মড়ার জিনিস ছোঁয়া মানা — ভূতের গল্প — পায়েল বিশ্বাস — এবং বৃত্তের বাইরে


Morar jinis choa mana a horror story by payel biswas

মড়ার জিনিস ছোঁয়া মানা

পায়েল বিশ্বাস

 “এই সুন্দর লেপটা কোথায় পেলি রে?”

রতন ফুটপাতে বস্তা পাততে পাততে তার ফুটপাতিয়া বন্ধু হারুকে বলল,

“ওই তো গঙ্গার পারে।”

“কারা ফেলল রে?”

“আরে এই এলাকার বস, যে কাল মরল। তাকে পোড়াতে এসেই তো এসব ফেলে দিল তার বাড়ির লোক। দ্যাখ, আমদের হাড় মাংস চুষে ওরা কি দামী জিনিস ব্যবহার করে!”

“তুই দেখ। ওই শয়তানের জিনিস আমি ছুঁয়েও দেখব না।”

রতন আর হারুর বাস এই মজে যাওয়া আদি গঙ্গার পাশে এক ফুটপাতে। ত্রিপলের ঘেরাটোপের মধ্যে তাদের রাজপ্রাসাদ।

গরমের রাতগুলো খোলা ফুটপাতের সামান্য বাতাসে তাও তারা ঘুমের দেশে পাড়ি দিতে পারে কিন্তু সমস্যা হয় বর্ষাকালে ও প্রবল শীতে। শীতে ঠান্ডার হাত থেকে বাঁচতে কারো বাড়ি থেকে জোগাড় করা ছেঁড়াফাঁটা কাঁথা কম্বলের তলায় কোনোমতে গুটিসুটি মেরে ভোরের অপেক্ষায় চোখ বন্ধ করে পড়ে থাকে। 

রাতে ত্রিপলটা দিয়ে চারিদিক বেশ ভালো করে ঘিরে তাড়াতাড়ি লেপের তলায় ঢুকে পড়ল রতন। ঘুমটা হঠাৎ ভেঙে যেতে রতনের কি রকম যেন অস্বস্তি হতে লাগলো। কেন জানে না ওর মনে হতে লাগলো ও লেপটাকে নিজের গায়ে জড়ায়নি, লেপটা যেন ওকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরেছে। একবার ভাবল লেপটা গা থেকে সরিয়ে দেয় কিন্তু এই প্রচন্ড ঠান্ডায় সে সেটা করতেও পারল না। রতন ভাবল বড়োলোকের জিনিস গায়ে দেওয়ার অভ্যাস নেই, তাই এমন অস্বস্তি হচ্ছে। যাইহোক, পাশ ফিরে আবার দুই চোখ বন্ধ করল সে।

রতনের শরীরটা ভালো যাচ্ছে না। ঘুসঘুসে জ্বর সাথে অস্বাভাবিক দূর্বলতা। হারু বলছিল ওকে নাকি ফ্যাকাসে দেখতে লাগছে৷ 

“এই রতন, হাসপাতালে গেছিলি?”

চায়ে চুমুক দিয়ে হারু জিজ্ঞেস করল। 

“হ্যাঁ রে৷ ওষুধ দিয়েছে। অনেক পরীক্ষাও দিয়েছে।”

“করিয়ে নিস পরীক্ষা। তা ডাক্তার কি বলল ?”

হারুর প্রশ্নে রতন বলল, ‘‘আমায় ভালো করে খাওয়া দাওয়া করতে বলল। আমার নাকি রক্ত কমে যাচ্ছে।”

“আমাদের মত ভিখারির আর ভালো খাওয়া!” দীর্ঘশ্বাস ফেলে হারু বলল। তারপর কিছুক্ষণ কি চিন্তা করে হারু বলল, “দাঁড়া, বাজারে যে দূর্গা মন্দির আছে ওখান থেকে আমি রোজ তোর জন্য ফল প্রসাদ নিয়ে আসব। খাবি, দেখবি গায়ে রক্ত হবে।”

বন্ধুর ভালোবাসায় রতন স্মিত হাসে।

দুই দিন বাদে ভোরবেলায় রতনের খোঁজে ওর আস্তানায় গিয়ে দেখে কেমন এক দৃষ্টিতে চোখ বড় বড় করে উপরের দিকে তাকিয়ে আছে রতন! গায়ে হাত দিতেই হারু বুঝে গেল সব শেষ। মৃত রতনের গায়ের লেপটার দিকে এবার নজর পড়ল তার। 

“কি সুন্দর মোটা লেপ! যখন প্রথম দেখেছিলাম তার থেকেও এখন বেশি সুন্দর লাগছে। রঙ যেন ফেটে বেরোচ্ছে।” মুগ্ধ হয়ে লেপের দিকে তাকিয়ে হারু নিজের মনেই কথাটা বলল।

লেপটা যেন তাকে ওর নিজের দিকে তীব্রভাবে আকর্ষণ করছে। 

“হোক মড়ার। ঠান্ডায় তো বাঁচব।”

কেউ দেখে ফেলার আগেই লেপটা রতনের গা থেকে খুলে নিল হারু। পুলিশ সাধারণ জিজ্ঞাসাবাদ করে রতনের বডিটা নিয়ে চলে গেল। 

রাতে লেপমুড়ি দিয়ে বেশ আরাম করেই হারু শুল। মাঝরাতে হারুর কেমন অস্বস্তি হতে লাগলো। মনে হল লেপটা যেন তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরেছে।

দুই দিন বাদে হারুরও শরীর খারাপ হতে লাগলো। ফুটপাতে বসে আগুন পোহাতে পোহাতে হারু ভাবল রতনের যেরকম শরীর খারাপ হয়েছিল তারও তো সেই রকম হচ্ছে। 

“কাল একবার হাসপাতালে যেতে হবে। নইলে রতনের মতো হাল হবে।” 

হঠাৎ হারুর মনে হল, “আরে তাইতো, লেপটা পাওয়ার আগে রতন তো সুস্থ ছিল। এই লেপ গায়ে দেওয়ার পর ওকে রোগে ধরে। আর আমারও তাই হল। তাহলে কি মড়ার জিনিস গায়ে দেওয়ার জন্য হচ্ছে?”

 রতন স্থির করল সেদিন রাত থেকে আর লেপ গায়ে দেবে না। রাতের বেলায় নিজের ছেঁড়া কম্বলেই গা ঢাকল হারু। পায়ের কাছে লেপটা অনাথের মতো পড়ে রইল। মাঝরাতে হারু স্বপ্ন দেখল রতন এসে ওর গা থেকে জোর করে লেপটা টেনে সরিয়ে দিচ্ছে। হঠাৎ একরাশ কালো ধোঁয়া কোথা থেকে এসে রতনকে ঘিরে ধরল। রতন একবার হারু বলে চেঁচিয়ে উঠল...। ধড়ফড় করে উঠে বসল হারু৷ 

“একি! লেপটা আমার গায়ে এল কি করে? আমি তো কম্বল গায়ে দিয়ে শুয়েছিলাম।” চমকে উঠল হারু। 

এক অমঙ্গলের আশংকায় হারু তাড়াতাড়ি লেপটা নিয়ে গঙ্গার ঘাটে রেখে দিল। ঘাট থেকে ফিরে যেই নিজের আস্তানায় প্রবেশ করল, একটা বরফের স্রোত ওর মেরুদণ্ড দিয়ে বয়ে গেল। যে লেপ সে ফেলে দিয়ে এল, সেই লেপটা বহাল তবিয়তে তার জীর্ণ আস্তানায় ঝকমক করছে৷ প্রচন্ড আতংকে রাতটুকু বসে কাটিয়ে সকাল হতেই সে দূর্গা মন্দিরে ছুটল।

দূর্গা মন্দিরের পুরোহিত সনাতন চক্রবর্তী সবে পুজো শেষ করে প্রসাদ বিতরণ করছেন, এমন সময় হারু হাঁপাতে হাঁপাতে সেখানে এসে উপস্থিত হল। সনাতন হারুকে অনেক দিন ধরেই চেনেন। ওকে ওইভাবে আসতে দেখে ভুরু কুঁচকে তাকালেন ওর দিকে। 

“ঠাকুরমশাই আপনার সাথে আমার একটু কথা আছে।”

“ঠিক আছে। আগে তুই প্রসাদ খেয়ে মন্দিরে একটু বসে জিরিয়ে নে। তারপর বল।”

সবাইকে প্রসাদ দিয়ে হাত ধুয়ে হারুর কাছে এলেন সনাতন চক্রবর্তী। 

“নে, বল, কি কথা আছে তোর?”

হারু আমতা আমতা করতে লাগলো। কি বলবে সে পুরোহিত মশাইকে! উনি তো শুনে হাসবেন। কিন্তু যে ভূতুড়ে কান্ড কারখানার মধ্যে সে পড়েছে তার থেকে উদ্ধারের পথও তো সে খুঁজে পাচ্ছে না। 

“কি রে বল?”

“আসলে আপনি হয়তো শুনে হাসবেন। কিন্তু বিশ্বাস করুন, আমি একটুও মিথ্যা বলব না আর আমি পাগল নই।”

“আরে সে না হয় ঠিক আছে। আগে তো সব বল।”

সনাতন চক্রবর্তীর আশ্বাসে হারু সব কথা খুলে বলল। রতনের অসুস্থতা, মৃত্যু, রতনের মত তারও একই অসুখ হওয়া আর শেষ পর্যন্ত লেপের নিজের জায়গায় ফিরে আসা সব। 

সব শুনে সনাতন চক্রবর্তী চোখ কপালে তুলে বললেন,

“করেছিস কি তোরা! শেষ অবধি মড়ার জিনিস ব্যবহার করছিস?”

“কি করব ঠাকুরমশাই, শীতে যে খুব কষ্ট হত আমাদের। তাই লোভে পড়ে রতন আর আমি একই ভুল করে ফেলেছি।” 

“হুম। এক কাজ কর, আমি তো এখন একটা কাজে বেরিয়ে যাচ্ছি, অনেক রাতে ফিরব। তুই কাল সকালে লেপটা নিয়ে আসিস।” 

“কিন্তু ঠাকুরমশাই, আজ রাতে যদি লেপটা আমায় মেরে ফেলে?”

“দাঁড়া। তোকে মায়ের পায়ের ফুল দিচ্ছি। এটা লেপের উপরে দিয়ে রাখ। রাতে আর ওটা গায়ে দিবি না।” 

মা দূর্গার পায়ের ফুল নিয়ে হারু নিজের আস্তানায় ঢুকল। নিজের মাথায় ফুলটা ছুঁয়ে লেপের উপর রাখল। তারপর পেটের খিদে শান্ত করতে বের হয়ে গেল।

সন্ধ্যেবেলা আস্তানায় ঢুকে লেপের দিকে নজর গেল হারুর। কেমন যেন চুপসে গেছে লেপটা। আগের সে উজ্জ্বলতাও আর নেই। আর ওর আস্তানা জুড়ে কেমন যেন বিশ্রী একটা দুর্গন্ধ! হারু ভাবল, ফুটপাতের পাশের নর্দমা থেকে হয়তো আসছে।

গভীর রাত, তার উপর শীতের প্রাবল্য, মাঝে মাঝে কুঁকড়ে যাওয়া কুকুরের অসহায় কান্না ভেসে আসছে। গলায় প্রবল চাপে হারুর ঘুমটা হঠাৎ ভেঙে গেল। ধড়ফড়িয়ে উঠে বসতে গেল কিন্তু বুকের উপর যেন কয়েক মণ ওজন। অন্ধকারে এবার ভালো করে তাকালো হারু।

“একি! লেপটা আবার আমার গায়ে এল কি করে?” আতংকে চিৎকার করে বলতে চাইল হারু। কিন্তু লেপটা যে তাকে গলা অবধি আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরেছে। তাই গলা দিয়ে গোঁ গোঁ শব্দ ছাড়া কিছুই বেরোল না। লেপের বেষ্টনী থেকে বেরোনোর জন্য হারু হাত পা ছোঁড়ার চেষ্টা করল। কিন্তু নিজের হাত পা একবিন্দু নড়াতে পারল না সে। দম বন্ধ হয়ে আসতে চাইল তার। সে বেশ বুঝতে পারছে রতনের মতো পরিণতি তারও হতে চলেছে। 

হঠাৎ, “হারু, হারু... এই হারু....” কেউ... কেউ তাকে ডাকল। 

হারু চেষ্টা করল সাড়া দিতে কিন্তু পারল না। নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে তার। একটু বাতাস চাই। এই অবস্থাতেও তার মনে হল কেউ যেন ত্রিপল সরিয়ে তার আস্তানায় ঢুকল।

“কি সর্বনাশ!” বলে কেউ যেন জল ছেটাতে লাগলো।

সারা জায়গা এক বিশ্রী দুর্গন্ধে ভরে গেল। কয়েক সেকেন্ড পর হারুর মনে হল লেপের বাঁধন যেন শিথিল হয়েছে। সে নিজের সর্ব শক্তি প্রয়োগ করে লেপটা গা থেকে ফেলে দিল। যিনি হারুর ঘরে ঢুকেছিল এবার তিনি হারুর হাত ধরে বাইরে নিয়ে এল। ল্যাম্পপোস্টের আলোয় হারু দেখল সামনে সনাতন চক্রবর্তী। 

“ঠাকুরমশাই আপনি না এলে তো আজ রতনের মতো আমাকেও লেপটা খেত।”

“তোকে যে বলেছিলাম মায়ের ফুলটা রাখতে।”

“রেখেছিলাম। এমনকি ওটা তারপর ছুঁইনি অবধি। তারপরেও ওটা কখন যেন আমার গায়ে এসে পড়ে।” 

“হুম। খুব বড়ো বেঁচে গেছিস আজ তুই। নইলে ওর মধ্যে যে পিশাচ আছে সেটা আজ তোর সব রক্ত টেনে নিত।” 

“সেকি! কে সে?”

“আবার কে? যার লেপ সে। ব্যাটা বেঁচে থাকতে সাধারণ মানুষদের হাড়মাস খেয়েছিল আর এখন মরে গিয়েও তার আশ মেটেনি, এই লেপের মাধ্যমে যে এটা গায় দেয় তার রক্ত চুষে খায়।” 

“সর্বানাশ তো তাহলে ঠাকুরমশাই। তাহলে এর হাত থেকে কি করে বাঁচব? ও তো আমায় ছাড়বে না।” 

“চিন্তা নেই তোর। লেপটাকে এখানে নিয়ে আয়।” 

সনাতন চক্রবর্তীর তাড়ায় হারু লেপটা নিয়ে এল। সনাতন চক্রবর্তী তখন মন্ত্র পড়তে পড়তে লেপটায় আগুন ধরিয়ে দিলেন। একটা অমানুষিক চিৎকার লেপটার ভিতর থেকে বেরিয়ে এল। চারিদিক ভরে গেল এক কটূ গন্ধে। 

কিছুক্ষণ পর লেপটির ছাইয়ের উপর সনাতন চক্রবর্তী যখন গঙ্গাজল ছেটাচ্ছেন তখন হারু জিজ্ঞেস করল,

“আচ্ছা ঠাকুরমশাই, আপনি তো এখানে ছিলেন না। ফিরতে রাত হবে বলেছিলেন, তাহলে আমার এখানে কি করে এলেন?”

“আমি তখন সবে বাড়ির সামনে যজমানের গাড়ি থেকে নেমেছি, হঠাৎ কানের কাছে সে বলল তোর খুব বিপদ, আমি যেন তোর আস্তানায় একবার যাই। তাই গেছিলাম তোর কাছে।”

সব শুনে অবাক হল হারু।

“কে বলল আপনাকে আমার বিপদের কথা?”

“কে আর বলবে? বলল তো তোর প্রাণের বন্ধু রতন।”

চমকে উঠল হারু।

“রতন কি করে বলবে? সে তো...”

“বন্ধুত্বের টান রে। তাই তোর বিপদের আঁচ পেয়ে রতন আমায় তোর কাছে পাঠাল। নিজে লেপের পিশাচের হাত থেকে বাঁচতে পারেনি। কিন্তু তোকে সে বাঁচিয়ে দিল।” 

রতনের মুখটা হারুর চোখের সামনে ভেসে উঠল। হারুর চোখে জল এসে গেল। রতন তাকে এত ভালোবাসত যে মরে গিয়েও তাকে বাঁচিয়ে দিয়ে গেল! 

“এই যে সবাই শোন, দেখলে তো রতন, হারুর সাথে কী ভয়ানক ঘটনা ঘটল৷ তাই তোমাদের সাবধান করে দিলাম মড়ার জিনিস কেউ ছোঁবে না। যার যে জিনিস প্রিয় থাকে মরার পরও অনেকে সেই জিনিসের টানে আবার ফিরে আসে। তাই এসব থেকে দূরে থেকো।”

সামনে জড়ো হওয়া ফুটপাথবাসীদের এই কথা বলে সনাতন চক্রবর্তী বাড়ির পথ ধরলেন।


এবং বৃত্তের বাইরে, ফেব্রুয়ারি, ২০২৫

No comments:

Post a Comment