অসুখ
অমিত দত্ত
আমরা তখন সোদপুরে একটা বাড়িতে ভাড়া থাকতাম। আমি, মা আর বাবা। দিদির বিয়ে হয়ে গিয়েছিল আগেই। বিয়ের পর দু’বছর ও বাড়ি আসেনি। আসলে ও পালিয়ে বিয়ে করেছিল। নিলয়দা ওর কলেজের সিনিয়র ছিল। মাঝে মাঝে এসে আমায় অঙ্ক দেখাত। আসলে আমায় অঙ্ক দেখানোর নামে ও আসত মা বাবার মন গলাতে। মা নিলয়দাকে পছন্দ করত না। আসলে দিদির কোনো কিছুই যেন মায়ের পছন্দ ছিল না। দিদিও কেমন যেন বেপরোয়া হয়ে উঠেছিল। নিলয়দাকে ইচ্ছা করেই বাড়িতে ডাকত।
খাটে বসেআমি অঙ্ক করতাম, নিলয়দা পাশে বসে থাকত। দিদি তখন চা করে আনত নিলয়দার জন্য। সে চায়ে কখনো চিনি বেশি থাকত, কখনো চা পাতা। দিদি চা করতে পারত না, আমি জানতাম। তবু নিলয়দা এলে ও কেমন যেন সংসারী হওয়ার চেষ্টা করত। মা একটু চাপা স্বভাবের ছিল, মুখের উপর কিছু বলতে পারত না। নিলয়দা চলে গেলেই মা ভর সন্ধেবেলা বাথরুমে জোরে জোরে আওয়াজ করে কাপড় কাচত, ঝাঁটা দিয়ে আরশোলা মারার নাম করে মেঝেতে সপাং সপাং করে বাড়ি মারত, সেদিনই রাতে তরকারিতে নুন বেশি হতো, ভাত শক্ত থাকত। রাতে শুয়ে শুয়ে মা একটানা ভুলভাল সুরে গান করত। আমাদের ঘুম আসত দেরিতে। বাবা নিরুত্তাপ থাকত, কিছুটা নিরুপায়ও। মানুষটা বাড়ির দুই মহিলাকেই খুব ভয় পেত। সরকার অ্যাণ্ড সন্স্ নামে কলকাতার এক অফিসে বাবা হিসাব লেখার কাজ করত। অনেক বেশি বয়সে বাবা বিয়ে করেছিল। রিটায়ার করেছিল দিদি কলেজে ওঠার আগেই। ব্যাংকে জমানো ছিল সামান্যই, দিদি তাই কলেজে পড়তে পড়তে টিউশনি করত। মা বিকেল করে পাড়ার ছোটো মেয়েদের আঁকা আর গান শেখাত। দুইজনেই দুজনের মতো করে সংসারের জন্য কিছু করতে চাইত কিন্তু লক্ষ করতাম দুজনের মধ্যেই একে অপরের প্রতি ভয়ঙ্কর রাগ আর বিতৃষ্ণা জমে ছিল। আমার মাঝে মাঝে মনে হতো ওরা ঝগড়া, মারামারি করে ব্যাপারটা মিটিয়ে নেয় না কেন? ক্লাসে দেখতাম টিফিন টাইমে যাদের মধ্যে মারপিট হচ্ছে, জামা ছিঁড়ে দিচ্ছে, ইট ছুড়ে মাথা ফাটিয়ে দিচ্ছে, মা তুলে গালাগাল দিচ্ছে তারাই ছুটির সময় এঁটো আইসক্রিম চুষতে চুষতে গলাগলি করে বাড়ি ফিরছে। মা আর দিদি সেটা করত না। ওরা রাগ পুষে রাখত। নিলয়দা অনেকবার মায়ের সাথে নানা ছুতোয় কথা বলার চেষ্টা করত। মা বিশেষ পাত্তা দিত না, এড়িয়ে যেত। নিলয়দা যেদিন আসত, সেদিনই মায়ের শরীর খারাপ হতো। সেদিন সকাল বা বিকেলটা মা ভিতরের ঘরে শুয়ে কাটাত, ডাকলেও সাড়া দিত না। একবার মনে আছে, বিজয়ার পর নিলয়দা এক বাক্স মিষ্টি নিয়ে হঠাৎ চলে এসেছিল। মা তখন রান্নাঘরে ছিল, নিলয়দা সটান সেখানে গিয়ে মায়ের হাতে মিষ্টিটা দিয়ে প্রণাম করেছিল। মা মুখে কিছু বলেনি শুধু নিলয়দা যাওয়ার পর মিষ্টির বাক্সটা টান মেরে রাস্তায় ছুড়ে ফেলেছিল। রাগে আর ঘেন্নায় মায়ের সারা শরীর কাঁপছিল। জানালা দিয়ে দেখেছিলাম, মিষ্টির বাক্সটা নিয়ে শিবা আর ভুলু রাস্তায় কাড়াকাড়ি করছে। দিদি এসব দেখেও মুখে কিছু বলত না, ওর মাথায় অন্য প্ল্যান ছিল। এরমধ্যেই ঘটল একটা অঘটন। বাবা চিরকালই স্বল্পাহারী কিন্তু আস্তে আস্তে বাবার খাওয়ার পরিমাণ যেন আরো কমে যাচ্ছিল, রাতে প্রায় কিছুই খেতে চায় না। জিজ্ঞেস করলে বলে, ইচ্ছা করছে না। এরমধ্যে একদিন নিলয়দা হঠাৎ করে আসায় মা আবার রেগে গেল। ভাত পুড়িয়ে দিল ইচ্ছা করে, ফ্রিজে রাখা ঠাণ্ডা বাটামাছ গরম করল না। মনে আছে, সেদিন রাতে খেতে বসে বাবা মুখটা শুকনো করে বলেছিল, “খিদে নেই।” রাতে শোয়ার সময় বাবার ধুম জ্বর এল, প্রেসার অনেকটা বেড়ে গিয়েছিল, বুকে ব্যথা। সারারাত লোকটা প্রবল অস্বস্তিতে এপাশ ওপাশ করেছিল। মা গোটা রাত জুড়ে বাবার পাশে শুয়ে শিষের মতো সুরে, ‘কিছুক্ষণ আরো না হয় রহিতে কাছে…’ গানটা গেয়েছিল।
বাবার ওজন আস্তে আস্তে কমতে শুরু করল। সারাদিন শুয়ে থাকত। খাবার খাওয়ার ইচ্ছেটা দিন দিন চলে যেতে লাগল। কথা বললে শুনত না। সিগারেট খাওয়াটা বেড়ে গিয়েছিল। তারপর একদিন হঠাৎ বাথরুমে মাথা ঘুরে পড়ে গেল। ইউরিন থেকে ব্লাড বেরোচ্ছিল। সেটা দেখেই হয়তো…. সেদিন রাতেই বাবাকে নিয়ে হাসপাতালে গেলাম আমি আর দিদি। কয়েকটা টেস্ট করানোর জন্য বাবাকে ওখানে ভর্তি করে নিল। ইউরিনের স্যাম্পেল টেস্টের জন্য পাঠানো হল কলকাতায়। তিনদিন পর কলকাতা থেকে রিপোর্ট এল। এখানকার ডাক্তাররা যেটা ভয় পাচ্ছিলেন সেটাই, বাবার কিডনিতে ক্যান্সার ধরা পড়েছে। আশা আছে কিন্তু কলকাতায় নিয়ে যেতে হবে। বাবার যা ছিল তার অর্ধেক এখানেই খরচ হল, বাকি চিকিৎসা আরো অনেক ব্যয়বহুল। কীভাবে টাকার জোগাড় হবে সেটাই আলোচনা করতে করতে আমি আর দিদি বাড়ি ফিরছিলাম। দিদি বলল যা হওয়ার হবে, আমরা কাল বাবাকে কলকাতায় নিয়ে যাব। ওখানে মেজমেসোর অনেক চেনাজানা আছে, কিছু একটা ব্যবস্থা হয়ে যাবে। বাড়ি ফিরে মাকে বিশেষ কিছু বললাম না, শুধু বললাম কাল বাবাকে হাসপাতাল থেকেই সোজা কলকাতা নিয়ে যাব। সব ব্যবস্থা হয়ে গেছে। মা সব শুনে কিছু বলল না, শুধু একটু হাসল। পরদিন সকালে উঠে দিদিকে দেখতে পেলাম না, শুধু ওর হাতে লেখা একটা চিঠি টেবিলে পেলাম, “আমি নিলয়কে বিয়ে করব, আমায় আর তোরা এসবের মধ্যে জড়াস না।” দেখলাম মা দরজার ওখানেই দাঁড়িয়ে আছে, মুখে আগের দিনের সেই হাসিটা।
বাবাকে আর কলকাতায় নিয়ে যাওয়ার সাহস পাইনি। বাড়িতে রেখেই যতটা পারছিলাম, করছিলাম। কিন্তু আমার তখন বয়স কম, স্কুলে পড়ি। বাবার অফিসে বলে কিছু টাকার ব্যবস্থা করা হয়েছিল, বাকি মায়ের আঁকা আর গান শেখানোর টাকায় কিছুটা ঠেকনা দেওয়া হচ্ছিল। বাবার ওষুধগুলোর বেশ দাম ছিল, প্রতিমাসে সবরকম ওষুধ কেনা সম্ভব হতো না। বাবাও যেন বড়ো অধৈর্য হয়ে পড়ছিল। বয়সের জন্য হোক বা এতদিনের না বলা কথা, রাগ, অস্থিরতা শরীর থেকে বার করার জন্য হোক, বাবা যুক্তিহীন খারাপ কথা বলা শুরু করল। কোনোভাবে বাবার বদ্ধমূল ধারণা হয়েছিল যে, আমরা বাবাকে ইচ্ছা করে বাড়িতে ফেলে রেখেছি, ইচ্ছা করে বাবার চিকিৎসা করাচ্ছি না। এই রাগ, এই সন্দেহ বাবার মধ্যে বেঁচে থাকার এক অদম্য আকাঙ্খা তৈরি করেছিল। মায়ের সাথেও বাবা অত্যন্ত রূঢ় ব্যবহার করত। মা কিন্তু সব নীরবে সহ্য করে নিত। দেখতে দেখতে বছর ঘুরে গেল, মায়েরও অনেক পরিবর্তন হয়েছিল। বাবা যতই মায়ের সাথে খারাপ ব্যবহার করুক, মা যেন আরো একরোখা হয়ে বাবার সেবা করে যেত। আসলে দিদির বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়াটা মা নিজের জয় বলে মনে করত। মায়ের মনে কোনও দুঃখ ছিল না, ঘর থেকে যেন পাপ বিদায় হয়েছে।
আমাদের পাড়ার অর্পিতাদি কলকাতায় গিয়েছিল, নিউমার্কেটে দিদির সাথে হঠাৎ দেখা। বাবার বর্তমান অবস্থার কথা শুনেও নাকি দিদি সে প্রসঙ্গ এড়িয়ে গিয়েছিল। অর্পিতাদির মুখেই আমরা শুনলাম, দিদি একটা মরা ছেলে প্রসব করেছিল। ভুলতে পারব না সেই দিনের কথা, মা সেই খবর পেয়ে পাড়াশুদ্ধু লোককে মিষ্টি খাইয়েছিল। শুধু কারণটা বলতে পারেনি। কিন্তু ঐটুকুই… সেই যে মানুষকে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে তাতিয়ে দেওয়া, দমবন্ধ করা পরিবেশ তৈরি করা… এসব যেন দিদির সাথে সাথে মায়ের স্বভাব থেকেও বিদায় নিয়েছিল। মায়ের এই অক্লান্ত সেবার জন্য হোক বা বাবার বেঁচে থাকার ভীষণ জেদের কারণেই হোক, বাবা আরো একবছর বেঁচে ছিল। দিদির বিয়েরও তখন দু’বছর হল। ওইযে শুরুতে বললাম, সোদপুরে ভাড়া থাকতাম…
বাবা চলে যেতেই মা আবার অন্যরকম হয়ে গেল। বাড়িতে তখন আমরা দুটো মাত্র মানুষ। বাড়িওয়ালা দয়া করে ভাড়াটা অর্ধেক করে দিয়েছিল। এই ঘটনা আজকের দিনে বিরল। আমি স্কুল পাশ করে সবে কলেজে উঠেছি। কয়েকটা টিউশনি করি। মা গান, আঁকা শেখানো সব বন্ধ করে দিয়েছিল। সারাদিন অদ্ভুতভাবে বাবার চেয়ারে বসে থাকত নয়তো বাবার বিছানায় শুয়ে থাকত। বাবার ঘর থেকে ওষুধ, ইউরিন, রোগ-যন্ত্রণা মাখা একটা বিশ্রী গন্ধ বেরোত। শত ফিনাইল আর ডেটল দিলেও সে গন্ধ যেত না। মা সেই ঘরেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটাত। কখনো রান্না করত, কখনো করত না। সে রান্নার থেকেও কেমন একটা বাসি, পচা গন্ধ বেরোত। মাঝে মাঝে ফ্রিজ খুলে দেখতাম সুইচ বন্ধ, আলো জ্বলছে না। ভিতরে পনেরো দিনের বাসি সবজি, পচা কলা, পেঁপে, পেয়ারা, অন্যান্য ফল, তার খোঁসা, ছাতা পড়া দুধ, রুইমাছের শুকিয়ে যাওয়া মাথা, ডিমের খোলা সব ডাঁই করে রাখা। একদিন রাতে আমার কলেজের খাতা খুঁজতে গিয়ে একটা লাল আঁকার খাতা মতো পেলাম। সেখানে সাদা কাগজে লাল কালি দিয়ে মা, দিদির নামে অত্যন্ত খারাপ সব কথা লিখে রেখেছে, অভিশাপ দিয়েছে। বলা ভালো বিষ উগরেছে। পাতায় পাতায় কী সব আঁকা! দেখলেই বুকটা কেঁপে ওঠে। একটা হাসপাতালের ঘর, ডাক্তারের হাতে একটা রক্তাক্ত মরা বাচ্ছা। একটা বিছানা, তাতে দাউদাউ করে পুড়ছে একটা শরীর। একটা মেয়ে, তার একহাতে একটা বঁটি, অন্যহাতে তার নিজের কাটা মাথা, গলা দিয়ে রক্তের ফোয়ারা বেরোচ্ছে।
“সানু...”
ফ্যাসফ্যাসে গলায় মায়ের অমন ভয়াল ডাক আমি আগে কখনো শুনিনি। চমকে গিয়ে খাতাটা হাত থেকে পড়ে গেল। মা ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে খাতাটা তুলে শিষের মতো গলায় বলল,
“আর কখনো আমার খাতাপত্র ধরিস না, হাত মুখ ধুয়ে নে, খেতে দিচ্ছি।”
ভয়ে সেদিন আমি আর ঘর থেকে বার হইনি। মা পাঁচ মিনিট অন্তর অন্তর দরজায় ঠকঠক করছিল। আমি কিছুতেই দরজা খুলিনি। সারারাত শুয়ে শুয়ে, বাইরের ঘর থেকে ভেসে আসা মায়ের দুর্বোধ্য গানের সুর শুনে গেছি। আমার কেমন যেন একটা আতঙ্ক তৈরি হয়েছিল। বাড়িতে বেশি থাকতাম না, ভয় লাগত। তনুদি মাঝে মাঝে বাজার করে দিয়ে যেত, রান্না করে পাঠাত। মা আর বাড়ির বাইরে বেরোত না। একদিন বিকেলে বাড়ি ফিরে দেখি মা, বাবার পড়ে থাকা ওষুধগুলো মুঠো করে নিয়ে কামড়ে খাচ্ছে। আমায় দেখে একগাল হেসে বলল,
“খুব খিদে পেয়েছিল রে, তুই খাবি? নে না খা... খা...।”
আয়নায় দেখেছিলাম আমার চোখ মুখ বসে যাচ্ছে, দিনদিন রোগা হয়ে যাচ্ছি।
বাবার অনেক আশীর্বাদ ছিল হয়তো, একদিন খুব জোর বেঁচে গেলাম। একটু রাত করেই সেদিন বাড়ি ফিরেছি, সারা ঘরে কেমন একটা গন্ধ পেলাম। দেখলাম মা শুয়ে আছে, অন্যদিন এরকম হয় না। একটা সন্দেহ হল, রান্নাঘরে গিয়ে দেখলাম গ্যাসের নবটা খোলা। কাঁপা হাতে গ্যাসটা বন্ধ করে পেছনে ঘুরতে যাব, স্পষ্ট অনুভব করলাম পিছনে কেউ দাঁড়িয়ে আছে। আমি আর নড়তে পারলাম না। মা কানের কাছে মুখ এলে বলল,
“গ্যাসটা বন্ধ করে দিলি সানু?”
ভয়ে আমি তেল চিটচিটে দেয়ালে সিঁটিয়ে দাঁড়ালাম। মায়ের মুখের ঠাণ্ডা হাসিটা কান ছাপিয়ে গেছে।
“বেশ… শুয়ে পড়। আজ আর কিছু রান্না করিনি। শরীরটা ভালো না।”
ক’টা দিন কোনোমতে কাটল। জয়ন্ত, বিকাশ আর সঞ্জয় এসেছিল দেখা করতে। প্ল্যান করলাম দু’দিনের জন্য দীঘা যাব। তখন আমি সবে সবে মদ খাওয়া শিখেছি। রাতে বসে খুব মদ খেলাম। বুকের জ্বালা জুড়োতে গিয়ে দেখলাম বুকে প্রচণ্ড ব্যথা শুরু হল। মাথাটা এলিয়ে একটু শুতে যাব, বিকাশ ফস্ করে একটা কথা বলে ফেলল,
“তোর দিদির খবর কী রে সানু? কথা ফথা হয়?”
“ওর খবর ঠিক জানি না আমি।” প্রশ্নটা যেন কিছুটা এড়িয়ে যেতে চাইলাম।
“কার সাথে পালাল যেন, নিলয়দা তো?”
“হ্যাঁ, আবার কার সাথে…”
“না, আসলে আমাদের পলতার ওদিকে পড়তে যেত তো, তখন দেখতাম…”
“কী দেখতিস?” আমি খেঁকিয়ে উঠলাম।
“আহঃ, এখন ছাড় না ওসব।”
সঞ্জয় নিভু নিভু চোখে বলে উঠল।
“বলুক না, মাল খেতে খেতে এসব কথা শুনতে তো ভালোই লাগে… যদি সানুর শুনতে কোনো আপত্তি না থাকে…” জয়ন্ত বলল।
“বল, আমি শুনব।” আমার মাথায় যেন রোখ চেপে গেল।
“না, দেখতাম ওই লাল পার্টির অর্ধেন্দুদার সাথে মাঝে মাঝে ঘুরত। ঝিলপাড়ের দিকটাও একবার দেখেছিলাম মনে হয়। ভর সন্ধেবেলা ওই পালপাড়ার শোভনদার কোলে উঠে বসেছিল, আমায় দেখে থতমত খেয়ে জামা ঠিক করছিল। আমি হেসে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘ভালো আছো দিদি?’ মুখ ঘুরিয়ে চলে গেছিল।”
আমার মাথাটা টনটন করছিল, নেশায় না জয়ন্ত-র কথায় জানি না। মনে হচ্ছিল বোতলটা ওর মাথায় মেরে… করতামও হয়তো… হঠাৎ ফোন বাজল… রাত তখন পৌনে বারোটা… এত রাতে… দেখলাম তনুদির ফোন। বিরক্ত হয়ে ফোনটা ধরে সমস্ত রাগ ওর উপর উগরে দিতে যাব, তার আগেই তনুদি বলল,
“সানু তুই কোথায় আছিস? এক্ষুণি বাড়ি আয়। তোর মা গায়ে আগুন দিয়েছে… এক্ষুণি আয়…”
বাকি কথাগুলো আমি আর শুনতে পেলাম না… এতক্ষণ যে ঢুলুনিটা আসছিল… এবার সেটা আরো জাঁকিয়ে এল… আমার খুব ঘুম পাচ্ছিল… অনেকদিন আমি শান্তিতে ঘুমাইনি… রাতের পর রাত…
বাবার বিছানায় বসে, গায়ে কেরোসিন ঢেলে মা আগুন দিয়েছিল। অদ্ভুতভাবে জ্বলে যাওয়ার সময়ও মা বসেই ছিল। আমি পরদিন সকালে বাড়ি ঢুকেছিলাম। অনেকে কানের কাছে অনেক কথা বলছিল, হয়তো সান্ত্বনা দিচ্ছিল। আমার চোখদুটো শুধু মায়ের মুখের দিকেই আটকে ছিল। থোকা থোকা আঙুরের মতো টসটসে পুড়ে যাওয়া মুখে তখনও একটা পৈশাচিক হাসি লেগেছিল, যা শুধুমাত্র আমিই অনুভব করতে পারছিলাম।
তনুদিকে কিছু একটা বলতে যাব এমন সময় বাইরে একটা চেনা মেয়েলি গলায় কান্নার আওয়াজ শুনতে পেলাম। সঙ্গে একটা দড়াম করে পড়ে যাওয়ার শব্দ আর একটা যন্ত্রণাময় চিৎকার। মায়ের আত্মহত্যার খবর পেয়ে দিদির কী এমন কষ্টে প্রাণ ফাটলো জানি না, “মা! মা!” করে ছুটে ঘরে ঢুকতে গিয়ে দরজার কাছে হোঁচট খেল। পেছনে ব্যাগ হাতে দাঁড়িয়ে নিলয়দা। দেখলাম এই কয়েক বছরে দিদি বেশ মুটিয়ে গেছে, পড়ে গিয়ে ওর পায়ের পাতাটা গেছে বেঁকে। ওকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হল। মাকে আর শেষ দেখা দেখতে পায়নি দিদি। শ্মশানে মাকে দাহ করে এসে দাঁতে নিমপাতা কেটেছিলাম, ব্যস ওইটুকুই। আলাদা করে আর কোনো নিয়ম মানিনি। শ্রাদ্ধ করিনি। দু’দিন পর দিদিকে হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দিল পায়ে প্লাস্টার করে। ফিরে যাওয়ার আগে ওর হঠাৎ কী হল জানি না, আমায় বলল, “সানু, তুইও চল ভাই আমাদের সাথে।” আমি মানা করলাম না, ও না বললে হয়তো আমি নিজেই বলতাম।
ওদিকের পাট চুকিয়ে দিয়ে চলে এলাম দমদমে দিদিদের বাড়ি। নিলয়দার বিশেষ মত ছিল না বুঝতে পারছিলাম, কিন্তু ও কিছু আর বলল না। একদিন রাত জেগে কলেজের কাজ করছি হঠাৎ একটা চেনা গন্ধ পেলাম। কিছুতেই ঠিক মনে করতে পারছিলাম না কীসের গন্ধ কিন্তু খুব চেনা লাগছিল। এটা নিয়েই ভাবছিলাম হঠাৎ একটা শব্দ শুনে বুকের রক্ত জল হয়ে গেল। একটা সুর… মায়ের সেই দুর্বোধ্য ভাষায় ইনিয়ে বিনিয়ে করা গানের সুর। কান বন্ধ করলেও কানের ভিতর দিয়ে নির্লজ্জের মতো ঢুকে যাচ্ছিল সুরটা… আসলে সুরটা তো ছিল আমার মাথার ভিতরেই… জমে ছিল ঘিলুর মধ্যে… উস্কানির একটা কাঠি দিয়ে কেউ সেই ঘিলুটা নাড়িয়ে দিতেই… ব্যস! আর যে ভুলতে পারছি না… চড়চড় করে বাড়ছে যেন আওয়াজটা… আসছে ওই দিদির ঘর থেকে…
“উফফফ দিদি তুই চুপ কর… আমায় আর জ্বালাস না… হয় নিজে পুড়ে মর… নয়তো আমায় মেরে ফেল… কিন্তু এইভাবে… উফফফফ! নাহ্!”
আমি চিৎকার করতে করতে দিদির ঘরের দিকে ছুটলাম। গন্ধটা ক্রমশ বাড়ছে, এই গন্ধ আমি চিনি, এটা বাবার ঘরের অসুখের গন্ধ, যে গন্ধে মা প্রাণ ভরে নিশ্বাস নিত। দিদির গলার আওয়াজটা ক্রমে বেড়েই যাচ্ছে, আর নেওয়া যাচ্ছে না। ছুটে দিদির ঘরের সামনে গিয়ে দেখলাম, দিদি মচকানো পায়ে ধেই ধেই করে নাচছে আর গান গাইছে,
“আগুন জ্বালো, আগুন জ্বালো…
আগুন জ্বালো, আগুন জ্বালো…”
নাচতে নাচতে টাল সামলাতে না পেরে দিদি পড়ে গেল। আমি “দিদি” বলে চিৎকার করে ছুটে গিয়ে মুখটা কোলে তুলে নিয়ে বুঝলাম, ও অনেকটাই স্বাভাবিক এখন। আমার মুখের দিকে তাকিয়ে দিদি কান্নায় ভেঙ্গে পড়ল,
“সানু… আমার... আমার বাচ্চাটা… আমার বাচ্চাটা…”
মাকে দেখতে আসার সময় দিদি দুমাসের প্রেগনেন্ট ছিল। সেদিন পড়ে গিয়ে ওর শুধু পা’টাই মচকায়নি, বাচ্চাটাও নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। দিদি আবারও একবার মা হতে পারেনি, ওর ধারণা মা ওকে ‘মা’ হতে দেয়নি। এই নাচের ব্যাপারে নিলয়দাকে কিছু বললাম না। ওর সেদিন নাইট ডিউটি ছিল।
পরদিন সকালে কলেজে যাব, খেতে বসেছি। ভাত, ডাল আর মাছ ভাজা। ডাল দিয়ে মেখে একগাল ভাত খেয়েছি, গলা দিয়ে যেন নামল না…
“দিদি, ভাতটা একদম সেদ্ধ হয়নি রে, শক্ত আছে এখনও।”
“ওহহ! একদম বুঝতে পারিনি... ভাত করাটা এখনও ভালো করে…”
“ডালটা কবেকার রে? কেমন একটা গন্ধ বেরোচ্ছে, টকটক লাগছে...”
“কবেকার মানে? আজই তো করলাম একটু আগে..”
আমার মনটা খচ করে উঠল, মাছটা খেলাম একটু ভেঙ্গে। যা ভেবেছিলাম তাই।
“মাছটা কেমন বল? ভালো না? তোর নিলয়দা নিজে হাতে বেছে জ্যান্ত রুই কাটিয়ে আনে।”
আমি আর কিছু বললাম না। যে কেউ একটু খেয়েই বলে দেবে, মাছটা অন্তত পনেরো দিনের বাসি আর পচা। আমার গা গুলিয়ে উঠছিল, মনে হচ্ছিল এক্ষুনি বমি করে দেব। দিদিকে এসব বলে কোনো লাভ হবে না জানতাম। চুপচাপ “কলেজের দেরি হচ্ছে” বলে উঠে পড়লাম।
সেদিনই রাতের ঘটনা, নিলয়দার নাইট ডিউটি ছিল আগের দিনের মতো। আমি প্রায় শুয়েই পড়েছিলাম, হঠাৎ একটা গন্ধ নাকে এল… এটা আবার কীসের গন্ধ? কেরোসিনের না? তড়াক করে উঠে পড়লাম... মানুষ যখন তলোয়ারের ওপরে খালি পায়ে হাঁটে, জীবন-মৃত্যুর ভয় তখন তার আর থাকে না। আমার ভবিতব্য ততদিনে আমার জানা হয়ে গেছে, তবু একটু চেষ্টা…
দিদির ঘরে গিয়ে দেখলাম ও বিছানার ওপর বসে নিজের গায়ে কেরোসিন ঢালছে। আমি দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়াতেই ওর চোখদুটো অগ্নিকুণ্ডের মতো জ্বলে উঠল…
“সানু, তুই আমায় একা ফেলে রেখে দীঘা ঘুরতে চলে গেলি? আমি মরলাম না বাঁচলাম, একবারও খোঁজ নিলি না? আয়, এবার আমায় বাঁচা… আমায় বাঁচা সানু। আমায় বাঁচা মায়ের থেকে।”
শেষ কথাটুকু শুনে যেন মনে হল দিদির গলা, আগেরগুলো নয়। ছুটে গিয়ে দিদিকে জড়িয়ে ধরলাম। কেরোসিনের কাঁচা গন্ধ নাকে এল।
সেদিন রাতে আমি আর দিদি আমার ঘরেই শুলাম। সকালে নিলয়দা ফোন করে জানালো, অফিসের কাজে ওকে দু’দিনের জন্য বাইরে যেতে হচ্ছে, শুক্রবার ফিরবে। দিদি ফোন রেখে কী যেন একটা ভাবল। আমিও কলেজের কাজে ব্যস্ত হয়ে গেলাম। দুপুরে হঠাৎ কলিং বেলটা বেজে উঠল। দরজা খুললাম, একটা অপরিচিত মুখ।
“আরে শোভনদা? আপনি? হঠাৎ?”
দিদি আমার পিছন থেকে বলল।
আমি মনে মনে বললাম, “হঠাৎ নয়।”
“এই এদিক দিয়ে যাচ্ছিলাম, ভাবলাম… ঘুমোচ্ছিলে না? থাক আজ যাই বরং…”
“আরে না না, আসুন তো… এটা আমার ভাই, সানু। বলেছিলাম না? ভালো নাম সায়ন সাহা। কলেজে পড়ে।”
“হ্যাঁ হ্যাঁ” একগাল হাসল ছোটোলোকটা।
“সানু যা তো, একটু শিঙাড়া নিয়ে আয় চট করে।”
“এই ভরদুপুরে শিঙাড়া?” আমি অবাক হলাম।
“দুপুর আর কই, ইয়ে, তিনটে বাজতে যায়…” দিদি কথার খেই হারিয়েও সামলে নিল।
“ওই সামনের কচুরির দোকানে যা, পেয়ে যাবি। গরম গরম ভাজিয়ে নিয়ে আসবি, দেরি করবি না।”
দেরি হল। গরম শিঙাড়া নিয়েই ফিরলাম। মনে আছে, শিঙাড়া হাতে পেয়েই ছুটেছিলাম। দুটো করে সিঁড়ি টপকে এক নিশ্বাসে উঠেছিলাম নিলয়দার চারতলার ফ্ল্যাটে। কীসের যে তাড়া, কোন দুর্ঘটনা আটকানোর যে এত উদ্বেগ, জানি না… এটুকু জানি, দশ সেকেন্ড দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে সেদিন সাতবার বেল দিয়েছিলাম। দিদি দরজা খুলে আমায় দিকে কটমট করে তাকিয়ে ছিল। শোভনদা সেদিন আর শিঙাড়া খাননি। তেলে ভাজা জিনিসে ওনার নাকি অম্বল হয়। দিদি বোধহয় সেটা জানত না।
সেদিন বিকেলবেলা দিদি আমায় ক’টা কথা বলল, কেন বলল জানি না…
“সানু, তুই কিন্তু ওর সামনে কিছু বলিস না, ও তো কিছু বোঝে না, কী ভাবতে কী ভাববে… ও কিছু জানে না।”
আমি মনে মনে হাসলাম, “সবাই সব জানে দিদি… শুধু নিলয়দা হয়তো কিছু জানে না। কিন্তু বিকাশ, জয়ন্ত, সঞ্জয়… এসব ছেলেরাও তোকে ভালোমতো চেনে, তোর সবটা জানে….”
নিলয়দা শুক্রবার রাতে ফিরেছিল গলা পর্যন্ত মদ গিলে। রাতে ওদের ঘর থেকে শব্দ আসছিল। দিদি, নিলয়দাকে আদর করছিল। ভয়ংকর আদর। আমি সেই শব্দের মধ্যেই কানে বালিশ দিয়ে ঘুমানোর চেষ্টা করছিলাম। হঠাৎ নিলয়দা তারস্বরে চিৎকার করে উঠল। সে চিৎকার আদরের নয়, প্রবল ত্রাসের। দৌড়ে গিয়ে দেখলাম, দিদি নিলয়দার তলপেটের উপর চেপে বসে আছে। খোলা চুল, নিলয়দার ডানকাঁধে ও প্রচণ্ড এক কামড় বসিয়েছে। শত বছরের জিঘাংসা যেন ফুটে উঠেছে সেই বীভৎস মুখে। কাটা পাঁঠার মতো ছটফট করছে নিলয়দা। দিদির রক্তবর্ণ চোখদুটো আমার দিকে পড়তেই একটু যেন শান্ত হয়ে গেল,
“সানু… দেখ, জানোয়ারটা কী বলছে দেখ… আমি নাকি দুপুরে বাড়িতে লোক এনেছিলাম, তার জন্য নাকি আবার শিঙাড়াও আনিয়েছিলাম, কার জন্য শিঙাড়া এনেছিলি তুই বল? নিজের জন্য তো? বল সত্যি করে… তুই নিজে খাবি বলে এনেছিলি তো শিঙাড়াগুলো?
আমি ততক্ষণে চোখে অন্ধকার দেখছি। কিছু বলতে যাব, তার আগেই নিলয়দা প্রবল যন্ত্রণাতেও চিৎকার করে বলে উঠল,
“ওহহ্, ভাই খাবে বলে...? ভাইয়ের সাথেও শুরু করে দিয়েছ?”
দিদি যেন কথাটা শুনে কারেন্ট খাওয়ার মতো ছিটকে গেল। গলগল করে রক্ত বেরোতে লাগল নিলয়দার কাঁধ বেয়ে। সেই অবস্থাতেও নিলয়দা খ্যাঁকখ্যাঁক করে হাসতে লাগল। দিদি একদলা রক্তমাখা থুতু ফেলে বিকৃত স্বরে বলল,
“কী ? আমার ছেলেকে নিয়ে এত নোংরা কথা ?”
কথাটা বলেই দিদি লাফ মেরে বিছানা থেকে নেমে আমায় ঠেলে ফেলে দিয়ে ছুটে বাইরে গেল। ও ওই কথাটা কেন বলল? ‘আমার ছেলে’ মানে? ওটা আসলে দিদির গলা নয়। দেখলাম নিলয়দাও চমকে গেছে। মুহূর্তে দিদি ঘরে ঢুকল হাতে একটা বঁটি নিয়ে। ধারালো চকচকে ফলা।
“আমার মেয়েটাকে যা খুশি বল, তোর হাত ধরে যেদিন থেকে পালিয়েছে, ও মরে গেছে আমার জন্য, কিন্তু সানুকে ওর সাথে জড়ালে, ঠিক এইভাবে… এইভাবে তোর গলাটা…”
দৃশ্যটা আমি কখনো ভুলতে পারব না। দিদি নিজের গলায় বঁটির কোপ বসাচ্ছে আর কথাগুলো বলছে। নাকি দিদির মুখ দিয়ে মা আসলে কথাগুলো বলাচ্ছে? আমি চোখে তখন অন্ধকার দেখছিলাম। অজ্ঞান হওয়ার আগে দিদির একহাতে বঁটি দেখেছিলাম, অন্যহাতে কাটা মাথা…
শিঙাড়া নিয়ে তাড়াহুড়োয় টাকা না দিয়েই ছুটেছিলাম বলে দোকানের লোকটা নিলয়দাকে নালিশ করেছিল। নাহলে এতকিছু হয়তো হতো না। নিলয়দাকে আর বাঁচানো যায়নি। সেপটিক হয়ে মারা গিয়েছিল। আমি এরপর গোলপার্কে মেজমেসোর কাছে চলে আসি। মায়ের লাল আঁকার খাতার তিন নম্বর ছবির দৃশ্যটা চোখের সামনেই সেদিন ঘটতে দেখেছিলাম। পরের পাতাটা আর কখনো উল্টে দেখার সুযোগ পাইনি। পরের পাতায় কী আঁকা ছিল, আমি সেটা জানি না।
এবং বৃত্তের বাইরে, ফেব্রুয়ারি, ২০২৫

No comments:
Post a Comment