শিকড়
হিমবন্ত দত্ত
জানলাটার বাইরের দিকে তাকালে বেশ কিছুটা দূরে থাকা ঝাঁকড়া মাথার গাছটার ডাল-পাতার মধ্যে চলতে থাকা আন্দোলন বেশ ভালোভাবেই বোঝা যায়। প্রকাণ্ড বকুল গাছটার বয়স ঠিক কত, তা বোধহয় কারোরই জানা নেই। শেষ কয়েক মাস কেউ গাছটার আশেপাশে গিয়েছে বলেও মনে হয় না। চারপাশে গজিয়ে ওঠা আগাছার ভীড়ে বকুল গাছটাকে বেড় দিয়ে থাকা বেদিটাও ঢাকা পড়েছে। হ্যাঁ, একটা বেদি আছে বটে গাছটাকে ঘিরে, তবে সেটাও বহুবছরের বার্ধক্যে জর্জরিত হয়ে ধুঁকছে। এখন অবশ্য আগাছার ভিড়ে তাকে দেখাও যায় না ঠিকমতো। তবে উত্তরদিকের এই জানলাটায় দাঁড়িয়ে গাছটার দিকে চোখ রাখলে আগাছার ভিড়ের ফাঁক গলে বেদির কিছুটা অংশ চোখে পড়ে। জানলার পাশে এসে দাঁড়ায় দেবদত্তা। চোখ চলে যায় গাছটার দিকে।
আঁধার রাতের শীতল হাওয়ায় তিরতির করে আলোড়ন উঠছে গাছটার ডাল-পাতায়। হঠাৎ করে দেখলে মনে হয় কোন এক কঙ্কালসার চেহারার অবয়বের ঝাঁকড়া চুলের মধ্যে দিয়ে ছুটে বেড়াচ্ছে অন্ধকারের কোনো এক অদৃশ্য জীব। আকাশে ভেসে বেড়ানো আলো-আঁধারি ঘেরা, মেঘের ফাঁক থেকে সদ্য বেরিয়ে আসে চাঁদের আলো জমাট বাঁধা চাপ চাপ অন্ধকারে মোমগলা ফ্যাকাশে আলোর ছোঁয়া লাগায়। হাওয়ার কেঁপে ওঠা ডাল-পাতাগুলো যেন খসখস করে নিঃশব্দে হেসে ওঠে। দেবদত্তা এখানে এসেছে মাস সাতেক হল। এর আগে যে হোস্টেলটায় থাকতো, সেটার তিনদিকই উঁচু উঁচু বাড়ি দিয়ে ঘেরা ছিল। যার ফলে প্রায় তিনদিকই অন্য বাড়ির দেওয়ালে ঢাকা পড়ে যেত। একটা দিক কিছুটা হলেও খোলামেলা ছিল। কিন্তু সেদিকেও কিছুটা দূরে অন্য তিন দিকের মতোই বাড়িঘর ছিল। তবুও তার মধ্যেই ফাঁক-ফোকর গলে প্রাকৃতিক আলোর কিছুটা অংশ ঘরে এসে পৌঁছাত। আগের হোস্টেলের ঘরটা একেবারেই পছন্দ ছিল না দেবদত্তার। দূরের সেই বকুল গাছটার দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলো দেবদত্তা। চাঁদটা এখন গাছটার ঠিক মাথার উপর রয়েছে। হঠাৎ দেখলে মনে হয় যেন ঝাঁকড়া মাথার গাছটার অন্ধকার ডাল-পাতার ভিতরে চাঁদটা এখনই ডুব দেবে পানকৌড়ির মত। তারপর খুঁজে আনবে লুকিয়ে থাকা কোনো আদিম রহস্যের উৎস, কারণ, ফলাফল।
জানলার দিক থেকে চোখ সরিয়ে খাটের বাঁদিকে একটু পিছনের দিকে রাখা চেয়ারটার দিকে তাকাল দেবদত্তা। রূপসা বসে আছে ওখানে।
‘‘যাবি একদিন?’’ - জিজ্ঞেস করল দেবদত্তা।
‘‘কোথায়?’’ - মুখ তুলে তাকায় রূপসা।
‘‘ঐ যে, ঐ গাছটার কাছে।’’
‘‘গাছটার কাছে? তুই জানিস তো ওদিকে যাওয়া বারণ।’’ - বিরক্ত হয়ে বলে রূপসা।
‘‘বারণ আছে তো আছে! তাতে কী হয়েছে? লুকিয়ে লুকিয়ে যাবো একদিন। আমি আর তুই। চল না, গিয়েই দেখা যাক।’’ - অনুরোধের স্বর ধরা দেয় দেবদত্তার গলায়।
‘‘না, আমি বাপু যাবো না। তোর যাওয়ার দরকার হলে যা।’’
‘‘কেন?’’
‘‘কেন মানে? তুই তো জানিস ওদিকে যাওয়া কেন বারণ। মনে নেই ফাল্গুনী দিদি, অখিলেশ জ্যেঠু কী বলেছিল?’’
এইবার একটু থমকে যায় দেবদত্তা। ওর মনে পড়ে যায় অনেকদিন আগে শোনা ঘটনাগুলোর কথা। কিংবা বলা ভালো গল্পটার কথা। কোনরকমে জাঁকিয়ে বসতে থাকা ভয়টাকে দূরে সরিয়ে দেয় ও। নিজেকে যতটা সম্ভব স্বাভাবিক রেখে দেবদত্তা বলে,
‘‘ও...ওসব মিথ্যে কথা। আর...আর যদি সত্যি হয়ও, সে না হয় তখন দেখা যাবে।’’
রুপসার দিক থেকে আর কোনো উত্তর ভেসে আসে না। কিছুক্ষণ চুপচাপ থাকার পর দেবদত্তা নিজেই নৈঃশব্দ ভেঙে বলে,
‘‘কিরে... যাবি?’’
‘‘উফফফ্!’’ - বিরক্তি ঝরে পড়ে রূপসার গলায়।
‘‘চল না। একটা দিন তো!’’
‘‘এখন ঘুমো। পরে ভাববো।’’
‘‘আচ্ছা।’’
জানলার কাছ থেকে সরে এসে বিছানায় শুয়ে পড়ে দেবদত্তা। আবারও উত্তর দিকের খোলা জানলাটার দিকে চোখ চলে যায় ওর। চাঁদটা আর আগের জায়গায় নেই। বোধহয় একটুখানি ডুব মেরেছে সেই তিরতির করে কাঁপতে থাকা অন্ধকারের বুকে। দেবদত্তা সেদিকে তাকিয়ে শুয়ে থাকতে থাকতে ভাবতে থাকে, কী যেন বেশ ছিল অনিমেষ জ্যেঠুর বলা গল্পটা! অনেক দূরে কোথাও একটা শেয়াল কেঁদে ওঠে। সেই সাথেই আরো কয়েকটা শেয়ালের ডাক ভেসে আসে। সেই শব্দ হাওয়ার তালে ভেসে আসতে আসতে বোধ হয় ঐ বকুল গাছটাতে ধাক্কা খায় একবার। গাছের পাতাগুলো একটু জোরেই দুলে ওঠে। দেবদত্তার মনে পড়ে যায় অনিমেষ জ্যেঠুর বলা সেই গল্পটা।
অনিমেষ বাবুর গল্প...
‘‘গাছটা যতটা না চেহারার বড়, তার চেয়ে বেশি তার মাথাটা ঝাঁকড়া। ডালপালা, পাতা ছড়িয়ে বিশাল একটা জায়গা দখল করে রেখেছে। সূর্যের আলো নিভলেই এই ডাল-পাতাগুলো খিলখিল করে হেসে ওঠে। তারপর চাঁদের আলোয় নিজেদের শরীর ভেজাতে ভেজাতে হালকা হাওয়ায় দুলে ওঠে বারবার। মনে হয় যেন আনন্দে নেচে উঠছে। আকাশে ভেসে থাকার চাঁদটাকেও মাঝে মাঝে গিলে নিতে চায় এই অন্ধকার। কিন্তু শুধুমাত্র গাছের উপরের অংশটা দেখলে বা এই উপরের অংশটার কথা ভাবলেই হবে না। মাটির নিচে, আমাদের দৃষ্টির আড়ালে সে ছড়িয়ে রেখেছে তার শিকড়। কতটা দূর পর্যন্ত, কিংবা ঠিক কতটা গভীরে তার বিস্তার, সেটা কিন্তু আমরা জানতেও পারিনা।’’ - থামলেন অনিমেষ বাবু।
‘‘গাছের তো ডালপালা, পাতা, শিকড় এসব থাকবেই।’’ - বলল দেবদত্তা।
‘‘তোমারও হাত-পা, মাথা, চোখ-কান-নাক সবকিছু আছে। আবার ভূতেদেরও এর সবগুলোই আছে। তাহলে তোমার সাথে ভূতেদের পার্থক্য কি?’’ - গোল্লা গোল্লা চোখে জিজ্ঞেস করলেন অনিমেষ বাবু।
একটু ভেবে দেবদত্তা বলে, ‘‘ভূতেরা মরে গিয়ে ভূত হয়েছে, আর আমরা বেঁচে আছি।’’
‘‘একদম ঠিক। যে গাছটার কথা বলছি, সেই গাছটাও অনেক বছর আগে মরে গেছে। অথচ এখনও ডালপালা, শিকড় সমস্ত কিছু ছড়িয়ে দিব্যি দাঁড়িয়ে রয়েছে।’’
‘‘মানে গাছের ভূত? গাছেদের ভূত হয় নাকি?’’
‘‘হবে না কেন? বইতে পড়নি গাছেদেরও তো প্রাণ আছে। তাহলে, যার প্রাণ আছে সে তো মরে যাবেই। আর যে মরে যাচ্ছে, সে ভূত হতে পারবে না?’’ - জিজ্ঞেস করেন অনিমেষ বাবু।
একটা ভয় জমাট বাঁধে দেবদত্তার মনে। কিছুক্ষণ চিন্তা করে মাথা নেড়ে সম্মতি জানায় ও। তারপর কিছুটা সময় চুপ করে থেকে জিজ্ঞেস করে,
‘‘কি করে ওই গাছটা?
‘‘হঠাৎ করে দেখলে বা বোঝার চেষ্টা করলে কেউ ধরতে পারবে না যে ঠিক কি হয়। কিন্তু যারা গাছের কাছে যায় তাদের সাথে ভয়ংকর একটা ব্যাপার ঘটে।’’
‘‘কী ঘটে?’’
‘‘গাছের শিকড় মাটির নিচে দিয়ে ছড়িয়ে থাকে অনেকটা দূর পর্যন্ত। সেই শিকড়ের নাগালের মধ্যে যদি কেউ চলে যায়, মাটির তলা থেকে কারোর অজান্তেই সেই ছড়িয়ে থাকা শিকড় তার মস্তিষ্ক থেকে সমস্ত চিন্তা, বুদ্ধি, এমনকি শরীর থেকে প্রাণবায়ু পর্যন্ত শুষে নেয়।’’
‘‘তারপর?’’ - জিজ্ঞেস করল দেবদত্তা।
‘‘সে পাগল হয়ে যায়। জড়বুদ্ধি সম্পন্ন হয়ে পড়ে। আর...’’ - বললেন অনিমেষ বাবু।
‘‘আর?’’
‘‘তার আয়ু কমে যায়। খুব অল্প বয়সে মারা যায় সে।’’
‘‘কোথায় আছে এরকম গাছ? কিভাবে চিনতে পারবো?’’
‘‘হতেই পারে আমরা প্রতিদিন যে গাছগুলোকে নিজেদের চোখের সামনে দেখছি, তার মধ্যেই হয়তো কোনো গাছ এইরকম। কিন্তু আমরা সেটা জানি না কিংবা বুঝতেও পারছি না।’’
‘‘সেকি! তাহলে তো...!’’ - চিন্তায় পড়ে যায় দেবদত্তা।
অনিমেষবাবু হাসেন। তারপর বলেন, ‘‘আরে ধুর, সেই গাছের বয়স তো অনেক বেশি হবে। তাই না? আর আরেকটা ব্যাপার বললাম না, সেই গাছের ছড়িয়ে থাকা শিকড়ের নাগালের মধ্যে চলে এলে তার চিন্তা-ভাবনা, বুদ্ধি, প্রাণবায়ু শুষে নেবে। তো, আমাদের আশপাশে যেসব গাছ আছে, তারা কি ওরকম কিছু করে? কারোর সাথে এরকম কিছু হয়েছে?’’
‘‘না তো!’’
‘‘আর, গাছের বর্ণনাটাও মাথায় রাখতে হবে। মানে গাছটা কেমন দেখতে সেটাও তো খেয়াল করতে হবে নাকি!’’
একটু হলেও হাঁফ ছেড়ে বাঁচল দেবদত্তা। তাহলে অতটাও ভয়ের ব্যাপার নেই, যতটা ও ভাবছিল এতক্ষণ ধরে।
‘‘আচ্ছা, গাছের শিকড় কতটা দূর পর্যন্ত আছে সেটা তো মাটির উপর থেকে দেখে আমরা বুঝতে পারবো না। তাহলে জানবো কি করে কতটা দূর পর্যন্ত গেলে সেই গাছের নাগালের মধ্যে পৌঁছে যাব?’’
অনিমেষ বাবু ভ্রূ নাচিয়ে বললেন, ‘‘বাহ এইটা খুব ভালো একটা প্রশ্ন করেছ। তবে এটার উত্তর সত্যি সত্যিই আমার কাছে নেই। মাটির উপর থেকে বোঝা সম্ভব নয় ঠিক কতটা দূর পর্যন্ত গাছের শিকড় ছড়িয়ে আছে।’’
‘‘তাহলে?’’
‘‘তাহলে আর কী, গাছের বাইরের চেহারার যে বর্ণনাটা দিলাম, সেটাই একমাত্র সম্বল। চোখের সামনে ষ্পষ্টভাবে সেটুকুই দেখতে পাওয়া যায়। এইরকম গাছ দেখতে পেলে তার থেকে যতটা সম্ভব দূরে থাকাই ভালো।’’ - বললেন অনিমেষ বাবু।
কপালে চিন্তার ভাঁজ এবং চোখেমুখে ভয়ের রেশটুকু মিলিয়ে যেতে গিয়েও স্থায়ী হয়ে রইল দেবদত্তার।
* * *
‘‘ঘুমাস নি এখনও?’’ - পাশ থেকে ভেসে আসে প্রশ্নটা। চিন্তার জগত ছিন্ন করে বেরিয়ে আসে দেবদত্তা।
‘‘না, এইবার ঘুমাবো।’’
‘‘কী ভাবছিলিস এতক্ষণ?’’ - জিজ্ঞেস করে রূপসা।
‘‘তেমন কিছু না। ওই অনিমেষ জ্যেঠুর বলা কথাগুলো মনে পড়ে গেল হঠাৎ।’’
‘‘জানলাটা বন্ধ করিস নি না?’’
‘‘নাহ্।’’
রুপসা উঠে গিয়ে জানলার সামনে দাঁড়ায়। বেশ কিছুটা সময় তাকিয়ে থাকে বাইরের দিকে। কী যেন একটা হয়ে চলেছে গাছটার কাছে। রূপসার মনে হয় একটা জোরালো হাওয়া যেন ঘুরপাক খেয়ে চলেছে গাছটার চারদিকে। বকুল গাছটার ঝাঁকড়া মাথার আন্দোলন বেড়ে গিয়েছে সেই হাওয়ার তালে। সেদিকে তাকিয়ে থাকে রুপসা আর দেবদত্তা। একটা ঠান্ডা হাওয়া এসে ঝাঁপিয়ে পড়ে জানলার উপর। সেই হাওয়া ঢুকে আছে ঘরের ভিতরে, তারপর থেমে যায় হঠাৎই।
‘‘তোর ফাল্গুনী দির বলা গল্পটার কথা মনে আছে?’’ - জিজ্ঞেস করে রূপসা।
একটু ভেবে দেবদত্তা জিজ্ঞেস করে, ‘‘কোন গল্পটা বলতো?’’
আসলে দেবদত্তার বেশ ভালোভাবেই মনে আছে সেই গল্পটা। তবুও আরো একবার শুনতে ইচ্ছা করলো ওর।
রূপসা তাকিয়ে রইল জানালার বাইরে, সেই গাছটার দিকে। কুয়াশার চাদর ঘিরে ধরছে চারপাশটা। চাঁদের আলো আরো বেশি ঘোলাটে হয়ে দখল নিচ্ছে পরিচিত অথচ খুব অচেনা প্রকৃতির। গাছটাও কেমন যেন ঝাপসা হয়ে গিয়েছে এই মুহূর্তে। ঝাঁকড়া মাথায় কুয়াশার চাদর মুড়ি দিয়ে এমনভাবে আছে, হঠাৎ দেখলে মনে হয় ঠিক যেন কোনো এক অশরীরী উবু হয়ে বসে আছে। সেদিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে রূপসা বলতে শুরু করল ফাল্গুনী দির বলা গল্পটা।
ফাল্গুনীর গল্প...
‘‘ঐ গাছটা দেখতে পাচ্ছিস?’’
‘‘হ্যাঁ।’’ - জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দূরে একটা গাছ দেখতে পেল দেবদত্তা।
‘‘গাছটা সবসময় দূর থেকে দেখবি। কাছে যাবিনা কখনও।’’ - বলল ফাল্গুনী।
‘‘কেন?’’ - জিজ্ঞেস করে দেবদত্তা।
‘‘ঐ গাছে মোতি বুড়ি থাকে।’’
‘‘গাছে থাকে?’’
‘‘হ্যাঁ। আগে গাছের তলায় থাকতো। এখন গাছে থাকে।’’
‘‘কেন?’’
‘‘সে এক বিরাট গল্প, তোদের ছোট করে বলছি।’’ - দেওয়ালে হেলান দিয়ে বসে ফাল্গুনী। দেবদত্তা আরো কিছুটা কাছে সরে আসে ওর।
‘‘ঐ যে গাছটা দেখছিস, ঐ গাছের নিচে একটা বুড়ি থাকতো অনেকদিন আগে। সাদা শনের নুড়ির মত চুল, কোঁচকানো চামড়া, বলিরেখা ভরা মুখে দুটো ছোট ছোট কোঠরে ঢুকে যাওয়া চোখ। একটা লাঠিতে ভর দিয়ে বুড়ি বসে থাকত গাছের নিচে। ওখানেই থাকতো, ওখানেই খেতো। আর ঐ গাছটার সাথেই সব সুখ-দুঃখের গল্প করতো। রাতের অন্ধকারে মরা আলোয় দূর থেকে হঠাৎ করে বুড়িকে হাত নাড়িয়ে, মাথা দুলিয়ে, কথা বলতে দেখলে মনে হতো যেন কোনো এক শয়তানের পূজারী অদৃশ্য কোনো অশরীরীর আবাহনে ব্যস্ত। তাতে অন্য এক গা শিরশিরে অনুভূতি যোগ করত, যখন কুয়াশাঘেরা শীতের রাতে বুড়ি গাছের নিচে আগুন জ্বেলে বসে এইভাবে মাথা দুলিয়ে, হাত নাড়িয়ে গাছের সাথে কথা বলতো। তার উপর সেটা যদি অমাবস্যার রাত হতো, তাহলে তো আর কথাই ছিল না। কিছুক্ষণ সেই দৃশ্যের দিকে তাকিয়ে থাকলে তা পিলে চমকে দিয়ে হাড়ে কাঁপন ধরিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল। বুড়ির সাথে যারা খারাপ ব্যবহার করতো, তাদের বুড়ি বলতো যে ঐ গাছ নাকি শাস্তি দেবে তাদের। সবাই এই কথা শুনে হাসত। আরো বেশি করে বুড়ির পিছনে লাগতো। একবার তো কয়েকটা দুষ্টু, মাঝবয়সী ছেলেমেয়ে বুড়ির পিছনে লাগার জন্য গাছের ডাল-পাতা ছিঁড়ে, ইট-পাটকেল ছুঁড়ে সে এক যা-তা অবস্থা! চিৎকার, চেঁচামেচি, বুড়ির খিস্তি-খেউড় সব মিলিয়ে বিতিকিচ্ছিরি অবস্থা হয়েছিল।’’
‘‘তারপর?’’
‘‘তারপর আশপাশের বয়স্ক, মাতব্বরেরা বারণ করে দিয়েছিল কেউ যেন বুড়িকে আর একদম বিরক্ত না করে। তবে লোকজন কী আর সেই বারণ শোনে! বুড়িকে উত্যক্ত করা, পিছনে লাগা এসব চলতেই থাকল। এর মধ্যেই একদিন একটা বাজে ঘটনা ঘটে গেল।’’ - থামল ফাল্গুনী।
‘‘কী ঘটনা?’’
‘‘বুড়ি ভিক্ষা-টিক্ষা করে যেটুকু টাকা-পয়সা পেতো, সব একটা পুঁটলিতে রাখতো। ঐ পুঁটলিটা কোনো সময়ই কাছছাড়া করতো না। একদিন সেই বখাটে ছেলেমেয়েগুলো সন্ধে বেলায় বুড়ির পিছনে লাগতে লাগতে টাকা-পয়সার পুঁটলিটা কেড়ে নিয়ে চলে গেল। বুড়ি সেদিন নাকি খুব কেঁদেছিল। অনেকটা রাত পর্যন্ত গাছটার দিকে হাত নাড়িয়ে এটা-ওটা বলতে বলতে ইনিয়ে-বিনিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদেছিল। তার পরদিন থেকে বুড়িকে আর ওখানে দেখতে পাওয়া যায়নি।’’
‘‘কেন? অন্য কোথাও চলে গিয়েছিল?’’
‘‘না। ওখানেই ছিল।’’
‘‘তাহলে আর দেখা যায় নি বললে যে!’’
দেবদত্তার কিছুটা কাছে সরে এল ফাল্গুনী। তারপর গলার আওয়াজটা যতটা সম্ভব আস্তে করে ফিসফিসিয়ে বলল, ‘‘বুড়ি ঐ গাছে থাকত। একজন দেখেছিল বুড়িকে গাছ বেয়ে উপরে উঠে যেতে।’’
‘‘গাছে?’’ - অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল দেবদত্তা।
‘‘হ্যাঁ। ওখানেই গাছের পাতা, ডালপালার আড়ালে থাকতো বুড়ি। তাকে আর দেখা যেতো না এদিক সেদিক, কোত্থাও। বুড়ি সবার চোখের আড়ালে চলে গিয়েছিল।’’
‘‘তাহলে খেতো কী? আর সারাক্ষণ গাছের উপরেই বা বসে থাকতো কী করে?’’
‘‘তা জানিনা। অনেকেই দেখার চেষ্টা করত উঁকিঝুঁকি মেরে, গাছের উপরের দিকে। কিন্তু কখনো কোথাও দেখা যায়নি বুড়িকে। এমন কি ওর সাদা শাড়ির অংশটুকুও কোনোদিন দেখতে পায়নি কেউ।’’
‘‘তাহলে সবাই নিশ্চিত হলো কীকরে যে বুড়ি ঐ গাছের উপরেই থাকতো।’’
‘‘কারণ তার বেশ কিছুদিন পর থেকে বেশ কয়েকবার বিভিন্ন সময়ে সাত-আটজন বুড়িকে নেমে আসতে দেখেছিল ঐ গাছ থেকে। সাদা শাড়ি পরে অন্ধকারে, গাছ বেয়ে বেয়ে।’’
‘‘বাপ রে!’’
‘‘এখনও তো ভয় পাওয়ার আসল ব্যাপারটাই বলিনি। বুড়ি যখন নেমে আসতো তখন মাথাটা নিচের দিকে থাকতো। অনেকটা গাছের গায়ে হামাগুড়ি দেওয়ার মত করে নেমে আসতো মোতি বুড়ি। ঠিক যেন একটা বড় গিরগিটি সারা গায়ে সাদা কাপড়ের টুকরো জড়িয়ে গাছের গায়ে বেয়ে যাচ্ছে।’’ - থামল ফাল্গুনী।
ভয়ে গলা শুকিয়ে গিয়েছিল দেবদত্তার। কোনোরকমে গলায় জোর এনে জিজ্ঞেস করল, ‘‘তু... তুমি দেখোনি কোনদিন?’’
‘‘আমি? নাহ্ রে।’’ - একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে ফাল্গুনীর গলা থেকে। একটু থেমে বলে, ‘‘আমার এখন মাঝেমধ্যে খুব আফসোস হয়। বুড়িকে যেসব ছেলেমেয়েরা বিরক্ত করতো, কিংবা যারা ওর সেই পয়সার পুঁটলিটা নিয়ে নিয়েছিল, তাদের মধ্যে আমিও ছিলাম। আসলে ওই বয়সে ওটাই বেশ একটা মজার খেলা ছিল আমাদের কাছে। কিন্তু এখন বুঝতে পারি, কারোর খেলা, মজা করা এইসব কোনো কিছুই কখনও অন্যের কষ্টের কারণ হওয়া উচিত নয়, হতে পারে না কখনও।’’ - দুদিকে মাথা দোলায় ফাল্গুনী।
* * *
‘‘শুনছিস?’’
‘‘হুম।’’
‘‘একটা ব্যাপার খেয়াল করলি?’’ - জিজ্ঞেস করে রূপসা।
‘‘কি বলতো?’’
‘‘এই যে ফাল্গুনী দি গল্পটা বলার সময় ঐ বুড়িটার কথা বলেছিল, যে বুড়িটা বলতো ঐ গাছটা ক্ষমা করবে না কাউকে...!’’
‘‘হ্যাঁ।’’ - বলে দেবদত্তা।
‘‘তারপর দেখ, যারা ওই বুড়িটাকে বিরক্ত করতো কিংবা বুড়িটার টাকা পয়সার নিয়ে নিয়েছিল তাদের মধ্যে ফাল্গুনী দিও তো ছিল। তাই না?’’
‘‘হ্যাঁ। ছিল তো।’’
‘‘আবার দেখ ফাল্গুনী দি যখন মরে গেল তখন কিন্তু ওই গাছটাতে গিয়েই গলায় দড়ি দিয়েছিল।’’ - জানলার দিকে তাকিয়ে বলে রূপসা।
‘‘হ্যাঁ, তাই তো! তাহলে কী সত্যি সত্যিই ঐ গাছটাই প্রতিশোধ নিয়েছিল ফাল্গুনী দির উপর?’’ - আনমনে বলে দেবদত্তা।
‘‘এটা তো ভেবে দেখিনি কখনও!’’
‘‘চল না, যাবি একদিন ঐ গাছটার কাছে?’’ - রূপসার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে দেবদত্তা। আগের মতোই অনুরোধের স্বরে।
‘‘কি করে যাবি? জায়গাটার অবস্থা দেখেছিস? চারদিকে পুরো জঙ্গল হয়ে আছে। যাওয়ার রাস্তাই তো নেই। তাছাড়া লুকিয়ে লুকিয়ে যেতে হবে। সেটা তো আরও কঠিন কাজ!’’ - বলে রূপসা।
‘‘সে একটা ব্যবস্থা ঠিক হয়ে যাবে খ’ন। তুই শুধু আমার সাথে যাবি কিনা বল।’’
‘‘যাবো।’’
‘‘তাহলে কাল বিকেলে। বাগানে ঘোরাঘুরির পর লুকিয়ে লুকিয়ে মেইন গেট দিয়ে বেরিয়ে পড়বো এক ফাঁকে। তারপর পাঁচিলের বাইরেই কোথাও একটা লুকিয়ে বসে থাকবো। একটু সন্ধে হলে আস্তে আস্তে পিছন দিকটায় চলে যাব। তারপর ঝোপঝাড় পেরিয়ে সোজা ঐ গাছটার কাছে।’’ - হাসে দেবদত্তা।
‘‘কিন্তু বেরোনোর সময় যদি এই বুড়ো গার্ডটা দেখতে পায়? তখন?’’ - চিন্তায় পড়ে যায় রূপসা।
‘‘বুড়োটা যখন চা, বিস্কুট খাবে, তখন বেরিয়ে যেতে হবে আমাদের। ওই সময় একটু অন্যমনস্ক থাকে লোকটা। আমি দেখেছি।’’
‘‘আর যদি ধরা পড়ে যাই?’’
‘‘তাহলে আর কী, গার্জেন কল হবে। তার বেশি তো আর কিছু হবে না।’’ - হাসে দেবদত্তা।
‘‘তা ঠিক। তাহলে কাল সন্ধেবেলায় আমরা ঐ গাছটার কাছে যাচ্ছি।’’ - গলার আওয়াজ দৃঢ় হয় রূপসার।
‘‘হ্যাঁ। ভাবতেই কেমন একটা থ্রিল হচ্ছে!’’
* * *
পরদিন বিকেলবেলা বাগানে খেলার সময় সম্পূর্ণ সময়টাই তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে বয়স্ক গার্ড নরহরির দিকে খেয়াল রাখল দেবদত্তা। শেষ বিকেলের দিকে নরহরি চা বিস্কুট হাতে নিয়ে একটা বিড়ি ধরিয়ে কিছুক্ষণের জন্য একটু অন্যমনস্ক হল, অন্যান্য দিনের মতোই। দেবদত্তা আর রুপসা নিজেদের প্ল্যান মাফিক ওই সময়টা মেইন গেটের কাছাকাছি থাকা একটা গাছের নিচেই বসেছিল বেশ কিছুক্ষণ ধরে। নরহরি অন্যমনস্ক হতেই চট করে মেইন গেটের লাগোয়া ছোট গেটটা পেরিয়ে বাইরে বেরিয়ে এলো ওরা দুজন।
‘‘এবার? এবার কি করবো?’’ - জিজ্ঞেস করল রূপসা।
‘‘ওই যে, ওদিকে পোস্টের নিচে যে কারেন্টের বড় বাক্সটা আছে, ওটার পিছনে গিয়ে লুকিয়ে থাকি খানিকক্ষণ। আরেকটু সন্ধে হলেই পিছনদিকটায় চলে যাবো।’’
বেশ কিছুক্ষণ সেই নির্দিষ্ট জায়গাটায় লুকিয়ে বসে রইল ওরা। একটু অন্ধকার হতেই পাঁচিলের পাশ নিয়ে খুব সাবধানে হেঁটে হেঁটে পিছন দিকটায় চলে গেল দেবদত্তা আর রূপসা। সবেমাত্র সন্ধ্যা নেমেছে। দিনের আলো পুরোপুরি মিলিয়ে যায়নি এখনও। ঝোপঝাড়, আগাছার জঙ্গলের ওপাশে ঝাঁকড়া মাথার গাছটা দেখতে পেল ওরা দুজন। এদিক ওদিক তাকিয়ে একটা শক্ত দেখে গাছের ডাল হাতে তুলে নিল দেবদত্তা।
‘‘এটা দিয়ে এই আগাছার জঙ্গল পরিষ্কার করতে করতে এগোবো। তুই কিন্তু একদম আমার পিছনেই থাকবি।’’
‘‘হ্যাঁ।’’
আগাছাগুলোর উপর বারবার লাঠির আঘাত করতে করতে অন্ধকারের মধ্যে দিয়ে আস্তে আস্তে এগোতে লাগলো দেবদত্তা। ওর ঠিক পিছনে ওকে অনুসরণ করে এগিয়ে চলল রুপসা। বুনো গাছের ঝাঁঝালো রসের গন্ধে ভরে উঠল চারদিকের পরিবেশ। সেই গাছটাকে সাক্ষী রেখে ছড়িয়ে পড়া হালকা চাঁদের আলো আর তার সাথে সদ্য বিদ্ধস্ত আগাছার বন্য গন্ধ, সবটা মিলে মিশে অদ্ভুত এক পরিবেশ তৈরি করেছে। ওরা দুজন এগিয়ে চলল সেই বকুল গাছটার দিকে।
অনেকটা সময়ের চেষ্টার পর অবশেষে গাছটার একেবারে কাছাকাছি এসে পৌঁছলো ওরা দুজন। সামনে আগাছা ঢাকা ভাঙাচোরা বেদির মত অংশটাও দেখা যাচ্ছে। স্বল্প আলোতে যেটুকু বোঝা যায় তার নোনা ধরা ইটগুলো হাঁ করে তাকিয়ে রয়েছে বহু বছর ধরে। হাত-পায়ের অনেক জায়গা কেটে-ছড়ে গিয়েছে দেবদত্তা আর রূপসার। হাত-পা চুলকাচ্ছে অচেনা-অজানা বুনো আগাছার রস লেগে। হাতটা চুলকাতে চুলকাতেই গাছটার দিকে ঘাড় উঁচু করে তাকিয়ে থাকতে থাকতে দেবদত্তা বলল, ‘‘গাছটার শিকড় ছড়িয়ে আছে মাটির তলায়। আর তার নাগালের মধ্যে আমরা এসেও গিয়েছি। এবার যদি সত্যি আমাদের মাথার ভিতরের সবকিছু, শরীরের প্রাণবায়ু শুষে নেয় গাছটা? তাহলে কী হবে?’’
রূপসার দিক থেকে কোনো উত্তর ভেসে আসে না। গাছের ছড়িয়ে থাকা ডালপালার দিকে ঘাড় উঁচু করে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে দেবদত্তা। অনেকটা সময় তাকিয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎই মনে হয় একটা নির্দিষ্ট জায়গায় অন্ধকার জমাট বাঁধছে। একটা অবয়ব তৈরি হচ্ছে ধীরেধীরে। গাছের ডাল থেকে ঝুলতে ঝুলতে হাওয়ার তালে ঘড়ির পেণ্ডুলামের মত বাঁ দিক থেকে ডানদিকে দুলে চলেছে সেটা।
‘‘ফাল্গুনী দি...!’’
গলা থেকে আওয়াজ বেরোয় না দেবদত্তার। ও তাকিয়ে থাকে সেইদিকে। উপরের ডাল থেকে একটা দড়ি ঝুলছে। সেই দড়িটা গলায় বাঁধা অবস্থায় দুলে চলেছে ফাল্গুনী দি! হ্যাঁ, ঐতো স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে ফাল্গুনী দিকে। চোখের পাতাদুটো পিটপিট করছে, ঠোঁটে হাসি খেলে যাচ্ছে ফাল্গুনী দির। হাত দুটো যেন একটু একটু করে নড়ছে মনে হচ্ছে। দুটো হাত সামনে এগিয়ে এসে উপরের দিকে উঠে আসছে আস্তে আস্তে। খিল খিলে গলায় সে বলল,
‘‘আয়, উঠে যায়, একসাথে দুলবো আমরা।’’
‘‘মোরা ভোরের বেলায় ফুল তুলেছি
দুলেছি দোলায়,
বাজিয়ে বাঁশি গান গেয়েছি
বকুলের তলায়।’’
একটা ফিসফিসিয়ে ওঠা স্বরে গুনগুন করে ভেসে আসে গানটা। ফাল্গুনী দি গাইছে। এক ঝলক দমকা হাওয়া এসে আরো জোরে দুলিয়ে দেয় শরীরটা। দড়িটা ছিঁড়ে যায়। ঝুপ্ করে একটা শব্দ হয় দেবদত্তার কয়েক হাত দূরে থাকা আগাছার ভীড়ে। সেদিকে তাকিয়ে বেশ কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে দেবদত্তা। মাথা কাজ করছে না ওর। হাত-পা নাড়ানোর ক্ষমতাও হারিয়ে ফেলেছে। গলা দিয়েও কোন শব্দ বের হচ্ছে না। নিস্পলক তাকিয়ে থাকে ওদিকে। হঠাৎই একটা শব্দ হয় গাছের উপরের দিক থেকে। সেদিকে ঘুরে তাকায় ও। গাছের পাতাগুলোর মধ্যে একটা আন্দোলন দেখা যায়। শিহরণ খেলে যায় গাছের প্রতিটা শাখা-প্রশাখা, কাণ্ড, পাতায়, ডালে, সমস্ত শরীরে, এবং হয়তো শিকড়েও। দেবদত্তা গাছের দিকে তাকিয়ে থাকে। সাদা রঙের কিছু একটা দেখা যাচ্ছে উপর দিকে। মুহুর্তেই স্পষ্ট হয় জিনিসটা। একটা সাদা রঙের শাড়ি। তবে শাড়িটা জড়ানো আছে একটা শরীরে, আর সেই শরীরটা গাছের ডাল-পাতার ফাঁক দিয়ে গাছের শরীর বেয়ে নেমে আসছে আস্তে আস্তে। সাদা রঙের চুলগুলো হাওয়ায় উড়ে মুখের উপর থেকে সরে যেতেই হালকা তুলে রাখা মুখটা দেখতে পায় দেবদত্তা। অজস্র বলিরেখা ভরা মুখে থাকা ঠোঁট দুটো চওড়া ফাঁকে হাসি খেলা করে যাচ্ছে। ঘাড়টা একটু উঁচু করে ওর দিকে তাকিয়ে চার হাতে পায়ে ভর দিয়ে গাছের গা বেয়ে নেমে আসছে শরীরটা। দৌড়ে পালিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা অনেক আগেই হারিয়ে ফেলেছে দেবদত্তা। এমন কি পাশে দাঁড়িয়ে থাকা রূপসাকে ডাকবে, সেই ক্ষমতাও আর নেই ওর। সেই শরীরটা একটু একটু করে নেমে আসছে গাছ থেকে, গাছ বেয়ে। চোখের সামনে অন্ধকার নেমে আসে দেবদত্তার। আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না, ওখানেই পড়ে যায় ও।
* * *
চিন্তিত মুখে ‘কেয়ার উইথ লাভ - মেন্টাল অ্যাসাইলাম’-এর দোতলার বেঞ্চটায় বসেছিলেন মালতী দেবী আর অসিত বাবু।
‘‘আসুন।’’- একজন অল্পবয়সী মহিলা এসে বললেন ওনাদের। তারপর ওঁদের উদ্দেশ্যে হাতজোড় করে বললেন ‘‘নমস্কার, আমার নাম শেফালী’’
প্রতি নমস্কার জানিয়ে মালতী দেবী জিজ্ঞেস করলেন, ‘‘আচ্ছা, মানে হঠাৎ করে কী হল বলুন তো ব্যাপারটা?’’
‘‘আমাদের মেন্টাল অ্যাসাইলামটা থেকে বেশ কিছুটা দূরে, ঐ পিছনের দিকে একটা বকুল গাছ আছে। ওখানেই অজ্ঞান হয়ে পড়েছিল আপনার মেয়ে। ওদিকটায় কেউ যায় না। তাই আমরাও প্রথমে ওকে খুঁজে না পেয়ে বুঝতে পারিনি। পরে পিছনের দিকে গিয়ে আগাছার জঙ্গলের দিকে আলো ফেলতে বুঝতে পারি কেউ সেখান পড়ে রয়েছে। বিকেলে যখন সামনের বাগানে সবাই ঘোরাঘুরি, খেলাধুলা করে, ঐ সময় কোনোভাবে গার্ডের অন্যমনস্কতার সুযোগ নিয়ে বাইরে বেরিয়ে গিয়েছিল সম্ভবত। তারপর পিছনের ঝোপঝাড় পেরিয়ে ওই গাছটার কাছে চলে যায় কোনোভাবে।’’
‘‘গাছ! আবার? কিন্তু...!’’ - মনেমনে বলেন মালতী দেবী।
‘‘আমাদের এখানে একজন স্টাফ ছিলেন, ফাল্গুনী দি। উনি মাস চারেক আগে ঐ গাছটাতেই... গলায় দড়ি দিয়ে সুইসাইড করেন। ফাল্গুনী দির সাথে দেবদত্তার খুব ভালো সম্পর্ক ছিল জানেনই তো। উনি এখানকার সবাইকেই খুব ভালোবাসতেন। গল্প শোনাতেন, খাওয়া-দাওয়া করিয়ে দিতেন। তো, হতে পারে ফাল্গুনী দির জন্যই হয়ত দেবদত্তা ওই গাছটার কাছে যাওয়ার চেষ্টা করেছিল। সেটা পরে ওর থেকে জানতে হবে ধীরেসুস্থে। আপাতত ভয়ের আর কিছু নেই। জ্বরটাও আর একেবারেই নেই।’’
তারপর একটু থেমে শেফালী জিজ্ঞেস করল, ‘‘আচ্ছা, আপনি প্রথমে গাছের কথা শুনেই অবাক হলেন কেন?’’
‘‘আসলে আমার এক ভাসুর ছিলেন। তার কাছে একটা সময় অনেক গল্প শুনতো দেবদত্তা। ওখান থেকেই কোনো একটা গাছের গল্প শুনেছিল ও তারপর থেকে বড় গাছ দেখলে দূরে সরে যেতো। অদ্ভূত একটা অবসেশন তৈরি হয়েছিল ওর মধ্যে বড় গাছের প্রতি। তাই গাছের কাছে চলে গিয়েছিল শুনে সেই ব্যাপারটা মনে পড়ে গেল।’’
‘‘মানে এগুলো ওর এই সিজোফ্রেনিয়ার সমস্যা শুরু হওয়ার আগের কথা?’’ - জিজ্ঞেস করল শেফালী।
‘‘হ্যাঁ। তার আগেই।’’ - বললেন মালতী দেবী।
‘‘আচ্ছা!’’
‘‘আচ্ছা, একটা কথা জিজ্ঞেস করবো?’’ - বললেন অসিত বাবু।
‘‘হ্যাঁ বলুন।’’
‘‘দেবদত্তা যে ঐ রূপসা নামের একজন কাল্পনিক বন্ধুর কথা বলে, সেটা কী আগের চেয়ে একটু হলেও... মানে, ও কি সুস্থ হয়েছে আগের থেকে?’’ - জিজ্ঞেস করলেন অসিত বাবু।
‘‘চলুন, আপনারাই গিয়ে কথা বলে দেখবেন।’’
দেবদত্তার ঘরে ঢুকেই ওর মা-বাবা দেখল বিছানার উপরে শুয়ে আছে ও। মা-বাবার দিকে তাকিয়ে হেসে বলল, -‘‘এই হোস্টেলটা ভালো। সবাই খুব ভালো। আমি না বলে বাইরে বেরিয়ছিলাম বলে গার্জেন কল করেছে।’’
ওর মাথার কাছে এসে দাঁড়িয়ে ওর কপালে হাত ছোঁয়ালেন মালতি দেবী। মিটমিট করে হাসল মেয়েটা। একটা চেয়ার রাখা খাটের পাশে। চেয়ারটা টেনে নিয়ে সেটাতে বসতে যাচ্ছিলেন অসিত বাবু।
‘‘ওটাতে বোসো না। বিছানায় বসো।’’ - একরকম চিৎকার করে বলে উঠল দেবদত্তা।
‘‘কেন? ফাঁকাই তো আছে চেয়ারটা!’’ - বলল শেফালী।
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে ইতস্তত করে দেবদত্তা বলে, ‘‘না, ওটাতে বসা যাবে না। এখন থেকে ঐ চেয়ারটায় মোতি বুড়ি বসবে।’’
‘‘মোতি বুড়ি? সে আবার কে?’’ - জিজ্ঞেস করেন মালতী দেবী।
‘‘কেন, ঐ তো বসে আছে চেয়ারে। নিজেই জিজ্ঞেস করে নাও ও কে! একেও দেখতে পাচ্ছো না?’’
অবাক হয়ে ফিসফিসিয়ে বলে ওঠে দেবদত্তা।
এবং বৃত্তের বাইরে, এপ্রিল, ২০২৫

No comments:
Post a Comment