পাহাড়ের আতঙ্ক
অরণ্যানী অর্পিতা
নিগুঢ় অন্ধকার রাত্রি স্তব্ধতায় মুড়ে রয়েছে। ঘন কুয়াশার আবরণকে ঠেলে ইলেকট্রিক টর্চের আলো তার সর্বশক্তি দিয়েও দুই হাত দূরের বস্তুকে দৃশ্যমান করতে পারছে না। তবুও সাবধানের মার নেই তাই মাঙ্কি টুপিটাকে চিবুকের তলা থেকে টেনে ভালো করে নাক অবধি তুলে নিল লোকটা। কেবল চোখ দুটি খোলা আছে তার সেটাও পুরু চশমার কাঁচে ঢাকা। হাতের শাবলটাকে আগে পাঁচিলের উপর রেখে নিয়ে এবার গেট ধরে বেয়ে উঠে পাঁচিল টপকে ফেললো সে।
ধুপ...। আওয়াজটা হতেই সতর্ক হয়ে লোকটি মাটিতে বসে রইল খানিকক্ষণ। এই পাহাড়ি এলাকায় যে কোন শব্দ অনেক দূর পর্যন্ত শোনা যায় সহজেই। যদিও বৌদ্ধ মন্দিরের পিছনের দিকের এই অঞ্চলটি বহুদিন ধরেই পরিত্যক্ত। আর এই বাড়িটিতেও বছরখানেক হলো কেউ থাকেনা। এই বাড়ির বউ টি অন্য একটি পুরুষের সঙ্গে পালিয়ে যাওয়ার পর পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা যখন তার বাপের বাড়ি হায়দ্রাবাদের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছিল সেদিনই পাহাড়ি রাস্তায় ধস নামে এবং খাদে পড়ে তারা সকলেই মারা যায়।
অনেকদিন ধরেই ভুবনের মাথায় পরিকল্পনাটা ঘুরছিল। অনেকগুলো টাকা দেনা তার মাথার উপর। কোনমতে আর কোন উপায় না পেয়ে শেষ পর্যন্ত এই বাড়ির ভিতরে ঢুকে টাকা পয়সা মূল্যবান সম্পত্তি না হোক কিছু আসবাবপত্র যদি সরাতে পারে সেগুলো বিক্রি করেও কিছুটা সুরাহা হবে তার। জিনিসগুলো তো পড়েই রয়েছে! আর সেই পালিয়ে যাওয়া বউ নিশ্চয়ই মান সম্মানের মাথা খেয়ে কোনদিনও দাবী দাওয়া করতে এখানে আসবে না! যদি আসার হতো এই ক’বছরে নিশ্চয়ই চলে আসতো! সবকিছু পড়ে পড়ে নষ্ট হওয়ার থেকে যদি ভুবনের মতো গরিবের কাজে লাগে তাতে কি ভগবান কিছু মনে করবেন? নিশ্চয়ই না!
এই সমস্ত ভেবে নিজের দ্বিধাগ্রস্থ মনটাকে আবারও সংকল্পে দৃঢ় করে নিয়ে ভুবন গায়ের চাদরটাকে ভালো করে জড়িয়ে নিয়ে তালা বন্ধ দরজার দিকে এগিয়ে গেল! গায়ের সমস্ত জোর দিয়ে শাবলটা উচিয়ে তালার উপর মারতেই তালাটা ভেঙে গেল। আবারো বুকের মধ্যে ধক্ করে উঠলো ভুবনের। আওয়াজটার প্রতিধ্বনি অনেকদূর পর্যন্ত হবে নিশ্চিত! আর কেউ না হোক সামনের মন্দিরের বৌদ্ধ সন্ন্যাসীরা না টের পেয়ে যায়! কিন্তু নাহ্ কোনও দিক থেকে আর কোন আওয়াজ না আসায় খানিকটা নিশ্চিন্ত হয়ে ঘরের মধ্যে ঢুকলো ভুবন!
ঘরে ঢুকতেই একটা কেমন কেমন গন্ধ নাকে ধাক্কা মারলো ভুবনের। অনেকদিন বন্ধ করেছিল তাই, বা হয়তো কোন ইঁদুর টিঁদুর মরে পচে ছিল! মনে মনে ভাবলো সে!
সময় নষ্ট না করে তাড়াতাড়ি আলমারি যে ঘরে রাখা সেই ঘরের দিকে পা বাড়াল। এই বাড়িতে একটা সময় মালির কাজ করেছে সে। কোথায় কী আছে তার সবই জানা।
আলমারির কাছে পৌঁছে আলমারি হাতলের শাবলটা ঢুকিয়ে চার দিতে লাগল সে। এইবার অবশ্য একটু বেগ পেতে হল। বেশ খানিকক্ষণ চেষ্টা করার পর অবশেষে হাতলটা খানিক নড়বড়ে হল আর ঠিক তখনই ভুবনের গায়ে একটা ঠান্ডা হওয়ার ঝাপটা এসে লাগলো! খুব কাজ দিয়ে কেউ দ্রুত গতিতে হেঁটে গেলে যে রকম হালকা হওয়ার ঝাপট লাগে ঠিক সেরকম! পাহাড়ে রাতের বেলা রাত্রি বেলা ঠান্ডা হাওয়া দেওয়া খুবই স্বাভাবিক ঘটনা। কিন্তু হাওয়াটা যেন তুষারপাতের মতোই হিমেল! তাছাড়া ঘরের কোন জানালাও তো খোলা নেই! হাতের টর্চের আলো এদিক-ওদিক ফেলে কিছুই দেখতে পেল না! মনে একটা অদ্ভুত অস্বস্তি শুরু হল ভুবনের! কেন জানি তার মনে হলো অতি দ্রুত কাজ সেরে কেটে পড়া প্রয়োজন... সে আবারও আলমারির হাতোলে চার দিতে যাবে এমন সময় খট্ করে কিছু একটা পড়ে যাবার আওয়াজ হল পাশের ঘর থেকে! আঁতকে উঠলো ভুবন! জায়গাটার এমনিতেই দুর্নাম রয়েছে, খানিক দূরেই কবরস্থান! তাছাড়া পরিতক্ত অঞ্চলে লেপার্ডের ঘুরে বেড়ানো অস্বাভাবিক নয়! হাতের শাবলটা উঁচু করে ধরে ধীরে ধীরে পাশের ঘরের দিকে উঁকি মারলো ভুবন, টরচের আলো এদিক-ওদিক ফেলেই দেখতে পেল একটা ফটো ফ্রেম টেবিল থেকে নিচে পড়ে রয়েছে। ভুবন ধীরে ধীরে সেদিকে এগিয়ে গেল। নিচু হয়ে তুলল ফ্রেমটা!
ছবির মানুষটা তার চেনা। এবাড়ির সেই বউটা। ওরকম শান্ত শিষ্ট মেয়ে, দেখে বোঝা যায়নি পেটে পেটে তার এত! কিন্তু ফ্রেমটা টেবিলের উপর থেকে নিচে পড়ল কী কবে? তবে কি অন্য কেউই বাড়িতে সবার অজান্তে আশ্রয় নিয়েছে? ফ্রেমটা টেবিলের উপর নামিয়ে রেখে পিছন ফিরতেই মনে হলো দরজার পাশ থেকে কে যেন সুরুৎ করে সরে গেল! ভুবনের সারা শরীর ছম্ছম্ করে উঠলো! একটা অজানা আশঙ্কা তাকে পেয়ে বসছে ক্রমশ! ভয় কাকে বলে? কোনদিনই খুব একটা জানা ছিল না ভুবনের কিন্তু আজ এই পরিতক্ত বাড়ির মধ্যে দাঁড়িয়ে চুরি করতে এসে লোকের হাতে ধরা পড়ার ভয়কে পেরিয়ে অন্য কোন একটা ভয় তার অনুভূতিগুলোকে ক্রমশ গ্রাস করছে!
মরিয়া হয়ে ভুবন পাশের ঘরে দৌড়ে গেল। গায়ের জোরে শাবলের চার মারতেই এবার আলমারির হাতলটা খুলে বেরিয়ে এলো। টর্চটা জ্বেলে বিছানার ওপরে সেট করে এমন ভাবে রাখল যাতে আলোটা সরাসরি আলমারির মধ্যে পড়ে। এবার দুই হাতে আলমারির জিনিসপত্র ঘাটতে ঘাটতে, এক বান্ডিল টাকা হাতে এলো তার। মুখে হাসি ফুটে উঠলো ভুবনের। লকারে চাবিটা খুলতেই সেই হাসি আরো চওড়া হয়ে উঠলো, লকারে ঠিক করে আলোটা পড়ছে না। বেশ কতগুলো ছোট ছোট বাক্স গয়নার হবে। বাক্সগুলো হাতে করে নিয়ে বিছানার ওপরে রাখলো ভুবন। আগ্রহ সামলাতে না পেরে একটা একটা করে বাক্স খুলতে লাগলো, সোনার বিছা হারটা দেখে চোখ চক চক করে উঠলো তার। হারটা ধরে চোখের সামনে ধরল সে। টর্চের আলোয় পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে জিনিসটা। আর তখনই কিছু একটা অনুধাবন করতে পেরে মুখের হাসি মিলিয়ে গেল ভুবনের! তার মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে গেল মুহূর্তেই! টর্চটা সে বিছানার উপর শুয়ে রেখেছিল! সেই অবস্থায় তো আলোটা এইভাবে পড়ার কথা নয়! সামনের দিকে না তাকিয়েও ভুবন বুঝতে পারল কোন একটি অবয়ও টর্চটিকে তুলে ধরেছে! ধীরে ধীরে সেদিকে এবার চাইল ভুবন!
অন্ধকারে শরীর মিশিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে একটা অস্পষ্ট নারী অবয়ব! মুখ দিয়ে একটা আতঙ্কের শব্দ বেরিয়ে আসল তার।
“কক্-ন হ্যয়?”
উত্তরে সেই নারী অবয়ব খিলখিল করে হেসে উঠলো! তারপর একটা ফ্যাসফ্যাসে গলায় বলল, “প্যাহেচানা নেহি, ভুবন ?...”
তারপর আবার সেই গা কাঁপানো অদ্ভুত হাসি! ভুবনের হাত থেকে গয়নাটা খসে পড়ল! সে পরী কি মরি করে দৌড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে লাফ মেরে বাগানে পৌঁছে গেল, কিন্তু তখনই পায়ে কোন কিছুতে বাধা পেয়ে উল্টে পড়ল সে! মুখ থেকে আক্ করে একটা শব্দ বেরিয়ে এলো! পরমুহূর্তেই ভুবনের লম্বা চওড়া শরীরটাকে পা ধরে হির হির করে টানতে টানতে কেউ বাগানের ভেতরের দিকে নিয়ে যেতে লাগলো যেন!
কুয়াশার অস্পষ্ট চাদরের মধ্য থেকে ভূবন দেখতে পেল একটা গাছের লতা ক্রমশ তার পায়ে জীবন্ত সাপের মত পেঁচিয়ে উঠছে। আতঙ্কে তীব্র আর্তনাদ ভুবনের গলা চিরে বেরিয়ে আসলো কিন্তু তার মুহূর্তের জন্যই! কারণ প্রায় সাথে সাথেই সেই গাছের লতা জীবন্ত নাগিনীর মতো সহস্র ফনায় বিভাজিত হয়ে ভুবনের মুখ দিয়ে কান দিয়ে নাক দিয়ে চোখ ফুঁড়ে ঢুকে গেল!
ভুবনের রক্তাক্ত শরীরটা কাটা মুরগির মতো ছটফট করে কাঁপতে কাঁপতে খানিকক্ষণের মধ্যেই স্থির হয়ে গেল!
* * *
কয়েক বছর পর...
নর্থ সিকিমের একটা অফবিট পার্বত্য গ্রাম নাংচিঙায় বেড়াতে এসেছে অনন্যা শ্রেয়া আর নীলাঞ্জনা। সোশ্যাল মিডিয়ার একটা পেজ থেকে এই মনোরম গ্রামটার খোঁজ পায় অনন্যা। সেখান থেকেই ফোন নাম্বার জোগাড় করে, লোকেশন অনুযায়ী একটা ছিমছাম পরিচ্ছন্ন হোমস্টের সামনে এসে পৌঁছালো ওরা তখন প্রায় দুপুর। ওদের গাড়ি পৌঁছতেই দরজা খুলে বেরিয়ে এলেন এক ভদ্রলোক। বাংলা হিন্দি মিশিয়ে বললেন,
-“আসুন আসুন! আমিই তারক বিশ্বাস।”
অনন্যা হাসি মুখে এগিয়ে গিয়ে তার সাথে হাত মিলিয়ে বলল,
-“একজন বাঙালি এখানে একটা হোমস্টে করেছে ভাবতেও দারুন লাগছে! আমি অনন্যা আমার সঙ্গে আপনার কথা হয়েছিল ফোনে।”
তারকবাবু স্মিত হেসে বললেন, “স্বাগতম আসলে আমার স্ত্রী খুবই পাহাড় ভক্ত। ওর সখের হাত ধরেই সম্ভব হয়েছে বলতে পারেন। আমি কিছু মাস এখানে আর কিছু মাস কলকাতায়! যাইহোক সে সব গল্প পরে হবে। আপনারা বরং চাবিটা নিয়ে আপনাদের ঘরে যান ফ্রেশ হয়ে নিন! তারপর সমস্ত গল্প হবে!”
চাবি নিয়ে ওরা তিনজন একটা কটেজে পৌঁছাল। ছোট্ট কিন্তু পরিপাটি করে গোছানো পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রুম। রুমে লাগেজ পত্র রেখে ফ্রেশ হয়ে ওরা খাবার টেবিলে চলে এল। তারক বাবু আগে থেকেই অপেক্ষা করছিলেন। ভদ্রলোক দিল খোলা মানুষ, বোঝা যাচ্ছিল অনেক দিন বাঙালি কাউকে পাননি কথা বলার জন্য। দুপুরে গরম ডাল সব্জি মাছ ভাত খেয়ে আর নানান কথায় বেলা গড়িয়ে এলো। তখন তারক বাবু বললেন,
“আশপাশটা এইবেলা দেখে আসুন, হাতে বেশি সময় নেই। এইসব অঞ্চলে আবার কিন্তু ঝুপ করে সন্ধ্যা নেমে আসে। খুব বেশি দূরে আজ যাবার দরকার নেই বুঝলেন”
নীলাঞ্জনা জিজ্ঞেস করল, “এখানে অনেক বৌদ্ধ মন্দির আছে বলেছিলন যে, আশ পাশে নেই?”
“হ্যাঁ হ্যাঁ, থাকবে না কেন? এই তো এই পথে গেলে আধাঘন্টা পরেই ওই উপরে একটা পুরোনো বৌদ্ধ মন্দির আছে, একটু পরেই সন্ধ্যা আরতি হবে ওইটাই দেখে আসুন বরং? কাল গাড়ি বলে রেখেছি, কাল ভালো করে ঘুরবেন! কেমন?” কথা গুলো বলে ভদ্রলোক উঠে গেলেন।
অনন্যারা দরজায় চাবি দিয়ে ভালো করে কান মাথা ঢেকে হাঁটতে বেরোতেই যাবে এমন সময় ভদ্রলোকের স্ত্রী এলেন,
-“নমস্কার, আমি উর্মিলা। তারক বাবু আমার স্বামী।’’
খানিকক্ষণ চুপ করে থাকে ভদ্রমহিলা আবার বললেন, -“আমার শরীরটা এবার এসে থেকে একটু খারাপ হয়েছে তাই আপনাদের সাথে আলাপ হয়নি! শুয়ে ছিলাম। আপনারা বাইরে বেরোতে যাবেন শুনেই এলাম, একটা কথা বলার ছিল!”
শ্রেয়া উৎসুক হয়ে জিজ্ঞেস করল, “হ্যাঁ বলুন না, কী ব্যাপার?”
উর্মিলা দেবী যেন একটু দ্বিধা করে বললেন, “এই যে এই টর্চ দুটো সাথে রাখুন আর মানে ইয়ে..., আসলে উনি তো এসব মানেন না, তাই কিছু বলেননি। এসব পাহাড়ি গ্রামে কিছু নিয়ম থাকে সে সব মেনে চলাই ভালো। ওই মন্দিরের পিছনে একটা বহু আগেকার গোরস্থান আছে। ওই দিকটায় যাবেননা যেন! জায়গাটা ভালো না! তার উপর আজ অমাবস্যা।’’
উর্মিলাদেবী একবার ওদের সবার দিকে তাকিয়ে আবারো বললেন, “আমি বলি কী, সন্ধ্যা আরতি খানিকটা দেখেই না হয় নেমে আসবেন। যেদিন গাড়ি থাকবে সেদিন পুরোটা দেখবেন না হয়। আজ একটু তাড়াতাড়ি ফিরে আসবেন, কেমন?”
শ্রেয়া অনন্যা নীলাঞ্জনা নিজেদের মধ্যে চোখাচোখি করল। শ্রেয়া ভয়ে ভয়ে বলল, “কোন ভূত-টুত আছে তাইতো? কোথায় এটা তো আপনারা ফোনে বলেননি!”
উর্মিলাদেবী যেন একটু অপ্রস্তুত হয়ে বললেন “আরে না না, ভয়ের কিছু নেই! কিন্তু ওই যে বললাম না, নানান কথা শোনা যায়! সাবধান থাকতে তো ক্ষতি নেই! ওদিকটায় না গেলেই হল!”
এবার নীলাঞ্জনা হেসে উঠল, “আপনি কোন চিন্তা করবেন না, আমরা তাড়াতাড়ি চলে আসব আর ওইদিকে যাবো না। আর শ্রেয়া, কোন ভাবে যদি ভূত তোকে ধরে তখন তুই ওই মন্ত্রটা বলবি, ‘ভূত আমার পুত, পেত্নী আমার ঝি রাম লক্ষন সাথে আছে ভয়টা আমার কী?’ তাহলেই দেখবি সব ভূতেরা কেমন পালাচ্ছে!”
কথা বলার ধরন শুনে অনন্যাও হেসে উঠল। শ্রেয়া প্রত্যুত্তরে কেবল মুখ বাঁকিয়ে ভেঙচি কাটল!
উর্মিলা দেবী চলে যেতেই অনন্যারা হাসি ঠাট্টা করতে করতে পাহাড়ি রাস্তা ধরে উঠতে লাগল। কথায় কথায় ছবি তুলতে আর পথের দু-ধারের অপূর্ব লাল রডড্রেনডন এর শোভায় বিহ্বল হয়ে ওরা ভুলেই গেল যে তাড়াতাড়ি ফিরতে হবে। অবশেষে যখন ওরা দূর থেকে ঘন্টা ধ্বনি শুনতে পেল তখন সূর্য পাটে বসেছে, আবছা অন্ধকার নামতে শুরু করেছে। সাথে কুয়াশার চাদর বিছিয়ে যাচ্ছে ক্রমশঃ। শ্রেয়া একটু সাবধানী, বেশ খানিকক্ষণ হাঁটার পরে ওই প্রথম বলল,
-“আজ আর মন্দিরে গিয়ে কাজ নেই। এখনই প্রায় সন্ধ্যা হয়ে গেছে!”
অনন্যা আপত্তি করে, জোর গলায় বলে, “না না, ওই তো ঘন্টার আওয়াজ আসছে, এত কাছে এসে ফিরব কেন?”
নীলাঞ্জনারও এখনই ফেরার ইচ্ছা ছিল না, তাই ওরা মন্দিরের পথেই উঠতে লাগল। মিনিট দশেকের মধ্যেই ওরা মন্দিরের পৌঁছে গেল! মন্দিরটি বেশ পুরোনো, ভগবান বুদ্ধের মূর্তির সামনে প্রদীপ জ্বেলে সন্ধ্যা আরতি হচ্ছে কিন্তু সেখানে লোকজন বিশেষ নেই। এক বৃদ্ধ সন্ন্যাসী আরতি করছেন। সাথে দুজন যুবক সন্নাসী। আর জনা তিনেক সম্ভবত স্থানীয় লোক। নীলাঞ্জনা বেশ কতগুলো ছবি তুলে নিল। অনন্যা অনেক চেষ্টা করেও কিছুতেই ফোনে টাওয়ার না পেয়ে ফেসবুক লাইভ করতে পারছে না। ও ফোনটা উঁচু করে এদিক ওদিক হাঁটতে লাগল ! অবশেষে একজায়গায় একটু টাওয়ার পেতেই যেই আরো সেদিকটায় এগোতে যাবে অমনি বাজখাঁই গলায় একজন বলে উঠল,
“উধার জানা মানা হ্যায় মেমসাহাব! লট যাইয়ে!”
অনন্যা চমকে উঠে দেখল ওর পিছনে একটা লম্বা চওড়া পেশীবহুল চেহারার লোক দাঁড়িয়ে আছে! কথাটা সেই বলেছে।
অনন্যা আমতা আমতা করে বলতে গেল,
“মোবাইল এ নেটওয়ার্ক নেই তো, এদিকে খানিকটা...”
“কাঁহা না লট যাও!”... লোকটার গলায় কিছুটা হুমকির ভাব স্পষ্ট!
অনন্যার মাথাটা গরম হয়ে গেল। কিন্তু মুখে কিছু না বলে চুপচাপ নিচে নীলাঞ্জনা ও শ্রেয়ার কাছে চলে গেল। আরো খানিকক্ষণ থাকার পর ওরা ফেরার পথ ধরল। চারিদিকে তখন কুয়াশার ঘন আস্তরণ। ঠান্ডা বেড়েছে বহুগুণ। উর্মি দেবীর দিয়ে দেওয়ার টর্চ জ্বালিয়ে ওরা দ্রুত পায়ে হোমস্টেতে ফিরে এলো! ঘরে ঢুকে গরম জলে হাত পা ধুয়ে গরম গরম চায়ের কাপ আর পকোড়া নিয়ে ওরা যখন নিজেদের ঘরে বসে গল্প করছে তখন ঘড়িতে বাজে আটটা।
শ্রেয়া অনন্যাকে জিজ্ঞেস করল,-“আচ্ছা অনু, তখন থেকে দেখছি, তুই কেমন যেন চুপ করে গেছিস, কিছু কি হয়েছে?”
নীলাঞ্জনা সম্মতিসূচক ঘাড় নেড়ে বলল,-“হ্যাঁ আমিও দেখেছি, কী ব্যাপার বলতো হঠাৎ এরকম চুপ মেরে গেলি কেন?
অনন্যা এবার ওই বৌদ্ধ মন্দিরের ঘটনাটা ওদেরকে বিস্তারিত বলে বলল,-“আমার মনে হয় ওরা কিছু একটা গোপন করতে চাইছে পাবলিকের থেকে। আর ওই লোকটা যে রকম বিচ্ছিরিভাবে আমার সঙ্গে ব্যবহার করেছে আমি ওখানে গিয়েই ছাড়বো! শুধু তাই না ছবিও তুলব পরে ফেসবুকে পোস্ট করব!”
শ্রেয়ার মুখে আশঙ্কার ছায়া ঘনিয়ে উঠল,-“আরে না না! যাওয়া বারণ আছে যখন তখন কী দরকার যাওয়ার? তুই ওসব মাথায় রাখিস না... আমরা এখানে আনন্দ করতে এসেছি কটা দিন আনন্দ করে চলে যাব! তার মধ্যে এই সমস্ত ফালতু ব্যাপারে একদম ঢোকার দরকার নেই!”
নীলাঞ্জনা মাথা নেড়ে সায় জানিয়ে বলল, আমারও সেই মত। চল তাড়াতাড়ি পকোড়াগুলো শেষ কর! এখানে আবার সাড়ে আটটার সময় খেতে দিয়ে দেয়। আমি অবশ্য বলেছি নটার সময় দিতে।”
শ্রেয়া একটা পকোড়া তুলে কামড় দিয়ে বলল,-“হ্যাঁ তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়তে হবে। কাল ভোর পাঁচটায় গাড়ি চলে আসবে বললেন তারক বাবু। একটা দারুন ভিউ পয়েন্ট আছে নাকি। সানরাইজ দেখতে হবে তো!”
সেই রাতে তিন বন্ধু তাড়াতাড়ি খাওয়া দাওয়া করে ঘুমিয়ে পড়ল। কিন্তু অনন্যা অনেক রাত পর্যন্ত বিছানায় চুপ করে বসে ছিল। সন্ধ্যেবেলার ঘটনাটা কিছুতেই ও মেনে নিতে পারছিল না।
পরদিন খুব ভোরবেলা তিন বান্ধবী ক্যামেরা নিয়ে গাড়ি করে ঘুরতে বেরিয়ে গেল। সূর্যদয় দেখে একটা স্থানীয় বাজার ঘুরে টুকটাক জিনিস কিনে ফেলা এগারোটা নাগাদ ওরা একটা খাবার দোকানে বসে থুপ্পা আর মোমো খেল। সব ভালোই চলছিল কিন্তু খাবার পরেই অনন্যা হঠাৎ করেই অসুস্থ বোধ করতে লাগল। ওর খুব পেটে ব্যথা শুরু হয়েছে। ওরা সবাই হোমস্টেতে ফিরে যাবার কথা বললে অনন্যা ওদেরকে বারণ করে দিয়ে জানালো ও একাই গাড়ি নিয়ে হোমস্টেতে ফিরে গিয়ে তারপর আবার গাড়িটা ওদের কাছে পাঠিয়ে দেবে। সবাই প্রথমে রাজি হচ্ছিল না বটে, কিন্তু অনন্যা জোর করায় অবশেষে এই প্রস্তাব সবাই মেনে নিল। পরিকল্পনা মত খানিকক্ষণ পরেই নীলাঞ্জনা আর শ্রেয়াকে রেখে অনন্যা একাই হোমস্টেতে ফিরে গেল।
নীলাঞ্জনা আর শ্রেয়া পরপর দুটি মনাস্ট্রিতে ঘুরে বেড়িয়ে ছবি তুলে বেশ খানিকটা সময় কাটাল। অবশেষে বিকেল নাগাদ ক্লান্ত হয়ে তারা ড্রাইভারকে ফোন করে ডেকে নিয়ে হোমস্টেতে ফিরে গেল। তখন প্রায় বিকেল চারটে। কিন্তু ঘরে কোথাও অনন্যাকে দেখা গেল না। তারক বাবুকে জিজ্ঞেস করে জানা গেল অনন্যা আদৌ ফেরেনি। ড্রাইভার সাদমা গুরুমকে জিজ্ঞাসাবাদ করায় সে জানাল যে, অনন্যা হোমস্টে পর্যন্ত গাড়ি করে আসেনি তার খানিকটা আগেই নেমে গিয়েছে দোকান থেকে কিছু জিনিস কেনার ছিল বলে!
নীলাঞ্জনা আর শ্রেয়া দুজন দুজনের দিকে চোখাচোখি করলো। তারপর কাউকে কিছু না বলে দুজনেই বেরিয়ে গেল হোমস্টে থেকে। ওদের বারবার মনে পড়তে লাগলো গতরাতে অনন্যার কথা। অনন্যা নিশ্চয়ই ওই বৌদ্ধ মন্দিরের পিছনের পরিত্যক্ত গোরস্থানে গেছে!
অশেষ দুশ্চিন্তা নিয়ে পাহাড়ি পথের উপর দিকে খানিকটা হাঁটতেই দেখা গেল ওপর থেকে হাসতে হাসতে অনন্যা নেমে আসছে! নীলাঞ্জনা রেগে গিয়ে চিৎকার করে উঠলো, “আশ্চর্য মেয়ে তো! তুই আমাদেরকে মিথ্যা বলে কোথায় গেছিলি? ওই গোরস্থানে তো?”
শ্রেয়াও নীলাঞ্জনা’র সুরে সুর মিলিয়ে রাগতো স্বরে বলল, “তোকে এতবার বারণ করলাম তাও তুই সেই ওখানে গেলি ?”
অনন্যা হাসতে হাসতে দুই বান্ধবীর হাত ধরে উৎফুল্ল ভাবে বলল, -“কী করব বল তোদের দুজনকে তো বললাম! তোরা তো কেউ রাজি হলি না। আর গতকাল ওই পাহারাদার লোকটা আমার সঙ্গে যে মিসবিহেভ করেছে আমি কিছুতেই ওটা ভুলতে পারছিলাম না! আরে এই তো দেখ না, আমি তো দিব্যি অক্ষত অবস্থায় ফিরে এসেছি ওখানে কোথাও কিচ্ছু নেই পুরো ফাঁকা একটা জমি পাচিল দিয়ে ঘেরা! বরং আরো কিছুটা উপরে উঠলে একটা খুব সুন্দর দারুন বাড়ি আছে! তোদের আমি ওখানে নিয়ে যাব চল! কত রকমের ফুলে সাজানো অথচ বাড়িতে কেউ থাকেনা!”
শ্রেয়া রাগত স্বরে বলল, অসম্ভব আমি আর একপাও হাঁটতে পারবো না! তোকে খুঁজতে আসবো বলে দুপুরবেলা কিছু খাওয়া পর্যন্ত হয়নি! তুই চল এখন আমার খুব জোর ক্ষিদে পেয়েছে!
নীলাঞ্জনাও একদমই উৎসাহ বোধ করল না অনন্যার কথায়। “আমিও খুব ক্লান্ত রে, ওই সুন্দর বাড়িতে পরে যাওয়া যাবে, আরে তোর হাতে এটা কী! বাঃ কী সুন্দর ফুলটা ! দেখি দে!
অনন্যা ফুলটা দেবার বদলে মুখটা বাঁকিয়ে বলে উঠলো,
-“একদম দেব না। এই ফুলটা ওই বাড়ি থেকেই আমি নিয়ে এসেছি।”
তারপর ফুলটা নিজের মাথায় গুঁজতে গুঁজতে বলল,
-“আগে বল, তোরা যাবি আমার সঙ্গে? তারপর শুধু ফুল কেন আমি তো ভেবেছি যন্ত্রপাতি নিয়ে যাব বেশ কতগুলো ফুলের চারাগাছ তুলে নিয়ে আসব! কেউ থাকেই না বাড়িটায়! এখন চল যাই, আমারও খুব ক্ষিদে পেয়েছে”!
তিন বান্ধবী মিলে এরপর দ্রুত হোমস্টেতে ফিরে এলো। তারকবাবু স্ত্রী উর্মি দেবী মুখে কিছু না বললেও সন্দেহজনকভাবে অনন্যার দিকে তাকিয়ে ছিলেন। বোঝাই যাচ্ছিল বিষয়টা তিনি মোটেই ভালোভাবে নেননি।
আর দুদিন পরেই অনন্যাদের ফিরে যাওয়া কলকাতায়। বাকি দুইদিন কোথায় কোথায় যাওয়া যায় সেই সমস্ত নিয়েই কথা বলতে বলতে রাত হয়ে গেল।
রাতে শুতে যাবার সময় শ্রেয়া বলল,
-“আচ্ছা তুই যেখানে গিয়েছিলি ছবি তুলিস নি?”
অনন্যা : আরে হ্যাঁ তুলেছি তো! কিন্তু...
নীলাঞ্জনা : কী কিন্তু?
অনন্যা : আর বলিস না, ফেরার সময় পাঁচিল টপকে নামতে গিয়ে ফোনটা একেবারে ধুম করে পড়ে গেল! সেই থেকে আর অন হচ্ছে না! কলকাতায় গিয়ে হসপিটালে দিতে হবে ফোনটাকে!
শ্রেয়া : বেশ হয়েছে, যেমন গেছিলি!
রাতের খাওয়া সেরে তিন বন্ধু ঘুমিয়ে পড়ে। কিন্তু সেই ঘুম দীর্ঘস্থায়ী হয় না। শ্রেয়ার ঘুম খুব পাতলা। রাত একটা নাগাদ একটা ঠুক ঠুক আওয়াজে শ্রেয়ার ঘুম ভেঙে যায়! প্রথমে তার মনে হয় হয়তো কোন পাখির ডাক! কিন্তু ভালো করে কান খাড়া করে বুঝতে পারে কে যেন কাঠের মেঝেতে বা দেওয়ালে কিছু ঠুকছে! নীলাঞ্জনাকে দুবার ডেকে কোন সাড়া না পেয়ে অনন্যাকে ডাকতে গিয়ে দেখে অনন্যা বিছানায় নেই! তাহলে কী অনন্যা এত রাতে কিছু করছে? শ্রেয়া জানে কোন এক সময় অনন্যার ঘুমের মধ্যে হেঁটে চলার অসুখ ছিল। সেটাই আবার নতুন করে ডেভলপ করেনি তো? শ্রেয়া মোবাইলের টর্চ জ্বেলে ধীরে ধীরে বিছানা থেকে নামে। দেওয়াল হাতরে লাইটের সুইচ টেপে কিন্তু কোন আলো জ্বলে না।
“অনু...! অনু কোথায় তুই? ”
শ্রেয়া অনন্যা কে ডাকার সাথে সাথেই ঠকঠক আওয়াজটা থেমে যায়! শ্রেয়া আবার ডাকে, “অনু... তুই কোথায়? এই অন্ধকারে কী করছিস?” শ্রেয়ার কথা শেষ হবার সাথে সাথেই একটা গা শিউরে দেওয়া খল খল হাসি হেসে ওঠে কেউ!
শ্রেয়া : “অনু প্লিজ আমায় ভয় দেখাস না বলছি! রাম রাম রাম।”
ঠক... ঠক... , ঠক... ঠক... শব্দটা আবারো শুরু হয়!
বাথরুমের দরজাটা হাত দিয়ে ঠেলতেই সেটা খুলে যায় মোবাইলের আলোয় শ্রেয়া দেখতে পায় অনন্যা কাঠের দেওয়ালে সমানে মাথা ঠুকছে আর শব্দটা তাতেই হচ্ছে।
তারমানে শ্রেয়া যা ভেবেছিল তাই অনন্যার ঘুমিয়ে হাঁটা রোগটা আবার শুরু হয়েছে? শ্রেয়া তাড়াতাড়ি হাত বাড়িয়ে অনন্যার হাতটা ধরে টানতে যায়,
“এদিকে আয়, অনু! ঘুমাচ্ছিস নাকি?”
আর তখনই অনন্যার ঘাড়টা ঘুরে যায় শ্রেয়ার দিকে!
লাল চোখগুলো ভাটার মত জ্বলছে! কপাল থেকে রক্ত চুইয়ে নামছে! অনন্যার মুখে একটা আকর্ণ বিস্তৃত বীভৎস হাসি! কালো কালো বিকট দাঁত বেরিয়ে রয়েছে! খল খল শব্দে হেসে উঠলো অনন্যা! এই ভয়ংকর চেহারা দেখে তীব্র আতঙ্কে চিৎকার করে উঠল শ্রেয়া!
ততক্ষণে অনন্যার একটা হাত লম্বা হয়ে চেপে ধরেছে শ্রেয়ার গলা! অনন্যার হাতের নখগুলি লম্বা হয়ে বাঁকা এবং ধারালো হয়ে গেছে! শ্রেয়ার গলা ফুটো করে দিচ্ছে সেই ধারালো নখর! শ্রেয়ার মনে হচ্ছে যেন কোন গরম লোহার সাঁড়াশি চেপে ধরা হয়েছে তার গলায়!
এদিকে শ্রেয়ার চিৎকারে নীলাঞ্জনার ঘুম ভেঙ্গে গেছে! টর্চ নিয়ে এগোতেই এই ভয়ঙ্কর দৃশ্য দেখে সেও চিৎকার করে উঠল আর কোন মতে দৌঁড়ে দরজা খুলে বাইরে গিয়ে চিৎকার করে তারক বাবুদের ডাকতে লাগল!
ওদিকে চেঁচামেচি শুনে ইতিমধ্যেই তারক বাবুরা জেগে উঠেছিলেন! তারকবাবু এবং উর্মিলা দেবী নীলাঞ্জনাকে নিয়ে তারা ঘরে ঢুকতে যেতেই কোন অদৃশ্য শক্তি যেন তাদের ধাক্কা দিয়ে ঘরের বাইরে ছুঁড়ে ফেলে দিল! আর দরজাটা ভিতর থেকে বন্ধ হয়ে গেল!
অনেক চেষ্টার পরেও যখন কিছুতেই দরজা খোলা গেল না তখন উর্মি দেবী দৌড়ে গিয়ে নিজের ঘরে ঢুকে ঠাকুরের সামনে থেকে তার গুরুদেবের দেওয়া মন্ত্রপুতঃ জলভরা ছোট্ট শিশি নিয়ে এসে সেই শিশির জল দরজায় ছিটিয়ে দিতেই দরজা খুলে গেল!
তারক বাবু, কেয়ারটেকার রঞ্জিত, উর্মিলা দেবী নীলাঞ্জনা ঘরে ঢুকতেই দেখল, শ্রেয়া মাটিতে পড়ে আছে আর অনন্যা ওর উপর চেপে বসে এক বিরাট হাঁ করে শ্রেয়ার দিকে ঝুঁকে পড়ছে! উর্মি দেবী সেই জল আবারো ছিটিয়ে দিতেই অনন্যা কেঁপে উঠে বিকট চিৎকার করতে লাগল! ওর তীব্র চিৎকারে জানালার কাঁচ অবধি ফেটে গেল যেন! তারপরেই সকলের আতঙ্কিত চোখের সামনে ঘটল এক ভয়ংকর দৃশ্য! অনন্যা খল খল করে হেসে টিকটিকির মত দেওয়াল বাইতে লাগল! সকলে অবিশ্বাস্য বিস্মিত চোখে দেখল অনন্যার পায়ের গোড়ালি উল্টো!
অনন্যা দেওয়াল বাইতে বাইতে আর ওই পৈশাচিক হাসি হাসতে হাসতে ভাঙা কাঁচের জানালা বেয়ে এইবার বাইরে গেল! ঘরের চালের উপর তার হাসির আর হামাগুড়ি দেবার শব্দ শোনা যেতে লাগল!
কেয়ার টেকার রঞ্জিত গুরুং বিপদ বুঝে দৌড়ে গেল তার ভাই দাদাদের খবর দিতে। শ্রেয়া মেঝেতে শুয়ে তখন যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে, তার হাত পা চিড়ে গেছে! গলায় পিশাচিনীর নখরের আঘাতে হওয়া গর্ত থেকে সমানে রক্ত পড়ে চলেছে! নীলাঞ্জনা নিজের ওড়না দিয়ে শ্রেয়ার গলার ক্ষত চেপে ধরল। উর্মিদেবী, তারক বাবু ভয়ে কী করবেন না বুঝতে পেরে ভগবান ভোলেনাথ এর নাম জপ করছেন। কিছুক্ষণ এর মধ্যেই দূর থেকে মানুষজনের গলার আওয়াজ, একটা ঘন্টার আওয়াজ ভেসে আসার প্রায় সাথে সাথেই ছাদের উপর ধুপ ধুপ আওয়াজ আর খলখল হাসি হঠাৎ করেই থেমে গেল।
তারক বাবু, উর্মিদেবী সাহস করে ঘরের বাইরে বেরিয়ে এলেন। গ্রামের কয়েকজন সাহসী যুবক শাবল, লাঠি আর মশাল নিয়ে ছাদে উঠল কিন্তু কোথায় কী? অনন্যা বা পিশাচিনীর কোন অস্তিত্ব মাত্র নেই কোথাও! তখন সবাই মশাল হাতে এদিক ওদিক দেখতে লাগল, কিন্তু না কোথাও অস্বাভাবিক কিছু দেখা গেল না! কেবল মাত্র ঘরের চালের উপর রক্ত মাখা পায়ের ছাপ প্রমাণ দিয়ে গেল, সে ছিল! একটু আগেও সে ছিল! রাত্রির নৈস্তব্ধকে কাঁপিয়ে দিয়ে একটা প্যাঁচা কোথাও ডেকে উঠল! চমকে সামনের দিকে তাকিয়ে রঞ্জিত বলে উঠল একটাই শব্দ, “প্রভুজি...!”
গ্রামবাসীদের মধ্যে মৃদু গুঞ্জন শুরু হল। সবাই অবাক হয়ে একদিকে তাকিয়ে। ক্রমশঃ ঘন কুয়াশার আস্তরণ ভেদ করে এক সৌম্যকান্তি বৃদ্ধের চেহারা উদ্ভাসিত হল। তার গায়ে বৌদ্ধ ভিক্ষুকের বস্ত্র। নীলাঞ্জনার মনে পড়ল এই বৃদ্ধকেই সেদিন সন্ধ্যা আরতি করতে দেখেছিল গৌতম বুদ্ধের মূর্তির সামনে। পাশে পেশিবহুল চেহারার লম্বা চওড়া এক ব্যক্তি একহাতে মশাল অন্য হাতে লাঠি নিয়ে দাঁড়িয়ে।
নীলাঞ্জনাকে চমকে দিয়ে বৃদ্ধ পরিষ্কার বাংলা ভাষায় বলে উঠলেন, বৃদ্ধ, “এত বছরে যা কখনো হয়নি এই প্রথম তা হল! এর আগে এরকম অতিলৌকিক ঘটনা ঘটেছে কিন্তু তা কেবলমাত্র গোরস্থান কেন্দ্রিক। তোমার বান্ধবীকে বারণ করা সত্ত্বেও সে আজ ওখানে গিয়েছিল! এবার তুমি আমাকে মনে করে বল গোরস্থান থেকে সে এমন কোন জিনিস নিয়ে এসেছিল যার ফলে সেই অশুভ শক্তি বাইরে আসতে পেরেছে আজ ?”
নীলাঞ্জনা অনেক চেষ্টা করেও কিছুই মনে করতে পারলো না। কারণ সত্যিই তো অনন্যার কাছে গোরস্থান থেকে আনা কোন জিনিসই ছিল না।
প্রভুজী, খুব চিন্তিত হয়ে বললেন, “এই অশুভ আত্মা দীর্ঘদিন ধরে ওই গোরস্থান সংলগ্ন অঞ্চলে রয়েছে। কোন এক অজ্ঞাত কারণে হাজার চেষ্টার পরেও আমরা কিছুতেই সেই অতৃপ্ত আত্মাকে শান্তি দান করতে পারিনি তাকে মুক্তি দান করতে পারিনি! কারণ সে কে সেই পরিচয়টাই আমরা জেনে উঠতে পারিনি! কিন্তু এতকাল সে কেবলমাত্র ওই ভূমিতেই আবদ্ধ ছিল! আজ কী করে সে বেরিয়ে এলো সেটাই আমায় ভাবাচ্ছে!
আজ আমি ধ্যান যোগে জানতে পারি ওই অশুভ অতৃপ্ত আত্মা এই গৃহে উপদ্রপ করছে! কিন্তু এখন দেখছি আমার আসতে অনেকটাই দেরি হয়ে গিয়েছে! এখন তো মনে হচ্ছে না গোরস্থানে গিয়েও কোন লাভ হবে, একবার যখন সে নিজের বন্ধন মুক্ত করে ফেলেছে সে কি আর ওখানে ফিরে যাবে?”
নীলাঞ্জনা অনুতপ্ত ভাবে বলল, “বিশ্বাস করুন আমরা যদি একবারের জন্য বুঝতে পারতাম ওকে কিছুতেই যেতে দিতাম না, কিন্তু এখন আপনি দয়া করে যে করে হোক অনন্যাকে বাঁচান!”
প্রভুজি হাতে একটি জ্বলন্ত মশাল তুলে নিয়ে সকলকে অনুসরণ করার জন্য ইশারা করে হাঁটতে লাগলেন। গ্রামবাসীসহ তারক এবং নীলাঞ্জনা প্রভুজিকে অনুসরণ করে চলতে লাগলো। ওদিকে উর্মিলাদেবী বসে রইলেন রক্তাক্ত শ্রেয়ার পাশে!
গভীর রাতের অন্ধকার আর প্রবল ঠান্ডাকে প্রতিস্পর্ধা জানিয়ে প্রভুজীর নেতৃত্বে এই ছোট্ট দলটা লাঠি আর মশাল হাতে নিয়ে অবশেষে এসে পৌঁছালো নিষিদ্ধ গোরস্থানে!
কিন্তু কোথায় কী? চারিদিকে অস্বাভাবিক কোনো কিছুরই চিহ্নমাত্র নেই! বৃদ্ধ সন্ন্যাসী প্রভুজী চোখ বন্ধ করে মন্ত্র উচ্চারণ করলেন কিন্তু তা সত্ত্বেও কোনভাবেই অনন্যার কোন সন্ধান পাওয়া গেল না।
তখন তিনি নীলাঞ্জনাকে জিজ্ঞেস করলেন,
“মা! ঠিক করে ভেবে বলো তো, গতকাল গোরস্থান থেকে ফেরার পরে তোমার বান্ধবীর কাছে অস্বাভাবিক কিছু দেখেছিলে? বা এমন কিছু বলেছিল যা হদিস দিতে পারে যে ও এখন কোথায় আছে? তা যত সামান্যই হোক একটু মনে করে বল তা আমাকে!”
নীলাঞ্জনা একটু ভেবে মাথা নেড়ে বলল, “না প্রভু! অস্বাভাবিক কোন কিছুই তো ছিল না! ও একদম খালি হাতেই ফিরছিল! ওই একটা ফুল ছিল জাস্ট আর কিছুই না! খুব সুন্দর দেখতে একটা ফুল!”
-‘‘কী ফুল?”
নীলাঞ্জনা একটু ভেবে নিয়ে বলল, “সেটা ঠিক জানি না, আগে কখনও অমন ফুল দেখিনি, ভারী সুন্দর অনন্যা বলেছিল এখানে কোন একটা বাড়ি আছে যেখানে নানান ধরনের ফুল রয়েছে। আর বাড়িতে কেউ থাকেনা সেখান থেকেই ওই ফুলটা ছিড়ে নিয়ে এসেছে! সারা সময় ফুলটা তো ওর মাথাতেই গোঁজা ছিল!”
প্রভুজি যেন এইবার চমকে উঠলেন!
“ফাঁকা বাড়ি! সে কি! হ্যাঁ একটি ফাঁকা বাড়ি রয়েছে সেখানে নানান ধরনের দুষ্প্রাপ্য ফুলের বাগান রয়েছে! আসলে ওই বাড়ির বউটির শখ ছিল দুষ্প্রাপ্য ফুলের! মদ্যপ স্বামীর সঙ্গে তার কোনদিনই বনিবনা ছিল না। সে অন্য একজনের সঙ্গে একদিন কোথাও পালিয়ে গেল, তারপর মনের দুঃখে বা লোকলজ্জায় তার স্বামীসহ গোটা পরিবার কিছুদিন পর এই অঞ্চল থেকে চলে যায়। তাদের আর ফেরা হয় না! এইটুকুই আমাদের জানা। তারপর থেকে বাড়িটি প্রায় ১৫ বছর ফাঁকা অবস্থায় রয়েছে। কিন্তু ওখানে কেউ যায় না। একবার একটি চোর সেই বাড়িতে গিয়েছিল বটে। পরের দিন সকালে তার রক্তশূন্য ক্ষতবিক্ষত ভয়ংকর মৃতদেহ বাড়ির বাগানে পড়ে থাকতে দেখতে পাওয়া যায়!”
নীলাঞ্জনা ঢোক গিলে জানাল, “অনন্যা বলেছিল আমাদের ওই বাড়িটায় নিয়ে যাবে!”
প্রভুজি ব্যস্ত হয়ে উঠলেন, “আমাদের আর দেরি করা ঠিক হবে না। বিমল! চলো যাওয়া যাক!”
মিনিট দশেক চড়াই উঠে বাঁদিকে মোড় নিতেই কুয়াশার মধ্যে অস্পষ্ট ভাবে একটা বিরাট লোহার ফটক দেখা গেল। এই বোধহয় সেই বাড়ি। ফটক খুলতে বিন্দুমাত্র সমস্যাই হলো না কারণ প্রভুজির হাতের সামান্য স্পর্শেই বোঝাগেল ফটকের গেটটি খোলাই রয়েছে। কিন্তু ফটক পেরিয়ে বাগানে ঢুকতেই এক অদ্ভুত বিশ্রি গন্ধ সবার নাকে ধাক্কা মারল! সকলে গন্ধের উৎস সন্ধানে এদিক ওদিক দেখছে এমন সময় একটা বরফ ঠান্ডা হিমেল হাওয়ার ঝাপটা এসে মশাল গুলোকে যেন জাদু মন্ত্র বলে নিভিয়ে দিল, একমাত্র প্রভুজির হাতের মশাল টা দাউ দাউ করে জ্বলতে লাগল! আর সেই আলোয় মনে হল একটা আবছায়া চার হাত-পায়ে হামাগুড়ি দিয়ে বাগানের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে চলে গেল অতি দ্রুত!
বিমল লাঠি বাগিয়ে ধরে চিৎকার করল, “কউন হ্যায়? সামনে আ!”
উত্তরে বাতাস কাঁপিয়ে একটা পৈশাচিক খল খলে হাসি ছড়িয়ে পড়ল... একটা হাড় হিম করা চিৎকার দিয়ে সেই নারকিয় অবয়ব কয়েক লাফে বাড়ির কার্নিশে উঠে উবু হয়ে বসলো!
এবার পরিষ্কার দেখা গেল খোলা চুলে অনন্যা বসে আছে! তার চোখ দুটি ভাটার মত জ্বলছে! গাল গড়িয়ে নামছে চট চটে কষ!
নীলাঞ্জনা আর্তনাদ করে উঠলো “অনন্যা...!”
অনন্যারূপী সেই অতিলৌকিক শক্তি ঘাড়টা ঘুরিয়ে নীলাঞ্জনাকে দেখেই কালো কালো দাঁত বের করে একটা আকর্ণ বিস্তৃত হাসি দিয়ে টিকটিকির মত সরসর করে ঘরের ভাঙা জানলা গলে ঘরের ভিতর ঢুকে গেল!
বিমল বলল, ‘‘পিছে কা দরওজা বর্ষোসে টুটা হুয়া হ্যয়! ওহা সে চলিয়ে প্রভু!”
গ্রামের সবাই এ ওর দিকে তাকাচ্ছে। কারোরই যেতে সাহস হচ্ছে না। তবুও গুরুজীর উপর ভরসা রেখে অবশেষে সকলে বাড়ির পিছন দরজা দিয়ে বাড়ির ভিতরে ঢুকল। আর ঢুকতেই মশালের আলোয় যা দেখল তাতে সবার গায়ের লোম খাঁড়া হয়ে গেল!
ঘরের মেঝে থেকে কয়েক হাত উঁচুতে শূন্যে উল্টো হয়ে ঝুলে রয়েছে অনন্যা! কিন্তু বাকিদের চোখে যা পড়েনি প্রভুজির চোখে তাই পড়ল। তিনি দেখলেন ওই ভয়াল অবয়ব এর খোলা চুলের মধ্যে দিয়ে উঁকি মারছে একটি সুন্দর অর্কিড!
তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “ওই টাই কি সেই ফুল?”
নীলাঞ্জনা সম্মতি সূচক ঘাড় নেড়ে বলল, “হ্যাঁ, এটা তো সেই ফুলটাই মনে হচ্ছে! কিন্তু এর আকার যেন এখন আরো অনেকটা বড় মনে হচ্ছে!”
প্রভুজি চিন্তিত মুখে বললেন, “বুঝতে পেরেছি! আগে ওই ফুলটিকে ওর মাথা থেকে সরাতে হবে! আমি মন্ত্র পড়ে ওকে শান্ত করা মাত্র তুমি ওই চুল থেকে ফুলটি সরিয়ে আমার হাতে দেবে!”
এই নির্দেশ দিয়ে সন্নাসী তার ঝুলি থেকে এক মুঠো শুকনো পদ্মের পাঁপড়ি বের করে বিড় বিড় করে মন্ত্র পড়ে সেই পাঁপড়ি গুলি বাতাসে ভাসিয়ে দিতেই পাঁপড়ি গুলি শূন্যে উঠে অনন্যাকে ঘিরে ধরল এবং একটি দড়ির আকারে তাকে বেঁধে ফেলে মেঝেতে নামিয়ে আনল!
অনন্যা কিংবা অনন্যার মধ্যে থাকা অন্য কিছু, অনেক চেষ্টা করেও কিছুতেই সেই পাঁপড়ির বাঁধন ছিঁড়তে পারল না! পিশাচিনী মেঝেতে আসতেই নীলাঞ্জনা দৌড়ে গিয়ে ফুলটা টেনে খুলতে যেতেই যন্ত্রণায় তিব্র চিৎকার করে উঠল অনন্যা! পৈশাচিক চেহারা মুছে গিয়ে ফুটে উঠল যন্ত্রণা কাতর অনন্যার অসহায় মুখ! অনন্যার চিৎকারে গুরুত্ব না দিয়ে আবারো ফুলটা টানতেই কিছু একটা দেখে আতঙ্কে বিবর্ণ হয়ে নীলাঞ্জনা আর্তনাদ করে উঠে বলল,
“প্রভু! এই ফুল তো অনন্যার মাথার চামড়া ভেদ করে ঢুকে রয়েছে!”
এই কথা শুনে প্রভুজি এবং উপস্থিত সবাই আঁতকে উঠলেন। আর অনন্যার করুণ মুখের জায়গায় আবার সেই বিভৎস ভয়াল চেহারা ফুটে উঠে বিশ্রী ভাবে হাসতে হাসতে বলল,
“কিসিকো নেহি ছোড়েঙ্গে! কিসি কো নেহি।”
প্রভুজি আবারো মন্ত্রপুতঃ পাঁপড়ি পিশাচিনীর দিকে ছুঁড়ে বললেন,
“কউন হ্যায় তু? ছোড় দে ইস মাসুম কো!”
উত্তরে সেই অপশক্তি কেবল খল খল করে হাসতে লাগল!
ঠিক এইসময় প্রভুজির কী মনে হতেই তিনি নিচু স্বরে বিমলকে কিছু একটা নির্দেশ দিতেই বিমল সম্মতি সূচক আর একটি মশাল জ্বালিয়ে বেরিয়ে গেল এবং মিনিট দুয়েক এর মধ্যেই হাসি মুখে ফিরে এসে জানাল,
“প্রভুজি! হামি এই ফুলের গাছ পেয়ে গেছি! আপ চলিয়ে মেরে সাথ!”
বিমলের কথা শেষ হবার সাথে সাথেই অনন্যারূপী ওই পিশাচিনী তীক্ষ্ণ চিৎকার করে উঠল! নিজেকে ছাড়ানোর আপ্রাণ চেষ্টা ব্যর্থ হতে বাঘের মত হিংস্র গর্জন করে বলতে লাগল,
“ছুনা মৎ! উসে ছুনা মৎ!”
ইষৎ হেসে প্রভুজি কয়েকজনকে নিয়ে বাগানে ডান দিকের কোণে থাকা অর্কিড লতাটির কাছে উপস্থিত হলেন। লতাটি স্পর্শ করতেই কী যেন টের পেলেন, বললেন,
“এই জায়গার মাটি সরাও তো...!”
শোনা মাত্র সকলে শাবল দিয়ে জায়গাটি খুঁড়তে আরম্ভ করল সবাই! লতাটিকে তুলে আরো কয়েক হাত মাটি খুঁড়তেই সকলে সবিস্ময়ে চমকে উঠল!
-“ইয়ে ক্যয়া হে! ইয়ে ক্যায়া!”
মাটির মধ্যে একটি নরকঙ্কাল! এদিকে ওই অপশক্তি নিজের সর্বশক্তি দিয়ে পাঁপড়ির বাঁধন ছিঁড়ে উড়ে চলে এসেছে সকলের সামনে! রাগে তার ভয়ঙ্কর চেহারা আরো ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছে।
প্রভুজি নির্দেশ দিলেন “জ্বালা দো ইস কঙ্কাল কো! মুক্তি মিল যায়েগি ইসে!”
“নেহিই...” চিৎকার করে উঠল অনন্যারূপী সেই পিশাচিনী!
তারপর হিন্দিতে বলে উঠলো,
-“মুঝে বদলা লেনা হ্যয়! মুঝে বদলা লেনা হ্যয়! ম্যায় কহি কিসিকে সাথ ভাগ কে নেহি গ্যয়ি! উসদিনভি মেরা পতি ন্যাসা করকে আয়া, আর রোজকি তরফ মুঝে পিটা। মেরা শরপে চোট লাগি অউর মেরি সেন্স চলি গ্যায়ি থি। মে মর গেয়ী হু ইয়ে সোচ কার উসনে মুঝে জিন্দা এহি পে গাঢ় দিয়া! মুঝে উসকা আনেকা ইন্তেজার হ্যয়! বদলা লেনা হ্যয় মুঝে...!”
প্রভুজি শান্ত হেসে বললেন, “মাইয়া! কিস চিজকা বদলা লেগি তু? তেরি সাথ জো হুয়া বহৎ বুরা হুয়া! লেকিন তুঝে মারনেকে বাদ ও লোগ যব গাড়ি লেকে ভাগ রাহা থা, উসকা গাড়ি খাড়ি মে গির গ্যয়া। অউর সবহি মর গ্যয়ে! জ্বলকে রাখ হো গ্যয়ে! আব তুম ভি শান্তি মুক্ত হো যা মাইয়া...!”
কথাগুলো শুনে সেই অপশক্তি যেন থমকে গেল! খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে একটা বীভৎস চিৎকার করে উঠল, সবার মনে হল যেন হাহাকার করে কাঁদছে সে...
“ম্যায় নির্দোষ থি! ম্যায় নির্দোষ থি!”
বিমল কঙ্কালে আগুন দেবার সাথে সাথে অনন্যার শরীর থেকে একটা কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলী পাক খেয়ে বেরিয়ে গেল ! একটা করুণ কান্নার সুর যেন ফুপিয়ে ফুপিয়ে গোটা বাড়ি ঘুরে ঘুরে ধীরে ধীরে মিলিয়ে যেতে লাগলো বাতাসে।
তখন অনন্যার মাথা থেকে ফুলটা আপনি আপনি খসে পড়ল। আর ওর অচেতন শরীরটা লুটিয়ে পড়ল মাটিতে।
* * *
পরদিন সকালে হোম স্টে তে...
শ্রেয়া গলায় ব্যান্ডেজ বেঁধে শুয়ে আছে। অনন্যা আর নীলাঞ্জনা বিছানার পাশে বসে। তারকবাবু বললেন,
‘‘কাজটা আপনি ঠিক করেননি বটে কিন্তু সত্যি বলতে আপনার হাত ধরেই এতবছর ধরে আটকে থাকা এক নিষ্পাপ মহিলার আত্মা মুক্তি পেল! আমার কিন্তু আপনাদের কাছে একটা দাবী আছে!”
“কী দাবি?”
“এই অবস্থায় কাল আপনাদের যাওয়া চলবে না! আপনারা আর কিছু দিন বিশ্রাম নিয়ে সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে তারপর কলকাতা ফিরবেন! গ্রামের এতবড় একটা উপকার করলেন আপনি এই কদিনের থাকা খাওয়া আমাদের তরফে!
শ্রেয়া নীলাঞ্জনা অনন্যারা পরস্পরের দিকে তাকালো! ওদের সবার মুখে আনন্দের হাসি ঝিলিক মারছে! অনন্যা বলল,
“বেশ তাতে যদি আপনার আনন্দ হয় তাহলে তাই হোক। সত্যিই তো, শ্রেয়া এখন যাওয়ার অবস্থায় নেই। তবে কী জানেন আমার ওই বউটির জন্য খুব খারাপ লাগছে। বেঁচে থেকে তো স্বামীর হাতে চূড়ান্ত লাঞ্ছনা ভোগ করত, মৃত্যুর পরেও প্রতিশোধ স্পৃহায় এতগুলো বছর ওর আত্মা ইহোলোকে বন্দী থেকে এত কষ্ট পেল। যে জন্য ওর এত দীর্ঘ অপেক্ষা সেটাও পূর্ণ হলো না...
জীবন বড়ই অদ্ভুত...”

No comments:
Post a Comment