ধূসর গোধূলি
সুজিত বসাক
“ওই যে দূরের গ্রামটা দেখতে পাচ্ছেন, ওটাই শিবকালিপুর। আমরা প্রায় এসে পড়েছি। এবার সামনের ওই কাঁচা রাস্তা ধরে যাব। এখন একটু ধূলো হবে, তবু ভাল, গাড়ি যাবে। বর্ষার সময় গাড়ি তো দূরের কথা, পায়ে হেঁটেও চলতে পারবেন না। এত কাঁদা হয়! পাশের গ্রামেই আমার আদি বাড়ি। এই অঞ্চল আমার খুব ভাল করে চেনা।”
দূরের দিকে তাকিয়ে কথাগুলো শেষ করলেন নরহরি চক্রবর্তী। বড় রাস্তার ধারে একটা বড় গাছের ছায়ায় দাঁড়িয়েছে রাহুলদের ‘বোলেরো’ গাড়িটা। বিশেষ কারণে একটু ব্রেক। কাতুদার ছেলে শুভর হিসু পেয়েছে। জায়গাটা শুনশান, আশেপাশে কোনও বসতি নেই। রাস্তার দু’পাশে দিগন্ত জোড়া ধানখেত। শরৎ প্রায় শেষ, হেমন্ত দোরগোড়ায়। পাকা ধানের মরশুম। এইসময় খেতগুলো যেন গর্ভবতী মা।
কাতুদা শুভকে এক সাইডে নিয়ে গিয়ে একটা ঝোঁপের সামনে দাঁড় করিয়ে প্যান্টের চেন খুলে দিল। আট বছর বয়স হলেও শুভ এখনও সবকিছু নিজে নিজে করতে পারে না। একটু বোকাসোকা গোছের। শুধু হিসু পায়। তিন সাড়ে ঘন্টার রাস্তায় চারবার গাড়ি দাঁড় করিয়েছে। এবার অবশ্য নরহরি চক্রবর্তী বাদে সব পুরুষই নেমে পড়েছে। সবারই কমবেশি চেপেছিল। ফাঁকা জায়গা পেয়ে সবাই হালকা হতে ব্যস্ত। কনে দেখতে যাচ্ছে ওরা, নতুন বাড়িতে ঢুকেই হিসু পেয়েছে বলে বাথরুমে ঢুকতে চাইলে ব্যাপারটা ভাল দেখাবে না। মেয়েদের ব্যাপারটা অবশ্য আলাদা, ওরা গাড়ির মধ্যেই বসে আছে। মেয়ে বলতে রাহুলের ছোটকাকিমা কাতুদার বৌ তন্বী বৌদি আর ওর বোন দীপা। ছোটকাকিমা বয়সে ও সন্মানে বড় হলেও জমাটি মহিলা। সব বয়সের লোকের সাথেই অনায়াসে মিশে যেতে পারেন। এই ক্ষমতা সবার থাকে না।
রাহুল আর দিব্য গাড়ি থেকে কিছুটা দূরে চলে এসেছে। দিব্য রাহুলের বাল্যবন্ধু। মেডিক্যাল রিপ্রেজেন্টেটিভের কাজ করে একটা ওষুধ কোম্পানিতে। একটু গোঁয়াড় টাইপের, তবে ভীষণ হেল্পফুল।
দিব্য বলল, “বাপরে বাপ, তোর ওই নরহরির পাল্লায় পড়ে আজ আমাদের গোলকধাম দর্শন হয়ে যাবে মনে হচ্ছে। আর বেশিক্ষণ যদি বুকে ধোঁয়া না যায় তাহলে লাশ হওয়া ছাড়া কোনও গতি থাকবে না। ঝটপট প্যাকেটটা বের কর।”
রাহুল হেসে বলল,“তা যা বলেছিস। তবে জায়গাটা কিন্তু বেশ। চোখ জুড়িয়ে যায়।”
“উরি শালা! এ তো দেখছি গাছে না উঠতেই এক কাঁদি। দাঁড়া খবরটা ছোটকাকিমার কানে তুলতেই হচ্ছে।”
“এই প্লিজ না। ছোটকাকিমা রোস্ট করার মাস্টার। এখন আবার সঙ্গে পুরো টিম, আমাকে জ্বালিয়ে মারবে। বৌদি, দীপা ও দুটোও তো কমে যায় না।” রাহুল অসহায় ভঙ্গিতে বলল।
দিব্য হেসে বলল,“আরে না না, বলব না। তোকে ভয় দেখালাম। জায়গাটা সত্যি তো দারুন। আমারও খুব ভাল লাগছে। কবিতা লেখা আসে না, কিন্তু বেশ একটা কবিতা কবিতা ফিলিংস হচ্ছে।”
দিব্য মাঝে মাঝে এমন করে কিছু কথা বলে, ভাল লাগে রাহুলের।
রাহুল হেসে বলল,“তুই ধরা, আমি একটু টয়লেট করে নিই। আবার কখন সুযোগ পাব কে জানে।”
দিব্য সিগারেট ধরাল, রাহুল এলে ওর হাতে একটা দিল। ওরা এসেছে কনে দেখতে। রাহুলের জন্য। রাহুল ব্যাংকে চাকরি করে। অ্যাসিসট্যান্ট ম্যানেজার। সুনীতা নামের একটি মেয়ের সঙ্গে ওর প্রেম ছিল। মধ্যবিত্ত ঘরের সুন্দরী মেয়ে। রাহুল মনপ্রাণ দিয়ে ভালবাসতো। হঠাৎ একদিন শুনতে পেল, ওর বাবা এক সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার পাত্রের সঙ্গে ওর বিয়ে ঠিক করেছেন। সুনীতাকে জিজ্ঞাসা করলে সে বলেছিল, বাবার ক্যানসার ধরা পড়েছে, তাই সে মৃত্যুপথযাত্রী বাবার কথা ফেলতে পারেনি। রাহুল কিছুই বলতে পারেনি। মৃত্যুপথযাত্রী একজন মানুষের ইচ্ছেকে সন্মান জানানো হয়তো মেয়ে হিসাবে সুনীতার পক্ষে সঠিক কর্তব্য, মানতে ভীষণ কষ্ট হলেও মনকে এভাবেই সান্ত্বনা দিয়েছিল রাহুল। সুনীতা এখন আমেরিকা থাকে। স্বামী সংসার নিয়ে সুখের সংসার।
একবার ভেবেছিল আর বিয়েই করবে না। এভাবেই কাটিয়ে দেবে। একটা জীবন খুব কি বড়? শেষপর্যন্ত অবশ্য মত চেঞ্জ করতে হয়েছে মায়ের জন্য। মায়ের ক্যানসার ধরা পড়েছে। যদিও ফার্স্ট স্টেজ, তবুও তার তাঁর প্রবল আবদার, মরার আগে তোর বৌয়ের মুখ দেখে যেতে চাই। রাহুলের অবাক লেগেছিল এই অদ্ভুত সংযোগ দেখে। সুনীতা বাবার ক্যানসারের জন্য বাবার অনুরোধ রাখতে বাধ্য হয়েছিল। মায়ের অনুরোধ রাখার জন্য এটুকু আত্মত্যাগ রাহুল করতে পারবে না? রাজি হয়ে গিয়েছিল রাহুল।
রাহুলদের যৌথ ফ্যামিলি নয়, তবে বসবাস যৌথ ফ্যামিলির মতোই। কাকু জেঠুদের বাড়ি পাশাপাশি। জেঠু ও বাবা মারা যাওয়ার পর কাকুরাই ওদের অভিভাবক। সম্পত্তি ভাগ বাটোয়ারা হলেও ভাই ভাইয়ের সম্পর্ক কোনও দিন খারাপ হয়নি এ বাড়িতে। মায়ের আবদারের পাশাপাশি কাকুদের কথাও শিরোধার্য করেছে রাহুল। রাহুল রাজি হতেই কাজ শুরু করে দিয়েছেন ঘটক নরহরি চক্রবর্তী।
তিনটে দেখা হয়েছে, কিন্তু পছন্দ হয়নি। নরহরির ওপর ভরসা কমছে। কিন্তু নরহরি ছাড়ার পাত্র নন। এবার তাঁর দৃপ্ত ঘোষণা, “এবার একটু গ্রামের দিকে নিয়ে যাব আপনাদের। আমার এলাকার মেয়ে। ঘরোয়া মেয়ে, দেখতে শুনতেও বেশ। আমি নিশ্চিত আপনাদের পছন্দ হবেই।”
রাহুল ছবি দেখেছে মেয়েটার। গায়ের রং শ্যামলা হলেও মুখশ্রী খুব সুন্দর।
ছোটকাকুও নরহরিকে আল্টিমেটাম দিয়ে রেখেছেন,“এই তোমার শেষ সুযোগ। এখানে পছন্দ হলে তো ভাল কথা, নইলে আর আমরা তোমার ভরসায় থাকব না। পেপারে বিজ্ঞাপন দেব। বিভিন্ন সাইটে সার্চ করব। আজকাল তো ওইসব পদ্ধতিই বেশি চলে।”
দুই
আজ রবিবার। ছুটির দিন। সেই হিসাবেই ডেট ঠিক করা হয়েছে। সবারই অফিস-কাচারী কাজকর্ম আছে। রাহুলের বাবারা চার ভাই। জেঠু ও বাবা মারা যাওয়ার পর এখন দুই কাকু আছেন। কাতুদা জেঠুর ছেলে। ওদের বাড়ির সবচেয়ে বড় ছেলে। ধীর স্থির দায়িত্বশীল মানুষ। আড়ালে অনেকে স্ত্রৈণ বলে, কিন্তু গায়ে মাখে না। ওর মতো ও চলে। ছোটকাকুই এইমুহুর্তে বাড়ির হর্তাকর্তা, অভিভাবক। বড়কাকু ভীষণ ইন্ট্রোভার্ট আর অলস প্রকৃতির মানুষ। কাকিমা হঠাৎ করে মারা যাওয়ার পর আরও বেশি করে ঘরকুনো হয়ে গেছেন। অফিস আর ঘর, এই তাঁর জগতের পরিধি। একমাত্র মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে। শ্বশুরবাড়ি অনেক দূর, তাই হুটহাট করে আসতে পারে না। রাহুলের বিয়ের মূল দায়িত্ব ছোটকাকু আর কাতুদা কাঁধে তুলে নিয়েছে।
সবাই গাড়িতে উঠলে ছোটকাকু বললেন, “যাই বলিস, আমাদের গ্রাম বাংলার সৌন্দর্যের তুলনা হয় না। কী অপূর্ব! এসব জায়গায় এলে মন শান্ত হয়ে যায়। থেকে যেতে ইচ্ছে করে।”
ছোটকাকিমা বললেন,“এত যখন ইচ্ছা তখন থেকে গেলেই পার। চাষবাস করে তরতাজা সবজি পাঠাবে, আমরা খেয়ে বাঁচব।”
হাসির রোল উঠল। দীপা বলল,“দাদার বিয়েটা এখানে হলে আমিও তোমার সঙ্গে কিছুদিন এখানে থেকে যাব কাকু। কী দুর্দান্ত ভিউ!”
তন্বী বৌদি হেসে বলল,“অত সহজ নয় চাঁদু। শহরের লোক হঠাৎ গ্রামে এলে আপ্লুত হয়ে যায়। কিন্তু দু’দিন গেলেই হাঁপিয়ে উঠবে।”
ছোটকাকিমা বললেন, “তুমি বাধা দিচ্ছ কেন বৌমা? ওদের যখন এত ইছে, আমরা আপত্তি করব কেন?”
কাঁচা রাস্তা ধরে ধুলো উড়িয়ে গাড়ি ছুটে চলেছে। ভিতরে চলছে হাসি-ঠাট্টা-মস্করা। নরহরি একটু বাদে প্রাথমিক ইনফরমেশন দেওয়ার ভঙ্গিতে বললেন, “এঁরা একসময় এখানকার জমিদার ছিলেন। জমিদারি নেই, তবে বাড়িটা আছে। বিষয় সম্পত্তিও নেহাত কম নেই। মন্দির, পুকুর, মণ্ডপ–সবই আছে। তবে পরিচর্যার অভাবে সেই জৌলুস আর নেই। একদিকের অংশে যথাসম্ভব সাজিয়ে গুছিয়ে ওঁরা থাকে। মেজবাবু শক্ত হাতে ধরে রেখেছেন সবকিছু।”
দিব্য জিজ্ঞেস করল, “মেজবাবু আবার কে?”
“মেয়ের জেঠু। খুব প্রভাবশালী মানুষ। অবশ্য ওঁদের প্রভাব এখন থেকে নয়। ওঁর বাবা তো আরও জাঁদরেল লোক ছিলেন। এই অঞ্চলের বাচ্চা বুড়ো সবাই এক ডাকে চিনতো। যেমন জমিদারি মেজাজ ছিল তেমনি ছিলেন পরোপকারী। মানুষের বিপদ আপদে ঝাঁপিয়ে পড়তেন। তাঁকে দেখার সুযোগ হয়েছিল আমার।”
গাড়ি দাঁড়াল গাছ গাছালিতে ঘেরা একখণ্ড মাঠে। সামনে বিরাট একটা বাড়ি। পুরনো, কিছুটা জরাজীর্ণ, তবুও সমীহ জাগে। গাড়ি দাঁড়াতেই কয়েকজন ব্যস্ত সমস্ত হয়ে প্রায় ছুটে এল। একটা তোড়ন পেরিয়ে ভিতরে ঢুকতে হয়। যদিও তোড়নের অবস্থা খুবই সঙ্গীন। লোহা ক্ষয়ে ক্ষয়ে আর কিছু নেই। দু’পাশের দুই পিলারে বসে থাকা সিংহ দু’জন ল্যাজ গুটিয়ে মৃত্যু প্রহর গুনছে। তোড়নকে জড়িয়ে থাকা একটি মাধবীলতা তার ফুলের সম্ভার নিয়ে কিছুটা হলেও লজ্জা নিবারণ করতে সক্ষম হয়েছে।
পায়জামা পাঞ্জাবি পরিহিত এক অতিব সুদর্শন যুবক এগিয়ে এসে নমস্কার জানিয়ে বলল, “আমি সাম্যময়, মেয়ের দাদা। জেঠতুতো দাদা। আপনাদের আসতে কষ্ট হওয়াটাই স্বাভাবিক, তাই আগে ভিতরে গিয়ে একটু রেস্ট নিন। তারপর অন্য সব কথাবার্তা হবে।”
বসার ঘরটি ভারি চমৎকার। বাইরে থেকে অবশ্য বোঝা মুশকিল। বিশাল এবং পরিপাটি করে সাজানো। সম্ভবত আগত অতিথিদের জন্যই এত আয়োজন। ঘরের প্রতিটি জিনিসে সাবেকিআনার ছোঁয়া। আসবাবপত্র থেকে শুরু করে ঘরের পর্দা, সবকিছুই সাবেক ঐতিহ্য বহন করছে। রাহুল আগে কোনওদিন এরকম কোনও বাড়িতে আসেনি। কাজেই সবকিছুই বেশ উপভোগ্য মনে হচ্ছিল। বাকিদেরও একই অনুভূতি হচ্ছে, বুঝে নিতে খুব একটা অসুবিধা হল না। চা নয়, প্রথমেই এল বিশাল কাঁসার গ্লাসে করে সরবত। এমন সরবত রাহুলরা আগে কখনও খায়নি। স্বাদে গন্ধে অতুলনীয়। প্রিপারেশন ইউনিক, বাজারে কেনা সরবত যে নয় তা হলফ করে বলা যায়।
কিছুক্ষণ পরেই ঘরে ঢুকলেন মেয়ের বাবা মা। অভিজাত চেহারা, দেখলেই সমীহ জাগে। কিছুক্ষণ গল্পগুজব চলল। গল্পের ছলে দু-পক্ষই যতটা সম্ভব প্রয়োজনীয় তথ্য কালেক্ট করার চেষ্টা করল। এবার এল জলখাবার। সেটা দেখে ওদের ভিড়মি খাওয়ার জোগাড়। লুচি, পায়েস, সবজি, চার পাঁচ রকমের মিষ্টিসহ আরও অনেক কিছু। সবই পরিবেশন করা হয়েছে কাঁসা পিতলের ভারি বাসনে, যা শহরের মানুষ চিন্তাই করতে পারে না।
মেয়ের বাবা বিনীতভাবে বললেন,“সংকোচ করবেন না কেউ। সবই বাড়ির তৈরি জিনিস। আপনারা এতটা পথ জার্নি করে এসেছেন। এটুকু খেয়ে নিন, তারপর মেয়েকে দেখবেন।”
রাহুলদের সবার চোখেই বিস্ময়। এই যুগেও মেয়ে দেখার অনুষ্ঠানে এত আয়োজন!
দিব্য ফিসফিস করে রাহুলের কানে বলল, “জমিদারি না থাকলেও এদের স্টাইল আছে বস। খানদানি ফ্যামিলি। আই লাইক ইট।”
রাহুল মৃদু হাসল। ছোটকাকিমা, তন্বী বৌদি, দীপা তিনজনেরই মুখ ‘হাঁ’ হয়ে আছে। ছোটকাকু, কাতুদা ওদের অবস্থাও তথৈবচ।
ছোটকাকু বললেন,“এত খাওয়া সম্ভব নয়। মানে অভ্যেস নেই আর কি। কাউকে বলুন কিছুটা করে কমিয়ে দিতে।”
ছোটকাকিমা বললেন,“আমরা যতটা পারি খাচ্ছি। অযথা নষ্ট করাটা ভাল দেখায় না।”
মেয়ের বাবা হাঁক দিলেন, “কই রে হারু, একটা পাত্র নিয়ে আয় বাবা।”
মেয়ের মা হেসে বললেন, “জোর করব না। খাওয়ার ব্যাপারে জোরজারি ঠিক নয়। তবে এগুলো সব নিজেরাই বানিয়েছি, খেলে ভাল লাগত। আপনারা ধীরে সুস্থে খেয়ে নিন। আমরা দেখি ওদিকে ওরা সব কি করছে। কই রে সমু, তুই এদিকটায় দেখিস বাবা। ওঁদের যেন কোনও অসুবিধা না হয়।”
খাওয়া শেষ হতেই যিনি ঘরে ঢুকলেন তাঁকে দেখেই অটোমেটিক্যালি দাঁড়িয়ে পড়ল রাহুল। ধবধবে সাদা ধুতি পাঞ্জাবি পরিহিত, গায়ের রং ধবধবে ফর্সা, চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা, চেহারার জৌলুস আরও বাড়িয়ে দিয়েছে একমাথা ধবধবে সাদা চুল। যেন বৃদ্ধ উত্তমকুমার! রাহুল আরও অবাক হল, এই বাড়িতে আজ যেন একটা উৎসবের পরিবেশ। সবাই পরিস্কার পরিচ্ছন্ন পোশাক পরিধান করেছে। এমনকি চাকর বাকরেরাও। হাঁটা চলায় উৎসবসুলভ আনন্দ। বাড়ির মেয়েকে পাত্রপক্ষ দেখতে এসেছে, তার জন্য এত! নাকি এসব করাই এদের ঐতিহ্য?
ওঁর গলার আওয়াজও গমগমে। মন্দ্রস্বরে বললেন, “তৈরি হতে একটু দেরি করে ফেললাম, সেজন্য দুঃখিত। আমি বীরেন্দ্র নারায়ণ মুখোপাধ্যায়। মেয়ের জ্যাঠামশাই। আপনারা ঠিকঠাক মতো জলযোগ করেছেন তো?”
ছোটকাকু বললেন, “হ্যাঁ, হ্যাঁ। যা আয়োজন করেছেন আপনারা। এত কি খাওয়া যায়?”
হাসলেন বীরেন্দ্র নারায়ণ, “তা বললে চলবে কেন? কতদূর থেকে এসেছেন আপনারা। পাত্রী দেখুন, আমাদের ভাঙাচোরা বাড়িটা একটু ঘুরে টুরে দেখুন। তারপর দুপুরে একটু ডাল ভাত মুখে দেবেন। পুকুরে জাল পড়েছিল সকালে। বড় বড় তিনটে কাতলা উঠেছে। খুব স্বাদ, খেলে ভুলতে পারবেন না। কই রে বিশাখা, এবার শ্যামাকে নিয়ায় তোরা।”
খাওয়া দাওয়ার ব্যাপারে কাউকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে হাঁক দিলেন বীরেন্দ্র নারায়ণ।
পাত্রীকে নিয়ে ঘরে ঢুকলেন অল্পবয়স্ক তিনজন মহিলা। পিছনে মেয়ের মা। বাবাও এসে একটা চেয়ারে বসলেন। এইমুহুর্তে ঘরভর্তি লোক। জানালা দিয়েও উঁকি মারছে দু’চারজন। রাহুলের হাসি পেল। অন্যরকম অভিজ্ঞতা! মেয়েকে প্রয়োজনের চেয়ে অনেকটাই বেশি সাজগোজ করানো হয়েছে। কাঁচা হাতের কাজ। অজ গ্রামেও আজকাল আর কেউ এমন করে মেয়ে দেখায় না। এ বাড়ির ব্যাপার স্যাপারই আলাদা! ফিউডাল স্ট্রাকচার এইটুকুন জায়গায় আজও যেন অটুট।
ছোটকাকিমা জিজ্ঞাসা করলেন, “তোমার নাম কী মা?”
“পরমেশ্বরী মুখোপাধ্যায়। ডাক নাম শ্যামা।” ক্ষীণকন্ঠে জবাব দিল পাত্রী।
“কতদূর পড়াশোনা করেছো?”
“বি এ পাশ করেছি।”
“রান্নাবান্না পারো?”
“হ্যাঁ পারি।”
তন্বী বৌদি এবার জিজ্ঞাসা করল, “কী করতে ভালবাসো? মানে তোমার হবি টবি কিছু আছে? তুমি বললাম বলে কিছু মনে করো না।”
“না না, মনে করব কেন? আপনি আমার চেয়ে বয়সে বড়। পুজো আর্চা, ঘর গেরস্থালির কাজ করতে আমার ভাল লাগে। হবি বলতে বই পড়া ছাড়া কোনও হবি নেই।”
দীপা হঠাৎ বলে উঠল, “আপনার প্রিয় নায়ক নায়িকা কে?”
শ্যামা অদ্ভুত এক চোখে তাকাল দীপার দিকে। এই পরিবেশে প্রশ্নটা বেমানান হয়েছে বুঝে সিঁটিয়ে গেল দীপা।
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা দিদি বৌদি গোছের মহিলা বললেন, “ও আসলে সিনেমা টিভি এসব দেখে না বললেই চলে। নাম টামও বিশেষ জানে না।”
ছোটকাকিমা বললেন, “সেটা একদিক থেকে ভাল। ওসব নেশা ছাড়া আর কিছুই নয়। ওর চেয়ে বই পড়া অনেক ভাল অভ্যাস। আমরা একটু ঘরোয়া সংসারী মেয়েই চাই। আজকালকার ছেলেমেয়েরা অবশ্য ওর মতো নয়। ওদের চাহিদা অন্যরকম। রাহুল তুই কিছু জিজ্ঞেস করবি?”
রাহুল সসংকোচে বলল, “না না, যা জিজ্ঞাসা করার তোমরাই করো।”
“তবে আমাদেরও আর কিছু জানার নেই। এবার তুমি আসতে পার মা।”
শ্যামাকে নিয়ে গেল ওরা। বীরেন্দ্র নারায়ণ বললেন, “আমি পরিস্কার কথার মানুষ। দেখুন, আমার ভাইঝিটি অন্যরকম। আধুনিক মেয়েদের মতো ব্যাপার স্যাপার হয়তো ওর মধ্যে নেই, কিন্তু ওর মতো মেয়ে কোথাও খুঁজে পাবেন না। যদি স্মার্ট ও আল্ট্রা মডার্ণ মেয়ে চান তাহলে অন্য কথা, কিন্তু যদি ঘরোয়া লক্ষ্মীমন্ত মেয়ে চান তাহলে ওকে চোখ বুজে নিয়ে যেতে পারেন। ওর মধ্যে এক শাশ্বত মাতৃরূপ আছে। বিয়েটা সারা জীবনের ব্যাপার। মিথ্যে বলে একটা সম্পর্ক তৈরি করে দেওয়া আমি কখনোই সমীচীন মনে করি না।”
মেয়ে দেখার পর্ব শেষ হলে রাহুল নরহরি চক্রবর্তীকে আলাদা ডেকে বলল,“একটু সাইডে চলুন। আপনার কাছে আমার দুটি প্রশ্নের উত্তর চাই। ”
নরহরি বললেন,“বেশ তো। চলো আমরা ওপাশের নিরিবিলিতে গিয়ে বসি।”
একটা বড় গাছের পিছনে নিয়ে গেলেন নরহরি। বহু পুরনো গাছ, ঘাত প্রতিঘাতে জর্জরিত শরীর। কত ঘটনার নীরব সাক্ষী!
রাহুল সিরিয়াস মুখে বলল, “আমার প্রথম প্রশ্ন, এই বাড়ির লোকজন প্রায় সবাই ধবধবে ফর্সা। অথচ মেয়েটা তুলনামূলকভাবে অনেক কালো। আমার কাছে ব্যাপারটা একটু অস্বাভাবিক লাগছে। শ্যামা কি সত্যি সত্যি এঁদের সন্তান?”
এরকম একটা প্রশ্ন আসতে পারে কল্পনাতেও বোধহয় ভাবতে পারেননি নরহরি। অপ্রস্তুতভাবে বললেন,“এসব আবোল তাবোল কী বলছো বাবা? এঁরা উচ্চবংশ, সন্মানীয় ব্যক্তি। যতটুকু জানি, অনেক মানত টানত করার পর জন্ম হয়েছিল শ্যামার। বাপ মা ফর্সা হলেই কি সবসময় ফর্সা সন্তান জন্মায়?”
রাহুল এ বিষয়ে আর কথা না বাড়িয়ে বলল,“আমার দ্বিতীয় প্রশ্ন, এ বাড়িতে অতিথিদের কি এভাবেই আপ্যায়ন করা হয়?”
নরহরি হঠাৎ গম্ভীর হলেন,“না। তোমাকে মিথ্যে বলব না। কারণটা শুনে হাসাহাসি করবে না বা কাউকে কিছু বলবে না। শুধু তোমরা আসবে বলেই এই আয়োজন। কারণ ওরা নিশ্চিত যে, শ্যামার সঙ্গে তোমার বিয়ে হবেই।”
রাহুল ভীষণ অবাক হয়ে বলল, “ইন্টারেস্টিং! তাই নাকি? কিন্তু এখনও পর্যন্ত আমরা তো কোনও মতামত জানাইনি। যা দেখছি তাতে এদের সঙ্গে আমাদের মেলা মুশকিল। ছোটকাকু রাজি হবেন বলেও আমার মনে হয় না। সর্বোপরি আমার মতামত। ছোটকাকু নিজের পছন্দ হলেও আমার মতামত না নিয়ে এক পা-ও এগোবেন না, আপনি সেটা ভাল করেই জানেন। আচ্ছা, ওদের এতটা নিশ্চিত হওয়ার কারণটা কী?”
“শ্যামার কথা। শ্যামা যা বলে তাই হয়। তোমার ছবি দেখার পরেই শ্যামা বলেছিল, এই ছেলের সঙ্গেই ওর বিয়ে হবে। তারপর থেকেই ওরা উঠে পড়ে লেগেছে। ওদের তাগিদেই আমি তোমাদের নিয়ে এসেছি।”
“শ্যামা কি অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী?”
“ওরা তেমনটাই বিশ্বাস করে।”
“আপনিও করেন। আমাদেরকে এখানে টেনে আনার চেষ্টাই প্রমাণ করছে আপনিও মনে করেন শ্যামার কথাই ঠিক। এখন বুঝতে পারছি। অদ্ভুত! শুনুন কাকু, আমি একবার শ্যামার সঙ্গে একান্তে কথা বলতে চাই। ব্যবস্থা করে দিতে পারবেন?”
“অন্য কেউ হলে ওরা মানতো না। ওসব ওরা পছন্দ করেন না। তবে তোমার ব্যাপারটা আলাদা। মনে হয় হয়ে যাবে। আমি ভিতরে গিয়ে বলছি।”
তিন
বাড়ির পিছনের এই দিকটায় পা দিলেই কেমন জানি গা ছমছম করে ওঠে। মস্ত একটা পুকুর। কালো জল। চারপাশে ঘন ঝোঁপঝার। তার ছায়া জলে পড়ে অদ্ভুত এক মায়াবী রহস্য তৈরি করে রেখেছে। একপাশে বাঁধানো ঘাট। সিঁড়ি নেমে গেছে জলের গভীর পর্যন্ত। ঘাটের উল্টোদিকে উঁচু মন্দির। শ্যাওলা জমেছে গায়ে। মাথা ভেদ করে বেরিয়েছে একটি অশ্বত্থ গাছ। মন্দিরে ঢোকার প্রবেশ দ্বার খুবই সংকীর্ণ এবং অন্ধকার। এটাই এই গ্রামের বিখ্যাত শিবকলি মন্দির। ভিতরে আছে তাঁদের বিগ্রহ।
একটি আঠারো উনিশ বছরের ছেলে রাহুলকে মন্দিরের সামনে এনে দাঁড় করিয়ে দিয়ে বলল,“আপনি এখানে একটু অপেক্ষা করুন। একটু পরেই শ্যামাদিদি আপনার সঙ্গে দেখা করতে আসবে। একটা চেয়ার এনে দেব?”
রাহুল হেসে বলল,“তার দরকার নেই। সিঁড়ির ধারেও বসতে পারি। আমার অসুবিধা হবে না। তুমি এই বাড়িতে কাজ করো?”
“হ্যাঁ। আমার বাবাও করতো।”
“তোমার নাম কী?”
“সনাতন, সনাতন দাস।”
“তোমাকে একটা প্রশ্ন করব সনাতন, কিছু মনে করো না। তোমার শ্যামাদিদি কেমন মানুষ গো?”
মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল সনাতনের,“শ্যামাদিদির মতো মানুষ হয় না। সবাই বলে সে নাকি দেবীর অংশ। মাঘ মাসে এই মন্দিরে পুজো হয়। তখন শ্যামাদিদির ভর ওঠে। সে রূপ দেখলে আপনি অবাক হয়ে যাবেন। সবাই তাকে পুজো করে। এমনকি মেজ জ্যাঠামশাই পর্যন্ত তাকে প্রণাম করেন।”
“ইন্টারেস্টিং!” আপনমনেই বিড়বিড় করতে করতে রাহুল বলল, “ঠিক আছে তুমি যাও।”
সনাতন চলে গেল। একটা সিগারেট ধরাল রাহুল। একটু পরেই ধীর পায়ে হাঁটতে হাঁটতে এল শ্যামা। এখন সাজগোজ নেই, আটপৌরে শাড়ি পড়া। তখন দেখতে পারেনি সবার মধ্যে, এখন সরাসরি তাকিয়ে দেখল। নিতান্তই সাদামাঠা চেহারা হলেও অন্যরকম এক আকর্ষণ মুখ জুড়ে। চোখ দুটো অন্যরকম। এতটাই সরল আর মায়ামাখা যে গভীরতা মাপা মুশকিল। কী আছে এই মেয়ের মধ্যে? দেখেই কেন যেন মনে হল, খুব চেনা চেনা, কোথায় যেন দেখেছে। তবে তাতে খুব বেশি অবাক হল না। কিছু ফেস এমন থাকে, যাদের দেখলেই চেনা চেনা লাগে।
রাহুল কিছু বলার আগেই শ্যামা হেসে বলল, “আপনি ওদের কথায় বিশ্বাস করবেন না। আমার মধ্যে কোনও অলৌকিক ক্ষমতা টমতা নেই। আমি অতি সাধারণ একটি মেয়ে।”
রাহুল বলল,“ওসব আমি বিশ্বাস করি না। সেজন্যই আপনার সঙ্গে আলাদা কথা বলার আগ্রহ প্রকাশ করেছি। আপনি বলছেন আপনার কোনও অলৌকিক ক্ষমতা নেই। তবে আপনি কেমন করে বললেন যে আমার সঙ্গেই আপনার বিয়ে হবে? এবং সেজন্যই বাড়িতে একটা খুশির আবহ, এত সব আয়োজন। সেটা আপনি কীভাবে বললেন?”
শ্যামার মাথা নত। ধীর গলায় বলল,“জানি না। সে প্রশ্নের উত্তর আমার কাছে নেই। কিছু বিশেষ মুহূর্তে আমি নিজস্ব সেন্স হারিয়ে কিছু কথা বলে ফেলি। ওরা সেটাই বিশ্বাস করে নেয়। আমি কী করবো বলুন?”
রাহুল কিছুটা কর্কশ স্বরে বলল,“আপনার এই জিনিসটা আসলে একটা অসুখ, আপনি জানেন?”
“অসুখ! তাই হবে হয়তো। আমি জানি না।”
“হ্যাঁ, অসুখ। আপনাকে বলতে খারাপ লাগছে, তবুও বলতেই হচ্ছে, আপনার ট্রিটমেন্ট দরকার। আপনাদের বাড়িতে শিক্ষিত মানুষ নিশ্চয়ই আছেন, জানি না তারা কেন অবহেলা করে আপনার জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলছেন। এভাবে চললে একদিন আপনি পাগলও হয়ে যেতে পারেন। বিয়ে তো অনেক দূরের কথা।”
শ্যামার মাথা ঝুলে পড়েছে। গভীর ভাবনায় পড়েছে! খারাপ লাগল রাহুলের। মেয়েটি স্নিগ্ধ ও সরল তাতে কোনও সন্দেহ নেই। হঠাৎ মাথা তুলে তাকাল শ্যামা, “একটা কথা বলবো?”
চোখের দৃষ্টি স্থির। মুখের লাজুক ভাব নেই। সেই জায়গায় এক ঐশ্বরিক আত্মবিশ্বাস, যা দেখেই মনে হয়, টলানো সম্ভব নয়। চমকে উঠল রাহুল। নরম গলায় বলল,“কী কথা?”
শ্যামা বলে চলল,“এ তো এক জন্মের ব্যাপার নয়। এই পৃথিবীতে আমরা বারবার এসেছি। আরও কত বার আসব কেউ জানি না। আপনি দেখতে পান না, কিন্তু আমি দেখতে পাই। আমাদের সম্পর্ক পূর্ব নির্ধারিত। মানুষে মানুষে এই জন্মবন্ধন যুগ যুগ ধরে চলে। আপনি যদি আমাকে বিয়ে না করেন তাহলে আমাকে অন্যকিছু ভাবতে হবে। কারণ জেনেশুনে আমি অন্য কাউকে আমি স্বামী হিসাবে কীভাবে মেনে নেব? আপনি বোঝার চেষ্টা করুন। হয়তো আপনিও একদিন বুঝতে পারবেন। কিন্তু তখন হয়তো অনেক দেরি হয়ে যাবে…।”
কথাগুলো শেষ করে হাঁপাতে লাগল শ্যামা। অস্বাভাবিক গতি, হাঁপানির রুগির মতো। রাহুল অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল ওর মুখের দিকে। গভীরভাবে অধ্যয়ন করার চেষ্টা করল, এটা কি শ্যামার অভিনয় ছিল, নাকি সত্যি সত্যি ওর মধ্যে কোনও পরিবর্তন ঘটেছিল? রাহুল বিজ্ঞানের ছাত্র। বিজ্ঞান সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য মানুষের কাছে প্রচারও করে। ওদের একটা সংস্থাও আছে। তার প্রধান উপদেষ্টা রাহুল নিজে। তবুও এইমুহুর্তে কিছুটা পাজেলড। অনেকগুলো প্রশ্ন উঠে আসছে মাথার মধ্যে। অতি সাধারণ একটি গ্রামের মেয়ে শুধুমাত্র বিয়ের জন্য এতসব অভিনয় করবে কেন? ওদের যা আর্থ সামাজিক অবস্থা এবং প্রভাব প্রতিপত্তি তাতে রাহুলের মতো ছেলে পাওয়া কি খুব অসম্ভব? রাহুলের সঙ্গে যদি একটা প্রেমের সম্পর্ক থাকত তাহলেও হয়তো এসবের একটা মানে পাওয়া যেত। দেখতে শুনতেও যথেষ্ট ভালোই বলা যায় শ্যামাকে। সমস্ত যুক্তি তালগোল পাকিয়ে গেল রাহুলের মস্তিষ্কে। নিজের বিজ্ঞান সচেতন মগজ আজ কোনও কাজ করছে না দেখে নিজেই অবাক হয়ে গেল।
চার
শিবকালিপুর থেকে ফেরার পর নরহরি চক্রবর্তীর আর দেখা পাওয়া যায় নি। সেটাই স্বাভাবিক। কারণ ওই বাড়ি থেকে পাত্রী দেখে আসার দু’দিন পরেই ছোটকাকু বলে দিয়েছিলেন, ওখানে বিয়ে সম্ভব হচ্ছে না। নরহরি নীরবে মাথা নেড়ে চলে গিয়েছিলেন। নতুন কোনও পাত্রীর সন্ধানও আর দেননি। যেটা তার স্বভাববিরুদ্ধ। সহজে হাল ছাড়ার পাত্র তিনি ছিলেন না।
ছোটকাকু একদিন বললেন,“ভালই হয়েছে। ওঁর দ্বারা হবে না। আমরা নিজেরাই নিজেদের মতো করে খুঁজবো। দেশে মেয়ের অভাব আছে নাকি?”
বলা মাত্র কাজ। তারপরেই শুরু হয়েছে বিভিন্ন প্রসেস। সাড়াও আসছে দারুনভাবে। কিন্তু সাড়া পেলেই তো হবে না, বাছবিচারের ব্যাপার আছে, অনুসন্ধানের ব্যাপার আছে। সেসব কাজই চলতে লাগল জোরকদমে।
শিবকালিপুর থেকে ফেরার পর পরই রাহুল দিব্যকে শ্যামার সঙ্গে ওর কথোপকথনের ব্যাপারটা খুলে বলেছিল। অবশ্যই কিছুটা সংকোচ নিয়ে। কারণ দিব্য জানে রাহুল ভীষণরকমের কুসংস্কারমুক্ত একজন।
শুনে একটু অবাক চোখে তাকিয়ে ছিল দিব্য। হেসে বলেছিল, “অল বোগাস্। তুই কি মনে করিস এসব ঘটবে? আমার প্রথম থেকেই মনে হয়েছিল, ডাল মে কুছ কালা হ্যায়। কিন্তু স্ক্রিপ্ট খুবই দূর্বল ছিল, ফাঁক ফোকরগুলো দেখা যাচ্ছিল। তবে আমার অবাক লাগছে ওদের বোকামি দেখে। মেয়েটি কিন্তু এমনিতেই বেশ ভাল ছিল। ওরা অতি নাটকীয়তা দেখাতে গিয়ে নিজেরাই সম্পর্কটা নষ্ট করল। এসব জেনেশুনে কোন ফ্যামিলি এমন একটি মেয়েকে বৌ করে আনবে? ওদেরও বলিহারি, এসব করার জন্য আর লোক পেল না? ওদেরই বা দোষ দিই কেমন করে, সাইন্স অ্যাওয়ারনেস ওয়ার্কার রাহুল সান্যালকে ওরা চিনবে কেমন করে? যাই হোক, এই চ্যাপ্টার মাথা থেকে ঝেড়ে ফেল।”
দিব্যর সাপোর্ট পেয়ে রাহুলও ঠিক করে ফেলেছিল, ওসব মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলাই ভাল।
তারপর অনেকগুলো মাস কেটে গেছে। শেষপর্যন্ত বাগনানের একটি মেয়েকে পছন্দ হয়েছে রাহুলের পরিবারের। রাহুলেরও খারাপ লাগেনি। এম এ পাশ, সুন্দরী এবং স্মার্ট। সরকারি চাকরি পায়নি, একটা প্রাইভেট স্কুলে ইংরেজি পড়ায়। উচ্চ শিক্ষিত পরিবার। বাবা কলেজের অধ্যাপক এবং মা গার্লস স্কুলের হেডমিস্ট্রেস ছিলেন। দাদা সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার, বিদেশে কর্মরত। সামনের মাসের পঁচিশ তারিখে ওদের বিয়ে। বাড়ির সবাই ভীষণ ব্যস্ত। রাহলও নিয়মিত অফিস করছে, কারণ সামনে বিয়ে পারপাসে একটা বড় ছুটি নিতে হবে। ছোটকাকু, কাতুদা ও দিব্য অন্যান্য সব আয়োজনের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছে। সময় পেলে রাহুল ওদের সঙ্গেও বসছে। বাবার অভাব তবুও প্রতিমুহূর্তে টের পাচ্ছে। তবে ভাল লাগছে মায়ের হাসিমুখটা দেখতে। এক জীবনে একটা সাধারণ মানুষের পক্ষে এটুকুই কম কি?
বিয়ের পাঁচ দিন আগে এক রবিবার হঠাৎ নরহরি চক্রবর্তী হাজির। দেখেই ছোটকাকু কিছুটা বিরক্ত মুখে বললেন, “তুমি তো আচ্ছা লোক হে। কোথায় ডুব মেরে ছিলে? ছেলেটা চিঠি দিতে গিয়ে দেখে তালা বন্ধ। যাইহোক, শুনেছো তো রাহুলের বিয়ে ঠিক হয়েছে? পঁচিশ তারিখে বিয়ে, সাতাশ তারিখে বৌভাত। তোমাকে সপরিবারে আসতে হবে।”
“শুনেছি। কিন্তু…”
“কোনও কিন্তু শুনবো না। তুমি বিয়ে ঠিক করতে পারোনি বলে আসবে না?”
“না না, তেমন কোনও ব্যাপার নয়।” খানিক ইতস্তত করে নরহরি বললেন, “আসলে ওই দিন বিশেষ একটি কাজে আমি থাকব না… তাই।”
“তাহলে তো বলার কিছু নেই। তবুও চেষ্টা করবে অবশ্যই।”
রাহুলকে ডেকে নরহরি বললেন, “তোমার সঙ্গে একটু কথা ছিল বাবা। সবার সামনে বলতে একটু অসুবিধা আছে।”
রাহুল ওঁকে নিজের ঘরে নিয়ে এসে বসাল। কাজের মেয়েকে দু’কাপ চা দিতে বলে সোফায় বসে বলল,“বলুন কী বলতে চান?”
নরহরি বললেন,“শ্যামাকে তোমার মনে আছে?... শিবকালিপুর... যাকে তোমরা দেখতে গিয়েছিলে?”
রাহুল হেসে বলল,“খুব মনে আছে। হঠাৎ শ্যামার কথা বলছেন কেন সেটা বলুন। ওরও কি বিয়ে ঠিক করে ফেলেছেন? মেয়েটি কিন্তু খুব ভাল। নিশ্চয়ই আমার চেয়ে অনেক ভাল পাত্র পেয়েছেন। ওরা শুধু শুধু…”
“শ্যামা জলে ডুবে আত্মহত্যা করেছে বাবা। নিজেই নিজের হাত-পা বেঁধে জলে ঝাঁপ দিয়েছিল। পরশুর ঘটনা। মেয়েটি বড় ভাল ছিল। আমার মুখেই তোমার বিয়ে ঠিক হওয়ার কথা শুনেছিল। শুনে মৃদু হেসেছিল শুধু। সে হাসিতে কতটা বেদনা ছিল বলে বোঝাতে পারব না। কিন্তু বুঝতে পারিনি এরকম মারাত্মক একটা ঘটনা ঘটতে চলেছে। জানলে কখনোই ওকে জানাতাম না।”
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে রাহুল বলল, “খুবই দুঃখজনক ঘটনা। আমারও ভীষণ খারাপ লাগছে। কিন্তু এক্ষেত্রে আমার কোনও দোষ আছে বলে আপনার মনে হয়?”
“না না না, তোমার কেন দোষ থাকবে?”
জোরে জোরে মাথা নাড়লেন নরহরি,“জোর করে তো কাউকে বিয়ে দেওয়া যায় না। উচিতও নয়। সেকথা শ্যামাও বুঝতো। মাঝে মাঝে বিষন্ন গলায় বলতো, কেন যে ও আমাকে চিনতে পারছে না, আমি কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছি না। এসব কথার মানে আমি কিছুই বুঝতে পারিনি। একবার ভেবেছিলাম এই মৃত্যু সংবাদ তোমাকে জানাব না। কিন্তু কাল রাতে হঠাৎ দেখলাম, আমার মাথার কাছে এসে শ্যামা যেন কিছু বলতে চাইছে। সেই বিষন্ন হাসি মুখ। না এসে পারলাম না। সামনেই তোমার বিয়ে, এরকম একটা খবর দিলাম বলে কিছু মনে করোনা, আমাকে ক্ষমা করে দিও।”
নরহরি চক্রবর্তী চলে যেতেই রাহুল দিব্যকে ফোন করে সব জানাল। দিব্য ভীষণ রেগে বলল,“লোকটা তো মহা বজ্জাত! এই সময় এরকম একটা খবর দেওয়ার মানেটা কিন্তু পরিস্কার। ব্যাটা পাক্কা শয়তান। সবকিছুর সাথে জড়িত। বিয়েটা দিতে পারেনি, বিরাট একটা টাকা মার গেছে, তারই প্রতিশোধ নিল এভাবে। বি কুল, এসব একদম মাথায় ঢোকাবি না প্লিজ। আমি ওর বাড়ি গিয়ে কিছু টাকা দিয়ে আসব।”
রাতে নিজের ঘরে আলমারির ড্রয়ার থেকে একটা জরুরি কাগজ বের করতে গিয়ে একটা ছবি দেখতে পেল রাহুল। শ্যামার ছবি। নরহরি চক্রবর্তী দিয়েছিলেন দেখতে যাওয়ার আগে। পরে আর ফেরত দেওয়া হয়নি, ওভাবেই থেকে গেছে। ছবিটা হাতে নিয়ে ভাল করে দেখল রাহুল। শেষপর্যন্ত এইরকম একটা পরিণতি হল মেয়েটার! এখনও চোখে চোখে ভাসছে ওর মুখটা। হোক ছবি, চোখে চোখ পড়তেই মাথাটা চক্কর দিয়ে উঠল রাহুলের। প্রথম দিন দেখার পরেই শ্যামাকে কেমন জানি চেনা চেনা লেগেছিল। সেই চেনাটা হঠাৎ করে তীব্রভাবে ফিরে আসছে কেন? অবচেতনের অলি গলি তোলপাড় করছে কেউ। চেতনার সব শক্তি প্রয়োগ হচ্ছে সেই কাজে। চরম বিজ্ঞান সচেতন রাহুল সান্যাল কিছুতেই সেই খোঁজের গতিরোধ করতে পারছে না। একসময় মনে হল, আর দেরি নেই, একটু পরেই উন্মোচিত হবে সব রহস্য!
এবং বৃত্তের বাইরে, এপ্রিল ২০২৫

No comments:
Post a Comment