরেই বেঁধে রাখা যায় না। ঠিক তবে ওর যন্ত্রণা হয় কথাবলার সময়, ঘুমানোর সময়, হাঁটার সময়, শ্বাস নেওয়ার সময়… সব সময়। ও জানে ওর হৃদপিণ্ডটা ঝাঁঝারা হয়ে গেছে। আর এখন এই জটিল সংক্রামণ ছড়িয়েছে ওর লোহিত কণিকায়। সাম্য জানে সময় ফুরিয়ে আসছে। তাই ও পালিয়ে যেতে চায় অনেক দূরে… অনেক অনেক দূরে। ফ্যানটার দিকে চেয়ে থাকতে থাকতে ওর মনে হয়, —আমি মরলে কে কষ্ট পাবে ? বাবা ? আজকেই মরে গেলে ?
সাম্যর শরীরের ভিতরে হঠাৎ অস্বস্তি শুরু হয়। এই ছয় মাসে নিজের ভিতরে দমিয়ে রাখা নেশাতুর দৈত্যটা জেগে উঠতে চায়। সাম্যর ডানহাতটা বেঁকে যাচ্ছে আবার। ও পাগলের মত হাতড়াতে থাকে প্যান্টের পকেট… খাটের তোষকের তলা… মরিচাধরা আয়নার নিচের খাপে। নেই কিছু নেই। সাম্যর পাগল পাগল লাগে। ঠিক ঠিক এর থেকেই পালতে হবে একেবারে চিরতরে। শেষ হয়ে যেতে হবে। সাম্য ঘুর্ণায়মান পাখার দিকে চায় সর্বনাশের আশায়। হাত বাড়িয়ে মান্ধাতার আমলের সুইচ বন্ধকরে। পাখার ঘোরা বন্ধ হয় না। চলতে চলতে কেমন যেন ঝাঁকুনি মত খায়। তারপর ধীরে ধীরে স্থিমিত হয়ে আসে। সাম্য ঘোর লাগা চোখে তাকিয়ে থাকে। আর তখনই দরজায় টোকা পড়ে। বেশ জোড়ে একবার, দুবার বেশ কয়েকবার। বেশ ব্যাস্ত ভঙ্গি। সাম্যর যেন ঘোর ভাঙে। চুপ করে বসে থাকে কিছুক্ষণ তারপর বিরক্ত হয়ে দরজা খুলতে খুলতে বলে,
—তোকে বললাম না কেউ যেন বিরক্ত না করে!
—আমি না ওকে খুঁজে পাচ্ছি না। কোথায় গেল কিছু বুঝতে পারছি না। এত ঘরের দরজা ধাক্কালাম কেউ দরজা খুললো না। কিছু বুঝতে পারছি না কোথায় যাব।
দরজার ওপাশে দাঁড়ানো তরুণীকে জরীপ করে সাম্য। মেয়েটির পরনে শাড়ি, একগুচ্ছ কোঁকড়া চুল লেপ্টে আছে কপাল জুড়ে।
—এ ঘরে কেউ নেই অন্য ঘরে খোঁজ করুন।
সাম্য প্রচণ্ড বিরক্ত হয়ে দরজাবন্ধ করতে যায়। ওপাশের অসহায় কণ্ঠস্বর আবারো বলে ওঠে,
—সব ঘরে কড়া নাড়লাম। কেউ তো সাড়া দিচ্ছে না। কি করবো আমি ? আমার তো আর ফিরে যাওয়ার উপায় নেই।
মেয়েটির গলার স্বর ঝাপসা শোনায়। সাম্য থমকায়, “ফিরে যাওয়ার উপায় নেই” কথাটা কানের কাছে বাজে। দরজা খুলে দেখে মেয়েটি অন্ধকার করিডর ধরে হাঁটছে। সাম্য তাকে ডাকে,
—এই যে শুনছেন…
মেয়েটি ফিরে তাকায়। তার দুচোখের কোণে অসহায়তার বাষ্পজমে। হতে পারে এ কোন চটুল মহিলার রাত বাসরের চাটুতলা। এরকম ঘটনার সাক্ষী তো সাম্য নিজেও বেশ কয়েকবার হয়েছে। সাম্য ওকে জরীপ করে। নাহ চোখে মুখে চাটুলতার লেশ মাত্র নেই বদলে এক অদ্ভুদ সারল্য,
—আপনি কাকে খুঁজেছেন বলুন তো ?
প্রশ্ন করে সাম্য। মেয়েটি মুখ ফিরিয়ে বলে,
—আমি খুঁজে নিতে পারবো। আপনাকে আর ব্যাস্ত হতে হবে না।
সাম্য ছেড়ে দিতে গিয়েও পারে না। মেয়েটির সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে বলে, —তখনকার জন্যে সরি। আসলে বুঝতে পারিনি। যাইহোক রিসেশনে খোঁজ নিয়ে দেখেছেন কি ?
মেয়েটি থমকে দাঁড়ায় হঠাৎ ঝুলজমা অন্ধকার লম্বা করিডরের এদিক সেদিক তাকিয়ে কী যেন খোঁজে। সাম্য প্রশ্ন করে,
—কিছু হয়েছে ?
—হ্যাঁ ? না আসলে আমার সব কেমন গুলিয়ে যাচ্ছে। কী করবো বুঝতে পারছি না।
মেয়েটিকে বিভ্রান্ত দেখায়। সাম্য বাইরের রিসেপ্সশনের দিকে যেতে যেতে বলে,
—আমি ছেলেটাকে গিয়ে জিজ্ঞেস করছি এরমধ্যে কাউকে বেরোতে দেখেছে কিনা!
কিন্তু করিডোরের বাইরে যেতেই হোঁচট খায়। কোথায় সেই নিয়ন বাতিজ্বলা রিসেপ্সশন ? কোথায় সেই ছেলে? কিছুই নেই। বদলে নোনাধরা দেয়াল, দেয়ালের গায়ে উঁয়ে ধরা ছবি। সামনে ছোট টেবিলের কাছে হাতলবিহীন চেয়ার। সাম্য চোখ কচলে তাকায়। আবার সে হ্যালুসিনেট নাকি! অনেক দিন পর আবার? পিছনে ফিরে করিডোরের দিকে তাকাতেই মনে হয় সত্যি তো আগের বারের তুলনায় করিডোরটাও আয়তনে বড় মনে হচ্ছে! কী হচ্ছে এসব ? ঘরগুলো অন্যরকম যেন। সামনের ঝকঝকে চেহারার ঘরগুলোকে ওমন বিভীষিকাময় লাগছে কেন ?
—কাউকে দেখতে পেলেন ?
সাম্য কী বলবে বুঝতে পারে না। তার নিজের কাছেই ব্যাখা নেই কিছুর। তাছাড়া মেয়েটি নিজেই এখন সমস্যার মধ্যে শুধু শুধু নিজের সমস্যা বলে লাভ কি ? হ্যালুসিনেশন হচ্ছে এটা ঠিক কিন্তু এটা কিছুতেই তাকে বুঝতে দেওয়া যাবে না।
—আমার মনে হয় আপনার একবার বাড়িতে ফোন করে জানানো উচিৎ।
মেয়েটি যেন ভয়ে সিটিয়ে যায়,
—নাহ, একদম না। বাবা আমাকে মেরেই ফেলেবে। একদম না।
—আচ্ছা, ঠিক আছে, ঠিক আছে কুল ডাউন। আপনি কীভাবে এখানে এলেন সেটা আমাকে বলতে নিশ্চয়ই এখন প্রব্লেম নেই ?
মেয়েটির চুপ করে থাকে কিছুক্ষণ। সাম্য ওকে গুছিয়ে নেওয়ার সময় দেয়। মেয়েটি আঁচলের খুঁট আঙুলে জড়িয়ে বলে,
—আমরা ভালোবেসেছিলাম, অভয়কে বাবা মানল না। বাড়িতে আমাকে আটকে রাখল অনেকদিন। তারপর গতকাল আমার মাসতুতো দিদির বিয়ে ছিল। সেই সুযোগে আমরা…
—বাড়ি থেকে না বলে চলে এসেছেন দুজনে ?
মেয়েটি আঁচলের খুঁটে আঙুল পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে জটিল করে তোলে, ধরা স্বরে বলে,
—ওকে ছেড়ে অন্যকাউকে বিয়ে করব কিভাবে ? ওকে ছেড়ে থাকতে পারব না।
—বুঝলাম তবে এখন আমাদের অভয়কে খুঁজে বের করতে হবে তাই তো ? আচ্ছা ওনাকে একবার ফোন করে দেখেছেন ?
—ফোন!
মেয়েটি অবাক চোখে তাকায়।
—সঙ্গে নিয়ে আসেননি নিশ্চয়ই উনি এনেছেন কি ? আচ্ছা ওনার অ্যাড্রেস নিশ্চয়ই জানেন ?
মেয়েটি মাথা নাড়ায়। সাম্য হতাশ স্বরে বলে,
—কোথায় যাওয়ার কথা ছিল সেটা নিশ্চয়ই জানেন ?
—জানি না। আমাকে বলেছিল আমি বিয়ে বাড়ির বাইরে অপেক্ষা করে থাকব। আমি সেইমত বেরিয়ে এসেছিলাম। তারপর সেখান থেকে ট্রেন তারপর বাস। বিকেলের দিকে এখানে আসি। আমার খিদে পেয়েছিল বলে ও খাবার আনতে গেল। আমিও ঘুমিয়ে পরেছিলাম তারপর থেকেই…
মেয়েটির দৃষ্টি আবার চঞ্চল। সাম্যর অবাক চোখে দেখে। এমন মেয়ের অস্তিত্বওটিকে আছে এখনো! যে প্রেমিকের ডাকে সব ছেড়ে বেরিয়ে আসতে পারে তাও এমন একজনের সঙ্গে যার ঠিকানা অবধি জানা নেই।
—অবিশ্বাস্য!
—মানে ?
—না কিছু না। আপনার নামটা বলতে পারেন অসুবিধে না থাকলে।
মেয়েটি সাম্যর মুখের ওপর একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে বলে,
—কথাকলি।
বেশ। আসুন একবার সবকটা ঘরে আরেকবার দেখি।
প্রতিটা ঘরের আকার প্রকার কেমন যেন বদলে গিয়েছে। সাম্য প্রতিটা ঘরে টোকা দিয়ে দেখে।
—দরজাটা একটু খুলবেন, দরকার আছে…
কেউ দরজা খোলে না। কিন্তু ফিসফাস শুনতে পায় কেউ বা কারা চাপা স্বরে কথা বলছে যেন! এদিকে ওদিকে তাকায় কই কেউ নেই তো! তবুও যেন মনে হয় একজোড়া চোখ ওই অন্ধকার কোণে লুকিয়ে ওদের ওপর নজর রাখছে যেন। সাম্য চাপা স্বরে বলে,
—দেখুন আমার এখানে কিছু ঠিক লাগছে না। একটু মাথা ঠান্ডা করে ভাবুন তো অভয় ঠিক কোথায় যেতে পারে? আপনার বাড়ির লোক খবর পেয়ে ওনাকে...
কথাকলি মুখে হাত চেপে আর্তনাদ করে ওঠে,
—নাঃ না, না। এমন বলবেন না।
সাম্যও মাথা নাড়িয়ে বলে, —হ্যাঁ সে পসিবিলিটি কম তাহলে আপনার সঙ্গে তাদের এতক্ষণে দেখা হয়ে যেত। তাহলে কি সব সমস্যা এই হোটেলের মধ্যেই?
কথাকলি সভয়ে প্রতিটা ঘরের দরজায় চোখ বোলায়।
—তারমানে এখানেই ওর কোনো বিপদ হয়েছে বলছেন?
সাম্য কিছু বলতে গিয়েও বলে না। বৃষ্টির শব্দ ছাপিয়ে চাপা আর্তনাদের শব্দ ভেসে আসে। দুজনেই সতর্ক হয়ে ওঠে। শব্দটা আসছে করিডরের শেষ প্রান্ত থেকে।
—কিসের শব্দ ?
—বুঝতে পারছি না।
—অভয়... অভয় ওদিকে নেই তো?
কথাকলি পায়ে পায়ে এগোয় সেদিকে। সাম্য ওকে সাবধান করে, —যাবেন না…
তখনই কোনো এক ঘরের দরজা শব্দ করে খুলে যায় হঠাৎ। হলদে আলো চুইয়ে পড়ে আঁধার জমা মেঝেতে। ঘরের ভিতর থেকে চুপি চুপি বের হয়ে আসে এক ছায়ামূর্তি। সাম্য কথাকলিকে টেনে দেয়ালের আড়ালে এনে দাঁড় করায়। তারপর আড়াল থেকে উঁকি মারে করিডরের শেষে। ছায়ামূর্তিটাকে আর দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু তার সুদীর্ঘ ছায়া এসে পড়েছে মেঝেতে। ছায়াটা নিচু হয়ে বসে মাটি থেকে কিছু কুড়িতে নিয়ে উঠে দাঁড়াল। ছায়ার হাতের বস্তুটা দেখে চমকে ওঠে সাম্য। একটা প্রমাণ সাইজের পাথর। পাথরটা মাথার ওপর তুলে সজোরে নামিয়ে দিল কিছুর ওপর। চাপা একটা শব্দ। সাম্যর হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে আসে ভয়ে। কথাকলি স্বপ্রশ্ন চোখে তাকায় ওর দিকে। সাম্য ভেবে নেয় এখানে আর এক মুহূর্ত না। ঠোঁটে আঙুল চেপে ওর হাত ধরে টেনে এক ছুটে বেরিয়ে আসে করিডরের পেরিয়ে মনোরমা হোটেলের বাইরে এসে দাঁড়ায়।
—এভাবে বাইরে নিয়ে এলেন কেন ? কী হয়েছে ? কী দেখলেন ভিতরে ? কি দেখলেন ?
সাম্য হাঁপাতে হাঁপাতে বলে, —আমার প্রথম থেকেই মনে হচ্ছে জায়গাটা সুবিধের না। এখানে কোনও কিছু ঠিক হচ্ছে না। এখানে থাকলে আমরা বিপদে পড়ব। আমদের এখান থেকে অন্য কোথাও চলে যেতে হবে। ওদিকে আমার গাড়ি আছে আপনি যেখানে বলবেন আমি পৌঁছে দেব। আসুন এক্ষুণি।
তুমুল বৃষ্টিতে তখন উত্তাল চারপাশ। বৃষ্টির দাপটে ভিজতে থাকা জাতীয় সড়কটাকে অচেনা লাগে সাম্যর। এদিকে একটা পান-বিড়ির গুমটি ছিল যে! সাম্য চোখ বোজে। আজ হ্যালুশিনেশন মাত্রাছাড়া। মাথার ভিতরে সেই বীভৎসছায়ার তৈরি কুরূপ দৃশ্য গুলো বার বার ফুটে উঠছে।
কথাকলি ব্যাস্ত হয়, —আপনার গাড়ি কোথায় ?
সাম্য পথের দুধারে চোখ বুলাতে বুলাতে প্রশ্ন করে,
—হ্যাঁ ? হ্যাঁ ? এখানেই হবে। ঠিক আছে আগে বলুন আপনার বাড়ি কোথায় ? আচ্ছা বাড়ি না হোক কোনও আত্মীয় স্বজনের বাড়ি কি কাছাকাছি ?
—বর্ধমানের গোলাপবাগে মজুমদার বাড়ি বললেই সবাই একেবারে দেখিয়ে দেবে। বাড়ির ঠিকানা জেনে লাভ নেই আমি ফিরে যাব না। আমার এখানে চেনা কেউ নেই। তবে অভয় বলছিল এখান থেকে একটু দূরে কোন এক গ্রামে ওর কেউ আছে। তাই আমরা এই হোটেলে এসে উঠেছিলাম। কিন্তু…
হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ে ও। সাম্য অবাক হয়ে তাকায়,
—কিছু বলবেন ?
—আমি ওর সঙ্গেই এসেছি আর ওকে ছেড়ে কোথাও যাব না। আমার মনে হয় ও বিপদে আছে।
কথাকলি বৃষ্টি মাথায় মনোরমা হোটেলের দিকে ছুটতে শুরু করে হঠাৎ। সাম্যও ছোটে পিছনে,
—যাবেন না, শুনুন যাবেন না।
মনোরমা হোটেলের লম্বা করিডরে থম থম করছে। কথাকলি চলতে চলতে অন্ধকারে হোঁচট খায়
—আঃ...
পিচ্ছিল কিছুতে ওর ডান পা’টা যেন পিছলেও যায় কিছুটা। সাম্য এসে আগলে ধরে।
—এই সামলে! আপনি ঠিক আছেন ?
—হ্যাঁ কিন্তু এখানে কী পড়ে আছে ?
অন্ধকারে প্রায় অদৃশ্য সবকিছু। বাইরে বিদ্যুৎতের আলো সবাইকে চমকে দিয়ে ঝলকে ওঠে হঠাৎ। তাতেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে মেঝের ওপর রক্তের দাগ। দাগটা ডান দিকের প্রথম ঘরের বাঁকের মুখ অবধি দেখা যাচ্ছে অস্পষ্ট। কথাকলি বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মত দাঁড়িয়ে থাকে। সাম্য বুকে সাহস নিয়ে এগিয়ে যায় রক্তের দাগ ধরে। বন্ধ ঘরের দরজার সামনে পড়ে আছে বিকৃত চেহারার এক মৃতদেহ। কেউ যেন খানিক আগেই ভারী কিছুর আঘাতে চুরমার করেছে তার করোটি। মৃতেদেহটি থেঁতলে যাওয়া এক চোখে মরা মাছের দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে আছে। সাম্যর গা গুলিয়ে বমি পায়। মৃতদেহটি পুরুষের এই-কী তবে অভয় ? সাম্য করুণ চোখে তাকায় অদূরে দাঁড়ানো কথাকলির দিকে। কথাকলি সর্বনাশের আশঙ্কায় ছুটে আসে। বীভৎস বিকৃত লাশের দিকে তাকিয়ে মাথাটা টলে যায় যেন। কথাকলি নিজেকে সামলে নিতে নিতে বলে,
—না... না একে আমি চিনি না। এ অভয় নয়, হতে পারে না।
সাম্য স্বস্তির শ্বাস ফেলে। কিন্তু মনের ভিতরে অস্বস্তি বাড়ে দ্রুত। এখুনি সবটা পুলিশকে জানাতে হবে। তার আগে ঘর থেকে নিয়ে আসতে হবে ফোনটা। কিন্তু ঘরটা যেন কোনদিকে? সব গুলিয়ে যাচ্ছে তো! সাম্য উদভ্রান্তের মত এদিকে ওদিকে খুঁজছে থাকে। কথাকলি ধরা স্বরে প্রশ্ন করে,
—কী… কী খুঁজছেন?
—আমার ঘরটা খুঁজে পাচ্ছি না। এদিকটা একটা...
তখনই খসখস শব্দে সচকিত হয়ে ওঠে দুজনে। কেউ ভারী কিছু টেনে টেনে নিয়ে আসছে মেঝের ওপর দিয়ে। অন্ধকারে আবৃত দুজন রুদ্ধশ্বাসে তাকিয়ে থাকে অন্ধকার করিডোরের দিকে। করিডোরের ওপর দিয়ে কেউ টেনে টেনে নিয়ে আসছে কিছু। জিনিসটা বিছানার চাদরে মোড়ানো। বিদ্যুতের ক্ষণিক আলো স্পষ্ট বুঝিয়ে দেয় সেটা একটা লাশ। সেই দীর্ঘছায়ার লোকটি সম্ভবত নিজের ঘর থেকে টেনে নিয়ে আসছে ওটা। লাশটার উন্মুক্ত পায়ের পাতা ছেঁচড়ে যাচ্ছে মেঝের ওপর। এই অসম্ভব মুহূর্তে কথাকলি অস্পষ্ট আর্তনাদ করে ওঠে, তখনই লোকটা ঘুরে তাকায় ওদের দিকে। লোকটি জাজ্বল্যমান চোখের দিকে তাকিয়ে সাম্যর বুকের রক্ত জমাট বাঁধে। ও অনুভব করে ওর কাঁধের কাছে কথাকলির মাথা। মেয়েটা জ্ঞান হারিয়েছে। সাম্য বুঝতে পারেনা এই মুহূর্তে ওর কী করা উচিৎ। লোকটা লাশটা নামিয়ে রেখে খুঁজছে কিছু। সম্ভবত ভারী সেই পাথরটা যেটা দিয়ে খুন হয়েছে দু-দুখানা প্রাণ। ওর মাথার ভিতর হাজার ভ্রমরের গুঞ্জন ভাসছে। অভিশপ্ত হোটেলটা ছাড়তে হবে এখনই। কিন্তু তা কীভাবে সম্ভব ? লোকটা যে হাতে তুলে নিয়েছে ভারী পাথরটা। সাম্য এলিয়ে পড়া কথাকলির শরীরটা কাঁধের ওপর ফেলে ছুটতে থাকে বাইরের দরজা লক্ষ্য করে। শয়তানটা এগিয়ে গিয়ে সদরটা বন্ধ করে দেয় সশব্দে। তারপর ঘুরে দাঁড়িয়ে পিশাচের মত হাসে। সাম্য পায়ে পায়ে পিছয়… করিডরের পিছনের দিকে একটা দরজা থাকার কথা যে। দরজাটা দেখা যাচ্ছে। সাম্য সে দরজার দিকে ছোটে। দরজাটা খোলার আগেই প্রবল এক ধাক্কায় সাম্য মুখথুবড়ে পড়ে। পাশে উপুড় হয়ে পরে কথাকলির নিস্তেজ শরীর। তাও কীভাবে যেন কথাকলি তখনো আঁকড়ে থাকে সাম্যর হাতটা। করিডর জুড়ে হুলস্থূল ঝড় উঠেছে যেন। করিডরের আলোগুলো হঠাৎ জ্বলে উঠল একবার। আবার নিভেগেল। আবার জ্বলছে… শয়তানটা এগিয়ে আসছে… আরেকটু এগোলেই দরজার ওপারে পৌঁছানো যাবে। সাম্য কিছুতেই পৌঁছাতে পারছে না। ও একবার কথাকলির নিস্তেজ মুখের দিকে তাকায় তারপর ধরা হাতটা শক্ত করে টেনে নিয়ে যেতে চায় বাইরে। সাম্য পারে না। কি অমোঘ এক শক্তি কথাকলিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে করিডরের গহীনে। সাম্য মুঠোর ভিতরে থাকা হাতটা ছাড়তে চায় না। ওর দু চোখ ঝপাসা হয়ে আসে… পারিপার্শ্বিক সব কিছু যেন ওকে ঘিরে ঘূর্ণির মত নাচছে। ঝপাসা হয়ে আসছে সবকিছু… সাম্যর ক্লান্ত দুচোখ বুজে আসে।
তিন বছর বাদে...
মনোরমা হোটেলের ঝুলতে থাকা বোর্ডটার দিকে খানিক তাকিয়ে থাকে সাম্য। ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামে আবার। সাম্য হোটেলের ভিতরে এসে ঢোকে। রিসেপশনের সেই ছেলেটি সাম্যর দিকে তাকিয়ে ম্লান হাসে। তারপর এগিয়ে দেয় একটা চাবি। সাম্য সুসজ্জিত ঘরগুলি পেরিয়ে পিছনের ঝুল ধরা লম্বা করিডরের শেষ মাথার ঘরের দরজা খুলে থমকে দাঁড়ায় প্রতিবারের মত। দরজার পাশের ছোট্ট খাটের ওপর বসে হাত ঘড়িতে সময় দেখে। রাত দশটা কুড়ি।
চোখ বুজতেই ভেসে ওঠে ঠিক তিনবছর আগের দুঃসহ রাতের স্মৃতি। সে রাতের পরের দিন সাম্য নিজেকে আবিষ্কার করেছিল হোটেলের ঘরের বাইরে। রিশেপশনের ছেলেটা অবাক হয়ে বলেছিল
—আপনি বাইরে এলেন কি ভাবে?
সাম্যর সেই মুহূর্ত থেকে অবাক হওয়ার শুরু। কারণ আগের রাতের কনও ঘটনাকেই কেউ সত্যি বলে মেনে নেয় নি। ছেলেটির হিসেবমত সেরাতে নাকি মাত্র দুটি ঘরেই বোর্ডার ছিল। তাও মাঝ রাতের দিকে ওরা নাকি চলে গেছিল হোটেল ছেড়ে। ছেলেটিও নাকি সারারাত বসে ছিল ওই রিসেপশনেই। সে রাতে কারেন্ট না থাকা ছাড়া আর কোনও অস্বাভিকত্ব চোখে-ই পরেনি তার।
—খুন!
হেসে গড়াগড়ি যেতে যেতে ছেলেটা বলেছিল,
—হেব্বি কড়া ছিল বলেন মালটা? এত নেশা করবেন না বুঝলেন আমার বাপটা নেশা করেই অকালে…
সাম্য কিছু বলতে পারেনি। খুন নয় নাইই বা হয়েছিল তবে কথাকলি ? ছেলেটি রেজিস্টারবুক ঘেঁটেও কথাকলি বা অভয় নামের কারোর সন্ধান দিতে পারে নি। হোটেলের সব লোক একবাক্যে স্বীকার করেছে সেদিন কোনও অচেনা কেউই এই হোটেলে আসেনি। ও যা দেখেছে বা অনুভব করেছে সব মিথ্যা ? সেই যে পুরনো রিসেপশন অফিস… লম্বা করিডর… আর সেই ঘর গুলো ? সাম্য বার বার হোটেলটা ঘুরে দেখেছে এই হোটেলের এই পুরনো অংশটুকু ছাড়া কিছুই মেলেনি। তবে ? এই “তবে”-র হিসেবেই যে গরমিল লাগে। হ্যালুসিনেশন ওর নতুন নয়, নেশার ঘোরে কতবার পর্নাকে দেখেছে। কিন্ত হ্যালুসিনেশনে অনুভব এত তীব্র হয় না। স্বপ্নেরও না। কথাকলির প্রতিটা কথা, ওর অভিমান, ওর অসহায়তা সব এত স্পষ্ট করে মনে আছে কিভাবে ? আর ওর ছুঁইয়ে থাকার অনুভূতি গুলো ? সেরাতের ওই পৈশাচিক ঘটনা সব মিথ্যে ? সবাই বলেছে সাম্য নেশার ঘোরে দেখেছে সব। সাম্য জানে বিগত ছয় মাস সে ছুঁইয়েই দেখেনি কিছু। তাও ও মেনেই নিয়েছিল এক সময় নেশার ঘোরেই হবে… ভুল দেখেছে… হতেপারে দুঃস্বপ্ন। কিন্তু তারপর বিশেষ একটা জিনিস তার চিন্তার জগতের ঝড় তুলল।
সাম্য পকেট থেকে রুমালে মোড়ানো এক আংটি বের করে আনে। সেই রাতের পরা পোশাকের ভিতর থেকে হঠাৎ করেই আবিষ্কার হল সেটা। তামাটে হয়ে আসা সোনার নক্সাকরা আংটির ওপর টকটকে লাল রুবী। এই সামান্য এক বস্তুই হদিশ দিল অসামান্য এক ঘটনার। প্রচণ্ড শব্দে বাজ পড়ে বাইরে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামে। সাম্য হাতঘড়িতে চোখ বুলিয়ে মুচকি হাসে। তারপর টানটান হয়ে শুইয়ে পরে সেই গদিবিহীন খাটের ওপর ঠিক তিন বছর আগে যেমন ভাবে শুইয়ে ছিল। সেই আংটি পাওয়ার পর সাম্য বুঝেছিল সেরাতে যা ঘটেছিল তা ঘটেইছিল। মনের ভুল ভেবে ভুলে যাওয়ার নয়। এই আংটির সুত্র ধরে সে প্রাণপণে অন্বেস্বন করেছিল প্রকৃত সত্যের। অবশেষে যে সত্য ধরা দিয়েছিল।
সাম্য হাতঘড়িতে আরেকবার সময় দেখে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায়। তারপর পায়ে পায়ে এগিয়ে দাঁড়ায় মান্ধাতার আমলের গোল গোল বড় সুইচের কালো বোতাম গুলোর কাছে। খানিক অপেক্ষা করে কাঁপা কাঁপা হাতে নির্দিষ্ট এক সুইচের নব নামায়। ঘর ঘর শব্দে মাথার ওপর ঘুরতে শুরু করে মরিচাধরা ফ্যান। সাম্য ফ্যানের দিকে তাকিয়ে থাকে। ফ্যানটা ঘুরতে ঘুরতে থেমে যায়। আবার ঘোরে। বাইরের আলো গুলো হঠাৎ নিভে জ্বলে উঠল যেন। সাম্যর শরীর উত্তেজনায় কাঁপে, হ্রিদস্পন্দনের গতি দ্রুত।
ও হাতের মুঠোয় শক্ত করে ধরে থাকে লাল পাথরের আংটি। এই আংটি অনেক কিছুর সাক্ষী। এই আংটি সাক্ষী থেকেছে নিখাত এক প্রেমের, ভরসার, প্রতারণার, আর খুনের।
নব্বই দশকের গোঁড়ার দিকে এক মানুষবেশী শয়তানের অপকান্ডে ত্রস্ত ছিল চারদিক। স্কুল-কলেজ ফিরতি মেয়েদের প্রেমের জালে ফাঁসিয়ে বাড়ি থেকে বহুদূরে এনে নৃশংসভাবে খুন করে ফেলে রাখত। ‘প্রেমিক খুনি’ নামে খ্যাত সিরিয়াল কিলার। ফাঁকা জাতীয়সড়ক বা জাতীয়সড়কের ধারে প্রায় পরিত্যক্ত ফাঁকা হোটেল তার পছন্দের জায়েগা ছিল। সাম্য জানতে পারে ১৯৯২ সালের ১৩ই জুলাই রাতে মনোরমা হোটেলে দুটো লাশ পাওয়া যায়। একটি সেই হোটেলের তৎকালীন ম্যানেজারের। যার মাথাটা থেঁতলে দেওয়া হয়েছিল হোটেলের রান্নাঘর থেকে নেওয়া ভারী শিল দিয়ে। মেয়েটিরও উদ্ধাংশ থ্যাতলান ছিল। শরীরের বাকী অংশছিল টুকরো করে কাটা। যেমন পায়ের পাতা, হাতের আঙুল। পুলিশের কথায় মেয়েটির অনামিকায় থাকা রুবির আংটিটি চুরি যায় কোনোভাবে। কিন্তু তারচেয়েও অদ্ভুত ব্যাপার সেরাতে খুন করার পর খুনিটি কোনোভাবে পালিয়ে যেতে পারে নি।
ফ্যানটা শব্দ করে বন্ধ হয়ে যায় পুরোপুরি। সাম্য অধীর অপেক্ষায় প্রহর গোনে। সেই ঘটনার পর থেকেই সাম্য অপেক্ষা করে আছে। কতবার জীর্ণকায় মনোরমা হোটেলের এই পরিতক্ত ঘরের ভিতরে চুপ করে বসে কাটিয়ে দিয়েছে দিনের পর দিন। কতবার কত রকম ভাবে চেষ্টা করেছে। কিন্তু বহু চেষ্টার পরেও সে দরজা আর খোলে নি। তবু সাম্য রোজ এসেছে। বিশেষ করে প্রত্যেক ১৩ই জুলাইয়ের রাতে। সে জানে সেরাতে ঘটেছিল অস্বাভাবিক কিছু। কোনভাবে খুলেছিল অতীতের দ্বার। সেই দ্বার বেয়ে ওর কাছে সাহায্যের জন্যে এসেছিল কথাকলি। যার জন্যে সাহায্য চাইতে এসেছিল সেইই তাকে খুন করে ফেলেছে বহু আগে। কিন্তু সে নিষ্ঠুর খুন করতে পারেনি তার প্রেমিকার হৃদয়ের ভালোবাসাকে। দরজার ওপাশের জগতে সেই মৃত প্রেমিকা মৃত্যুর পরেও তার প্রেমিককে খুঁজে ফেরে। এভাবেই হয়ত খুঁজে চলেছে বহুকাল ধরে একইভাবে। আর সেই প্রেমিক তাকে প্রেমিকাকে খুন করে চলেছে প্রতিরাতে।
তিনটে বছর ধরে সাম্য অকারণে অপেক্ষা করে থাকে সেই দরজার। সে আপ্রাণে চায় আবার সে দরজায় কড়া নেড়ে কেউ বলে উঠুক, ‘‘আমি না ওকে কোথাও খুঁজে পাচ্ছি না”। না এবার আর সাম্য ওকে ওর প্রতারিত প্রেমিককে খুঁজে নেওয়ার সুযোগ দেবে না। ওর হাতটা শক্ত করে ধরে বলবে,
—পালিয়ে যাবে ? অনেক্ দূর… যেখানে কেউ খুঁজে পায় না কাউকে। বলো যাবে ? আমার হাতে সময় খুব কম কথাকলি। মাত্র দেড়টা মাস পালাবে বলো না ?
সাম্য দেখে অসম্ভবকে সম্ভব করে ঠিক ওই ঘরের উল্টোদিকের দেয়ালের গায়ে ধীরে ধীরে ফুটছে একটা দরজা। চারদিকে আঁধারে মোড়া নিস্তব্ধতা। সাম্য রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করে। কয়েক মুহূর্ত যেন একে একটা যুগ। এমনি কয়েক যুগের পর ওপাড়ের দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ হয়...
সাম্যর ঠোঁটের কোণে যুদ্ধ জয়ের হাসি।
মার্চ ২০২৫, এবং বৃত্তের বাইরে

No comments:
Post a Comment