সিসোকা
হৈমন্তী ভট্টাচার্য
১৫ ই মার্চ, ২০২৫,
রাত দুটো এখন। ঘুম আসছে না। চলন্ত ট্রেনের দুলুনিতে আপার বার্থে ঘুম না আসার কথা নয়। কামরায় আলো জ্বলছে না। শুধু জানলা দিয়ে ঠিকরে আসা রেল ট্র্যাকের লাল-নীল-সবুজ আলো যেন নজরদারির ভঙ্গিতে এসে পড়ছে মেঝেতে চৌখুপি তৈরি করে। লোয়ার বার্থ, মিড-লোয়ার বার্থের মানুষগুলোর আকার স্পষ্ট হচ্ছে তাতে। আর তখনই ভয়ে কেঁপে উঠছি আমি। উল্টো দিকের লোয়ার বার্থের বাচ্চাটা মাকে জড়িয়ে শুয়ে আছে। কত বয়স হবে ? দশ বারো। আমার স্পষ্ট মনে আছে, বাচ্চাটা ছিল না।
হ্যাঁ সত্যিই, ওদের ফ্যামিলিটা খেয়াল করছিলাম। একজন দেহাতি স্ত্রীলোক। ও খাবার খেল, হাতে হলুদ চুড়ি, তারপর বার্থটা নামিয়ে নিল। আমিও উঠে এলাম ওপরে। ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। আচমকা ঘুম ভেঙে গেল। বিশ্রী একটা স্বপ্ন। উফফ্। ছেঁড়া ছেঁড়া। আমার অতীত। তারপরে ঘুম ভেঙে উঠে দেখলাম, আমার সোজাসুজি ওই ছেলেটা। কামরায় আলো নেই, তাই মুখটা বোঝা যাচ্ছে না। আর ওই মহিলা, মুখটা এখনও ঘোমটা দিয়ে ঢাকা, হঠাৎ জোরে চাপড়াতে শুরু করল, ‘‘আয় ঘুম যায় ঘুম...’’ট্রেন এগিয়ে চলেছে, তীব্র কানে ছুঁচ ফুটিয়ে দেওয়া হর্ন।
‘‘বাগদি পাড়া দিয়ে, বাগদীদের মেয়ে পান খায়...’’
আমি শিউরে উঠছি। ঘেমে গেছি। বাথরুমে যাবার দরকার এই মুহূর্তে। চলন্ত ট্রেনে আমি কি আপার বার্থ থেকে নামতে পারব? মাথাটা টলছে। নামতে হবে।
* * *
(তিন মাস আগে)
পত্রালী আমার সামনে বসে চোখ মুছছে। ফর্সা গালের ওপর গলে যাওয়া কাজলের এলোমেলো দাগ। আমি সামনে নিশ্চুপ হয়ে বসে আছি। চারপাশের টেবিলের লোকজন হয়ত আমায় দেখছে। আমার এলোমেলো চুল, না কামানো দাড়ি। এরকম অবিন্যস্ত আমি শেষবার ছিলাম মাস ছয়েক আগে, আমার মা মারা যাবার সময়ে। আজও কি কেউ মারা গেছে? যদি মরে গিয়ে থাকে তো আমার আর পত্রলীর এত বছরের সম্পর্ক।
পত্রালী, আমার ‘পাতা’ হাউ মাউ করে ফুলে ফুলে কাঁদার মেয়ে নয়, কখনও দেখিনি ওকে ভেঙে পড়তে। আজও ও রুমালটা ঠিক গালের ওপরে চেপে বসে আছে। আমার আগের দুটো বছরের একাকীত্বকে ও ঢেকে দিয়েছিল প্রেমে আর মমতায়। আমি ওর মত স্টেডি থাকতে পারছি না। ওর ভিজে চোখের পাতা আমার মনের অবরুদ্ধ অশ্রুকে আকুল করে তুলছে। আমি কাঁপা গলায় বললাম,
‘‘বুকু কেমন আছে, পাতা?’’
‘‘আছে। তোমায় খোঁজে। বলতে তো পারে না। অবোলা প্রাণীর মত...’’
পাতার কথার শেষটুকু বাষ্পতে ডুবে যেতেই আমি চারপাশের পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভুলে গিয়ে কেঁদে উঠলাম। সকলে দেখছে।
‘‘আহ, রজত। কেঁদো না। তোমার জীবনে এখন আর তুমি একা নও। তুমি যেটা করে ফেলেছ, সেটাও অন্যায় নয়। আমি তো তোমায় বলেছি, আমি রইলাম। তুমি যেভাবে চাইবে।’’
সামনের রাস্তার দিকে তাকিয়ে থাকি আমি। রোদে চকচক করছে। এরকমই একটা রোদেলা সকালে আমি পাভো ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে প্রথম জয়েন করেছিলাম। আমার দিকে শান্ত অথচ সহযোগী যে চোখদুটো তাকিয়েছিল, তার দুটো পাড় নীল কাজলে আঁকা। ঘন ম্যাজেন্টা লিপস্টিকে রাঙানো সরু ঠোঁটের হাসি ছুঁয়ে গিয়েছিল গালের গভীর ডুব পুকুর টোলে। শুধু তাই নয়, সিনিয়র কলিগ হিসাবে এই ধরণের কর্পোরেট স্কুলে যেরকম পিঠ পিছে কথা হয়, সেরকম সিচুয়েশনে আমি কী বলতে হবে একদমই বুঝে উঠতে পারতাম না। এমনকি যেরকম বাইরের ঝাঁ চকচকে একটা চেহারা বজায় রাখতে হয় সেটাও পারতাম না। পাতা আমাকে স্কুলের ক্যাফেতে নিয়ে গিয়ে একসঙ্গে লাঞ্চ করত। ওর সঙ্গে থেকেই আস্তে আস্তে আমার ফুটো বাড়তে থাকা স্যান্ডো গেঞ্জির ওপর ব্রান্ডেড পোশাক পরা।
পাতা’র বাড়িতে যেদিন প্রথম গিয়েছিলাম, আমাদের বন্ধুত্ব প্রেমে বাঁক বদলের মাস তিনেক পরে, আমি সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা পেয়েছিলাম। আমার মনে আছে, বউবাজারের পুরোনো আমলের বাড়ির ভারী দরজাটা ক্যাঁচ ক্যাঁচ শব্দে খুলে গেল। ভেতর থেকে একটা জান্তব ঘরঘরে শব্দ। যেন কেউ প্রাণপনে বাঁধন ছিঁড়ে বেরিয়ে আসতে চাইছে। আমি দু’পা পিছিয়ে গেছিলাম। তারপর সামনের দরজার পাল্লাটা সরে যেতে যে দৃশ্য দেখলাম, তাতে আমি চমকে উঠে পাতার হাসি মেখে থাকা মুখের দিকে তাকালাম।
‘‘কী হল, চমকে উঠলে কেন রজত?’’
আমি অতীত থেকে ঝাঁকুনি খেয়ে বর্তমানে ফিরলাম। পাতার চোখদুটো এখনও ফোলা ফোলা। পাতা, আমার পাতা, দুঃখের আগুনে পুড়ে খাঁটি সোনা হয়ে ওঠা প্রতিমা পাতা, যার সঙ্গে আমার বিচ্ছেদ হয়েছে, এটা মন মেনে নিতে পারছে না।
‘‘রজত, তুমি তোমার জীবনে ফোকাস করো। আমার যা হয় হোক।’’ দীর্ঘ সরলবর্গীয় বৃক্ষের মত পাতা সোজা হয়ে দাঁড়ায়।
‘‘আর বুকু?’’ আমার গলা কান্নায় বুজে আসে।
স্কুলে প্রথম আলাপের দিনই পাতা বলেছিল, ‘‘আমার পরিবারে আমি আর আমার ছেলে। আমার শক্তি বলো, আর যা সবই আমার ওই ছেলে। ওই আমার এনার্জি বুস্টার।’’ তারপর সেই বৌবাজারের বাড়ি, সেই পুরোনো কালচে কাঠের ওপর তাপ্তি মারা দরজা। ঠেলে খোলার পর অদ্ভুত জান্তব শব্দ। খোলা দরজা দিয়ে আলো আয়তক্ষেত্র হয়ে ঘরের মেঝেতে পড়ে ছিটকে গিয়ে যে মুখটাতে পড়ছে সেটা একটা শিশুর। গোলাকার মুখের ওপরে প্রায় কেশহীন মাথা। আগুনের মত লাল চোখ। লাল টুকটুকে ছড়ানো ঠোঁটের চারদিক লালায় ভিজে।
‘‘আ...আ...’’
বিজাতীয় শব্দে ভয়ে আঁতকে উঠেছিলাম সেদিন। আধো অন্ধকারে চোখ সইয়ে তাকালাম। ঘরে যে মানুষটি বিছানার ওপরে বসে আছে, তার বয়স বছর ষোলো। কিন্তু মুখটা একটা পাঁচ বছরের শিশুর মত। অদ্ভুত গোল চোখদুটোয় নীলচে মণি।
আমি অবাক হয়ে তাকিয়েছিলাম। হঠাৎ আমার হাতের উপর একটা ঠাণ্ডা হাত।
‘‘অবাক হলে?’’
আমি শিউরে উঠে তাকিয়ে দেখলাম পাতার চোখদুটোতে একটা মজা খেলা করছে। আমি খুঁটিয়ে দুঃখ খুঁজলাম। এরকম একটা স্পেশাল বাচ্চার মা যে, তার এতদিনের আচরণে কোনও হতাশা, কোনও বেদনা থাকবে না! এটা কখনও হয়!
তারপরেও আমি আর পাতা পথ একসঙ্গে হেঁটেছি। পাতা বুকুর কথা বলে গেছে। আমি চুপ করে শুনেছি। তবে আমি আর যেতে চাইনি ওর বাড়িতে। পাতার হাত যখন নিজের হাতে তুলে নিয়েছি ভুলে যেতে চেয়েছি, এই হাতেই ও নিশ্চয়ই বুকুর পেচ্ছাপ পরিষ্কার করে এসেছে। আমি পাতার শরীরে সেদিনকার পুরোনো স্যাঁতসেঁতে বাড়ির গন্ধটা এড়িয়ে গিয়ে ওর চুলে নাক ডুবিয়ে দিয়েছি। সুন্দর শ্যাম্পুর গন্ধ, নাহ, আমি সেই গন্ধটার প্রেমে পড়েছি। পাতা সযত্নে ঢেকে রেখেছে ওর অতীত। কথা বলতে হত, আমিও কৌতূহলী হয়েছি। কিন্তু তার আগেই... পাতাকে নিয়ে আমি কোনও পরিকল্পনা করে ওঠার আগেই আমার একটা ভুল সব ভেঙে দিল।
‘‘তুমি অস্বীকার করতে পারো না সত্যিটা। ঠিক ভুল যাই হোক।’’ পাতা বলে।
আমারা আবার অতীতে ডুবে গিয়েছিলাম। পাতার কথায় মুখ তুললাম। আমি জানি ও কী বলছে। আমি ঘাড় নেড়ে বললাম, ‘‘আমায় ক্ষমা করলে তো? থাকবে তো আমার সঙ্গে?’’
‘‘থাকব। তবে কী পরিচয়ে? একজন বিবাহিত পুরুষের জীবনে আদার ওম্যান। বলো।’’
আমি নীরবে তাকিয়ে থাকি।
‘‘আমি কখনও তোমার কাছে কিছু চাইনি। আজ চাইব?’’
‘‘বলো।’’
‘‘থাক। পরে বলব।’’
* * *
সুমঙ্গলা আমার বাড়িতে আপাতত গিন্নি হয়ে বসেছে। সুমঙ্গলা মান্ডু ওর সাদা দাঁতগুলো গুলের ছাই দিয়ে মাজে। শহরে গুলের ছাই জোগাড় করা কম কথা নয়। আমি কাছের লন্ড্রি থেকে এনে দিই। কাঁচের ডাইনিং টেবিলে বসে ও গোটা সবুজ কাঁচালঙ্কা মট করে ভেঙে ভাতে দলে নেয়। তারপর চটকে মেখে খায়। অথচ ও ইংরেজিতে নিজের নাম লিখতে পারে। আমার এই ছোট্ট বাড়ির তিনটে ঘরে তিনজন আছি। একটা ঘরে নিজের বইপত্র নিয়ে আমি। আরেকটা ঘরে সুমঙ্গলা। ও আমার বউ। কিন্তু ওকে নিয়ে এক ঘরে থাকব, এটাই আমি ভাবিনি। সুমঙ্গলাকে আমি বিয়ে করলাম কেন? পাতাও এই প্রশ্ন করেছিল। ওকে উত্তর দিয়েছিলাম, ‘‘ভাগ্য!’’ আসলে তা নয়। আমার মা বাঁকুড়ায় সোনামুখীর বাড়িতে একা থাকতেন। মাকে দেখাশোনা করত সুমঙ্গলা। জেনেছিলাম ওর কেউ নেই, অনাথ। আমি আচমকা ওর ফোনেই জানলাম মায়ের হঠাৎ মুখ চোখ ফুলে গেছে। সারারাত মা ঘুমোতে পারছে না। সেদিনই রওনা হলাম। মঙ্গলা মায়ের মাথার কাছে দাঁড়িয়ে, মায়ের শেষ নিঃশ্বাস তখন গলার কাছে। পারিবারিক বৃদ্ধ ডাক্তার বসে আছেন বিরস মুখে। চারপাশের মানুষজনের চোখে চোরা অভিযোগ। সত্যিই, ছেলে কলকাতায় থাকে, মাকে কেন নিয়ে যায়নি! কিন্তু আমার যা রোজগার তখন, স্কুলের চাকরিটা চলে গেছে। তার ওপর মেসের ঘর। হয়নি। মায়ের শেষ নিঃশ্বাস পড়ার আগে মারাত্মক নিঃশ্বাসের টান চলল কিছুদিন। তারমধ্যে একদিন মঙ্গলা আমায় চা দিতে এল। ওর বুকের ওপর শাড়ি নেই, শুধু সায়া আর ব্লাউজ, একটা গামছা বুকে ধরা। যেতে গিয়ে ছুঁয়ে গেল আমায়, হয়ত ইচ্ছে করে নয়। আমার মধ্যে কী যেন হল। আমি জাপটে ধরলাম ওকে। ও বাধা দিল না। তারপর নিজের ওপর সে কি ঘেন্না। মায়ের আমাকে বলা শেষ কথা ছিল, ‘‘মংলাকে তুই নে, বিয়ে করে নে।’’ না করলেও পারতাম। কিন্তু মংলা আবার সে রাতে এল। ওর কপালে সিঁদুর। আমি তো পরাইনি। আমি ভয় পেলাম। অথচ মেয়েটা কী সহজভাবে আমায় প্রণাম করল। পরের দিন রটে গেল আমি ওকে বিয়ে করেছি। আমিও তো মেনে নিলাম। বাধা তো দিই নি। আমার দুর্বলতা আমায় বাধা দিতে দিল না।
সুমঙ্গলার ঘন ভ্রুর নীচে ছোট্ট ছোট্ট চোখ। সত্যি বলতে আমি শহর থেকে দূরে একটা ঝরঝরে পুরোনো বাড়ি কিনেছি। সারাতে হবে, বুঝি, কিন্তু টাকা কোথায়! দুটো ঘরে আমরা দুজন থাকি। একঘরে থাকলেও সারাদিনের পর রাতে পাশে গুটিয়ে শুয়ে থাকা মঙ্গলাকে আমার ছুঁতে ইচ্ছে করে না। আরও অস্বস্তির কারণ আমি বুকুকে এ বাড়িতে এনেছি। পাতা আর বুকুর সঙ্গে আমার সম্পর্ক চিরকাল একই থাকবে। পাতার একটা অপারেশন হয়েছে, গলব্লাডারে স্টোন হয়েছিল ওর। সেই সময়ে আমার হাতটা ধরে ও বলেছিল, ‘‘রাখবে বুকুকে ?’’
বুকুর দেখাশোনা করা সহজ নয়। জন্তুর মত ওর উদ্দাম একটানা চিৎকার। আমি আমার অল্প রোজগারেও কাজের লোক রেখেছিলাম। প্রথম দিন বুকু থালা ছুঁড়ে ফেলল। পরের দিন পরনের জামা প্যান্ট টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ল। তারপরের দিন কাজের লোক এলই না আর। আমাকে অফিসে যেতেই হবে। দূর, যা হয় হোক। বুকুর ওই একটানা 'আ...আ' চিৎকার অসহনীয় লাগছিল। অফিসে কাজের শেষে বাড়ি ফিরে দেখলাম বুকুকে মংলা খাওয়াচ্ছে। এটা নিয়ে আর কথা হয়নি। কিন্তু মংলা ক্রমশ বুকুর দেখাশোনায় কীভাবে যেন সড়গড় হয়ে গেল।
আর বুকু। সারাদিন অদ্ভুত চোখে তাকিয়ে থাকে। আমি যেন ওর পলক পড়াও দেখতে পাই না। ওর সঙ্গে চোখাচোখি হবার অস্বস্তি আমি এড়িয়ে যেতে চাই। ও সারা বাড়ি জুড়ে পা ঘষে ঘষে হাঁটে। আমি একা থাকলে ঘরের দরজা ভেজিয়ে রাখি। বুকু ঘরে ঢুকলে আমার নাক কেমন যেন শুকনো লালার গন্ধ পায়। ওর যেন কত রাগ আমার ওপর। আর ওই অদ্ভুত চিৎকার, আর্তনাদের মত।
ঘটনাটা ঘটল তেইশে জানুয়ারি মাঝরাতে। এমনিতেই সারাদিন মাইকে ‘মেরে ওয়াতন কি লোগো’ শুনে শেষে পাশে কোথায় পিকনিকে একগাদা মশলার গন্ধে হেঁচে শুতে গেছি, মংলা পাশে ঘুমিয়ে পড়েছে আগেই। আলো নিভিয়ে বিছানায় গা ফেলতেই একটা অদ্ভুত আঁশটে গন্ধ নাকে এসে জোরালো ধাক্কা মারল। আর একটা ডানা ঝাপটানোর শব্দ।
ঘরে কী পায়রা ঢুকল? অন্ধকারের মধ্যে চোখ সইয়ে আমি দেখার চেষ্টা করলাম। হ্যাঁ, কিছু একটা ঢুকেছে ঘরে। খাটের ছত্রির ওপর একটা কালচে জিনিস বসে আছে। আমি তো একটু আগেই আলো নিভিয়েছি। তাহলে? চোখে পড়ল না কেন!
পাশে ঘুমন্ত মংলাকে ডাকব? ওর সঙ্গে সারাদিনে যা কথা হয় শুধুই প্রয়োজনের। বুকুকে নিয়ে কিছু। এখন রাতে ভয় পেয়ে ওকে ডাকতে ইতস্তত লাগল। আর ভয় কীসের? কাক বা পায়রা হয়ত।
একটা টর্চ হাতের কাছে থাকলে... আছে তো, মোবাইলটা বালিশের পাশে। আমি হাত বাড়াতেই একটা অদ্ভুত চাপা কর্কশ আওয়াজ যেন ঠিক আমার কানের কাছে বেজে উঠল, ‘‘আঁ... আঁ...’’।
আমি সব শক্তি একজায়গায় এনে মোবাইলটা তুলে কাঁপা হাতে টর্চ জ্বেলে সামনে ফেলতেই মনে হল হ্যাঁ, কিছু একটা ছিল। আলো পড়তেই সেটা গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে যেন ছড়িয়ে গেল মেঝেতে। আমি চিৎকার করে উঠলাম, মোবাইলটা হাত থেকে পড়ে গেছে।
‘‘কী... কী হলু রে?’’, মংলা উঠে বসেছে।
মেঝেতে মোবাইল চিৎ হয়ে পড়ে। টর্চের আলোটা সিলিংয়ে গিয়ে পড়ে ছড়িয়ে যাচ্ছে সারা ঘরে। আমি ঘেমে উঠে বসে চিৎকার করে মেঝের দিকে তাকালাম। কীসের যেন আঁকিবুকি অল্প আলোয় ফুটে আছে।
মংলা উঠে গিয়ে ঘরের আলো জ্বালিয়েছে। আর তাতে মেঝের দিকে তাকিয়ে দেখলাম সিমেন্টের ওপর নোংরা কাদা ওয়ালা নখ দিয়ে যেন কেউ আঁচড়ে দিয়েছে। মংলা উঠে গিয়ে মাটিতে বসে দেখল। তারপর উঠে গিয়ে ন্যাতা এনে ঘর মুছে আবার হাই তুলে ঘুমিয়ে পড়ল।
‘‘আলোটা নিভাইন দিন।’’
আমি আলো নিভিয়ে একটা সিগারেট হাতে বারান্দায় দাঁড়াই। ওপাশের ঘরে বুকু ঘুমিয়ে। ওকে ওষুধ দিয়ে ঘুম পাড়াতে হয়। নাক ডাকছে।
‘‘আঁ... আঃ...’’ আমি চমকে উঠলাম। বুকু ঘুমের মধ্যে শব্দ করছে। অবিকল এরকমই আঁতকে ওঠা চিৎকার আমি একটু আগে শুনলাম না! না না মনের ভুল। তাহলে মেঝেতে ওই আঁচড়গুলো কীসের! সামনে কুয়াশার আড়ালে রাতের ঝাপসা বাতিগুলো। হঠাৎ মনে হল, সামনের বড় মাঝারি সব ঘুমন্ত বাড়িগুলোর কার্নিশে একরাশ কালো কালো অদ্ভুত পাখি বসে আছে। তাদের চোখ অন্ধকারে ঢাকা, কিন্তু সে চোখে গনগনে আগুন। আমি গ্রিলে হাত রেখেছিলাম কখন যেন। চমকে উঠলাম হাতে একটা শিরশিরে স্পর্শ পেয়ে। একটা সরু হিলহিলে সাপের মত পাকানো জিনিস আমার হাত ছুঁয়ে যাচ্ছে।
নাহ্, চোখটা প্রাণপনে বন্ধ করার পরে আমি খুলে দেখলাম ওটা একটা বুনো গাছের আকর্ষ।
কেন এত ভয় পেলাম সেদিন! হঠাৎ কী হল!
* * *
(ওই ঘটনার দু মাস পরে, সকালবেলা)
মংলা ইচ্ছে করেই কপালের লেপে যাওয়া সিঁদুরটা মোছেনি। ওর কালো কপালে চামড়ার সূক্ষ্ম ভাঁজে শিরা উপশিরার মত সিঁদুরের রেখা। আমার সামনে চা রেখে ও চুলটা ইচ্ছে করেই সরিয়ে রাখল কানের পাশে। মংলার সঙ্গে আমার সম্পর্কের মাঝে যে বরফের পাঁচিল ছিল, সেটা রক্ত মাংসের গন্ধে আর ভাপে আস্তে আস্তে গলে গেছে। আমিই সেদিন ভয়ের রাতটা কাটানোর পরে ভীষণ একাকীত্ব অনুভব করছিলাম। পরদিন দেখেছিলাম মংলা বুকুকে স্নান করাচ্ছে। খালি গায়ে, ফর্সা বুক পিঠে গরম জলে ডুবিয়ে শুকনো করে জল ঝরানো গামছা দিয়ে মোছানো হল। মেয়েটার মনটা সদয়। সেই রাতে আমার ভয় করছিল খুবই। ভয়ের স্বপ্ন দেখলাম। আমার সামনে অনেকগুলো সাপের মত সর্পিল হিলহিলে গলা। কীসের? সেই গলা গুলোর প্রতিটার ওপরে ছোট্ট কালো মাথা, দুটো করে জ্বলন্ত গনগনে চোখ, জ্বলছে। আমার যেন চোখ গুলো খুব চেনা। সেই সঙ্গে একটা ‘‘আঁ...’’ আর্তনাদ। বুকুর গলা অবিকল। আমি যেন চমকে উঠে বসলাম। তারপর দেখলাম মাথার ওপরের আকাশটা কালো করে উড়ে বেড়াচ্ছে বিরাট বিরাট শকুন। তাদের লম্বা পলকহীন গলাগুলোকে আমি সাপ ভাবছিলাম।
আমি কি জেগে? না ঘুমিয়ে?
নাহ, ঘোরের মধ্যে আমি কাউকে আঁকড়ে ধরতে চাইছিলাম। আমার নিরাপত্তা চাই। নাহলে ওই ভয়ানক বিরাট শকুনগুলো আমায় নখ দিয়ে ছিঁড়ে দেবে।
‘‘কী হল অনে ?’’
‘‘আ... আ...’’
আমি জড়িয়ে ধরি আমার পাশে কে পুরো ভুলে গিয়ে। ঘুমটা ভেঙে যায়। চমকে দেখি আমার বাহুবন্ধে থেকে আমায় আঁকড়ে আছে। আমি উঠে বসি, পাতা যে বুকুর দায়িত্ব দিয়ে গেছে, পাতার মুখটা ভেসে উঠল। সবে হাসপাতাল থেকে ফিরেছে। বুকু ঠিক আছে তো? আমি ছুটে গেলাম ওর ঘরে।
নাহ, ঘুমিয়ে আছে।
ঘরে ফিরে আমি জড়িয়ে ধরলাম মংলাকে। ও মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। তারপর বলল, ‘‘ভয় পেইছ?’’
আমি তুতলে বলি, ‘‘না মানে একটা বিশ্রী স্বপ্ন। বুকু, আর একটা শকুন...’’
মংলা আমার বুকের ওপর হাত রেখে একদৃষ্টে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। এই মেয়েটাকে আমি এতগুলো দিন ছুঁয়ে দেখিনি। ওর রেঁধে দেওয়া ভাত খেয়েছি, কিন্তু ওর হাতটা হাতের মধ্যে জড়িয়ে রাখিনি, তবুও ওর চোখের মমতা আমায় স্পর্শ করছে। ও কী যেন ভাবছে, কী যেন বলতে চাইছে। ওকে এই মুহূর্তে আশ্রয় ভাবছি আমি, পাতা, আমার প্রিয়তমা, ক্ষমা করে দাও আমায়।
‘‘কী হল, মংলা?’’
‘‘এসো’’, আমার হাত ধরে টানতে টানতে নিয়ে যাচ্ছে মংলা। একতলা বাড়ির সিঁড়ির ওপ্রান্তে ছাদ। ধাপে ধাপে পায়ে পায়ে আমি উঠে যাচ্ছি ছাদের দিকে। ও হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ে। তারপর বলে, ‘‘ওই দেখো।’’
আমি এগিয়ে যাই। এক কোণে কয়েকটা পালক ছড়িয়ে আছে। সাদায় কালোয় মেশানো পালক। আমি আমার দুঃস্বপ্নের কথা মনে করি, সারি সারি শকুন। এইরকম কালো পালক।
‘‘শকুন’’।
‘‘হ্যাঁ, ঠিক বলিছ। গতকাল থিকে আছে। আমার মন বলছে কিছুর নজর আছে আমাদের ওপর।’’
‘‘কিসের?’’, আমি বোকার মত জিজ্ঞাসা করি।
‘‘খারাপ আছর আছে। আমি ভাবছিলাম বলব না। তবে...’’
‘‘সি... সিসকা...’’
‘‘সেটা কী?’’
মংলা বলতে গিয়ে থমকে যায়।
‘‘আঁ....আঁ...’’
চমকে তাকাই আমি আর মংলা। বুকু ঘুম থেকে উঠে পড়েছে। দাপানোর শব্দ আসছে। অস্থিরভাবে ও পা দাপাচ্ছে খাটের উপর। আর চিৎকার করছে, ‘‘আঁ....’’ রাতের অন্ধকার চিরে যাচ্ছে তীব্র আর্তনাদে।
‘‘এই আওয়াজটা। এটা ভালো নয় গো।’’ মংলা ফিসফিস করে বলে।
* * *
এই কদিনের কাজে আমি পাতাকে প্রায় দেখতেই যেতে পারিনি। ও হাসপাতাল থেকে বাড়ি এসেছে আমারই হাত ধরে। ওর পুরোনো বাড়ির ঘরে যখন ওকে নিয়ে ঢুকলাম, তখন বুকুর বিছানাটা এলোমেলো। আমি সেদিকে তাকিয়ে শিউরে উঠি। পাতা নিজের মনে বলে চলে, ‘‘বুকুকে এই কদিন যে রাখলে এই উপকারের ঋণ আমি শোধ করতে পারব না।’’
আমি চুপ করে থেকে পাতার হাতের নখগুলো চেপে চেপে ধরি। কী করে দুটো সত্য একই সঙ্গে আমার জীবনে রয়েছে, আমি সেটা সৎভাবে পাতার সামনে স্বীকার করব। আমি পাতাকে পাগলের মত ভালোবাসি। এমনকি মংলা আমার জীবনে জায়গা করে নেবার পরেও, আমি প্রতিটি নিভৃতি জুড়ে শুধুই পাতাকে রেখেছি। কিন্তু বুকু! ওকে আমার অস্বস্তি হয়। আমার নিজেকে ঘৃণা করতে ইচ্ছে হয় বুকুকে আমি গ্রহণ করতে পারিনি বলে। আর ইদানিং কিছু ঘটনায় বুকুকে ঘিরে আমার যেটা হয়েছে সেটা একটা অসম্ভব ভয়। তার কারণও আছে। পাতাকেও অনেক গুলো প্রশ্ন আমার করার আছে।
‘‘এবার আমি অন্য কোথাও চাকরি নিয়ে চলে যাব। আমি আর বুকু। তোমার জীবনে এবার তুমি মন দাও।’’ পাতা মৃদু হেসে বলে।
আমি সামান্য চমকে উঠি। চারপাশে তাকাই। পাতা কি খেয়াল করেছে? আমি অন্যমনস্ক হয়ে পড়ি।
এই কয়েকদিন আগের ঘটনা। সকালবেলা দাঁত মাজতে গেছি। কলের জলটা মুখে দিতেই গা গুলিয়ে ওঠে। কিসের যেন গন্ধ, আর লালচে ঘোলা। ইস।
‘‘মংলা...’’, ওকে ডেকে ওকেও দেখাই।
দুজনে ছাদে জলের ট্যাঙ্কের দিকে এগোতে গিয়ে বুকুর ঘরের দিকে চোখ যায়। বুকু বসে আছে সোজা হয়ে। দুলছে মুখে আঙুলগুলো পুরে দিয়ে।
আমরা ছাদে যাই। সরু মই বেয়ে ট্যাঙ্কের ওপরে উঠে ঢাকনি সরিয়ে নীচে উঁকি মারি, টর্চের আলো ফেলি। হ্যাঁ, কীসব যেন ভাসছে জলে। কী এগুলো! চশমাটা ফেলে এলাম। দূর।
‘‘তুমি নামো দিকি। আমি উঠব।’’
আমি নামতেই মংলা সরসর করে ওপরে উঠে যায়। তারপর বলে ‘‘কলটা খুলে দাও।’’
খানিকক্ষণ পরে সব জল বেরিয়ে যাবার পরে মংলা লাফ দিয়ে নামে। রোগা শরীরে চট করে নেমে গিয়ে হাতে যেগুলো নিয়ে ও বেরিয়ে আসে সেদিকে তাকিয়ে আমার সারা গা গুলিয়ে ওঠে। পালক, আর পাখির নাড়িভুঁড়ি।
‘‘কাক বা পায়রা পড়তে পারে?’’ আমি মিনমিন করে বলি।
‘‘পালকগুলো শকুনের।’’
সারাদিন আমরা যে যার কাজ করি। বুকু পা ঘষে ঘষে ওর রক্তাভ চোখ নিয়ে নিজের মত ঘোরে বাড়িময়। বিকেলের দিকে একটু ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। হঠাৎ মংলা আমায় ডাকে, ‘‘এসো দিকি।’’
ওর গতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে প্রায় ছুটে আমি সিঁড়ি বেয়ে ছাদে আসি। কিন্তু এটা কী দেখছি? সরু সিঁড়ি বেয়ে উঠে, খোলা জলের ট্যাঙ্কের ওপর একজন ঝুঁকে আছে। বুকু?
‘‘চুপ...’’
আমি রুদ্ধশ্বাসে দেখি, বুকুর হাতে একটা মরা শকুনের ছানা। এটা কোথা থেকে এল? ও তার পাখনাগুলো ছিঁড়ে ছিঁড়ে জলে ফেলছে।
‘‘তুমি নীচে চলো।’’
‘‘কিন্তু বুকু?’’
‘‘ওকে ডেকো না। ওর ক্ষতি হবে না।’’
নেমে এসে মংলা আমায় যা যা বলে আমি পরম বিস্ময়ে শুনে যাই কেবল।
এই মুহূর্তে পাতার সামনে বসে আমার মনে পড়ছে কথাগুলো। আমি কি জিজ্ঞাসা করব, পাতার স্বামী কে ছিল? কার সন্তান বুকু? কার রক্ত ওর শরীরে?
না, আমার ভদ্রতাবোধ আমায় আটকাচ্ছে। তবুও করলাম। পাতা একটু চুপ করে থেকে স্পষ্ট ভাষায় বলল,
‘‘তোমায় এতদিন বলিনি আজ বলছি, ও আমার নিজের সন্তান নয়। আমার আগের চাকরি ছিল মানভূমের একটা মিশন স্কুলে। সেখানেই ওকে আমি পাই, পরিত্যক্ত অবস্থায়। কিন্তু আজ ও আমার নিজের সন্তানের চেয়ে কম নয়।’’
আমি চুপ করে শুনি। বুকুকে নিয়ে ভাবতে দায় পড়েছে। এই মুহূর্তে পাতার থেকেও দূরে যেতে চাই আমি। ঝামেলামুক্তি চাই। ওরা যা পারে করুক, শুধু মংলার কথা মনে পড়ে। পাতা কি সত্যিই কোনও অশুভ শক্তির বশ! বুকুও! শিউরে উঠি। মরিয়া হয়ে বলি,
‘‘পাতা, তুমি তো এখন সুস্থ, তাহলে বুকুকে কি এবার দিয়ে যাব?’’
পাতা কি অবাক হল! তাকিয়ে আছে। কী ভাবছে? চুলোয় যাক।
‘‘বেশ।’’
আমি নিশ্চিন্ত হলাম এবার। আমার আর মংলার একটা স্বাভাবিক জীবন, সুখের চেয়ে স্বস্তি। পাতা, আমি খুব স্বার্থপর। আমি এই মুহূর্তে তোমাকেও ভয় করছি, সন্দেহ করছি। তোমার এই ঘরেও কি সেই অশুভ নজর রয়েছে? দেখছে আমায়! আর তুমি?
কোনোমতে বিদায় নিয়ে বেরিয়ে আসি।
* * *
‘‘এই বাংলার আদি যুগের মনিষ্যি যারা ছিল তাদের সঙ্গে হারিয়ে গেছে তাদের সব মন্তর। তাদের জানা কত জাদু, এমনকি তাদের মেরেধরে বাইরে থেকে আসা মানুষগুলো যখন তাড়িয়ে দিল, তখন একজন দুজন ছাড়া সেই দলের কেউ বাঁচেনি এমনও হয়েছে।’’
‘‘বাংলার আদি লোকজন? মানে আদিবাসীরা? সাঁওতাল ওরাও কোল?’’
আমি জানি মংলা নিজেও বাগদী। ও স্কুলে পড়েছে। বানান করে পড়তে জানে। আমি বলি, ‘‘কিন্তু তুমি বলো সিসকা কে?’’
মংলা চুপ করে থেকে বলে, ‘‘তুমি পাতা দিদিকে ভালোবাসো। বলতে আমার কেমনি কেমনি লাগছে। কিন্তু বলি, পাতা দিদি ভালো লয়। তুমি ওর ওই ছিলা, আর ওর বাপের নাম জিগাওনি। জিগালাও ও বলতনি।’’
আমি মিলিয়ে মিলিয়ে ভাবি। সত্যিই তো। আমি জিজ্ঞাসা করেছি, পাতা এড়িয়ে গেছে। এই সেদিনও। মংলা বলে, ‘‘এই যে ও বলে না, এটা আগে খুঁজে বের করো। সিসোকা একটা হারিয়ে যাওয়া আত্মা। অনেক যুগ আগের মানুষরা তাকে জাগাতে পারত।’’
‘‘আমি সত্যিই কিছু বুঝতে পারছি না।’’
‘‘আমার মনি হয়, বুকু সিসোকা। কেউ ওর মধ্যে মন্তর দিয়ে ওকে এক অদ্ভুত জীব বানিয়েছে। সেই মন্তর এখনকার মানুষ জানে না। আগেকার মানুষ জানত, যাদের মেরে ধরে শেষ করে দিয়েছিল বাইরে থেকে আসা মানুষ। আমাদের সান্তরী গল্পে এদের অনেক গল্প আছে।’’
আমি জানি, ভারতের উপজাতি সম্প্রদায়ের মানুষকে কিভাবে উৎখাত করেছিল বিভিন্ন সময়ে বহিরাগত জাতি। কখনও আর্য, কখনও অস্ট্রিক জাতি ভারতের মূল ভূখণ্ডের আদিম জাতিগুলোর সঙ্গে মিশে গিয়েছে। তাদের মধ্যে কত জাতিকে যুদ্ধে নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছে। তাদের কোনও গোপন ক্রিয়া হয়ত এই মেয়েটা জানে। কিন্তু কীকরে জানল?
মংলা আমার দিকে তাকিয়ে আছে। ও বলল, ‘‘তুমি ভাবছ আমি কী করে জানলাম? আমার পরিবারের বাপ পিতেমোর যে ঐ কাজ ছিল। এসো একটা জিনিস দেখাই।’’
আমি বসে আছি। মংলা ওর বাক্সের কাছে গেল। খুব সাবধানে কিছু একটা আনছে ও।
ও সেটা আমার সামনে তুলে ধরল। একটা ছোট্ট বাঁশি।
‘‘কী এটা?’’
‘‘শকুনের হাড় দিয়ে বানানো বাঁশি। সিসোকা এতেই জাগে। আরও অনেক মন্ত্র আছে, আমি সব জানি না। কিন্তু আমি এটা বলতে পারি, ওই বুকু, হয়ত ও আর মানুষ নেই। হয়ত কখনও ছিল। কিন্তু এখন নেই। ওর মত মনিষ্যি যাদের বুদ্ধি শুদ্ধি কম, তাদের সিসোকা বানানো সোজা।’’
‘‘কিন্তু কেন এতকম করবে কেউ?’’
‘‘আমার মনে হয় হয়ত পাতা নিজেই সেই তন্ত্র জানে। হয়ত তোমাকেও গ্রাস করতে চেয়েছিল।’’
‘‘এরা কেমন?’’
‘‘এদের ক্ষমতা থাকে আত্মাকে গ্রাস করার। সেই মানুষকে দেখে বোঝার উপায় থাকে না, সে সিসকা হয়ে গেছে। তার গলা শকুনের মত লম্বা হয়ে পেঁচিয়ে ধরে কাউকে মেরে ফেলতে পারে। তুমি বুকুর গলাটা লক্ষ্য করবে।’’
‘‘কেন এমন করে?’’
‘‘হয়ত গোপন বিদ্যায় চিরকাল বশ করে রাখতে চায় প্রিয়জনকে। সিসোকার কোনও বাপ মা থাকে না। তারা পিথিবী মায়ের ছাবাল। শুধু যে তাকে তৈরি করে, একই মন্তর দিয়ে কাজ করে একই সঙ্গে, সেই তার মা - বাপ।’’
* * *
সেদিন সন্ধ্যাবেলা পাতা এল গাড়ি ভাড়া করে। আমি বুকুকে গাড়িতে তুলে দিলাম। ওর গলাটা আমি ভালো করে লক্ষ্য করলাম। কোনও পার্থক্য নেই তো। পাতা আমার সঙ্গে কোনও কথা বলল না। হয়ত অভিমান। মংলাও সামনে এল না। ও একদমই চায়নি বুকু পাতার কাছে ফিরে যাক। বার বার বলেছিল, ‘‘ছিলাটার ক্ষতি হবে। ওকে এখনও বাঁচানো সম্ভব। ও থাক। পাতাদিদি মন্তর জানা ডাইন।’’
ঝামেলা নিতে আমি রাজি হইনি।
আমি একা ছাদে এলাম সন্ধ্যেবেলা। মাথাটা না না রকম চিন্তায় ছেয়ে আছে। মংলা কাল যা যা বলল, সেগুলো সত্যি না গল্প? এসব আদৌ সম্ভব! মংলা আমার ভালোই চায়। এমনকি বুকুরও। ও কী করে এত সব জানল! যেভাবেই জানুক আমি দেখেছি বুকুর ওপর ওর মায়া। কত যত্ন!
সেই রাতে কোনও আশ্চর্য ঘটনা ঘটল না। আমিও আস্তে আস্তে স্বাভাবিক হতে লাগলাম। মংলার সঙ্গে আমার স্বাভাবিক দাম্পত্য মোটামুটি গড়ে উঠেছে। বুকু আর পাতা আমার জীবন থেকে প্রায় মুছেই গেছে।
* * *
(এক বছর পরে)
মাঝের একটা বছর কীভাবে যেন কেটে গেল। যেন এই একটা বছর কয়েকশ বছরের যোগফল। কীভাবে? সেই দুর্ভাগ্যের জন্য নিজের ওপর আমার করুণা হয়। পরে আসছি সে গল্পে। হঠাৎ তখনই এমন একটা ঘটনা ঘটল যে আমার যেটুকু শান্তি ছিল সেটাও চুরমার হয়ে গেল।
মাঝের এই সময়ে আমি অনেক কিছু হারিয়েছি। কিন্তু খবরের কাগজ পড়ার নেশা আমি হারাতে পারিনি। জোগাড় করে হলেও আমি খবরের কাগজ পড়ি, এমনকি... লুকিয়ে হলেও। দিনটা আজও মনে আছে, দোলের আগের দিন সেটা। খবরের কাগজের এক কোণে একটা ছোট্ট খবর, প্রায় চোখে না পড়ার মতই। এত ছোট হরফে, যে একটা মৃত্যু যেন কোনও ব্যাপারই নয়। একজন মহিলার ক্ষত বিক্ষত দেহ পাওয়া গেছে।
আমি ছুটতে ছুটতে হাসপাতালে গেলাম। দেহ ততক্ষণে শক্ত নীল। তারপর থানায়, হাসপাতালে। দেহ কাটাছেঁড়ার পর যখন দেখতে পেলাম, তখন চেনার উপায় নেই আর। পাতা আমার প্রিয়তমা। একটা বেওয়ারিশ লাশের মত সৎকার হল ওর। আমি পাশে পাশে ঘুরলাম, কেউ পাত্তা দিল না।
একটা পার্কে গাছের তলায় অনেকক্ষণ বসে রইলাম। পাতার সন্তান বুকুর সম্পর্কে এই মাঝের সময়ে আমি অনেক কিছু জেনেছি। আর যা জেনেছি সেগুলো যদি কারোর সঙ্গে আলোচনা করতে পারতাম ভালো হত। কিন্তু কাউকে বলার নয়। না না, বলব ভাবলেই ভয়ে আমার হাত পা কেমন ঠাণ্ডা হয়ে আসছে।
‘‘মড়... মড়... মড়... মড়...’’
শুকনো পাতার ওপর দিয়ে হেঁটে আসছে কেউ। এক্ষুণি কি সূর্যটাকে ঢেকে দেবে একটা কালো শকুনের খসখসে পালক বসানো বিরাট পাখনা!
আমি আঁতকে তাকিয়ে দেখলাম, নাহ! শকুন নয়। কোনও পাখি নয়। দূরে একটা বাচ্চা ছুটে ছুটে নিজের মত খেলছে। পাশে ওর মা বসে। আমি একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলাম।
* * *
পাতা চলে যাওয়ার পরে এতটা অসাড় লাগবে মন, আজও ভাবিনি। কত টুকরো টুকরো স্মৃতি চিরকুটে ভেসে বেড়াচ্ছে। মাঝে এতগুলো দিন, এত কিছু যে হয়ে গেছে পাতা জানতেও পারেনি। আচ্ছা, আমিও তো জানার চেষ্টা করিনি পাতা কেমন আছে। আ-আমার উপায়ও ছিল না অবশ্য।
আপাতত আমি বাড়ি ফেরার রাস্তায়। আগের বাড়ি, আগের চাকরি সব আমি ছেড়ে দিয়েছি। দিতে বাধ্য হয়েছি। শহর ছেড়ে, একটা কম জনবসতির প্রান্তভাগে এসে আমরা উঠেছি। আমরা তিনজন। পাতাকে আর ভাবব না। ও একটা দুঃস্বপ্নের মত মিলিয়ে যাক। ওর কাছে এ জন্মে আর ক্ষমা চাওয়া হল না। আমি ঝরঝরে পুরোনো বাড়িটার দরজা ঠেলে ঘরে ঢুকলাম। এরকম বাড়িতে লোকজন থাকে না। তাই এক পয়সাও বাড়িভাড়া লাগে না। আলোও নেই। কী করে থাকবে!
সন্ধ্যের আধো অন্ধকারে এবার আমায় ছাদে যেতে হবে। আর সঙ্গে যেটা নিয়ে এসেছি সেটাও নিতে হবে। কাপড়ের থলিটা আমি শক্ত করে ধরলাম। এটার ভেতরে যা আছে, সেটা আমি রাস্তায় বেরিয়েই আজ পেয়ে গেছি। নাহলে একটু খুঁজতে হত।
আমি ছাদে গিয়ে দাঁড়ালাম। আকাশের দিকে তাকিয়ে রইলাম কেটে যাচ্ছে পলের পর পল। ওই যে আকাশের গায়ে দুটো বিন্দু। বড় হচ্ছে ক্রমশ। তারপর সব আলো ঢেকে দিয়ে আমার সামনে নেমে এল বিরাট আগুনে চোখের দুটো শকুন। আমি তাড়াতাড়ি থলেটা উল্টে দিলাম। একটা মরা আধ-পচা কুকুরের মুণ্ডুহীন দেহ ছাদের উপর পড়ল। হয়ত গাড়িতে চাপা পড়েছিল। আমি তুলে এনেছি।
‘‘আঁ...’’
তীব্র শব্দে ডেকে উঠে শকুন দুটো মাংসের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। ছিঁড়ে ছিঁড়ে খাচ্ছে। তার একটু পরেই শকুনদুটো একদৃষ্টে আমার দিকে তাকায়। ওদের চোখের দৃষ্টি একটু একটু করে বদলে যাচ্ছে। আমার চেনা দুটো চোখ।
‘‘সিসকা... সিসকা....’’
আমি নিজের মনেই বলি। বিরাট বাঁকানো লোমহীন গলার ওপরের মাথাটা আস্তে আস্তে মানুষের আদল নিচ্ছে। আমার চেনা দুটো মুখ। মংলা আর বুকু। হ্যাঁ, সেই সময়টা মনে করলে আমার আজও বিশ্বাস হয় না। পাতা আর বুকু আমার জীবন থেকে তখন প্রায় মুছে গেছে।
হঠাৎ একরাতে আমার ঘুম ভেঙে গেল। মংলা নেই আমার পাশে। আমি পুরো বাড়ি খুঁজে সিঁড়ি দিয়ে উঠলাম ছাদে। ফুটফুটে জ্যোৎস্নায় দেখলাম মংলা দাঁড়িয়ে। আর ওর গলাটা অবিকল একটা শকুনের গলার মত লোমহীন, কুৎসিত। আর ছাদে এসে বসেছে আরেকটা শকুন, তড়পাচ্ছে, ডানা ঝাপটাচ্ছে। তার চোখদুটো লাল। আস্তে আস্তে তার পাখনা মিলিয়ে একটা দুর্বল শরীরে পরিণত হচ্ছে। একটা অসহায় ডাক, ‘‘আঁ...’’ লালা ঝরা ঠোঁট। এ কি! বুকু! পাতা বুকুর মা ছিল না। ও বুকুকে কুড়িয়ে পেয়ে মানুষ করেছিল নিজেই বলেছিল।
বুকু এখানে কেন? পাতা কোথায়? মংলা যে মুহূর্তে দেখতে পেয়েছিল আমায়, চিৎকার করে ওর ওই বাঁকানো সরু গলাটা দিয়ে আমায় পেঁচিয়ে ধরেছিল। আমি জ্ঞান হারালাম। পরদিন জ্ঞান আসার পর দেখি, মংলা আর বুকু। বুকুর সেই রকম লাল চোখ, লালা ঝরা মুখ। মংলা চিৎকার করে বলেছিল, ‘‘ইটা আমার ছিলে। আমার। হারাই গেছিল। ফিরা উকে আসতেই হত।’’
ক্রমশ বুঝলাম, ওরা দুজনেই মানুষ নেই আর। কখনও কি ছিল? ওরা দুজনেই মানুষের মত দেখতে পচা মাংসের লোভে হিংস্র হয়ে ওঠা মানব-শকুন। গোপন মন্ত্রশক্তিতে আদিবাসী রক্তে জেগে ওঠা মাংসপিপাসু এক লুপ্ত নরগোষ্ঠীর গোপন ক্রিয়াকর্ম। মংলা জেনেছে কোনওভাবে। হয়ত উত্তরাধিকার সূত্রে।
‘‘বুকু তোমার ছেলে মানে? ও কীকরে এখানে এল? আর তুমিই বা কীকরে এতদিন বাদে বুঝলে ও তোমার ছেলে?’’ ঝাঁকিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম। উত্তরে ও মিটি মিটি হাসতে হাসতে হা হা করে হেসে উঠেছিল। তারপর বলেছিল, ‘‘পচা মাসের গন্দ্যে।’’
আমি চাইলে তখনই চিৎকার করে পালিয়ে যেতে পারতাম। কিন্তু পারলাম না। ভয়ে আমার হাত পা যেন শিকড় গেড়ে ফেলল মাটিতে। মংলা আর বুকু আমার চোখের সামনে বদলে যেত শকুনে। আর আমি সারা দিন ওদের ছড়িয়ে রাখা পচা মাংসের গন্ধ শুকতাম। আমার যেন নেশা হয়ে গেছে আজ।
কিন্তু পাতাকে ওরা কেন মারল? বুকুকে মংলা নিজের কাছে আনার পরে পাতার কী হয়েছিল? ও কি খোঁজ করে কিছু জানতে পেরেছিল? বুকুর প্রকৃত সত্তা কি জেনে গিয়েছিল? তাই ওকে মরতে হল! পাতার সম্পর্কে বলা মংলার কথাগুলো মনে পড়ল, ‘‘ও ভালো লয়!’’ মংলা নিজেই আমায় সিসোকার কথা বলেছিল। এমনকি ও বলেছিল, পাতাই সিসোকা, পাতাই ডাইনি, এরকমও বলেছিল। মিথ্যে মিথ্যে, সব মিথ্যে।
আচ্ছা, আমিও তো সব জানি! সব না হলেও অনেকটা। আমিও কি তাহলে বিপন্ন? ওদের খোরাক মেটাই, পচা মাংসের ভুক্তবশেষ ঘাঁটতে আমার ভালো লাগে। আমিও খেয়ে দেখি ওদের মত গলে যাওয়া মরা পশুর চোখ। কিন্তু কেন করি! কতদিন আমি স্বাভাবিক জীবন থেকে দূরে। রাস্তায় বেরোই। পাগলের মত লম্বা ধুলো মাখা চুল দাড়ি নিয়ে পথে পথে ঘুরি। আবার রাতে ফিরে আসি। এরকম জীবন তো আমার হবার নয়।
আমায় পালাতে হবে এবার... স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে হবে।
* * *
(১৫ ই মার্চ, ২০১৫)
ট্রেনে আপাতত দক্ষিণভারতের টিকিট কেটেছি। একটিমাত্র সোনার আংটি ছিল আঙুলে। শেষ সম্বল। ওটা বেচে চলছে। ওই দিনের পর আমি পালাতে চেষ্টা করেছি। কতবার চেষ্টা করেছি। শেষ পর্যন্ত পারিনি। ঠিক ওই অশুভ মা আর তার অশুভ ছেলে, যদিও এটাও জানি না, আদৌ মংলা ওর মা, নাকি নিজের কোনও নিষিদ্ধ গুপ্ত ক্ষমতায় ওকে গ্রাস করেছে। আমাকেও গ্রাস করতে চায় হয়ত। করবেও। তার আগেই পালাতে হবে।
ট্রেন ছুটে চলেছে...
নীচের বার্থে ওই মহিলা, ঘোমটায় ঢাকা মুখ। আর ওই ছেলেটা, যার চেহারাটা অন্ধকারে ঢাকা।
‘‘আঁ... আঁ...’’
স্পষ্ট শুনছি হালকা আওয়াজটা। ট্রেনের ঝনঝন শব্দে ঢাকা পড়ছে মাঝে মধ্যে। না, একটুও ভুল নয়। নীচের দিকে তাকিয়ে দেখি... একি! এটাই তো ভয় করছিলাম। মহিলার আর বাচ্চাটার গলা...
ট্রেনটা হঠাৎ ভীষণ দুলে উঠল। আমাকে নামতে হবে। পা'টা ফুট স্টেপের বাইরে...
আহ। গড়িয়ে পড়ে আমি ট্রেনের ফ্লোরে আছড়ে পড়লাম। আর এক পা দূরে দরজাটা, হাওয়ায় বন্ধ হচ্ছে খুলছে। আমি প্রয়োজনে চলন্ত ট্রেন থেকে ঝাঁপ দেব, বা ওই যে কমে আসছে গতি। হা ঈশ্বর, এই স্টেশনে তারমানে দাঁড়াবে গাড়ি। তক্ষুণি নামতে হবে।
আমি টলমল করতে করতে এগিয়ে যাচ্ছি। গতি কমানো ট্রেন থেকে পা'টা প্লাটফর্মে দিলেই আমি মুক্ত হতে পারব। পা’টা বাড়াতেই কিসে যেন আমার হাতটা পেঁচিয়ে ধরল। কানের কাছে বেজে উঠল, ‘‘কী, পালাবে?’’ আমি প্রাণপনে হাতটা টেনে দরজার বাইরে পা বাড়িয়ে শরীর ছুঁড়ে দিলাম।
ট্রেন প্লাটফর্ম তখনও স্পর্শ করেনি। আর একটু পরে করত হয়ত।
এবং বৃত্তের বাইরে, এপ্রিল ২০২৫

No comments:
Post a Comment